গল্পটি সাহিত্য পত্রিকা 'নতুন ধারা'র ঈদ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে।
...
সেই দিনটা স্পষ্ট মনে আছে প্রীতমের।
হাসপাতালে নার্স তার হাতে একটা জ্যান্ত ছানা তুলে দেবার সঙ্গে সঙ্গে প্রীতমের দুনিয়াটা পাল্টে যায়। সামনের নার্স, ছানাটিকে ঘিরে ধরা আত্মীয়েরা, হাসপাতালের ছাদ-দেয়াল ফরফর করে নিমিষে চারিদিকে ছিটকে পড়ে। প্রীতম নিজেকে আবিষ্কার করে আশ্চর্য-অচেনা, হলুদ-ফুলে-ছাওয়া এক শস্যক্ষেতের মাঝখানে। তার দু’হাতের শয্যায় মনুষ্যছানাটি কোনোরকমে শুয়ে। উজ্জ্বল নীল আকাশ আর ঝকঝকে রোদের নিচে প্রীতমের দিকে চোখ পিটপিট করে তাকায় ছানাটি। কোন জনমের অনিদ্রায় তার অতি সামান্য চোখের পাতা ঘুমঘোরে ভারী হয়ে প্রায় বন্ধ হয়ে আসে। তাও কোনো এক প্রয়োজনে, অনিচ্ছুক যদিবা, চোখের পাতা অল্প করে মেলে ধরে। প্রীতমের চোখে চোখ পড়ে। আবার চোখ বুঁজে, পুনরায় অনিচ্ছুক পাতা খোলে। আরেকবার প্রীতমকে দেখে নেয়, যেন বুঝেও নেয়। তারপর চোখের পাতা ফেলতে ফেলতে ঠোঁটের বাম পাশকে নিশ্চল রেখে, ডান পাশটা টেনে একটা হাসি হাসে। এই সামান্য হাসিতে ডান ঠোঁটের কোণে ক্ষুদ্রকায়, কোণের ঠিক উপরিভাগে আরেকটি এবং ডান গালের মাঝ বরাবর মাঝারি আকারের টোল পড়ে। প্রীতমের এই প্রথমবারের মতো মনে হয়, এই মানবসন্তানটি তার নিজের। কারণ হাসলে প্রীতমের নিজের গালেও টোল পড়ে।
পরক্ষণেই মনে হয়, মনুষ্যছানাটির মালিকানা এককভাবে তার নয়। এর মালিকানায় আরেকজনের ভাগ আছে। সে হলো তার স্ত্রী নীতু। তার মালিকানার অংশটিই বেশি, এতগুলো মাস ছানাটিকে গর্ভে তিল তিল করে বড়ো করা, তার আগে চাকরি ছেড়ে বিছানায় আশ্রয় নেয়া। জটিলতা দেখে ডাক্তার বলেছিল কোনো রকম ঝুঁকি নেয়া চলবে না, সব ছেড়েছুঁড়ে বিশ্রাম নিতে হবে সর্বক্ষণ। তাই করা হয়েছে Ñ একয়েকটা মাস নীতু চাকরি, বন্ধু-কলিগসহ তার নিজের জগত ইত্যাদি ছেড়ে বিছানায় বন্দি হয়েছে। সে এই ছানাটির জন্যই। মহা মূল্যবান এই ছানাটি। কারণ বিয়ের কয়েকটি বছর পার করার পর দাম্পত্য-মুগ্ধতা যখন ফিকে হবার উপক্রম, তখন তারা সিদ্ধান্ত নেয় সন্তান নেবার। কিন্তু চাহিবামাত্রই কেউ আসে না। ডাক্তারের শরণাপন্ন হয়ে, বেশ কিছুদিনের তদারকির পর, কোথাও ডিম্বাণু-শুক্রাণুর দেখা হয়। তারপর এই ছানাটি। সেই ছানার প্রধান দাবিদার তার মাকে, মানে নীতুকে মনে পড়ে প্রীতমের। সে আশ্চর্য শস্যক্ষেত থেকে নিমেষে হাসপাতালে ফিরে আসে। খোঁজ-খবর নিয়ে জানা যায় নীতু ভালো আছে। তবে অ্যানেস্থেসিয়ার প্রভাব তখনও কাটেনি।
