somewherein... blog badh bhangar awaaj recent posts http://www.somewhereinblog.net http://www.somewhereinblog.net/config_bangla.htm copyright 2006 somewhere in... সামাজিক মাধ্যম নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সেমিনার আপনারা সবান্ধব আমন্ত্রিত। ]]> http://www.somewhereinblog.net/blog/fahmidulhaqblog/29541406 http://www.somewhereinblog.net/blog/fahmidulhaqblog/29541406 2012-02-14 21:33:13 বিকল্প মাধ্যম নিয়ন্ত্রণের ভাবনা হবে আত্মঘাতী
দুনিয়া জুড়ে সাইবারপরিসরকে নিয়ন্ত্রণ করবার একটা আশঙ্কাজনক প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সোপা (স্টপ অনলাইন পাইরেসি অ্যাক্ট) এবং পিপার (প্রটেক্ট ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি অ্যাক্ট) মতো বিল পাশ করানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। বিল দু’টির মূল কথা ছিল প্রথাগত কপিরাইট প্রথা লঙ্ঘন করতে পারে এমন বিদেশি ওয়েবসাইট আমেরিকানরা দেখতে পাবে না। এই আইনটি পাশ হলে বন্ধ হয়ে যেতে পারে উইকিপিডিয়া ও তার মতো অনেক গুরুত্বপূর্ণ ওয়েবসাইট, যা মূলত ব্যবহারকারীদের অবদানে গড়ে উঠেছে। এই উদ্যোগের প্রতিবাদে উইকিপিডিয়া গত ১৮ জানুয়ারি, ২০১২ একদিনের জন্য তাদের ইংরেজি ওয়েবসাইটটি ব্ল্যাকআউট করে রেখেছিল। ফেসবুকের উদ্যোক্তা মার্ক জুকারবার্গ তার স্ট্যাটাসে লিখলেন, “ফেসবুক সোপা ও পিপার বিরোধিতা করছে এবং ইন্টারনেটকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এরকম যেকোনো আইনের বিরোধিতা করবে। পৃথিবীতে আজ সেইসব রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের প্রয়োজন যারা ইন্টারনেটবান্ধব।” এদিকে ভারত সরকার ফেসবুক ও গুগলকে সতর্ক করে দিয়েছে এবং প্রয়োজনে চীনের মতো করে ইন্টারনেটকে নিয়ন্ত্রণ করা হবে বলে ঘোষণা দিয়েছে। স¤প্রতি মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার দেশগুলোতে ইন্টারনেট বন্ধ করে দেবার একাধিক ঘটনা ঘটেছে। বাংলাদেশেও কিছু আলামত দেখা যাচ্ছে। বিশেষত এলজিআরডি মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফ জানুয়ারি মাসে বলেছিলেন, আইন করে অশালীন ব্লগারদের নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। দু-একটি ব্লগ কর্তৃপক্ষ নিজেরাও গিলোটিনে গলা এগিয়ে দিয়ে বলছেন সাইবার অপরাধ দমনের নিমিত্তে সাইবার আইন করতে হবে। দেশে ব্লগার গ্রেফতার হয়েছে, ফেসবুকের স্ট্যাটাস নিয়ে আইনের ফ্যাসাদে ফাঁসিয়াছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষক।

বিকল্প মাধ্যম হিসেবে বিশ্লেষকরা মধ্য ঊনবিংশ শতাব্দির ব্রিটেনে দৃষ্ট শ্রমজীবীদের বা র‌্যাডিক্যাল প্রেস কিংবা ১৯৬০-এর দশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পরিদৃষ্ট নিও জার্নালিজমের পত্রিকাগুলোর কথা উল্লেখ করেন। পশ্চিমা দেশগুলোতে, যেখানে মূলধারার মাধ্যমগুলো অনেক শক্তিশালী, নানা ধরনের বিকল্প মিডিয়ার অস্তিত্ব আছে। ধরা যাক ষাটের দশকের হিপিদের ‘আন্ডারগ্রাউন্ড’ সংবাদপত্রগুলো। কিংবা একালে স্বল্প বাজেটের সাহিত্য পত্রিকা, র‌্যাডিকাল রাজনৈতিক মতাদর্শের পত্রিকা অথবা পরিবেশবাদীদের কিংবা নারীবাদীদের কমিউনিটি রেডিও। প্রতিদিনের মূলধারার পত্রিকা যা কাভার করেনা, তা তুলে ধরে যে মাধ্যম, সেটাই বিকল্প মাধ্যম। টিম ও’সুলিভান বলেছেন, বিকল্প মাধ্যম অবশ্যই বিপ্লবী পন্থায় সমাজ পরিবর্তনের ওকালতি করবে। কিন্তু বিকল্প মাধ্যমকে আজ আমরা কীভাবে চিনবো? আমাদের কি নতুন করে বিকল্প মাধ্যম দাঁড় করাতে হবে না এর নিদর্শন ইতোমধ্যেই আমরা দেখতে পাচ্ছি? আজকের সময়ে বিকল্প মাধ্যম সবচেয়ে বেশি পরিদৃষ্ট হচ্ছে সাইবারপরিসরে। আমাদের দেশে এর খুব বেশি নিদর্শন দেখা না গেলেও ব্লগ ও ফেসবুকে স্বতঃস্ফূর্ত-অপেশাদার নাগরিক সাংবাদিকতার কারণে অনলাইন ক্রমশ বিকল্প মাধ্যম হিসাবে গড়ে উঠছে। প্রথাগত মূলধারার গণমাধ্যমে তথ্যের প্রবাহ একমুখী। কিন্তু সামাজিক মাধ্যমগুলিতে দ্বিমুখী পদ্ধতিতে মানুষ পরস্পরের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া ঘটাচ্ছে। যোগাযোগ প্রক্রিয়ায় বার্তাপ্রেরক ও গ্রহীতার যে সম্পর্ক তাতে প্রেরক থাকে প্রধান ও নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় -- মূলধারার গণমাধ্যমে সাংবাদিক ও পাঠক-দর্শক-শ্রোতার সম্পর্ক যেমন। কিন্তু সাইবারপরিসরের যোগাযোগ প্রক্রিয়ায় প্রেরক-গ্রহীতার সম্পর্ক পাল্টে গিয়েছে। গ্রহীতাও প্রেরকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হচ্ছে। এই পরিবর্তন তাৎপর্যময়। এখন এই বিকল্প মাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণের ভাবনা ভাবছেন শাসকেরা।

এর কারণ অনুমান-অযোগ্য কোনো বিষয় নয়। আরব বসন্ত এবং অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট-এর মতো আন্দোলনগুলোতে ইন্টারনেটভিত্তিক সামাজিক মাধ্যমগুলো খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। অন্যদিকে মানবেতিহাসে এই প্রথমবারের মতো নিপীড়িতরা বৈশ্বিকভাবে এক হবার সুযোগ পেয়েছে। অধিকার আদায় এবং সামাজিক পরিবর্তনের জন্য মানুষের একত্রিত হওয়াটা অন্যতম পূর্বশর্ত। আর সাইবারপরিসর হলো সেই পাটাতন, যাতে পৃথিবীর সকল প্রান্তের মানুষ একত্রিত হয়ে কথা বলছে, প্রতিবাদ কর্মসূচি নির্ধারণ করছে। একথা ঠিক যে অনেক ব্লগার বা ফেসবুক-টুইটার ব্যবহারকারী দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ করেন। বাকস্বাধীনতার অপব্যবহার করে ব্যক্তি অবমাননা করে থাকেন, অপরের ক্ষতিসাধন করে থাকেন -- এইভাবে সম্ভাবনাময় একটি মাধ্যমকে কালিমালিপ্ত করে থাকেন। ব্লগারদের লাগামহীনতার বৈশিষ্ট্য পৃথিবীব্যাপী প্রায় একই। অবশ্য বাংলভাষী প্রতিটি ব্লগ কমিউনিটিরই নীতিমালা আছে, এবং বাকস্বাধীনতার অপব্যবহার একটা সীমা রয়েছে। ফেসবুকেও আপত্তিকর আধেয় নিয়ে কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা যায় ও তার ফল পাওয়া যায়। কিন্তু দায়িত্ববোধহীনের বোধোদয়ের জন্য, সচেতনতা বৃদ্ধির কর্মসূচি নেয়া বা ব্লগগুলোতে সুলিখিত নীতিমালা প্রবর্তনের আবেদন ছাড়া, নিয়ন্ত্রণের কোনো পদক্ষেপ গণতান্ত্রিক একটি সরকারের জন্য আত্মঘাতী হবে। ২০১০ সালে কয়েকদিনের জন্য যখন ফেসবুককে বন্ধ করিয়া দেয়া হয়েছিল, তখন প্রক্সি সার্ভার দিয়া মানুষ ফেসবুকে প্রবেশ করেছিল। আর বিদেশে অবস্থানকারী ব্যবহারকারীদের একেবারেই নিয়ন্ত্রণ করা যায়না। বলা যায়, ইন্টারনেটকে পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়া ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ কোনো সাইটকে বন্ধ করে দেওয়া প্রায় অসম্ভব। এখন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ চীন বা ইরানের মতো ইন্টারনেট-প্রতিপক্ষ দেশ হবার বিলাসিত করতে পারে কিনা সরকারকে ভেবে দেখতে হবে। কারণ গণতান্ত্রিক যেকোনো দেশে বাকস্বাধীনতা হরণ করলে হিতে বিপরীত হয়। ফেসবুক বা ব্লগ ব্যবহারকারীদের সবাই সমাজের সচেতন-শিক্ষিত অংশ। এই সাইটগুলো তাদের দৈনন্দিন জীবনযাপনের অংশ হয়ে গিয়েছে। যেকোনো নিয়ন্ত্রণ তাদের ক্ষুব্ধ করে তুলবে। আর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করলেই তা বৈশ্বিক একটা সংবাদের পরিণত হবে। ডিজিটাল বাংলাদেশ স্লোগানধারী সরকারের ভাবমূর্তির সঙ্কট তৈরী হবে। তাই মানুষকে স্বাধীনভাবে কথা বলতে দেয়াই উচিত। জনশাসন প্রক্রিয়া সমালোচনাবিহীন যাবে, কোনো গণতান্ত্রিক সরকারেরই এরকম আশা করা উচিত নয়। যুর্গেন হ্যাবারমাসের জনপরিসরের যে ধারণা’ তা জনগণের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে সাইবারপরিসরে গড়ে উঠেছে। এই পরিসরকে রক্ষা করতে হবে।

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/fahmidulhaqblog/29529363 http://www.somewhereinblog.net/blog/fahmidulhaqblog/29529363 2012-01-25 23:45:32
বস নাম্বার ওয়ান: অবিশ্বস্ত অথচ আকর্ষণীয়
মোহাম্মদ হোসেনের প্রযোজনায় ও বদিউল আলম খোকনের পরিচালনায় নির্মিত শাকিব খাননির্ভর চলচ্চিত্র-কারখানার এই ছবিকে হিট বানানোর দায়িত্ব শাকিব খানের কাঁধেই বর্তেছে। বাকিদের দায়িত্ব তাঁকে কেবল সমর্থন দেওয়া। ফলে শাকিব খানের আক্রোশের শিকার হওয়ার জন্য মিশা সওদাগর অভিনীত ডলার তালুকদার চরিত্রকে কিছুটা বাড়তে দেওয়া হয়েছে। আর সংঘাত শুরুর উপলক্ষ হিসেবে শাকিব খানের বাবা রাহাত খানরূপী প্রবীর মিত্রকে স্থানীয় ব্যবসায়ী সমিতির প্রধান হিসেবে দেখানো হয়েছে। রাহাত খান চাঁদা না দেওয়ার পবিত্র দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে চাঁদাবাজদের আক্রমণের শিকার হন। বাবাকে রক্ষা করতে গিয়ে হৃদয় আহত হয়। এই চাঁদাবাজদের গডফাদার হলো ডলার তালুকদার। হাসপাতালে রক্ত দিয়ে হৃদয়কে বাঁচিয়ে দেয় আলো চৌধুরী। ফলে তাদের মধ্যে প্রেম হয়; বিয়েও ঠিক হয়। ওদিকে ডলার বাহিনীর সঙ্গে হৃদয়ের শত্রুতা নানা সূত্রে বাড়তেই থাকে। বিয়ের দিন আলোকে কিডন্যাপ করে ডলার বাহিনী। তাকে উদ্ধার করতে হৃদয় ডলারের আস্তানায় গেলে তাকে প্রচণ্ড মারধর করে ডলার বাহিনী এবং আলোকে গুলি করে। অজ্ঞান আলোকে নিয়ে একটি জিপে করে হৃদয় যেতে চাইলে ডলার হৃদয়কে গাড়ি থেকে টেনে নামায় এবং গাড়িটি রাস্তা থেকে পাহাড়ের নিচে পড়ে আগুন লেগে যায়। ডলারের লোক পুলিশ অফিসার হৃদয়কে গ্রেপ্তার করে আলোকে ধর্ষণচেষ্টা ও হত্যার অভিযোগে।

একসময় হৃদয় জেল থেকে পালায়। এ সংবাদ পেয়ে ডলার তার পুরো বাহিনী নিয়ে পাতাইয়া পালায়। সেখানে গিয়ে সে আন্ডারওয়ার্ল্ডের বস নাম্বার ওয়ান হওয়ার মিশনে নামে। আর ডলারের খোঁজ দিয়ে হৃদয়কে পাতাইয়া ডেকে নেয় ক্রাইম রিপোর্টার আশা চৌধুরী। সেখানে গিয়ে হৃদয় খানও দাবি করতে থাকে, সে-ই বস নাম্বার ওয়ান। তারও এক বাহিনী গড়ে ওঠে। ফলে এ দুই পক্ষের সংঘাত অনিবার্য হয়ে ওঠে। দেশ থেকে ডলার ধরে নিয়ে আসে হৃদয়ের মা-বাবা, ভাই-ভাবি ও ভাতিজাকে। ডলারের হাতে একে একে নিহত হয় ভাই ও বাবা। এদিকে আশা ও হৃদয় একসঙ্গে কাজ করলেও এবং প্রকাশ্যে আশা হৃদয়ের প্রেমপ্রত্যাশী হলেও শেষ পর্যন্ত আশা হৃদয়কে খুন করে বোন আলোকে হত্যার প্রতিশোধ নিতে চায়। জানা যায়, আলো মারা যায়নি। অচেতন আলোকে নিয়ে ড্রাইভারবিহীন জিপটি পাহাড়ের নিচে পড়ে গেলেও শেষ মুহূর্তে সে গাড়ি থেকে রাস্তায় ছিটকে যায়। আর তখনই চট্টগ্রাম থেকে ড্রাইভ করে ফিরছিল আশা। আশা আলোকে নিয়ে থাইল্যান্ডে চলে আসে। দীর্ঘদিন সে হাসপাতালে কোমায় রয়েছে। এই কাহিনি প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আলো ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয় এবং বোনকে বলে যে হৃদয় তাকে কখনোই ধর্ষণ বা খুন করতে চায়নি, বরং সব সময় ভালোবেসেছে। আশা ক্ষমা চায়, হৃদয় ফিরে পায় প্রেমিকাকে। এবার হৃদয় ডলার বাহিনীকে একাই হত্যা করে।

বস নাম্বার ওয়ান চলচ্চিত্রটি বহু কাকতাল ও অসংগতিতে পরিপূর্ণ। যখনই বাবা আক্রান্ত হয়, হৃদয় সেখানে গিয়ে উপস্থিত হয়। জেল থেকে পালানোর নৈতিক সমর্থন দেন জেলার সাহেব, যিনি আবার আলো-আশার বাবা। অচেতন আলোকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে আবিষ্কার করে তারই বোন। এসব হলো অসংখ্য কাকতালীয় ঘটনার কয়েকটি। অসংগতিরও শেষ নেই। হৃদয় মারামারি করে মাথায় চোট পেল। মারামারি করল সে এক পোশাকে, ব্যান্ডেজ বেঁধে বাসায় ফিরল আরেক পোশাকে। আলো বলছে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কথা, অথচ দেখা গেল এফডিসির ভেতরের এক রাস্তা। দৃশ্য—রাজপথের সিগন্যালে ফুল বিক্রির, অথচ তা চিত্রায়িত হয়েছে এফডিসির ভেতরে, দুই সারির কয়েকটি গাড়ির পরেই এফডিসির হলুদ রঙের দেয়াল দেখা যায়। আর দর্শকের বুদ্ধির ওপর পরিচালকের চূড়ান্ত অনাস্থা দেখা গেল ওই অংশে—কাহিনি বাংলাদেশে ঘটছে, অথচ বারবার ক্যামেরা চলে যাচ্ছে থাইল্যান্ডে। ডলার যখন ঘোষণা দিয়ে থাইল্যান্ড যাচ্ছে এবং তাকে অনুসরণ করে হৃদয়ও সেখানে যাচ্ছে, কেবল তার পর থেকেই থাইল্যান্ডকে দেখানো যেত। আগের অংশে পাতাইয়া বিচ দেখানোর লোভ সংবরণ করতে পারা উচিত ছিল পরিচালকের। ফলে চলচ্চিত্রের কাহিনিবিন্যাস ও চিত্রায়ণ অবিশ্বস্ত ঠেকে।

ভিনদেশে গিয়ে আন্ডারওয়ার্ল্ডের বস নাম্বার ওয়ান হওয়ার প্রতিযোগিতাটির যৌক্তিকতা একেবারেই প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বিশেষত ওই দেশের আন্ডারওয়ার্ল্ড বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সেটার অনুমোদন এত সহজে কিছুতেই দেবে না। ডলারের একটা প্রেক্ষাপট হয়তো আছে, কিন্তু হৃদয় খানের পক্ষে এত অল্প সময়ে ভিনদেশে গিয়ে একটা বাহিনী গড়ে তোলা কতটুকু সম্ভব? এই ক্ষমতা ও অর্থ সে কোথায় পেল? যে আশা চৌধুরী তাকে সাহায্য করছে, তারই বা থাইল্যান্ডে কতটুকু ভিত্তি আছে? সে কোন চ্যানেলের সাংবাদিক—দেশের, না থাইল্যান্ডের? এসব মৌলিক প্রশ্নের কোনো মোকাবিলাই করা হয়নি। দুই ঘণ্টার বেশি সময় ধরে কেবল ধারাবাহিকভাবে অসম্ভব সব ঘটনার বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। আগের ঘটনাগুলো কাহিনিতে যৌক্তিকভাবে প্রতিষ্ঠা না করেই পরের অসম্ভব ঘটনাগুলো হাজির করা হয়েছে।

দুর্বল গতানুগতিক কাহিনি এবং অবিশ্বস্ত চিত্রায়ণের পরও ছবিটির দর্শক টানার উপাদান রয়েছে। এ ছবির অন্যতম বাজি হলেন শাকিব খান। শুরুর দিকে ভারতীয় অভিনেতা সালমান খানকে অনুকরণ করলেও এখন তিনি তাঁর নিজস্ব সাবলীল অভিনয়রীতি দাঁড় করিয়েছেন। আলো-আশার চরিত্রে নিপুণ ও সাহারা উতরে যান তাঁদের সৌন্দর্য, বিশ্বস্ত পোশাক-আশাক ও চলনসই অভিনয়কুশলতা দিয়ে। ডলার তালুকদার চরিত্রটিতে শক্তিমান অভিনেতা মিশা সওদাগরও মানানসই ছিলেন।

এফডিসির মানের তুলনায় ছবিটির মুদ্রণমান বেশ ভালো। এ জায়গায় যে যথেষ্ট মনোযোগ পরিচালক-প্রযোজক দিয়েছেন, তা পর্দায় রঙে ও দৃশ্যের গভীরতায় স্পষ্ট। ফলে পাতাইয়ার চমকপ্রদ লোকেশন দর্শকের চোখে আরাম দেবে। পাহাড় থেকে গাড়ি পড়ে যাওয়ার দুটি কাটপিস অবশ্য ব্যবহার করা হয়েছে। সেগুলোর প্রিন্ট ছিল যাচ্ছেতাই। যে কাটপিসকে সহজে চেনা যায়, তা ব্যবহার না করাই ভালো। আসাদুজ্জামান মজনুর ক্যামেরাও বেশ নিয়ন্ত্রিত ছিল। শটের ধারাবাহিকতা নির্মাণের ক্ষেত্রে, বিশেষত নৃত্যগীত ও মারামারির দৃশ্যগুলো অনেকখানি ত্রুটিমুক্ত ছিল। সাধারণত এ দুই ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের চিত্রগ্রাহকেরা অনেক গোলমাল করে ফেলেন। তবে অন্য সব ছবির মতোই মারামারির দৃশ্যগুলোতে ব্যবহূত সাউন্ড ইফেক্ট পীড়াদায়ক। ব্যবহূত পাঁচটি গানের একটিও খুব চেনা গানের নকল নয়, গানগুলো শুনতেও মন্দ নয়। তাই সংগীতপরিচালক আলী আকরাম শুভকে ধন্যবাদ দিতে হয়।

প্রথম আলো, আনন্দ পাতায়, ১৭ নভেম্বর, ২০১১ তারিখে প্রকাশিত।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/fahmidulhaqblog/29485420 http://www.somewhereinblog.net/blog/fahmidulhaqblog/29485420 2011-11-17 23:46:04
নয় এগারোর এক দশক-পূর্তির ভাবনা
ঐ হামলার পর থেকে সন্ত্রাসবাদ নামক ভূত পশ্চিমা বিশ্বকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। ঐ হামলা সামরিক শক্তিতে বলীয়ান ইঙ্গ-মার্কিন মিত্রশক্তির অহমে আঘাত করেছে। আল কায়েদা নেটওয়ার্ক নির্মূল করার জন্য ও তার নেতা লাদেনকে ধরবার জন্য ২০০১ সালেই আফগানিস্তানে আগ্রাসন চালানো হয়, আল কায়েদার মিত্র তালেবান সরকারকে উৎখাত করে পুতুল সরকারকে বসানো হয়। ২০০৩ সালে ইরাকে আগ্রাসন চালানো হয়, অভিযোগ আল কায়েদা নেটওয়ার্ককে প্রশ্রয় দিয়েছে সাদ্দাম সরকার এবং ইরাকের গণবিধ্বংসী রাসায়নিক অস্ত্র রয়েছে। এইসব আগ্রাসনে প্রচুর বেসামরিক মানুষ মৃত্যুবরণ করেছে, ধ্বংস হয়েছ জনপদ। ক্রমশ এইসব অন্যায় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী জনপ্রতিরোধ হয়েছে, কিন্তু ‘সন্ত্রাসবিরোধী’ এইসব যুদ্ধকে থামানো যায় নি। স্পষ্ট হয়েছে এইসব আগ্রাসন মধ্যপ্রাচ্য ও মধ্য এশিয়ার তেলসম্পদ করায়ত্ব করার উদ্দেশে পরিচালিত হয়েছে। ফলে সন্ত্রাস দূর হয় নি। তালেবান গোষ্ঠী আফগানিস্তান হতে সরে পাকিস্তানসহ অন্যান্য অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। জর্জ বুশের ক্রুসেড হোক বা স্যামুয়েল হান্টিংটনের ‘সভ্যতার সংঘাত’ হোক, স্নায়ুযুদ্ধকালীন আমেরিকা-সোভিয়েত ইউনিয়নের সংঘাতের পর এখন সংঘাত পশ্চিম বনাম ইসলামে এসে ঠেকেছে। এটি সারা বিশ্বের মুসলমানদের একাংশকে অধিক কট্টর হতে ও সন্ত্রাসীকার্যে উৎসাহিত করেছে। শুধু পশ্চিমে নয়, সন্ত্রাসবাদ এভাবে আন্তর্জাতিক হতে স্থানীয় একটি রূপ ধারণ করেছে। ২০০৪-০৫ সময়কালে বাংলাদেশেও ইসলামি জঙ্গিবাদ মাথাচাড়া দিয়া উঠেছিল। আন্তর্জাতিক যোগাযোগের আওতায় ছোট ছোট নতুন অনেক সন্ত্রাসী সংগঠনের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে বাংলাদেশে। পাকিস্তানে প্রায়ই এবং ভারতে মাঝে মাঝে সন্ত্রাসী হামলা ঘটে চলেছে। তিউনিশিয়া, মিশর ও লিবিয়ায় সাধারণ জনগণ গণতন্ত্রকামী হইয়া উঠেছে, এই গণঅভ্যুত্থানকে পশ্চিমা শক্তি ভালোভাবেই কাজে লাগাচ্ছে। বিদ্রোহীদের সমর্থনের মাধ্যমে তাদের সামনে এসেছে ঐসব দেশের সম্পদ করায়ত্ব করবার সুযোগ।

নয় এগারোর ঘটনা যদি কালক্রমে এইসব ফলাফল বয়ে এনে থাকে, তবে দেখতে হবে নয় এগারোর ঘটনাটি কেন ঘটল? সমাজতন্ত্রের পতনের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বে একক শক্তি হিসাবে অনায়াসে আধিপত্য বিস্তার করতে থাকে। এই সময়কালে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতরের মধ্যপ্রাচ্য-নীতি আরব মুসলমানদের ক্রমশ অসন্তুষ্ট করে তোলে। বিশেষত প্যালেস্টাইন প্রসঙ্গে নানান পদক্ষেপ এবং ইসরায়েলকে ক্রমাগতভাবে সমর্থন দেওয়ার মতো যুক্তরাষ্ট্রের নীতি ওসামা বিন লাদেনের মতো ব্যক্তিদের সন্ত্রাসীতে রূপান্তরিত করে। আর বিশ্বশান্তিকে দূরে ঠেলিয়া দেবার জন্য নয় এগারোর একটি ঘটনাই যথেষ্ট হয়েছে। তাই ওইরকম ভয়াবহ সন্ত্রাসী ঘটনা যেমন নিন্দনীয়, তেমনি সন্ত্রাসী ঘটনার উছিলায় দেশে দেশে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনও মেনে নেয়া যায়না। বিশ্বশান্তির জন্য তাই পশ্চিমা শক্তির দায়ও যেমন বেশি, দায়িত্বও বেশি।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/fahmidulhaqblog/29446385 http://www.somewhereinblog.net/blog/fahmidulhaqblog/29446385 2011-09-11 21:03:56
ভার্চুয়ালিটি, সিক্রেট এ্যান্ড ইমোটিকন
(রাত একটা। বাংলাদেশ।)

--হাই, সবুজ নারী।
--হ্যালো ধূসর নর।
--এখন সবুজ।
--হমম। লগ-ইন করার সময় দেখি ধূসর হয়ে আছো। কেমন আছো?
--ভালো নাই। ভালো আছি।
--মানে কী?
--মানে ভালো ছিলাম না। এখন আছি। তোমার দেখা পেলাম।
--ভালো ছিলে না কেন?
--ছেলেটার হাই ফিভার। তিনদিন হলো। একটু পরপর জলপট্টি দিয়ে জ্বর নামাবার চেষ্টা করছি। প্যারাসিটামল দিয়ে কাজ হচ্ছে না।
--ও। স্ত্রী?
--ঘুমাচ্ছে।
--ও আচ্ছা।
--সারাদিন ওই দেখেছে। ধকল গেছে। আমি দু’ঘণ্টা ধরে ...। আর এমনিতেই আর্লি বেডে যায়।
--ডেঙ্গু নয়তো?
--দেখি। বন্ধু আছে একজন, ডাক্তার। ফোনে আপডেট জানাচ্ছি তাকে। আরও দুয়েকদিন দেখতে বলেছে। তোমারটা কেমন আছে?
--আছে ভালোই। আজ ওর বার্থডে। সন্ধ্যায় পার্টি হবে, সকাল থেকেই খুব চার্জড হয়ে আছে। এখন স্কুলে।
--তোমার লাঞ্চ ব্রেক?
--ঠিক তাই। তোমার?
--চাইল্ড কেয়ারিং। আর অপেক্ষা।
--কীসের?
--তুমি সবুজ হবে।
--সত্যি নাকি? আমি আপ্লুত।
--আমি কৃতার্থ।

[বিরতি]

--আর ইউ দেয়ার? ... আর ইউ দেয়ার?
--ওয়েট ... ছেলেটা একটু কেঁদে উঠলো। ... কেমন লাগে, গবেষণা?
--ভালো। প্যাশন ও পেশা এক হলে, ভালো হবারই কথা। এই ভালোলাগার বোধ সবসময় কাজ করে তা নয়। হঠাৎ পেছন ফিরে মনে হয়, মন্দ নয়।
--নর্থ আমেরিকার নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক। ইউ আর গোয়িং টু বি এ বিগ শট!
--ডোন্ট সে দ্যাট। আই উইশ আই কুড বি এ প্রমিনেন্ট জার্নালিস্ট ইন বাংলাদেশ।
--ধুর! কী যে বলো! কোনো মজা নাই। এদেশে সাংবাদিকতার কোনো স্ট্যান্ডার্ড আছে নাকি? মজা হলো তোমার, গবেষকের।
--আরে দেশে যারা পারে না তারাই বাইরে আসে। দেশের একটা সম্মানজনক চাকরি যার আছে তার কি বিদেশে আসার দরকার আছে নাকি? দেশে থাকার সুখ ... আমি আমার হতভাগা গরিব দেশটাকে, ঢাকাকে খুব মিস করি।
--এখানে আছে ট্রাফিক জ্যাম, ফরমালিনের ভেজাল, অনিয়ম, দুর্বৃত্তায়ন ... আর ওখানে আছে ফাস্ট ড্রাইভিং, পিওর ফুড, একটা সিস্টেম ... জীবন কত সহজ! ক্লিন এ্যান্ড গ্লসি সবকিছু।
--নারে ভাই। ব্যাপারটা অত সহজ না। তোমাকে দেশে সবাই এক নামে চেনে। আর এখানে আমাকে কে চেনে বলো? আমার ল্যাব, টেনেটুনে এই ইউনিভার্সিটি। এর বাইরে আমি নোবডি। এশিয়ান কালো মাইয়ারে কে পুছে বলো?
--তুমি তো কালো নও। বাদামি। বাংলাদেশের বিবেচনায় ‘মাই ফেয়ার লেডি’।
--সাদার বাইরে কালো বাদামি আর বাংলাদেশি ফেয়ার লেডি সবই এক।

[বিরতি ...। ‘ফেয়ার লেডি’র সঙ্গে ‘মাই’ শব্দটি যোগ করার পরপরই ইতস্তত বোধ করছিল ধূসর নর। কিন্তু কেমন অবলীলায় আসলো শব্দটা। ইতোমধ্যেই সবুজ নারীর একটি পোর্ট্রেট ছবি হাতড়ে বের করেছে অ্যালবাম থেকে। সেই মনোরম ছবিই এখন স্ক্রিনজুড়ে। কেমন সহজ আর আপন ভঙ্গিতে তাকিয়ে আছে ধূসর নরের দিকে। যেন কিবোর্ডের মাধ্যমে নয়, মুখোমুখি বসেই আলাপ হচ্ছে। আর সবুজ নারীর কথামালাও সহজ-স্বাভাবিক। ‘মাই’ শব্দটা যেন ধূসর নর বলেই নি। সবুজ নারী, তুমি গ্রেট, ভাবে ধূসর নর। এরকম আলটপকা কথা ধূসর নরেরা হঠাৎ বলেই ফেলে। বুদ্ধিমতী সবুজ নারীরা চিরকালই সেসব সামলে নিয়েছে।]

--কুয়ালালামপুরের কথা প্রায়ই মনে পড়ে।
--হ্যাঁ। আমারও। ইট ওয়াজ রিয়েলি এ নাইস এক্সপেরিয়েন্স। তোমাকে বন্ধু হিসেবে পেলাম।
--উপায় কী? আর তো বাঙালি ছিলনা। নয়তো এই আগলি ডাকলিংসের দিকে কে ফিরে তাকায়?
--বন্ধুত্ব কি ফিজিকাল ফিচার্স দিয়ে হয়?
--আমি কিন্তু তোমার ফিজিকাল ফিচার্স দেখেই আটকে গেছিলাম, এখনো আটকে আছি।
--নটি বয়! আই নো, ইউ আর লায়িং।
--আই ডোন্ট লাভ লায়িং।
--আমি কিছুমাত্রায় বলি।
--সোডারবার্গের ‘সেক্স, লাইজ এ্যান্ড ভিডিওটেপ’ দেখেছো?
--হমম। মিথ্যাগুলো ঐ পর্যায়ে না গেলেই হলো।
--মিথ্যা কি তাহলে পার্ট অব হিউম্যান রিলেশনশিপ?
--ধরো তোমার স্ত্রীর ঘুম এখন একটু ভাঙলো। বিছানা হাতড়ে অভ্যাসমতো তোমাকে খুঁজলো। না পেয়ে ঘুম ঘুম স্বরে জিজ্ঞেস করলো, রাত জেগে কী কর? তুমি কি বলতে পারো এক নারী বন্ধুর সঙ্গে আলাপ করছি? তুমি বলবে ছেলেটার জ্বর নামছে কিনা দেখছি।
--উমম, দু’টাই বলতে পারি। আবার নাও বলতে পারি। কিন্তু যেটার কথা বলছো, সেটাও তো সত্য।
--অর্ধসত্য। আমার ক্ষেত্রেও এরকম হতে পারে। ধরো হাজবেন্ড ফোন করে বললো, হাই হানি, কী কর? আমি বলবো লাঞ্চ করি। সেটাও কিন্তু সত্য। আমি তোমার সঙ্গে আলাপ করতে করতেই কিন্তু লাঞ্চ করছি। অর্ধসত্য।
--আমরা যা করছি তা কি অন্যায়?
--অন্যায় ভাবলে অন্যায়। না ভাবলে না। বাট এভরিবডি হ্যাজ টু হ্যাভ হিজ অর হার ওউন সিক্রেটস। একান্ত নিজস্ব কিছু না থাকলে মানুষটির আর অবশিষ্ট কিছু থাকেনা। সে সম্পর্ক, সমাজ, সংসারের কাছে দেউলিয়া হয়ে যায়।
--কিন্তু মিথ্যাগুলো ঐ পর্যায়ে না যাওয়াই ভালো। ঐরকম মিথ্যার একটা চাপ আছে, বিপর্যয় আছে। তা সামলানো কঠিন হয়।
--সেটা ঠিক। বন্ধুত্ব, প্রেম, দাম্পত্য -- সবকিছুরই একটা সৌন্দর্য আছে, সীমারেখা আছে।
--আমি সৌন্দর্যের পূজারী, আবার সীমারেখার কথাও ভুললে চলেনা।
--লাঞ্চ আওয়ার শেষ। বাই বলতে হচ্ছে।
--<img src=" style="border:0;" />। বাই।

[সবুজ নারী আর ধুসর নরের দেখা হয় কুয়ালালামপুরে, গত বছর একটা কনফারেন্সে। সবুজ নারী উত্তর আমেরিকার একটি নামী ল্যাবের টেলিকম গবেষক। আর ধূসর নর বাংলাদেশের টেলিকম রিপোর্টার। টেলিকম অপারেটরদের একটা সংস্থার স্পন্সরশিপে কুয়ালালামপুরের ঐ কনফারেন্সে ধূসর মানবের অংশগ্রহণের সুযোগ ঘটে। সেখানেই পরিচয় হয় সবুজ নারীর সঙ্গে। তারপর থেকে তারা পৃথিবীর তৃতীয় বৃহত্তম দেশে বন্ধু হিসেবে বসবাস করছে।]

--হাই সবুজ নারী।
--হ্যালো ধূসর নর।
--কাল তোমার কথা বললাম।
--কাকে?
--স্ত্রীকে। অর্ধসত্য এড়াতে চাইলাম।
--তাই নাকি? কী বললেন তিনি?
--পেটের সব কথা ওকে না বললে ভালো লাগেনা। ওর জন্যও বিষয়টা তাই। আমাদের প্র্যাকটিস।
--কীভাবে নিলেন বিষয়টা তিনি?
--ওর সব কথাই আমাকে বলে ও।
--তুমি কিন্তু আমার প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছো না। সহজভাবে নিয়েছে?
--হ্যাঁ। তার মহা উৎসাহ। এই মধ্যবয়সে এসে বান্ধবী জোটানো Ñ ব্যাপারটা নাকি খুব এক্সসাইটিং। শুনলে অবাক হবে Ñ সে বললো, আই এ্যাম প্রাউড অফ ইউ।
--অবাক হচ্ছি না। অবিশ্বাস হচ্ছে।
--ইটস ট্রু।
--হয়তো পৃথিবীর দুই প্রান্তের বন্ধুত্ব, দাম্পত্যে কোনো উৎপাত হবার সম্ভাবনা নেই ... এজন্য ...।
--আমার ধারণা, তুমি যদি ঢাকায় থাকতে, তবুও একই প্রতিক্রিয়া আসতো। ও আসলে আমাকে খুব ভালোবাসে।
--তুমি?
--আমিও।
--স্ত্রী কি আসলেই তার সব কথা তোমাকে বলে?
--হ্যাঁ বলে। এই যেমন ধরো একবার এক কলিগের সঙ্গে তার একটা রিলেশন তৈরী হতে যাচ্ছিল। হয়না, কাজ করতে করতে একসময় হঠাৎ অজান্তে একটা ভালোলাগা ... মাঝে মাঝে লাঞ্চে যাওয়া ...।
--তারপর?
--ঐ পর্যায়ে খেয়াল করলাম, যতক্ষণ বাসায় থাকে, সে আমার কাছাকাছি থাকতে চায়। মানে স্বাভাবিকের চাইতে বেশি। রাতে ঘুমানোর সময় সেই যে আমাকে আঁকড়ে ধরে, আর ছাড়ে না। পাশ ফিরতে দেয়না। একদিন বললাম, তুমি রাতে আমাকে ঘুমাতে দাওনা। দিনে কাজ-অফিস করতে খুব সমস্যা হচ্ছে। ও কী বললো শুনবে?
--কী?
--বলে আমাকে তুমি আটকে রাখো, আমাকে বেঁধে রাখো, ছাড়বে না। আমি নিজের ওপর বিশ্বাস রাখতে পারছি না ...। কেমন অদ্ভূত কথা! বললাম, কী সমস্যা খুলে বলো। সে খুলে বললো। আমি বললাম তুমি ব্রাঞ্চ চেঞ্জ করো।
--তাই করলো?
--হ্যাঁ, সে দুই মাসের মধ্যে কর্পোরেট অফিসে ট্রান্সফার নিলো। আর বললাম, মন থেকে এসব মুছে ফেল।
--তাহলে তো তোমার আমার সঙ্গে রেগুলার চ্যাট করা ঠিক না।
--কেন?
--তোমাদের এত ভালো, এত সুখের একটা দাম্পত্য। সেটায় কোনো ট্রাবল আনতে চাইনা।
--আমাদের দাম্পত্য জীবনে কোনো ঘটনাই ট্রাবল ক্রিয়েট করতে পারেনা। আমাদের পরস্পরের প্রতি আস্থা প্রবল।
--আই সি। দ্যাটস গ্রেট। আমার ক্ষেত্রে অবশ্য বিষয়টা এত পিওর না। আমার হাজবেন্ডের প্রতি আমার আস্থা আছে। কিন্তু মনে করি এই আস্থা কোনো কারণে চলে যেতেও পারে। হাউএভার, এই যে তোমার সঙ্গে নিয়মিত আলাপ হয়, এটা বন্ধ হোক। আমার নিজের ওপর অত আস্থা নাই। আমার মনে হয়, তোমার সঙ্গে রেগুলার আলাপ হওয়াটা, ইতোমধ্যে স্থাপিত একটা সম্পর্ককে নির্দেশ করে।
--তোমার আমার মধ্যে কোনো সম্পর্ক আদৌ স্থাপিত হয়েছে?
--হয়নি?
--আমি নিশ্চিত না।
--কেন নিশ্চিত না?
--ভার্চুয়াল সম্পর্ক কি কোনো সম্পর্ক?
--ভার্চুয়ালিটি রিয়ালিটির এক্সটেনশন, জানো না? অথবা বলা যায়, টেকনোলজিকাল ভার্সন অব রিয়েলিটি।
--আমার মনে হয়না। এখানকার অনেককিছুই ফেইক।
--আমার পরিচয় তুমি জানো, তোমারটা আমার। আমাদের এই বন্ধুত্ব তো ফেইক না।
--না ঠিক তা না। কিন্তু এই রিলেশনের কোনো বাস্তব ভিত্তি নাই।
--ও, আচ্ছা। তাহলে আজকের ফেইক আলাপটা বন্ধ হোক। বাই।
--এই, কী হচ্ছে? ডোন্ট গো।

[এরপর সবুজ নারীর দেখা পায়না ধূসর নর। নিরুপায় হয়ে ডাকবাক্সে চিঠি লেখে।]

--স্যরি। আমি মনে করিনা তোমার আর আমার বন্ধুত্ব ফেইক।

[এরপর সবুজ নারীর চিঠি পায়না ধূসর নর। নিরুপায় হয়ে ডাকবাক্সে চিঠি লেখে।]

--উত্তর দাও।

[এরপর সবুজ নারীর চিঠি পায়না ধূসর নর। নিরুপায় হয়ে ডাকবাক্সে চিঠি লেখে।]

--আগলি ডাকলিংস ইজ মিসিং হিজ ফেয়ার লেডি।

[এরপর সবুজ নারীর উত্তর পায় ধূসর নর।]

--তোমার সমস্যা কি জানো? তোমার লাইফে কোনো সিক্রেট নাই। এ্যান্ড ইউ আর নট এ হ্যাপি ম্যান এ্যাট অল। ডোন্ট নক মি।

[এরপর ধূসর নর ক্রমাগত চিঠি লিখতে থাকে।]

--আগলি ডাকলিংস ইজ মিসিং হিজ ফেয়ার লেডি।
--আগলি ডাকলিংস ইজ মিসিং হিজ ফেয়ার লেডি।
--আগলি ডাকলিংস ইজ মিসিং হিজ ফেয়ার লেডি।
--আগলি ডাকলিংস ইজ মিসিং হিজ ফেয়ার লেডি।
--আগলি ডাকলিংস ইজ মিসিং হিজ ফেয়ার লেডি।
...

[এরপর সবুজ নারীর উত্তর পায় ধূসর নর।]

--ডোন্ট ডু দিস। আই মে ব্লক ইউ। ইউ আর হ্যারাসিং আ উইম্যান।

[এরপর অনেকদিন দু’জনের আলাপ বন্ধ। অনেকদিন পর ধূসর মানব একটা চিঠি লেখে সবুজ নারীকে।]

--মাই ওয়াইফ ইজ কিপিং দ্যা রিলেশন উইথ হার কলিগ। সে এটা আমাকে বলেনি, আমি নিজেই আবিষ্কার করেছি। ইউ আর রাইট। আই এ্যাম নট হ্যাপি এ্যাট অল। এ্যান্ড আই ওয়ান্ট টু ক্রিয়েট সাম সিক্রেটস। নেক্সট গ্লোবাল টেলিকম কনফারেন্স জোহানেসবার্গে। আই ওয়ান্ট টু মিট ইউ দেয়ার।

[এই চিঠির উত্তরে ধূসর নারী তেমন কিছু লিখলো না। শুধু একটা ইমোটিকন বিরাট প্রশ্ন হয়ে ধূসর নরকে অস্থির করে তুললো -- <img src=" style="border:0;" /> ...]

০৫ আগস্ট, ২০১১।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/fahmidulhaqblog/29445079 http://www.somewhereinblog.net/blog/fahmidulhaqblog/29445079 2011-09-09 00:40:14
দূরত্ব ...

সেই দিনটা স্পষ্ট মনে আছে প্রীতমের।

হাসপাতালে নার্স তার হাতে একটা জ্যান্ত ছানা তুলে দেবার সঙ্গে সঙ্গে প্রীতমের দুনিয়াটা পাল্টে যায়। সামনের নার্স, ছানাটিকে ঘিরে ধরা আত্মীয়েরা, হাসপাতালের ছাদ-দেয়াল ফরফর করে নিমিষে চারিদিকে ছিটকে পড়ে। প্রীতম নিজেকে আবিষ্কার করে আশ্চর্য-অচেনা, হলুদ-ফুলে-ছাওয়া এক শস্যক্ষেতের মাঝখানে। তার দু’হাতের শয্যায় মনুষ্যছানাটি কোনোরকমে শুয়ে। উজ্জ্বল নীল আকাশ আর ঝকঝকে রোদের নিচে প্রীতমের দিকে চোখ পিটপিট করে তাকায় ছানাটি। কোন জনমের অনিদ্রায় তার অতি সামান্য চোখের পাতা ঘুমঘোরে ভারী হয়ে প্রায় বন্ধ হয়ে আসে। তাও কোনো এক প্রয়োজনে, অনিচ্ছুক যদিবা, চোখের পাতা অল্প করে মেলে ধরে। প্রীতমের চোখে চোখ পড়ে। আবার চোখ বুঁজে, পুনরায় অনিচ্ছুক পাতা খোলে। আরেকবার প্রীতমকে দেখে নেয়, যেন বুঝেও নেয়। তারপর চোখের পাতা ফেলতে ফেলতে ঠোঁটের বাম পাশকে নিশ্চল রেখে, ডান পাশটা টেনে একটা হাসি হাসে। এই সামান্য হাসিতে ডান ঠোঁটের কোণে ক্ষুদ্রকায়, কোণের ঠিক উপরিভাগে আরেকটি এবং ডান গালের মাঝ বরাবর মাঝারি আকারের টোল পড়ে। প্রীতমের এই প্রথমবারের মতো মনে হয়, এই মানবসন্তানটি তার নিজের। কারণ হাসলে প্রীতমের নিজের গালেও টোল পড়ে।

পরক্ষণেই মনে হয়, মনুষ্যছানাটির মালিকানা এককভাবে তার নয়। এর মালিকানায় আরেকজনের ভাগ আছে। সে হলো তার স্ত্রী নীতু। তার মালিকানার অংশটিই বেশি, এতগুলো মাস ছানাটিকে গর্ভে তিল তিল করে বড়ো করা, তার আগে চাকরি ছেড়ে বিছানায় আশ্রয় নেয়া। জটিলতা দেখে ডাক্তার বলেছিল কোনো রকম ঝুঁকি নেয়া চলবে না, সব ছেড়েছুঁড়ে বিশ্রাম নিতে হবে সর্বক্ষণ। তাই করা হয়েছে Ñ একয়েকটা মাস নীতু চাকরি, বন্ধু-কলিগসহ তার নিজের জগত ইত্যাদি ছেড়ে বিছানায় বন্দি হয়েছে। সে এই ছানাটির জন্যই। মহা মূল্যবান এই ছানাটি। কারণ বিয়ের কয়েকটি বছর পার করার পর দাম্পত্য-মুগ্ধতা যখন ফিকে হবার উপক্রম, তখন তারা সিদ্ধান্ত নেয় সন্তান নেবার। কিন্তু চাহিবামাত্রই কেউ আসে না। ডাক্তারের শরণাপন্ন হয়ে, বেশ কিছুদিনের তদারকির পর, কোথাও ডিম্বাণু-শুক্রাণুর দেখা হয়। তারপর এই ছানাটি। সেই ছানার প্রধান দাবিদার তার মাকে, মানে নীতুকে মনে পড়ে প্রীতমের। সে আশ্চর্য শস্যক্ষেত থেকে নিমেষে হাসপাতালে ফিরে আসে। খোঁজ-খবর নিয়ে জানা যায় নীতু ভালো আছে। তবে অ্যানেস্থেসিয়ার প্রভাব তখনও কাটেনি।

এদিকে পিতৃত্বের প্রভাবে প্রীতম পাল্টে যেতে থাকে।

সে খুব গৃহী মানুষ ছিলনা। অফিসের পরেও তার বাসায় ফিরতে ইচ্ছে করতো না। দুই-তিনটে জায়গায় বন্ধুদের সঙ্গে পর্যায়ক্রমে সে নিয়মিত আড্ডা দিতো। প্রতিদিন কোনো না কোনো জায়গায় আড্ডা দিয়ে বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত দশটা-এগারোটা বাজিয়ে ফেলতো। প্রথম প্রথম নীতু অভিযোগ করতো। পরে মেনে নিয়েছিল। নীতু সবকিছুতে অনুৎসাহী একটি মেয়ে, একটু অলসও যেন। ক্যারিয়ার নিয়ে তার কোনো উচ্চাকাক্সক্ষা ছিলনা, আজকাল অনেক মেয়েরই যা থাকে। দুটো চাকরিতে ঢুকেছে, একটির মেয়াদ ছিল সোয়া এক বছর, আরেকটির দেড় বছর। মাঝে প্রায় আড়াই বছর কোনো চাকরি করেনি, কোনো গুরুতর কারণ ছাড়াই। প্রথমটি ছেড়েছিল, তার ভাষায়, সহকর্মীদের মানসিক নিচতা দেখে। দেড় বছরেরটি ভালোই চলছিল, ছেড়ে দিতে হয় সে সন্তানসম্ভবা হবার পরে। অনুৎসাহী নীতু সংসারটাও করতো কোনোরকমে। ফলে প্রীতম-নীতুর গৃহটি খুব ঝকঝকে থাকতো না। ঘরের কোণে মাকড়সার ঝুল, রান্নাঘরে তেলাপোকা, ঘরের মেঝেতে স্থায়ী হয়ে যাওয়া নানা দাগ নিয়ে দু’জনের সংসার ঢিলেঢালাভাবে চলছিল। প্রীতমের বাইরে আড্ডার নেশা ছিল, আর নীতুর ছিল ঘুমের নেশা। প্রীতম বাইরে প্রচুর আড্ডা দিলেও, তার বাসায় আড্ডার আয়োজনে বন্ধুরা কমই আসতো। কারণ সাজানো টেবিলে, দুধসাদা ক্রোকারিজে, নানা পদের খাবার দিয়ে, মনোরম আপ্যায়ন তারা বন্ধু-দম্পতিদের করতো না। অগোছালো বাড়িতে, অল্পের-ওপর-দিয়ে নিমন্ত্রণ-পর্ব সারার এই প্রবণতাটি তাদের বন্ধুরা, বিশেষত কোনো কোনো বন্ধু-স্ত্রী বা বান্ধবী একদমই বরদাশত করতো না। প্রতিটি দম্পতির প্রায় সবক্ষেত্রেই বিপরীত বৈশিষ্ট্যের দু’জনকে নিয়ে গঠিত হয়। কিন্তু প্রীতম-নীতু দম্পতির অমিলের চাইতে মিলই বেশি। দু’জনেই অগোছালো, জীবনযাপন নিয়ে উচ্চবাচ্চ নেই, গাড়ি-বাড়ি করার তাড়া নেই, পরস্পরের বিরুদ্ধে খুব বেশি অভিযোগও নেই। দৈনন্দিন একটা ইস্যুতেই সামান্য ঝগড়া হতো, ঘুমাবার আগে, মশারি কে টাঙাবে তা নিয়ে। প্রীতম বলে, সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনির পর এই বাজে কাজটা আমি করতে পারবো না। নীতু বলে, আমি অফিসও করি, সংসারও সামলাই। ঘরের এই একটা কাজ তো তুমি করবা! যেহেতু তাদের দু’জনের কেউই জান দিয়ে কিছু করেনা, অন্যদিকে দাম্পত্য কলহে তাদের উৎসাহ নেই, তাই বেশিরভাগ দিন মশারি ছাড়াই তারা ঘুমাতে যায়।

এই কলহ-অনুৎসাহী, উচ্চাকাক্সক্ষাহীন দু’জনের দাম্পত্যজীবন, অতএব, ক্রমশ পানসে হতে থাকে। বিশেষত নীতুর মধ্যে একধরনের অবসাদ বাসা বাঁধে। অফিস থেকে ঘরে এসে সে শুধু বিশ্রাম নিতে চায় ও ঘুমাতে চায়। প্রীতমের বিরুদ্ধে অভিযোগ নেই, কিন্তু মনোযোগও নেই। ছুটা কাজের লোক অনিয়মিত আসে, ঘরের আসবাবে ধূলা-ময়লার স্তর পুরু হতে থাকে। প্রায়ই রাতে ফেরার আগে প্রীতম ফোন পেতো Ñ রান্না করিনি, বাইরে থেকে খাবার নিয়ে এসো। একদিন দু’জনেই স্বীকার করে যে তাদের পারিবারিক জীবন অর্থহীন হয়ে পড়েছে। বিষয়টি নিয়ে তারা ঘনিষ্ট বন্ধু-সহকর্মীদের সঙ্গে আলাপ করে। দুই দিক থেকেই পরামর্শ আসে যে তাদের জীবন পুনরায় অর্থপূর্ণ হতে পারে যদি তাদের ঘরে সন্তান আসে। তারা উভয়েই, কোনো রকম বাদানুবাদ ছাড়াই, সন্তান গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়।

এক পর্যায়ে নীতুর গর্ভে প্রাণের স্পন্দনের প্রমাণ পাওয়া গেল। এই স্পন্দন তাদের জীবনে আসলেই পরিবর্তন নিয়ে আসলো। ডাক্তারের পরামর্শ পাওয়া মাত্রই নীতু চাকরি ছেড়ে দিল। প্রীতম সম্পাদককে বলে রিপোর্টিং থেকে ডেস্কে চলে আসলো। কারণ রিপোর্টারের কাজে নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা নেই, সহ-সম্পাদকের কাজের সময় সুনির্দিষ্ট। এক সপ্তাহ পরপর শিফট পরিবর্তন হলেও ছয় ঘণ্টার সুনির্দিষ্ট কাজ। সবচেয়ে বড়ো কথা এই প্রথম প্রীতম গৃহমুখী হলো। বাইরের আড্ডা বন্ধ করে দিল। নীতুর শরীরের যত্নের জন্য আত্মনিয়োগ করলো। অদ্ভূত ও অনিয়মিত সব খাবার খেতে চায় নীতু -- লবণ মাখানো পেয়ারা, তেঁতুলের আচার, কাচকি মাছের চচ্চড়ি, মশলা মাখানো কদবেল, শুঁটকি মাছের ভর্তা ইত্যাদি। আর সবার জন্য স্বাভাবিক খাবার ভাত-মাছ-মাংস দিলে বমি করে ফেলে। প্রথম কয়েকদিন দৌড়াদৌড়ি করে এইসব খাবার সরবরাহ করে সে হয়রান হয়ে যায়। তাকে উদ্ধার করতে নীতুর মা চলে আসেন ঢাকায়। খানিক অবসরে, ভেতরের ছানাটির বয়স ছ-সাত মাস হলে, প্রীতম নীতুর স্ফীত উদরে হাত রাখে। প্রীতম বিস্মিত হয়, ভেতর থেকে কে যেন তার হাতের তালু আলতো করে চুলকে দিচ্ছে। হাতের স্থান পরিবর্তন করলেও একই ঘটনা ঘটে। নীতু বিশ্বাস করেনা প্রীতমের কথায়। নিজেও হাত রাখে এবং হতবাক হয়ে যায়। দৃষ্টিবিনিময়ে দেখা যায়, দু’জনেরই চোখ জুড়ে গভীর বিস্ময়, মুখজুড়ে স্মিতহাস্য। জীবন এত মধুর হয়? উভয়েই ভাবে।

ভেতরের ছানাটি নিয়ে দু’জনেই খুব টেনশন করতো। প্রীতম বলতো, সব ঠিকঠাকমতো হবে তো? ভেতর থেকে কোনো ভোঁদড়ছানা বের হবে নাতো? নীতু মারতে আসতো, কৃত্রিম কোপ প্রকাশ করতো। নীতু আর ভেতরকার ছানা উভয়ে মিলে অদ্ভুত সব খাবার খেয়ে হোক, আর ভেতরের ছানাটির বৃদ্ধির কারণে হোক, নীতু একসময় বিশালদেহী মানুষে পরিণত হলো। প্রীতম ডাকতো পালোয়ান বলে। সে যাই হোক, পালোয়ানের পেট থেকে ভোঁদড়ছানা নয়, ছোটখাটো মায়ময় এক মনুষ্যছানাই বেরুলো। তার নাম দেয়া হলো তন্বিষ্ঠা। প্রীতমের বাংলা ভাষার যাবতীয় জ্ঞান বিনিয়োগ করে এরকম একটা তৎসম-মার্কা নাম পাওয়া গেল। কিন্তু তা মোটেও জনপ্রিয় হলো না। সবাই তাকে তন্বি বলে ডাকা শুরু করে। বাবা ও মা উভয় প্রান্তেই তন্বিষ্ঠা প্রথম সন্তান। ফলে তাকে নিয়ে আর সবার আহ্লাদও কম দেখা গেল না। তন্বিষ্ঠা অথবা তন্বি হয়ে উঠলো তার মা-বাবা, দাদা-দাদি, নানা-নানি, খালা-খালু, চাচা-চাচি প্রমুখের প্রধান আলোচ্যউপাদান।

খাওয়া, রেচনোদ্ভূত ত্যাগ ও ঘুম -- প্রথম কয়েক সপ্তাহ এই তিনটি কাজই করলো তন্বি। তার প্রথম দুইটির সঙ্গে জড়িয়ে গেল প্রীতম। ক্ষিদে পেলেই কেবল তার ঘুম ভাঙ্গে, চোখ-মুখ লাল করে তীক্ষè-তীব্র চিৎকার করে বাড়ি মাথায় তোলে। প্রথম প্রথম মায়ের স্তনবৃন্ত সে মুখে পুরতে পারেনা, তাই ক্ষুদ্র ফিডারে দুধ গোলানো ও দ্রুততম সময়ে তার মুখে বোতলবৃন্ত ঠেসে ধরলেই কেবল তাকে ঠাণ্ডা করা যায়। বানানো দুধ খেতে খেতে, পেটটা ঠাণ্ডা হলে, সে প্রায় ঘুমিয়ে পড়ে। কিন্তু তার আগে দ্বিতীয় কাজটি করে ফেলে এবং দ্বিতীয় দফায় কাঁদে। প্রীতম তন্বিকে পরিস্কার করে, এরপর সে তৃপ্তির ঘুমে ঢলে পড়ে। এভাবে তন্বির পরিচর্যায় প্রীতম জড়িয়ে পড়ে। কারণ সার্জারির ধকল সয়ে বিছানা ছাড়তে নীতুর কয়েক সপ্তাহ লেগে গেল। নীতু কর্মক্ষম হয়ে উঠলেও প্রীতম ছুটি পেলনা। কারণ নানি-দাদিরা যে-যার সংসারে ফিরে গেছেন। সংসারে রান্না-বান্নাসহ নিয়মিত অনেক কাজে নীতু পুনরায় যুক্ত হয়ে গেল। ফলে তন্বিষ্ঠাকে পরিচর্যার বিরাট অংশ প্রীতমের ভাগেই রইলো। অবশ্য প্রীতম তা আনন্দের সঙ্গেই করতো। দিনে দিনে পরিবেশের সংস্পর্শে তন্বিষ্ঠার গায়ের রঙ ফর্সা-হলুদ অবস্থা থেকে প্রীতমের মতো শ্যামলা-তামাটে রঙে রূপান্তরিত হতে থাকলো। চেহারায়ও মায়ের আর্যরূপের চাইতে বাবার অনার্য রূপটিই প্রবল হয়ে উঠলো। সবমিলিয়ে তন্বিষ্ঠার জন্য প্রীতমের ভালোবাসা-মায়ার পারদ চড়তে থাকলো। মুখাবয়বের সাদৃশ্য ও ত্বকের রঙ মিলে তন্বিকে প্রীতম নিজের এক্সটেনশন হিসেবে ভাবতে থাকে।

তন্বি প্রথম যে কথাটা শিখলো তা হলো ‘তন্বি’। এবং অনেক দিন সে এটা ছাড়া কিছুই বলে না। ঐ একটি শব্দ দিয়েই যাবতীয় মনের ভাব প্রকাশ করতে থাকলো। সে খুশি থাকলে বলে তন্বি, রেগে গেলে বলে তন্বি, সবাইকে ডাকে তন্বি বলেই। শব্দটির সঙ্গে তার চোখ-মুখের প্রকাশভঙ্গি দেখে প্রীতমদের বুঝে নিতে হয় তার মনের অবস্থা। এরপর সে অদ্ভূত অদ্ভুত সব শব্দ উচ্চারণ করা শুরু করলো। যেমন ‘তিল্ডা তিল্ডা ইয়াল্ডা ইয়াল্ডা ...’। অথবা ‘ধুনতা পাপা’ বা ‘পান্তানিনি’ বা ‘নিম্মাতিতি’। এইভাবে তন্বি বড়ো হতে থাকে। মা-বাবা ডাকতে শেখে। আর বাবার ভক্ত হয়ে ওঠে। কারণ মার পেটে ইতোমধ্যে তন্বির ভাই এসে গেছে এবং মার পুরো মনোযোগের অনেকখানি তন্বির দিক থেকে সরে গেছে। তাই বাবাই হয়ে ওঠে তার পূর্ণাঙ্গ আশ্রয়। তন্বি বুঝুক বা না বুঝুক তার বাবা তাকে প্রচুর গল্প-গান-কবিতা শোনায়, কাতুকুতু দেয়, হাত-পা ধরে টানাটানি করে। লুকোচুরিসহ অন্যান্য খেলাধূলাও চলে। আর খাওয়ানো ও প্রাকৃতিক কর্মের পরে পরিস্কার করার মতো জরুরি কাজ তো রয়েছেই। তন্বি দুষ্টুমি করাও শেখে। হামাগুড়ি দিয়ে এসে টেবিল ধরে দাঁড়ায়, তারপর বাবার কম্পিউটারের সুইচটা বন্ধ করে দিয়ে হাসিমুখে তাকিয়ে থাকে। প্রীতম হয়তো কোনো একটা নিউজ বাসার কম্পিউটারে সম্পাদনা করছে, সেটার অনেকখানি হারিয়ে যায় সেভ না করার কারণে। প্রীতমের রাগ করা উচিত, কিন্তু তন্বির মুখের দিকে তাকিয়ে শেষপর্যন্ত পারে না।

তন্বিষ্ঠার ছোটভাই তন্ময় পৃথিবীতে এলো। সত্যিকার অর্থে তন্বিষ্ঠাই তখন অনেক ছোট। তন্ময়ের দিকে তাকানোর তেমন ফুরসৎ পেতনা প্রীতম। অদ্ভূত হলেও সত্য তন্ময় প্রথম কয়েক মাস বাবার কাছ থেকে পূর্ণ ভালোবাসা পায়নি। বিছানার এক কোণে সে অবহেলায় পড়ে থাকতো। মার কিছু আদর জুটতো বটে, তা নিয়েই সে সন্তুষ্ট থাকতো। তেমন সাড়া-শব্দও সে করতো না। কেবল খিদে পেলে বিকট চিৎকার করতো, খাবার মুখে দিলে শান্ত হয়ে যেত। সেই তন্ময় যেন বুঝে গিয়েছিল ভালোবাসা আদায় করে নিতে হয়। তাই এক বছর হবার আগেই একদিন সে প্রীতমের হাত বেয়ে প্রীতমের কোলে প্রায় উঠে পড়ে। সেদিন প্রীতম শুধু বিস্মিতই হয়নি, সেদিন সে তন্ময়ের দিকে ভালোবাসাসহ ফিরে তাকায়।

এরপর থেকে, কয়েক বছর ধরে, তন্বি ও তন্ময় উভয়কেই প্রতিপালন করে চলেছে প্রীতম। অবশ্যই নীতু মা হিসেবে তার দায়িত্ব ঠিকঠাক পালন করেছে। কিন্তু পরপর দুই সন্তানকে পালতে গিয়ে সে হয়রান হয়ে পড়ে। এরকমও হয়েছে যে দুই শিশু একযোগে মায়ের স্তন্যপান করছে। এবংবিধ চাপে সে শারীরিক ও মানসিকভাবে কাহিল হয়ে যায় এবং দুই সন্তানকে পূর্ণ মনোযোগ দিতে পারেনা। উপরন্তু মাঝে মাঝে মায়ের বকা খায় বাচ্চা দু’টি, চড়-চাপড়ও খায়। ফলে তারা প্রীতমের সংসর্গ বেশি উপভোগ করে। আর একটা বাড়তি পাওনা হলো যে প্রীতম তাদের কখনোই বকা দেয়না, হাত তোলেনা। কিন্তু প্রীতমকে সেটা রক্ষা করতে হয় বহু কসরৎ ও ক্রোধ প্রশমনের মাধ্যমে। কারণ শিশুদের মধ্যে কেবল দেবতা বা ফেরেশতার রূপই থাকেনা, তাদের কর্মকাণ্ডে যথেষ্ট আসুরিক বা শয়তানপ্রভাবও থাকে। তাদের সেইসব আসুরিক তাণ্ডব যেহেতু প্রীতম ধৈর্যসহকারে সহ্য করে, বাচ্চারা যেকোনো প্রশ্ন ও সমস্যা নিয়ে প্রীতমের কাছেই আসে। যেকোনো বিপর্যয়-বিবাদ-বিসংবাদে প্রথমে ‘বাবা’ বলেই ডেকে ওঠে তারা। রাতে ঘুমানোর সময় কে বাবার সঙ্গে ঘুমাবে তা নিয়ে দুই ভাই-বোনের মধ্যে ঝগড়া শুরু হয়ে যায়।

কিন্তু একসময় কিছু জিনিস বদলাতে থাকে।

তন্বিষ্ঠার বয়স যখন আট ও তন্ময়ের সাড়ে ছয়।

নীতু একদিন বললো, তুমি তন্বিকে আর গোসল করাবে না, কেবল তন্ময়কে করাবে।

প্রীতম তন্ময়কে নিয়ে সেলুনে চুল কাটাতে নিয়ে যায়। নীতু তন্বিকে বিউটি পারলারে নিয়ে যায়।

একদিন প্রীতম তন্বিকে ডাকলো, তন্বি মা, আয় বাবার সঙ্গে ঘুমাবি।

তন্বি উত্তর দিলো, না। তোমার সঙ্গে আর ঘুমাবো না, তুমি তো পুরুষ।

০২ জুলাই, ২০১১


]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/fahmidulhaqblog/29439649 http://www.somewhereinblog.net/blog/fahmidulhaqblog/29439649 2011-08-27 22:58:52
হামাস-ফাতাহ সম্প্রীতি চুক্তি: স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথে খানিক অগ্রগতি
ঐতিহাসিক এই চুক্তির পর আনন্দ প্রকাশ করেছে গাজা ও পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনিরা। চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয় ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট ও ফাতাহ নেতা মাহমুদ আব্বাস এবং হামাস নেতা খালেদ মেশালের মধ্যে। ফাতাহ নেতৃত্বাধীন ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষ পশ্চিম তীরের বৃহদাংশে শাসনকার্য পরিচালনা করে এবং গাজার দখল ছিল হামাসের হাতে। ২০০৬ সালের নির্বাচনে হামাসের বিস্ময়কর বিজয়ের এক বছর পর, দুই দলের হানাহানি ঠেকাতে, উভয় দল মিলে কোয়ালিশন সরকার গঠন করে, ২০০৭ সালে। কিন্তু হামাস এক পর্যায়ে গাজা থেকে ফাতাহকে বের করে দেয়। তার পর হতে উভয় দলের নেতৃবৃন্দের মধ্যে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল। বুধবারের সম্প্রীতি চুক্তির পর মাহমুদ আব্বাস বলেন, আমরা নিজেদের মধ্যকার ভেদাভেদের অতীতের সেই কালো অধ্যায়কে চিরতরে বিদায় জানিয়েছি। এই সমপ্রীতি চুক্তিতে ইসরায়েল স্বভাবতই সহজভাবে নেয়নি। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, এটি শান্তি প্রক্রিয়ার উপরে চরম আঘাত ও সন্ত্রাসবাদের বিজয়। হামাসকে ইসরায়েল ও তার মিত্র পশ্চিমা শক্তি সন্ত্রাসবাদী সংগঠন হিসেবে বর্ণনা করে থাকে।

এই সম্প্রীতি চুক্তি অনুযায়ী প্যালেস্টাইনে একটি অন্তর্বর্তীকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হবে, যে সরকার আগামী বছরে একটি সাধারণ নির্বাচন আয়োজনের জন্য নিজেকে নিযুক্ত করবে। এছাড়াও এই সমপ্রীতি চুক্তি কতকগুলো তাত্পর্য নিয়ে হাজির হয়েছে। আগামী সেপ্টেম্বরে ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষ জাতিসংঘে একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের ঘোষণার দাবি করবে যাতে ১৯৬৭-পূর্ব সীমান্তরেখার ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের কথা থাকবে এবং যার রাজধানী হবে জেরুজালেম। এই চুক্তি তাদের দাবিকে জোরদার করবে। কিন্তু এই চুক্তির ফলে মাহমুদ আব্বাসের নেতৃত্বাধীন দল ফাতাহর সঙ্গে পশ্চিমা শক্তির দূরত্ব আরও বাড়বে এবং লক্ষ লক্ষ ডলার বিদেশী সাহায্য হারাবার সম্ভাবনা তৈরী হবে। হামাসও অধিক কট্টর ইসলামী গোষ্ঠীর বিরোধিতার মুখোমুখি হবে। হামাসের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে তারা অভিযোগ করেছে যে দলটি আপস করে চলছে এবং ক্রমশ মধ্যপন্থী হয়ে উঠছে। ঐক্যবদ্ধ ফিলিস্তিনিরা এইসব চাপ মোকাবিলা করতে পারে কেবলই তাদের ঐক্য দিয়ে। ইসরায়েলের বিরুদ্ধে তাদের ঐক্যের কারণে পশ্চিমাদের বিরোধিতা বেড়ে যেতে পারে, কিন্তু পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে মিশরের মতো দেশকে তারা পাশে পাবে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। সর্বোপরি এই সমপ্রীতি চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যে তথা ইসরায়েলের দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনিদের সংগ্রামের ঘটনাবলীতে নতুন দিকমাত্রা নিয়ে হাজির হয়েছে।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/fahmidulhaqblog/29377774 http://www.somewhereinblog.net/blog/fahmidulhaqblog/29377774 2011-05-08 22:51:57
মেহেরজান, গেরিলা ও আমার বিরুদ্ধে কুৎসার জবাব
সারোয়ার রেজা আর আমি পরস্পরের পূর্বপরিচিতই ছিলাম, সম্পর্ক শিক্ষক-শিক্ষার্থীর; যদিও তাকে আমি সরাসরি ছাত্র হিসেবে পাইনি, উচ্চশিক্ষায় বিদেশে থাকার কারণে। কিন্তু তাকে বন্ধুতালিকা থেকে বাদ দেয়ার পেছনে কোনো শিক্ষকসুলভ অহম কাজ করেনি, সেটা সারোয়ার রেজাও হয়তো বলবেন না। তার ক্রিয়ার স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়াই ছিল সেটা। তার প্রসঙ্গ এখানে উত্থপান করার কারণ হলো তার ঐ পোস্টের কারণেই সচলায়তনে আমার চরিত্রহননের দ্বিতীয় ঢেউ চলছে। প্রথম ঢেউটি ছিল প্রথম আলোর ঐ কলামের পরে। সেসব হননকার্যে বেশ কিছু অসম্ভব কষ্টকল্পিত সমীকরণ টানা হয়েছে আমাকে নিয়ে। আমার এই রচনার কারণ হলো বাংলা ব্লগিস্ফিয়ারে, ফেসবুকে বা অনলাইনে আমি সক্রিয় আছি ২০০৭-এর অক্টোবর থেকে। অনেকেই আমাকে ভার্চুয়ালি চেনেন, আমিও যেমন চিনি অনেককে, কখনো দেখাও হয়নি। এবং অনেকের সঙ্গে আমার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। এটা আমার কাছে অনেক মূল্যবান। তারা সচলায়তনের ঐসব কল্পকথা শুনে আমার সম্পর্কে বিভ্রান্ত হতে পারেন। যাহোক, সচলায়তনে ঐসব কল্পকাহিনীর কয়েকটি অনুসিদ্ধান্ত এখানে উল্লেখ করি:

১। পরিচালক রুবাইয়াত হোসেন আমাকে অর্থপ্রদান করেছেন, মেহেরজানের ‘পক্ষে’ লেখার জন্য।
২। আমাকে মগবাজার (জামায়াত অফিস) থেকে অর্থপ্রদান করা হয়েছে, ‘পাকিবান্ধব’ ঐ ছবির ‘পক্ষে’ লেখার জন্য।
৩। রুবাইয়াত হোসেন যে রচনাটি লিখেছিলেন রোবায়েত ফেরদৌস ও অন্যান্যদের কলামটির জবাবে, তা সাজ্জাদ শরিফের তত্ত্বাবধানে ফারুক ওয়াসিফ আর আমি মিলে লিখেছি।
৪। বিশ্ববিদ্যালয় রাজনীতিতে আমি ‘সাদা গ্র“পের’ (বিএনপি-জামাতপন্থী) লোক।
৫। আমি ফরহাদ মজহার গোষ্ঠীর লোক।

এইসব অভিযোগের উত্তর সংক্ষেপে দেই:

১। ডাঁহা মিথ্যা। মেহেরজান মুক্তি পাবার আগে মেহেরজান টিমের সঙ্গে আমার আগে থেকেই যোগাযোগ হয়েছে। চলচ্চিত্র গবেষক হিসেবে যেমন তারেক-ক্যাথরিন মাসুদের প্রডাকশন, আবু সাইয়ীদের প্রডাকশন, নূরুল আলম আতিকসহ অন্য অনেকের প্রডাকশন টিমের সঙ্গে আলোচনা হয়ে থাকে। সবক্ষেত্রেই সেই আলোচনা এমন বেশি কিছু না।
২। ডাঁহা মিথ্যা। যারা আমাকে একটুও জানেন তিনিও বলবেন আর যাই হোক তার ঐ কানেকশন নাই।
৩। ডাঁহা মিথ্যা। প্রথম আলোর অনেক সাংবাদিকের সঙ্গে আমার সুসম্পর্ক আছে, কিন্তু প্রথম আলোর নীতির ও ভূমিকার আমি ঘোর সমালোচক। এই সমালোচনা আমি ২০০২ সাল থেকে করে আসছি। প্রথম আলোর অফিসে আমি শেষ গিয়েছি প্রায় এক বছর আগে। সচলায়তনে শুভাশীষ দাশ রচিত এই ব্লগপোস্টে (http://www.sachalayatan.com/subasish/38567) দেখেন আমেরিকাপ্রবাসী কুলদা রায় কী বলেন:
"কাবেরী গায়েন, রোবায়েত এবং ফেরদৌসী প্রিয়দর্শিনী প্রথম লেখাটি যখন প্রথম আলোতে দিল তখন মতি মিয়া ফারুক ওয়াসিফ, ফাহমিদ, আবুলকন্যা রুবায়েতকে ডেকে আনেন প্রথম আলো অফিসে। সাজ্জাদ শরীফের তত্তাবধানে ফারুক রুবাইয়েতের বয়ানে উক্ত লেখাটির একটা জবাবী লেখা প্রস্তুত করে। সহযোগিতা করে বাকী দুজন। এবং মতি মিয়া কাবেরীদের লেখার সঙ্গে রুবায়েতের জবাবী লেখাটাও প্রকাশ করেন। সাংবাদিকতার ইতিহাসে এটা একটা বিরল ঘটনা। ফাহমিদ আরেফিন স্যারের পেয়ারের লোক।"
৪। ডাঁহা মিথ্যা। এই অভিযোগটা করেছিলেন সচলায়তনের মডারেটর হিমু। অথচ ওপরে কুলদা রায় কী বলছেন শেষ বাক্যে দেখেন। ছাত্র-সহকর্মী হিসেবে আরেফিন স্যার নিশ্চয়ই আমাকে স্নেহ করেন, কিন্তু ‘পেয়ারের লোক’ বলতে যা বোঝায় কেউ কেউ নিশ্চয়ই আছেন, আমি নই। একজন ইউরোপ, আরেকজন আমেরিকা থেকে যথেষ্ট যাচাই না করে সম্পূর্ণ কল্পনাপ্রসূত এইসব অভিযোগ করে চলেছেন।
৫। প্রাজ্ঞ অথচ বিতর্কিত এই বুদ্ধিজীবীর সঙ্গে আমার পরিচয় হয়, বিডিনিউজ আর্টস আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে। এটাও একটা ডাঁহা মিথ্যা।

অনলাইনে মেহেরজানবিরোধিতার এক বিরাট অংশই এইসব মিথ্যাচারের ওপরে নির্ভর করে আছে।

আমার পেশাগত দায়িত্বের জায়গা থেকে চলচ্চিত্র ও মিডিয়া নিয়ে আমি গবেষণা করি। এই কারণে আমার হয়েছে এক সমস্যা। মাধ্যম-গবেষক হিসেবে আমি মনে করি মেইনস্ট্রিম মিডিয়ার ক্রমাগত প্রো-মার্কেট ও এ্যান্টি-পিপল হয়ে পড়েছে। তাই প্রো-পিপল সাংবাদিকতার জন্য আমাদের বিকল্প মিডিয়া অনুসন্ধান করতে হবে এবং আজ বা আগামীকাল সাইবারপরিসরই হবে বিকল্প সাংবাদিকতার জায়গা। ২০০৯ সালে আমি গবেষণা করেছিলাম, বাংলা ব্লগ কমিউনিটির ওপরে। সম্প্রতি যোগাযোগ পত্রিকায় (সংখ্যা ১০, জানুয়ারি, ২০১১) তা ছাপাও হয়েছে। সেই গবেষণাপত্রে অন্তঃত দুইটি বিষয়ে আমি ভুল করেছিলাম:
১। বাংলা ব্লগ কমিউনিটি নিয়ে আমি উচ্চাশা ব্যক্ত করেছিলাম।
২। বাংলা ব্লগ কমিউনিটির মধ্যে সচলায়তন সবচাইতে সিরিয়াস।

উচ্চাশার কিছু নিদর্শন এখনও আছে। যেমন আমার ‘জার্গনভরা’ মেহেরজান-রিভিউ পড়ার পর ভালো পাল্টা ব্লগ লিখেছিলেন শুভাশীষ এবং হাসিব। আমার লেখাটার অবদানও এই ছিল যে ব্লগাররা পড়াশুনা শুরু করেছেন। কেউ দেরিদা পড়ে এলেন এবং লিখলেন, কেউ বেনেডিক্ট এ্যান্ডারসন পড়ছেন এখন। কিন্তু ঐসব ব্লগপোস্টের মন্তব্য অংশে যেসব অর্থহীনতা, অসংলগ্নতা ও বিকার লক্ষ করা গেছে, সেটাই আমার আশাবাদকে ভুল প্রমাণ করছে। আর আমার ধারণা ছিল সামহোয়ারইন-এর ব্লগারদের তুলনায় সচলায়তনের ব্লগাররা সিরিয়াস, কিন্তু তাদের মতো বিকার আমি সামহোয়ারের গালিবাজ ব্লগারদের মধ্যেও দেখিনি। আর বিকারগ্রস্তদের সর্বাধিনায়ক হলেন হিমু। যে-ব্লগের মডারেটরই বিকারচর্চায় নেতৃত্ব দেন, সেই ব্লগের হাল যে কী তা সহজেই অনুমেয়। আমাকে বিরোধিতা করতে গিয়ে জনাব হিমু দুই দুইটা ব্যঙ্গাত্মক গল্প লিখেছেন। তার এই চর্চা অব্যাহত থাকলে নিশ্চয়ই তিনি একদিন ব্যক্তিআক্রমণবিবর্জিত সত্যিকারের গল্প লিখে উঠতে সমর্থ হবেন।

আমি ২০০৯ সালে ব্লগ নিয়ে গবেষণা করেছিলাম। কিন্তু আজ মনে হচ্ছে সামহোয়ারইনপ্রবর্তিত ব্লগকমিউনিটির যে প্যাটার্ন তা সম্ভবত ফেইল করতে চলেছে, বিশেষত ফেসবুক নোট আসার পরে। বান্ধবদের ভুবনে, ফেসবুকে ব্লগের মতোই সবকিছু করা যায়, বাড়তি কিছু ফিচারসহ। আমি সামহোয়ারইনে একজন সক্রিয় ও পরিচিত ব্লগার ছিলাম। সক্রিয়তা দিনে দিনে কমে যাচ্ছে।

চলচ্চিত্র গবেষক হিসেবে আমি অনেক ছবি নিয়ে সমালোচনা লিখেছি: অন্তর্যাত্রা, খেলাঘর, থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার, রানওয়ে, মেহেরজান ইত্যাদি। মেহেরজান নিয়েও হয়তো একভাবে লিখতাম, যেমনটা অন্যগুলোর ক্ষেত্রে ঘটেছে। প্রথম আলোর ঐ আর্টিকেলটা লিখি, মেহেরজান নিয়ে প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া দেখার পর। আমার মনে হয়েছে ছবিটাকে ট্রিট করা হয়েছে জামাতের প্রেস রিলিজের মতো। একটা ক্রিয়েটিভ এক্সপ্রেশনের সমালোচনার ধরন ওরকম হওয়া উচিত নয়। আমি তাত্ত্বিকভাবে বিষয়টা ব্যাখ্যা করতে চেয়েছি। একজন চলচ্চিত্র-গবেষক হিসেবে আমি এটা মনে করেছি। আর মনে হয়েছে আমাদের পশ্চিমা সেকুলারিজম-মর্ডানিটিনির্ভর বাঙালি জাতীয়তাবাদী ধ্যান-ধারণার মধ্যে কিছু গলদ রয়েছে। সেটাকেও এ্যাড্রেস করা দরকার। ঐ লেখার পর মেহেরজানের পাশাপাশি এরপর আমাকে এবং ফারুক ওয়াসিফকে তার আরেক লেখার জন্য আক্রমণ করা হয়েছে। এই জেহাদে অগ্রগণ্য ছিল ব্লগগুলোর মধ্যে সচলায়তন।

ব্লগার হিসেবে আক্রমণের এই সংস্কৃতিকে আমি জানি। জামাতবিরোধিতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ব্লগিস্ফিয়ারে দাপট দেখানোর একটা হাতিয়ার অনেক ব্লগারের জন্য। এই রাজনীতিকে ঘিরে দল পাকে, ঘোঁট বাঁধে, ব্লগারখেদানো চলে। এইসব ব্লগসাইট প্রতিষ্ঠাতাদের কেউ কেউ থাকেন বিদেশে। তাদের পঠনপাঠন, সমাজচেতনা, এবং দেশের সঙ্গে যুক্ত থাকার বাসনা এইসব ব্লগসাইট প্রতিষ্ঠায় তাদের উদ্বুদ্ধ করে। আবার তাদের অর্জিত জ্ঞানও জাহির করার প্রয়োজন হয়। তাই অনলাইন ও মুদ্রণ উভয় মাধ্যমে পরিচিত ব্লগারদের সুযোগ পাওয়া মাত্রই সংঘবদ্ধ আক্রমণের মাধ্যমে খেদানো হয়। সচলায়তন থেকে এর আগে খেদানো হয়েছে সুমন রহমান ও ফারুক ওয়াসিফের মতো শক্তিশালী ব্লগারকে। সাদা-কালো (মুক্তিযুদ্ধ বনাম জামাত/পাকিস্তান এই ডিসকোর্সের বাইরে যেমন কিছু নাই) বিভাজনের বাইরে এসে যারাই কথা বলেছেন এরকম আক্রমণের শিকার হয়েছেন। এই তালিকায় আছেন মানস চৌধুরী, ব্রাত্য রাইসু, মাহবুব মোর্শেদ। এই তালিকায় যুক্ত হলাম আমি। অনেক ত্যাড়া-বিপ্লবী ব্লগার রাসেলকেও মেহেরজান ইস্যুতে ফ্রেমের বাইরে কথা বলার কারণে আক্রমণ করা হয়েছে। সর্বোপরি এইসব লাঠিয়ালগিরি তাদের একঘেঁয়ে-কষ্টকর প্রবাসজীবনে একটা ভিন্ন ফ্লেবার দেয়। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা তাদের কাছে প্রেরণা নয়, তাদের ব্লগজীবনের প্রাণভোমরা। এটা না থাকলে তারা প্রাণহীন হয়ে ধুঁকতে থাকেন।

আমি এটা জানি বলেই ওরকম একটা স্ট্যাটাস দিয়েছিলাম যে “মেহেরজানবিরোধীরা নিশ্চয়ই দলে দলে গেরিলা আর আমার বন্ধু রাশেদ দেখছেন”। ডিভিডি-ইন্টারনেট-কেবল টিভির যুগে আমাদের মতো একটা দেশে একটা ছবি বানানো বিরাট চ্যালেঞ্জ। বাপের টাকা থাকলেই তো সবাই ছবি বানাতে পারেনা। মেহেরজানের হল থেকে নেমে যাওয়াটা বাজে দৃষ্টান্ত হয়ে রইলো। কাল ইসলামবিরোধী বলে আরেকজন হল থেকে নামিয়ে দেবে। আর এগুলো সেল্ফ সেন্সরশিপকে চূড়ান্ত করে। আমি চলচ্চিত্রপ্রেমী বা স্বাধীনধারার চলচ্চিত্র-ক্ষেত্রের শুভার্থী হিসেবে আশা করছিলাম, মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ছবি মেহেরজান নিয়ে এত কথা, তাহলে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের ছবি গেরিলা বা রাশেদ নিশ্চয়ই এইসব টালমাটাল ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার পর সবাই দলে দলে দেখতে যাবেন। তাই ঐ স্ট্যাটাসটা ঐভাবে লিখেছিলাম। কিন্তু আমার এক বান্ধব ফেসবুকের মালকে ঘি বানিয়ে সচলায়তনের আগুনলাগা গুদামে গিয়ে ঢাললেন। সেই বন্ধুত্বকে অস্বীকার করা ছাড়া আর উপায় রইলো না। ফেসবুকের মতো ‘লুজ ফেডারেশন’-সদৃশ বন্ধু-ফেডারেশনের সদস্যদের তাই এটা জানিয়েই করেছিলাম।

আমি জানি এই লেখার পর সচলায়তনের লাঠিয়ালরা বিষ্ঠা আরও ঘাঁটবেন তাদের লাঠি দিয়ে। কিন্তু আশাবাদ এই যে আমার ভার্চুয়াল ও বাস্তবজীবনের বন্ধু-শুভার্থীদের দিক থেকে আমাকে নিয়ে উদ্ভূত দ্বিধা-সন্দেহ এই লেখা পাঠের পর দূরীভূত হবে।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/fahmidulhaqblog/29367521 http://www.somewhereinblog.net/blog/fahmidulhaqblog/29367521 2011-04-22 23:50:19
মেহেরজান: বিনির্মাণে বিপত্তি ও জাতীয়তাবাদী আবেগ রুবাইয়াত হোসেন পরিচালিত ‘মেহেরজান’ এবং চলচ্চিত্রটি নিয়ে তৈরী-হওয়া ব্যাপক প্রতিক্রিয়া, উভয়ই আমার দৃষ্টি কেড়েছে। আমার ধারণা হয় মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আমরা অত্যন্ত আবেগপ্রবণ, হয়তো ঐ মাত্রায় বিশ্লেষণপ্রবণ নই। ফলে মুক্তিযুদ্ধের ‘গ্রান্ড ন্যারেটিভ’-এর বাইরে কোনো কিছুকেই আমরা অনুমোদন দিতে চাইনা। সেই গ্র্যান্ড ন্যারেটিভটা কী, আমরা সবাই জানি। যে স্বাধীনতাকামী বাঙালি জনগণের ওপরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আক্রমণ করে, হত্যা-ধর্ষণ-ধ্বংসের মতো যুদ্ধাপরাধ করে এবং বাঙালি মুক্তিযোদ্ধারা প্রতিরোধ গড়ে তুলে দেশকে স্বাধীন করে। এই ন্যারেটিভের আরেকটি অংশ হলো ইসলামপন্থী কয়েকটি দলের বাঙালি সদস্যরা ঐসব যুদ্ধাপরাধে সহায়তা করে অথবা ঐসব অপরাধে নিজেদের নিযুক্ত করে। ‘মেহেরজান’ ছবিটি ঐ গ্র্যান্ড ন্যারেটিভের বাইরে গিয়ে ভিন্ন ন্যারেটিভ নির্মাণ করেছে। ফলে ছবিটিকে ঘিরে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরী হয়েছে।

সেইসব প্রতিক্রিয়ার যে গড় বৈশিষ্ট্য, তাতে মূলত মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিপরীতে উল্লম্ব অবস্থানে রেখে ছবিটিকে বিচার করেছে। আমি ছবিটিকে বিচার করতে চাই বাংলাদেশে নির্মিত মুক্তিযুদ্ধসম্পর্কিত অন্যান্য ছবির সঙ্গে আনুভূমিকভাবে। তার সঙ্গে মেলাতে চাই জাতিরাষ্ট্র ধারণার।

জাতিরাষ্ট্র যদি, বেনেডিক্ট এন্ডারসনের ভাষায় একটি ‘কল্পিত সমাজ’ (ইমাজিনড কমিউনিটি) অথবা গায়ত্রী স্পিভাকের ভাষায় ‘কৃত্রিম নির্মাণ’ (আর্টিফিশিয়াল কনস্ট্রাক্ট), হয়ে থাকে, তবে তার ‘কল্পিত’ ঐক্য ও সংহতির জন্য লাগাতারভাবে একটি আদর্শ জাতীয়তার অবয়ব বা বৈশিষ্ট্য গড়ে তুলতে হয় এবং কিছু ‘রেপ্রিজেন্টশন-পদ্ধতি’র (স্টুয়ার্ট হলের মতে) মাধ্যমে এই নির্মাণের কাজটি করতে হয়, সেই অবয়ব বা বৈশিষ্ট্যকে ধরে রাখার জন্যও। সংবাদপত্র, সাহিত্য বা শিক্ষা সেই রেপ্রিজেন্টশনের দায়িত্বটি বরাবর পালন করে এসেছে। অপেক্ষাকৃত অধুনা মাধ্যম চলচ্চিত্রও বিশ্বব্যাপী জাতীয়তা, আত্মপরিচয় নির্মাণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে এসেছে।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র পরিচালকেরাও উৎসাহের সঙ্গে বাঙালি জাতিসত্তা গঠন, সংরক্ষণ ও প্রচারণার কাজটি করে চলেছেন। এদেশের শিল্পপ্রয়াসী চলচ্চিত্রের বিরাট অংশই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত। স্বাধীনধারার পরিচালক তারেক মাসুদ, মোরশেদুল ইসলাম, তানভীর মোকাম্মেলের পাশাপাশি মূলধারার চাষী নজরুল ইসলামের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র নির্মাণের খ্যাতি আছে। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বেশিরভাগ চলচ্চিত্রে ঐ গ্র্যান্ড ন্যারেটিভকেই দেখি। তারেক মাসুদের ‘মাটির ময়না’ ছবিতে প্রথম দেখা গেল ঐ ন্যারেটিভ থেকে কিছুটা সরে আসা হয়েছে, যদিও তার ‘মুক্তির গান’ ছবিটা গ্র্যান্ড ন্যারেটিভেরই অন্যতম অংশীদার। ‘মাটির ময়না’য় প্রথম দেখা গেল একটি অন্যতম বড় চরিত্র, যার ইসলামিক বেশবাশ ও ম্যানারিজম থাকার পরও তিনি রাজাকার নন। নতুবা আগে নির্মিত মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্রগুলোয় একটি রাজাকার চরিত্রের উপস্থিতি থাকে যে ইসলামপন্থী এবং যার চরিত্রে যাবতীয় বদস্বভাব রয়েছে। এরা একটু বয়ষ্ক ও সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি-টুপি পরিহিত, এদের মুখে দাড়ি থাকে -- অর্থাৎ রাজাকার ও মোল্লা এইভাবে সমার্থক হয়ে ওঠে। একথা ঠিক ১৯৭১ সালের রাজাকাররা কোনো না কোনো ইসলামপন্থী দলের সদস্য ছিল। কিন্তু তারা সবাই বয়ষ্ক-টুপিপরিহিত ছিলনা। তাদের অনেকেই বয়সে তরুণ ও আমাদের মতোই শার্ট-প্যান্ট পরিধান করতো। এইসব নির্মাতা-স্রষ্টারা মূলত চিন্তাভাবনায় আধুনিক ও বামঘেঁষা হলেও ষাটের দশকের বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার মধ্য দিয়েই পশ্চিমা আধুনিকতা ও বামভাবনার স্থানীকীকরণ ঘটে। ফলে বাঙালি মুসলমানের বাঙালিত্বের অংশটুকুই তারা একমাত্র আত্মপরিচয় বলে ভাবতে চান। এজন্য মুসলমানিত্বের অংশটুকুকে তারা বাতিল করতে চান। ইসলামের অনুসারীরা তাদের কাছে ‘অপর’। ফলে চলচ্চিত্রে তাদের অপরায়ণের শিকার হয় বাঙালি-মুসলমান জাতিসত্তার ভেতরকার মুসলমানিত্ব অংশটি।

‘মাটির ময়না’ ছবির দ্বিতীয় ভাগে একটি দৃশ্য আছে ঢাকা থেকে পালিয়ে আসা নাগরিকেরা একটি লঞ্চে পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণের ভয়াবহতা বর্ণনা করছে এবং পরপরই অন্ধ বয়াতীর গান শুরু হয় যেখানে কারবালার যুদ্ধকে ‘ভ্রাতৃঘাতী’ যুদ্ধ হিসেবে বর্ণনা করা হয় এবং যাকে বর্তমান যুদ্ধের সঙ্গেও সম্পর্কিত করা হয়। সুফিবাদ বা লোকধর্মের আদর্শপ্রভাবিত সহজিয়া ভাবের রক্তপাতহীন ছবিটি, চলমান যুদ্ধকে স্বীকার করে নিয়েও তাকে অতিক্রম করতে চায় এবং জাতীয়তাবাদী আবেগের বাইরে এসে সব যুদ্ধই শেষপর্যন্ত যে ভ্রাতৃঘাতী, সেই বার্তা দিতে চায়। তারেক ও ক্যাথরিন মাসুদের স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘নরসুন্দর’-এ একজন বিহারী, পাকিস্তানী সেনা ও রাজাকারদের তাড়া খেয়ে পলায়নরত একজন মুক্তিযোদ্ধাকে বাঁচিয়ে দেয়। এটিও মুক্তিযুদ্ধের গ্র্যান্ড ন্যারেটিভের বাইরের ছবি, যেক্ষেত্রে আমরা বিহারীদের জানি মুক্তিযুদ্ধবিরোধী হিসেবে।

‘মেহেরজান’ ছবিতে মুক্তিযুদ্ধের অবমাননা নিয়ে যারা উত্তেজিত তাদের ‘মেহেরজান’-পূর্ব ছবিতে দৃষ্ট এধরনের ডিকনস্ট্রাকশনের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। এই পর্যায়ে আমি হুমায়ূন আহমেদের ‘শ্যামল ছায়া’ (২০০৪) ও তৌকীর আহমেদের ‘জয়যাত্রা’র (২০০৪) কথা বলতে চাই। প্রথমেই বলে নেয়া ভালো দু’টি ছবিতেই রাজাকার হিসেবে দু’টি চরিত্র ছিল, কিন্তু চরিত্রগুলো ছোট। অন্যদিকে ‘জয়যাত্রা’য় দেখা যায়, যখন পাক-সেনারা গ্রামে ঢুকে, তাদের জেরার মুখে পড়ে মসজিদের ইমাম। তিনি পাক-সেনার নৃশংসতার প্রতিবাদ করেন, এবং পাক-সেনার হাতে শহিদ হন। এভাবে একজন মৌলবি হন চলচ্চিত্রের প্রথম প্রতিবাদকারী এবং শহিদ। আর ‘শ্যামল ছায়া’য় যুবা-মৌলবি বলতে গেলে মূল চরিত্র। তিনি নৌকা আরোহীদের মধ্যে প্রথম মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। তিনি রাজাকারকে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচান। তার গুণাবলির চরম নিদর্শন দেখি অন্য ধর্মের মানুষের প্রতি তার উদারতায়। নৌযাত্রায় হিন্দুদের ধর্মচর্চার অধিকার রক্ষায় তিনি ছিলেন সচেষ্ট। এক মৌলবির মধ্যেই যাবতীয় গুণাবলীর সমাবেশ ঘটানো হয়েছে। একসময় ঘটতো ঠিক উল্টোটা।

লক্ষ করার বিষয় হলো এরমধ্যে নাইন-ইলেভেনের ঘটনা ঘটে গেছে, আফগানিস্তান-ইরাক আগ্রাসন ঘটেছে। মুসলমানদের আত্মপরিচয়ের নতুন নতুন ব্যাখ্যা আসছে। আমাদের বেশিরভাগ আর্ট সিনেমা যেহেতু মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক, তাতে ইসলামী দলভুক্ত রাজাকার চরিত্র থাকছে এবং বাঙালি মুসলমানের আত্মপরিচয়ের জিজ্ঞাসায় ‘প্রথমত বাঙালি না মুসলমান’ প্রশ্নটি অমীমাংসিত থাকছে -- এই পরিপ্রেক্ষিতে খোদ মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্রেই নানা বিনির্মাণ বা ডিকনস্ট্রাকশন শুরু হয়েছে বিগত এক দশকে। ‘মেহেরজান’ সেই ডিকনস্ট্রাশন প্রক্রিয়ায় একটা উল্লম্ফন। আগের ডিকনস্ট্রাকশনগুলোয় কিন্তু আজকের মতো ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি।

আরও একটি বিষয় হলো, যারা যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন, বা মুক্তিযুদ্ধের প্রজন্ম, তাদের আবেগের পরিমাপে মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী প্রজন্ম সৃজনশীল অভিপ্রকাশে আক্রান্ত হবেননা। বরং মুক্তিযুদ্ধের মতো বিশাল ঐতিহাসিক ঘটনাকে নানা দৃষ্টিকোণ থেকেই দেখতে চাইবে নতুন প্রজন্ম। আর এই দেখার ক্ষেত্রে তারা সমসাময়িক জাতীয় ও বৈশ্বিক জীবনদর্শন ও রাজনীতি, বৈশ্বিক মানবতাবাদ ইত্যাদি বহিঃস্থ ঘটনাক্রম-আদর্শ দ্বারা অবলীলায় তাড়িত হবে। এটা শৈল্পিক দায় এবং উপায়।

‘মেহেরজান’-বিতর্কে চলচ্চিত্রটিকে একটি টেক্সট হিসেবে কেউ পাঠ করছেন না। বা বলা যায় সেই দিকটায় দৃষ্টি দেবার অবকাশ পাচ্ছেন না, সংক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়ায়। অথচ ছবিটির চিত্রনাট্যে যথেষ্ট দুর্বলতা আছে। একমাত্র পাকিস্তানি সৈনিকের সঙ্গে মেহেরের প্রেমের বিষয়টি ছাড়া কোনো কিছুই পক্বতা লাভ করেনি ছবিতে। অথচ ছবিটি একসঙ্গে অনেক কিছুকে ধরতে চেয়েছে। এমনকি পরিচালকের নিজস্ব গবেষণার জায়গাটি, বীরাঙ্গনাদের অংশটিও পূর্ণ অভিঘাত নিয়ে হাজির হয়না। নীলা চরিত্রটির হঠাৎ-প্রস্থান একটি সম্ভাবনাকে অসমাপ্ত রাখে। মেহেরের প্রেমপর্বটি অতিদীর্ঘ, ঐরকম গ্রামীণ নির্জনতায় অনেক আগেই এই ‘অনাকাক্সিক্ষত’ প্রেমটি ধরা পড়ার কথা। কিছু কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কেবল ইঙ্গিতের মাধ্যমে সারা হচ্ছে, অথচ যার বিস্তার জরুরি ছিল। যেমন যুদ্ধশিশু সারাহর একটি সমকামী সম্পর্কের ইঙ্গিত আছে ছবিতে। একই ইঙ্গিত আছে ‘প্রাণসখা’ অরূপ-রাহীর চরিত্রদু’টির ক্ষেত্রেও। সেই ইঙ্গিত চিত্রনাট্যে কিছুই যোগ করেনা। সমকামিতা নিজেই একটা বিরাট ডিসকোর্স, এই বিষয়ভিত্তিক আলাদা ছবিই হতে পারে। মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটের ছবিতে ঐ ইঙ্গিত অপ্রয়োজনীয় ছিল।

বাণিজ্যিক উপাদান ছবিটির অন্যতম সীমাবদ্ধতা। সময় ও চরিত্রানুযায়ী অবিশ্বস্ত বর্ণিল পোশাক, অমলিন ঝকঝকে বাংলাদেশের গ্রাম, ভারতীয় তারকাদের কাস্টিং, নির্রযোগ্য সিনেমাটোগ্রাফি-উদ্ভূত এক্সোটিক প্রাকৃতিক চলমান চিত্র -- ছবিটির প্রতি একটা ওরিয়েন্টালিস্ট গেইজ-এ (প্রাচ্যবাদী দৃষ্টিক্ষেপণ) প্রলুব্ধ করে। তবে বাণিজ্যিক বিনোদন আবার ছবির অন্যতম শক্তিও। ঐসব উপাদানের কারণে অনেক সাধারণ দর্শকের কাছেই এটা বিয়োগান্তক প্রেমকাহিনী হিসেবে হাজির হবে, মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে যা একটা রূপকথার আখ্যান তৈরি করে। আর মুক্তিযুদ্ধের গ্র্যান্ড ন্যারেটিভের ডিকনস্ট্রাকশন করতে গিয়ে, রূপকথা-পরিস্থিতি, পরিচালকের জন্য বিশেষ সুবিধা এনে দেয়। সেই সুবিধা বা স্বাধীনতা পরিচালক নিতেই পারেন। নয়তো মুক্তিযুদ্ধ কেবল ইতিহাসের দিন-সংখ্যা নিয়ে পাঠ্যবইতে আটকে থাকবে, নানারূপে মানুষের মনে ঠাঁই নেবে না।

তবে বলতে হবে ‘মেহেরজান’-এর কাউন্টার ডিসকোর্স প্রিম্যাচিউর। ঐতিহাসিক ঘটনার সঙ্গে স্থানিক ও কালিক ব্যবধান গ্র্যান্ড ন্যারেটিভের বাইরে কাউন্টার ন্যারেটিভ জন্মের পথ করে দেয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ বা ভিয়েতনাম যুদ্ধ নিয়ে এরকম অনেক ছবি নির্মিত হয়েছে। অথচ মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি এখনও সিনিয়র প্রজন্মের কাছে তরতাজা। ফলে এই ধরনের ডিকনস্ট্রাকশন ‘মেহেরজান’-এর জন্য খানিক আগাম হয়ে গেল।

কিন্তু ‘মেহেরজান’বিরোধী বিক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখে আমার ভয় হয়, ঐতিহাসিক বা জাতীয়-আন্তর্জাতিক যেকোনো ঘটনাক্রম নিয়ে নানামুখী বা ডিসকার্সিভ আলোচনার পথ বুঝি ক্রমশ রুদ্ধ হয়ে পড়ছে। মুক্তিযোদ্ধা বনাম রাজাকার/পাকিস্তানপন্থী ডাইকোটমির বাইরে বুঝি আর কিছু থাকতে নেই এই ভুবনে।



প্রথম প্রকাশ: প্রথম আলো, ৩০ জানুয়ারি, ২০১১


]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/fahmidulhaqblog/29317284 http://www.somewhereinblog.net/blog/fahmidulhaqblog/29317284 2011-01-30 18:34:53
ব্লগসম্পর্কিত গবেষণা-প্রবন্ধ ও 'দিনমজুর' নিক নিয়ে বিভ্রান্তি
"দিনমজুর নিকটি রাজনৈতিক ব্লগিং এর জন্য সবার কাছে শ্রদ্ধেয় হয়ে ওঠেন। বামপন্থী মতাদর্শের এই ব্লগার সাম্রাজ্যবাদ, কর্পোরেট বিশ্বায়ন ইত্যাদির বিরুদ্ধে তথ্যমূলক ও বিশ্লেষণী লেখা লিখে সবার আস্থা অর্জন করেন। পরে জানা গেছে এই নিকটি সমমনা তিন বন্ধু মিলে চালাতেন। মতের মিল দীর্ঘস্থায়ী হয় নি, এখন এই নিকের পিছনে আছেন কেবল অনুপম সৈকত শান্ত।"

কিন্তু ইমেইল মারফত, ব্লগার দিনমজুর এই তথ্যের প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তিনি লিখেছেন:

"আমরা দিনমজুর নিক নিয়ে আপনার এই বিভ্রান্তিমূলক মন্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানাই। এখানে দিনমজুর নিক সম্পর্কে “পরে জানা গেছে এই নিকটি সমমনা তিন বন্ধু মিলে চালাতেন” কথাটুকু বলে আপনি রহস্য উদঘাটনের একটা ভাব করেছেন অথচ আমরা শুরু থেকেই বিভিন্ন সময় বিভিন্ন মন্তব্যে পরিস্কার করে বলেছি এই নিকটি অনুপম সৈকত শান্ত, মাহবুব রুবাইয়াত ও কল্লোল মোস্তফা এই তিনজন মিলে চালায়। যে তথ্য দিনমজুর নিজেই উন্মুক্ত করেছে সেটাকে দিনমজুর “পরে জানিয়েছে” না লিখে পরে “জানা গেছে” বলার মানে কি? নীচের লিংক এ দেখেন ২০০৮ এর ৮ সেপ্টম্বের এর একটা মন্তব্যে(১২ নং মন্তব্য) আমরা বলেছি: “আসলে এই ব্লগটি আমরা তিনজন মিলে চালাই ( কল্লোল মোস্তাফা, অনুপম সৈকত শান্ত এবং মাহবুব রুবাইয়াত)”:
Click This Link

এই বিভ্রান্তির জন্য আমি গবেষক হিসেবে আন্তরিক দুঃখপ্রকাশ করছি। বিভ্রান্তিকর তথ্যপ্রদানের জন্য গবেষক হিসেবে আমি দায় স্বীকার করছি। আশা করি ঐ প্রবন্ধের পাঠক, দিনমজুর নিক সম্পর্কিত তথ্য দ্বারা বিভ্রান্ত হবেন না।

প্রিয় ব্লগার দিনমজুরের কাছেও এজন্য মার্জনা প্রার্থনা করছি।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/fahmidulhaqblog/29304040 http://www.somewhereinblog.net/blog/fahmidulhaqblog/29304040 2011-01-08 20:45:27
বাংলা ব্লগ কমিউনিটি নিয়ে প্রথম সমন্বিত গবেষণা-প্রবন্ধ প্রকাশিত Click This Link)। আমি গবেষণাটি করেছিলাম আমাদের একাডেমিক পত্রিকা 'যোগাযোগ'-এর জন্য। পত্রিকাটির প্রকাশনা নানাভাবে বিলম্বিত হয়। অবশেষে পত্রিকার ১০ম সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে গবেষণানিবন্ধটি।
পত্রিকাটি পাওয়া যাবে শাহবাগের পাঠক সমাবেশ, জনান্তিক, কাঁটাবনের শ্রাবণ-এ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সেমিনারে। এছাড়া এক সপ্তাহ পর থেকে পাওয়া যাবে চট্টগ্রামের বিশদ বাংলা ও বাতিঘর-এ এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে।

'যোগাযোগ' পত্রিকার ১০ম সংখ্যার তথ্যাবলী

যোগাযোগ: যোগাযোগ ও সংস্কৃতি বিষয়ক পত্রিকা

সংখ্যা ১০, জানুয়ারি ২০১১


সম্পাদক
ফাহমিদুল হক
আ-আল মামুন

সহকারী সম্পাদক
আবুল খায়ের মোহাম্মদ আতিকুজ্জামান

প্রচ্ছদ
শিবু কুমার শীল

২০০ পৃষ্ঠা, মূল্য: ১০০ টাকা

সূচি

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় সংস্কার: প্রসঙ্গ শিক্ষক ও ছাত্র রাজনীতি
--সেলিম রেজা নিউটন

গণমাধ্যমের রাজনৈতিক অর্থনীতি: একটি তাত্ত্বিক পর্যালোচনা
--আনিস রহমান

ফুকো, সাঈদ এবং ক্ষমতা/প্রতিরোধ
--হাসান আল যা’য়েদ
অনুবাদ: আহমেদ জাভেদ চৌধুরী রনি

‘অশ্লীলতা’-বিরোধী প্রপাগান্ডা ও ‘সুস্থ’ চলচ্চিত্রের যুগে ঢাকাই সিনেমা
--মোহাম্মদ আজম

মেরিল-প্রথম আলো চলচ্চিত্র ‘সমালোচক পুরস্কার’-এর রাজনৈতিক অর্থনীতি
--আ-আল মামুন

বাংলা ব্লগ কমিউনিটি: মতপ্রকাশ, ভার্চুয়াল প্রতিরোধ
অথবা বিচ্ছিন্ন মানুষের কমিউনিটি গড়ার ক্ষুধা
--ফাহমিদুল হক

যুদ্ধ সমাচার: প্রচারণার নতুন কায়দা
--রবার্ট ফিস্ক
অনুবাদ: আবুল খায়ের মোহাম্মদ আতিকুজ্জামান

মিথ্যা মিথ্যা খেলা: আমরা যেভাবে আরেক আগ্রাসী যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হচ্ছি
--জন পিলজার
অনুবাদ: রিফাত ফাতিমা

লাখ আর কোটি
--জন পিলজার
অনুবাদ: ইলোরা সুলতানা
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/fahmidulhaqblog/29302954 http://www.somewhereinblog.net/blog/fahmidulhaqblog/29302954 2011-01-06 20:02:41
বাংলাদেশের গণমাধ্যম: ৪০ বছরের অভিজ্ঞতা, ৫০ বছরের পূর্বাভাস
২০১১ সালে স্বাধীন দেশ হিসেবে বাংলাদেশের ৪০ বছর পূর্তি হচ্ছে। এই ৪০ বছরে বাংলাদেশের সাংবাদিকতার বিভিন্ন ঘটনাক্রমের যেমন একটি পর্যালোচনা করার সুযোগ রয়েছে, তেমনি আগামী এক দশকে বা ৫০ বছর পূর্তি হতে হতে সাংবাদিকতা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তার একটি পূর্বাভাস দেয়ারও প্রয়োজন রয়েছে।

পাকিস্তান আমলে প্রতিষ্ঠিত দৈনিক ইত্তেফাক এবং দৈনিক সংবাদ এখনও প্রথম পর্যায়ের সাংবাদিকতার শেষ প্রতিনিধি হিসেবে টিকে আছে, যদিও তারা বর্তমানে মূলত বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা বা দ্বিতীয় পর্যায়ের সাংবাদিকতার প্রতিনিধিত্ব করছে। পাকিস্তান আমলের স্বাধীকার আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে এই দুটি পত্রিকার ঐতিহাসিক ভূমিকা রয়েছে। স্বাধীন বাংলা বেতার ছাড়াও বাংলাদেশ বেতার ও বাংলাদেশ টেলিভিশন ঐতিহাসিক নানা ঘটনাক্রমের সঙ্গে অবশ্যম্ভাবীরূপে জড়িয়ে পড়েছে। বাকি প্রায় সব মুদ্রণ ও সম্প্রচার মাধ্যমের জন্ম হয়েছে বিগত দুই দশকে। লক্ষ করার বিষয়, সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের পতনের পর, এই দুই দশক হলো মুক্তবাজার অর্থনীতিনির্ভর বিশ্বায়নের কাল। ফলে পুঁজিতান্ত্রিক বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ার একটা প্রভাব এই সময়ের গণমাধ্যমের ওপরে পড়েছে, উল্টো দিক থেকে সম্প্রসারণশীল বিশ্বায়ন প্রক্রিয়াসৃষ্ট পুঁজিতান্ত্রিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম অংশীদার হিসেবে থেকেছে গণমাধ্যম। বিদ্যমান গণমাধ্যম পরিস্থিতি তাই, একইসঙ্গে, পুঁজিতান্ত্রিক বিশ্বায়নের কারণ ও ফলাফল।

বাংলাদেশের দ্বিতীয় পর্যায়ের সাংবাদিকতার (বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা) বিস্তৃতি ছিল স্বল্পকালের, অন্য দেশের সঙ্গে পার্থক্যটা এইখানে। দেশ স্বাধীন হবার পরিপ্রেক্ষিতে রাজনৈতিক সাংবাদিকতার প্রয়োজন একরকম ফুরালেও, আশির দশক পর্যন্ত আমরা রাজনৈতিক সাংবাদিকতাকেই দেখেছি। দ্বিতীয় পর্যায়ের সাংবাদিকতার (বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা) প্রতিনিধি হিসেবে আমরা নব্বই দশকের প্রথম দিকে পেয়েছি আজকের কাগজকে। সাংবাদিকতা বিভাগে অহরহ উচ্চারিত বস্তুনিষ্ঠতার বাণীর একরকম প্রতিফলন আমরা দেখতে পাই ঐ পত্রিকায়। ঐ পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ছিলেন সাংবাদিকতা বিভাগের একজন গ্র্যাজুয়েট। আজকের কাগজ পত্রিকার মাধ্যমে বাংলাদেশের সাংবাদিকতায় বেশ কিছু পরিবর্তন আসে। বস্তুনিষ্ঠ ও এথিকাল রিপোর্টিংয়ের পাশাপাশি রুচিশীলতা, সংস্কৃতিমনস্কতার পরিচয় দেয় পত্রিকাটি। কম্পিউটার ডেস্কটপ প্রকাশনা ও অফসেট মুদ্রণ প্রযুক্তি ইতোমধ্যে চলে আসায় মুদ্রণমানেও পরিবর্তন আনতে পারে পত্রিকাটি। গুরুত্বপূর্ণ একটি পরিবর্তন আসে দৈনিক পত্রিকায় লেখক ও পাঠকের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে। নির্ধারিত উপ-সম্পাদকীয় লেখকের বাইরে মধ্যপাতায় চিন্তক, বুদ্ধিজীবী মায় পাঠক পর্যন্ত লেখা শুরু করেন নিজ পরিচয় বিবৃত করার মাধ্যমে। এরা সবাই হয়ে ওঠেন কলামিস্ট, এবং দ্রুত মধ্যপাতানির্ভর একটি সিভিল সোসাইটি গড়ে উঠতে থাকে বাংলাদেশে। আজকের কাগজ-এর নতুনত্ব ভোরের কাগজ আবির্ভাবের মাধ্যমে স্থানান্তরিত হয় এবং প্রথম আলো পত্রিকার আবির্ভাবের পরে ক্ষণস্থায়ী দ্বিতীয় পর্যায়ের সাংবাদিকতার অবসান ঘটে।

প্রথম আলোর মাধ্যমেই কর্পোরেট সাংবাদিকতার প্রবর্তন ঘটে, যদিও ভোরের কাগজ-এর সম্পাদক-সাংবাদিকরা মিলেই পত্রিকাটি চালু করেন। কিন্তু মালিকানার প্রকৃতির কারণেই একই সম্পাদক-সাংবাদিকরা বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা থেকে সরে এসে কর্পোরেট সাংবাদিকতা শুরু করেন। আমদানিকারক বৃহৎ প্রতিষ্ঠান ট্রান্সকম গ্র“পের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান প্রথম আলোর পাশাপাশি, এস এম আলী প্রতিষ্ঠিত ইংরেজি দৈনিক দি ডেইলি স্টারও ট্রান্সকম গ্র“পের অঙ্গীভূত হয়। নব্বই দশকের শেষের দিকে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার-এর যূথবদ্ধতার আগেও কর্পোরেট সাংবাদিকতার নিদর্শন নিয়ে জনকণ্ঠ বা মুক্তকণ্ঠ হাজির হয়েছিল, কিন্তু তারা প্রভাববিস্তারকারী হয়নি। প্রথম আলোর নির্দিষ্ট করে দেয়া সাংবাদিকতার ধরন-ধারণই বাকিরা এখন পর্যন্ত অনুসরণ করে চলেছে। প্রশ্ন হলো সেই ধরনটা কী?