এদিকে পিতৃত্বের প্রভাবে প্রীতম পাল্টে যেতে থাকে।
সে খুব গৃহী মানুষ ছিলনা। অফিসের পরেও তার বাসায় ফিরতে ইচ্ছে করতো না। দুই-তিনটে জায়গায় বন্ধুদের সঙ্গে পর্যায়ক্রমে সে নিয়মিত আড্ডা দিতো। প্রতিদিন কোনো না কোনো জায়গায় আড্ডা দিয়ে বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত দশটা-এগারোটা বাজিয়ে ফেলতো। প্রথম প্রথম নীতু অভিযোগ করতো। পরে মেনে নিয়েছিল। নীতু সবকিছুতে অনুৎসাহী একটি মেয়ে, একটু অলসও যেন। ক্যারিয়ার নিয়ে তার কোনো উচ্চাকাক্সক্ষা ছিলনা, আজকাল অনেক মেয়েরই যা থাকে। দুটো চাকরিতে ঢুকেছে, একটির মেয়াদ ছিল সোয়া এক বছর, আরেকটির দেড় বছর। মাঝে প্রায় আড়াই বছর কোনো চাকরি করেনি, কোনো গুরুতর কারণ ছাড়াই। প্রথমটি ছেড়েছিল, তার ভাষায়, সহকর্মীদের মানসিক নিচতা দেখে। দেড় বছরেরটি ভালোই চলছিল, ছেড়ে দিতে হয় সে সন্তানসম্ভবা হবার পরে। অনুৎসাহী নীতু সংসারটাও করতো কোনোরকমে। ফলে প্রীতম-নীতুর গৃহটি খুব ঝকঝকে থাকতো না। ঘরের কোণে মাকড়সার ঝুল, রান্নাঘরে তেলাপোকা, ঘরের মেঝেতে স্থায়ী হয়ে যাওয়া নানা দাগ নিয়ে দু’জনের সংসার ঢিলেঢালাভাবে চলছিল। প্রীতমের বাইরে আড্ডার নেশা ছিল, আর নীতুর ছিল ঘুমের নেশা। প্রীতম বাইরে প্রচুর আড্ডা দিলেও, তার বাসায় আড্ডার আয়োজনে বন্ধুরা কমই আসতো। কারণ সাজানো টেবিলে, দুধসাদা ক্রোকারিজে, নানা পদের খাবার দিয়ে, মনোরম আপ্যায়ন তারা বন্ধু-দম্পতিদের করতো না। অগোছালো বাড়িতে, অল্পের-ওপর-দিয়ে নিমন্ত্রণ-পর্ব সারার এই প্রবণতাটি তাদের বন্ধুরা, বিশেষত কোনো কোনো বন্ধু-স্ত্রী বা বান্ধবী একদমই বরদাশত করতো না। প্রতিটি দম্পতির প্রায় সবক্ষেত্রেই বিপরীত বৈশিষ্ট্যের দু’জনকে নিয়ে গঠিত হয়। কিন্তু প্রীতম-নীতু দম্পতির অমিলের চাইতে মিলই বেশি। দু’জনেই অগোছালো, জীবনযাপন নিয়ে উচ্চবাচ্চ নেই, গাড়ি-বাড়ি করার তাড়া নেই, পরস্পরের বিরুদ্ধে খুব বেশি অভিযোগও নেই। দৈনন্দিন একটা ইস্যুতেই সামান্য ঝগড়া হতো, ঘুমাবার আগে, মশারি কে টাঙাবে তা নিয়ে। প্রীতম