সেই উত্তর দেবার আগে বিগত দুই দশকে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক পটভূমির একটা বর্ণনা দেয়া দরকার। সমাজতন্ত্র পতনপরবর্তী মুক্তবাজার অর্থনীতিনির্ভর বিশ্বায়ন প্রক্রিয়া এবং বাংলাদেশে এরশাদ-সরকারের স্বৈরাচারী শাসনাবসানপরবর্তী গণতন্ত্রের আবির্ভাব একই সময়ে ঘটে। এখন বাংলাদেশের এই নির্বাচনকেন্দ্রিক, অবিকশিত গণতন্ত্র মুক্তবাজার অর্থনীতির জন্য কোনোভাবেই প্রতিকূল ছিলনা। বরং পশ্চিমা দ্বিদলীয় গণতান্ত্রিক পদ্ধতির আদলে বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্র মার্কিনি সাম্রাজ্যবাদী প্রভাবযুক্ত মুক্তবাজার অর্থনীতির ধারণাকে সাদরে গ্রহণ করেছে। বলাবাহুল্য এই মুক্তবাজার অর্থনীতিতে বাংলাদেশ আছে গ্রাহক-প্রান্তে। বিশ্বায়নের কালে বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের প্রান্তিক পুঁজিবাদী দেশগুলো অক্রিয় ভোক্তার বাজারে রূপান্তরিত হয়েছে। সস্তাশ্রমনির্ভর তৈরীপোশাক শিল্প এবং বিদেশী বিনিয়োগনির্ভর টেলিকম খাত ব্যতীত বাংলাদেশে বিদেশের পণ্য দেশে এনে বিক্রিভিত্তিক একটি সওদাগর-শ্রেণীর উদ্ভব ঘটেছে, এবং এই তিন খাতই বিকাশমান কর্পোরেট শ্রেণীর অংশীদার। ফলে ১৫ কোটি মানুষের একটি দেশ মানে সম্ভাব্য ১৫ কোটি ভোক্তার বাজার। আমদানিকারকদের দিক থেকে তাই প্রয়োজন পড়ে মানুষকে ভোক্তায় রূপান্তরের এবং ভোক্তসংস্কৃতি চালু করা বিদ্যমান অর্থনৈতিক প্রক্রিয়ার অন্যতম জরুরি শর্ত হিসেবে দাঁড়িয়ে যায়।

এই ভোক্তসংস্কৃতি চালু করার দায়িত্ব পড়ে গণমাধ্যমের ওপর। ফলে ট্রান্সকমের মতো আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানই প্রতিষ্ঠা করে প্রথম আলোর মতো সংবাদপত্রের যার মূল কর্মসূচি হলো নিজ কোম্পানির স্বার্থ সংরক্ষণ করা, সার্বিকভাবে প্রাইভেট সেক্টর বা ব্যবসায় শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষা করা এবং পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ বিজ্ঞাপন প্রকাশ, বাজারের খবর, নতুন পণ্যের সংবাদ ইত্যাদি পরিবেশনের মাধ্যমে ক্রয়মনষ্কতার স্বভাব সৃষ্টি করা। বাজার সৃষ্টি ও ভোক্তাসংস্কৃতি চালু করার পাশাপাশি প্রথম আলোর মতো পত্রিকাগুলো ব্যবসা-বাণিজ্যের সবচেয়ে বড়ো বাধা হিসেবে রাজনৈতিক দলগুলোর বিদ্যমান অপরিচ্ছন্ন কর্মকাণ্ডকে দায়ী করে। তাই পাল্টা শক্তি হিসেবে ব্যবসায়ীদের নেতৃত্বে সিভিল-সমাজ দাঁড় করিয়ে ব্যবসার স্বার্থ অক্ষুণœ রাখার মতো ‘স্থিতিশীলতা’, ‘গণতন্ত্র’ ও ‘সুশাসন’ প্রতিষ্ঠা করাই এই গণমাধ্যম-প্রতিষ্ঠানগুলোর লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়। একই প্রয়োজনে এই প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার পত্রিকা সেনা-সমর্থিত ২০০৭-০৮ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারকেও প্রকাশ্য সমর্থন দিয়েছে। কীরকম বাংলাদেশ তারা দেখতে চায় সেবিষয়ে সিভিলসমাজ-কর্পোরেট-মিডিয়া-মিলিটারির ঐক্য আছে। সব প্রতিষ্ঠানের বিরাজনীতিকরণের মাধ্যমে নির্বিবাদী ব্যবসা-বাণিজ্য করতে পারার একটা পরিবেশ চায় এই ঐক্যজোট। এই বিরাজনীতিকরণ ডিসকোর্সের প্রবর্তন ও নিয়মিত চর্চার মূল দায়িত্ব গণমাধ্যমের হাতেই।

শূন্য দশকে টেলিভিশন চ্যানেলের ’বুম’ উল্লেখ করার মতো আরেকটি ঘটনা। ইটিভির মাধ্যমে টিভি চ্যানেলগুলোর একটি প্যাটার্ন দাঁড়িয়ে যায় -- বিশেষত সংবাদপরিবেশনে, অনুষ্ঠাননির্বাচনে, এবং গ্রাফিকাল উপস্থাপনায়। বর্তমানে প্রায় ১২-১৩টি চ্যানেল সম্প্রচার চালিয়ে যাচ্ছে, সামনে আসবে আরও কয়েকটি চ্যানেল। এইসব চ্যানেলগুলো ইটিভির ফরম্যাটই অনুসরণ করে চলেছে। তবে চ্যানেল আই, এনটিভি, এটিএনসহ সব চ্যানেলই উল্লিখিত কর্পোরেট সাংবাদিকতার আওতায় রয়েছে। পুরোপুরি বিজ্ঞাপননির্ভর এই চ্যানেলগুলো কর্পোরেট ব্র্যান্ডিং করতে গিয়ে সংবাদের সব স্লট বিক্রি করে দিয়েছে বিভিন্ন বিজ্ঞাপনদাতার কাছে। নির্দিষ্ট পরিমাণ বিজ্ঞাপনের বাজার ধরতে প্রতিযোগিতারত চ্যানেলগুলো সংবাদের স্লটগুলোকে অতি সস্তা করে তুলেছে। প্রথম আলোর সৃষ্টি করা কর্পোরেট সাংবাদিকতা চ্যানেলগুলোকে সম্পূর্ণ গলাধঃকরণ করেছে। প্রথম আলো যদি ‘বদলে যাও বদলে দাও’ কর্মসূচির মাধ্যমে কর্পোরেট সাংবাদিকতার গ্লানি ঘোচাতে চায়, চ্যানেলগুলোর মধ্যে সেই চেষ্টাও নেই। তবে এটা ঠিক, টেলিভিশন চ্যানেলের সংবাদ দেখা অধুনা মধ্যবিত্তের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে, যে-অভ্যাস তৈরী হয়েছে বিগত এক দশকে। বিটিভির সরকারনিয়ন্ত্রিত সংবাদ দীর্ঘদিন ধরে মধ্যবিত্তকে সংবাদ-বুভুক্ষু করে রেখেছিল। তবে সরকারগুলো মুদ্রণমাধ্যমকে স্বাধীন রেখে দিলেও, টেলিভিশন চ্যানেলগুলোকে এখনও নজরদারির মধ্যে রেখেছে। রাজনৈতিক বিবেচনায় বন্ধ করে দেয়া হয়েছে ইটিভি, সিএসবি ও চ্যানেল ওয়ানকে। যারা টিকে আছে, তাদের সংবাদপরিবেশনে তাই কোনো ধার বা বলিষ্ঠতা লক্ষ করা যায়না।

এফ এম চ্যানেল আরেকটি প্রপঞ্চ হিসেবে শূন্য দশকে হাজির হয়েছে। চারটি এফএম চ্যানেল এই মুহূর্তে চালু রয়েছে। এফ এম রেডিও মূলত পপ সঙ্গীতনির্ভর, এদের উদ্দিষ্ট জনগোষ্ঠী তরুণরা, এবং সেইসব তরুণ যারা ইতোমধ্যে কর্পোরেট সংস্কৃতির অধিভুক্ত বা ঐ সংস্কৃতিতে নিজেকে নিযুক্ত করতে উন্মুখ রয়েছে। ফলে খানিক ইংরেজির মিশেলে এবং ইংরেজি-ঘেঁষা বাংলা উচ্চারণে যে-চ্যানেলগুলো চলছে তাতে রয়েছে ঘণ্টাপ্রতি খবর, আছে ঢাকা শহরের ট্রাফিক আপডেট, আছে শেয়ার বাজারের আপডেট। অল্প কিছু টকশো বা সাক্ষাৎকার বাদে বাকিটা মিউজিক। এফএম চ্যানেলগুলোর জন্মই কর্পোরেট-সংস্কৃতির আওতায়। অন্য মাধ্যমগুলো এক দশক ধরে একটি কর্পোরেট-সংস্কৃতি সৃষ্টির যে-চেষ্টা চালিয়েছে, এফএম চ্যানেলগুলো সেই সংস্কৃতির ওপর দাঁড়িয়েই ২৪ ঘণ্টা অনুষ্ঠান চালিয়ে যাচ্ছে।

এই কর্পোরেটারয়ণের বিপরীতে চালু হতে যাচ্ছে কমিউনিটি রেডিও। কমিউনিটির মানুষদের উন্নয়নে, উন্নয়ন যোগাযোগের কাজ করবে এই কমিউনিটি রেডিও। তবে এর মালিকানা বা প্রচার স্বত্ব কেবল এনজিওগুলোই পেতে যাচ্ছে। ফলে সম্ভাবনাময় ও বিকল্প এই মাধ্যমটি বিদ্যমান উন্নয়ন ডিসকোর্সের বাইরে এসে কমিউনিটিতে কতটুকু অবদান রাখতে পারবে, সে-সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে। এনজিও উদ্ভাবিত এবং প্রথম আলো-ডেইলি স্টার সমর্থিত তথ্য অধিকার আইনের প্রচলনও শূন্য দশকের শেষের একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। ভারতে তথ্য অধিকার আইন চেয়েছে কমিউনিটির মানুষ, কিন্তু বাংলাদেশে এটি চেয়েছে বিদেশি ফান্ডপ্রাপ্ত এনজিওগোষ্ঠী, যারা কমিউনিটির উন্নয়নকল্পে কাজ করে থাকে। এরপরও বলা যায় কমিউনিটি রেডিও ও তথ্য অধিকার আইন এই সময়ের দুটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা।

আগামী দশ বছর পর রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের বয়স অর্ধশত পূর্ণ হবে। বিগত দেড় দশকে বাংলাদেশের মিডিয়া খাতে বিরাট পরিবর্তন এসেছে। তাই আগামী দশ বছরে কী পরিবর্তন আসবে, তার পূর্বাভাস দেয়া বেশ কঠিন। তবে এটুকু বলা যায়, বিগত দশকের মতো নাটকীয় পরিবর্তন আসবে না। এই মুহূর্তে বাংলাদেশের গণমাধ্যম পরিস্থিতি পৃথিবীর উন্নত অনেক দেশ থেকেই আলাদা। পৃথিবীর নানা প্রান্তে যেক্ষেত্রে সাইবারপরিসরের কারণে সংবাদপত্র বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, বাংলাদেশে এখনও নতুন নতুন সংবাদপত্র প্রকাশিত হচ্ছে। কারণ বাংলাদেশের অর্থনীতিও এখন সম্প্রসারণশীল। আর উন্নত দেশগুলোর তুলনায় ইন্টারনেটের এদেশে ব্যবহার এখনও অনেক কম। ফলে শুধু টিভি চ্যানেল বা এফ এম চ্যানেলই নয়, এদেশে এমনকি মুদ্রণ মাধ্যমের পরিধি এখনও বিস্তৃত হয়ে চলেছে। বলা দরকার, এখনও এদেশে সবচেয়ে প্রভাবশালী মুদ্রণ মাধ্যমই।

তবুও আগামী এক দশকে যে পরিবর্তন আসবে, তা বিগত এক দশকের মতো পালাবদলের হবেনা। ইতোমধ্যে অনুমতিপ্রাপ্ত চ্যানেলগুলো যোগ দিলে বাংলাদেশে টিভি চ্যানেলের সংখ্যা হবে প্রায় ২০টি। যেহেতু বিজ্ঞাপনের বাজার এতগুলো চ্যানেলকে সমর্থন দিতে পারে না, তাই কিছু চ্যানেল হয় বন্ধ হয়ে যাবে বা আদৌ আত্মপ্রকাশ করবে না। তবে আরও কয়েকটি এফএম চ্যানেল হয়তো আগামী দশ বছরে চালু হবে। আগামী দশ বছরে নতুন আরও চার-পাঁচটি দৈনিক চালু হতে পারে। তবে আগামী এক দশকে গণমাধ্যম পরিস্থিতি বেশ সংহত অবস্থায় চলে আসবে। দশ বছরের মধ্যে সম্প্রসারণশীল গণমাধ্যম এক জায়গায় থিতু হবে এবং মুখোমুখি হবে নতুন চ্যালেঞ্জের। এই চ্যালেঞ্জ আসবে সাইবারপরিসর থেকে। অধিক পরিমাণ মানুষ ওয়েবে যুক্ত হবেন, এবং এরা হবেন সক্রিয় নেটিজেন। বিগত পাঁচ বছরে একটি বাংলা ব্লগ কমিউনিটি ইতোমধ্যেই গড়ে উঠেছে যারা সদস্য সংখ্যা প্রায় দুই লক্ষ। সোশ্যাল নেটওয়ার্ক ফেসবুকেও যুক্ত আছেন প্রায় দশ লক্ষ মানুষ। এদের হাত দিয়েই শুরু হতে যাচ্ছে অপেশাদার কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সিটিজেন জার্নালিজম। এরাই সনাতন ও মূলধারার সাংবাদিকতাকে হুমকির মুখে ফেলে দিতে পারে। বাধ্য হয়ে সনাতন মাধ্যম ওয়েবে তাদের উপস্থিতি নিশ্চিত করবে। কিন্তু যেহেতু তারা সমাজের অপরাপর ক্ষমতাধর শ্রেণীর সঙ্গে একটি মিথোজীবীমূলক সম্পর্কে লিপ্ত থাকে, তাই স্বাধীন সিটিজেন সাংবাদিকদের স্বতঃস্ফূর্ততা তাদের মধ্যে অনুপস্থিত থাকবে। ফলে ওয়েবে পেশাদার ও অপেশাদার বা বিকল্প সাংবাদিকতার একটি দ্বন্দ্বের দেখা পেতে পারি আমরা, আগামী দশকে।


নোট: ইত্তেফাক পত্রিকার অনুরোধে এই নিবন্ধটি লেখা। নইলে ৪০ বছরের ইতিহাস ১৫০০ শব্দে লেখা এক ধরনের স্পর্ধা। ইত্তেফাক কিছু কেটেছেটে লেখাটি ছাপে: Click This Link । এখানে মূল লেখাটি দেয়া হলো।




]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/fahmidulhaqblog/29300439 http://www.somewhereinblog.net/blog/fahmidulhaqblog/29300439 2011-01-01 23:14:52
একটি বিক্ষোভ-সমাবেশ ও জনবিরোধী ব্রিটিশ মিডিয়া
গ্যারেথ, সহকর্মী শামীম রেজা আর আমি সেন্ট্রাল লন্ডনে একটা মিটিং সেরে বেলা সাড়ে তিনটার দিকে ঘটনাস্থলে দেখি বিশাল সমাবেশ। বামে ট্রাফালগার স্কোয়ার থেকে ঢাক-ঢোল পেটানোর শব্দ আসছে, যদিও সেই শব্দের সাথে সাথে জনস্রোত বিগ বেন হয়ে পার্লামেন্ট হাউসের দিকে চলেছে। শিক্ষার্থীদের হাতে ফেস্টুন-ব্যানার, তাতে লেখা আছে -- এডুকেশন ইজ রাইট, নট এ কমোডিটি। একই ধরনের স্লোগান আমাদের বাম সংগঠনের শিক্ষার্থীদের মুখে বাংলায় শোনা যায়। তবে মিলের পাশাপাশি ইংরেজি ভাষা ও সংস্কৃতিগত পার্থক্যও লক্ষ করা গেল, তাদের প্রতিবাদের ভাষায়। এক ফেস্টুনে লেখা আছে ‘কাটস আর নাট’। কাট বলতে এখানে শিক্ষাখাতে ভর্তুকি কর্তনের কথা বলা হচ্ছে। আর কয়েকজন ব্যানার ধরে আছে ‘ফাক দ্য ফিস’। ছেলেমেয়েরা হইচই করছে। বেশ শান্তিপূর্ণ এবং উৎসব উৎসব ভাব। কিছু পুলিশকে দেখা গেল, দূরে দাঁড়িয়ে সবকিছু সতর্কভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। জনস্রোতের দিকে এবং বিপরীতে বেশ কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করার পর গ্যারেথ জানালেন, তার কাজ আছে, যেতে চান। গ্যারেথকে বিদায় দিয়ে আমরা চললাম ট্রাফালগার স্কোয়ারের দিকে। সেখান থেকে বাকিংহাম প্যালেস দেখাতে আমাকে সঙ্গে নিয়ে চললেন শামীম রেজা। তিনি প্রায় এক দশক আগে সোয়াসে (স্কুল অব অরিয়েন্টাল এ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজ) পড়েছেন, ফলে লন্ডন শহর তার বেশ খানিকটা চেনা। আমি এই প্রথম।

রাতে হোটেলে ফিরে বিবিসিতে চোখ রাখতেই দেখি প্রধান শিরোনাম শিক্ষার্থীদের ডেমোনেস্ট্রশন। কিন্তু ফুটেজে যা দেখানো হলো তা আমরা সমাবেশে থেকে দেখি নি। শিক্ষার্থীরা ক্ষমতাসীন দল কনজারভেটিভ পার্টির সদর দফতরের জানালার কাঁচ ভাঙছে। পুরো সংবাদটা পরিবেশন করা হলো শিক্ষার্থীদের সহিংসতা নিয়ে এবং আড়ালে চলে গেল তাদের ন্যায্য দাবিতে আয়োজিত প্রতিবাদসমাবেশের বিষয়টি। বিস্ময়ের বাকি ছিল অনেক। পরদিন সংবাদপত্র দেখে আমি মোটামুটি হতভম্ব হয়ে গেলাম। মিডিয়ার মিসরেপ্রিজেন্টেশন কত ভয়াবহ হতে পারে, এই নিবন্ধে তার নমুনাই উত্থাপন করা হবে, শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ-সমাবেশের মিডিয়া কাভারেজকে কেস হিসেবে ধরে। তার আগে এই ফি বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটটা একটা বলে নেয়া যাক।

ব্রিটেনে পড়াশোনার খরচ বরাবরই বেশি। বিদেশীদের জন্য এই খরচটা আবার বেড়ে দু-তিন গুণ হয়ে যায়। কল্যাণমূলক রাষ্ট্র হিসেবে একসময় ব্রিটেনে স্থানীয়দের জন্য ন্যূনতম টিউশন ফি ছিল এবং স্থানীয়-বিদেশীদের ফির পার্থক্য ছিলনা। পরে ফি যুক্ত হয়েছে এবং খুব সম্প্রতি বৃদ্ধি করা হয়েছে। শেষপর্যন্ত এই ফি ছিল প্রায় তিন হাজার পাউন্ড। কিন্তু সম্প্রতি এই ফি বাড়িয়ে ৯ হাজার পাউন্ড করা হয়েছে। আর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ব্যাপকভাবে বরাদ্দ কমানো হয়েছে। সাম্প্রতিক বিক্ষোভের কারণ হলো এই ফি-বৃদ্ধি ও বরাদ্দ-কর্তন। এর প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতেও। কারণ বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর বহু শিক্ষক-গবেষক-শিক্ষার্থী উচ্চতর ডিগ্রির জন্য যুক্তরাজ্যে যান। বাংলাদেশী এক পিএইচডি-ছাত্র জানালেন তিনি এখন বার্ষিক ১২ হাজার পাউন্ড দিচ্ছেন, টিউশন ফি হিসেবে। ২০১২ থেকে তাকে দিতে হবে ১৬ হাজার পাউন্ড। ক্ষেত্রবিশেষে (যেমন বিজ্ঞান বা মেডিকেল) এটা ২০ হাজার পাউন্ড হবে যা বছরে বাংলাদেশী টাকার ২০-২২ লাখ টাকার সমপরিমাণ হবে। চার বছরের পিএইচডি শেষ করতে একজন গবেষকের প্রয়োজন হবে এক কোটি টাকারও বেশি। এই পরিমাণ টাকা দিয়ে উচ্চশিক্ষায় আসতে পারেন এমন বাংলাদেশী নাগরিক নাই বললেই চলে। ব্রিটেনে উচ্চশিক্ষা বাংলাদেশীদের জন্য তাই অসম্ভব হতে চলেছে। চীন, ব্রাজিল বা আরব দেশগুলোর নাগরিকেরা এরপরও পড়তে পারবেন, কারণ তাদের হাতে আছে নগদ অর্থ। কমনওয়েলথ বা শিভেনিং স্কলারশিপ যারা পাবেন, তাদের কথা ভিন্ন। কিন্তু এই স্কলারশিপগুলোর সংখ্যা এত যৎসামান্য যে তাকে এই আলোচনার বাইরে রাখাই ভালো।

ব্রিটেনের বর্তমান কোয়ালিশন সরকারের অন্যতম অংশীদার লিবারেল ডেমোক্রেট বিগত নির্বাচনে ভালো করার অন্যতম কারণ ছিল, ক্ষমতায় গেলে টিউশন ফি আর বৃদ্ধি না করার ঘোষণা দিয়ে তরুণ ভোটারদের আকৃষ্ট করেছিল। অথচ তাদের বৃহৎ অংশীদার কনজারভেটিভ পার্টি শিক্ষা উন্নয়নের প্রধান হিসেবে নিয়োগ দিল পেট্রোলিয়াম কোম্পানির সাবেক প্রধান লর্ড ব্রাউনকে। আর এরপর শুরু হলো ফি-বৃদ্ধি ও বরাদ্দকর্তনের উদ্যোগ। সঙ্কটে নিপতিত ব্রিটিশ অর্থনীতিকে উদ্ধার করতে, শুধু শিক্ষাখাতই নয়, সামাজিক সেবার অন্যান্য খাতেও চলছে কর্তন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এই কর্তনের খরচ মেটানো হবে বর্ধিত ফি দিয়ে।

বিক্ষোভ সমাবেশের পরেরদিন কয়েকটি পত্রিকা দেখলাম। পত্রিকাগুলো হলো ডেইলি মেইল, ডেইলি মিরর, দি সান, লন্ডন ইভনিং স্ট্যান্ডার্ড, দ্যা গার্ডিয়ান ও দ্যা ডেইলি টেলিগ্রাফ। লন্ডনের পত্রিকাগুলো ‘হেভিস’ এবং ‘ট্যাবলয়েডস’ এই দুই ভাগে ভাগ করা হয়। দ্যা গার্ডিয়ান ও দ্যা টেলিগ্রাফ পড়ে ‘হেভিস’ বর্গে, অর্থাৎ এরা একটু সিরিয়াস। আর ট্যাবলয়েডগুলো হলো নন-সিরিয়াস। কিন্তু ট্যাবলয়েডগুলো যথেষ্টই জনপ্রিয়। গার্ডিয়ান ও টেলিগ্রাফের কাভারেজ খানিকটা সংহত থাকলেও, ট্যাবলয়েডগুলোর কাভারেজ ছিল যাচ্ছেতাই। সবগুলো পত্রিকাতেই বড়ো করে ছাপানো হয়েছে সহিংসতার ছবি -- বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা টোরি পার্টির হেডকোয়ার্টারের কাঁচের দেয়াল ভাঙছে। সংবাদগুলোর মূল ফোকাস শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের কারণের প্রতি না ফেলে তাদের সহিংসতার ওপরে ফেলা হয়েছে। মৃদু দোষারোপ করা হয়েছে পুলিশ বিভাগকে, এই সহিংসতাকে ঠিকমতো মোকাবেলা করতে না পারায়। যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে ছাপা হয়েছে আহত পুলিশ সদস্যদের ছবি ও খবর (আহত ১৪ জনের মধ্যে ৭ জন পুলিশ ছিল। বাকিদের কথা পত্রিকায় উল্লেখ নেই)। আর সবচেয়ে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে ঐ জায়গায় যে, শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ সমাবেশ গুটিকয়েক বামপন্থী (লেফটিস) ও নৈরাজ্যবাদীর (অ্যানার্কিস্টস) কারণে বানচাল হয়ে গেছে। বামপন্থী ও অ্যানার্কিস্টদের এমনভাবে চিত্রিত করা হয়েছে যেন তারা বিপথগামী ও নিষিদ্ধ। পত্রিকাগুলো খুব সুচারুভাবে চেষ্টা করেছে শিক্ষার্থীদের নাম-পরিচয় ও ছবি ছাপার, যেন তাদের পুলিশ সহজেই শনাক্ত করতে পারে। কাভারেজের ধরন দেখে মনে হয় তারা সমাবেশে যোগ দেয়া ৫০ হাজার শিক্ষার্থীদের, এবং ব্রিটেনের ইতিহাসে চতুর্থ বৃহত্তম জনসমাবেশের দাবির চাইতে গুটিকয় ‘লেফটিস’-এর তৎপরতা নিয়ে বেশি চিন্তিত। ফলত এই ঘটনায় পত্রিকাগুলোকে সরকারের মুখপাত্র মনে হয়েছে। অথচ টোরি ভবনের ছাদে উঠে সেই লেফটিসরা উল্লসিত সমর্থকদের এসএমএস পাঠালো: “আমরা সব ধরনের কর্তনের বিপক্ষে এবং গরিব, বয়ষ্ক, পঙ্গু এবং শ্রমজীবী মানুষের সঙ্গে আছি। আমরা শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণের বিরুদ্ধে। আমরা টোরি হেডকোয়ার্টারের ছাদ দখল করে এটাই দেখাতে চাই যে আমরা গরিবকে আক্রমণ করার ও ধনীদের সাহায্য করার টোরি নীতির বিরুদ্ধে। আমাদের আন্দোলন সবে শুরু হলো” (দি গার্ডিয়ান, ১১ নভেম্বর, ২০১০)। আন্দেলনের পরে দ্বিতীয় দিন পর্যন্ত ৫০ জন শিক্ষার্থীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বলাবাহুল্য সিসিটিভি ক্যামেরা ও পত্রিকার ছবি পুলিশকে এব্যাপারে যথেষ্ট সাহায্য করেছে।

১১ নভেম্বর তারিখে দি সান-এর কাভারেজ বিশ্লেষণ করলেই চিত্রটি স্পষ্ট হবে। বলা দরকার, রুপার্ট মারডকের নিউজ কর্প গ্র“পের অঙ্গসংগঠন নিউজ ইন্টারন্যাশনাল থেকে প্রকাশিত দি সান হলো যুক্তরাজ্যের সর্বোচ্চ সার্কুলেশনের পত্রিকা। উইকিপিডিয়ার দেয়া তথ্য অনুসারে অক্টোবর, ২০১০ সালে পত্রিকাটির গড় সার্কুলেশন ছিল ২৯,০৪,১৮০। প্রথম পাতায় তাদের শিরোনাম ছিল “ব্রেইনলেস: টোরি হেডকোয়ার্টার ট্র্যাশড ইন রায়ট”। ‘ব্রেইনলেস’ শব্দটি প্রায় দুই ইঞ্চিতে ছাপা হয়েছে। শব্দটি লেখা হয়েছে পৃষ্ঠাব্যাপী স্থিরচিত্রের ওপরে, যেখানে দেখা যাচ্ছে চোখ-মুখ ঢাকা এক ছাত্র টোরি-ভবনের কাঁচের দেয়াল ভাংছে। বক্স আইটেম হিসেবে একজন আহত-ক্রন্দরত-রক্তাক্ত নারী-পুলিশের ছবি ছাপা হয়েছে এবং ক্যাপশন/শিরোনাম লেখা হয়েছে: “ব্লিডিং ... কপ ইয়েস্টারডে”। এই ট্রিটমেন্ট এই অর্থ নির্মাণ করে যে শিক্ষার্থীরা সহিংস, অপরাধী এবং তাদের অপরাধের মাত্রা এমন উচ্চ যে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারীকেও তা আক্রান্ত করে। চতুর্থ ও পঞ্চম পাতার পুরোটা জুড়েই ছবি ও সংবাদ, বিক্ষোভের। বামে ওপরে রয়েছে টোরি-ভবনের ছাদে উঠে-পড়া ছাত্রদের উল্লাসের ছবি। এরপরই আছে পুলিশ-শিক্ষার্থীদের মুখোমুখি সংঘাতের ছবি। এই দুই ছবির ডানে রয়েছে নানা ধ্বংসযজ্ঞের ছবি। ডানে পুনরায় আরেকটি বড়ো ছবি যেখানে একজন ‘ক্যাপ-পরিহিত উন্মাদ’ চেয়ার দিয়ে কাঁচের দেয়াল ভাংছে। আরও ডানে ছোট ছোট চারটি ছবি: ১. শিক্ষার্থীরা ভাঙ্গা দেয়ালের ওপর দিয়ে ভেতরে ঢুকছে (পত্রিকার ভাষায় ‘মব রুল’) ২. একজন পুলিশের মুখ, ঠোঁটের কোণ দিয়ে রক্ত ঝরছে (ক্যাপশন: ব্লডিয়েড ... ইনজুরড কপ) ৩. একজন নারী পুলিশের মুখ (ক্যাপশন: ভিকটিম ... হার্ট ফিমেল কপ) ৪. আগুনের গোলা ছুঁড়ে মারার যন্ত্র হাতে একজন ছাত্র, ছাদে দাঁড়িয়ে। এখানেও দেখা যাচ্ছে ‘অপরাধী শিক্ষার্থী-আক্রান্ত পুলিশ’ ট্রিটমেন্ট। তিনজনের সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়েছে একই পাতায়: ১. ন্যাশনাল স্টুডেন্ট ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট এই সহিংসতার নিন্দা জানিয়েছেন ২. সান-এর একজন ফটোগ্রাফার দাঙ্গার প্রত্যক্ষদর্শী-বর্ণনা দিচ্ছেন ৩. পুলিশ প্রধান বলছেন ‘আমি বিব্রত’। ঘটনার ভয়াবহতা তুলে ধরার জন্য রিপোর্টে বলা হয়েছে টোরি চেয়ারম্যানসহ প্রায় ৮০ জন স্টাফ ঐসময় ভবনে আটকা পড়েন, যাদের মধ্যে একজন গর্ভবতী নারীও ছিলেন।

সম্পাদকীয়তে এসে দি সান-এর অবস্থান আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সম্পাদকীয়র শিরোনাম: “ডে অব শেইম”। শুরুতেই বোল্ড করে লেখা: “অন্যদের মতোই শিক্ষার্থীদের সময় কঠিন”। বলা হচ্ছে: “কোনোই সন্দেহ নাই যে মুখোশধারী ভাড়াটে বামপন্থী বেকুবরাই দাঙ্গায় নেতৃত্ব দিচ্ছিল যারা শান্তিপূর্ণ মিছিলকে ছিনতাই করতে এসেছিল”। আবার বলা হচ্ছে -- “সহানুভূতিশীল হবার পরিবর্তে খেটে-খাওয়া জনগণ প্রশ্ন তুলবে: তারা যদি এরকম আচরণ করে করদাতারা কেন তাদের সমর্থন করবে?” আরও বলা হচ্ছে: “ছাদ থেকে যেভাবে মিসাইল ছুঁড়ে মারা হয়েছে তাতে সাহসী মেট্রোপলিটন পুলিশ অফিসাররা মারা যেতে পারতো।” পরামর্শ দিতেও সম্পাদকীয় ভুল করছে না: “যদি প্রমাণিত হয় যে তারা শিক্ষার্থী, তবে তাদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা উচিত”। সরকার অবশ্য বলেছে যে কলেজ-কর্তৃপক্ষ নয়, আদালতই এদের শাস্তি নির্ধারণ করবে। বোঝা যায়, গ্রেফতার ছাড়াও বহুল মামলা-মোকদ্দমায় জড়িয়ে পড়ছে গ্রেফতারকৃতরা।

দি সান-এ প্রকাশিত এইসব বাক্য এরকম একটি অর্থ নির্মাণ করে যে দাঙ্গাকারীরা ‘ভাড়াটে বামপন্থী বেকুব’, কর্মরত পুলিশরা ‘সাহসী’ এবং ঐ বেকুবরা যদি শিক্ষার্থীও হয় তবে তাদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের করে দেয়া দরকার। বোঝা যায় সোভিয়েত সমাজতন্ত্র পতনের পরও পুঁজিতান্ত্রিক বিশ্বের ‘লালভীতি’ আজও যায়নি। তাই তাদের নানা ফ্রেমিং ও অপবাদ দিয়ে দমনের চেষ্টা চলছেই, যার পুরোভাগে রয়েছে পুঁজিতান্ত্রিক মেইনস্ট্রিম মিডিয়া। ঐ ‘বিপথগামী’রা আজও সাধারণ মানুষের স্বার্থে প্রতিরোধ-সমাবেশ আয়োজনে অবদান রেখে চলেছে। অন্যদিকে সহিংসতা দমনে ব্যর্থ হবার পরও দি সান কর্মরত অফিসারদের বলছে ‘সাহসী’।

দি সান সবচেয়ে মারাত্মক কাজটি করলো পেইজ থ্রি-তে এসে। সেখানে বরাবরের মতো নগ্ন তরুণীর ছবি ছাপা হয়েছে। ২০ বছর-বয়েসী এলি নামের মেয়েটির মুখ দিয়ে তারা অমোঘ বাণী উচ্চারণ করিয়ে ছাড়লো: “বৃহৎ সামাজিক-রাজনৈতিক সমস্যার বিরুদ্ধে সহিংসভাবে প্রতিবাদ জানানোয় যে, অর্থনৈতিক অস্থিরতার সময়ে, আর্থিক প্রবৃদ্ধি ও দারিদ্র্য বিমোচনের সম্ভাবনাকে কমিয়ে ফেলে, তা তারা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে।”


তথ্যসূত্র: Click This Link

২৩ নভেম্বর, ২০১০।

প্রথম প্রকাশ: মিডিয়াওয়াচ, ২৮ নভেম্বর, ২০১০।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/fahmidulhaqblog/29281103 http://www.somewhereinblog.net/blog/fahmidulhaqblog/29281103 2010-11-30 21:58:22
রানওয়ে: সমকালীন বাংলাদেশের সংবেদনশীল চিত্রায়ণ
রুহুলের বাবা মধ্যপ্রাচ্যে গিয়েছে অভিবাসী শ্রমিক হিসেবে, মা একটি এনজিওর কাছ থেকে ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে গাভী কিনেছে, ছোট বোন ফাতেমা গার্মেন্টস শ্রমিক। পরিবারে আর আছে বৃদ্ধ দাদা। রুহুল নিজে ঝরে-পড়া মাদ্রাসার ছাত্র, বেকার অথচ নিরুদ্বিগ্ন। মাঝে মাঝে মামার সাইবার ক্যাফেতে গিয়ে টুকটাক কম্পিউটার-ইন্টারনেট শেখে। বিস্ময়-যন্ত্রটিকে সে বাগে আনতে পারেনা, মামা বিরক্ত হয়। পাশে বসা এক তরুণ তাকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসে। এভাবে তরুণ আরিফের সঙ্গে রুহুলের বন্ধুত্ব হয়। শ্মশ্রূমণ্ডিত ও সুশ্রী-স্মার্ট আরিফের সঙ্গে ইসলামের সঠিক পথ কোনটা, তা নিয়ে আলাপ করতে করতে রুহুল আরিফদের জঙ্গি কার্যক্রমের সঙ্গে পরিচিত হয়। আফগানিস্তান-কাশ্মির যুদ্ধে অংশ নেয়া মুজাহিদ ‘উর্দু ভাই’ তাদের সামরিক প্রশিক্ষণ দেন।

জঙ্গিবাদের পাল্লায় পড়ে রুহুল বদলে যেতে থাকে। বোন ফাতেমার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে চায়, টেলিভিশনে সংবাদ ছাড়া আর কিছু দেখা যাবে না। বোনের বান্ধবী শিউলীকে সে পছন্দ করতো, তার সঙ্গেও সে আড়ালে থেকে কথা বলে। মাকে নির্দেশ দেয় এনজিওর সুদের ব্যবসা থেকে সরে আসতে। ধার্মিক রুহুলের এই কট্টর রুহুলে পরিবর্তন পরিবারের সদস্যদের কেউই তেমন অনুমোদন করেনা। বরং পাল্টা প্রতিরোধের মুখোমুখি হয় ও তিরষ্কৃত হয়। ফলে রুহুল আরও ঘরবিমুখ হয়ে পড়ে।

ওদিকে আরিফরা সিনেমা হলে বোমা হামলা করে। জঙ্গিনেতা দাবি করে তাদের তৎপরতার কারণেই যাত্রা, মাজারের ওরশ-পালাগান বন্ধ হয়েছে। তিনি কোনো একটা এলাকা নিজেদের ‘মুক্তাঞ্চল’ ঘোষণা করে সেখানে শরিয়ত মোতাবেক প্রশাসনিক কার্যক্রম চালানোর ঘোষণা দেন। তবে তাদের ‘বাড়াবাড়ি’তে বিব্রত হয়ে সরকারের একজন ক্ষমতাধর ব্যক্তি জঙ্গিদের ডেকে বকাঝকা করেন -- এইরকম বাড়াবাড়ি করলে যে আর ‘প্রটেকশন’ দেয়া যাবেনা, সেকথা স্পষ্ট করে বলেন। বিচারকদের যেন কিছু না করা হয় তা আলাদা করে নির্দেশ দেন। জঙ্গিনেতাও কর্তাব্যক্তির বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেন যে, তারা মুখে ইসলামী জাতীয়তাবাদের কথা বলেন আর দাতাদের মন যুগিয়ে চলেন। দাতাদের ভয়ে একটাও শরিয়তী আইন পাশ করতে পারেননি।

কিন্তু বিচারকদের ওপর আদালত প্রাঙ্গনে একটি গাড়িবোমা হামলা হয় এবং ঐ হামলায় গুরুতরভাবে আহত হয় আরিফ। টেলিভিশনের পর্দায় ক্ষত-বিক্ষত আরিফকে দেখে জঙ্গিরা ভাবে, হাসপাতালে একটু সুস্থ হলেই, আরিফ সব বলে দিতে পারে। তাই তারা সেই রাতেই সটকে পড়ে। কিন্তু রুহুল সেখানেই থেকে যায়। বন্ধু আরিফের এই পরিণতি রুহুল মানতে পারে না। তার ভাবান্তর হয়। নিজ সত্তার সঙ্গে তর্ক হয়। সে বাড়ি ফিরে আসে। ঘুম থেকে উঠে বিকেলে ঘরের বাইরে এসে বসে। সোনারঙা রোদে সে জীবনের প্রবাহ দেখে -- খালে জেলে মাছ ধরছে, পানিতে এক ঝাঁক হাঁস ভাসছে, পিঁপড়ের সারি দলবেঁধে দৈনন্দিন কাজে চলেছে, ফড়িঙ-প্রজাপতি উড়ে বেড়াচ্ছে ঘাসে-গাছে। রুহুলের সবকিছু ভালো লাগে, সেই আগের জীবনকে নতুন করে ফিরে পায় সে। নবজন্ম লাভ করা রুহুলের মুখ দুধ দিয়ে ধুইয়ে দেয় রুহুলের মা।

সমকালীন বৃহত্তর ঘটনাবলীকে শিল্পে রূপায়ণ ঘটাতে গেলে এর সুবিধে এবং অসুবিধে দুটোই আছে। সুবিধা হলো ঘটনাবলীর টাটকা উপাদানগুলোর সমাবেশ ঘটানো সহজ, গবেষণার প্রয়োজন কমই পড়ে। আবার কল্পকাহিনী হবার পরেও তার একটা দালিলিক মূল্য থাকে। আর অসুবিধা হলো ঘটনার মধ্যে থাকার কারণে এর নির্মোহ মূল্যায়ন করা সম্ভব হয়না। কালিক নৈকট্য এক্ষেত্রে বিশ্বস্ত ন্যারেটিভের বাধা হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু শিল্পীরা সেসব তোয়াক্কা না করেই সমকালকে তাদের কর্মে ধারণ করেন, এই তাগিদ থেকে যে তার কর্ম মানবিক-সামাজিক অগ্রগতিতে তাৎক্ষণিক অবদান রাখবে। অথবা তার কাজটি হতে পারে কেবলই তার ভেতরটাকে তোলপাড় করে দেয়া প্রতিক্রিয়ার ব্যক্তিগত প্রকাশ মাত্র। শিল্প ও দর্শনের সর্বজনীন ও সর্বকালীন আবেদন রাখতে চায় চলচ্চিত্র। কিন্তু তার বাইরে এসে তা প্রায়ই গণমাধ্যম হিসেবে সমাজে ভূমিকা রাখতে চায়। সমকালীন সঙ্কটকে ধারণ করে রানওয়ে সেই ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে।

তবে ছবিতে যে-বিষয়গুলোকে তুলে আনা হয়েছে সেগুলো সাধারণত ‘স্পর্শকাতর’ বিষয় বলে বিবেচিত। গার্মেন্টসে শ্রমশোষণ ও শ্রমঅসন্তোষের কথা আছে, ফাতেমার বেতন দুই মাস বন্ধ ছিল। মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে মুসলিম ভাইদের দ্বারা বাংলাদেশী শ্রমিকদের নিষ্পেষণের কথা আছে। শক্তিমান এনজিওর ক্ষুদ্রঋণের উচ্চসুদের কিস্তি শোধের চাপাচাপির কথা আছে -- গরুর দুধ বেচে নয়, মা কিস্তি শোধ করে মেয়ের বেতন থেকে। টেলিকম কোম্পানির কলরেট নিয়ে ধাপ্পাবাজির কথা আছে। আর আছে মাদ্রাসার গরিব ছাত্র রুহুলের জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ার কথা। শেষোক্ত বিষয়টিই সবচেয়ে স্পর্শকাতর -- ইসলামের প্রকৃত পথ কোনটি, তা নিয়ে রুহুলের মতো সব মুসলমানই কমবেশি বিভ্রান্ত। বাঙালি মুসলমানদের বরাবরই তাড়িয়ে বেড়িয়েছে করেছে ঐ মৌলিক প্রশ্নটি, যে সে প্রথমত বাঙালি না মুসলমান? জটিলতার মাত্রা আরও বাড়িয়ে তুলেছে ৯/১১ ঘটনা, যার সূত্র ধরে, সন্ত্রাস দমনের নামে, আফগানিস্তান-ইরাকের মুসলমানদের ওপরে আগ্রাসন চালিয়েছ ইহুদি-খ্রিস্টান সমরপতিরা। বৈশ্বিক মুসলিম ভ্রাতৃত্ববোধ, সাম্রাজ্যবাদবিরোধিতা, ‘ক্ষতিকর’ পশ্চিমা সংস্কৃতি-বিরোধিতা আর ইসলামী জঙ্গিবাদ -- আজ সব একাকার হয়ে গেছে। সন্ত্রাসদমনের অভিযানকে আমরা দেখছি সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনরূপে যার নেপথ্যে রয়েছে স্থানীয় খনিজসম্পদকে করায়ত্ব করার অভিলাস। মুসলিম জঙ্গিবাদ তাই দমন হচ্ছে না, ডালাপালা মেলে নানা দিকে ছড়িয়ে পড়েছে। ২০০৫-০৬ সালে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের উত্থানের পেছনে এই আন্তর্জাতিক রাজনীতির একটা স্পষ্ট যোগ আছে, স্থানীয় রাজনীতির ঘোরপ্যঁচের সঙ্গে মিলে তার একটা স্থানীয় গ্রহণযোগ্যতাও তৈরী হয়। বঙ্গে ইসলামের যে নানা প্রকরণ, তার মধ্যকার এতদিনে যে স্পষ্ট সীমারেখা, আজ যেন অস্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

বঙ্গদেশে ঐতিহাসকভাবে আমরা ইসলামের তিনটি প্রকরণ দেখতে পাই -- সুফি ইসলাম, শাস্ত্রীয় ইসলাম ও রাজনৈতিক ইসলাম। ত্রয়োদশ শতকে তুর্কী বখতিয়ার খলজির অসিসহযোগে বঙ্গবিজয়ের আগেই ইরানি সুফি-সাধক-দরবেশরা এদেশে ইসলাম প্রচার করতে এসেছিলেন, এবং সফল হয়েছিলেন। প্রকৃত ইসলাম অদ্বৈতবাদে বিশ্বাসী এবং এখানে খোদা ও বান্দার সম্পর্ক প্রভু ও দাসের। কিন্তু সুফিরা দ্বৈতবাদে বিশ্বাস করে যেখানে খোদা ও বান্দার সম্পর্ক ভালোবাসার। সুফিসাধনার একটি পর্যায় হলো ‘ফানা’, যেখানে খোদা ও বান্দা লীন হয়ে যায়। বঙ্গে এই সুফি ইসলামই জনপ্রিয় হয়, মুসলিম শাসকদের পাশাপাশি পীর-দরবেশরা সমাজে যথেষ্ট প্রভাবশালী ছিলেন। কিন্তু ঊনবিংশ শতাব্দিতে সর্বভারতে ওয়াহাবী এবং বঙ্গে ফরায়েজী এবং তৎসদৃশ কিছু ইসলামী সংস্কার আন্দোলনের মাধ্যমে প্রকৃত আরব-ইসলাম মুসলমান সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়। কোরআন-হাদিসভিত্তিক শাস্ত্রীয় ইসলাম সর্বসাধারণের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। আরব ইসলামের দাপটে সুফি ইসলাম কোণঠাসা হয়ে পড়ে। ব্রিটিশ ভারতের রাজনৈতিক-সামাজিক পরিস্থিতি, ব্রিটিশ সরকারের নানা নীতি, প্রাধান্যশীল হিন্দুত্ববাদ ইত্যাদি কারণে বিংশ শতাব্দির প্রথমভাগে মুসলিম লীগের মাধ্যমে জন্ম নেয় রাজনৈতিক ইসলামের। আধুনিক বাংলাদেশে আমরা রাজনৈতিক ইসলামের প্রতিনিধি হিসেবে জামাত-ই-ইসলামীর মতো দলকে দেখতে পাচ্ছি। ৯/১১-এর পরে আফগানিস্তান-ইরাকে আগ্রাসনের পরে, সাম্রাজ্যবাদবিরোধিতায় প্রাণিত হয়ে, জেএমবি, হরকাতুল জিহাদসহ আরও অনেক ছোট ছোট দল আত্মপ্রকাশ করে যারা জিহাদের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে বাংলাদেশে ইসলামী শরিয়া আইন বা শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ শুরু করে। এরাই জঙ্গি নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। সুফি ইসলামের অনুসারীরা মাজারভিত্তিক পীর-মুর্শিদ-মুরিদ সম্পর্ক ও তার চর্চার মাধ্যমে নিজিদের ব্যাপৃত রাখে, বাউলমতের মধ্যেও সুফিবাদের বহুল প্রভাব রয়েছে। আর সমাজের সাধারণ ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের মধ্যে আমরা শাস্ত্রীয় ইসলামের অনুসারীদের সহজেই খুঁজে পাবো। ঐতিহাসিক নানা ঘটনাক্রমের পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, এই তিন ধরনের ইসলাম-অনুসারীদের মধ্যেই ভাবনা ও কর্মপরিধিতে স্পষ্ট পার্থক্য এতদিন ছিল। তারেক মাসুদের অপর ছবি মাটির ময়নায় আমরা এই তিন ইসলামের অনুসারীদের খুঁজে পাই -- বড়ো হুজুর ছিলেন জিহাদী বা রাজনৈতিক ইসলামের অনুসারী, ইব্রাহিম হুজুর ছিলেন সুফি ইসলামের অনুসারী আর কাজী ছিলেন শাস্ত্রীয় ইসলামের অনুসারী। ঐতিহাসিকভাবে সমাজে সুফি ও রাজনৈতিক ইসলাম পরস্পরবিরোধী অবস্থানে থেকেছে। শরিয়া ও মারফতের বিতর্ক আমাদের চেনা। মাটির ময়নায়ও আমরা শরিয়া ও মারফতের বিতর্ক দেখেছি এবং সেখানে মারফত বা সুফি ইসলামকে জয়লাভ করতে দেখেছি।

তবে রাজনৈতিক ইসলাম যেহেতু জিহাদ বা বলপ্রয়োগের পক্ষপাতী, তাই সা¤প্রতিক জঙ্গি-কার্যক্রমে দেখেছি যে তারা সুফি ইসলামের কার্যকলাপ বলপ্রয়োগ করে বন্ধ করতে চেয়েছে। মাজারে বোমা হামলা হয়েছে, বাউলদের অনুষ্ঠান তারা বন্ধ করে দিয়েছে। দীর্ঘদিন যাত্রাপালা অনুষ্ঠিত হয়নি। তাদের কর্মপরিধির আওতায় অন্যান্য বিষয় ছিল উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিম বঙ্গে মাওবাদী সর্বহারাদের হত্যা করা, ইসলামমতে অপসংস্কৃতির আখড়া সিনেমা হলে হামলা করা এবং গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের প্রতীক বিচারব্যবস্থার ওপরে হামলা করা। রানওয়ে ছবিতে এইসব প্রসঙ্গই এসেছে, ভালোমতোই এসেছে। এখন এই জঙ্গি কার্যক্রমে কারা যুক্ত? জঙ্গিনেতা হিসেবে আছে আফগানিস্তান-কাশ্মিরে যুদ্ধ করা উর্দু ভাইয়ের মতো উগ্রবাদী, ধর্মান্ধ মানুষ। কিন্তু সেটাই সব নয়। আরিফের মতো স্মার্ট, প্রযুক্তি-দক্ষ তরুণরাও এতে যুক্ত আছে। কারণ বুদ্ধিদীপ্ত এই তরুণ একটি আদর্শ খুঁজতে খুঁজতে এখানে এসে ভীড়েছে। সমাজতন্ত্রের পতন ঘটেছে, সাম্রাজ্যবাদের থাবা আজ যখন মুসলমানদলনের সমার্থক হয়ে উঠেছে, তখন প্রতিরোধকারী প্যালেস্টাইন-যুবক, তালেবান-যোদ্ধা তার প্রেরণা হয়ে উঠছে। আর আছে রুহুলের মতো আধুনিক শিক্ষাবঞ্চিত, মাদ্রাসা থেকে ঝরে-পড়া, গরিব-বেকার তরুণরা। জঙ্গিবাদের তীব্র মতবাদ আদর্শবাদী এইসব তরুণ একটা আদর্শের সন্ধান দেয়, আবার অর্থেরও যোগান দেয়। জেহাদি জোশ তাদের বিবেচনাবোধ, বিচারবুদ্ধিকে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে শরিয়া আইন প্রতিষ্ঠার অন্ধত্বে আচ্ছন্ন করে। আরিফের জঙ্গিবাদে জড়ানো স্বেচ্ছাকৃত, রুহুলের জন্য ব্যাপারটা তা নয়। আরিফদের ফেরানো কঠিন। কিন্তু রুহুলদের ফেরানো সম্ভব। তারেক মাসুদ রানওয়েতে রুহুলকে ফিরিয়ে এনেছেন, হয়তো ইসলামের প্রকৃত পথের সন্ধানে ব্যাপৃত রুহুলকে তার আদর্শ থেকে পুরোপুরি ফেরানো যায়নি, কিন্তু রুহুল ফিরে এসেছে জীবনের কাছে। সে এটা অন্তঃত বুঝতে পেরেছে যে, ঐ পথ ইসলামের প্রকৃত পথ নয়। ঐ পথে আরিফের মতো বন্ধুকে বা তার নিজেকে সবসময়ই জীবন ও মৃত্যুর মাঝখানে নিরলম্ব ঝুলে থাকতে হয়।

আদর্শের বিচারে পরিচালক তার মতটি স্পষ্ট করেছেন যে রুহুলদের পথ ভ্রান্ত, এবং তাদের ফেরানো দরকার। আধুনিক গণতান্ত্রিক চেতনা, মানবতাবোধ ও বিদ্যমান আইনের বিচারে যুক্তিমনষ্ক যেকেউই তাই বলবে। কিন্তু রুহুল কী কী কারণে ঐ পথে আকৃষ্ট হয়েছে বা হতে পারে, তার সবধরনের প্রেক্ষাপট বা যুক্তির ডালপালাকে পরিচালক মেলতে দিয়েছেন। জিহাদের পক্ষপাতী হুজুর তাই বলছেন, কোরানে নামাজের জন্য আয়াত মাত্র ৮২টি, সেইখানে জিহাদের জন্য আছে ৬৮১টি। অর্থাৎ রুহুলের মতো কোরান-সুন্নাহরভক্ত একজন, যে দ্বীনের সহি রাস্তা খুঁজছে, তার জন্য জিহাদের শাস্ত্রীয় একটা অনুমোদন আছে। আবার রাজনৈতিক ইসলামের চর্চাকারী দল জামাত-ই-ইসলামের ওপরও আরিফরা তুষ্ট নয়। আরিফের সঙ্গে তার স্ত্রীর বিচ্ছেদ হয়েছে এই মতাদর্শিক কারণে, যে স্ত্রীর দল ঠিকই জানে ইসলাম এবং গণতন্ত্র পরস্পরবিরোধী, অথচ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সরকার পরিচালনায় অংশ নিয়ে তারা হিপোক্রিসি করছে। হুজুর বলেছেন, পশ্চিমা গণতন্ত্রের লেবাশ গায় দিয়া ইসলামী রাষ্ট্র কায়েমের মিথ্যা ওয়াদার মদ্যেও কোনো সুরাহা নাই। অতএব ঐ দলটির পথে ইসলামের মুক্তি হবে না। রাজনৈতিক ইসলমের অনুসারীদের মতভেদ, জঙ্গিবাদের প্রসারের একটা কারণ। তবে উদীয়মান জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোর বৃদ্ধির পেছনে প্রশাসনিক সমর্থনও ছিল। বিশেষত ২০০৫-০৬ সময়কালে জঙ্গিবাদীদের জন্য তৎকালীন সরকারের একটা অংশের সমর্থন ছিল। ছবিতে তাও স্পষ্ট করা হয়েছে। পাশাপাশি ঐ সমর্থন কতদূর পর্যন্ত থাকবে, তা নিয়ে সমর্থিত ও সমর্থনকারী পক্ষের মধ্যে টেনশনও ছিল। কারণ জঙ্গিরা ‘বাড়াবাড়ি’ করছিল, এবং বিচারকদের ওপরে হামলা হলে যে সমর্থন উঠিয়ে নেয়া হবে, সেই ধমকও সরকারপক্ষীয় নেতাকে জঙ্গিদের দিতে দেখা গেছে। ব্যক্তি-জীবনে রুহুলরা সুবিধাবঞ্চিত ও নিগৃহীত শ্রেণীতে বাস করে। শ্রেণীগত নিগৃহের কথাও পরোক্ষভাবে এসেছে। রিকশা-আরোহী রুহুল একবার দেখে যে, সামনের প্রাইভেট কারটি হঠাৎ ব্রেক কষায় রিকশাটি কারের গায়ে আঘাত করে। এতে কারমালিক রিকশাঅলাকে প্রহার করে। রুহুল তার প্রতিবাদ জানায়। ফলে সেও প্রহৃত হয়। এই শ্রেণীপ্রাধান্য রুহুলের মনে খানিক হলেও ভাবান্তর আনে -- যে রিকশাঅলার ত্রুটি না থাকার পরও মার খায়, আবার প্রতিবাদ করার কারণে সে নিজেও মার খায়। তাই রানওয়েতে উড়ে যাওয়া প্লেনের দিকে ছোট্ট ছেলেটা গুলতি ছুঁড়ে মারলে সে খুশি হয়। তার বোনও শ্রেণীবঞ্চনার শিকার। কিন্তু কেবল বঞ্চিত হওয়াই নয়, বঞ্চনার প্রতিবাদের কথাও এসেছে। ফাতেমা বলে, জুলম তাকলে মারামারি থাকপেই দাদা। আমাগো গার্মেন্টে বাংচুর হয় টিবিতে খালি হেইটেই দেহায়। কিন্তু আমাগো মাত্র পনেরশ টাহা ব্যাতন দিয়া মালিকরা যে কত লাক টাহা লাব করতেছে হেইডা তো দেহায় না। এইসব ক্ষুদ্র ব্যক্তিগত এবং বৃহৎ আদর্শগত কারণ রুহুলদের জঙ্গিবাদের দিকে ঠেলে দেয়। জঙ্গিবাদ তাকে ক্ষমতা ও শক্তি যোগায়। আরিফ এখানে একজন অনুঘটক মাত্র। আরিফের দেয়া তথ্যও রুহুলের জন্য একটা বাড়তি উসিলা যে, সারা দুনিয়ার কাফেররা মুসলমানদের নিয়ন্ত্রণ করতেছে। মুসলমানরা আজ তাদের সহি রাস্তা হারাইয়া পদে পদে হোঁচট খাইতেছে। এই সমসাময়িক আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে মুসলমানদের বিশেষ উপস্থিতি, এর সঙ্গে সাম্রাজ্যবাদের যে-যোগ, সেবিষয়গুলো ছবিতে আরও খানিকটা স্পষ্টভাবে উঠে আসতে পারতো।

ছবির শেষটা একটু বেশিমাত্রায় মিলনাত্মক, যা ছবির মূলসুরের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। এটা কেবল রুহুলের ফিরে আসার মধ্যেই সীমিত নয়। রুহুলের সাইবার-ক্যাফে ব্যবসায়ী মামাকে গোয়েন্দা পুলিশ গ্রেফতার করেছিল, এটা একটা সন্দেহমূলক অন্যায় গ্রেফতার ছিল। ছবির শেষের দিকে তার ছাড়া পাবার তথ্য জানা যায়। ফিরে আসার পরে রুহুল জানতে পারে তার গোপন-প্রেমিকা শিউলি একটা বাজে-বিয়ে এড়াতে মেসভাড়া করে স্বাধীন জীবনযাপন করছে। অপ্রয়োজনীয় ছিল রুহুলের বাবার ফিরে আসা। যে মধ্যপ্রাচ্যে গিয়ে বহুদিন কোনো খবর দেয়নি, যে প্রতারিত হয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে ইরাকে অভিবাসন করেছে, ঝলমলে-সুখীবেশে তার হঠাৎ ফেরাটা কাহিনীর সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ হয়নি। আর অতি-দীর্ঘ হয়েছে মায়ের, ফিরে-আসা রুহুলের মুখ, দুধ দিয়ে ধুয়ে দেবার দৃশ্যটি। রিচুয়ালটি খুব বেশি পরিচিতও নয়।

রানওয়ে ছবির সম্পদ হলো এর সিনেমাটোগ্রাফি। প্লেনগুলো ওঠানামা করার ক্ষেত্রে মিশুক মুনীরের ক্যামেরার মুন্সিয়ানা দর্শকের চোখে পড়বেই। রুহুলের ফিরে আসার পর উঠোনে বসে যখন সে চলমান জীবনকে দেখছে, তখন ক্যামেরার যে-ডিটেইলকে তুলে ধরে, তা অসাধারণ। ছবির প্রথম দিকে, প্লেনের ল্যান্ডিংয়ের সময় ঝুপড়ি ঘরের দেয়ালে দুর্বল তাকে রাখা এনামেলের গ্লাসের কেঁপে ওঠা এবং দাদার দৈনন্দিনের ঘুম ভেঙ্গে যাওয়ার শটটি সহজেই প্রমাণ করে যে এই ঘর, এই পরিবার, বিশাল রানওয়ের ও দানবীয় উড়োজাহাজগুলোর নিচে কত দুর্বল ও অসহায়। অন্তর্যাত্রা থেকে রানওয়ে -- ডিজিটাল ক্যামেরায় চলচ্চিত্রকে ধারণ করার ক্ষেত্রে একটা উল্লম্ফন দেখা গেল। অন্তর্যাত্রার ডিভি ক্যামের ফুটেজ ৩৫ মিমি- এ ট্রান্সফার করার পর ইমজের মান সন্তোষজনক পাওয়া যায়নি -- একটা বাড়তি লেয়ার পর্দায় ধরা পড়েছিল, ডেপথ অব ফিল্ডও সন্তোষজনক ছিলনা। কিন্তু উন্নত এইচডিভি ক্যামেরায় ইমেজের যে-মান পাওয়া গেল তার সঙ্গে ৩৫ মিমি ফরম্যাটের খুব বেশি পার্থক্য থাকেনি। সেদিন আর বেশি দূরে নেই যে, পরিচালকরা আর কখনোই ব্যয়বহুল ৩৫ মিমি ক্যামেরা ব্যবহার করবেন না।

মাটির ময়না বা অন্তর্যাত্রার তুলনায় এই ছবির আবহসংগীত সাধারণ ঠেকেছে। তবে ডলবি ডিজিটাল শব্দের ব্যবহার ছবিতে লাগসই মনে হয়েছে। বিশেষত প্লেনের ওঠানামার সময় শব্দের যে তীব্রতা ও গভীরতা প্রয়োজন, তা ভালোভাবেই পাওয়া গেছে। ক্যাথরিন মাসুদের সম্পাদনা বরাবরের মতোই ঠাসবুনোটে প্রাপ্ত -- কেবল দুধ দিয়ে মুখ ধোয়ানোর দীর্ঘ দৃশ্যটি ছাড়া। রুহুল একটি স্বপ্নদৃশ্যে দেখে যে ট্রলিতে করে গুরুতর আহত আরিফকে ঠেলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি হাসপাতালের করিডোরের ছাদের একটি লং টেক, স্লো মোশনে। লাইটগুলো একের পর এক দেখা যাচ্ছে, ফ্রেমে আলো-আঁধারির বৈপরীত্য খেলা করছে। ধরে নেয়া যায়, এটা আরিফের পয়েন্ট অব ভিউতে দেখানো হচ্ছে, যেহেতু সে শুয়ে আছে ট্রলিতে, তার পক্ষেই কেবল ছাদে লাইটের উপস্থিতি-অনুপস্থিতিকে বা জীবন-মৃত্যুর দোলাচলের সন্ধিক্ষণকে অনুভব করা সম্ভব। কিন্তু গুরুতর আহত অবস্থায়, আরিফকে আমরা অচেতনই দেখি। তার পয়েন্ট অব ভিউ থেকে এই টেকটি নিলে তা একটা ত্র“টিপূর্ণ সিদ্ধান্ত -- সিনেমাটোগ্রাফি ও সম্পাদনা উভয় বিবেচনাতেই।

অপেশাদার অভিনেতা নির্বাচনের কারণে রানওয়ের চরিত্রগুলো বিশ্বস্ত হয়ে উঠেছে। রুহুলের মামার চরিত্রে অভিনয় করেছেন জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়, আর দাদার চরিত্রে নাজমুল হুদা বাচ্চু। একটি দৃশ্যে আরিফের স্ত্রীর ভূমিকায় দেখা গেছে নুসরাত ইমরোজ তিশাকে। এই তিনজন ছাড়া, প্রধান চরিত্রে অভিনয়কারী বাকি সবই অচেনা মুখ। রুহুলের মার ভূমিকায় অভিনয় করেছেন রাবেয়া আক্তার মনি, যাকে এর আগে নাল পিরান টেলিছবিতে দেখা গিয়েছিল। আর মাটির ময়নার বড়ো হুজুর মোছলেমুদ্দিন অভিনয় করেছেন জঙ্গিনেতা উর্দু ভাইয়ের চরিত্রে। রুহুলের ভূমিকায় ফজলুল হক, আরিফের ভূমিকায় আলী আহসান, ফাতেমা ও শিউলির চরিত্রে নাসরিন আক্তার ও রিকিতা নন্দিনী শিমু -- এরা সবাই অপেশাদার এবং প্রথম বারের মতো চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। তারা বাস্তব জীবনে যে-শ্রেণীতে অবস্থান করেন, ঠিক সেরকম চরিত্রেই তারা অভিনয় করেছেন। আর পরিচালকের সাফল্য এখানেই যে তাদের কাছ থেকে যথাযথ অভিনয় বের করে নিয়ে এসেছেন। এদের মধ্যে সবচাইতে উজ্জ্বল ছিলেন আরিফের চরিত্র রূপদানকারী আলী আহসান।

আগেই বলেছি রানওয়ে সমকালের ছবি। এতটা সমকালীন ফিকশন ছবি বাংলাদেশে, সম্ভবত, আর নির্মিত হয়নি। সমকালীন বিষয়গুলোকে, বিশেষত জঙ্গিবাদকে বুঝতে এই ছবি সাহায্য করবে। কারণ জঙ্গিবাদের একতরফা নির্মাণ এখানে হয়নি, বরং জঙ্গিবাদী মানুষগুলোর সব যুক্তিকে এখানে প্রশ্রয় দেয়া হয়েছে, তারপর খণ্ডন করে বলা হয়েছে যে ঐ পথ অযৌক্তিক, আইন-অসিদ্ধ, মানবতাবিরোধী ও ভ্রান্ত। এই সংবেদনশীলতাই এই ছবির শক্তি। এই ছবির বহুল প্রচার দরকার, প্রথাগত কয়েকটি এলিট সিনেমা হলে যেমন এর মুক্তি হবে, অপ্রথাগত বা বিকল্প চ্যানেলেও সব ধরনের মানুষের কাছে এটা পৌঁছা দরকার। যাদের জঙ্গিবাদী হবার সম্ভাবনা নেই, যারা ধর্মীয় সংস্কারের দূরে অবস্থান করেন, ঢাকা শহরের কেবল সেই গুটিকয়েক সামাজিক-সাংস্কৃতিক এলিট মানুষই যদি কেবল এই ছবি দেখার সুযোগ পায়, তবে তা একটা পরিহাসের বিষয় হবে। কারণ, চলচ্চিত্র এখানে শিল্পমাধ্যমের চেয়ে গণমাধ্যমের ভূমিকায় অবতীর্ণ। তার মানে এই নয় যে, রানওয়ের শিল্পমূল্য নেই।

২২ অক্টোবর, ২০১০

প্রথম প্রকাশ: Click This Link]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/fahmidulhaqblog/29263720 http://www.somewhereinblog.net/blog/fahmidulhaqblog/29263720 2010-10-29 19:51:48
সাইবারপরিসরে, বিকল্প মাধ্যমের খোঁজে
এদের নিয়ন্ত্রণ করতে ব্রিটিশ সরকার কাগজের ওপর করারোপ করে, লাইসেন্সপ্রথা চালু করে, প্রকাশকদের হেনস্থা করে। কিন্তু এইসব পীড়ন র‌্যাডিকাল প্রেসকে দমাতে পারেনি, উল্টো তাদের জনপ্রিয়তা বেড়ে যায়। কিন্তু সরকার সংবাদপত্রের ওপর কর শিথিল করলে ও সংশ্লিষ্ট আইনকে উদার করলে বড়োলোকশ্রেণী নতুন উদ্যমে বড়ো বিনিয়োগ নিয়ে মূলধারার পত্রিকা চালু করে। তারা প্রকাশনা শিল্পের নতুন প্রযুক্তি নিয়ে হাজির হয়, যা উন্নত ছাপা নিশ্চিত করে। কিন্তু এইসব নতুন প্রযুক্তি ব্যবয়বহুল হওয়ায়, র‌্যাডিকাল প্রেস তাদের ছাপাকে উন্নত করতে সমর্থ হয়নি। নতুন প্রযুক্তিতে ছাপা পত্রিকার পাশে সেসব পত্রিকাকে নি®প্রভ দেখায়। বিজ্ঞাপন ও বাজার ব্যবস্থা র‌্যাডিকাল প্রেস বিলুপ্ত হয়ে যাবার পেছনে আরেকটি কারণ। র‌্যাডিকাল প্রেস ছিল সার্কুলেশননির্ভর, কিন্তু মূলধারার পত্রিকা ছিল বিজ্ঞাপননির্ভর। র‌্যাডিকাল প্রেসের পাঠকরা পণ্যক্রেতা ছিলনা। তাই অনেক সার্কুলেশন থাকার পরও এসব পত্রিকা ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যায়। আর কম সার্কুলেশন নিয়েও মূলধারার পত্রিকাগুলো বহাল তবিয়তে টিকে থাকে। ১৮৫৬ সালে একজন বিজ্ঞাপন কর্মকর্তা বলেন, কিছু পত্রিকা মাধ্যম হিসেবে খুবই দুর্বল কারণ তাদের পাঠকরা পণ্যক্রেতা নয়, তাদের ওপর অর্থব্যয় করা আর তা জলে ফেলে দেয়া একই কথা (হারম্যান ও চমস্কি উদ্ধৃত, ২০০২: ৯৩)। জেমস কারান ও জাঁ সেটান দেখিয়েছেন, রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ যা পারেনি বাজার সফলভাবেই সেই লক্ষ্য অর্জন করেছে (হারম্যান ও চমস্কি, ২০০২: ৮০)।

বিকল্প মাধ্যম হিসেবে বিশ্লেষকরা ১৯৬০-এর দশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পরিদৃষ্ট নিও জার্নালিজমের পত্রিকাগুলোর কথাও বলেন। তবে নিও জার্নালিজম যতটা না আধেয়তে, তার চাইতে বেশি সংবাদ উপস্থাপনে বিকল্প ছিল। সচরাচর ‘ষড়-ক’নির্ভর সংবাদ তারা পরিবেশন করতো না। বরং সংবাদ পরিবেশনে এক ধরনের নাটকীয়তা ছিল। কখনও গল্প আকারে, কখনও সংলাপ দিয়ে এক ধরনের পরিবেশনা তখন লক্ষ করা যেত। ভিলেজ ভয়েস পত্রিকা এধরনের সাংবাদিকতার মাধ্যমে পরিচিত হয়ে ওঠে। পরে অবশ্য মিডিয়া মোগল রুপার্ট মারডক পত্রিকাটিকে কিনে নেন।

র‌্যাডিকাল প্রেস বা নিও জার্নালিজম চর্চাকারী পত্রিকাগুলো ছাড়াও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন সময়ে নানান ধরনের বিকল্প মাধ্যমের আবির্ভাব ঘটেছে। লক্ষ করার বিষয় হলো বিকল্প মাধ্যমের ইতিহাস হলো টিকে না থাকার ইতিহাস। কিন্তু বিকল্প মাধ্যমের প্রয়োজনীয়তা বরাবরই অনুভূত হয়ে এসেছে। এর কারণ মূলধারার মাধ্যমগুলো জনস্বার্থের চাইতে বরাবরই মালিকস্বার্থ বা বাজারস্বার্থকে বড়ো করে দেখেছে। পশ্চিমা পুঁজিবাদী মতাদর্শই মূলধারার নিউজরুমগুলোতে গ্রথিত হয়ে রয়েছে। তাই ইস্যু হিসেবে, শ্রমিকদের নিম্নআয়ের চাইতে কোম্পানির জেনারেল ম্যানেজারের বার্ষিক প্রবৃদ্ধিবিষয়ক কোনো সংবাদ সম্মেলন মূলধারার গণমাধ্যমের কাছে বরাবরই বেশি গুরুত্ব পেয়ে এসেছে। সা¤প্রতিককালের কর্পোরেট মালিকানা ও একচেটিয়া প্রবণতা গণমাধ্যমগুলোকে আরও বেশি জনবিমুখ করে তুলেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সর্ববৃহৎ রেডিও স্টেশন অপারেটর ক্লিয়ার চ্যানেল কমিউনিকেশনস ইনকর্পোরেটের সিইও বলেছিলেন, আমরা সংবাদ ও তথ্য পরিবেশনের ব্যবসা করতে আসিনি। আমরা সুনির্বাচিত সঙ্গীত পরিবেশনের ব্যবসা করতেও আসিনি। আমরা আমাদের ভোক্তাদের কাছে পণ্য বিক্রির ব্যবসা করতে এসেছি (Waltz, 2005: 8)। কর্পোরেট মিডিয়ার এহেন মানসিকতার বিপরীতে বিকল্প মিডিয়ার প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই।

কিন্তু বিকল্প মাধ্যমকে আজ আমরা কীভাবে চিনবো? আমাদের কি নতুন করে বিকল্প মাধ্যম দাঁড় করাতে হবে না এর নিদর্শন ইতোমধ্যেই আমরা দেখতে পাচ্ছি? আমাদের দেশে এর খুব বেশি নিদর্শন দেখা না গেলেও পশ্চিমা দেশগুলোতে, যেখানে মূলধারার মাধ্যমগুলো অনেক শক্তিশালী, নানা ধরনের বিকল্প মিডিয়ার অস্তিত্ব আছে। ধরা যাক ষাটের দশকের হিপিদের ‘আন্ডারগ্রাউন্ড’ সংবাদপত্রগুলো। কিংবা একালে স্বল্প বাজেটের সাহিত্য পত্রিকা, র‌্যাডিকাল রাজনৈতিক মতাদর্শের পত্রিকা অথবা পরিবেশবাদীদের কিংবা নারীবাদীদের কমিউনিটি রেডিও। প্রতিদিনের মূলধারার পত্রিকা যা কাভার করেনা, তা তুলে ধরে যে মাধ্যম, সেটাই বিকল্প মাধ্যম। টিম ও’সুলিভান বলেছেন, বিকল্প মাধ্যম অবশ্যই বিপ্লবী পন্থায় সমাজ পরিবর্তনের ওকালতি করবে (O’Sulivan, 1994, ১৯৯৪, উদ্ধৃত Waltz, 2005)। তবে আজকের সময়ে বিকল্প মাধ্যম সবচেয়ে বেশি পরিদৃষ্ট হচ্ছে সাইবারপরিসরে।

ইন্টারনেটভিত্তিক বিকল্প মাধ্যম জিনেট-এর প্রতিষ্ঠাতা মাইকেল অ্যালবার্ট (Albert, 1997) মনে করেন, মূলধারার মিডিয়া প্রতিষ্ঠান (সরকারী বা বেসরকারী) বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রধান লক্ষ্য হলো মুনাফা অর্জন এবং আয়ের উৎস হিসেবে এলিট অডিয়েন্সকে বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছে বিক্রি করা। কিন্তু বিকল্প মিডিয়া প্রতিষ্ঠান মুনাফামুখী নয়, প্রাথমিকভাবে বিজ্ঞাপনদাতার কাছে অডিয়েন্সকে বিক্রি করতে চায়না (তাই বৃহত্তর ও নন-এলিট অডিয়েন্সই তার উদ্দিষ্ট) এবং সমাজকর্তৃক সংজ্ঞায়িত স্তরভিত্তিক সামাজিক সম্পর্কের ধারণাকে অতিক্রম করতে চায়। অ্যালবার্ট মনে করেন একটি বিকল্প মাধ্যমের কয়েকটি বৈশিষ্ট্য থাকতে হবে: ১. বিকল্প মাধ্যমের কর্মচারীরা পদবী ব্যতিরেকেই সমান পরিমাণ কাজ করবে এবং সমান বেতন পাবেন ২. সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়ায় সংগঠনের সবার অংশগ্রহণ থাকবে এবং সংগঠনটি স্তরভিত্তিক হবার চাইতে গণতান্ত্রিক হবে ৩. কষ্টসাধ্য হলেও লিঙ্গ ও বর্ণনির্বিশেষে শ্রমবিভাজনের বিভেদরেখা উঠিয়ে দেয়া হবে ৪. বিকল্প মিডিয়া প্রতিষ্ঠান যখন অডিয়েন্সের সঙ্গে যোগাযোগ করবে, তা মিডিয়া পণ্য দিয়ে হোক বা ব্যবসাসূত্রে হোক, মিথস্ক্রিয়াটি উপরোক্ত অভ্যন্তরীণ মূল্যবোধভিত্তিক হবে ৫. কেবল বিজ্ঞাপনদাতাদের কল্পিত এলিট-ক্রেতাদের কাছে নয়, বিকল্প মাধ্যম প্রতিষ্ঠান বৃহত্তর ও সর্বস্তরের জনগণের কাছে পৌঁছাতে চাইবে ৬. বিকল্প মাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলো পরস্পরকে নানাভাবে সাহায্য করবে।

মাইকেল আলবার্ট বিকল্প মাধ্যমের যে-চিত্র অঙ্কন করেছেন, সেইরকম মূলনীতির বেশ বেশ কিছু বিকল্প মাধ্যম রয়েছে সাইবারপরিসরে। এই মাধ্যমগুলো অনেক ক্ষেত্রে পাঠক ও সদস্যদের চাঁদানির্ভর। এইসব বিকল্প মাধ্যম কোনো কোনো ক্ষেত্রে সংবাদনির্ভর - যেমন ইন্ডিমিডিয়া (Indymedia)। অনেক সময় তা বিশ্লেষণনির্ভর - যেমন জিনেট (Znet)। কোনো কোনো বিকল্প মাধ্যম আবার বিদ্যমান মূলধারার প্রতিষ্ঠান ও মিডিয়ার সরসরি প্রতিপক্ষ নাম ও কাজ নিয়ে আবির্ভূত। যেমন মূলধারার প্রতিষ্ঠানে পরিবেশিত সংবাদের পাল্টা সংবাদ বা বিশ্লেষণ প্রদান করে ফেয়ারনেস এ্যান্ড এ্যাকুরেসি ইন রিপোটিং (FAIR) ও মিডিয়া চ্যানেল (Mediachannel)। আছে কর্পোরেটওয়াচ (Corporatewatch) বা ওয়ালমার্টওয়াচ (Wallmartwatch)। কর্পোরেট, সরকারী দুর্নীতি নিয়ে ও মূলধারার মিডিয়ার পাল্টা রিপোর্ট নিয়ে প্রকাশিত হয় মাদার জোন্স (Motherjones)-এ। ফাস্টকোম্পানি (Fastcompany) বলে যে ওয়েবসাইট আছে তা মূলত দ্রুত বর্ধনশীল কোম্পানিগুলো ও সেগুলোতে নতুন চাকরির খবরাখবর পরিবেশন করে। ২০০০ সালে এর পাল্টা বিকল্প মাধ্যম হিসেবে দাঁড়িয়েছিল ফাকডকোম্পানি (Fuckedcompany) যাতে তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর কোম্পানিগুলো দেউলিয়া হওয়া ও বহুমানুষের চাকরি হারানোর খবরাখবর থাকতো। এরকম ভুরি ভুরি বিকল্প মাধ্যম ইন্টারনেটজুড়ে বিরাজ করছে। এইসব মাধ্যমে যারা কাজ করে তারা এ্যাক্টিভিস্ট, অনেক ক্ষেত্রে বামপন্থী ও র‌্যাডিকাল এবং এদের লক্ষ্য বৃহত্তর সামাজিক পরিবর্তন। যেমন ১৯৯৯ সালে সিয়াটলে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সম্মেলনবিরোধী আন্দোলনের ফসল হলো ইন্ডিমিডিয়া। পরবর্তী সময়ে বোস্টন থেকে বোম্বে পর্যন্ত পৃথিবীব্যাপী বিকল্প মাধ্যমটির ১২০টি অনলাইনভিত্তিক শাখা স্থাপিত হয়েছে (Beckerman, 2003)। ইন্ডিমিডিয়ার রিপোর্টাররা মনে করেন কোনো সাংবাদিকতাই পক্ষপাতমুক্ত নয়। এই পক্ষপাতকে ধামাচাপা দেয়ার জন্যই মূলধারার সাংবাদিকতায় বস্তুনিষ্ঠতার কথা এত বেশি উচ্চারিত হয়। এধরনের বিকল্প মাধ্যম তাদের পক্ষপাতকে লুকানোর চেষ্টা করে না। তাদের লক্ষ্য হলো সামাজিক-রাজনৈতিক স্থিতাবস্থা ভেঙ্গে ফেলা। অর্থাৎ সামাজিক পরিবর্তনের জন্য কাজ করে যাওয়া।

সিয়াটলের ঘটনা যদি ইন্ডিমিডিয়ার জন্ম দেয়, নাইন ইলেভেনের ঘটনা ব্লগকে জনপ্রিয় করে তোলে। ব্লগ শব্দটি এসেছে ‘ওয়েবলগ’ থেকে, যাকে ভাঙলে দাঁড়ায় ‘ওয়েব’(সাইট)-এর ‘লগ’। এক্ষেত্রে ‘লগ’ শব্দটি নেওয়া হয়েছে ‘দৈনন্দিন কার্যকলাপ লিপিবদ্ধ করার রেকর্ড বই’ ধারণা থেকে, যা আবার এর মূলগত অর্থ ‘সমুদ্রযাত্রার সময় জাহাজের দৈনন্দিন ক্রিয়া-কলাপের রেকর্ড’ থেকে এসেছে। ‘ওয়েবলগ’ শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন জর্ন বার্জার, ১৯৯৭ সালে, তার অনলাইন জার্নাল ‘রোবোট উইজডম’-এ (Gurak and others, 2004)। ব্লগ হলো ব্যক্তি-পরিচালিত ওয়েবসাইট, যেখানে সাধারণত মতামত, ঘটনার বর্ণনা কিংবা স্থির বা সচল চিত্রের নানা ভুক্তি থাকে। অর্থাৎ এটি এক ব্যক্তির সাইট যেখানে তিনি ইচ্ছামতো তার মতামত, দর্শন, বিভিন্ন চলমান বিষয় সম্পর্কে তার ব্যক্তিগত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ স্বাধীনভাবে পরিবেশন করেন। টেক্সট ছাড়াও তিনি চিত্র বা ভিডিও সরাসরি বা হাইপারলিঙ্ক আকারে পরিবেশন করতে পারেন। ভুক্তিসমূহ সাধারণত বিপরীত ক্রমে সাজানো থাকে। ব্লগের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এতে পাঠকদের মতামত প্রদান, তর্ক-বিতর্ক করার সুযোগ থাকে এবং এভাবে এটি একটি মিথস্ক্রিয়ামূলক পাতা হিসেবে গড়ে ওঠে। একেকটি টেক্সট বা অন্য যেকোনো প্রকারের ভুক্তিকে ‘পোস্ট’ বলা হয়ে থাকে। তবে টেক্সটনির্ভর ছাড়াও কেবলই স্থিরচিত্রের (ফটোব্লগ), সচলচিত্রের (ভিডিওব্লগ বা ভ­গ), অডিওর (পডকাস্টিং) ব্লগ থাকতে পারে।

ব্লগ সার্চ ইঞ্জিন টেকনোরাতি ২০০৮ সালের ব্লগ-পরিস্থিতি সম্পর্কে জানাচ্ছে যে, ২০০২ সালের পর থেকে তারা এ পর্যন্ত ১৩ কোটি ৩০ লক্ষ ব্লগের অস্তিত্ব খুঁজে পেয়েছে। আর সাইবার পরিসরে প্রতি ঘণ্টায় ৯ লাখ ব্লগ পোস্ট করা হয়ে থাকে। ব্লগারদের দুই-তৃতীয়াংশই পুরুষ আর শতকরা ৫০ ভাগ ব্লগার ১৮-৩৪ বছর বয়সসীমার। তো এটা হলো আরেকটি বিরাট ক্ষেত্র যেখানে বিকল্প মাধ্যমের চরিত্র নিয়ে লক্ষ লক্ষ ব্লগসাইট কাজ করে চলেছে। ব্লগের মিথস্ক্রিয়ার চরিত্রটি একে আকর্ষণীয় করে তুলেছে। নাইন ইলেভেনের ঘটনা বহু ব্লগের জন্ম দিয়েছিল, ইরাক যুদ্ধের সময় ব্লগের সংখ্যা হাজার হাজার ব্লগসাইট আত্মপ্রকাশ করে। অর্থাৎ সারা পৃথিবীর মানুষ বড়ো বড়ো আন্তর্জাতিক ও রাজনৈতিক ঘটনায় স্বাধীনভাবে নিজের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে চায় এবং সেই বিষয়ে মিথস্ক্রিয়া করে। প্রাতিষ্ঠানিক মূলধারার মিডিয়ায় সাধারণ মানুষের এই এ্যাক্সেস বা অভিগম্যতা ছিলনা এতদিন। সাইবারপরিসরের বিকল্পমাধ্যমগুলো মিডিয়ার গণতন্ত্রায়নের অনন্য নজির হিসেবে আজ হাজির।

ইন্টারনেটে সামাজিক নেটওয়ার্ক ফেসবুক চালু হয় ২০০৪ সালে। মাত্র ছয় বছরে এর ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ৫০ কোটি। এখন এটা হয়ে গেছে পৃথিবীর তৃতীয় বৃহত্তম ‘দেশ’। এর ২৮% ব্যবহারকারীর বয়স ৩৪ বছরের বেশি (Fletcher, 2010)। বাংলাদেশে এর ব্যবহারকারীর সংখ্যা নয় লাখ। নগরায়ণের কারণে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া মানুষের ‘কমিউনিটি গড়ার ক্ষুধা’ (রেইনগোল্ড, ১৯৯৯; দেলান্তি উদ্ধৃত, ২০০৩) মেটাতে সামাজিক নেটওয়ার্কিং সাইট ফেসবুকের আবির্ভাব ঘটেছিল। পরে আবির্ভাব ঘটেছে টুইটারের। লক্ষ লক্ষ মানুষকে সাইবারপরিসরে আন্তসম্পর্কিত রাখার জন্য অনেক ফিচার যুক্ত হয়েছে ফেসবুকে। এরমধ্যে কয়েকটির মাধ্যমে মানুষ নিজের মতপ্রকাশ করছে স্বাধীনভাবে, কথা বলছে সামাজিক পরিবর্তনের জন্য। এভাবে ফেসবুক, টুইটার বা মাইস্পেসও হয়ে উঠছে বিকল্প মাধ্যমে।

সাইবাপরিসরের বিকল্প মাধ্যমগুলোর শক্তির দিক হলো এগুলো মিথস্ক্রিয়ানির্ভর, ফলে যেকোনো ইস্যুতে একপাক্ষিক না হয়ে একটা ডিসকার্সিভ আলোচনা হবার সুযোগ থাকে। আর মূলধারার মুদ্রণ বা ইলেক্ট্রনিক মাধ্যমের তুলনায় এগুলো পরিচালনা করার খরচ খুব বেশি নয়। এক্ষেত্রে ইংল্যান্ডের শ্রমজীবীদের পরিচালিত র‌্যাডিকাল প্রেসের কথা আমাদের মনে পড়ে যেতে পারে, মুদ্রণপ্রযুক্তি সস্তা ছিল বলেই যেগুলো একসময় টিকে ছিল। কিন্তু এর সীমাবদ্ধতার দিক হলো, এগুলোর অভিগম্যতার জন্য দরকার কম্পিউটার ও ইন্টারনেট কানেকশন ফি, সর্বোপরি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা যা এখনও সর্বসাধারণ মানুষের আয়ত্বের বাইরে। এরপরও কেউ কেউ মনে করেন, সাইবার ক্যাফে, স্কুল, লাইব্রেরি এবং মুঠোফোনের মাধ্যমে সেই সীমাবদ্ধতা খানিকটা দূর হয়ে যায়। মিজি ওয়ালজের মতে, শীর্ষস্থানীয় পত্রিকা নিউইয়র্ক টাইমস বা ব্রডকাস্ট মাধ্যম বিবিসির চাইতে বেশি মানুষ ইন্টারনেটের সঙ্গে যুক্ত (Waltz, 2005)।

বাংলাদেশের মানুষের স্বাভাবিকভাবে জীবনধারণ করতে গিয়েই নাজেহাল হতে হয়, নানা চোরাপথে এ্যাক্টিভিজমের চেতনা তাই বিলুপ্ত হয়ে যায়। ইন্ডিমিডিয়ার মতো সংবাদনির্ভর বা জিনেটের মতো বিশ্লেষণনির্ভর সাইট তাই এদেশে নেই। শেষ ভরসা তাই ব্লগ ও ফেসবুক। বাঙালিদের রয়েছে কয়েকটি ব্লগ কমিউনিটি যাদের সদস্যসংখ্যা কয়েক লাখ। ফেসবুকের নোট চালাচালির মাধ্যমেও বাংলাদেশের তরুণ বুদ্ধিজীবীরা বিকল্প ভাবনাগুলো শেয়ার করে চলেছেন। কর্পোরেট মালিকানার মূলধারার মিডিয়ার বিপরীতে ভিন্ন ধারণা নিয়ে বিকল্প মাধ্যমে মতপ্রকাশ এখানেও ঘটে চলেছে। এখন প্রয়োজন সামাজিক পরিবর্তনের জন্য, এইসব সাইটের শক্তিমত্তার সর্বোত্তম ব্যবহার করা।

তথ্যসূত্র
হারম্যান, এডওয়ার্ড এস ও চমস্কি, নোম (২০০২)। সম্মতি উৎপাদন: গণমাধ্যমের রাজনৈতিক অর্থনীতি (মামুন, আ-আল অনূদিত)। ঢাকা: সংহতি।
Delanti, Gerard (2003). Community. London: Routledge.
Waltz, Mitzi (2005). Alternative and Activist Media. Edinburgh: Edinburgh University Press.
Fletcher, Dan (2010). Facebook: Friends without Border, Time. Vol. 175, no. 21.
Beckerman, Gal (2003). Emerging Alternatives: Edging Away from Anarchy, CJR. September/October 2003.
Gurak and others (undated). Introduction: Weblog, Rhetoric, Community and Culture, Click This Link.
Albert, Michael (1997). Click This Link. aceesed on 26 September, 2010.
Click This Link

প্রথম প্রকাশ: খালেদ মুহিউদ্দিন সম্পাদিত 'মিডিয়াওয়াচ', সংখ্যা ৪২, অক্টোবর, ২০১০।

ব্লগারদের অবগতির জন্য

জিনেট: http://www.zcommunications.org/znet
ইন্ডিমিডিয়া: http://www.indymedia.org/en/index.shtml]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/fahmidulhaqblog/29249576 http://www.somewhereinblog.net/blog/fahmidulhaqblog/29249576 2010-10-04 23:27:48
গল্প: সিঙ্গিং ইন দ্যা রেইন
গপগপ করেই খাচ্ছিল আজহার। গুলশান অঞ্চলে রোদমাথায় সারাবেলা হাঁটাহাঁটি করে খুব ক্লান্ত ও ক্ষুধার্ত ছিল সে। হঠাৎ আড়াই বর্গফুটের চৌকোণা টেবিলটার সামনের চেয়ারে মায়মুনাকে দেখা গেল, রাগী-চেনা চেহারায়।

--আমাকে ছাড়া কেএফসিতে আসছো?

--আমি তো চুরি করে ঢুকলাম। তুমি আসলে কখন?

--এই চুরি-চামারি কেন? কার আসার কথা?

--মুনা, কারও আসার কথা থাকলে তার জন্য অপেক্ষা করতাম, এরকম গপগপ করে খেতাম না।

--নিমাকে ডাকো। প্রিয় কলিগ তোমার!

--মুনা, খিদা পেটে এইসব অকারণ সন্দেহের উত্তর দিতে ইচ্ছা করছে না।

--কেএফসিতে ঢুকছো কেন?

--খিদা লাগছে।

--বাংলা খাবার খাইতা। টাকা উড়াচ্ছো কেন?

--গুলশানে বাংলা-ইংরাজি সব খাবারের দামই এক।

--এখন যাও, আমার জন্য অর্ডার দাও।

--আমার কাছে আর ৫০ টাকা আছে। তোমার কাছে আছে?

--তোমার শাস্তি হলো, খিদা নিয়ে বসে থাকবা। খাইতে পারবা না।

--তুমি যাওতো! ঘরেও জ্বালাও, এখানে একটু শান্তিমতো খাচ্ছি, অমনি এসে হাজির। যা ভাগ!

মায়মুনার গায়ে পেপসি ছুঁড়ে মারে আজহার। পেপসির সবটাই পড়ে যায় সামনের চেয়ারে। মায়মুনা উধাও। ক্লিনার এসে বিরক্ত মুখে ‘ওকে স্যার’ বলে চেয়ার আর ফ্লোর মুছতে থাকে। আজহার আর কী বলে? ‘সরি’ই বলে।

মায়মুনা চলে যাবার পরে, অদূরে বসা, পোলো টি-শার্টপরা মেয়েটাকে খুঁটিয়ে দেখে আজহার। মেয়েটা একটু আগে লিভাইস জিন্সপরা ছেলেটিকে জাপ্টে ধরে দোতলায় উঠেছে। পোলো-মেয়েটা এখন টেবিলে একা বসে, লিভাইস-ছেলেটা হয়তো নিচে খাবার আনতে গেছে। মেয়েটার বয়স ত্রিশ-বত্রিশ হবে। দেখতে শার্প, লম্বাটে ফর্সা মুখ। স্করসেসির ‘ট্যাক্সি ড্রাইভার’-এর নায়িকা বেটসির মতো দেখতে। ট্রেভিস বিকলের মতোই আজহার মেয়েটির প্রতি দুর্দদমনীয় আকর্ষণ বোধ করে। সরাসরি তাকায়। মেয়েটা অন্যদিকে তাকিয়ে আনমনে কী যেন ভাবে। ওই আনমনা ভাব তার সৌন্দর্যকে বাড়িয়ে তোলে। আজহার তার টেবিল থেকে উঠে গিয়ে, মেয়েটির টেবিলের সামনে গিয়ে, ট্রেভিসের মতোই বলে, ইউ আর দ্যা মোস্ট বিউটিফুল গার্ল আই হ্যাভ এভার সিইন। কমপ্লিমেন্ট শুনে বেটসি প্রশ্রয়ের হাসি হেসেছিল। কিন্তু যেহেতু এটা নিউইয়র্ক নয়, তাই মেয়েটির ডান হাত আচমকা সবেগে আজহারের গালের দিকে ধেয়ে আসে। তবে চড়টা গালে পড়ার আগেই আজহার নিজেকে নিজের টেবিলে সুরক্ষিত আবিষ্কার করে। বেটসির টেবিলে তার বয়ফ্রেন্ডকেও দেখা যায়।

বেটসির পেছনের টেবিলটা ফাঁকা। তারও পেছনে বড়ো একটা টেবিলে কয়েকজন স্থূলকায় মাতা তাদের খাদ্যগ্রহণে-অনীহ বাচ্চাদের নিয়ে অথবা বাচ্চাদের স্কুলের ক্লাসটেস্ট নিয়ে অথবা স্বামীদের পরনারীর প্রতি আসক্তি নিয়ে অথবা জিটিভির চলমান সোপ নিয়ে অথবা শাশুড়িদের বিদ্বেষ নিয়ে বকবক করে চলেছেন। তাদের বকবকানি চাপা পড়ে যাচ্ছে তাদেরই বাচ্চাদের চিৎকারে -- রাইডে চড়লে সব বাচ্চাই চিল্লায়। আর বাচ্চাদের চিৎকারও প্রায় ঢাকা পড়ে যাচ্ছে সনি ব্রাভিয়া এলসিডি মনিটরে প্রদর্শিত এবং প্যানাসনিক স্পিকারে প্রচারিত হেভি মেটাল কোনো গানের ঝনঝনানিতে। এইসব চিৎকার-চেঁচামেচি বাড়তে বাড়তে চরমে পৌঁছে, রঙিন-শীতল কেএফসি রেস্তোরাঁর টকটকে লাল দেয়াল আগুনের হল্কা হয়ে ফ্লোরময় হঠাৎ বয়ে যায়। সেই নরকের তীব্র তাপে স্থূলকায় মাতারা ঝলসে যান, শিশুদের চিৎকার দপ করে থেমে যায়, বেটসি আর তার বয়ফ্রেন্ডের কঙ্কাল পরস্পরের দিকে তাকিয়েই থাকে। কাঁচা রক্ত-মাংসের পোড়া গন্ধে আজহারের বমি পায়। অথচ কেনটাকি ফ্রায়েড চিকেন উদ্ভাবনকারী বুড়ো কর্নেল হারল্যান্ড স্যান্ডার্স হাসতেই থাকেন।

আজহার হাস্যোজ্জ্বল বুড়ো কর্নেলকে পেছনে ফেলে চলে আসে গুলশানের রাজপথে। রাজপথে তখন তুমুল বৃষ্টি। বৃষ্টির মধ্যে কেএফসির নরক জ্বলছেই। প্রবল বৃষ্টিতে আগুন কীভাবে জ্বলতেই থাকে, আজহার সেই অসম্ভাবনা নিয়ে ভাবে। একটা টয়োটা ল্যান্ড ক্রুজার প্রচণ্ড হর্ন দিয়ে আনমনা আজহারকে রাজপথ থেকে ফুটপাথে আছড়ে ফেলে। আজহারের মনে পড়ে যায়, তুমুল বৃষ্টির মধ্যে ছোটবেলায় স্কুলের মাঠে ফুটবল খেলার সময়, বলের দখল আনতে গিয়ে, ঘাসে-পানি-কাদায় ঠিক এভাবেই পিছলে দূরে পড়তো। এই যে ভাই, বল ধরেন, উঠে দাঁড়ান, গোল দিতে হবে -- সমস্বরে কারা বলে উঠে। আজহার পেছনে ফিরে দেখে বাংলালিঙ্কের বিলবোর্ড থেকে সুন্দর ছেলে আর সুন্দরী টিনএজাররা নেমে এসেছে। তাদের হাতে ফোনের বদলে নাইকি ফুটবল। তারা এত নিচে যখন নামতে পেরেছে, তখন আজহার আর পিছলে শুয়ে থাকে কেন? গুলশানের ফুটপাতেই খেলা শুরু করে দেয়, মডেলদের সাথে। বৃষ্টির কারণে ফুটপাতে পথচারী নেই, ভিখিরি নেই, ভেন্ডররা নেই। তবে কোত্থেকে একপাল টোকাই এসে জোটে, খেলায় যোগ দেয়। খেলা জমে উঠে। নারী-মডেলদের গায়ে অনেকের গন্ধ লেপ্টানো ছিল -- অ্যাড নির্মাতা, চ্যানেলপ্রধান, ব্র্যান্ডম্যানেজারের -- বহু শাওয়ারেও প্লেবয় বডি স্প্রে আর ঘামমেশানো বোঁটকা গন্ধ যায়নি শরীরের অলিগলি থেকে। ফুটবল খেলতে খেলতে তুমুল বৃষ্টি আজ তা নিয়ে চলে যায়। অল্পাহারে শীর্ণ পাকস্থলীতে চাউরে ওঠা খিদেও মুছে যায় টোকাইয়ের। আর আজহারের পকেটে নোকিয়া সেটটি বৃষ্টিতে ভিজে মরে যেতে থাকে। তা যাক, গুলশানের ফুটপাতে তখন নারী-পুরুষ-মডেল-টোকাইয়ের সাম্যবাদ।

কোত্থেকে নিমা এসে হাজির।

--আজহার ভাই চলেন একসাথে বৃষ্টিতে ভিজি, আর গান গাই:

আই এ্যাম সিঙ্গিং ইন দ্যা রেইন

জাস্ট সিঙ্গিং ইন দ্যা রেইন

হোয়াট আ গ্লোরিয়াস ফিলিং

আই অ্যাম হ্যাপি এগেইন ...

--এই থামো, তুমি কোত্থেকে?

--অফিস থেকে দেখলাম আপনি বৃষ্টিতে পোলাপানের সঙ্গে খেলছেন। তাই আমিও নেমে আসলাম।

--পোলাপান কোথায় গেল?

--আমাকে দেখে ভাগছে।

ঠিক তাই, বাংলালিংকের ছেলেমেয়েগুলো ফুটবল ছেড়ে ফোন কানে বিলবোর্ডে হাসছে, আবার। অবশ্য এখনও তারা বৃষ্টিতে ভিজছে। কেএফসি এখনও জ্বলছে, দাউ দাউ করে। কিন্তু টোকাইগুলো কোথায় লুকালো?

--তুমি কি একটা অশুভ শক্তি, আমার জন্য? খেলা নষ্ট করতে এলে?

--ছিঃ! কী বলেন? আপনার জন্য আমার জগজ্জোড়া সমস্ত শুভকামনা।

--আপাতত ভাগো। একটু আগে মুনা আসছিল। আশপাশেই কোথাও আছে।

--বউকে এত ভয় পান কেন? আপনার বন্ধুবান্ধব থাকতে পারেনা? আমি তো আর উটকো কেউ না। আপনার দীর্ঘদিনের সহকর্মী।

--বন্ধু থাকতে পারবে, বান্ধবী নয়।

--মি তো কলিগ।

--মুনা আমার মেয়ে কলিগদের আমার বান্ধবী বলেই ডাকে। আচ্ছা, তোমার স্বামী তোমাকে ভয় পায়না?

--তা খানিকটা পায় বটে।

--তোমার হাজবেন্ডকে তার সেক্রেটারির সঙ্গে রাস্তায়-রেস্তোরাঁয় দেখলে তুমি ছেড়ে কথা কইবে?

যা ভাবা! শরীফ ছাতা মাথায় দিয়ে মায়মুনা এদিকেই এগিয়ে আসছে। সর্বনাশ! নিমাও অপ্রস্তুত। মুনা ওদের কাছে পৌঁছানোর আগেই চিৎকার করে উঠে, এই নিমা, তুমি এখানে কী কর? ভিজে যাচ্ছো তো! আমার ছাতার নিচে আসো।

মুনা কাছে এসে নিমাকে তার ছাতার ভেতরে নিয়ে নেয়। তারপর দুজনে কোমর জড়াজড়ি করে এক ছাতার নিচে, উভয়েই সামান্য ভিজে, সামান্য নিজেকে বাঁচিয়ে, চলে যায়। যেন প্রাণের বান্ধবী দুইজন। আজহার যে এখানে কাকভেজা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, তা তাদের নজরেই পড়েনি।

যে যার গন্তব্যে, যাক। এতক্ষণে ফোনটা আসার সময় হয়েছে। ইউনিলিভারের ফিন্যান্সিয়াল ম্যানেজার বলেছেন দু’ঘণ্টা পরে চেকটা রেডি হলেই ফোনে জানাবেন। আজ সকালেই চেকটা হবার কথা ছিল, কিন্তু চিফ অ্যাকাউন্টেন্টের স্ত্রী রাতে আত্মহত্যা করায় সকালে আর আসেননি। বিশেষ ব্যবস্থায় দু’ঘণ্টার মধ্যে চেক রেডি করা হবে, ম্যানেজার সাহেব জানিয়েছেন। এজন্যই আজিমপুর থেকে এসে, দু’ঘণ্টা ধরে, আজহার গুলশান এলাকায় ঘুরঘুর করছে। আজহারের চেকটা পাওয়াও অতীব জরুরি। ডায়গনসিস করতে করতে কালকেই হাতের সব টাকা শেষ হয়েছে। আজ যদি চেকটা পাওয়া যায়, সোনালী ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে তবে তা জমা দিতে হবে। কাল সকালে টাকা উঠিয়ে স্কয়ার হাসপাতালে দৌড়াতে হবে। দুপুর একটায় রাতুলের অপারেশন। সেখানে ছুরি-কাঁচি নিয়ে অপারেশন টেবিলে ডাক্তাররা বড়োজোর এক ঘণ্টা অপেক্ষা করবেন। নয়তো ওটি থেকে রাতুলকে বের করে দেয়া হবে।

রাতুল আজহার আর মায়মুনার একমাত্র ছেলে। বয়স চার। ব্রেন টিউমার হয়েছে রাতুলের।

বৃষ্টি থেমে গেছে।

এবার আজহারের মনটা অস্থির হয়ে ওঠে। ইউনিলিভার থেকে ফোন আসবে কীভাবে? নোকিয়াটা যে বৃষ্টিতে ভিজে মৃত্যুবরণ করেছে!