বলে, সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনির পর এই বাজে কাজটা আমি করতে পারবো না। নীতু বলে, আমি অফিসও করি, সংসারও সামলাই। ঘরের এই একটা কাজ তো তুমি করবা! যেহেতু তাদের দু’জনের কেউই জান দিয়ে কিছু করেনা, অন্যদিকে দাম্পত্য কলহে তাদের উৎসাহ নেই, তাই বেশিরভাগ দিন মশারি ছাড়াই তারা ঘুমাতে যায়।
এই কলহ-অনুৎসাহী, উচ্চাকাক্সক্ষাহীন দু’জনের দাম্পত্যজীবন, অতএব, ক্রমশ পানসে হতে থাকে। বিশেষত নীতুর মধ্যে একধরনের অবসাদ বাসা বাঁধে। অফিস থেকে ঘরে এসে সে শুধু বিশ্রাম নিতে চায় ও ঘুমাতে চায়। প্রীতমের বিরুদ্ধে অভিযোগ নেই, কিন্তু মনোযোগও নেই। ছুটা কাজের লোক অনিয়মিত আসে, ঘরের আসবাবে ধূলা-ময়লার স্তর পুরু হতে থাকে। প্রায়ই রাতে ফেরার আগে প্রীতম ফোন পেতো Ñ রান্না করিনি, বাইরে থেকে খাবার নিয়ে এসো। একদিন দু’জনেই স্বীকার করে যে তাদের পারিবারিক জীবন অর্থহীন হয়ে পড়েছে। বিষয়টি নিয়ে তারা ঘনিষ্ট বন্ধু-সহকর্মীদের সঙ্গে আলাপ করে। দুই দিক থেকেই পরামর্শ আসে যে তাদের জীবন পুনরায় অর্থপূর্ণ হতে পারে যদি তাদের ঘরে সন্তান আসে। তারা উভয়েই, কোনো রকম বাদানুবাদ ছাড়াই, সন্তান গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়।
এক পর্যায়ে নীতুর গর্ভে প্রাণের স্পন্দনের প্রমাণ পাওয়া গেল। এই স্পন্দন তাদের জীবনে আসলেই পরিবর্তন নিয়ে আসলো। ডাক্তারের পরামর্শ পাওয়া মাত্রই নীতু চাকরি ছেড়ে দিল। প্রীতম সম্পাদককে বলে রিপোর্টিং থেকে ডেস্কে চলে আসলো। কারণ রিপোর্টারের কাজে নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা নেই, সহ-সম্পাদকের কাজের সময় সুনির্দিষ্ট। এক সপ্তাহ পরপর শিফট পরিবর্তন হলেও ছয় ঘণ্টার সুনির্দিষ্ট কাজ। সবচেয়ে বড়ো কথা এই প্রথম প্রীতম গৃহমুখী হলো। বাইরের আড্ডা বন্ধ করে দিল। নীতুর শরীরের যত্নের জন্য আত্মনিয়োগ করলো। অদ্ভূত ও অনিয়মিত সব খাবার খেতে চায় নীতু -- লবণ মাখানো পেয়ারা, তেঁতুলের আচার, কাচকি মাছের চচ্চড়ি, মশলা মাখানো কদবেল, শুঁটকি মাছের ভর্তা ইত্যাদি। আর সবার জন্য স্বাভাবিক খাবার ভাত-মাছ-মাংস দিলে বমি করে ফেলে। প্রথম কয়েকদিন দৌড়াদৌড়ি করে এইসব খাবার সরবরাহ করে সে হয়রান হয়ে যায়। তাকে উদ্ধার করতে নীতুর মা চলে আসেন ঢাকায়। খানিক অবসরে, ভেতরের ছানাটির বয়স