০৩ সেপ্টেম্বর, ২০১০।



প্রথম প্রকাশ: Click This Link
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/fahmidulhaqblog/29240998 http://www.somewhereinblog.net/blog/fahmidulhaqblog/29240998 2010-09-17 15:35:33
ইফতার রিপোর্টিং: উপবাসী মানুষের রসনাবিলাসে উস্কানি
রমজানের তাৎপর্যের উল্টোদিকে হাঁটার এই প্রবণতায় মিডিয়ার একটা অবদান আছে, এই নিবন্ধে আমি সেদিকটায় আলোকপাত করবো। আমি ১৬ থেকে ২১ আগস্ট, ২০১০ তারিখের শীর্ষস্থানীয় তিনটি দৈনিক -- প্রথম আলো, কালের কণ্ঠ ও সমকাল-এর ইফতার সংক্রান্ত রিপোর্ট ও ফিচারগুলো নিয়ে বিশ্লেষণ করবো। তিনটি পত্রিকার প্রায় এক সপ্তাহের ইফতার-সংক্রান্ত রিপোর্ট বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে যে, অল্পাহারের রমজানকে ভোজনবিলাসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে এই রিপোর্টগুলো। রিপোর্টগুলোর টেক্সট মনোযোগ দিয়ে পাঠ করলে যেকারোরই এরকম ধারণা হবে। আর বাজারমুখিন ও শ্রেণীপক্ষপাতী মিডিয়াগুলো ইফতারের মতো দৈনন্দিন ঘটনাকে ‘ইফতার বাজার’-এ পরিণত করেছে এবং এক্ষেত্রে তাদের অভিজাত এলাকার বাজারগুলোর দিকেই আগ্রহ বেশি।

১৬ আগস্ট তারিখে প্রথম আলো পত্রিকার শেষ পাতায় সচিত্র রিপোর্টের শিরোনাম ‘বেইলি রোডে দাম চড়া, বিক্রি বেশি’। রিপোর্টের শুরুতেই বলা হচ্ছে: “বেইলি রোডের ক্যাপিটাল ইফতরি বাজারে পা ফেলার জো নেই। ইফতারের তখনো চার ঘণ্টা বাকি। তবুও বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে বেইলি রোডে এসেছেন ভোজনরসিকেরা। রসনা বিলাসের জন্য খ্যাতি যে বাঙালি জাতির, তারা সংযমের পরীক্ষায়ও যেন উত্তীর্ণ। এই দোকানের ঘিয়ে ভাজা পরোটা আর মাংসের নানা পদের ম-ম গন্ধ কল্পনাপ্রবণ মানুষকে চোখের পলকে পৌঁছে দেবে কোনো বাদশাহি ভোজন উৎসবে।” এই অনুচ্ছেদ আমাদের এই ধারণা দিচ্ছে যে, ইফতার কিনতে আসেন ‘ভোজনরসিকেরা’, তাদের মধ্যে এই ভোজনরস এতই তীব্র যে প্রাকৃতিক বাধা উপেক্ষা করেও তারা চলে আসেন। আর ইফতারের আয়োজন দেখে মনে হবে এটা একটা ‘বাদশাহি ভোজন উৎসব’। অবশ্য ‘তারা সংযমের পরীক্ষায়ও যেন উত্তীর্ণ’ -- এই শব্দগুলোর অর্থ অস্পষ্ট এবং দ্ব্যর্থকও বটে। রিপোর্টের তৃতীয় অনুচ্ছেদে বলা আছে: “এম আর হায়দার নামের এক ব্যবসায়ী সেই চকবাজার থেকে বেইলি রোডে এসেছেন ইফতারি কিনতে। চকে ইফতার সামগ্রীর এমন রাজকীয় আয়োজন থাকতে বেইলি রোডে কেন, এমন প্রশ্নে তিনি জানালেন, পত্রপত্রিকা ও টিভি মারফত এই বাজারের নাম শুনেছেন, একটু চেখে দেখতে চান খাবারটা কেমন।” অর্থাৎ সারাদিন অভুক্ত তার শুকনো জিব নব নব খাবারের স্বাদ নিতে চায়, আর তাকে সাহায্য করছে পত্রিকা-টিভির রিপোর্ট। বেইলি-রোড ইফতার বাজার অন্যের কাছে বিখ্যাত হয়ে উঠেছে মিডিয়ার কল্যাণে।

তবে চকবাজার ইফতার-বাজার আগে থেকেই বিখ্যাত, এম আর হায়দার ছিলেন চকবাজারেরই বাসিন্দা। কালের কণ্ঠ ২১ আগস্ট তাদের ফিচার পাতা ‘শুধুই ঢাকা’র ৪ নম্বর পৃষ্ঠাজুড়ে সেই চকবাজারের ইফতার বাজার নিয়ে বিশেষ ফিচার করেছে। সেই পাতার প্রথমেই রয়েছে প্রায় ৭২ পয়েন্টে (এক ইঞ্চি) বিশাল শিরোনাম: ‘কাবাব, হালিম আর দইবড়া’। শিরোনামটা এতই বড় যে তা আমি সেদিন প্রথম পড়ি, নীলক্ষেত অঞ্চলে, একটি গাড়ি যখন আমার রিকশাকে অতিক্রম করছিল, আরোহী ভদ্রমহিলা পত্রিকাটি পড়ছিলেন এবং ঐ এক মুহূর্তেই পুরো শিরোনমটা আমার পড়া হয়ে যায় (এই নিবন্ধটি লেখার তাগিদ তৎক্ষণাৎই আসে আমার মনে)। ফিচারের প্রথম অনুচ্ছেদে আছে ‘‘রাস্তার দুই ধারে শুধু খাবার আর খাবারের দোকান। যতদূর চোখ যায়, সারিবদ্ধভাবে বসেছে রসনাপূজার পসরা’’। রমজান মাসে ফিচারলেখকের ‘রসনাপূজা’ কথাটা লিখতে একটুও হাত কাঁপেনি সম্ভবত। কারণ তার পরের অনুচ্ছেদেই আছে: “এসময় রোজাদাররা সুস্বাদু খাবার দিয়ে ইফতার করার যথাসাধ্য চেষ্টা করে”। আসলে এধরনের শব্দ (‘সুস্বাদু খাবার’, ‘যথাসাধ্য চেষ্টা’) ব্যবহারের মাধ্যমে রসনাবিলাসকেই উস্কে দেয়া হচ্ছে, রমজান মাসে। যাহোক, এরপর লেখক লিখছেন ‘সবচেয়ে বেশি বিক্রীত ১০টি পদ নিয়েই এই আয়োজন’। ১০ পদের ছবি দেবার পাশাপাশি সেখানে তিনি লিখছেন: ‘‘জিলাপি ছাড়া ইফতার আয়োজন ঢাকাবাসীর কাছে অকল্পনীয় ব্যাপার”; “ভোজনরসিকদের কাছে দই বড়া না হলে যেন ইফতারই অসমাপ্ত থেকে যায়”; “ঢাকাবাসীর কাছে হালিম ছাড়া ইফতারে বসা অকল্পনীয়ই নয়, অসম্ভবও”। লেখকের কথা যদি সত্য ধরে নেই তবে একজন ঢাকাবাসী যদি ইফতারে বসেন তবে অন্যান্য অনেক কিছুর সঙ্গে সেখানে অবশ্যই থাকতে হবে জিলাপী, দই বড়া ও হালিম। এই অবশ্যসম্ভাব্যতা একজন ঢাকাবাসী রোজাদারের মনে একটা অপ্রাপ্তির বোধ তৈরি করে, যদি তিনি এসব নিয়মিত না খেয়ে থাকেন। তার এই অপূর্ণতাবোধ তাকে ঠেলে দেয় একজন আদর্শ ঢাকাবাসী রোজদার হতে, অর্থাৎ ইফতারের জন্য দইবড়া কিনতে তিনি ব্যাকুল হয়ে ওঠেন। ফিচার থেকে আরও জানা গেল কোয়েল পাখির রোস্ট, চিকেন কাঠি বা মাংস-ডিমের ডাবলি, কাশ্মিরী শরবত কেবল রমজান মাসেই, চকবাজারে পাওয়া যায়। অন্য কোনো সময় নয়। অর্থাৎ অন্য মাসে আমরা যেটা খাই না, রমজান মাসে সেটা খাই, যেন রমজান হলো খাবার মাস। অন্য সময় যেটা খাও না, এমাসে সেটাও খাও। প্রথম আলোর বেইলি রোডের রিপোর্টেও বলা হচ্ছে: “বিক্রেতা মো. ইয়াসিন অবশ্য বললেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্রেতাদের রুচি ও চাহিদার পরিবর্তন হচ্ছে। প্রায় এক যুগ ধরে তিনি এ এলাকায় ব্যবসা করছেন, কিন্তু দইবড়া বা দইবুন্দিয়ার মতো খাবারগুলো খুব সাম্প্রতিক সংযোজন।” আর এই সংযোজনের কথা আমাদের জানিয়ে দিল মিডিয়া রিপোর্ট। এখন দইবড়া বা দইবুন্দিয়া খেতে মিরপুর বা পোস্তগোলা থেকে বেইলি রোডে আসবেন রসনালিপ্সু রোজদারেরা। তবে সমকালের এক রিপোর্টে (১৬ আগস্ট, পৃষ্ঠা ৩) বলা হচ্ছে দইবড়াই নাকি বাংলার নিজস্ব ইফতার। ডোবাতেলে ভাজা বেগুনি, পেঁয়াজু ইত্যাদি হলো মোগলাই খাবার। কিন্তু রিপোর্টার জানাচ্ছেন: “বইপত্র ঘেঁটে ও ইতিহাসবিদদের মতে, ছোলা-মুড়ি, দই-চিড়া, দইবড়া -- আরও কিছু পদ বাংলার নিজস্ব ইফতারের পদ”। ইতিহাসবিদরা কে, তা অবশ্য রিপোর্টার জানাননি।

ইফতার নিয়ে এই ‘আদেখলাপনা’ কেবল ঢাকা শহরের মধ্যবিত্ত ও উচ্চ মধ্যবিত্তের মধ্যেই বেশি দেখা যায়। অন্যান্য শহরে ইফতার-উৎসব অতটা চোখে পড়েনা। কালের কণ্ঠ ১৬ আগস্ট ৩-এর পাতায় পরিবেশন করেছে একটি রেস্টুরেন্টে কী কী ইফতারি পাওয়া যায়: “ফ্রেন্ডস রেস্টুরেন্টে আছে বাহারি ইফতার। জিলাপি, বোম্বে জিলাপি, খাসির হালিম, খাসির জালি কাবাব, বিফ চপ, চিকেন ফ্রাই, গ্রিল চিকেন, খাসির মগজের স্যান্ডউইচ, ফুল ডিমের চপ, বিফ কোপ্তা, রেশমি কাবাব, ফুলুরি, কইপাতা, টিক্কা কাবাব, খাসির রোস্ট, বোম্বাই রোস্ট, ছোলা, ফালুদা ও লাচ্ছি”। ১৭ আগস্ট প্রথম আলোর ৩-এর পাতায় দেয়া হচ্ছে আরেক লিস্ট: “ছোলা, পেঁয়াজু, বেগুনি, হালিমের পাশাপাশি এসব রেস্তোরাঁয় রয়েছে লাচ্ছা পরোটা, পাঞ্জাবি চিকেন, চিকেন মসাল্লাম, চিকেন তাওয়া ড্রাই, প্রন টোস্ট, চিকেন বড়া কাবাব, বিফ রেনডাং, বিফ তাওয়া ড্রাই, নানা রকম ফিরনি ও জিলাপি”। পাঠক, ভাবুন তো আপনি এত এত খাবারের সমারোহ কোনো উৎসবে কি দেখেন? ঈদে বা অন্য কোনো দিনে? এসব ভিন্নধর্মী বা স্পেশাল খাবার, আপনার সামর্থ্য থাকলে, আপনি ছ-মাসে বা বছরে একবার খেতে পারেন, প্রোগ্রাম করে। রোজার মাসের তিরিশটা দিন এইসব রাশি রাশি খাবার আপনি পাচ্ছেন, অথচ এই মাসে আপনার কম খাবার কথা। আপনার জন্য এই বিশাল উৎসবের খবর আসছে মিডিয়াবাহিত হয়ে। আর এসব খাবারের কাব্যিক বর্ণনা পড়ে, রোজাদারের জিব লকলকিয়ে উঠবে দিনের শুরুতে, এবং রোজা ভেঙ্গে যাবার সমূহ সম্ভাবনা তৈরী হবে। প্রথম আলোর সেই রিপোর্টেই বিশেষভাবে বর্ণনা করা হচ্ছে ‘ছুপা রুস্তম’ নামের এক কাবাবে কথা: “একেবারেই সাদামাটা এক কাবাব এই ছুপা রুস্তম। তবে মুখে দেওয়ার পর ধারণা বদলে যাবে। চার পরতে তৈরি এই কাবাব পাওয়া যায় গুলশানের খাজানা রেস্টুরেন্টে। চার পরতের প্রথমে সবজি, এরপর খাসির মাংস, তারপর মুরগির মাংস, সবশেষে জিভে লাগবে পনিরের স্বাদ। মাংস লুকানো থাকে বলে এর নাম ছুপা রুস্তম।” রমজান উপলক্ষ্যে রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ীরা নব নব খাবারের আবিষ্কার করে চলেছেন এবং এই বিষবৃক্ষে পানি ঢালছে মিডিয়া, রসনাকাব্য রচনার মধ্য দিয়ে। সমকালের ১৬ আগস্টের রিপোর্টটিতে একটি খাবারের বর্ণনা এমনভাবে একটি খাবারকে ভিজুয়ালাইজ করছে যে, তা ক্ষুধার্ত রোজাদারকে স্খলিত করবে: “মানিকের দই-চিড়ায় দই আর সারারাত ভেজানো নরম চিঁড়ার সঙ্গে থাকে ঘোল ও খেজুরের গুড়ে মাখানো মচমচে ভাজা মুড়ি। এ জন্যই এক চামচ মুখে নিলেই মুখ ভরে যায় ঘোল-দইয়ের টক-মিষ্টি স্বাদে। আর চাবাতে শুরু করলেই পাওয়া যায় মচমচে মুড়ি ভাঙার কুড়মুড়ে শব্দ”। এধরনের কাব্যিক বর্ণনানির্ভর ইমেজ তৈরির কাজটিকেই জন ফিস্ক ও জন হার্টলি (ফিস্ক ও হার্টলি, ২০০৩) বর্ণনা করেছেন মিডিয়ার ‘পোয়েটিক ফাংশন’ হিসেবে।

আগেই বলেছি যে, বাজারমুখিন ও শ্রেণীপক্ষপাতি মিডিয়ার ইফতার-বাজার বর্ণনার ক্ষেত্রে প্রথম পছন্দ হলো অভিজাত এলাকার বাজার বর্ণনা। প্রথম আলোয় ১৭ আগস্টের শিরোনাম ‘অন্যরকম আবহ অভিজাত এলাকার ইফতারি বাজারে’ (গুলশান-বনানী), কালের কণ্ঠে ১৬ আগস্টের শিরোনাম ‘ধানমণ্ডির অভিজাত রেস্টুরেন্টে ইফতারি: বৈচিত্র্যেই আগ্রহ বেশি’, প্রথম আলোর ১৬ আগস্টের শিরোনাম ‘বেইলি রোডে দাম চড়া, বিক্রি বেশি’। সেইসব রিপোর্টে অবশ্য অভিজাত এলাকার আভিজাত্যের বর্ণনাও আছে -- দীর্ঘ গাড়ির সারি আর হৈচৈবিহীন বেচাকেনার কথা উল্লেখ আভিজাত্যের পরিচায়ক হিসেবে বর্ণিত হয়েছে।

গতবছর এফএম রেডিওতে শোনা একটি লাইভ ইফতার-রিপোর্ট-এর কথা প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করতে চাই। সেখানে আবার ইফতার রিপোর্ট পড়েছিল ‘প্রডাক্ট প্লেসমেন্ট’-এর খপ্পরে। সংবাদ বা অনুষ্ঠানের মাঝে কায়দা করে পণ্যের নামটি ঢুকিয়ে দেয়ার নাম ‘প্রডাক্ট প্লেসমেন্ট’। ২০০৯ সালের রোজার সময়ে ইফতার-সম্পর্কিত একটি অনুষ্ঠান হতো রেডিও আমার-এ। ঐ অনুষ্ঠানটির স্পন্সর ছিল ম্যাঙ্গো জুস ফ্রুটো। টিএসসি এলাকা থেকে ইফতারের লাইভ রিপোর্ট করছিলেন একজন রিপোর্টার। তিনি স্টেশনের অ্যাঙ্করকে জানাচ্ছিলেন কে কী ইফতার নিয়েছেন এবং বলছিলেন সবার সঙ্গেই রয়েছে পানীয় হিসেবে ফ্রুটো। তিনি এটা জানাতেও কসুর করলেন না যে তিনি নিজেও একটা ফ্রুটো নিয়েছেন এবং অ্যাঙ্করের জন্যও ফ্রুটো রেখেছেন। এভাবে ব্র্যান্ড নিজেই অনুষ্ঠানের টেক্সট হিসেবে ঢুকে যাচ্ছে, পণ্যকে স্থাপন করা হচ্ছে টেক্সটের অংশ হিসেবে।

তবে নির্বাচিত ছয় দিনের পত্রিকায় ইফতারের ওপর ভিন্নধর্মী ও ভালো কিছু রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে প্রথম আলোয়। সেসব রিপোর্টের শিরোনাম হলো: ‘ব্যস্ত দিনের শেষে বুড়িগঙ্গার মাঝির নিরিবিলি ইফতার’ (২১ আগস্ট, পৃষ্ঠা ৩); ‘ইফতারের জন্য ফুটপাতের দোকানই গরিবের ভরসা’ (১৮ আগস্ট, পৃষ্ঠা ১৯); ‘বদলে যায় হাসপাতালও’ (২০ আগস্ট, শেষ পৃষ্ঠা)। গরিব, খেটে খাওয়া এবং সাধারণ জীবনযাপনের বাইরে অবস্থান করছেন যে মানুষ, তাদের জীবনে ইফতারের বাস্তবতা কী, তা উঠে এসেছে এসব রিপোর্টে। রমজানের যে-তাৎপর্য, তার সঙ্গে এধরনের রিপোর্টই বেশি সাযুজ্যপূর্ণ। ভোজনলোলুপতা বাড়ায়, এরকম রিপোর্টের পরিবর্তে, সাধারণ মানুষের জীবনের রমজান কীভাবে উপস্থিত হয়, সেই বাস্তবতাকে তুলে ধরাই হোক রিপোর্টিংয়ের লক্ষ্য।


তথ্যসূত্র: জন ফিস্ক ও জন হার্টলি (২০০৩)। রিডিং টেলিভিশন। লন্ডন: রাউটলেজ।


২২ আগস্ট, ২০১০।

প্রথম প্রকাশ: খালেদ মুহিউদ্দিন সম্পাদিত 'মিডিয়াওয়াচ', ২৯ আগস্ট, ২০১০।


]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/fahmidulhaqblog/29233701 http://www.somewhereinblog.net/blog/fahmidulhaqblog/29233701 2010-09-01 21:18:51
চলচ্চিত্র-সংস্কৃতি বিকাশে অবদান রাখুক বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ জার্নাল
২০০৮ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত ঐ জার্নালের ১ম সংখ্যার সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে, চলচ্চিত্র প্রদর্শন, অনুশীলন ও অধ্যয়নের মাধ্যমে সামাজিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলনে নতুন প্রবাহ ও প্রণোদনা সৃষ্টির মাধ্যমে বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ দেশের চলচ্চিত্র সংস্কৃতির মিলনকেন্দ্রে পরিণত হতে চায়। আর প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠার ত্রিশ বছর পূর্তির শুভলগ্নে জার্নাল প্রকাশনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সম্পাদকীয়তে অবশ্য উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে যে সম্পাদকীয় পরিষদকে চলচ্চিত্র বিষয়ে গবেষণা ও বিশ্লেষণধর্মী লেখার অপর্যাপ্ততার সঙ্কটে ভুগতে হয়েছে। সেই সঙ্কট অবশ্য ৩য় সংখ্যাতেও লক্ষ্যণীয়, তবে জার্নালটির ক্রমোত্তরণ প্রশংসনীয়।

সরকারী প্রতিষ্ঠান হবার পরও আমলাতান্ত্রিক বেড়াজাল ডিঙ্গিয়ে যে ফিল্ম আর্কাইভ চলচ্চিত্র-সংস্কৃতির মিলনক্ষেত্রে পরিণত হতে চায়, এই ইচ্ছাটাই প্রাণশক্তি হয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে সক্রিয় করে তুলেছে। স্মরণ করা যেতে পারে যে সত্তরের দশকের শেষদিকে চলচ্চিত্র সংসদকর্মীদের দাবি ও আন্দোলনের মাধ্যমে ফিল্ম আর্কাইভ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং আর্কাইভের প্রথম অ্যাপ্রিসিয়েশন কোর্সেই মানজারে হাসীন মুরাদ, তানভীর মোকাম্মেল, মোরশেদুল ইসলাম ও তারেক মাসুদরা প্রশিক্ষিত হয়েছিলেন যারা এখন পর্যন্ত শিল্পপ্রয়াসী স্বাধীন ধারার চলচ্চিত্র নির্মাণে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তবে প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতার কারণেই যে সম্পাদক কয়েকটি প্রবন্ধ প্রথম সংখ্যায় প্রকাশ করতে সমর্থ হননি তাও স্বীকার করেছেন। আর চলচ্চিত্র বিষয়ক গবেষণাধর্মী ও বিশ্লেষণধর্মী লেখার লেখক-স্বল্পতার উদ্বেগও কমে আসবে আশা করা যায়। লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে এই জার্নাল ও প্রতিষ্ঠানটির গবেষণা ফেলোশিপের মধ্য দিয়ে বেশ কিছু লেখক-গবেষকও তৈরী হয়ে উঠছেন।

এবার প্রথম সংখ্যার প্রবন্ধসমূহের দিকে চোখ ফেরানো যাক। জাতীয় স্মৃতি রক্ষায় ফিল্ম আর্কাইভের ভূমিকা নিয়ে প্রথম প্রবন্ধটি লিখেছেন আর্কাইভের বর্তমান মহাপরিচালক ও জার্নালের সম্পাদক ড. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসেন। প্রথম সংখ্যার প্রথম প্রবন্ধ হিসেবে এটি লাগসই হয়েছে। প্রবন্ধে ফিল্ম আর্কাইভ প্রতিষ্ঠার পটভূমি, আর্কাইভের কার্যক্রম এবং আর্কাইভকে ঘিরে কিছু প্রশ্ন-বিতর্কের দিকে প্রবন্ধকার আলোকপাত করেছেন। একটি বিতর্ককে এখানে উল্লেখ করতে চাই। প্রবন্ধকার বলছেন ধাতব ক্যান নাকি প্লাস্টিক ক্যান -- কোন ক্যানে ফিল্ম সংরক্ষণ ভালো হয় এটা নিয়ে নাকি বাংলাদেশে কোনো সিদ্ধান্তে আসা যাচ্ছেনা। এজন্য বৈজ্ঞানিক গবেষণা হওয়া দরকার বলে উল্লেখ করেছেন প্রবন্ধকার। আমার মতে এটা নিয়ে খুব বেশি গবেষণার দরকার আছে বলে মনে হয়না। প্রতিষ্ঠিত কোনো আর্কাইভ বা আমাদের মতো আবহাওয়ার কোনো দেশের আর্কাইভ সফর করলেই এর উত্তর জানা যাবে।

সত্যজিতের রাজনৈতিক ছবি, বিশেষত কলকাতা-ত্রয়ী (প্রতিদ্বন্দ্বী, সীমাবদ্ধ ও জনঅরণ্য) নিয়ে বিশ্লেষণধর্মী একটি প্রবন্ধ লিখেছেন নাদির জুনাইদ। তিনি লক্ষ করেছেন জাঁ লুক গদার বা গ্লবার রোশার মতো পরিচালক যেরকম রাজনৈতিক চলচ্চিত্রকার হিসেবে পরিচিত, সত্যজিতের সেরকম পরিচিতি নেই। বরং ‘অরাজনৈতিক’ অভিযোগে অভিযুক্ত সত্যজিৎ। প্রবন্ধকার এই তিনটি চলচ্চিত্র বিশ্লেষণের মাধ্যমে প্রমাণে প্রয়াসী হয়েছেন যে উচ্চকিতভাবে না হলেও সত্যজিৎ, বিশেষত পরের দিককার চলচ্চিত্রসমূহের বদৌলতে একজন রাজনৈতিক চলচ্চিত্রকার। তিনি এজন্য অনেক গবেষকের বরাতে বেশ কিছু উদ্ধৃতি ব্যবহার করেছেন। সেই ব্যবহারের ক্ষেত্রে গবেষণা প্রণালীতে শুদ্ধ থাকার পরও প্রবন্ধকারের নিজস্ব যুক্তি-বিশ্লেষণের স্বল্পতা প্রবন্ধটিকে খানিক দুর্বল করে রেখেছে।

তানভীর মোকাম্মেলের চলচ্চিত্রের আবহসঙ্গীতকার সৈয়দ সাবাব আলী আরজু তার অভিজ্ঞতা প্রসূত একটি প্রবন্ধ লিখেছেন ‘প্রসঙ্গ: চলচ্চিত্রে আবহসঙ্গীত’ শিরোনামে। বিভিন্ন চলচ্চিত্রে যেভাবে তিনি সঙ্গীত শৈলী প্রয়োগ করেছেন তা উদাহরণসহ আলোচনা করায় প্রবন্ধটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পশ্চিমবঙ্গের শিল্পসম্মত চলচ্চিত্রের ওপর একটি পর্যালোাচনামূলক দীর্ঘ প্রবন্ধ লিখেছেন সোমেশ্বর ভৌমিক। সেখানে সত্যজিৎ-ঋত্বিক-মৃণাল থেকে শুরু করে হালের ঋতুপর্ণ পর্যন্ত বিভিন্ন পরিচালকের হাতে বাংলাভাষার শিল্পসম্মত ছবি যেভাবে ঋদ্ধ হয়ে দেশকাল ছাপিয়ে উঠেছে তার প্রেক্ষাপট সমেত বর্ণনা প্রবন্ধকার হাজির করেছেন।

১ম সংখ্যায় দু’টি চলচ্চিত্র সমালোচনা প্রকাশিত হয়েছে -- একটি হলো তারেক ও ক্যাথরিন মাসুদের ‘অন্তর্যাত্রা’ (২০০৬) ও আরেকটি হলো আবু সাইয়ীদের ‘নিরন্তর’ (২০০৬)। চিত্রসমালোচনা হিসেবে ‘নিরন্তর’ ছবির ওপরে শাহীন কবীরের আলোচনা অনেকটা সংগতিপূর্ণ হলেও, ‘অন্তর্যাত্রা’ ছবিটি নিয়ে খন্দকার সাখাওয়াত আলীর আলোচনাটি চলচ্চিত্রের বাইরের কিছু বিষয় (যেমন পরিচালকদের সঙ্গে তার পরিচয়-বন্ধুত্ব ইত্যাদি) অযাচিতভাবে চলে আসায়, দুর্বল হয়ে পড়েছে।

সাজেদুল আউয়ালকৃত ঋত্বিক ঘটকের দুইটি চলচ্চিত্রের চিত্রগ্রাহক এবং তানহা (১৯৬৪) ও চরিত্রহীন (১৯৭৪) ছবির পরিচালক বেবী ইসলামের সাক্ষাৎকারটি গুরুত্বপূর্ণ। বেবী ইসলাম স¤প্রতি পরলোকগত হয়েছেন, মৃত্যুর পূর্বে ঐ সাক্ষাৎকারটি প্রকাশ একটি দায়িত্বশীলতার প্রকাশরূপে বিবেচনা করা যেতে পারে। জার্নালের প্রথম সংখ্যাটি স্বাধীনধারায় নির্মিত দ্বিতীয় চলচ্চিত্র ‘হুলিয়া’র (১৯৮৪) চিত্রনাট্য ছেপে একটি উল্লেখ্যযোগ্য আরেকটি দায়িত্ব পালন করেছে। সঙ্গে পরিচালক তানভীর মোকাম্মেলের ভূমিকাটিও সুপ্রযোজ্য হয়েছে।

চলচ্চিত্রবিষয়ক প্রকাশনার সমালোচনা প্রকাশিত হয়েছে দুইটি। পথিকৃৎ-চলচ্চিত্রকর্মী মুহাম্মদ খসরু সম্পাদিত ‘ধ্র“পদী’ পত্রিকার ওপর আলোচনা করেছেন শৈবাল চৌধুরী। আর গীতি আরা নাসরীন ও ফাহমিদুল হক রচিত গবেষণাগ্রন্থ ‘বাংলাদেশের চলচ্চিত্রশিল্প: সঙ্কটে জনসংস্কৃতি’ শীর্ষক বইয়ের সমালোচনা লিখেছেন শাহাদুজ্জামান। এই গ্রন্থটির সঙ্গে এই লেখক সরাসরি যুক্ত থাকায় সমালোচনাটির ভালোমন্দ নিয়ে কিছু বলছি না। তবে সমালোচক শাহাদুজ্জামানকে ধন্যবাদ দেবার পাশাপাশি একটি বিষয় শুধরে দেবার প্রয়োজন বোধ করছি। সমালোচক এক জায়গায় বলেছেন যে, গীতি আরা এবং ফাহমিদুল প্রচলিত ইতিহাসচর্চা নিয়ে যেমন বিতর্ক তুলেছেন তেমনি ইতিহাসের নতুন দিকে আলোকপাতও করেছেন। আরেক জায়গায় বলছেন, সব মিলিয়ে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসের অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটি বিকল্পপাঠ উপস্থাপন করেছেন গীতি আরা এবং ফাহমিদুল। আসলে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসের ঐ বিকল্পপাঠটি চলচ্চিত্র-গবেষক জাকির হোসেন রাজুর। তার পিএইচডি গবেষণার প্রাপ্ত ফলাফল, ঐ বিকল্পপাঠ। ঐ গ্রন্থে লেখকদ্বয় যথাযথভাবে রাজুকে রেফারেন্সসহ উল্লেখ করার পরও সমালোচকরা (যেমন ‘প্রথম আলো’ পত্রিকায়, ১১ এপ্রিল ২০০৮ তারিখে, ফারুক ওয়াসিফের সমালোচনাতেও এটি দেখা গেছে) মনে করছেন যে ঐ বিকল্পপাঠ, বইয়ের লেখকদ্বয়ের। পাঠকের উপলব্ধির সুবিধার্থে বিষয়টা এখানে খোলাসা করা হলো। অপ্রাসঙ্গিক শোনাক, তবুও বলি, জাকির হোসেন রাজুর পিএইচডি গবেষণাটি অচিরেই বিখ্যাত আন্তর্জাতিক প্রকাশনা-সংস্থা রাউটলেজ থেকে প্রকাশিত হতে যাচ্ছে, যা বাংলাদেশের চলচ্চিত্র নিয়ে আন্তর্জাতিক প্রকাশনা-সংস্থা থেকে প্রকাশিত প্রথম গবেষণাগ্রন্থ হিসেবে স্বীকৃত হবে।

এপর্যন্ত প্রকাশিত তিনটি সংখ্যার প্রত্যেকটিতেই দেখা গেছে প্রথম প্রবন্ধটি চলচ্চিত্র সংরক্ষণ বিষয়ক, ফিল্ম আর্কাইভ জার্নালের যা সঙ্গতিপূর্ণও। ৩য় সংখ্যায় অবশ্য প্রথম দু’টি প্রবন্ধই এই সংক্রান্ত। প্রথমটি লিখেছেন ড. মোঃ ছাবের আলী, শিরোনাম ‘ক্ষতিগ্রস্ত চলচ্চিত্র পুনরুদ্ধারে একটি ফিল্ম হাসপাতালের রূপরেখা’। তিনি ফিল্মের রোগগুলো সনাক্ত করে প্রতিটি ফিল্ম আর্কাইভে, রূপকার্থে, একটি ফিল্ম হাসপাতাল থাকার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন যেখানে ফিল্মের ঐসব রোগ সারানো যাবে। দ্বিতীয় প্রবন্ধটি লিখেছেন অপরেশ কুমার ব্যানার্জী যিনি চলচ্চিত্র সংরক্ষণে বিদ্যমান সমস্যা চিহ্নিত করে তার প্রতিকার নিয়ে আলোচনা করেছেন।

৩য় সংখ্যায় বিচিত্র সব প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। এর বিস্তার ঢাকায় নির্মিত উর্দু চলচ্চিত্র থেকে সিনেমা এ্যান্ড সেক্সুয়ালিটি পর্যন্ত। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র সমালোচনা-গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত ছিল গঙ্গাযাত্রা, চন্দ্রগ্রহণ, সাজশিল্পী এবং মাটির ময়না। এছাড়া রয়েছে চলচ্চিত্র বিষয়ক গ্রন্থালোচনা, প্রবীণ অভিনেতা আনোয়ার হোসেনের সাক্ষাৎকার, ২০১০ সালে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন চলচ্চিত্র উৎসবের রিপোর্ট, ফিল্ম আর্কাইভ জার্নালের পূর্ববর্তী সংখ্যার রিভিউয়ের পুনর্মুদ্রণ, বাংলাদেশী সিনেমার প্রথম যুগের কিছু লেখার পুনর্মুদ্রণ এবং ২০০৯-১০ সালে ফিল্ম আর্কাইভের কার্যক্রমের রিপোর্ট।

যাত্রা ও লোকমাধ্যমের গবেষক ড. তপন বাগচী ‘বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে লোকজীবনের উপস্থাপনা’ শীর্ষক প্রবন্ধে জহির রায়হানের বেহুলা (১৯৬৬), সালাহউদ্দিনের রূপবান (১৯৬৫), দীলিপ সোমের সাত ভাই চম্পা (১৯৬৮) ও তোজাম্মেল হক বকুলের বেদের মেয়ে জোসনা (১৯৮৯) -- এই চারটি চলচ্চিত্র বিশ্লেষণ করে ঐসব ছবিতে লোকজীবনের উপস্থাপনা অনুসন্ধান করেছেন। তিনি চলচ্চিত্রগুলোর লোকসাহিত্য-উৎস, লোকাচার-লোকানুষ্ঠান, লোকশিল্প বা শিল্পগত ফোকলোর, লোকবিজ্ঞান ও কারিগরি ইত্যাদি থিমের আলোকে চলচ্চিত্রগুলোকে বিশ্লেষণ করেছেন। প্রবন্ধশেষে তিনি বলছেন, আমাদের লোকজীবনের অনুষঙ্গ চলচ্চিত্রে রূপ দিয়ে চলচ্চিত্রের হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনা যায় -- যা পর্যবেক্ষণ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ। চারটি চলচ্চিত্রের মধ্যে বেদের মেয়ে জোসনা নিয়ে বিশ্লেষণের পরিধি কমই দেখা গিয়েছে, যেক্ষেত্রে ফাদার গাস্তঁ রোবের্জ ও ফরহাদ মজহারের মতো পণ্ডিতেরা ছবিটির অনুপুঙ্খ বিশ্লেষণ ইতোমধ্যে করেছেন। চারটি ছবিই লোকসাহিত্য থেকে অ্যাডাপশন করা হয়েছে, আর সমৃদ্ধ লোকসাহিত্যকে চলচ্চিত্রে পুনরুৎপাদনের ক্ষেত্রে ছবিগুলো কতটা সফল বা বিফল হয়েছে, তা গবেষকের বিশ্লেষণে উঠে আসেনি। সেক্ষেত্রে চলচ্চিত্রগুলোর আঙ্গিক ও ভাষা নিয়ে আলোচনা করলে প্রবন্ধটি পূর্ণাঙ্গ হতো।

এই অপূর্ণাঙ্গতা দেখা যাবে অহিদুজ্জামান ডায়মন্ডের গঙ্গাযাত্রা ও মুরাদ পারভেজের চন্দ্রগ্রহণ নিয়ে যে চলচ্চিত্র-সমালোচনা প্রকাশিত হয়েছে তাতেও। গঙ্গাযাত্রা নিয়ে লিখেছেন শারফুদ্দিন আনাম এবং চন্দ্রগ্রহণ নিয়ে আলোচনা করেছেন মনি হায়দার। আলোচনা দুটো মনোগ্রাহী হলেও অপূর্ণাঙ্গ। কারণ এই আলোচনা দুটোতে কেবল কাহিনী ও চরিত্রবিশ্লেষণ করা হয়েছে। সাহিত্যের জন্য সবসময় জরুরি না হলেও, চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে আঙ্গিক নিয়ে আলোচনা জরুরি। অবশ্য কোনো চলচ্চিত্রের সঙ্গে সামাজিক, রাজনৈতিক বা সাংস্কৃতিক প্রপঞ্চকে মিলিয়ে অধ্যয়ন ভিন্ন কথা, কিন্তু যখন কেবলই একক চলচ্চিত্রটির সমালোচনা করা হচ্ছে তখন ফিল্ম টেকনিক নিয়ে আলোচনা অপরিহার্য। সমালোচক মনি হায়দার অবশ্য স্বীকার করেছেন, “আমি জানি চলচ্চিত্রের একটি নিজস্ব ভাষা আছে। সে ভাষা অনুধাবন করার জন্য ব্যাপক পঠন পাঠন দরকার। যা আমার নেই।” একটি চলচ্চিত্রবিষয়ক জার্নালে যে সমালোচনা প্রকাশিত হবে তাতে চলচ্চিত্র-ভাষার পঠন-পাঠনযুক্ত রচনাই কাম্য।

৩য় সংখ্যার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ লিখেছেন ড. কাবেরী গায়েন। কোরীয় চলচ্চিত্রকার ও চলচ্চিত্র-তাত্ত্বিক কিম সোইয়ং-এর উইমেন’স হিস্ট্রি ট্রিলজি নিয়ে সেমিনার হয়েছিল ২০০৯ সালের নভেম্বরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেই সেমিনারের আলোচক ড. গায়েন পরে প্রবন্ধ লিখেছেন ফিল্ম আর্কাইভ জার্নালের জন্য। সোইংয়ের তিনটি প্রামাণ্যচিত্রে কোরীয় নারীর একটি ভিন্ন ইতিহাস রচিত হয়েছে। চলচ্চিত্র তিনটি ছিল কোরিয়ু: সাউদার্ন উইমেন এন্ড সাউথ কোরিয়া (২০০৩), আই’ল বি সিয়িং হার (২০০৩) এবং নিউ উইমেন: হার ফার্স্ট সঙ (২০০৪)। গবেষকের বিশ্লেষণমতে, তিন প্রজন্মের তিন ধরনের কোরীয় নারীকে আমরা ট্রিলজিতে দেখতে পাই। সেখানে ‘ওনমুনজায়েমুন’ (মৃতব্যক্তির জন্য বিলাপরচয়িতা) নারী যেমন আছেন, তেমনি আছেন আজকের আধুনিক কোরীয় নারী -- নিউ উইমেন। আর এই নারীদের মধ্যে একটি সাধারণ ডায়াস্পোরিক অস্তিত্ব বহমান। প্রথম নারী তার মাতাপিতার বাড়ি থেকে শ্বশুরবাড়িতে অভিবাসী হয়েছেন, মধ্যম পর্বের নারীদের একজন বিদেশে স্বামীর সঙ্গে অভিবাসী হয়েছেন আর তৃতীয়জন কারও কাছে বা কারও সঙ্গে নয়, নিজেই অন্য শহরে যাচ্ছেন স্বাধীকার ও জীবিকার জন্য। কিম সোইয়ং-এর প্রামাণ্যচিত্র তাত্ত্বিক, সেখানে কোনো ধরনের বিনোদনের আশা করা বৃথা। তবে ছবিতে তীক্ষ্ণধী ও দৃঢ়চেতা এক ন্যারেটরকে পাওয়া যায়। ড. কাবেরী গায়েনের প্রবন্ধেও সেই সুর অক্ষুণœ আছে।

ফাহমিদুল হক ও শান্তি বলরাজ লিখেছেন বাংলাদেশের চলচ্চিত্র মাটির ময়না নিয়ে। ছবিটি কীভাবে বাঙালি-মুসলমানের আত্মপরিচয়কে তুলে ধরেছেন সেইদিকে আলোকপাত করা হয়েছে প্রবন্ধে। প্রবন্ধের শিরোনাম ‘দি ক্লে বার্ড: আইডেন্টিটি কনস্ট্রাকশন অব বেঙ্গলি মুসলিমস অন দ্য স্ক্রিন’। প্রবন্ধকারদ্বয় বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটকে বিবেচনায় রেখে বাঙালি-মুসলমানের আত্মপরিচয়ের তিনটি এ্যাপ্রোচের কথা উল্লেখ করেছেন। এগুলো হলো বাঙালিত্ব (বাঙালি জাতীয়তাবাদ), মুসলমানিত্ব (ইসলামপ্রভাবিত বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ) এবং লোকধর্ম (বৌদ্ধিক তান্ত্রিকতা, বৈষ্ণববাদ ও সুফিবাদ প্রভাবিত গৌণধর্মসমূহ)। বিশ্লেষণে বেরিয়ে এসেছে যে মাটির ময়না ছবিতে এই তিন ধরনের আত্মপরিচয়কেই চিত্রিত করা হয়েছে কিন্তু লোকধর্মের প্রতি চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদের পক্ষপাত স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

কলকাতার গবেষকের জটিল শিরোনামের প্রবন্ধ ‘ত্রয়ী চলচ্চিত্রকারের প্রাক-পটভূমির উৎসমুখের সন্ধানে’। শিরোনাম কোনোকিছু স্পষ্ট না করলেও, প্রবন্ধ পড়ে বোঝা গেল, কলকাতার ত্রয়ী চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ-ঋত্বিক-মৃণাল-এর আবির্ভাবের পূর্বে বাংলা সিনেমার উল্লেখযোগ্য ঘটনাবলীর ওপর প্রবন্ধটি রচিত যাতে হীরালাল সেনের প্রাথমিক উদ্যোগ থেকে শুরু করে নিমাই ঘোষের প্রখ্যাত চলচ্চিত্র ‘ছিন্নমূল’ পর্যন্ত আলোচনা বিস্তৃত হয়েছে। প্রমথেস বড়–য়ার বাণিজ্যিক সফলতা, গণনাট্য সংঘ বা আইপিটিএ-এর অবদান, ক্যালকাটা ফিল্ম সোসাইটির উদ্যোগ ইত্যাদি বিষয়ের ওপরে প্রবন্ধকার আলোকপাত করেছেন।

এই কয়েকটি বৃহৎ প্রবন্ধ ছাড়াও আরও কয়েকটি ছোট আকারের গবেষণা-প্রবন্ধ ৩য় সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে। মোঃ নজরুল ইসলাম লিখেছেন ঢাকায় নির্মিত উর্দু চলচ্চিত্রের ওপর। সৈয়দা নিগার বানুর প্রামাণ্যচিত্র সাজশিল্পীর ওপরে কাজ করেছেন আশরাফী বিন্তে আকরাম। মান্দি নারীরা ঢাকার বিউটি পার্লারে কাজ করে থাকেন; সংখ্যালঘু পরিচয়, দারিদ্র্য ও কর্মহীনতার কারণে তাদের অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতি বা ইন্টারনাল মাইগ্রেশন ঘটেছে -- এই দিকটায় আলোকপাত করেছেন গবেষক। ভারতীয় গবেষক পূজা দাস সরকার লিখেছেন সিনেমা এ্যান্ড সেক্সুয়ালিটি (সিনেমা এ্যান্ড সেক্সুয়ালিট: অন দ্যা ডেথ অব দ্য ডিজায়ারিং ওম্যান) নিয়ে। নিবন্ধটি আলোচনা হিসেবে ভালো, কিছু ছবির উদাহরণও দিয়েছেন লেখক, কিন্তু কোনো ছবি নিয়ে গভীরতাধর্মী গবেষণায় প্রবন্ধকার যাননি। শৈবাল চৌধুরী বাংলাদেশের চলচ্চিত্রনির্ভর পত্র-পত্রিকার একটি ঐতিহাসিক বর্ণনা দিয়েছেন তার প্রবন্ধে। সৈয়দ সালাহউদ্দিন জাকীর নিবন্ধ ‘জার্নাল-চিন্তা থেকে ফিল্ম ইনস্টিটিউট-ভাবনা’ সুখপাঠ্য, কিন্তু তাতে গবেষণাধর্মিতার লেশমাত্র নেই। এটি যেকোনো চলচ্চিত্রবিষয়ক সাময়িকপত্রের জন্য ঠিক আছে, কিন্তু জার্নালের জন্য খাপ খায় না।

স¤প্রতি প্রকাশিত চলচ্চিত্রবিষয়ক গ্রন্থ বাংলাদেশের চলচ্চিত্র: আর্থামাজিক পটভূমি (আহমেদ আমিনুল ইসলাম)-এর ওপরে আলোচনা করেছেন ফারজানা ইয়াসমিন। বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ প্রকাশিত তিনটি গ্রন্থের (তপতী বর্মণ ও ইমরান ফিরদাউসের বাংলাদেশের শিশুতোষ চলচ্চিত্র: একটি সমাজতাত্ত্বিক সমীক্ষা, অদিতি ফাল্গুনী গায়েন ও হুমায়রা বিলকিসের বাংলাদেশের জনপ্রিয় ধারার চলচ্চিত্র ও সিনে সাংবাদিকতার আন্তঃপ্রভাব এবং বিকাশ চন্দ্র ভৌমিকের ওমেন অন স্ক্রিন: রেপ্রিজেন্টিং ওমেন বাই ওমেন ইন বাংলাদেশ) ওপর আলোচনা করেছেন হাবিবা রহমান এবং তিন চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্বের জীবনগ্রন্থের (সুহৃদ জাহাঙ্গীরের উদয়ন চৌধুরী, হারুনর রশীদের চলচ্চিত্রকার সালাহ্উদ্দিন এবং অব্যয় রহমানের সুমিতা দেবী) ওপরে আলোচনা করেছেন মনিস রফিক। অন্যান্য সংখ্যার মতো ৩য় সংখ্যাতেও একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়েছে। অভিনেতা আনোয়ার হোসেনের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ড. সাজেদুল আউয়াল।

জার্নালটির সার্বিক কিছু দিকে আলোকপাত করে আলোচনা শেষ করবো। জার্নালটি দ্বিভাষিক, কিন্তু ইংরেজি প্রবন্ধের সংখ্যা খুবই কম। তৃতীয় সংখ্যায় মাত্র দুইটি ইংরেজি ভাষায় লিখিত প্রবন্ধ আছে। যদি সব প্রবন্ধই বাংলা হতো, কোনো সমস্যা ছিলনা। কিন্তু দ্বিভাষিক জার্নাল হতে হলে এখানে অবশ্যই শতকরা ৩০-৪০ ভাগ প্রবন্ধ ইংরেজি ভাষায় লিখিত হওয়া উচিত। ইংরেজি ঘাটতি পূরণ করতে হলে আরেকটা উপায় হতে পারে, প্রতিটি প্রবন্ধের শুরুতে একটা অ্যাবস্ট্রাক্ট বা প্রবন্ধসংক্ষেপ ইংরেজিতে দেয়া, প্রবন্ধটি বাংলায় লিখিত হলেও। সম্পাদকীয় দায়িত্ব এতে বাড়বে, কিন্তু জার্নালটি যদি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেতে চায় এছাড়া গত্যন্তর নেই।

জার্নালটির রেফারেন্স স্টাইলে কোনো সাধারণীকরণ বা ইউনিফর্মিটি নেই। একেক প্রবন্ধে একেক ভাবে রেফারেন্স ব্যবহার করা হয়েছে যা সম্পাদকীয় দুর্বলতা প্রকাশ করে। এমনকি কোনো প্রবন্ধে রেফারেন্স-এর বাংলা লেখা হয়েছে গ্রন্থপঞ্জি, কোথাও বা তথ্যনির্দেশ। ১ম সংখ্যার প্রচ্ছদ ডিজাইন খুব সাধারণ ছিল, কিন্তু ৩য় সংখ্যার প্রচ্ছদটি দৃষ্টিনন্দন হয়েছে। ড. সাজেদুল আউয়াল এবারের প্রচ্ছদটি করেছেন সুভাষ দত্ত চিত্রিত মাটির পাহাড় চলচ্চিত্রের গানের বই-এর প্রচ্ছদের ভিত্তিতে।

প্রবন্ধগুলো বাংলাদেশের ছবির ওপরে লিখিত হওয়াই ভালো। বিদেশী চলচ্চিত্র বলতে ভারতীয় বাংলা বা দক্ষিণ এশীয় চলচ্চিত্র পর্যন্ত যাওয়া যেতে পারে। ২য় সংখ্যায় পোলিশ চলচ্চিত্রকার কিসলোভস্কির থ্রি কালারস ট্রিলজির ওপরে একটি প্রবন্ধ ছাপা হয়েছিল, ইংরেজিতে। কিসলোভস্কির ওপরে অসংখ্য প্রবন্ধ ইংরেজিভাষায় ছাপা হয়েছে, বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ জার্নালে এধরনের প্রবন্ধ ছাপার কোনো অর্থ নেই। ৩য় সংখ্যায় পূজা দাস সরকারের ইংরেজি নিবন্ধটিও কেবল ভারতীয় ছবির ওপরে আলোকপাত করলে ভালো হতো।

তবে জার্নালটির ক্রমোত্তরণের পরিপ্রেক্ষিতে সম্পাদক ড. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসেন এবং নির্বাহী সম্পাদক ড. সাজেদুল আউয়াল অবশ্যই ধন্যবাদার্হ হবেন। ড. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর বর্তমানের বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ ছেড়ে অন্য প্রতিষ্ঠানে সরকারী আদেশে বদলী হয়েছেন। জার্নালটি তার উদ্যোগেই শুরু হয়েছিল, আশা করি বর্তমান ও ভবিষ্যতের মহাপরিচালকেরা জার্নালটি নিয়মিত প্রকাশনা চালিয়ে যাবেন এবং এভাবে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র-সংস্কৃতি ও চলচ্চিত্র অধ্যয়নের অ্যাকাডেমিক ক্ষেত্রে জার্নালটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সমর্থ হবে।

২৬ জুলাই, ২০১০।

প্রথম প্রকাশ: খালেদ মুহিউদ্দিন সম্পাদিত 'মিডিয়াওয়াচ', ২৬ জুলাই (বর্ষ ১, সংখ্যা ৩৫)। ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/fahmidulhaqblog/29213167 http://www.somewhereinblog.net/blog/fahmidulhaqblog/29213167 2010-08-02 01:05:01
দুই সাংবাদিকের চাকরিচ্যুতি এবং ইসরায়েলদরদী মার্কিন মিডিয়া ইরাকে ইঙ্গ-মার্কিন আগ্রাসনের প্রাক্কালে টেলিভিশন চ্যানেল এনবিসি তাদের প্রতিবেদক পিটার আরনেটকে চাকরিচ্যুত করেছিল, ইরাকি টেলিভিশনকে সাক্ষাৎকার দেবার জন্য ও ইরাকি তথ্য-মন্ত্রণালয়ের প্রশংসা করার জন্য। বিখ্যাত টকশো-উপস্থাপক ফিল ডোনাহুকে এমএসএনবিসি চাকরিচ্যুত করেছিল, তিনি যুদ্ধবিরোধী লোকজনকে তার অনুষ্ঠানে ডেকে আনছিলেন বলে। ওয়েবসাইট ইয়োলোটাইমস-কে যুদ্ধবিরোধী প্রতিবেদন চালিয়ে যাবার জন্য বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। টেক্সাসের লিউইসভিল লিডার পত্রিকার কলামিস্ট ব্রেট ফ্লিনের কলাম বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল, কারণ তিনি যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভে সরাসরি অংশ নিয়েছিলেন।

আমেরিকার মিডিয়াগুলো এরকমই যে, মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে অন্য দেশে আগ্রাসন-সংঘাতের উদ্যোগ নেয়া হলে তারা তার আগ্রাসনের ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে থাকে, লাগাতার বকবকানির মধ্য দিয়ে। তাদের টকশো এবং সংবাদবিশ্লেষণে হাজির করা হয় সামরিক আমলাদের এবং ‘নিওকন’দের (আমেরিকায় ‘নিওকনজারভেটিভ’ তারাই যারা মনে করেন মার্কিন অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে অন্য দেশে উদারনৈতিকতা, গণতন্ত্র ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করা দরকার), যারা আফগানিস্তানে ওসামা বিন লাদেন থাকার কারণে, সাদ্দামের রাসায়নিক অস্ত্র থাকার কারণে কিংবা ইরানে পরমাণু অস্ত্র থাকার কারণে আক্রমণটা করাই উচিত বলে রায় দেন। আর প্যালেস্টাইনে দখলদারী ইসরায়েলের হামলাকে ‘নিজেকে রক্ষা করার’ মতো ন্যায্যতায় নামিয়ে আনতে সচেষ্ট থাকেন। তাদের আলোচনায় আগ্রাসনের যৌক্তিকতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন থাকেনা, বরং নতুন নতুন লক্ষ্যভেদী অস্ত্রগুলো বেসামরিক মানুষের কোনো ক্ষতি না করে কিরকম সূক্ষতায় কেবল লক্ষ্যস্থলে আঘাত হানে, তার প্রশংসা করা হয়। এর ব্যতিক্রম ঘটলে বা উল্টো কিছু ঘটলে সাংবাদিকের চাকরি বরবাদ হয়ে যায়। নিবন্ধের শুরুতেই তার কিছু উদাহরণ দেয়া হয়েছে।

ইরাকে আগ্রাসন সমাপ্ত হয়েছে। তাই ঐ ফ্রন্টিয়ারের কোনো সাংবাদিক আর চাকরি হারাচ্ছেন না। কিন্তু প্যালেস্টাইনে ইসরায়েলের হামলা চলছেই। ইসরায়েল-দরদী মার্কিন প্রশাসন ও মার্কিন মিডিয়া স¤প্রতি চাকরি খেয়েছে দু’জন সাংবাদিকের-- দুজনই লেবানিজ-আমেরিকান খ্রিস্টান নারী। একজনের নাম ওক্টাভিও নাসর এবং আরেকজন হলেন হেলেন থমাস। প্রথমজন চাকরি খুইয়েছেন সিএনএন থেকে। তার অপরাধ ছিল তিনি আমেরিকার তালিকায় সন্ত্রাসী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত লেবাননের এক ধর্মীয় নেতার মৃত্যুতে শোকপ্রকাশের সময় তার প্রশংসা করেছিলেন। দ্বিতীয়জনকে বাধ্যতামূলক অবসর দেয়া হয়েছে হোয়াইট হাউস থেকে। তিনি বলেছিলেন ইসরায়েলিদের প্যালেস্টাইন থেকে সরে পৃথিবীর অন্য যেকোনো জায়গায় চলে আসা উচিত।

ওক্টাভিও নাসর বিগত ২০ বছর ধরে সিএনএন-এ কাজ করছিলেন। তিনি ছিলেন সংবাদনেটওয়ার্কটির মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক একজন সিনিয়র সম্পাদক। তিনি লেবাননের ধর্মীয় নেতা সৈয়দ মোহাম্মদ হুসেন ফাদলাল্লাহর মৃত্যুতে, সিএনএন-এ নয়, নিজস্ব টুইটার পোস্টে লিখেছিলেন, “সৈয়দ মোহাম্মদ হুসেন ফাদলাল্লাহর মৃত্যুতে আমি দুঃখভারাক্রান্ত ...। তিনি একজন বড় হিজবুল্লাহ, যাকে আমি শ্রদ্ধা করি।” ব্যস, তীব্র প্রতিক্রিয়া ধেয়ে আসে তার দিকে। মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকভুক্ত ‘সন্ত্রাসী’র মৃত্যুতে শোকপ্রকাশ করা সিএনএন-এর একজন সাংবাদিকের জন্য গর্হিত অপরাধ! ভড়কে গিয়ে নাসর দুঃখপ্রকাশ করেন। তার বক্তব্যের ব্যাখ্যা দেন যে, ফাদলাল্লাহকে তিনি শ্রদ্ধা করেন, এর কারণ হলো তিনি নারীদের অধিকারের বিষয়ে কথা বলে থাকেন। কিন্তু শেষরক্ষা হয়নি। চাকরিচ্যুতি এড়ানো যায়নি। ২০ বছরের সেবা, এক টুইটে শেষ।

লেবানিজ-আমেরিকান হিসেবে লেবাননের একজন নেতার মৃত্যু নাসরকে ব্যক্তিগতভাবে আগ্রহী করে তুলেছিল। অথচ কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বিবৃতি বা সংবাদপরিবেশন না হবার পরও, ব্যক্তিগত টুইটে প্রকাশিত একটি শোকবার্তা প্রাতিষ্ঠানিক ফলাফল বয়ে আনলো। হিজবুল্লাহ নেতা ফাদলাল্লাহ নিশ্চয়ই ভয়ঙ্কর লোক ছিল তাহলে। মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিন ধরে সাংবাদিকতায় যুক্ত লন্ডনভিত্তিক দি ইন্ডিপেন্ডেন্ট পত্রিকার সাংবাদিক রবার্ট ফিস্ক (ফিস্ক, ২০১০) জানাচ্ছেন, ফাদলাল্লাহ আদতে হিজবুল্লাহর লোকই নন। কিন্তু সেটা বড় কথা নয়। তিনি নিঃসন্দেহে একজন বড় মানুষ। তিনি একজন লেখাপড়া জানা অসাধারণ এবং ন্যাপরায়ণ মানুষ। তিনি নারীর অধিকারে বিশ্বাস করেন, ‘পারিবারিক সম্মান বাঁচাতে নারী হত্যা’কে (অনার কিলিং) ঘৃণা করেন। ইরানের ধর্মীয় সমাজব্যবস্থার সমালোচক তিনি। শিয়া হবার পরেও, তিনি শিয়াদের রক্তাক্ত আশুরা পালন বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন। এসব সদউদ্যোগের বিপরীতে তার সন্ত্রাসী আচরণ বলতে গেলে-- তিনি পৃথিবীর প্রায় সব মানুষের মতোই মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নীতির বিরোধী ছিলেন। ১৯৮২ সালে ইসরায়েলের লেবানন দখলের সময়ে লেবাননের প্রতিরোধকে সমর্থন জানিয়েছিলেন। ১৯৮৩ সালে বৈরুতে অবস্থি আমেরিকার মেরিন ঘাঁটিতে আত্মঘাতী বোমা হামলায় ২৪১ জন নিহত হয়েছিল। এ ঘটনা সম্পর্কে আমেরিকা বলেছিল যে হামলাকারীদের ওপর ফাদালাল্লাহর আশীর্বাদ আছে। ফিস্ক বলছেন (ফিস্ক, ২০১০), বিষয়টি ফাদালাল্লাহ আমার কাছে সবসময় অস্বীকার করেছেন এবং আমি তার কথা বিশ্বাস করি। আমরা জানি, আত্মঘাতী হামলাকারীরা উন্মাদের মতো থাকে, তাদের কারো আশীর্বাদের প্রয়োজন পড়েনা। তারা ভাবে, তারা আল্লাহর কর্তব্যপালন করছে, ফাদলাল্লাহর মতো মানুষদের কোনো সাহায্য তাদের দরকার নেই। কিন্তু তার পরও ১৯৮৫ সালে ওয়াশিংটন সৌদি আরবের অর্থ খরচ করে গাড়িবোমা হামলা করে ফাদলাল্লাহকে হত্যার চেষ্টা করে। ফাদলাল্লাহ সে আক্রমণ থেকে বেঁচে যান, কিন্তু ৮০ জন নিরীহ মানুষ সে হামলায় নিহত হয়।

এহেন ফাদলাল্লাহ, আপনি যদি তাকে ঠিকমতো জানেন, তাহলে তার মুত্যুতে আপনার মনও ভারাক্রান্ত হবে। নাসর একজন লেবানিজ হিসেবে, মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সম্পাদক হিসেবে, ঠিক তাই করেছেন। অনুসন্ধানে জানা গেল, নাসর কোনোকালেই ঠিক প্যালেস্টাইন-দরদী বা ইসরায়েল-বিদ্বেষী ছিলেন না। মার্কিন এক প্রাধান্যশীল মিডিয়াতে টিকে থাকার জন্য যতটুকু বিশ্বস্ততা দরকার, নাসরের তা পুরোমাত্রায়ই ছিল। কিন্তু ব্যক্তিগত মানসিক আর্দ্রভাব তার জন্য পেশাগত বিপর্যয় ডেকে আনলো। এখানে একটা নিরীহ প্রশ্ন তুলে রাখি: মার্কিন প্রশাসন যাকে ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করে রেখেছে, তার মৃত্যুতে ব্যক্তিগত পর্যায়ে শোকপ্রকাশের কারণে কেন সিএনএন-এর সাংবাদিক চাকরি হারাবেন? মার্কিন নীতি আর সিএনএন-এর নীতিতে কি কোনো ফারাক নাই? গণতন্ত্র, মানবাধিকার আর মতপ্রকাশের স্বাধীনতার চূড়ায় যাদের বসতবাড়ি, তারা কোন নীতিতে মধ্যপ্রাচ্যনীতি নির্ধারণ করে রেখেছেন?