ছ-সাত মাস হলে, প্রীতম নীতুর স্ফীত উদরে হাত রাখে। প্রীতম বিস্মিত হয়, ভেতর থেকে কে যেন তার হাতের তালু আলতো করে চুলকে দিচ্ছে। হাতের স্থান পরিবর্তন করলেও একই ঘটনা ঘটে। নীতু বিশ্বাস করেনা প্রীতমের কথায়। নিজেও হাত রাখে এবং হতবাক হয়ে যায়। দৃষ্টিবিনিময়ে দেখা যায়, দু’জনেরই চোখ জুড়ে গভীর বিস্ময়, মুখজুড়ে স্মিতহাস্য। জীবন এত মধুর হয়? উভয়েই ভাবে।
ভেতরের ছানাটি নিয়ে দু’জনেই খুব টেনশন করতো। প্রীতম বলতো, সব ঠিকঠাকমতো হবে তো? ভেতর থেকে কোনো ভোঁদড়ছানা বের হবে নাতো? নীতু মারতে আসতো, কৃত্রিম কোপ প্রকাশ করতো। নীতু আর ভেতরকার ছানা উভয়ে মিলে অদ্ভুত সব খাবার খেয়ে হোক, আর ভেতরের ছানাটির বৃদ্ধির কারণে হোক, নীতু একসময় বিশালদেহী মানুষে পরিণত হলো। প্রীতম ডাকতো পালোয়ান বলে। সে যাই হোক, পালোয়ানের পেট থেকে ভোঁদড়ছানা নয়, ছোটখাটো মায়ময় এক মনুষ্যছানাই বেরুলো। তার নাম দেয়া হলো তন্বিষ্ঠা। প্রীতমের বাংলা ভাষার যাবতীয় জ্ঞান বিনিয়োগ করে এরকম একটা তৎসম-মার্কা নাম পাওয়া গেল। কিন্তু তা মোটেও জনপ্রিয় হলো না। সবাই তাকে তন্বি বলে ডাকা শুরু করে। বাবা ও মা উভয় প্রান্তেই তন্বিষ্ঠা প্রথম সন্তান। ফলে তাকে নিয়ে আর সবার আহ্লাদও কম দেখা গেল না। তন্বিষ্ঠা অথবা তন্বি হয়ে উঠলো তার মা-বাবা, দাদা-দাদি, নানা-নানি, খালা-খালু, চাচা-চাচি প্রমুখের প্রধান আলোচ্যউপাদান।
খাওয়া, রেচনোদ্ভূত ত্যাগ ও ঘুম -- প্রথম কয়েক সপ্তাহ এই তিনটি কাজই করলো তন্বি। তার প্রথম দুইটির সঙ্গে জড়িয়ে গেল প্রীতম। ক্ষিদে পেলেই কেবল তার ঘুম ভাঙ্গে, চোখ-মুখ লাল করে তীক্ষè-তীব্র চিৎকার করে বাড়ি মাথায় তোলে। প্রথম প্রথম মায়ের স্তনবৃন্ত সে মুখে পুরতে পারেনা, তাই ক্ষুদ্র ফিডারে দুধ গোলানো ও দ্রুততম সময়ে তার মুখে বোতলবৃন্ত ঠেসে ধরলেই কেবল তাকে ঠাণ্ডা করা যায়। বানানো দুধ খেতে খেতে, পেটটা ঠাণ্ডা হলে, সে প্রায় ঘুমিয়ে পড়ে। কিন্তু তার আগে দ্বিতীয় কাজটি করে ফেলে এবং দ্বিতীয় দফায় কাঁদে। প্রীতম তন্বিকে পরিস্কার করে, এরপর সে তৃপ্তির ঘুমে ঢলে পড়ে। এভাবে তন্বির পরিচর্যায় প্রীতম জড়িয়ে পড়ে। কারণ সার্জারির ধকল সয়ে বিছানা ছাড়তে নীতুর কয়েক সপ্তাহ লেগে গেল। নীতু কর্মক্ষম হয়ে উঠলেও প্রীতম ছুটি পেলনা। কারণ নানি-দাদিরা যে-যার সংসারে ফিরে গেছেন। সংসারে রান্না-বান্নাসহ নিয়মিত অনেক কাজে নীতু পুনরায় যুক্ত হয়ে গেল। ফলে তন্বিষ্ঠাকে পরিচর্যার বিরাট অংশ প্রীতমের ভাগেই রইলো। অবশ্য প্রীতম তা আনন্দের সঙ্গেই করতো। দিনে দিনে পরিবেশের সংস্পর্শে তন্বিষ্ঠার গায়ের রঙ ফর্সা-হলুদ অবস্থা থেকে প্রীতমের মতো শ্যামলা-তামাটে রঙে রূপান্তরিত হতে থাকলো। চেহারায়ও মায়ের আর্যরূপের চাইতে বাবার অনার্য রূপটিই প্রবল হয়ে উঠলো। সবমিলিয়ে তন্বিষ্ঠার জন্য প্রীতমের ভালোবাসা-মায়ার পারদ চড়তে থাকলো। মুখাবয়বের সাদৃশ্য ও ত্বকের রঙ মিলে তন্বিকে প্রীতম নিজের এক্সটেনশন হিসেবে ভাবতে থাকে।
তন্বি প্রথম যে কথাটা শিখলো তা হলো ‘তন্বি’। এবং অনেক দিন সে এটা ছাড়া কিছুই বলে না। ঐ একটি শব্দ দিয়েই যাবতীয় মনের ভাব প্রকাশ করতে থাকলো। সে খুশি থাকলে বলে তন্বি, রেগে গেলে বলে তন্বি, সবাইকে ডাকে তন্বি বলেই। শব্দটির সঙ্গে তার চোখ-মুখের প্রকাশভঙ্গি দেখে প্রীতমদের বুঝে নিতে হয় তার মনের অবস্থা। এরপর সে অদ্ভূত অদ্ভুত সব শব্দ উচ্চারণ করা শুরু করলো। যেমন ‘তিল্ডা তিল্ডা ইয়াল্ডা ইয়াল্ডা ...’। অথবা ‘ধুনতা পাপা’ বা ‘পান্তানিনি’ বা ‘নিম্মাতিতি’। এইভাবে তন্বি বড়ো হতে থাকে। মা-বাবা ডাকতে শেখে। আর বাবার ভক্ত হয়ে ওঠে। কারণ মার পেটে ইতোমধ্যে তন্বির ভাই এসে গেছে এবং মার পুরো মনোযোগের অনেকখানি তন্বির দিক থেকে সরে গেছে। তাই বাবাই হয়ে ওঠে তার পূর্ণাঙ্গ আশ্রয়। তন্বি বুঝুক বা না বুঝুক তার বাবা তাকে প্রচুর গল্প-গান-কবিতা শোনায়, কাতুকুতু দেয়, হাত-পা ধরে টানাটানি করে। লুকোচুরিসহ অন্যান্য খেলাধূলাও চলে। আর খাওয়ানো ও প্রাকৃতিক কর্মের পরে পরিস্কার করার মতো জরুরি কাজ তো রয়েছেই। তন্বি দুষ্টুমি করাও শেখে। হামাগুড়ি দিয়ে এসে টেবিল ধরে দাঁড়ায়, তারপর বাবার কম্পিউটারের সুইচটা বন্ধ করে দিয়ে হাসিমুখে তাকিয়ে থাকে। প্রীতম হয়তো কোনো একটা নিউজ বাসার কম্পিউটারে সম্পাদনা করছে, সেটার অনেকখানি হারিয়ে যায় সেভ না করার কারণে। প্রীতমের রাগ করা উচিত, কিন্তু তন্বির মুখের দিকে তাকিয়ে শেষপর্যন্ত পারে না।