জুলাই, ২০১০ মাসে যদি নাসর চাকরি হারান, তবে জুন মাসে বাধ্যতামূলক অবসর দেয়া হয়েছে হেলেন থমাসকে। তিনি একজন বর্ষীয়ান সাংবাদিক (জন্ম ১৯২০), ছিলেন হার্স্ট নিউজপেপার-এর কলামিস্ট এবং হোয়াইট হাউস-এর সংবাদদাতা। কিন্তু এর আগে ৫৭ বছর তিনি সংবাদ-এজেন্সি ইউনাইটেড প্রেস ইন্টারন্যাশনাল-এর (ইউপিআই) এর সংবাদপ্রতিনিধি ও হোয়াইট হাউসের ব্যুরো চিফ হিসেবে কাজ করেছেন। তিনি আইজেনহাউয়ার থেকে ওবামা সব প্রেসিডেন্টকে কাভার করেছেন। জুনিয়র বুশকে প্রশ্নবাণে বিরক্ত করার জন্য তিনি বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। একবার তিনি ওবামাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, আপনার কি মনে হয় মধ্যপ্রাচ্যের কোনো দেশে আদৌ পারমাণবিক অস্ত্র আছে? ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে মার্কিন প্রশাসনের সা¤প্রতিক তৎপরতার বিপরীতে উত্তর হতো, অন্তঃত একটি দেশের তো আছেই, আর তা হলো ইসরায়েল। কিন্তু ওবামা এই প্রশ্নের উত্তর দেননি। কিন্তু উত্তর তো সবার জানাই। ওবামাকে প্রশ্নটি ভালোই বিব্রত করেছিল। এভাবেই হোয়াইট হাউসের ব্যতিক্রমী সাংবাদিক হিসেবে হেলেন তার দায়িত্ব পালন করছিলেন, স্রোতের উজানে বৈঠা ঠেলে টিকেও ছিলেন। কিন্তু একদিন তিনি গোলমাল করে ফেললেন। সেদিন একটু বেশিই বলে ফেললেন তিনি ।

২৭ মে, ২০১০ তারিখে, হোয়াইট হাউসে, ইহুদি ঐতিহ্য পালন দিবসে ডেভিড নেসেনঅফ হেলেন থমাসের সাক্ষাৎকার নিলেন:
নেসেনঅফ: ইসরায়েল নিয়ে আপনার মন্তব্য কী? আজ আমরা সবাইকে ইসরায়েল সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছি।
হেলেন: তাদের প্যালেস্টাইন থেকে সরে যেতে বলো।
নেসেনঅফ: উউউ! ইসরায়েল নিয়ে কোনো ভালো কথা?
হেলেন: মনে রেখ, ওটা ওদের ভূমি এবং ওটা দখল করা হয়েছে। ওটা জার্মানি নয়, পোল্যান্ডও নয় ...।
নেসেনঅফ: তাহলে তারা কোথায় যাবে? তারা কী করবে?
হেলেন: ওদের নিজের বাড়ি যেতে বলো।
নেসেনঅফ: বাড়ি কোথায় ওদের?
হেলেন: পোল্যান্ড, জার্মানি।
নেসেনঅফ: আপনি বলছেন ইহুদিদের পোল্যান্ড বা জার্মানিতে চলে যেতে হবে?
হেলেন: আমেরিকাতেও যেতে পারে, বা অন্য যেকোনো জায়গায়। শত শত বছর ধরে ওখানে যারা বাস করছে, তাদের ঠেল কেন বাবা? ভেবে দেখ।

এরকম বিধ্বংসী মন্তব্যের প্রতিক্রিয়া দ্রুতই দেখতে পেলেন হেলেন। ফলে দ্রুত ক্ষমাও চাইলেন: গত সপ্তাহে ইসরায়েল ও প্যালেস্টাইন সম্পর্কে আমি যা বলেছি তার জন্য দুঃখপ্রকাশ করছি। আমি আসলে যা মনে করি, ঐ মন্তব্যে তা প্রতিফলিত হয়নি। আমি মনে করি, মধ্যপ্রাচ্যে তখনই শান্তি আসবে যখন জড়িত পক্ষগুলো পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহিষ্ণুতা প্রদর্শনের চাহিদা অনুভব করবে। সেই দিন শিগগীরই আসুক। কিন্তু এতে শেষরক্ষা হয়নি। হেলেনের এজেন্সি নাইন স্পিকার্স ইনকর্পোরেটেড ক্লায়েন্ট হিসেবে তাকে বাদ দিয়ে দেয়। ক্রেইগ কফোর্ড হেলেনের সঙ্গে লিসেন আপ মিস্টার প্রেসিডেন্ট শীর্ষক যে গ্রন্থ-প্রকল্পে যুক্ত ছিলেন, তা থেকে হেলেনকে বাদ দিয়ে দেন। মেরিল্যান্ডের এক স্কুলে তার বক্তৃতা দেবার কথা ছিল, তা বাতিল করা হয়। ৭ জুন, ২০১০ তারিখে বর্তমান কর্মস্থল হার্স্ট নিউজপেপার থেকে তিনি ইস্তফা দিতে বাধ্য হন। ইস্তফা দিতে বাধ্য হন হোয়াইট হাউস সংবাদদাতার পদ থেকেও। প্রেসিডেন্ট ওবামা হেলেনের বক্তব্যকে ‘আক্রমণাত্মক’ ও ‘সীমালঙ্ঘনকারী’ হিসেবে বর্ণনা করেন এবং তার বাধ্যতামূলক অবসরকে ‘সঠিক সিদ্ধান্ত’ বলে রায় দেন। ঐ ঘটনার পর হেলেনকে তিরস্কৃত করা এবং তার বক্তব্যের প্রতি নিন্দাজ্ঞাপনকারীদের সংখ্যা ছিল অনেক। হিজবুল্লাহ ও হামাস অবশ্য হেলেনের ঐ বক্তব্যের প্রশংসা করে বিবৃতি দেয়। রালফ নাদের, জেমস জগবি এবং পল জে-র মতো দীর্ঘদিনের ইসরায়েল-সমালোচকরা হেলেনের বক্তব্যকে সমর্থন জানান।

এই দুই নারী-সাংবাদিকের চাকরিচ্যুতি আবারো প্রমাণ করলো যে, ইহুদি-লবি প্রভাবিত মার্কিন প্রশাসন এবং পশ্চিমা মিডিয়ার, ইসরায়েলের অন্যায় আগ্রাসনের প্রতি প্রচ্ছন্ন সমর্থন আছে, এবং প্যালেস্টাইনিদের প্রতিরোধের প্রতি একধরনের বিরাগ রয়েছে। ‘সন্ত্রাসী’, ‘জঙ্গি’, ‘চরমপন্থী’ ইত্যাদি নানা অভিধায় অভিযুক্ত করে প্যালেস্টাইনি মুসলমানদের ন্যায্য প্রতিরোধের প্রেক্ষাপটকে আড়াল করে ফেলা হয়। মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই কাজটি লাগাতারভাবে চালিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব মিডিয়াগুলো ভালোভাবেই পালন করছে।

পশ্চিমা মিডিয়ার কাছে ‘সন্ত্রাসী’ হলো তারাই যারা সরকার ও মিডিয়া চিহ্নিত শত্র“। আরেক ধরনের লোক সরকার ও মিডিয়ার কাছে শত্র“। এরা হলো তাদের বন্ধুদের শত্র“। ইসরাইলের বিরুদ্ধে প্যালেস্টাইনের যুগ যুগ ধরে চালিয়ে যাবার সংগ্রামের সংবাদে প্যালস্টাইনিরা মিডিয়ার দিক থেকে ‘বন্ধুর শত্র“’ ট্রিটমেন্ট পেয়েছে। প্রথমত পশ্চিমা মিডিয়ায় প্যালেস্টাইন-ইসরাইল সংঘাত সবসময় মধ্যপ্রাচ্য-সংকট হিসেবে ‘নিরপেক্ষ’ ট্রিটমেন্ট পেয়েছে। এ যে আগ্রাসনকারীদের হাত থেকে অধিকৃত ভূমি ফিরিয়ে আনার ও স্বাধীনতার লড়াই -- সংকটের সেরকম মর্যাদা কখনোই দেয়া হয় না। তাই হিজবুল্লাহ এবং হামাসের লড়াই-প্রতিরোধ-হামলা সবসময়ই ‘জঙ্গী’ ও ‘সন্ত্রাসী’। ইসরাইলিরা মারা গেলে সেটা হয় ‘হত্যা’, আর ফিলিস্তিনিরা মারা গেলে সেটাকে বলা হয় ‘সংঘাত’-এ মৃত। কেবল রবার্ট ফিস্কের প্রতিবেদনেই আমরা ঘটনাবলীর ভিন্ন ভাষ্য পেয়ে থাকি। ফিস্ক (ফিস্ক, ২০০৩) বলেন, হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রে ইসরাইলের দায়দায়িত্ব শনাক্ত করার একটা সহজ উপায় হলো সেটাকে যদি ‘ক্রস-ফায়ার’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হলে। বিশেষত যখন কোনো শিশু ইসরাইলি সৈন্যের হাতে মারা যায় এবং সেটা আলোচনায় চলে আসে তখন ব্যাপারটাকে ‘ক্রসফায়ারে নিহত’ বলে চালানো হয়। প্যালেস্টাইনের সঙ্গে ইসরাইলের যুদ্ধের কাভারেজ জুড়ে, প্রচারণার বিভিন্ন কায়দা অনুসরণ করে, ‘নেম কলিং’ আর ‘ওয়ার্ড গেমস্’ চলতে থাকে। ফিস্ক যথার্থই বলেন, যুদ্ধ সবসময় বাচনিক ছলনার জন্ম দেয়। বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতিকে তাই বলা হয়ে থাকে ‘পরোক্ষ ক্ষতি’, ইসরাইল কর্তৃক কোনো শহর অবরোধের ঘটনাকে বলা হয় ‘বন্ধ করে দেয়া’, ইসরাইলের মূল ভূখণ্ড এবং তাদের অধিকৃত ভূখণ্ডের মধ্যকার আইনী সীমারেখা হয়ে ওঠে ‘মিলন রেখা’, ফিলিস্তিনি রাজাকারদের বলা হয় ‘সহযোগী’, ইসরাইলী-অধিকৃত ভূখণ্ড হয়ে ওঠে ‘বিতর্কিত’ আর আরব ভূখণ্ডে অবৈধভাবে গড়ে তোলা ইহুদি বসতিকে বলা হয় ‘প্রতিবেশী এলাকা’। এই প্রতিবেশী এলাকা আবার ফিলিস্তিনি ‘জঙ্গী’ দ্বারা আক্রান্ত হয়। ইসরাইল কর্তৃপক্ষ বা তার বন্ধু মার্কিন-প্রশাসন ব্যাপারগুলোকে এভাবেই দেখেন এবং মুশকিল হলো মিডিয়া প্রতিবেদনগুলোতে তাদের কথাগুলোই সরাসরি ‘কোট’ করে থাকে। সংবাদ-ভাষ্যেও এর কোনো ব্যতিক্রম ঘটে না।

সংবাদের ট্রিটমেন্ট, এজেন্ডা সেটিং এবং ভাষিক কুশলতার মাধ্যমে এই কাজটি পরোক্ষভাবে চলছে। কিন্তু ইসরায়েলপক্ষপাত এবং প্যালেস্টাইনবিরোধিতা মাঝে মাঝে প্রত্যক্ষ হয়ে ওঠে। অক্টাভিও নাসর ও হেলেন থমাসের চাকরিচ্যুতি তার প্রমাণ।


তথ্যসূত্র
রবার্ট ফিস্ক (২০১০)। আয়াতুল্লাহ ফাদলাল্লাহর ব্যাপারে সিএনএনের ধারণা ভুল (মহসীন হাবিব অনূদিত)। কালের কণ্ঠ, ১৪ জুলাই, ২০১০।
রবার্ট ফিস্ক (২০০৩)। যখন সাংবাদিকরা ভুলে যান যে হত্যা হত্যাই (উদিসা ইসলাম অনূদিত)। মানুষ: সন্ত্রাস-মিডিয়া-যুদ্ধ সংখ্যা। সেলিম রেজা নিউটন সম্পাদিত। ঢাকা: সমাবেশ, ২০০৩।
http://en.wikipedia.org/wiki/Octavia_Nasr.
http://en.wikipedia.org/wiki/Helen_Thomas.

প্রথম প্রকাশ: খালেদ মুহিউদ্দিন সম্পাদিত সাপ্তাহিক 'মিডিয়াওয়াচ'। ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/fahmidulhaqblog/29207423 http://www.somewhereinblog.net/blog/fahmidulhaqblog/29207423 2010-07-25 22:53:46
হলুদ সাংবাদিকতা, মিডিয়া দানব ও সিটিজেন কেন
কিন্তু আশ্চর্যরকমভাবে এই দুইয়ের সম্মিলন ঘটেছিল মার্কিন নাগরিক উইলিয়াম রুডলফ হার্স্টের মধ্যে। তিনি হলুদ সাংবাদিকতার জনক, আবার তার ছিল এক মিডিয়া কনগ্লোমারেট। এই হার্স্টের জীবনীভিত্তিক যে-চলচ্চিত্র, তার নাম সিটিজেন কেন, পরিচালক অরসন ওয়েলস। তবে হার্স্ট ছবিটি একেবারেই পছন্দ করেননি। ১৯৪১ সালে মুক্তি পাওয়া ছবিটি অস্কারে নয়টি মনোনয়ন পেলেও কেবল চিত্রনাট্যের জন্যই শেষপর্যন্ত পুরস্কার পায়। অনুমান করা হয় এতে হার্স্টের হাত ছিল। যদিও সিটিজেন কেন-এ হার্স্ট ছাড়াও সমকালীন আরও কয়েকজন ধনকুবেরের জীবনের খণ্ডাংশ এবং পরিচালকের নিজের জীবনেরও কিছু অংশ যুক্ত ছিল, কিন্তু হার্স্টের জীবনের সঙ্গে মূল চরিত্র চার্লস ফস্টার কেনের অনেক মিল রয়েছে। এতেই ক্ষুব্ধ হন হার্স্ট। তিনি তার মিডিয়া সাম্রাজ্যের কোনো হাউসেই যেন এই ছবির বিজ্ঞাপন, রিভিউ এমনকি নামোল্লেখ পর্যন্ত না হয়, তার ব্যবস্থা করেছিলেন। এর প্রভাব পুরো হলিউডে পড়ে। হার্স্টের লবিংয়ে প্রভাবিত হয়ে পুরো ইন্ডাস্ট্রির পক্ষ থেকে প্রযোজনা-পরিবেশনা প্রতিষ্ঠান মেট্রো-গোল্ডউইন-মেয়ার-এর প্রধান লুইস বি মেয়ার সিটিজেন কেন-এর প্রযোজক আরকেও-র কাছে প্রস্তাব দেন যে, ৮০৫,০০০ মার্কিন ডলারের বিনিময়ে ছবির সবগুলো প্রিন্ট যেন পুড়িয়ে ফেলা হয়। কিন্তু প্রযোজন প্রতিষ্ঠানটি তা করতে অস্বীকৃতি জানায়। অবশ্য হার্স্টের প্রভাবের কারণে ছবিটির ব্যবসা একদমই ভালো হয়নি। অনেক প্রদর্শক ছবিটি চালাতে চায়নি মিডিয়া-মোগল হার্স্টের প্রতিপত্তির ডরে। এসব কারণে হার্স্ট এবং ওয়েলসের বিবাদ চরমে উঠে, যা দু’জনেরই ক্যারিয়ারে ক্ষতিসাধন করে। বেতার-ব্যক্তিত্ব ওয়েলস তার প্রথম ছবি সিটিজেন কেন নির্মাণ করেন মাত্র চব্বিশ বছর বয়সে, মূল চরিত্রে অভিনয়ও করেন তিনি। তার পরের ছবিগুলো ওরকম বিখ্যাত আর হয়নি।

তবে হার্স্ট তো আর ওয়েলসের সঙ্গেই কেবল বিবাদ করেননি। তিনি তার মিডিয়া-মালিকানার প্রথম দিককার পত্রিকা দি নিউইয়র্ক জার্নাল নিয়ে জোসেফ পুলিৎজারের পত্রিকা নিউইয়র্ক ওয়ার্ল্ড-এর সঙ্গে প্রচারসংখ্যা টপকে যাবার জন্য এক অসুস্থ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হন। পুলিৎজারের পত্রিকা তখন নিউইয়র্কে প্রচারসংখ্যায় শীর্ষে অবস্থান করছিল। তাকে অতিক্রম করার জন্য হার্স্ট নিউইয়র্ক ওয়ার্ল্ড থেকে বেশ কয়েকজন সাংবাদিককে ভাগিয়ে নিয়ে আসেন তার পত্রিকায়। এদের মধ্যে একজন ছিলেন রিচার্ড এফ আউটকল্ট। আউটকল্ট পুলিৎজারের পত্রিকায় একটি কমিক সিরিজ করতেন, যাতে হলুদরঙা, রাত্রিবাস পরিধান করা, একটি ন্যাড়া-মাথা ছোকরা, প্রধান চরিত্র ছিল। এর ডাকনাম ছিল ‘ইয়োলো কিড’। আউটকল্ট ভেগে যাবার পরে পুলিৎজার অন্য আরেকজনকে দিয়ে তার পত্রিকায় কমিক সিরিজটি চালিয়ে যান। ফলে নিউইয়র্ক শহরে দু’টি হলুদ ছোকরাকে দেখা গেল -- একটি নিউইয়র্ক জার্নাল-এ, আরেকটি নিউইয়র্ক ওয়ার্ল্ড-এ। আর পত্রিকা দুটোতে চাঞ্চল্যকর, অপরাধমূলক, যৌনতানির্ভর সংবাদের পরিমাণ বেড়ে গেল। মূল বিষয় হলো এসব সংবাদ ছিল অতিরঞ্জিত, কখনো কখনো বানোয়াট। ১৮৯৫ থেকে ১৮৯৮ সালের মধ্যে হলুদ সাংবাদিকতার উদ্ভব হলো, এভাবে।

উইলিয়াম রুডলফ হার্স্ট আর চার্লস ফস্টার কেনের মধ্যে অমিলের চেয়ে মিলই ছিল বেশি। উভয়েই মিডিয়া মোগল ছিলেন (চলচ্চিত্রেও কেনের ক্ষেত্রে হলুদ সাংবাদিকতার রেফারেন্স আছে), দু'বার বিয়ে করেন (উভয়েরই একজন স্ত্রী ছিলেন অপেরা গায়িকা), ধনে-সম্পদে ফুলে-ফেঁপে পরে রাজনীতিতে নামেন, গভর্নর পদে নির্বাচন করেন -- প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে স্পেনের সঙ্গে আমেরিকার যুদ্ধের ব্যাপারে জনমত প্রভাবিত করার চেষ্টা করেন। বড়ো পার্থক্য এটাই, ছবি শুরু হয় চার্লস ফস্টার কেনের মৃত্যুসংবাদ দিয়ে, আর হার্স্ট ছবির মুক্তি পাবার ১০ বছর পরে ১৯৫১ সালে মারা যান।

সিটিজেন কেন প্রাথমিকভাবে ব্যবসাসফল না হলেও, যত সময় গিয়েছে, এটি চলচ্চিত্র বোদ্ধাদের কাছে ক্রমেই প্রিয় চলচ্চিত্র হয়ে উঠেছে। সর্বকালের সেরা চলচ্চিত্রের তালিকায় এটা সবসময়ই প্রথম ১০-এর মধ্যে থাকে, কোনো কোনো চলচ্চিত্র-বোদ্ধার তালিকায় এটা এক নম্বরেই আছে। প্রথম আসনটি নিয়ে সিটিজেন কেন-এর সাধারণত লড়াই হয় সের্গেই আইজেনস্টাইনের ব্যাটলশিপ পটেমকিন ও আলফ্রেড হিচককের ভার্টিগোর সঙ্গে। ফিল্ম স্কুলগুলোতে সিটিজেন কেন অবশ্যপাঠ্য। কারণ এর ন্যারেটিভ কাঠামো, চলচ্চিত্র-ভাষা থেকে শুরু করে মেক-আপের ব্যবহার পর্যন্ত চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে। চলচ্চিত্রের ভাষা নিয়ে পরবর্তী সময়ে অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছে। কিন্তু সিটিজেন কেন আজও সিনেমাটোগ্রাফি, আলোকসম্পাত, সম্পাদনা, মিজ-অঁ-সেন ও ডেপথ অব ফিল্ডের টেক্সট হিসেবে পাঠ্য। চলচ্চিত্র-টেকনিকের আকর হলেও, সাংবাদিক ও সাংবাদিকতার শিক্ষার্থীদেরও এই ছবিটি দেখা দরকার। অবশ্য কেনের সাংবাদিক-জীবনের চাইতে তার ব্যক্তিজীবনই ছবিতে প্রধান হয়ে উঠেছে। যাহোক, এই নিবন্ধের পরবর্তী আলোচনা অরসন ওয়েলসের চলচ্চিত্র সিটিজেন কেন এবং চলচ্চিত্রের প্রধান চরিত্র চার্লস ফস্টার কেনকে নিয়েই এগুবো।

ছবি শুরু হয় ধনকুবের চার্লস ফস্টার কেনের প্রাসাদোপম এস্টেট জানাডু-এর কয়েকটি ডিজলভ শট দিয়ে, যার একটিতে দেখা যায় এস্টেটের মূল গেটে ‘নো ট্রেসপাসিং’ সাইনবোর্ড। এরপর বিশাল অট্টালিকার একটি ঘরে নিঃসঙ্গ-বৃদ্ধ কেনের মৃত্যুদৃশ্য। মৃত্যুমুহূর্তে তিনি উচ্চারণ করেন ‘রোজবাড’। এরপরে বিখ্যাত এই ব্যক্তির ওপরে একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শিত হয়, কোনো এক অপরিসর মিলনায়তনে। প্রামাণ্যচিত্রে সংক্ষেপে কেনের মিডিয়া সাম্রাজ্য-প্রতিপত্তি ও তার পতনের বর্ণনা থাকে। কিন্তু প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনশেষে দর্শকরা (যারা মূলত সাংবাদিক) আলোচনা করেন, কেনের মৃত্যুমুহূর্তে উচ্চারিত শব্দ ‘রোজবাড’-এর মানে কী, তা নিয়ে। নিউজরিল রিপোর্টার জেরি থম্পসনকে দায়িত্ব দেয়া হয় ‘রোজবাড’ কী বা কে তা অনুসন্ধানের জন্য। জেরি থম্পসন এরপর চার্লসের ব্যবসায়িক ও ব্যক্তিগত জীবনে ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকার নিতে আমেরিকার নানা প্রান্তে যান। ঐসব ব্যক্তিদের বর্ণনার মাধ্যমেই আসলে ছবির মূল কাহিনী এগিয়ে যায়, ফ্লাশব্যাকে। অবশ্য থম্পসন ‘রোজবাড’ কী বা কে তা বের করতে ব্যর্থ হন। তার উপসংহার ছিল, ‘রোজবাড’ এমন কিছু যা মহাক্ষমতাধর চার্লসের খুব প্রিয়, কিন্তু তিনি তাকে পাননি বা পেয়ে হারিয়েছেন।

নানা জনের বর্ণনা থেকে জানা যায়, কেন জন্মলাভ করেন আমেরিকার কলোরাডোয় এক দরিদ্র পরিবারে। তার বাবা-মা একটি বোর্ডিং চালাতেন। কিন্তু ঘটনাচক্রে তাদের বোর্ডিং হাউসের নিচে আবিষ্কৃত হয় পৃথিবীর তৃতীয় বৃহত্তম সোনার খনি। খনি-কোম্পানির সঙ্গে কেন-পরিবারের রফা হয় যে শিশু কেনকে উচ্চশিক্ষার জন্য নিউইয়র্কে নেয়া হবে, কোম্পানির ব্যাংকার ওয়াল্টার পার্কস থ্যাচার হবেন তার অভিভাবক এবং প্রাপ্তবয়ষ্ক হলে, শিক্ষাজীবন শেষে কেন হবেন কোম্পানির একটা অংশের মালিক, বিনিময়ে তার মা সোনার খনি থেকে সরে যাবেন। কেন ২৫ বছর বয়সে থ্যাচারের কাছ থেকে কেবল নিউইয়র্ক ইনকোয়ারার পত্রিকার দায়িত্ব নেন, বাকি সবকিছুকে অগ্রাহ্য করেন। যেদিন তিনি পত্রিকার দায়িত্ব নেন, সেদিন পত্রিকার সার্কুলেশন ছিল ২৬ হাজার। তিনি হলুদ সাংবাদিকতার মাধ্যমে পত্রিকার সার্কুলেশন ৬ লাখ ৮৪ হাজার পর্যন্ত বৃদ্ধি করেন। এর অংশ হিসেবে তিনি প্রতিপক্ষ পত্রিকা নিউইয়র্ক ক্রনিকল থেকে অনেক সাংবাদিক ভাগিয়ে আনেন। এরপর গড়ে তোলেন তার বিশাল মিডিয়া-সাম্রাজ্য। এতে রয়েছে ৩৭টি সংবাদপত্র, ২টি সিন্ডিকেট, একটি রেডিও নেটওয়ার্ক। এছাড়া তার কর্পোরেট মালিকানাধীন ছিল পেপার মিল, গ্রোসারি স্টোর, এপার্টমেন্ট ব্যবসা, শিপিং ব্যবসা, সোনার খনি, বন-জঙ্গলের এস্টেট ইত্যাদি। তিনি প্রথমে বিয়ে করেন প্রেসিডেন্টের ভাগ্নী এমিলি নর্টনকে, তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারকে মাথায় রেখে। রাজনীতিতে নেমে কেন গভর্নর পদে নির্বাচনেও দাঁড়ান। কিন্তু নির্বাচনের আগে বর্তমান গভর্নর জিম ডব্লিউ গেটিস পত্রিকায় প্রকাশ করে দেন যে কেনের বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক আছে অ্যামেচার গায়িকা সুসান আলেক্সান্ডারের সাথে। এতে কেনের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যায়। স্ত্রী-পুত্রের সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটে। রক্ষিতা সুসানকেই তিনি বিয়ে করেন। দ্বিতীয় বিয়ের পর স্ত্রী সুসানকে অপেরা গায়িকা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য তিনি উঠেপড়ে লাগেন। বিশাল আয়োজন করেন সুসানকে ঘিরে। কিন্তু অপেরা গায়িকা হিসেবে সুসান ব্যর্থ হন। তার গায়কীর সমালোচনা করার জন্য কেন তার বহু পুরনো বন্ধু ও ব্যবসায়িক সহচর জেডেডিয়াহ লেল্যান্ডকে চাকরিচ্যুত করেন। সুসানের সঙ্গে কেনের শেষ দিনগুলো কাটে জানাডু প্রসাদে। কিন্তু তাদের দুজনের মধ্যে ব্যবধান বাড়তে থাকে। প্রাসাদের উঁচু খিলান আর দূরবর্তী দেয়ালগুলো তাদের সম্পর্কের ব্যবধানকে মূর্ত করে তোলে। একাকী প্রাসাদে হাঁপিয়ে উঠে সুসান কেনকে পরিত্যাগ করে চলে যান। সুসানের প্রস্থান কেনকে বিপর্যস্ত ও পরাজিত করে। এদিকে তিরিশের মহামন্দা তার ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যেও পতন আনে। বিশাল প্রাসাদের তার নিঃসঙ্গ মৃত্যুও বিরাট চরিত্রের করুণ সমাপ্তিকে নির্দেশ করে। তার মৃত্যুর পরে রিপোর্টার থম্পসন ‘রোজবাড’-এর রহস্যের কিনারা করতে না পারলেও, ক্যামেরার মাধ্যমে চলচ্চিত্রের দর্শক ‘রোজবাড’ কী তা জানতে পারেন। তার মৃত্যুর পর যখন কেনের যাবতীয় সংগ্রহ নিলামে ওঠে, তখন পরিত্যক্ত অনেক কিছুর সঙ্গে পুড়ে যেতে থাকে গায়ে ‘রোজবাড’ লেখা এক স্লেড। এই স্লেডটি নিয়েই কলোরাডোর বাড়ির আঙ্গিনায় কেন তার শৈশবে খেলতেন যা তিনি আজীবন সংগ্রহে রেখেছিলেন। হয়তো কেনের জন্য সেটাই ছিল তার জীবনের সবচাইতে মধুর সময়। আত্মপ্রত্যয়ী ও আত্মগর্বী এক বিখ্যাত মানুষ ভেতরে ভেতরে যে কতটা অসহায় ছিলেন, মৃত্যুমুহূর্তে উচ্চারিত ‘রোজবাড’ শব্দটিই তার প্রমাণ। সিটিজেন কেন এমন একটি ছবি যা সামান্য অবস্থায় থেকে এক ব্যক্তির বিপুল উত্থান এবং সামান্য হিসেবেই তার জীবনের সমাপ্তির কাহিনী বর্ণনা করে।

তবে এই কাহিনী যেভাবে বর্ণিত হলো, সেটাই ছবিটিকে চলচ্চিত্রের ইতিহাসে ছবিটিকে অনন্য করে রেখেছে। গ্রেগ টোল্যান্ডের সিনেমাটোগ্রাফি এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। তিনি প্রায় পুরো ছবি জুড়েই ডিপ ফোকাসের ব্যবহার করার চেষ্টা করেছেন। আলোর যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে ফোরগ্রাউন্ড ও ব্যাকগ্রাউন্ড উভয়ক্ষেত্রেই সব চরিত্র ও প্রপসকে তীক্ষèভাবে স্পষ্ট করে তুলেছেন। জাঁ রেনোয়ার রুলস অব দ্যা গেম-এর পর সফলভাবে ডিপ ফোকাসের ব্যবহার করেছেন ওয়েলস। টোল্যান্ড ক্লোজ-আপ শটের ক্ষেত্রে টেলিফটো লেন্স ব্যবহার করেছিলেন।

ডিপ ফোকাসের ব্যবহার: কেনের মা ও ব্যাংকার থ্যাচারের মধ্যে চুক্তি সই হচ্ছে। ঘরের বাইরে, দূরে ‘রোজবাড’-হাতে ক্রীড়ারত শিশু কেন। ফোরগ্রাউন্ড ও ব্যাকগ্রাউন্ড, ফ্রেমে ধারণকৃত সবই স্পষ্ট।

ফ্লাশব্যাকের এরকম অসাধারণ ব্যবহার অন্য কোনো ছবিতে এর আগে দেখা যায়নি। ছবিতে কোনো একক ন্যারেটর কেউ ছিলেন না। কেনের ব্যবসায়িক ও ব্যক্তিগত জীবনে ঘনিষ্ঠ ৫জন ব্যক্তি এখানে ন্যারেটর, যারা কেন-এর জীবনের নানা অংশের বর্ণনা তারা করেছেন। এমনকি ছবির প্রথম দিকে নিউজরিলের মাধ্যমে তার জীবনের সংক্ষিপ্ত এক বর্ণনা প্রথমেই দিয়ে দেয়া হয়।

সম্পাদনা ক্ষেত্রে যদি সময় ও স্থানের ম্যানিপুলেশন একটা বিশেষত্ব হয়ে থাকে, তবে প্রথম স্ত্রী এমিলি নর্টনের সঙ্গে কেনের প্রাতঃরাশের সিকোয়েন্সটি সবসময় উল্লেখ করে থাকেন চলচ্চিত্র-বোদ্ধারা। ৫টি দৃশ্য পরপর কাটের মাধ্যমে মন্তাজের দুর্দান্ত ব্যবহার করা হয়েছে -- দুই মিনিটের সিকোয়েন্সে ১৬ বছর পার করে দেয়া হয়েছে। কেন ও নর্টনের পোশাক বারবার পাল্টে দেয়া হয়েছে। প্রথম দৃশ্যে অপেক্ষাকৃত ছোট টেবিলের দুইপাশে দু’জন, অন্তরঙ্গ কথা বলছেন। এরপরের দৃশ্যগুলোতে টেবিলের দৈর্ঘ্য বাড়তে থাকে। তাদের আলাপচারিতায় উষ্ণতা নেই, বাড়ছে দ্বন্দ্ব। অর্থাৎ তাদের মধ্যে ভৌত ও মানসিক উভয় দূরত্বই বাড়ছে। শেষে তাদের মধ্যে কোনো আলাপই নেই, দু’জনেই সংবাদপত্র পড়ছেন। কেন পড়ছেন নিজের পত্রিকা ইনকোয়ারার আর এমিলি পড়ছেন প্রতিপক্ষ-পত্রিকা ক্রনিকল।

অরসন ওয়েলসের ছিল রেডিওতে কাজ করার অভিজ্ঞতা। তাই সিটিজেন কেন-এর সাউন্ডট্র্যাকও অসাধারণ। আর চরিত্রের মেক-আপ তো তুলনাহীন। ২৪ বছর বয়সে ওয়েলস কেন-এর চরিত্রে অভিনয় করেন। কিন্তু তাকে তরুণ থেকে বৃদ্ধ, নানা বয়সের মেক-আপে দেখা গেছে। তার জীবনে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত বিভিন্ন ব্যক্তিকেও একইভাবে নানা বয়সে দেখা গেছে। সবমিলিয়ে সব চরিত্রকে বয়সানুযায়ী চিত্রিত করার ক্ষেত্রে মেক-আপের ব্যবহার চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সিটিজেন কেনকে অনন্য করে রেখেছে। বিভিন্ন বয়স অনুযায়ী অরসন ওয়েলসের অভিনয়ও অনবদ্য। আর উঁচু উঁচু ছাদ, খিলান ও দেয়ালের মাধ্যমে ঘটনা ও চরিত্রের বিশালতা, অসাহয়ত্ব ও নিঃসঙ্গতার আবহ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে, যা মিজ-অঁ-সেন-এর আদর্শপাঠ হিসেবে চলচ্চিত্র-শিক্ষার্থীদের কাছে অগ্রগণ্য।

সাংবাদিকতা ও চলচ্চিত্রের শিক্ষার্থী হিসেবে আমার জন্য এটা আবিষ্কার করা আনন্দের ছিল যে প্রিয়তম চলচ্চিত্র সিটিজেন কেন এমন একজন ব্যক্তির জীবন অবলম্বনে নির্মিত যিনি একজন আদি মিডিয়া-মোগল এবং হলুদ সাংবাদিকতার জন্মদাতা।

প্রথম প্রকাশ: খালেদ মুহিউদ্দিন সম্পাদিত 'মিডিয়াওয়াচ' পত্রিকা। ১১ জুলাই, ২০১০ সংখ্যা।


]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/fahmidulhaqblog/29198325 http://www.somewhereinblog.net/blog/fahmidulhaqblog/29198325 2010-07-13 00:36:24
শাশ্বত-আপডেট: পোস্টটাকে স্টিকি করা হোক Click This Link) একদিনের জন্য হলেও স্টিকি করার জন্য মডারেটরদের অনুরোধ করছি। ]]> http://www.somewhereinblog.net/blog/fahmidulhaqblog/29156274 http://www.somewhereinblog.net/blog/fahmidulhaqblog/29156274 2010-05-16 20:58:23 প্রেস ফ্রিডম ডে-র ভাবনা: কেবলই সাংবাদিক নির্যাতন?
সাংবাদিকের নিরাপত্তা: একমাত্র যে টেক্সট
আমি যে একটি বিষয়ের কথা বলছি, যা প্রেস ফ্রিডম ডে'র আলোচ্য, তা হলো সাংবাদিক নির্যাতন। সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনা অবশ্যই স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য অন্যতম হুমকি, কারণ এ যে একেবারে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে মৃত্যুঝুঁকিতে পড়ে যাওয়ার ব্যাপার। বাংলাদেশ অবশ্যই পৃথিবীর মধ্যে এ ক্ষেত্রে একটি ঝুঁকিপ্রবণ দেশ। পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আহত-নিহত হয়েছেন এ রকম একসারি নাম সাংবাদিকতা-জগতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মনে পড়বে: শামছুর রহমান, মানিক সাহা, টিপু সুলতান, হুমায়ুন কবীর বালু, প্রবীর শিকদার, গৌতম দাস প্রমুখ। আর এসব হত্যাকাণ্ড বা নির্যাতনের বিপরীতে প্রশাসনের ব্যর্থতা ও বিচারব্যবস্থার চেহারা আমরা সবাই দেখি।

তবে সাংবাদিক নির্যাতনের বিষয়টি একেবারে নির্ভেজাল প্রপঞ্চ নয়। বাংলাদেশে সাংবাদিক নির্যাতিত হচ্ছেন, শারীরিক আক্রমণের শিকার হচ্ছেন, এর অন্তত দুটি দিক রয়েছে। প্রথমত, তিনি একেবারে সাপের খোঁড়লে হাত দিয়েছেন, ফলে দংশনে নীল হতে হয়েছে। স্থানীয় দুর্নীতির পিছু ধাওয়া করতে গিয়ে ক্ষমতাবহুলদের মুখোশ উন্মোচন করে ফেলছেন, ফলে সাপের ছোবল খেতে হয়েছে। দ্বিতীয় যে-ব্যাপারটি অনুমান করতে কষ্ট হয় না -- কিছু অসমর্থিত তথ্যও ইথারে ভেসে বেড়ায় -- যে সাংবাদিক নিজেই ওই সব অর্থকরী, অপরাধপ্রবণ কর্মকাণ্ডে সংশ্লিষ্ট হয়ে পড়েন এবং সেসব অপরাধ সামাল দিতে যথেষ্ট দক্ষ না হওয়ায় প্রতিপক্ষের আক্রমণের শিকার হন। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে যেহেতু সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনা বেশি ঘটে, তাই সেখানকার আন্ডারগ্রাউন্ডের সশস্ত্র রাজনীতির সঙ্গে এই দুই বিষয় মিলিয়ে নিলে আমাদের কাছে নির্যাতনের প্রপঞ্চটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। উপরন্তু, স্থানীয় পর্যায়ে প্রশাসন, সাংবাদিক, অপরাধী, ক্ষমতাবান -- সবাই পরস্পরের কাছে পরিচিত হওয়ায়, হাতের নাগালের মধ্যে সবাই সবাইকে পেয়ে যায় বলে নির্যাতনের আশঙ্কা আরও বেড়ে যায়। বলা যায়, নির্যাতিত সব সাংবাদিকই যে সততার সঙ্গে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ও রকম দুর্ঘটের মুখোমুখি হয়েছেন, তা নয়। দুঃখজনক ও ঘৃণ্য এসব নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদসহই বলছি যে, সাংবাদিক নির্যাতনের ইস্যুটি আলোচনার সময় আমরা হয়তো নির্মোহ ও নিরাবেগ থাকি না।

বাংলাদেশ সংবাদকর্মী নির্যাতনের পরিপ্রেক্ষিতে একটি অন্যতম ঝুঁকিপ্রবণ দেশ। কিন্তু পরিস্থিতি অবশ্যই দুর্নীতিতে শীর্ষে যাওয়ার মতো ভয়ংকর নয়। কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টের ওয়েবসাইট (htp://www.cpj.org/killed/) থেকে জানা যাচ্ছে, ১৯৯২ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ২০টি দেশের তালিকায় সাংবাদিককে হত্যার নিরিখে সবচেয়ে বিপজ্জনক দেশ হলো ইরাক; সে দেশে কয়েক বছর ধরে চলা একপক্ষীয় যুদ্ধই দেশটিকে শীর্ষে নিয়ে এসেছে। দেশটিতে এ পর্যন্ত মোট ১৪১ জন সাংবাদিক হত্যার শিকার হয়েছেন। এরপর যথাক্রমে রয়েছে ফিলিপাইন (৬৮), আলজেরিয়া (৬০), রাশিয়া (৫২), কলম্বিয়া (৪২, সোমালিয়া (৩২), পাকিস্তান (২৮), ভারত (২৬)। এই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের অবস্থান ১৮তম। বাংলাদেশে এ পর্যন্ত ১২ জন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। ভারত, পাকিস্তান ছাড়াও দক্ষিণ এশিয়ার আরেকটি দেশ শ্রীলঙ্কাও (১৮) বাংলাদেশের চেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। আর সারা বিশ্বে নিহত সাংবাদিকদের বিট বিবেচনায় সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হলো রাজনীতি (৩৮%)। এরপর রয়েছে যুদ্ধ (৩৫%) ও দুর্নীতি (২১%)।

আমি সাংবাদিকের নিরাপত্তার বিষয়টিকে মোটেও খাটো করে দেখছি না, স্বাধীন সাংবাদিকতার সঙ্গে বিষয়টি সরাসরি জড়িত। এই রচনাকে সেভাবে ভুল বুঝলে লেখাটির উদ্দেশ্য ব্যর্থ হবে। আমার অবস্থান হলো, স্বাধীন সাংবাদিকতাকে ব্যাহত করে এ রকম সব কটি বিষয়কে এই দিবসে আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। নিচে তেমন কয়েকটি বিষয় আলোচনা করা হলো।

সরকারি নিয়ন্ত্রণ: প্রচলিত টেক্সট
প্রেস ফ্রিডম ডে-তে আলোচিত না হোক, বাংলাদেশের স্বাধীনতায় প্রতিবন্ধকতাস্বরূপ যে-বিষয়টি সবচেয়ে বেশি ইতোমধ্যে আলোচিত তা হলো, প্রেসের ওপরে সরকারের বা ক্ষমতাসীনের নিয়ন্ত্রণ। ঐতিহাসিকভাবেই প্রেসের সঙ্গে সরকারের সম্পর্ক দ্বান্দ্বিক। পাকিস্তান আমলে প্রেসের রাজনৈতিক ভূমিকার কথা এবং মুক্তিযুদ্ধকালে বেতার, সংবাদপত্র, টেলিভিশনের সাহসিকতার কথাও আমরা জানি। স্বাধীনতা-পরবর্তী শেখ মুজিবুর রহমানের আমলে মাত্র চারটি পত্রিকা বাদে বাকি সব পত্রিকার প্রকাশনা বাতিল করার সিদ্ধান্তের কথাও খুব আলোচিত। আর সবচেয়ে বেশি আলোচিত স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের 'প্রেস অ্যাডভাইস'-এর কথা। বর্তমানের 'গণতান্ত্রিক' সময়েও মিডিয়া পুরোপুরি স্বাধীন নয়। মুদ্রণ মাধ্যমকে ছাড় দিলেও সরকার ইলেকট্রনিক মাধ্যমকে কুক্ষিগত করে রেখেছে। কলম্বীয় লেখক গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ক্যাস্ট্রোকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের এক ধরনের 'পর্নোগ্রাফিক অবসেশন' রয়েছে। টেলিভিশনকে নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের, তা যে-সরকারই হোক, মনোভাব খানিকটা সে রকমই। বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলগুলো চলে আসার পর কেবল নিরুপায় দর্শকেরাই -- যাদের কেবল-সংযোগ নেই -- বিটিভি দেখে থাকেন। কিন্তু বেসরকারি টিভি চ্যানেলগুলোর সংবাদ দেখেও মনে হয়, তা যেন বিটিভিরই পরিমার্জিত সংস্করণ। উপস্থাপনা ও আঙ্গিকের কুশলতা রয়েছে কিন্তু আধেয়তে সেই প্রধানমন্ত্রীর স্লট, কয়েকজন প্রভাবশালী মন্ত্রীর মুখে কেবিনেট-মিটিংয়ের সিদ্ধান্তের বয়ান। মুদ্রণমাধ্যমে আমরা কেবিনেট-মিটিংয়ের সিদ্ধান্তগুলো নিয়ে সংবাদ হতে দেখি না, কিন্তু ইলেকট্রনিক মাধ্যমে তা রীতিমতো শিরোনাম আকারে হাজির হয়। বিগত বিএনপি সরকারের আমলে মন্ত্রীদের চেয়েও সরকারি দলের যুগ্ম মহাসচিবের সংবাদ বেশি বেশি দেখা যেত। সংবাদ হওয়ার ক্ষেত্রে তার অন্যতম যোগ্যতা সম্ভবত তিনি প্রধানমন্ত্রীর বড় সন্তান এবং সরকারি দলটির মূল ক্ষমতা ভবিষ্যতে তার হাতেই যাবে। বোঝাই যায়, বেসরকারি টিভি-চ্যানেলগুলোর ওপর, অন্তত সংবাদের ওপর কড়া রকমের নিয়ন্ত্রণ সরকারের রয়েছে। এর আগে বিটিভির স্বায়ত্তশাসন নিয়ে লুকোচুরি ও ধাপ্পাবাজি আমরা দেখেছি।

তবে মুদ্রণমাধ্যমের ওপর নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে সরকারি বিজ্ঞাপন বণ্টনের কথাও আমরা ভালোভাবেই জানি। প্রতিটি সরকারের কিছু পছন্দের পত্রিকা থাকে, কিছু অপছন্দের পত্রিকা থাকে। যে সরকার ক্ষমতায় থাকে তখন তার পছন্দের পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়, অপছন্দের পত্রিকা বাদ পড়ে যায়। পত্রিকার সার্কুলেশনের ভিত্তিতে বিজ্ঞাপন বণ্টনের কথা থাকলেও তা কখনোই কোনো বিবেচ্য বিষয় হয় না। এতে মুশকিলে পড়ে মাঝারি ও ছোট সার্কুলেশনের পত্রিকাগুলো, বড় পত্রিকাগুলো অবশ্য আজকাল সরকারি বিজ্ঞাপনের ওপর একেবারেই নির্ভরশীল নয়, যদিও সরকারি বিজ্ঞাপনপ্রাপ্তির আলোচনায় তারাও যথেষ্ট সোচ্চার। বিশ্বায়নের কারণে গত দেড় দশকে বাংলাদেশেও বেসরকারি খাতের একটা বিকাশ হয়েছে। বেসরকারি বিজ্ঞাপনদাতারাই বড় পত্রিকা ও চ্যানেলগুলোকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। সরকারি নিয়ন্ত্রণের এই নানা দিককেও প্রেস ফ্রিডম ডে’র আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত করা দরকার।

বেসরকারি খাতের নিয়ন্ত্রণ: অপ্রচল কাহিনি
বাংলাদেশের সরকারি খাত যদি দুর্নীতিপরায়ণ হয়, তাহলে বিগত দুই দশকে বিশ্বায়নের কারণে যে বেসরকারি খাত বিকশিত হয়েছে তা হলো দুর্বৃত্ত। সংবাদমাধ্যমের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণের কথা এ দেশে খুব আলোচিত ও চর্চিত বিষয় হলেও বেসরকারি খাতের নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি একেবারেই আলোচিত নয়। সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রায় সব কটিই ওই 'দুর্বৃত্ত' বেসরকারি খাতের মালিকানাধীন হওয়ার কারণে এগুলো নিয়ে তারা একেবারেই আলোচনা করে না; সেটাই স্বাভাবিক। এসব তখনই কেবল আলোচনায় আসে যখন এক পত্রিকার মালিকের সঙ্গে অন্য পত্রিকার মালিকের বিবাদ শুরু হয়। তাই বেসরকারি খাতের নিয়ন্ত্রণ, যা সরকারি খাতের নিয়ন্ত্রণের চেয়ে ধীরে ধীরে ভয়ংকর হয়ে উঠেছে, তা এমনকি প্রেস ফ্রিডম ডে-তে অনালোচিত থেকে যায়।

বিজ্ঞাপনদাতাদের চাপের ভেতরে থেকে যে সাংবাদিকতা, তা কীভাবে মুক্ত হতে পারে? তাদের প্রত্যক্ষ চাপ, পণ্যের খবরাখবর দেওয়ার নানা আবদারের কথাটি না-ই বা ধরলাম, যে বিজ্ঞাপনদাতা প্রতিনিয়ত পত্রিকাকে বিজ্ঞাপন দেয়, তার কোনো 'দুর্বৃত্তায়ন'-এর খবর একটি পত্রিকা কীভাবে ছাপবে? ছাপছেও না। কয়েক বছর আগের একটা উদাহরণ দিই। আমার বিভাগের ওপরের ক্লাসের এক ছাত্র, তার কাছ থেকেই গল্পটা শোনা। তবে এ কিন্তু 'গল্প' নয়, নির্জলা সত্য ঘটনা। ছাত্রটি পড়াশোনার পাশাপাশি একটি প্রভাবশালী ইংরেজি দৈনিকে কাজ করে। সে জানতে পারে, গভীর রাতে কারা যেন ট্রাকভর্তি মাটি এনে গুলশান লেকে ফেলছে। সে কয়েক দিন পর্যবেক্ষণ করে, আশপাশের দোকানদারের কাছ থেকে জানতে পারে একটি বিরাট কোম্পানি, যার মালিক ক্ষমতাসীন দলের এমপি, এই দখলের পেছনে রয়েছে। আবিষ্কারের উত্তেজনায় কম বয়সী, অনভিজ্ঞ সেই রিপোর্টার বেশ ধারালো একটি প্রতিবেদন লেখেন, অফিসে জমা দেন। কিন্তু তার চিফ রিপোর্টার/নিউজ এডিটর তাকে ধমকে দেন: 'ওই মিয়া, জানো, এই কোম্পানি প্রতিদিন আমাদের কত বিজ্ঞাপন দেয়? এই রিপোর্ট যাবে না।' চিফ রিপোর্টার না বললেও রিপোর্টার মেসেজ পেয়ে যান, এ ধরনের প্রতিবেদন আর রচনা করা যাবে না।

আমি সাংবাদিকতার চর্চায় নেই, এ ধরনের গল্প আমার চেয়ে ঢের বেশি জানেন ইন-হাউস রিপোর্টার ও সহ-সম্পাদকেরা। তবে মিডিয়ার চরিত্র-লক্ষণ দেখে আমাদের কাছে সব জলের মতো পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে। 'বাজারে এসেছে নতুন পণ্য'জাতীয় সংবাদগুলো, যার অর্থমূল্য থাকলেও সংবাদমূল্য সামান্যও নেই, বিজ্ঞাপনদাতাদের চাপেই যে প্রকাশ করতে হয়, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। বিজ্ঞাপন তো বিজ্ঞাপনই, কিন্তু সংবাদের ছদ্মবেশে সে হাজির হলে তা অনেক কার্যকর হয়। তো এ রকম একটি পরিস্থিতিতে মুক্ত সাংবাদিকতা কি আদৌ সম্ভব? এই প্রশ্নগুলো প্রেস ফ্রিডম ডে-তে কেন উত্থাপিত হবে না?

সেলফোন কোম্পানিগুলোর সঙ্গে মিডিয়া হাউসগুলোর সম্পর্ক বা লেনদেন নিয়ে মহাকাব্য হতে পারে। আমি নিশ্চিত জানি, অনেক অনেক পাঠক একসময় চিঠিপত্রের পাতায় সেলফোন কোম্পানিগুলোর প্রতারণা, ভুল বিল, বিলের উচ্চহার, প্যাকেজ/অফারের নামে ধাপ্পাবাজি নিয়ে প্রচুর, সুপ্রচুর চিঠি লিখেছেন, তাদের চিঠিগুলো ছাপা হয়নি। এসব অন্যায় নিয়ে শক্ত কোনো রিপোর্ট, কোনো সম্পাদকীয় পত্রিকাগুলো লেখেনি, চ্যানেলগুলো কোনো আইটেম প্রচার করেনি। যদিও বা কোনো সংবাদ হয়, নিশ্চয়ই নিয়মিত হয়, তা প্রমোশনাল: কোন নতুন প্যাকেজ এল ইত্যাদি। যদি সংবাদের গুরুত্বপূর্ণ স্লটের স্পন্সর হয়ে সংবাদের শিরোনামগুলোর শিরোনাম হয় 'সিটিসেল সংবাদ-শিরোনাম' কিংবা 'গ্রামীণফোন খেলার খবর', তাহলে চ্যানেলগুলোর আর উপায় থাকে না এদের ব্যাপারে ক্রিটিক্যাল হওয়া। আজকাল ভোক্তারা লেখার মাধ্যমে সমস্যা জানানোর সুযোগই পাচ্ছে না, তাই তারা মাঠে নেমেছেন, প্রতিবাদ-সমাবেশ করেছেন। মিডিয়াগুলো বাধ্য হয়ে ভেতরের পাতায় এক কলামে নিউজ করছে। মোবাইল ফোনের এই ভোক্তারা আবার পত্রিকার পাঠকও তো, তাদেরও হারালে চলে না।

বেসরকারি খাতের এই সব দুর্বৃত্তায়ন নিয়ে কোনো ক্রিটিক্যাল রিপোর্ট সংবাদমাধ্যমে পাওয়া যায় না। যদি কখনো পাওয়া যায়, তাহলে বুঝতে হবে, ওই পত্রিকার মালিকপক্ষের যাকে নিয়ে রিপোর্ট করা হচ্ছে তাদের সঙ্গে কোনো একটা ঝামেলা হয়েছে। নইলে সংবাদমাধ্যগুলো বেসরকারি খাতের দ্রুত বিকাশের পক্ষেই কাজ করে থাকে। সরকারি খাতের দুর্নীতি-অব্যবস্থাপনা তুলে ধরা এবং বেসরকারি খাতকে গতিশীল, স্মার্ট প্রমাণ করা একটি অন্যতম এজেন্ডা।

সংবাদমাধ্যমের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য-এজেন্ডা পরিবর্তিত হয়ে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে এই সব সীমাবদ্ধতা, পরাধীনতার কথা কি আমরা প্রেস ফ্রিডম ডে-তে আলোচনা করব না? এই বিজ্ঞাপনদাতা, বেসরকারি খাতের কবল থেকে মিডিয়াকে আরও স্বাধীন কীভাবে করে তোলা যায়, তার দিকনির্দেশনা কি আমরা প্রেস ফ্রিডম ডে-তে খোঁজার চেষ্ট করব না?

শ্রেণী/লিঙ্গ/গোত্র: 'অপর' উপেক্ষার খতিয়ান
স্বাধীন মিডিয়া বলতে আমরা আসলে কী বুঝি? যে নির্ভয়ে সবকিছু বলতে পারে, কোনো শক্তি যাতে তাকে সত্য প্রকাশে বাধা দিতে না পারে। কিন্তু আমরা দেখছি, মিডিয়ার ওপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ আছে, বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছেও সে পরাধীন। তবে কি এই দুই খাতের নিয়ন্ত্রণমুক্ত হলেই মিডিয়া পুরোপুরি স্বাধীন হয়?

যখন মিডিয়া গ্রামকে উপেক্ষা করে, শহরকে বেশি গুরুত্ব দেয়, দিতে বাধ্য হয়, তখনো কি সে পুরোপুরি স্বাধীন থাকছে? নাগরিক জীবনের খবরাখবর, সমস্যা, অর্জন প্রথম পাতা ও চ্যানেলের শিরোনামজুড়ে থাকে। আর গ্রামীণ জীবন পড়ে থাকে 'মফস্বল পাতা'য় অথবা 'জনপদের খবর'-এ, অনাদরে। সংবাদ গ্রহণ-বর্জন কিংবা ট্রিটমেন্টের মাধ্যমে গ্রাম-শহরকে নিয়ে মিডিয়ার মনোভাব কী, তা স্পষ্টতই বোঝা যায়। আর মিডিয়া যেন বড়লোকদের জন্যই, গরিব লোকদের তাতে স্থান নেই; যদিও টেলিভিশন-দর্শকদের বিরাট অংশই হলো গরিব মানুষ। টেলিফিল্ম কিংবা মেগাসিরিয়ালে আমরা যে চোখ ধাঁধানো ড্রয়িংরুম, প্রাসাদোপম বাড়ি দেখি, তা সব শ্রেণীকে অনুমোদন করে না। নিঃসন্দেহে এগুলো গরিব কিংবা মধ্যবিত্তের গল্প নয়। কিংবা পত্রিকার ফিচার পাতায় যে ইন্টেরিয়রের ছবি ছাপা হয়, যে ফ্যাশন-আইটেমের, যে নতুন খাবারের দোকানের সন্ধান দেওয়া হয়, তার সবই তো সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে।

তাহলে এই যে মিডিয়া গ্রামকে আনতে পারছে না, এ ক্ষেত্রেও মিডিয়াকে কি আমরা স্বাধীন বলতে পারি?

কিংবা ধরা যাক, আমাদের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারীর কী চিত্র মিডিয়ায় দেখছি? মিডিয়ায় নারীর রূপায়ণ যেমন অবমাননাকর, তেমনি এই প্রতিষ্ঠানে তার অংশগ্রহণও পুরুষের তুলনায় খুবই কম। সংবাদে নারীকে উপস্থাপন করা হয় অসহায়, দুর্বল হিসেবে। সংবাদে তাই প্রায়ই লক্ষ করা যায় 'নারী ও শিশুসহ ---জন নিহত'-ধরনের শিরোনাম। সংবাদপত্রে নারী প্রধানত ঘটনার শিকার হিসেবেই উপস্থাপিত হয়ে থাকে। সক্রিয় সংবাদ-উপাদান হিসেবে তাকে খুব একটা দেখা যায় না। নারী-নির্যাতনের সংবাদ, অপরাধবিষয়ক সংবাদ, গসিপ ফ্যাশন ইত্যাদি সংবাদ পত্রিকায় বেশি বেশি ছাপা হয় এবং নারীকে সেখানে যৌনবস্তু ও প্রদর্শনযোগ্য সৌন্দর্যের আধার হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। অন্যদিকে নারীসংশ্লিষ্ট খবর, ফিচার প্রকাশের চেয়ে নারীর ছবি পত্রিকায় বেশি হয়ে থাকে। প্রদর্শনী, পাবলিক পরীক্ষা, মেলা ইত্যাদি আইটেমে অবধারিতভাবে নারীর ছবি ছাপা হয়ে থাকে। আর সংবাদমাধ্যমগুলোতে নারীর অংশগ্রহণও খুব কম। বাংলাদেশের অন্য অনেক ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বাড়লেও মিডিয়ায় সে হারে নারীর অংশগ্রহণ বাড়েনি। মিডিয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ স্তরে নারীর অংশগ্রহণ খুবই কম। টেলিভিশন-সংবাদে অনেক নারীকে দেখা গেলেও তাদের বেশির ভাগের ভূমিকাই নিউজ প্রেজেন্টারের, রিপোর্টিংয়ে তাদের কমই দেখা যায়। আবার নিউজ প্রেজেন্টারদের মধ্যে পুরুষের চেয়ে নারীর সংখা অনেক বেশি হয়ে থাকে। এতে এটাই প্রমাণিত হয় যে টেলিভিশনের সংবাদ বিভাগে নারীর সৌন্দর্যকে বেশি মূল্য দেওয়া হচ্ছে। মুদ্রণমাধ্যমের তুলনায় ভিজ্যুয়াল মাধ্যমে তাকে খানিকটা বেশি মাত্রায় দেখা যাওয়ার কারণ হলো, সে 'নারী'।

মিডিয়ায় যে নারীকে সৌন্দর্যসামগ্রী হিসেবে, দুর্বল হিসেবে, নির্যাতিত হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে, তুলে ধরতে বাধ্য হচ্ছে; এ ক্ষেত্রেও তো মিডিয়া স্বাধীনভাবে আচরণ করতে পারছে না। কারণ সমাজ নারীকে এই রূপে দেখে থাকে, আর মিডিয়া তার চরিত্রগত ও ব্যবসায়িক কারণে সমাজে বিদ্যমান শক্তিশালী বিশ্বাসগুলোর বিরুদ্ধাচরণ করে না।

আবার সমাজের সব গোত্রের প্রতি মিডিয়া সমান ও সংবেদনশীল আচরণ করে না। আদিবাসীদের নিয়ে, পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা নিয়ে মিডিয়ার দৃষ্টিভঙ্গি 'স্টিরিওটিপিক্যাল' -- সংখ্যাগরিষ্ঠের চোখ দিয়ে 'অপর' আদিবাসীদের সে দেখে। একবার পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান সন্তু লারমা রাঙামাটিতে এক সংবাদ সম্মেলনে, যেখানে লেখকও উপস্থিত ছিলেন, এক প্রশ্নের জবাবে পার্বত্য চট্টগ্রামের ইস্যুতে মিডিয়ার ভূমিকা নিয়ে তার মন্তব্য করেন। তার সংক্ষিপ্ত মন্তব্য ছিল: 'ভালো না'। অনেক সংঘাতের ঘটনা ঠিকমতো যাচাই না করেই, ঘটনাস্থলে না গিয়ে, রাঙামাটি শহরে বসে, অনেক সময়ে প্রশাসন বা

সেনাবাহিনীর বিবৃতির ওপর ভিত্তি করে প্রতিবেদন রচনা করা হয়। স¤প্রতি বাঘাইছড়ির ঘটনায় দেখা গেল, পত্রিকাগুলো সংবাদের ট্রিটমেন্ট করেছে পাহাড়ি-বাঙালি সংঘর্ষ হিসেবে, অথচ এটা প্রকৃত অর্থে যে পাহাড়িদের ওপর আগ্রাসন, তা সংবাদে উঠে আসেনি। সংঘাতের অকুস্থল যদি হয় গহিন অঞ্চল, তবে প্রায় সময়ই রিপোর্টগুলো এ রকমই হয়ে থাকে। আর আলোকচিত্রীরা ক্যামেরার চোখ দিয়ে আদিবাসীদের কেবল খণ্ডিত জীবন দেখেন। তাদের দৈহিক সৌন্দর্য, তাদের উৎসবকেন্দ্রিক সংস্কৃতি, তাদের জীবনযাত্রার সহজলভ্য ও ধরাবাঁধা কিছু বিষয়ই আলোকচিত্রে ঘুরেফিরে আসে।

সংখ্যালঘু, আদিবাসীদের নিয়ে মিডিয়ার এই যে খণ্ডিত চিত্রায়ণ, এ ক্ষেত্রেও কি মিডিয়া স্বাধীন থাকতে পারছে? কারণ তার মেকানিজমের মধ্যে সমস্যা আছে। তার প্রধান সমস্যা হলো সে সংখ্যাগুরু, সংখ্যালঘুরা তার কাছে 'অপর'-ই থেকে যাচ্ছে।

দেখা যাচ্ছে যে শ্রেণী, লিঙ্গ, গোত্র বিচারেও মিডিয়া পুরোপুরি স্বাধীন নয়। তার অন্তর্নিহিত চরিত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সে একদিকে ব্যবসা করতে চায়, তাই এমন কিছু সে করতে পারে না, যাতে তার ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে সমাজে বিদ্যমান ধ্যান-ধ্যারণার বিপরীতে সে অনেক ক্ষেত্রে যেতে পারে না। অন্যদিকে ঐতিহাসিক কারণে তাকে সমাজের ভালোমন্দ নিয়ে ভাবতে হয়, অন্তত মানুষ এখনো মিডিয়ার কাছ থেকে সে রকমই প্রত্যাশা করে। এই দুই দ্বান্দ্বিক সম্পর্কের দুই লক্ষ্য পূরণ করতে গিয়ে সে অনেক আপস করে, অনেক সময় তার অপভূমিকা প্রকট হয়ে ওঠে। সর্বোপরি সে প্রকাশ্যে বলে স্বাধীনভাবে সমাজের জন্য অবদান রাখতে চায়, কিন্তু পদে পদে সে থাকে পরাধীনতায় শৃঙ্খলাবদ্ধ।

শেষ কথা
আমার আলোচনায় আমি এটাই স্পষ্ট করতে চেয়েছি যে, বাংলাদেশে ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম ডে'র আলোচনায় সাংবাদিকের নিরাপত্তার দিকে বেশি আলোকপাত করা হয়, কিন্তু অন্য অনেক ক্ষেত্র যেগুলো স্বাধীনভাবে কাজ করতে বাধাগ্রস্ত করে কিংবা যে যে ক্ষেত্রে সে স্বাধীনভাবে কাজ করতে ব্যর্থ হচ্ছে, সেই বিষয়গুলোও আলোচনায় আসা উচিত। সাংবাদিকের নিরাপত্তার বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু অন্য বিষয়গুলোও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।

[খালেদ মুহিউদ্দিন সম্পাদিত 'মিডিয়াওয়াচ'-এ (Click This Link) প্রকাশিত।] ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/fahmidulhaqblog/29147461 http://www.somewhereinblog.net/blog/fahmidulhaqblog/29147461 2010-05-03 10:34:03
'ভারতীয়' নয়, 'বিদেশী' ছবি আমদানি হোক
আমার বিবেচনায়, সুনির্দিষ্ট নীতিমালার মাধ্যমে, নির্দিষ্ট পরিমাণ বিদেশী ছবি (কেবলই ভারতীয় বা হিন্দি নয়) আমাদের দেশে আমদানি করা যেতে পারে। চীনে বছরে ২০টি বিদেশী ছবি আমদানি হয়, সেন্সরপ্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয় সেসব ছবিকে যেতে হয়। মালয়েশিয়ায় দেখেছি একই সিনেপ্লেক্সে পাশাপাশি ইংরেজি, চীনা, হিন্দি, তামিল ও মালয়ভাষী ছবি পাশাপাশি প্রদর্শিত হচ্ছে। আমার এই অবস্থানকে পরিস্কার করার আগে একটা প্রেক্ষাপট বর্ণনা করা দরকার।

১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ শুরু হবার কয়েকদিন পরে পাকিস্তান সরকার ভারতীয় চলচ্চিত্র এদেশে নিষিদ্ধ করে। আবার ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু সরকার উর্দু বা পাকিস্তানি ছবিকে নিষিদ্ধ করে। কিন্তু নিষিদ্ধ করার আগ পর্যন্ত বহুজনপ্রিয় ভারতীয় বাংলা ছবির দাপটের পরও যেমন আমাদের বাংলা ছবি ব্যবসা করেছে, এফডিসি থেকে নির্মিত চকোরি-চান্দা-তালাশ ইত্যাদি উর্দুভাষী ছবি পশ্চিম পাকিস্তানেও ব্যবসা করেছে। অথচ স্বাধীনতার পর থেকে একটি ‘প্রটেকটেড’ পরিবেশে, চ্যালেঞ্জবিহীন, যা-খুশি-নির্মাণ-করি-ব্যবসা-হবে মানসিকতার কারণে আমাদের মূলধারার ছবির মান আর আগায় নি। হ্যাঁ, ব্যবসা হয়েছে ততদিন, যতদিন না ভিসিআর-কেবল টেলিভিশনের চ্যালেঞ্জ আসেনি। তার আগ পর্যন্ত মানুষের দৈনন্দিন বা সাপ্তাহিক বিনোদন তো একটাই ছিল -- প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে সিনেমা দেখা। এখন মানুষ বিনোদনের অনেক অপশন পেয়ে গেল, বিনোদনের জন্য তাকে আর প্রেক্ষাগৃহে যেতে হয়না। আবার দুয়েকবার গিয়ে তারা দেখে যে, ঘরে বসে গ্ল্যামারাস হিন্দি আর দুর্ধর্ষ ইংরেজি ছবি দেখে দেখে তাদের যে-চোখ তৈরী হয়েছে তার কাছে বাংলা ছবি বড্ড পানসে। সরকার ইন্ডাস্ট্রিকে প্রটেকশন দিতে পারে, কিন্তু দর্শক স্বাধীন, তার তো বাংলা সিনেমাকে প্রটেকশন দেয়ার দায়িত্ব নেই।

এবার ভারতীয় ছবি আমদানির পক্ষে-বিপক্ষে যারা যে-যুক্তিগুলো দিচ্ছেন সেগুলো বিবেচনা করে দেখা যাক।

গত ২২ এপ্রিল, ২০১০ তারিখে প্রথম আলোর 'আনন্দ' পাতায় প্রকাশিত সাক্ষাৎকারে অভিনেতা-নির্মাতা রাজ্জাক বলেছেন, ‘ভারতীয় হিন্দি চলচ্চিত্র আমাদের দেশে আসা মানে, আমাদের নিজস্ব যে সংস্কৃতি আছে, সেটুকুও শেষ হয়ে যাওয়া।’ এই অভিযোগ অনেক পুরনো কিন্তু এখন অকার্যকর। কেবল টিভি, ইন্টারনেটের মাধ্যমে তথাকথিত ‘অপসংস্কৃতি’র যে-প্রবাহ, তা দেড় দশক ধরে চলছে -- আমরা ভেসে যাইনি। বরং বিশ্বায়নের বার্তার সঙ্গে প্রতিদিন মোকাবেলা করে আমরা টিকে আছি। লোকজ ধাঁচের গান-কাহিনী নিয়ে ‘মনপুরা’ লড়াই করছে। অভিনেতা-নির্মাতা আলমগীর বলেছেন, ‘এদেশে বাংলা চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে ভিত্তিপ্রস্তর গড়ে এফডিসি নির্মাণ করেছিলেন, সেটাও আর থাকবে না।’ এফডিসির অবস্থা এখনই বেশ করুণ, এফডিসির সুযোগ-সুবিধার সর্বোচ্চ ব্যবহার এখন চলচ্চিত্র-নির্মাতারা করছেন না, করছেন বিজ্ঞাপননির্মাতারা। একসময় প্রায় একশ ছবি নির্মিত হতো এদেশে, এখন হয় ৪৫টা। নির্মাতা চাষী নজরুল ইসলাম বলেছেন, ‘পাকিস্তানে ভারতীয় ছবি প্রদর্শনের ফলে সে দেশের চলচ্চিত্রশিল্প রুগ্ণ হয়ে গেছে।’ ভারতের মহাপ্রতিপক্ষ পাকিস্তানে ভারতীয় ছবি প্রেক্ষাগৃহে চলছে, কিন্তু সেটাই চলচ্চিত্রশিল্প রুগ্ণ হয়ে পড়ার প্রধান কারণ নয়। এর অনেক আগে, জিয়াউল হক সরকারের গৃহীত নীতিমালার কারণেই পাকিস্তানের চলচ্চিত্রশিল্প মুখ থুবড়ে পড়েছিল। জিয়াউল হক যেবছর শাসনভার হাতে নেন, সেই ১৯৭৯ সালে পাকিস্তানে ৯৮টি ছবি নির্মিত হয়েছিল। কিন্তু পরের বছরেই সেই সংখ্যা ৫৮তে নেমে আসে। জিয়া সরকারের সময় ধর্মীয় উন্মাদনা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে যার প্রথম কোপ পড়ে চলচ্চিত্রশিল্পের ওপর। পরিচালক মোরশেদুল ইসলাম ঢালাওভাবে ভারতীয় চলচ্চিত্র আমাদানি সমর্থন করেননা। তবে তিনি মনে করেন, ‘দুই দেশের মধ্যে একটা বিনিময়চুক্তি থাকলো, তার মধ্যে একটি হচ্ছে আমাদের দেশ থেকে তারা বাংলা ছবি নেবে, আমরাও তাদের দেশ থেকে বাংলা ছবি আনতে পারি। হয়তো সেখানে বছরে কয়েকটি হিন্দি ভালো ছবি আসতে পারে।’

এই প্রস্তাবটি আমার কাছে অপেক্ষাকৃত ভালো মনে হয়েছে। আমদানির প্রসঙ্গে রফতানির বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে। এখানে একটা বৈষম্য থাকবে অবশ্য, মান ও সংখ্যার বিবেচনায় ভারতীয় ছবিই বেশি আসবে (ধরা যাক বছরে ১৫টি) এবং আমাদের ছবি কম যাবে (হয়তো বছরে ৫টি)। বলা দরকার অনেক চেষ্টা-চরিত্র করে চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ ২০০৭ সাল নাগাদ, ভারতীয় প্রেক্ষাগৃহে মাটির ময়নার মুক্তি দিয়েছিলেন। পশ্চিমবঙ্গে আমাদের ছবির চাহিদা আছে। আর কেবল ভারতীয় কেন, ইংরেজি ছাড়া অন্যভাষী (যেমন ইরানি) ছবি আরও ১০টি আসতে পারে। আর প্রেক্ষাগৃহগুলোতে শতকরা কতভাগ বিদেশী ছবি চলবে, তারও একটা নীতিমালা থাকতে হবে। প্রদর্শক সফদর আলী ভুঁইয়া বলেছেন, ‘সরকার যদি নিয়ম করে দেয় শতকরা ৫০ ভাগ স্থানীয় ছবি প্রদর্শন করতে হবে, আমরা তা করবো।’ মাঝখান দিয়ে সিনেমা হলগুলোর সংস্কার হবে, সবগুলো বিভাগীয় শহরে সিনেপ্লেক্স স্থাপনের যে সময়ের দাবি, তাও পূর্ণ হতে পারে। কারণ বিদেশী ছবিগুলো বর্তমান প্রেক্ষাগৃহ-অবকাঠামোয় প্রদর্শন প্রায় অসম্ভব। প্রেক্ষাগৃহের বড় পর্দায় নানা দেশের, নানান স্বাদের চলচ্চিত্র দেখার সুযোগ পাওয়া আমার কাছে একটি নাগরিক অধিকার। এই অধিকার কেবল ভারতীয় ছবি আমদানির কারণে চলচ্চিত্র-শিল্পের ধ্বংস বা উন্নয়নের বিতর্কে বন্দি থাকেনা।

তবে আমদানিকৃত এইসব নানাবিধ বিদেশী ছবির দাপটে, বর্তমানে যারা ছবি নির্মাণ করছেন, তারা আসলেই বিপদে পড়বেন। তাদের ছবি মন্দাদশা থেকে বন্ধদশায় পৌঁছাবে। কিন্তু বিদেশী ছবি না আসলেই বা কী? বছরের পর বছর তারা কীইবা আমাদের উপহার দিয়ে চলেছেন? একইরকম সাধারণমানের কাহিনী, অতি দুর্বল চলচ্চিত্র টেকনিক দিয়ে আর কতদিন সংস্কৃতির ধারক-বাহকের তকমা গায়ে ঘুরবেন? বরং এই হুমকির মুখে তারা আরও প্রস্তুতি নিয়ে, অবশিষ্ট মেধা প্রয়োগ করে, সুনির্মিত চলচ্চিত্র নির্মাণে সচেষ্ট হবেন। যেসব স্বাধীন চলচ্চিত্রগুলো মাঝে মাঝে বিদেশ থেকে সাফল্য বয়ে নিয়ে আসছিল, তা বন্ধ হবেনা। বরং মূলধারার চলচ্চিত্রকারদের নিজের দিকে ফিরে তাকাবার একটা বাধ্যবাধকতা চলে আসবে। অধিকন্তু আমাদের দরকার একঝাঁক নতুন নির্মাতা, যারা নতুন সময়ে নতুন চলচ্চিত্র-ভাবনা নিয়ে সিনেমা বানাতে আসবেন।

নব্বই দশক নাগাদ যখন বলিউডের দাপট বাড়ছিল, তখন পশ্চিমবঙ্গের চলচ্চিত্রব্যবসা মৃতপ্রায় হয়ে পড়ে। কিন্তু তারা একটা পর্যায় পেরিয়ে আজ আবার উঠে দাঁড়িয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ১০টির মতো সাম্প্রতিক ছবি পরপর দেখলাম। এরমধ্যে ঋতুপর্ণ ঘোষ ও অঞ্জন দত্ত ছাড়া বাকি সব ছবির পরিচালকই অচেনা ছিল। কিন্তু সার্বিকভাবে তাদের চলচ্চিত্রের ভাষা বদলে গেছে, কাহিনী বৈচিত্র্যময় ও আধুনিক, মিজ-অঁ-সেন-এ মেধার প্রয়োগ দেখা গেল। কেবল নিছক বিনোদন নয়, সময়কে ধরার প্রচেষ্টা ছবিগুলোতে স্পষ্ট। আমাদের জন্যও দরকার একটা বড় চ্যালেঞ্জ, যার চাবুকে বিক্ষত হয়ে আবার উঠে দাঁড়ানোর প্রত্যয় জাগতে পারে মনে। বিদেশী ছবি আমদানি সেই অর্থে ইতিবাচকই হবে আমাদের জন্য। তবে বলা দরকার, বিদেশী ছবি মানে কেবল ভারতীয় নয়, আর ভারতীয় মানে কেবল হিন্দি নয়। আর সরকারের উদ্যোগে কেবল আমদানি নয়, রফতানির বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/fahmidulhaqblog/29144602 http://www.somewhereinblog.net/blog/fahmidulhaqblog/29144602 2010-04-29 09:23:04
মনসা, সুফিবাদ ও সর্পসিনেমা যাহোক আমরা ক্রমশ সাবালক হয়ে উঠি, ভিসিআরের যুগ পেরিয়ে আমরা স্যাটেলাইট টেলিভিশনের যুগে এসে হিন্দি ও ইংরেজি ছবির সঙ্গে অধিক পরিচিত হই। সিনেমার বাড়তি নেশা আমাদের একসময় ফিল্ম সোসাইটিসমূহের নানা প্রদর্শনী ও বর্তমানে ডিভিডি সার্কিটে হলিউড-বলিউডের বাইরেও চিলি থেকে চীন বা সুইডেন থেকে রাশিয়ার ছবিতে মজতে বাধ্য করেছে। সিনেমার ছায়াপথ আমাদের আচ্ছন্ন করে রাখে।
তবে আমাদের সাবালকত্ব অর্জনের পরে, বাংলা ছবির প্রাক্তন দর্শক হিসেবে, আজ যখন এফডিসির সিনেমার দিকে তাকাই বা স্মরণ করি, সেসব ছবিকে খুব নাবালক মনে হয়। অথচ ইন্ডাস্ট্রির জন্য, যার নানা উৎপাদন একসময় আমাদের সিনেমার পিপাসা মিটিয়েছে, একটা মায়া থেকেই গিয়েছিল। নতুন শতকে এসে দেখলাম সেই মায়ামাখা ইন্ডাস্ট্রি অতল গহ্বরে তলিয়ে যাচ্ছে। আমরা তাই পতিত ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে গবেষণায় নামলাম। গবেষণা-ফলাফল বই আকারেও বেরুলো। সমসাময়িক কিছু ছবিকে বিশ্লেষণ করতে উদ্যোগী হয়েছিলাম গবেষণার আওতায়। নির্বাচিত ৩টি ছবির মধ্যে একটাতে দেখা গেল আবার সেই সাপের ফ্যান্টাসি। সাবালক আমরা নাবালক সেই নির্মাণের ব্যঙ্গ করলাম এভাবে:
“ঢাকাই ছবিতে সাপের গুরুত্ব সাংঘাতিক। ফ্যান্টাসি-পোশাকি-সামাজিক সব ছবিতেই সাপের দেখা মেলে। এমনকি সাপেদের জীবন নিয়ে প্রচুর ছবি নির্মিত হয়েছে (নাগ নাগিনী, নাগিনী কন্যা, শীষনাগ প্রভৃতি ছবির নাম স্মর্তব্য), সেসব ছবিতে নাগিনী কন্যার সঙ্গে রাজপুত্রের প্রেমের ঘটনা দেখানো রীতিমতো স্বাভাবিক টেক্সটে পরিণত হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান সময়ে যে ছবিতে বৈজ্ঞানিক গবেষণার মাধ্যমে প্রবল ক্ষমতাধর চশমা আবিষ্কৃত হচ্ছে সেই একই ছবিতে সর্পরূপী মানুষ বা মনুষ্যরূপী সর্পকে আমরা দেখছি। (রঙ্গীন চশমা) সিনেমায় সাপের এই প্রবল উপস্থিতি কেন, কেন অন্যান্য সরীসৃপ যেমন কুমীর কিংবা কেঁচোকে দেখা যায় না, তা নিয়ে আলাদা গবেষণা হতে পারে। বাংলাদেশী সিনে-ইন্ডাস্ট্রি কী কারণে ভারতীয় পুরাণ কিংবা মনসামঙ্গল-এর লিগ্যাসি বহন করে চলেছে, তাও বিরাট প্রশ্ন, যার সমাধান হওয়া জরুরি।” (নাসরীন ও হক, ২০০৮: ১১৫-১৬)
এরপর কিছুদিন কাটলো। ইতালি থেকে এক গ্রন্থ-সম্পাদক হঠাৎ ই-মেইলে যোগাযোগ করলেন। আমাদের গ্রন্থের খবর পেয়েছেন অনলাইনে, এবার আমার কাছ থেকে বাংলাদেশী কয়েকটি ছবির রিভিউ চান, বইতে অন্তর্ভুক্ত করতে চান। তবে তার বইটি হবে যত অদ্ভূতুড়ে জঁরা বা সিনেমার ধরন আছে তার রিভিউয়ের সংকলন, যাতে চলচ্চিত্র-উৎপাদনকারী সব দেশের প্রতিনিধিত্ব রাখতে চান তিনি। জঁরাগুলো হলো হরর, ফ্যান্টাসি, থ্রিলার, সাইকোথ্রিলার, ক্রাইমথ্রিলার ইত্যাদি। তার চাপাচাপিতে একটা হরর ফিল্ম রিভিউ করে পাঠালাম, যদিও বাংলাদেশে হরর ছবি হয়না বললেই চলে। এবার ফ্যান্টাসি ছবির পালা। আমি ভাবছিলাম ইবনে মিজানের ‘বাহাদুর’ ছবির কথা। কিন্তু ঐ ছবির ডিভিডি বাজারে আসেনি। আমার সাপনির্ভর ছবির কথা মনে পড়লো। সর্পরূপী মানব/মানবী বা মানব/মানবীরূপী সর্পের মতো ফ্যান্টাসি আর কয়টা হয়? রাইফেলস স্কোয়ারে খুঁজে দুটো ছবি পেলাম -- শেখ নজরুল ইসলাম পরিচালিত ‘নাগিন’ আর মাসুদ পারভেজ পরিচালিত ‘নাগপূর্ণিমা’। ‘নাগপূর্ণিমা’ ছবির নামটা মনেই ছিল, একটি গানের কারণে -- এ্যান্ড্রু কিশোরের কণ্ঠে গানটি হলো ‘তুমি যেখানে, আমি সেখানে, সেকি জাননা?’ লিরিক খুব সাধারণ, কিন্তু আলম খানের কম্পোজিশন দারুণ। সাপখোপের ছবিতে এরকম একটা আধুনিক কম্পোজিশন, ভাবাই যায়না! পরে এই গানটি বিজ্ঞাপনেও ব্যবহৃত হয়েছে।
ছবি দুটো সংগ্রহ করে ফেললাম। এবার দেখার পালা। ‘নাগিন’ ছবির পরিচালক শেখ নজরুল ইসলাম আশির দশকেই ‘এতিম’ এবং ‘মাসুম’ নামের শিশুচরিত্রনির্ভর সামাজিক ছবি বানিয়ে মোটামুটি নাম করেছিলেন। আর মাসুদ পারভেজ, ‘নাগপূর্ণিমা’ ছবির পরিচালক তো এ্যাকশন ও মার্শাল আর্ট ছবির পরিচালক-প্রযোজক-নায়ক(সোহেল রানা) হিসেবে বিশেষত্ব অর্জন করেছিলেন। আমি খানিক অবাক হলাম সামাজিক ও এ্যাকশন ছবির পরিচালকরা নাগ-নাগিনীদের নিয়ে ছবি করেছেন! আবার রোমান্টিক নায়ক-রাজ রাজ্জাক (নাগিন), লাস্যময়ী-আধুনিক নায়িকা ববিতা (নাগপূর্ণিমা), এ্যাকশন হিরো সোহেল রানাও (নাগপূর্ণিমা) এসব ছবিতে অভিনয় করেছেন। প্রমাণিত হয় যে নাগ-নাগিনীনির্ভর এইসব ফ্যান্টাসি কতটা সাধারণ জঁরা ছিল আশির দশকে, যার রেশ পরবর্তী দশকগুলোতেও দেখা গেছে। কিন্তু ছবি দেখতে গিয়ে অপরীক্ষিত ঐ কথাটা বারবার মনে পড়তে থাকে: “বাংলাদেশী সিনে-ইন্ডাস্ট্রি কী কারণে ভারতীয় পুরাণ কিংবা মনসামঙ্গল-এর লিগ্যাসি বহন করে চলেছে, তাও বিরাট প্রশ্ন, যার সমাধান হওয়া জরুরি”। ব্যঙ্গাত্মকভাবে কথাটা বলা হলেও, কথাটার মধ্যেই সমাধানসূত্র ছিল। খুব স্পষ্ট করে না হলেও, এদফা সমাধানের কাছাকাছি পৌঁছানো গেল।
কিন্তু কীরকম ব্যাপার সেটা? তার আগে ছবি দুটির কাহিনী বলে নেয়া দরকার।

কাহিনীসূত্র: নাগিন
জমিদার আলম চৌধুরী (শওকত আকবর) প্রজাদরদী কিন্তু তার নায়েব মাহতাব (গোলাম মোস্তফা) দুশ্চরিত্র ও অত্যাচারী। আলম চৌধুরী একদিন হাতেনাতে ধর্ষণোদ্যত মাহতাবকে ধরে ফেলে, চাবুক দিয়ে প্রহার করে এবং নায়েবের নির্বাহী ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে নিজের হাতেই সব নির্বাহী ক্ষমতা নিয়ে নেয়। মাহতাব প্রতিশোধস্পৃহ হয়ে এক সাপুড়ে দম্পতিকে ডেকে দায়িত্ব দেয় জমিদার রাতে ঘুমিয়ে থাকলে সাপকে দিয়ে যেন হত্যা করে। সাপুড়ে যেনতেন নয়, বীণ বাজিয়ে একেবারে সাপুড়েদের আরাধ্য নাগিনকে হাজির করে এবং জমিদারের শয্যায় চালনা করে। ঘটনাচক্রে জমিদারের শয্যায় সেদিন শুয়েছিল জমিদারকন্যা জেবা। নাগিন জেবাকেই দংশন করে, এবং সবাইকে চোখের জলে ভাসিয়ে জেবাকে অতঃপর নদীতে, কলার ভেলায় ভাসিয়ে দেয়া হয়। বলা দরকার জেবা ও নায়েবপুত্র সেলিম খেলার সাথী ছিল। যাহোক, মাহতাব এরপর জমিদারের কাছ থেকে ক্ষমতা কেড়ে নেয়, তাকে কারাগারে বন্দি করে রাখে।
নাগিনের অন্বেষণে জঙ্গলে এলোপাতাড়ি বীণ বাজাচ্ছিল এক সাপুড়ে সর্দার (রাজীব)। সে-ই জেবার প্রায়-মৃতদেহ উদ্ধার করে এবং সাধু বাবার সাহায্য নিয়ে সর্দার নাগিনকেই ডেকে আনে এবং তাকে বাধ্য করে বিষয় ফিরিয়ে নিতে। এরপর জেবা দুলি (সুচরিতা) নাম নিয়ে সাপুড়ে সর্দারের আশ্রয়ে বড়ো হতে থাকে। সর্দারের আরও দু’জন আশ্রিত হলো চম্পা (নূতন) ও রমজান (বাবর), যারা সম্পর্কে ভাইবোন। দুলি-চম্পা সুহৃদ বান্ধবীর মতো করে বড়ো হতে থাকে, কিন্তু যৌবনপ্রাপ্ত রমজান দুলিকে ভালবাসে ও বিয়ে করতে চায়। এদিকে দুলি একদিন একটা সাপকে নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করছিল আর সেলিম (রাজ্জাক) ঐ সাপটিকেই গুলি করে মারতে চাচ্ছিল। এই ঘটনায় তাদের মধ্যে সামান্য বিতর্ক হলেও, প্রথম পরিচয় হয়ে যায় এবং পরস্পরকে মনে ধরে যায়। আরেকদিন এক সাপ সেলিমকে দংশন করেই বসে। গুরুতর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়, কারণ খোদ সর্দারও ঐ সাপের বিষ নামাতে ব্যর্থ হয়। সেলিমকে ধরাধরি করে নিকটবর্তী মাজারে নেয়া হয়, দুলি-চম্পা-সর্দার সবাই মিলে গান গেয়ে মওলার কাছে ফরিয়াদ জানিয়ে সেলিমকে সুস্থ করে তোলা হয়। সেলিম চোখ মেলেই দেখে দুলিকে, দুলির প্রতি তার প্রেম পোক্ত হয়। আর জমিদার খুশি হয়ে সাপুড়ে পরিবারকে লাখেরাজ সম্পত্তি দান করে অনুরোধ করে যাযাবর জীবন পরিত্যাগ করে থিতু হতে।
এতে সেলিম ও দুলির সুবিধে হলো। কিন্তু রমজান অখুশি হলো, ওদের দু’জনের অবাধ মেলামেশা দেখে তার গা জ্বলে যায়। আর জমিদারও একপর্যায়ে সাপুড়ে পাড়ায় সেলিমের যাতায়াতের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করলো। কিন্তু তাদের অভিসার গোপনে চলতে থাকে। রমজান একদিন দুলির হাত থেকে সেলিমের উপহার দেয়া আংটি কেড়ে নেয়। দুলি রাতে তার আংটি খুঁজতে রমজানের ঘরে যায়। রমজান জেগে গিয়ে দুলির প্রতি পুনরায় প্রেম-কাম নিবেদন করে। জোরপ্রয়োগ করতে গেলে দুলি ক্রোধান্বিত হয়, তার মধ্যে পরিবর্তন ঘটে এবং নাগিনে রূপান্তরিত হয়ে সম্ভ্রম রক্ষা করে। বোঝা যায় যে-নাগিন একদিন জেবাকে কেটেছিল, সেই এখন দুলির মধ্যে বাস করে। রমজান এতে খুশিই হয়, সাপুড়ে হিসেবে। সাপুড়েদের আরাধ্য নাগিন যে একেবারে ঘরের মধ্যে! সে সর্দারের কাছ থেকে মানুষ থেকে বেজিতে রূপান্তরিত হবার মন্ত্র শেখে। সর্দারও তাকে ভবিষৎ সর্দার বানাবার প্রতিশ্র“তি দেয়। তবে রমজান আরেকবার দুলিকে ধর্ষণোদ্যত হলে, সর্দার হাতেনাতে ধরে ফেলে এবং তাকে কাবিলা থেকে বের করে দেয়। বঞ্চিত রমজান যোগ দেয় জমিদার মাহতাবের সঙ্গে। রমজান জমিদারকে জানায় সেলিম ও দুলির সম্পর্কের কথা। জমিদার নিজ সন্তানকে আরেক পরগণায় পাঠিয়ে দেয় কৌশলে এবং আটকে রাখে সেখানে। আর রমজানকে দায়িত্ব দেয় সর্দার ও দুলিকে ধ্বংস করার জন্য। রমজান পাতালমণি সাপের নেতৃত্বে হাজার হাজার সাপ পাঠায়, কিন্তু নাগিন দুলি একাই পাতালমণিকে পরাস্ত করে। এরপর জমিদার আদেশ দেয় সাপুড়ে পল্লী পুড়িয়ে দিতে। দুলি জমিদারের কাছে গিয়ে মিনতি জানায় যে প্রেম করে সে অন্যায় করেছে, পুরো কৌমের জন্য ক্ষতি না করা হয়। জমিদার দুলিকে তুলে দেয় রমজানের হাতে এবং রমজান দুলিকে জোরপূর্বক নিয়ে যায়। তখন দুলি নাগিনে পরিণত হয়, রমজান পরিণত হয় বেজিতে। তাদের লড়াই চলে। এদিকে সেলিমের গোপন-প্রেমিকা অথচ ত্যাগী মানসিকতার চম্পা সাপের মুখ দিয়ে চিরকুট পাঠায় সেলিমের ফাটকে। সেলিম কাররক্ষীদের সঙ্গে মারামারি করে, ত্যাগী দ্বিতীয় নায়িকা চম্পার মৃত্যু সেখানেই হয়, কোলেটারাল ড্যামেজ হিসেবে। সেলিম প্রাসাদে আসে, রমজানের সঙ্গে লড়াই হয়, মারামারিতে কোলেটারাল ড্যামেজ হিসেবে জমিদার মাহতাবেরও মৃত্যু ঘটে। ওদিকে কারারক্ষীর সহায়তায় কারাগার থেকে বেরিয়ে আসে আসল জমিদার। সর্দারও যথাসময়ে হাজির হয়। জমিদার আলম চৌধুরীর লেখা চিরকুটটা সঙ্গেই ছিল সর্দারের। দুলি যে আসলে জেবাই, তা জানা যায়, চিরকুটের বদৌলতে। সেলিমও জানতে পারে সে ভুল মানুষকে ভালবাসেনি, দুলি তো তার খেলার সাথী জেবা। কিন্তু রমজানকে কামড়ে নাগিন জেবা তখনও বেহুঁশ। সর্দার জানালো, বেহুঁশ হবার কারণ নাগিনের আত্মা চিরতরে চলে গেছে জেবাকে ছেড়ে। জমিদার পেল হারিয়ে যাওয়া মেয়ে ও জমিদারি, বাবাকে হারালেও সেলিম পেল তার প্রেমিকা দুলিকে (অথবা খেলার সাথী জেবাকে)। কিন্তু সর্দার কিছুই চায়না। নাগিনের খোঁজে জঙ্গলে জঙ্গলে সে বীণ বাজাতে থাকে।

কাহিনীসূত্র: নাগপূর্ণিমা
‘নাগপূর্ণিমা’ ছবির কাহিনী ‘নাগিন’ থেকে আরও খানিকটা জটিল।
সাপুড়ের এক ছেলে এক মেয়ে। মেয়ের পোষা পাখিকে কালনাগিনী খেতে গেলে মেয়ে লাঠি হাতে তাকে মারতে যায়। কালনাগিনীর ছোবলে মেয়ের মৃত্যু ঘটে। কন্যাহারা সাপুড়ে খেপে গিয়ে বীণ বাজাতে বাজাতে কালনাগিনীর খোড়লে পৌঁছে যায়। কালনাগিনীর সন্তানকে সে ধরে ফেলে এবং আছাড় মেরে হত্যা করে। এতে নাগিনীও ক্ষেপে যায়, এবং ঘোষণা দেয় সাপুড়ের ছেলেকে হত্যা করার মাধ্যমে তাকে নির্বংশ করা হবে। ছেলে মঙ্গলকে বাঁচাতে সে যায় সাধু বাবার কাছে। সাধু বাবা তাকে বলে যে কালনাগিনীর হাত থেকে মঙ্গলকে বাঁচাতে হলে ওকে কঠিন এক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। ওকে প্রতিদিন কালনাগের বিষ খাওয়াতে হবে, ১২ বছর পর্যন্ত। কালনাগের বিষের প্রভাবে কোনো সাপ তাকে মারতে পারবে না। আর দেওয়া হয় একটা তাবিজ। সেই তাবিজ কখনোই খোলা যাবেনা, এবং তাবিজ খোলার অবকাশে কোনো সাপ যদি তাকে দংশন করে তবে পরের পূর্ণিমা রাত থেকেই শুরু হবে অঘটন।
বাবাজির কাছ থেকে বিষ নিয়ে মঙ্গলকে সাপুড়ে প্রতিদিন বিষ খাওয়ায়, এভাবেই বেড়ে ওঠে মঙ্গল। তরুণ মঙ্গলের (সোহেল রানা) প্রেমের সাথী হলো লাচি (ববিতা)। কিন্তু লাচিকে পছন্দ করে সাপুড়ে সর্দারের নাতি শেরু (আদিল)। তাকে বিয়েও করতে চায়। পথের কাঁটা সরাতে শেরু মঙ্গলকে মারতে দলবল পাঠায়। মারামারির এক পর্যায়ে হাতের তাবিজ খুলে যায় মঙ্গলের, আর সেই ফাঁকে তাকে দংশন করে কালনাগিনী। পরের পূর্ণিমা রাতেই মঙ্গলের মাঝে কিছুটা পরিবর্তন আসে। উত্তরের পাহাড়ে কোনো এক নারী (রোজিনা) গান গায়, সেই গানের টানে মঙ্গল ছুটে যায় সেই নারীর কাছে, ভুলে যায় পেছনের সবকিছু। একপর্যায়ে ঘুমিয়ে পড়ে সেই পাহাড়েই। হত্যার উদ্দেশেই মঙ্গলকে অনুসরণ করে শেরু। কিন্তু অচেনা নারীকে দেখে ফিরে আসে এবং লাচিকে জানায় মঙ্গলের পূর্ণিমা অভিসারের কথা। পরের পূর্ণিমায় লাচি অনুসরণ করে মঙ্গলকে। সেও দেখে সেই নারীর নাচ আর গানে সম্মোহিত মঙ্গলকে। কিন্তু মঙ্গল লাচিকে দেখেও চিনতে পারেনা। বরং কামড়াতে আসে লাচিকে। তবে শেরুর বাহিনী এসে মঙ্গলকে তার আগেই আক্রমণ করে। মারামারির এক পর্যায়ে মঙ্গল কামড় দেয় শেরুর অনুচরকে। সে তৎক্ষণাৎ মারা যায়, এবং তার শরীরে বিষের সংক্রমণ ফুটে ওঠে। শেরু রটিয়ে দেয় মঙ্গল মানুষ না, সাপ। এরপর মঙ্গলের মধ্যে শুরু হয় অস্তিত্বের সংকট। সে বাবার কাছে প্রকাশ করে পূর্ণিমা রাতে ভুলে যায় সবকিছু, তার মধ্যে ওলট-পালট হয়ে যায়। তার ইচ্ছে করে কাউকে পেঁচিয়ে ধরে মেরে ফেলতে অথবা দংশন করতে। বাবা বুঝতে পারে ১২ বছরের অধ্যবসায় বিফলে গেছে। সে আবার ছোটে সাধুবাবার কাছে। জানতে পারে আর এক পূর্ণিমা পরেই মঙ্গল পুরোপুরি নাগে পরিণত হবে। এই বিপদ ঠেকানোর একটাই উপায়, নাগপুরীতে গিয়ে নাগরাজের বর নিয়ে আসতে হবে, নাগরাজ খুশি হয়ে বর দিলেই কেবল এই রূপান্তর ঠেকানো যাবে। কিন্ত সেটা প্রায় অসম্ভব একটা কাজ।
কিন্তু সেই অসম্ভব কাজ করতেই রওয়ানা দেয় মঙ্গল। এদিকে শেরু জটাগুরুর কাছে যায় কিছুতেই যাতে নাগপুরীতে পৌঁছতে না পারে তার ব্যবস্থা করতে। জটাগুরু শেরুর কাছ থেকে এক নারীকে ভোগের জন্য উপঢৌকন পেয়ে নানা তন্ত্র-মন্ত্র জপতে বসে। মঙ্গলকে আটকাতে পাঠানো হয় বেজি। বেজি ও প্রায়-সর্প মঙ্গলের মধ্যে লড়াই হয়, মঙ্গল পরাস্ত হয়ে ক্ষতবিক্ষত হয়। তাকে শুশ্রƒষা করতে হাজির হয় সেই নারী, যার গান শুনে মঙ্গল পূর্ণিমা রাতে উতলা হয়ে পড়তো। জানা যায় তার নাম চন্দ্রমণি, নাগকন্যা সে, কিন্তু নাগরাজের বরে সে মানুষের রূপও ধারণ করতে পারে। আর সে বহুদিন ধরে যে প্রেমিককে খুঁজে আসছিল, মঙ্গলই হচ্ছে সেই প্রাণনাথ। সে খুশি এজন্য যে অচিরেই মঙ্গল নাগে পরিণত হবে এবং ভুলে যাবে অতীত মানবজন্ম এবং তার আর মঙ্গলের মাঝে আর কোনো ব্যবধান থাকবে না। কিন্তু মঙ্গল তখনও লাচির প্রেমিক এবং মানবজন্মই তার কাক্সিক্ষত। সে কিছুতেই নাগে রূপান্তরিত হতে চায়না। সে বরং চন্দ্রকে অমোঘ বাণী দেয়, ‘ভালবাসার সার্থকতা পাওয়ায় নয়, ত্যাগে’। অতএব তার মঙ্গলকেই সাহায্য করা উচিত, নাগপুরী খুঁজে পেতে। ঐ মুহূর্তে চন্দ্র তাকে সাহায্য করে না। কিন্তু মঙ্গল ঠিকই নাগপুরীতে পৌঁছে যায়, নাগরাজের মূর্তির সামনে অনেক কাকুতি-মিনতি করে তার মানবজন্ম অক্ষুণœ রাখার জন্য। কিন্তু নাগরাজ সাড়া দেয়না। মঙ্গলের দেহে রূপান্তর ঘটতে থাকে। রূপান্তরের জ্বালা সইতে না পেরে সে ধরাশায়ী হয়। ওদিকে জটাগুরু মন্ত্র-তন্ত্র জপে দুই নর্তকীকে দিয়ে সর্প-নৃত্যের আয়োজন করে, নাগরাজের আবির্ভাবের জন্য। আর ধরাশায়ী মঙ্গলের পাশে, নাগরাজের মূর্তির সামনে নাচতে থাকে চন্দ্র। চন্দ্রর জয় হয়। মঙ্গল ফিরে পায় মানবজীবন। কৃতজ্ঞতা জানাতে না জানাতেই চন্দ্র চিরকালের জন্য পরিণত হয় সর্পে।
ওদিকে লাচিকে জোরপূর্বক বিয়ের আয়োজন করে শেরু। মঙ্গল ফিরে আসে বিয়ে সমাপ্ত হবার আগেই। শেরু চিৎকার করে ওঠে, মঙ্গল সাপ, ওকে মারো। মঙ্গল দাবি করে সে এখন বিষমুক্ত। সে লাচির ঘাড়ে কামড় দিয়ে প্রমাণ করে সে বিষমুক্ত। তার বিষমুক্তির খবর কালনাগিনীর কাছে পৌঁছে যায়। সে তার পুরনো প্রতিজ্ঞা পালন করতে ছুটে আসে। মঙ্গলকে দংশন করতে হবে। এদিকে চন্দ্রমণিও বন্ধুকে রক্ষা করতে ছুটে আসে। ক্রস কাটিং সম্পাদনায় আমরা দেখতে পাই মানুষে মানুষে ও সাপে সাপে লড়াই। অবশেষে শুভর জয় হয়।
এই দুই গল্পের প্রেক্ষাপটে আমি আসলে বিশ্লেষণ করতে চাইবো কেন বাংলা সিনেমায় সাপের এই প্রবল উপস্থিতি? কেন এসব ছবিতে মসজিদের চাইতে মাজার বেশি দেখা যায়?