তন্বিষ্ঠার ছোটভাই তন্ময় পৃথিবীতে এলো। সত্যিকার অর্থে তন্বিষ্ঠাই তখন অনেক ছোট। তন্ময়ের দিকে তাকানোর তেমন ফুরসৎ পেতনা প্রীতম। অদ্ভূত হলেও সত্য তন্ময় প্রথম কয়েক মাস বাবার কাছ থেকে পূর্ণ ভালোবাসা পায়নি। বিছানার এক কোণে সে অবহেলায় পড়ে থাকতো। মার কিছু আদর জুটতো বটে, তা নিয়েই সে সন্তুষ্ট থাকতো। তেমন সাড়া-শব্দও সে করতো না। কেবল খিদে পেলে বিকট চিৎকার করতো, খাবার মুখে দিলে শান্ত হয়ে যেত। সেই তন্ময় যেন বুঝে গিয়েছিল ভালোবাসা আদায় করে নিতে হয়। তাই এক বছর হবার আগেই একদিন সে প্রীতমের হাত বেয়ে প্রীতমের কোলে প্রায় উঠে পড়ে। সেদিন প্রীতম শুধু বিস্মিতই হয়নি, সেদিন সে তন্ময়ের দিকে ভালোবাসাসহ ফিরে তাকায়।
এরপর থেকে, কয়েক বছর ধরে, তন্বি ও তন্ময় উভয়কেই প্রতিপালন করে চলেছে প্রীতম। অবশ্যই নীতু মা হিসেবে তার দায়িত্ব ঠিকঠাক পালন করেছে। কিন্তু পরপর দুই সন্তানকে পালতে গিয়ে সে হয়রান হয়ে পড়ে। এরকমও হয়েছে যে দুই শিশু একযোগে মায়ের স্তন্যপান করছে। এবংবিধ চাপে সে শারীরিক ও মানসিকভাবে কাহিল হয়ে যায় এবং দুই সন্তানকে পূর্ণ মনোযোগ দিতে পারেনা। উপরন্তু মাঝে মাঝে মায়ের বকা খায় বাচ্চা দু’টি, চড়-চাপড়ও খায়। ফলে তারা প্রীতমের সংসর্গ বেশি উপভোগ করে। আর একটা বাড়তি পাওনা হলো যে প্রীতম তাদের কখনোই বকা দেয়না, হাত তোলেনা। কিন্তু প্রীতমকে সেটা রক্ষা করতে হয় বহু কসরৎ ও ক্রোধ প্রশমনের মাধ্যমে। কারণ শিশুদের মধ্যে কেবল দেবতা বা ফেরেশতার রূপই থাকেনা, তাদের কর্মকাণ্ডে যথেষ্ট আসুরিক বা শয়তানপ্রভাবও থাকে। তাদের সেইসব আসুরিক তাণ্ডব যেহেতু প্রীতম ধৈর্যসহকারে সহ্য করে, বাচ্চারা যেকোনো প্রশ্ন ও সমস্যা নিয়ে প্রীতমের কাছেই আসে। যেকোনো বিপর্যয়-বিবাদ-বিসংবাদে প্রথমে ‘বাবা’ বলেই ডেকে ওঠে তারা। রাতে ঘুমানোর সময় কে বাবার সঙ্গে ঘুমাবে তা নিয়ে দুই ভাই-বোনের মধ্যে ঝগড়া শুরু হয়ে যায়।
কিন্তু একসময় কিছু জিনিস বদলাতে থাকে।
তন্বিষ্ঠার বয়স যখন আট ও তন্ময়ের সাড়ে ছয়।
নীতু একদিন বললো, তুমি তন্বিকে আর গোসল করাবে না, কেবল তন্ময়কে করাবে।
প্রীতম তন্ময়কে নিয়ে সেলুনে চুল কাটাতে নিয়ে যায়। নীতু তন্বিকে বিউটি পারলারে নিয়ে যায়।
একদিন প্রীতম তন্বিকে ডাকলো, তন্বি মা, আয় বাবার সঙ্গে ঘুমাবি।
তন্বি উত্তর দিলো, না। তোমার সঙ্গে আর ঘুমাবো না, তুমি তো পুরুষ।
০২ জুলাই, ২০১১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