মনসা, সুফিবাদ ও সর্পসিনেমা
এজন্য প্রাচীন কাল থেকে বঙ্গের মানুষের ধর্মপালনের প্রেক্ষাপটটিতে দৃষ্টি দেয়া দরকার। এই অঞ্চল প্রাচীনকালে বরেন্দ্র, সমতট, বঙ্গ, হরিকেল এরকম কয়েকটি জনপদে বিভক্ত ছিল এবং অধিবাসীরা জনপদ অনুসারেই পরিচিত হতো। আর উত্তর ভারতে আর্যরা খ্রিস্টপূর্ব দুই হাজার বছর পূর্বে আসলেও দূরবর্তী পূর্ব ভারত বা এই অঞ্চলে তারা আসে অনেক পরে। এই অঞ্চলের অনার্য লোকজন তাদের কাছে ‘বর্বর’রূপেই পরিচিত ছিল। খ্রিস্টের জন্মের মাত্র কয়েকশ বছর আগে, মৌর্য আমলে (৩২১-১৮১ খ্রি.পূ.) আর্যপ্রভাব অনুভূত হয়। তাই দেখা গেছে আর্য দেব-দেবীদের চাইতে অনার্য বা স্থানীয় দেব-দেবীরাই এখানে বেশি পূজিত হতো। মনসামঙ্গলের কাহিনী তারই সাক্ষ্য দেয়।
মনসা ছিল সাপের দেবী এবং অনার্য দেবী। চাঁদবেনে পূজা করতো আর্য দেবতা শিবের। কিন্তু মনসা চাঁদবেনের ভজনা কামনা করে। চাঁদবেনে তা অস্বীকার করে এবং মনসাকে দেবী বলেই মানতে চায়না। ক্রোধান্বিত মনসা চাঁদ সওদাগরের সপ্তডিঙ্গা ডুবিয়ে দেয়। আর হত্যা করে সাত পুত্রকে। কনিষ্ঠতম পুত্র লক্ষ্মীন্দরের সঙ্গে বিয়ে হয় বেহুলার। সেই লক্ষ্মীন্দরকেও বাসররাতে সাপে কাটে মনসার অভিশাপে। এরপর স্বামীকে নিয়ে শুরু হয় বেহুলার ভাসান। স্বামীপ্রেম, দেবীভক্তির মাধ্যমে সে ফিরে পায় স্বামীকে, শ্বশুরের সপ্তডিঙ্গা ও সাত সন্তান, বিনিময়ে চাঁদবেনে শিবপূজার পরিবর্তে মনসাপূজা শুরু করে। এই কাহিনী তাই আর্য দেবের ওপরে অনার্য দেবীর বিজয় ঘোষণা করে।
মনসামঙ্গল বঙ্গে তাই বহুল পঠিত, বেহুলা-লক্ষ্মীন্দরের কাহিনী বহুজনপ্রিয়। মনসাও জনপ্রিয় একজন অনার্য দেবী। প্রাচীনকালে বঙ্গ ছিল বনজঙ্গল আর জলা-জংলায় ভরপুর। মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাপনের সঙ্গেই সাপ অস্তিত্বমান ছিল। সাপ-খোপের হাত থেকে রক্ষা পাবার জন্যও সাপের দেবীর পূজা অনিবার্যতায় রূপ পেতো।
অনার্য ধর্ম, বৌদ্ধ ধর্ম, আর্যধর্মের দীর্ঘ ইতিহাসের পর একপর্যায়ে এদেশে আসে মুসলমানরা। তুর্কী বখতিয়ার খলজির অসিযোগে বঙ্গবিজয়ের আগেই বঙ্গের মানুষের অন্তর জয় করে নিয়েছিল ইরান থেকে আসা সুফি সাধক-দরবেশরা। ইরানি সুফিবাদের মধ্যে যেহেতু এক ধরনের উদারতা ছিল, তাই অনার্য মত মননে রেখেই স্থানীয় লোকজন মুসলমান হয়েছিল। মনসা তাই মন থেকে দূর হয়ে যায়নি। আবার সুফি সাধক বা পীর-মুর্শিদকে ঘিরেই বঙ্গে গড়ে উঠেছে মাজার সংস্কৃতি। বঙ্গের মুসলমানরা সাধক-বাবার (জীবাত্মা) মধ্য দিয়েই আল্লাহকে (পরমাত্মা) পেতে চাইতো। যাহোক ব্রিটিশরা আসার পর ধর্মপালনের এই প্রধান ধারা বেশ খানিকটা পাল্টে যায়। হিন্দু-মুসলমানদের বিভেদ বাড়ে। ঊনবিংশ শতাব্দির ফরায়েজি আন্দোলনের পর বঙ্গে সুফিবাদপ্রভাবিত ইসলামের ওপর প্রাধান্য বিস্তার করে অবিকৃত আরব-ইসলাম। অন্যদিকে ব্রিটিশপ্রবর্তিত আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে জন্ম নেয় সেকুলার মূল্যবোধ। বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রাধান্যে ও শাস্ত্রীয়-রাজনৈতিক ইসলামের চাপে সুফি ইসলাম হয়ে পড়ে গৌন। এককালের লোকধর্ম হয়ে পড়ে প্রত্যন্ত গ্রামীণ ও প্রান্তীয় মানুষের গৌনধর্ম, এক সাব-কালচার।
এফডিসিতে যারা ছবি বানাতে আসেন তাদের মধ্যে আধুনিকমনস্কতা, শৈল্পিক পরিশীলিনতার অভাব দেখা যায়। আধুনিকতা ও সেকুলারিজমের পঠন-পাঠনের সুযোগ ঘটেনি তাদের। তাদের সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতার মধ্যে রয়েছে লোকজ বিভিন্ন আঙ্গিক (যেমন যাত্রা), বিভিন্ন মিথ (যেমন মনসামঙ্গল), ধর্মাচারের মধ্যেও রয়েছে গ্রামীণ ভক্তিবাদ (পীর-মুর্শিদবাদ)। এফডিসির চলচ্চিত্রে সাপনির্ভর অনেক অনেক ফ্যান্টাসি নির্মাণ তাই আশ্চর্যের কোনো বিষয় থাকছে না, শেষপর্যন্ত।
‘নাগিন’ ছবিতে দেখা যাচ্ছে নাগিনকে নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য সাপুড়ে-সর্দার যখন মন্ত্রপাঠ করছে তখন বারবার মা মনসার নাম নিচ্ছে। এমনকি নাম নিচ্ছে মান পীর-মুর্শিদেরও। যখন জেবার প্রায়-মৃতদেহ সে নদী থেকে উদ্ধার করে, তখন নাগিনকে ডেকে বিষ ওঠানোর ব্যবস্থা করার জন্য সে ছুটে যায় সাধু বাবার কাছে। আবার সেলিম যখন সাপের কামড়ে বেহুঁশ, যখন সাপুড়ের মন্ত্রও ব্যর্থ, তাকে ভালো করে তুলতে সর্দার-দুলি-চম্পা সবাই তাকে নিয়ে যায় মাজারে। বাবার মারফতে মওলার কাছে তারা সেলিমের জীবনভিক্ষা করে, গান গেয়ে। ‘নাগপূর্ণিমা’ ছবিতে কালনাগিনীর হাত থেকে মঙ্গলকে রক্ষা করার জন্য বাবা সাপুড়েও ছুটে যায় সাধুবাবার কাছে। বলা যায় ছবির কাহিনীর প্রাণভোমরাই ছিল সাধুবাবার হাতের কৌটায়। মঙ্গলের জীবনে যাওয়া ঘটে যাওয়া নানা ঘটনার জন্য সে মোটেই নিজে দায়ী ছিল না। কিন্তু তার ভবিতব্যের সকল সমাধানসূত্র সাধুবাবার হাতেই ছিল। তাইতো মঙ্গল যখন ক্রমশ সাপে পরিণত হচ্ছে, তার অস্তিত্বের সঙ্কট চরমে, তখন নাগরাজ্যে গিয়ে নাগরাজের বর পাবার পরামর্শও দেয় সাধুবাবা। বাংলা সিনেমায় মসজিদের দেখা ততটা মেলেনা, কিন্তু মাজারের দেখা অহরহই মেলে। বাংলা সিনেমায় মাজারের এই বহুল উপস্থিতি প্রকারন্তরে রাজনৈতিক ইসলামের প্রসারকে চ্যালেঞ্জ জানায়, সাংস্কৃতিক অভিপ্রকাশের মাধ্যমে।
তবে সাংস্কৃতিক অভিপ্রকাশ হিসেবে এফডিসির পরিচালকেরা বেছে নিয়েছেন প্রযুক্তিনির্ভর একটি আধুনিক মাধ্যমকে, যে-মাধ্যমের ওপরে তাদের খুব একটা দখল নেই। ফলে এইসব ফ্যান্টাসির স্পেশাল ইফেক্ট হয় নিম্নমানের। ‘নাগিন’ ছবিতে আমরা দেখি নাগিনের মুখ থেকে এলোমেলো আলোকরশ্মি বেরুচ্ছে। মানুষ থেকে সাপ বা সাপ থেকে মানুষে রূপান্তরের ফ্যান্টাসি তারা একদমই নির্মাণ করতে পারছেন না। কেবল একটি কাট-এর মাধ্যমে এই পরিবর্তন দেখাচ্ছেন তারা, ইফেক্ট দেবার চেষ্টাও করেননি। ‘নাগিন’ ছবির এক দৃশ্যে দেখা গেল কারাবন্দী জমিদার বলছে, “এই অন্ধকার কারাগার-এ আমি আর বাঁচতে চাইনা” ... ইত্যাদি। কিন্তু ভিস্যুয়ালে দেখা গেল আলো-ঝলমলে কারাগারের সেট। তবে এসব ছবির দুয়েকটি ক্ষেত্রে তারা পারঙ্গমতা অর্জন করেছেন: এক. সাপুড়েদের বীণ বাজানোর নৃত্যভঙ্গি, দুই. অভিনেত্রীদের সাপুড়ে-নৃত্য পরিবেশনা।
মডার্নিটির রুচি ও শৈলী অর্জনে অযোগ্যতা কিন্তু লোকধর্মের সঙ্গে মানসিক আলগ্নতার কারণে আমরা এফডিসি থেকে সাপনির্ভর ও মাজারগামী অনেক ছবি পেয়েছি, ‘নাগিন’ বা ‘নাগপূর্ণিমা’ হয়তো তার শ্রেষ্ঠ উদাহরণও নয়।

তথ্যসূত্র
গীতি আরা নাসরীন ও ফাহমিদুল হক, বাংলাদেশের চলচ্চিত্রশিল্প: সঙ্কটে জনসংস্কৃতি, (ঢাকা: শ্রাবণ, ২০০৮)।
চিত্র: একটি রিকশা পেইন্টিং; সূত্র: Click This Link
প্রথম প্রকাশ: খালেদ মুহিউদ্দিন সম্পাদিত 'মিডিয়াওয়াচ': Click This Link]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/fahmidulhaqblog/29134394 http://www.somewhereinblog.net/blog/fahmidulhaqblog/29134394 2010-04-13 23:00:11
নারী দিবসে হেঁশেল-ছাড়া নারীর জন্য 'রাঁধুনী'র পুরস্কার
কিন্তু পরিহাস হলো, এই কীর্তিমতীরা হেঁশেল থেকে বেরিয়ে এসে সমাজে নিজপরিচয়ে পরিচিত হয়ে ওঠার পুরস্কারস্বরূপ পেলেন ‘রাঁধুনী’র এই পুরস্কার। আমোদের কথা বটে! রাঁধুনী হলো স্কয়ার-উৎপাদিত মসলাজাতীয় দ্রব্যের ব্রান্ড।

নারীদিবস এলেই প্রতিবছর কর্পোরেট প্রতিষ্ঠাগুলো নানা ধরনের পরিহাসের জন্ম দেয়। ইদানীংকার পরিহাস হলো হেঁশেলছাড়া কীর্তিমতীর জন্য রাঁধুনী-পুরস্কার। এর আগে আমরা দেখেছি খোদ নারী-দিবসকে ‘পন্ডস নারী দিবস’ হিসেবে প্রচার করতে। নানা দিবসকে ঘিরে কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর দরদীপনা আমাদের শঙ্কিত করে তোলে। এতে সহযোগী হয় কিছু কর্পোরেট মিডিয়া, যা আমাদের দুর্ভাবনায় নতুন দিকমাত্রা আনে। রাঁধুনী কীর্তিমতী সম্মাননার সহযোগী গতবছর ছিল চ্যানেল আই ও প্রথম আলো। এবার কেবলই চানেল আই। একুশে ফেব্র“য়ারি, পহেলা বৈশাখ, স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস, নারী দিবসসহ যাবতীয় দিবসসমূহ, যাতে ব্যাপক জনসংশ্রব রয়েছে -- কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো সেসব দিবসকে ঘিরে তাদের কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপন্সিবিলিটির প্রদর্শনে পাল্লা দিয়ে নামে।

তবে নারীর ক্ষেত্রে বিষয়টা আর দিবসে আটকে থাকেনা। এরকমও দেখা গেছে যে ফেয়ার এ্যান্ড লাভলী ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে নারীকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে কম্পিউটার ইত্যাদি উপহার দিতে। ত্বক ফর্সাকারী ক্রিমের বিজ্ঞাপনে দেখা যায় কালো মেয়ে চাকরি পাচ্ছেনা, ক্রিম মেখে ফর্সা হওয়ামাত্রই চাকরি জুটে যাচ্ছে। যে পণ্য নারীকে এরকম বর্ণবাদী দৃষ্টিতে দেখে, তারাই আবার নারীর উন্নয়নের জন্য ফাউন্ডেশন বানায়, তাতে উপদেষ্টা হন নারীনেত্রী। পরিহাসের পরাকাষ্ঠা যাকে বলে!

কীর্তিমতীরা নিশ্চয়ই এখনও নিয়মিত বা মাঝেমধ্যে হেঁশেলে ঢোকেন, কিন্তু এটা নিশ্চিত যে তারা কীর্তিমতী হয়েছেন নারীর রাঁধুনী-ইমেজকে অতিক্রম করেই। অথচ তাদের দেয়া হচ্ছে ‘রাঁধুনী’র পুরস্কার। এখানেই অর্থের জগতে একটা শোরগোল পড়েছে। নির্দেশিত অর্থ (ডিনোটেটিভ মিনিং) যদি হয় কীর্তিমতী নারীর প্রতি সম্মান-প্রদর্শন, গূঢ়ার্থে (কনোটেটিভ মিনিং) ঠিক উল্টোটাই খুঁজে পাওয়া যাবে। ‘রাঁধুনী’ কি কেবলই একটি নিরপেক্ষ-নির্ভেজাল প্রডাক্ট? একটা ব্র্যান্ডমাত্র? মোটেই তা নয়। রাঁধুনীর মতো প্রডাক্ট নারীদের কী চোখে দেখে, তা বোঝার জন্য সেই বিজ্ঞাপনটির কথা স্মরণ করাই যথেষ্ট হবে, যেখানে মা-ছেলের আনন্দমুখর সংলাপের এক পর্যায়ে মা বলেন ‘এবার সত্যিকারের রাঁধুনী ঘরে নিয়ে আয়’। যে-পণ্যটি স্ত্রী বা নারীকে রাঁধুনী ছাড়া আর কিছুই ভাবছে না, সে দিচ্ছে কীর্তিমতী নারীর জন্য পুরস্কার! সিগারেট-কোম্পানি যখন ধূমপানবিরোধী ক্যাম্পেইন করে, তখন আমাদের মনে যে বিপুল পরিমাণে বিনোদনের সরবরাহ হয়, রাঁধুনীর এই কীর্তিমতী সম্মাননাও তেমনি হাস্যকর প্রয়াস। কিন্তু মূল ব্যাপারটি হলো এর মাধ্যমে নারীর প্রতি প্রতীকী অবমাননার জন্ম দেয়া হয় এবং প্রকারন্তরে নারীর অগ্রযাত্রাকেই রুখে দেয়া হয়। নারীকে হেঁশেলে আটকে রাখার পুরুষতান্ত্রিক যে-ষড়যন্ত্র, তা-ই এখানে প্রয়োগ করা হচ্ছে। এমনকি হেঁশেলছাড়া নারীকেই দেয়া হচ্ছে হেঁশেলসামগ্রীর পুরস্কার, যার মাধ্যমে প্রকারান্তরে সকল অগ্রগামী নারীকে হেঁশেলে ফেরার আহ্বান জানানো হচ্ছে। ফেয়ার এ্যান্ড লাভলী ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে নারীর অগ্রযাত্রায় অবদান রাখাও ঠিক একইরকম অর্থবৈপরীত্য সৃষ্টি করে।

অন্যদিকে হেঁশেল থেকে এতদূরের রাস্তা পাড়ি দেবার পরেও কীর্তিমতীরা সানন্দে রাঁধুনীর সম্মাননা নিচ্ছেন, সমস্যাটা এখানেও। কীর্তিমতীদের কীর্তি নিয়ে আমাদের সন্দেহ নাই, আমাদের মনে খচখচ করে, এত কীর্তির পরে তারা কিনা নিলেন রাঁধুনীর পুরস্কার! এবারের সম্মাননাপ্রাপ্তরা ঢাকার বাইরে থেকে নির্বাচিত হয়েছেন। কিন্তু গতবারের সম্মাননাপ্রাপ্তরা ঢাকার নাগরিকসমাজের পরিচিত মুখ। তাই তাদের কাছ থেকে অনেকখানি দায়িত্ববোধ পুরো জাতিই আশা করে।

অন্যদিকে এই সম্মাননা প্রদানের একটা রাজনৈতিক-অর্থনীতিও রয়েছে। গত বছরের অনুষ্ঠানে প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান তিন গুণী নারীকেই প্রথম আলো পরিবারের অংশ বলে উল্লেখ করেন। সুমনা শারমিন প্রথম আলো পরিবারের সদস্য বটেন। কিন্তু বাকী দুইজন কীভাবে? মতিউর রহমান না বললেও বোঝা যায় বাকী দুইজন পত্রিকাটির সহযোগী সদস্যের মতো। বিউটিশিয়ান কানিজ আলমাস প্রথম আলোর নকশা পাতার এক্সপার্ট, নারীর রূপ-ম্যানেজমেন্ট নিয়ে তার কারবার। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা, নারীনেত্রী, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি (যাকে সমাজসেবা ক্যাটাগরিতে সম্মাননা দেয়া হয়েছে) সুলতানা কামাল প্রথম আলোর মধ্য বা প্রথম পাতার একজন এক্সপার্ট। প্রথম আলো পরিবারের এই সদস্যদের পুরস্কার দিচ্ছে শীর্ষ কর্পোরেট-কোম্পানি। এই কোম্পানিও প্রথম আলো পরিবারের বাইরের কেউ না, নিয়মিত বিজ্ঞাপন তো তারা দিচ্ছেই, আরও নানা কর্মসূচিতে তারা প্রথম আলোর সঙ্গে তারা যুক্ত (যেমন প্রথম আলো-মেরিল পুরস্কার)। মুদ্রণ মাধ্যম প্রথম আলোর সঙ্গে সুশীল-কর্পোরেটের যে সৌহার্দ্য, ইলেক্ট্রনিক মাধ্যম চ্যানেল আইয়ের সঙ্গেও তাদের সেরকমই সুসম্পর্ক। তাই স্কয়ার-প্রথম আলো-চ্যানেল আইয়ের যূথবদ্ধতাও অনিবার্য হয়ে ওঠে। নারী দিবসে নারীদের (সুলতানা, সুমনা, কানিজ) সম্মাননা জানানো তাই মিডিয়া(মতি-সাগর)-সুশীল(সুলতানা)-কর্পোরেটের(অঞ্জন) মিথোজীবী (symbiotic) সম্পর্ককে টিকিয়ে রাখা ও অন্যদের জানিয়ে রাখা অপরিহার্য হয়ে ওঠে। এই ঐক্যজোট একইরকম করে ভাবে, কীরকম বাংলাদেশ তারা দেখতে চায় সেবিষয়ে তাদের ঐক্য আছে। সব প্রতিষ্ঠানের বিরাজনীতিকরণের মাধ্যমে নির্বিবাদী ব্যবসা-বাণিজ্য করতে পারার একটা পরিবেশ চায় এই ঐক্যজোট।

গত বছরের সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন কীর্তিমতীরা ছাড়াও স্কয়ারের অঞ্জন চৌধুরী পিন্টু, প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান, চ্যানেল আইয়ের প্রধান নির্বাহী ফরিদুর রেজা সাগর, তত্ত্ববধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্ট রোকেয়া আফজাল রহমান, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি ও নারী প্রতিনিধিরা। আর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত এবারের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন স্কয়ারের অঞ্জন চৌধুরী পিন্টু, চ্যানেল আইয়ের প্রধান নির্বাহী ফরিদুর রেজা সাগর, সঙ্গীতশিল্পী রুনা লায়লা, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি ও নারী প্রতিনিধিরা।

একটা আশাবাদের গল্প বলে শেষ করি। গল্পটা ব্যক্তিগত পর্যায়ে শোনা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক গীতি আরা নাসরীনকে চ্যানেল আই থেকে যোগাযোগ করে বলা হয়েছিল যে চ্যানেলটি কয়েকজন কীর্তিমান নারীকে সম্মাননা জানাতে চায়। তাকে আহ্বান জানানো হয়েছিল সেই উদ্যোগে সামিল হয়ে কোনো একটা দায়িত্ব পালন (সম্ভবত বিচারকার্য) করতে। একটি মিডিয়া-প্রতিষ্ঠান নারী দিবস উপলক্ষ্যে কয়েকজন নারীর অর্জনকে সম্মান জানাবে, তাতে সানন্দে সামিল হতে রাজি হন তিনি। কিন্তু মূল অনুষ্ঠানে গিয়ে দেখেন, সেটি মূলত ‘রাঁধুনী কীর্তিমতী সম্মাননা’ অনুষ্ঠান। তিনি তৎক্ষণাৎ অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ করেন, এবং জানিয়ে আসেন যে তার নাম যেন এই কর্মসূচির কোথাও ব্যবহার করা না হয়।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/fahmidulhaqblog/29121092 http://www.somewhereinblog.net/blog/fahmidulhaqblog/29121092 2010-03-22 00:22:13
রেপ্রিজেন্টশন, প্যারিস ম্যাচ ও ‘দুনিয়া কাঁপানো ৩০ মিনিট’ এবারের একুশে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষ্যে প্রথম আলো ও গ্রামীণ ফোনের যৌথ কর্মসূচি ছিল ‘দুনিয়া কাঁপানো ৩০ মিনিট’। কর্মসূচির আরও কিছু সহ-আয়োজক ছিল চ্যানেল আই, এটিএন বাংলা, এনটিভি, আরটিভি, দেশ.টিভি, রেডিও টুডে ও এবিসি রেডিও, যারা কর্মসূচিটির মিডিয়া পার্টনার হয়ে লাইভ কাভারেজ দিয়েছে। শহিদ মিনারের অদূরে, ঐতিহাসিক আমতলার সামনে (ঢাকা মেডিকেল কলেজের ইমার্জেন্সি গেটে) আয়োজিত ঐ কর্মসূচিতে এখনও-জীবিত ভাষা-সৈনিকদের উপস্থিতিতে ১৯৫২ সালের ঐদিনে কী কী ঘটেছিল তার একটা ডেমোনেস্ট্রেশন অনুষ্ঠিত হয়। সফল সেই অনুষ্ঠানটি এক র‌্যালির মাধ্যমে সমাপ্ত হয়। তবে র‌্যালির তরুণেরা শহিদ মিনারে এক পর্যায়ে এক উন্মাদনার পরিস্থিতি সৃষ্টি করেন ফুল ছোঁড়াছুঁড়ির মাধ্যমে এমনকি মিনার স্তম্ভে উঠে পড়ার মাধ্যমে, যা পার্টনার মিডিয়ায় প্রচারিত-প্রকাশিত হয়নি। পার্টনার-বঞ্চিত ইটিভির সংবাদেই কেবল তা দেখানো হয়।

যাহোক, এই কর্মসূচির পূর্বে ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১০, প্রথম আলো পত্রিকায় একটি বিজ্ঞাপন ছাপা হয়। আজকের এই রচনার বিষয় হলো সেই বিজ্ঞাপন। সেই বিজ্ঞাপনটির রেপ্রিজেন্টশনকে সেমিওটিক পদ্ধতিতে বিশ্লেষণের মাধ্যমে, বিশেষত রোলাঁ বার্থের (Roland Barthes) সেমিওটিক্সের মাধ্যমে, পুরো কর্মসূচির সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক অভিপ্রায়কে বোঝার চেষ্টা করা হবে। তাই প্রথমে আলোচনা সংক্ষেপে আলোচনা করতে চাইবো রেপ্রিজেন্টশন কী এবং রোলাঁ বার্থের সেমিওটিক্সই বা কী?

রেপ্রিজেন্টেশন হলো ভাষাকে ব্যবহারের মাধ্যমে মানুষের কাছে দুনিয়াকে অর্থপূর্ণভাবে বলা বা উপস্থাপন করা। এই ভাষা হতে পারে আলোকচিত্র, চলচ্চিত্র, সাহিত্য, পেইন্টিং ইত্যাদি। রেপ্রিজেন্টেশনের ধারণা সেই ভাষাকে এবং এর অর্থকে সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত করে। অর্থবহনকারী শব্দ, ধ্বনি ও ইমেজকে আমরা চিহ্ন (সাইন) নামক সাধারণ পরিভাষায় বর্ণনা করে থাকি। আমরা আমাদের মাথায় যেসব-ধারণা ও সেগুলোর মধ্যে বিদ্যমান ধারণাগত সম্পর্ক নিয়ে ঘুরি-ফিরি, চিহ্ন সেগুলোকে রেপ্রিজেন্ট করে অথবা প্রতিনিধিত্ব করে এবং এগুলো একত্রে আমাদের সংস্কৃতির অর্থ-পদ্ধতি তৈরি করে। ট্রাফিক লাইটের যে লাল রঙ কিংবা হলুদ কিংবা সবুজ, সেই লাল-হলুদ-সবুজের নিজস্ব কোনো অর্থ নেই: লাল মানে, যেমন ’থামো’ এবং সবুজ মানে ’যাও’। আমরা আমাদের সংস্কৃতিতে লালের মানে ’থামা’ এবং সবুজের মানে ’যাও’-কে সঙ্কেতাবদ্ধ (এনকোড) করে নিয়েছি। যেকোনো রেপ্রিজেন্টেশন তাই সাংস্কৃতিক। একটি বিজ্ঞাপনের চিত্র বা পোস্টারের তাই ওপরের নির্দেশিত অর্থ (ডিনোটেটিভ মিনিং) থাকে, আমরা যদি তার সঙ্গে লেপ্টে থাকা সাংস্কৃতিক সঙ্কেতলিপি বা কোডগুলোক আলাদা করতে পারি সঙ্কেতোদ্ঘাটনের (ডিকোড) মাধ্যমে, তবে সেই চিত্রের গূঢ়ার্থও (কনোটেটিভ মিনিং) বের করা সম্ভব। ফরাসি তাত্ত্বিক রোলাঁ বার্থ প্রবর্তিত পদ্ধতি সেভাবে কাজ করে।

’প্যারিস ম্যাচ’-এর প্রচ্ছদ
’মিথোলজিস’ গ্রন্থের ‘মিথ টুডে’ প্রবন্ধে রোলাঁ বার্থ একটি উদাহরণ দিয়েছেন, যা সাংস্কৃতিক স্তরে রেপ্রিজেন্টেশন সত্যিকার অর্থে কীভাবে কাজ করে তা বুঝতে আমাদের সহায়ক হয়। একদিন সেলুনে গিয়ে তিনি ফরাসি ম্যাগাজিন ‘প্যারিস ম্যাচ’-এর প্রচ্ছদে দেখতে পান একজন তরুণ নিগ্রো ফরাসি ইউনিফর্ম পরে ওপরের দিকে তাকিয়ে স্যালুট ঠুকছে, সম্ভবত সে তিনরঙা ফরাসি পতাকার দিকে তাকিয়ে ছিল। কোনো অর্থ পেতে চাইলে প্রথম স্তরে আমাদের ইমেজটির প্রতিটি দ্যোতককে (সিগনিফায়ার) যথাযথ ধারণায় সঙ্কেতোদ্ঘাটিত (ডিকোড) করতে হবে। এখানে দ্যোতকগুলো হলো সৈন্য, ইউনিফর্ম, স্যালুট-ঠোকা হাত, ওপরে-তোলা চোখ, ফরাসী পতাকা। এই একপ্রস্থ দ্যোতক এখানে সাধারণ যে-অর্থটি বর্ণনা করছে তা হলো, ‘‘একজন কালো সৈনিক ফরাসি পতাকাকে স্যালুট করছে’’ (নির্দেশিত অর্থ বা ডিনোটেটিভ মিনিং)। কিন্তু বার্থ বলছেন এই ইমেজের একটা বৃহত্তর সাংস্কৃতিক অর্থও রয়েছে। যদি আমরা প্রশ্ন করি, ‘‘কালো সৈন্য ফরাসি পতাকাকে স্যালুট করছে, এই ছবির মাধ্যমে ‘প্যারিস ম্যাচ’ কী বোঝাতে চাচ্ছে?” বার্থ মনে করছেন এর উত্তরে আমরা এই বার্তা পেতে পারি যে: “ফ্রান্স একটা বৃহৎ সাম্রাজ্য, এবং তার প্রতিটি নাগরিক, বর্ণনির্বিশেষে, তার পতাকার নিচে থেকে, বিশ্বস্ততার সঙ্গে তাকে সেবা করে থাকে (নির্দেশিত অর্থ) এবং ফ্রান্সকে উপনিবেশবাদের দায়ে অভিযুক্ত করে থাকে যে-নিন্দুকেরা তাদের জন্য এর চেয়ে ভালো কোনো উত্তর হয় না, যেখানে একজন নিগ্রো তার তথাকথিত নিপীড়কের প্রতি সম্মান দেখাতে কতোখানি উদ্যমী তা দেখা যাচ্ছে (গূঢ়ার্থ বা কনোটেটিভ মিনিং)।”

বার্থের এই প্রকৃত বার্তা খুঁজে পাওয়ার ব্যাপারে আপনি যাই ভাবুন না কেন, যথাযথ সেমিওটিক বিশ্লেষণের জন্য আপনাকে অবশ্যই বিভিন্ন স্তরের সূক্ষ্ম সীমারেখা বের করতে পারতে হবে, যে-পদ্ধতিতে এই বৃহত্তর অর্থ উৎপাদনের বিষয়টি বের হয়ে আসবে। বার্থ বলছেন এখানে রেপ্রিজেন্টেশন ঘটছে দুইটি ভিন্ন কিন্তু পরস্পর সম্পর্কিত প্রক্রিয়ায়। প্রথমত, দ্যোতক (ইমেজের উপাদান) ও দ্যোতিত (ধারণাসমূহ -- যেমন সৈন্য, পতাকা এবং অন্যান্য) মিলে একটা চিহ্ন গঠন করছে যার একটা নির্দেশিত অর্থ রয়েছে: ‘কালো সৈন্য ফরাসী পতাকাকে স্যালুট ঠুকছে’। দ্বিতীয় স্তরে এই সমাপ্ত বার্তা বা চিহ্ন আরেকপ্রস্থ দ্যোতকের সঙ্গে সম্পর্কিত হচ্ছে -- সেটি হলো ফরাসি উপনিবেশবাদ সম্পর্কিত একটা বৃহত্তর, আদর্শগত থিম। প্রথম সমাপ্ত অর্থটি রেপ্রিজেন্টেশন প্রক্রিয়ায় দ্বিতীয় স্তরের দ্যোতক হিসেবে কাজ করছে এবং যখন একজন পাঠক এই দ্যেতককে বৃহত্তর থিমের সঙ্গে মিলিয়ে পড়ছেন তখন মুহূর্তের মধ্যে অধিক বিস্তৃত ও আদর্শগতভাবে কাঠামোবদ্ধ বার্তা বা অর্থ পাচ্ছেন। বার্থ এই দ্বিতীয় ধারণা বা থিমের একটা নাম দিচ্ছেন -- তিনি একে বলছেন “‘ফরাসি উপনিবেশবাদ’ ও ‘সামরিকায়ন’-এর উদ্দেশ্যমূলক মিশ্রণ।” তিনি বলছেন এই মিশ্রণ ফরাসি উপনিবেশ ও তার বিশ্বাসী নিগ্রো সেনা-জোয়ানের জন্য দেয় বার্তার সঙ্গে আরও কিছু যোগ করে। বার্থ এই দ্বিতীয় স্তরের দ্যোতনায়নকে বলছেন মিথ-এর স্তর। এই প্রসঙ্গে তিনি যোগ করছেন, “মিথটির পিছনে ফরাসি উপনিবেশবাদই তাড়না হিসেবে কাজ করছে। ধারণাটি একসারি কার্যকারণ ও ফলাফল, অভিসন্ধি ও ইচ্ছাকে পুননির্মাণ করে ...। এই ধারণার মাধ্যমে ... একটা সম্পূর্ণ নতুন ইতিহাস ... মিথটির মধ্যে রোপিত হয় ... ফরাসি উপনিবেশবাদের ধারণা ... বিশ্বের সমগ্রতার সঙ্গে আবার জুড়ে দেওয়া হচ্ছে; ফ্রান্সের সাধারণ ইতিহাসকে এর ঔপনিবেশিক অভিযানের সঙ্গে, এর বর্তমান সঙ্কটের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হচ্ছে।”

এবং ‘দুনিয়া কাঁপানো ৩০ মিনিট’
এবার আমরা ‘দুনিয়া কাঁপানো ৩০ মিনিট’ কর্মসূচির বিজ্ঞাপনটির দিকে তাকাই। এখানে দ্যোতক হিসেবে পাচ্ছি: আমতলা গেটের ছবি ও তার সামনের রাস্তায় রক্তেভেজা কিছু পদচ্ছাপ, দুনিয়া কাঁপানো কর্মসূচির লোগো ও বায়ান্ন সালের ‘সেই ৩০ মিনিট’-এর কিছু তথ্য এবং ২০১০ সালের ২১ ফেব্র“য়ারির দিনে ঘটনাস্থলে সর্বস্তরের মানুষের মিলিত হবার আহ্বান। একেবারে নিচে আয়োজক প্রথম আলো এবং গ্রামীণ ফোনের লোগো এবং মিডিয়া পার্টনার চ্যানেল আই, এটিএন বাংলা, এনটিভি, আরটিভি, দেশ.টিভি, রেডিও টুডে ও এবিসি রেডিওর লোগো। এই একপ্রস্থ দ্যোতক সাধারণ যে অর্থ বহন করে তা হলো: বায়ান্ন সালের ২১ ফেব্র“য়ারির মূল ঘটনাটি (যা আয়োজকদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী ৩০ মিনিটের একটি ঘটনা ছিল) যেখানে ঘটেছিল, সেই একই স্থলে এবারের ২১ ফ্রেব্র“য়ারিতে দেশবাসী কাছে আসবেন এবং এক হবেন। বলা যায় জীবিত ভাষাসৈনিকদের উপস্থিতিতে পুরো দেশ আবার একুশের চেতনায় কাছে আসবেন এবং উজ্জীবিত হবেন।

এখানে রেপ্রিজেন্টশন ঘটছে ছে দুইটি ভিন্ন কিন্তু পরস্পর সম্পর্কিত প্রক্রিয়ায়। প্রথমত, দ্যোতক (বিজ্ঞাপনের বিভিন্ন উপাদান) ও দ্যোতিত (ধারণাসমূহ, যেমন একুশের ঘটনা, এক হওয়া) মিলে একটা চিহ্ন গঠন করছে যার একটা নির্দেশিত অর্থ রয়েছে -- ‘একুশের চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে এক হতে হবে’। দ্বিতীয় স্তরে এই সমাপ্ত বার্তা বা চিহ্ন আরেকপ্রস্থ দ্যোতকের সঙ্গে সম্পর্কিত হচ্ছে -- গ্রামীণফোন একটি বৃহৎ কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান যার প্রধান লক্ষ্য মুনাফা অর্জন ও প্রথম আলো একটি সংবাদপ্রতিষ্ঠান মুনাফার পাশাপাশি যা দেশের সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক-সামাজিক ক্ষেত্রে প্রভাব রাখতে চায় এবং কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপন্সিবিলিটর আওতায় উভয়ের অন্যান্য নানা যৌথ কর্মসূচি রয়েছে। প্রথম সমাপ্ত অর্থটি রেপ্রিজেন্টেশন প্রক্রিয়ায় দ্বিতীয় স্তরের দ্যোতক হিসেবে কাজ করছে এবং যখন একজন পাঠক এই দ্যোতককে বৃহত্তর থিমের (গ্রামীণ ফোনের ব্যবসায়িক উদ্দেশ্য ও প্রথম আলোর সাংস্কৃতিক প্রভাব) সঙ্গে মিলিয়ে পড়ছেন তখন মুহূর্তের মধ্যে অধিক বিস্তৃত ও আদর্শগতভাবে কাঠামোবদ্ধ বার্তা বা অর্থ পাবেন। দ্যোতনায়নের এই দ্বিতীয় স্তরই মিথের স্তর এক্ষেত্রে, রোলাঁ বার্থের বরাতে যা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। এই স্তরে বলতে চাওয়া হচ্ছে যে ইতিহাস তখনই রচিত হতে পারে যখন মানুষ গ্রামীণ ফোনের মতো করে সবার ‘কাছে আসতে’ পারে। লক্ষ্যণীয় যে গ্রামীণ ফোনের স্লোগান ‘কাছে থাকুন’, যা লোগোর অপরিহার্য অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হয় এবং গ্রামীণজীবনের নানা চিহ্নের রেপ্রিজেন্টেশনের সময় তারা বৃহৎ বিলবোর্ডে লিখে থাকেন যে ‘আপনাকে কাছে রাখতেই আমাদের এতদূর আসা’। লক্ষণীয়, আলোচ্য বিজ্ঞাপনে গ্রামীণ ফোন-এর লোগোতে অপরিহার্য অংশ ‘কাছে থাকুন’ উধাও এবং তাকে মিশিয়ে দেয়া হয়েছে কর্মসূচির স্লোগানে: ‘কাছে আসার শক্তিতে মাত্র ৩০ মিনিটেই তৈরি হতে পারে ইতিহাস’। নিচে বলা হচ্ছে: ‘চলুন আবারো কাছে আসি। এক হই। এই ২১ ফেব্র“য়ারি, ঠিক দুপুর ৩টায়, সেই আমতলার গেটে। চলুন আবারো ৫২’র সেই ইতিহাসের মহান সংগ্রামী আহমদ রফিক, ভাষা মতিন ও রওশন আরা বাচ্চু-সহ অনেকের সাথে এক হয়ে পৃথিবীকে মনে করিয়ে দেই মানুষের কাছে আসার শক্তি।’ আজকের একুশের এই মিথের পুরো ব্যাপারটাই ‘কাছে আসা’ বা ‘কাছে থাকা’র ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। বলাবাহুল্য এর স্বরূপ হবে গ্রামীণফোন-নির্ধারিত। বায়ান্ন সালের ঐ ঘটনাটি হঠাৎ ৩০ মিনিটে ঘটে যায়নি। বরং এর পেছনে আরও অনেক রাজনৈতিক ঘটনাবলী রয়েছে, একটা জাতির আত্মপরিচয় খোঁজার ব্যাকুলতা রয়েছে যা একটি সাংস্কৃতিক অভিপ্রকাশের মাধ্যমে প্রাথমিকভাবে স্পষ্ট হয়ে উঠলেও পরবর্তী সময়ে স্বাধিকার আন্দোলন ও স্বাধীনতা যুদ্ধের মাধ্যমে পূর্ণতা লাভ করেছে। অথচ এই কর্মসূচি ঘটনাটিকে ৩০ মিনিটে সংক্ষেপকরণের প্রয়াস নিয়েছে।

এভাবে আজকের এই মিথ প্রকৃত ভাষা আন্দোলন, প্রকৃত ২১ ফেব্র“য়ারি, প্রকৃত ভাষাপ্রেমীদের আড়ালে ফেলে দেয়। রফিক-মতিন-বাচ্চুকে সামনে রাখলেও, মিথের পর্যায়ে, আজকের ভাষাপ্রেমী/সৈনিক হয়ে উঠছে প্রথম আলো বা গ্রামীণ ফোন। জাতীয় রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক চেতনাটিকে এবং সেই চেতনার জীবন্ত কিংবদন্তীদের এভাবেই বিক্রি করে দেয়া হয়েছে লাখ লাখ গ্রামীণফোন-ভোক্তা এবং প্রথম আলো ও অন্যান্য মিডিয়া পার্টনারের অডিয়েন্সের কাছে। তা কিংবদন্তীরা বুঝতে ব্যর্থ হলেও কেউ কেউ এই রেপ্রিজেন্টেশন ও মিথের গূঢ়ার্থ বুঝতে পেরেছেন। শহিদ মিনার ও ‘দুনিয়া কাঁপানো ৩০ মিনিট’ অনুষ্ঠানের মাঝামাঝি, মেডিকেল কলেজের বহির্বিভাগের উল্টোদিকে, বিশাল বিলবোর্ডে আলোচ্য একই রেপ্রিজেন্টেশন হুবহু লাগানো রয়েছে। ২৩ ফেব্র“য়ারি ২০১০ তারিখে দেখলাম, বিলবোর্ডে ব্যবহৃত চিত্রের নিচ বরাবর ও গ্রামীণ ফোন ও মিডিয়া পার্টনারদের লোগোর ওপর দিয়ে কে যেন বড়ো বড়ো করে লিখে রেখেছে: ‘রক্তে গড়া ইতিহাস জনতার, এদের ধান্দাবাজি আর ব্যবসার জন্য নয়’।

তথ্যসূত্র
স্টুয়ার্ট হলের গ্রন্থ ‘রেপ্রিজেন্টশন: কালচারাল রেপ্রিজেন্টশন এন্ড সিগনিফাইং প্র্যাকটিসেস’ (লন্ডন: দি ওপেন ইউনিভার্সিটি, ১৯৯৭)।

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/fahmidulhaqblog/29112726 http://www.somewhereinblog.net/blog/fahmidulhaqblog/29112726 2010-03-08 23:32:49
আদিবাসী ‌'‘‌‍প্রিয়দর্শিনী' ও সুন্দরী প্রতিযোগিতার রাজনৈতিক অর্থনীতি
তবে সুন্দরী প্রতিযোগিতায় আমার আগ্রহ কম থাকলেও, এর পেছনের রাজনীতিকে বুঝতে অনাগ্রহ নেই আমার। তাই টেলিভিশন বন্ধ করার পরও সেদিন রাতে ঘুমাবার এবং পরদিন মাঝে মাঝেই মনে এই প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছিল যে, আদিবাসীদের মধ্য থেকেও সেরা সুন্দরী নির্বাচনের প্রয়োজন কেন পড়ে? পরদিন সকালে প্রথম আলোর প্রতিবেদনের শিরোনাম দেখলাম: 'আদিবাসী তরুণ-তরুণীদের নাচে-গানে মুখরিত সৈকত'’। সেই প্রতিবেদনে অবশ্য আদিবাসী 'প্রিয়দর্শিনী' সম্পর্কিত কোনো তথ্য পাওয়া গেলনা। জানা গেল, সেটা ছিল মূলত আদিবাসী মেলা। বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশন ও চ্যানেল আইয়ের যৌথ উদ্যোগে এই আয়োজন ছিল দ্বিতীবারের মতো। ২০০৯ সালে প্রথম আদিবাসী মেলা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। প্রতিবেদন থেকে জানা যায় বিভিন্ন ক্ষুদ্র জাতিসত্তার প্রতিনিধিরা ঐ মেলায় অংশ নেয় এবং ‘নাচে-গানে' সৈকত 'মুখরিত’ হয়ে ওঠে। অনুষ্ঠানটি উদ্বোধন করেছিলেন শিল্পমন্ত্রী দিলীপ বড়ুয়া। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন পর্যটন করপোরেশনের চেয়ারম্যান, চ্যানেল আইয়ের শীর্ষ দুই কর্তা ব্যক্তি, স্থানীয় প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা।

বাংলাদেশের সবচেয়ে ‘এক্সোটিক ডেস্টিনেশন’ কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে আদিবাসীদের এই সাংস্কৃতিক অভিপ্রকাশকে সাদা চোখে সদর্থক দৃষ্টিতে দেখার বিস্তর সুযোগ রয়েছে। কিন্তু দু’টি বিষয় আমাকে আরও ভাবিয়ে তোলে, ইস্যুর গভীরে নামতে উস্কে দেয় -- প্রথমত, ঐ প্রশ্নটি মনে ঘুরপাক খায় যে কেন আদিবাসীদের মধ্য থেকেও সুন্দরী বাছতে হয় এবং দ্বিতীয়ত, দুই কলামের আদিবাসী মেলার সংবাদের পাশেই প্রথম আলোতে প্রকাশিত আরেকটি এক-কলাম সংবাদ: ‘মন্ত্রণালয়ের গোপন চিঠি: উপজাতিদের আদিবাসী হিসেবে অভিহিত করার অপতৎপরতা চলছে’। কী আছে ঐ এক-কলামের সংবাদে? সেখানে বলা হচ্ছে, পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে স্বরাষ্ট্রসচিব ও তিন পার্বত্য জেলা প্রশাসককে দেওয়া গোপন চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘উপজাতীয় কতিপয় নেতৃবৃন্দ, বুদ্ধিজীবী, পাহাড়ে বসবাসরত শিক্ষিত ব্যক্তিবর্গ এমনকি সাংবাদিকেরাও ইদানীং উপজাতীয় স¤প্রদায়গুলোকে উপজাতি না বলে আদিবাসী হিসেবে অভিহিত করছেন। বিভিন্ন এনজিও, বিদেশি সংবাদমাধ্যম, জাতিসংঘের আড়ালে থাকা খ্রিস্টান রাষ্ট্রসমূহ ঐ ব্যক্তিবর্গের সহাযোগিতায় পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় পৃথক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় সহায়তার অপতৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে’ (প্রথম আলো, ১৩ ফেব্র“য়ারি, ২০১০, পৃ ২১)।

আদিবাসী মেলার সংবাদের একেবারে পাশ ঘেঁষে প্রকাশিত এই সংবাদ দগদগে বৈপরীত্য নিয়ে আমাদের চোখে ধরা দেয়। এই ‘গোপন সংবাদ’ আমাদের অবহিত করছে সরকার ও আমলাতন্ত্র আদিবাসীদের কী দৃষ্টিতে দেখে। সংখ্যাগরিষ্ঠের সরকার ও তার আমলাতন্ত্র সংখ্যালঘুদের সাধারণ নাগরিকের স্বীকৃতি দিতে কীরকম সংরক্ষণবাদী তা স্পষ্ট হয় এই সংবাদে। ১৯৯৭ সালের চুক্তির ন্যূনতম বাস্তবায়ন এত বছরেও কেন হচ্ছে না, তারও একটা ব্যাখ্যা এই মানসিকতার প্রকাশের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়। সরকার পরিবর্তন হয়, কিন্তু সংখ্যালঘুদের অধিকারের ব্যাপারে সংখ্যাগরিষ্ঠের সরকারের অবস্থান তেমন হেরফের হয়না। কিন্তু সেই সরকারেরই একটি প্রতিষ্ঠান পর্যটন করপোরেশন যখন আদিবাসী মেলায় যুক্ত হয়, তখন এটাও স্পষ্ট হয় যে এটা কোনো আদিবাসী-দরদী অনুষ্ঠান নয়, বরং আদিবাসীদের জাতিবৈচিত্র্য, তাদের নৃত্য-গীত, তাদের জীবন-যাপন-সংস্কৃতি এখানে ‘এক্সোটিক কমোডিটি’ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে দেশি-বিদেশি সম্ভাব্য-পর্যটকদের কাছে। চ্যানেল আইয়ের পৌরহিত্যে আদিবাসী 'প্রিয়দর্শিনী’ বাছাবাছিও, সুন্দরী প্রতিযোগিতার বিরুদ্ধে প্রাথমিক যে অভিযোগ -- নারীকে পণ্যকরণ -- তার সঙ্গে বাড়তি মাত্রা নিয়ে হাজির হচ্ছে। একে বলা যায় আদিবাসী নারীর পণ্যকরণ হিসেবে। দ্বিস্তরের এই পণ্যকরণ প্রক্রিয়ায় চ্যানেল আই ও পর্যটন কর্পোরেশন উভয়কেই দায়ী করতে হয়। তবে প্রথম স্তরের পণ্যকরণ প্রক্রিয়া, সুন্দরী-প্রতিযোগিতা নিয়ে আরেকটু বিশদ বাগবিস্তার ঘটাতে চাই।

১৯২১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টিক সিটির হোটেলসমূহের কর্তৃপক্ষরা হোটেলগুলোতে ভ্রমণকারীদের আরও অধিক সময় আটকে রাখার মার্কেটিং উপায় হিসেবে মেয়েদের সুইমস্যুটনির্ভর একটি প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। এটাই সুন্দরী প্রতিযোগিতার আদি নিদর্শন। এরপরে নারীর সৌন্দর্য ও শরীরনির্ভর প্রতিযোগিতার বুম হয়। স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে নানা ধরনের প্রতিযোগিতা হতে থাকে। এরপর একে একে বৈশ্বিক পর্যায়ে প্রথম সুন্দরী প্রতিযোগিতা শুরু হয় মিস ওয়ার্ল্ড (১৯৫১ সালে), মিস ইউনিভার্স (১৯৫২ সালে), মিস ইন্টারন্যাশনাল (১৯৬০ সালে) নামে। এইসব বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার জন্য জাতীয় প্রতিযোগী নির্বাচনের জন্য আবার জাতীয় পর্যায়ে নানা ধরনের প্রতিযোগিতা হয়, ভারতে যেমন আছে ‘ফেমিনা মিস ইন্ডিয়া’। তবে মিস ওয়ার্ল্ড বা মিস ইউনিভার্সের জাতীয় প্রতিনিধি নির্বাচনই তো মূল কথা নয়, পণ্যের প্রসার-প্রচারের জন্য কর্পোরেশনগুলোর প্রতিনিয়ত দরকার হয় সুন্দর দেহের নতুন নতুন নারীমুখ, এজন্য নিয়মিতভাবে এইসব প্রতিযোগিতার আয়োজন চলে। একই নারী(দেহ) র‌্যাম্প, সিনেমা, সিরিয়ালে যুক্ত হয়ে তারকা-ইমেজ বলবৎ রাখে এবং পণ্যের মডেলিং-এ নারীর বিক্রিমূল্য অটুট রাখে। তাই ‘ফেমিনা মিস ইন্ডিয়া’ ছাড়াও আমরা দেখি ‘সানন্দা তিলোত্তমা’ প্রতিযোগিতা। বাংলাদেশে যেমন রয়েছে ‘লাক্স-চ্যানেল আই সুপারস্টার’ প্রতিযোগিতা। আগেই বলেছি যে এইসব প্রতিযোগিতায় প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত থাকে একটি মিডিয়া হাউস। ফেমিনা হলো ভারতের অন্যতম বৃহৎ টাইমস অব ইন্ডিয়ার অঙ্গ-প্রতিষ্ঠান।

এইসব সুন্দরী প্রতিযোগিতার আয়োজকরা ‘নারীকে বস্তুকরণ’-এর অভিযোগ এড়াতে অন্তঃত দু’টি বিষয় সামনে এনে অভিযোগের ঘায়ে মলম দিতে চায় -- প্রথমত, এটি নারীর ক্ষমতায়ন ঘটায়; দ্বিতীয়ত, এখানে দৈহিক সৌন্দর্যই মূলকথা নয়, তার বুদ্ধিমত্তা বা ট্যালেন্টই তাকে জিতিয়ে দেয়। এই আলোচনায় ফিরে আসা যাবে, তার আগে আমি সুন্দরী প্রতিযোগিতার পেছনের যে রাজনৈতিক-অর্থনীতি, সেদিকে আলোকপাত করতে চাই।

ভারতীয় নারীরা একসময় বিশ্বসুন্দরীর খেতাব পাওয়া শুরু করেন এবং পেতেই থাকেন। এযেন সুন্দরী হবার জোয়ার, ভারতীয় নারীরা হঠাৎ করে যেন সুন্দরী হয়ে গেছেন। ১৯৯৪ সালে সুস্মিতা সেন মিস ইউনিভার্স হন এবং ঐশ্বরিয়া রাই মিস ওয়ার্ল্ড হন। এরপর ডায়ানা হেইডেন মিস ওয়ার্ল্ড হন ১৯৯৭ সালে। যুক্তা মুখী মিস ওয়ার্ল্ড হন ১৯৯৯ সালে। ২০০০ সালে মিস ইউনিভার্স হন লারা দত্ত এবং মিস ওয়ার্ল্ড হন প্রিয়াঙ্কা চোপড়া। ১৯৯৪ সালের আগে একমাত্র ভারতীয় বিশ্বসুন্দরীকে (রিটা ফারিয়া) দেখা যায় বহু পূর্বে ১৯৬৬ সালে। ১৯৬৬-১৯৯৪ সময়কালে, ২৮ বছরে কোনো ভারতীয় বিশ্বসুন্দরী পয়দা হননি, কিন্তু ১৯৯৪-২০০০ সময়কালে, ৬ বছরে আমরা পাচ্ছি ৬ জন বিশ্বসুন্দরীকে। আবার ২০০০ সালের পর থেকে ৯ বছরে আর একজনও বিশ্বসুন্দরীর খেতাব পেলনা ভারত থেকে।

নব্বই দশকে ভারতে বিশ্বসুন্দরীদের এই সমাগমের পেছনের রাজনৈতিক-অর্থনীতি হলো, নরসীমা রাওয়ের সরকার থেকেই একসময়ের-সোভিয়েত-ঘেঁষা ভারত অর্থনৈতিক উদারীকরণের সিদ্ধান্ত নেয়। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পরে যে বিশ্বায়ন প্রক্রিয়া তাতে বহু-ভোক্তার দেশ ভারত একটা বিরাট বাজার হিসেবে বিবেচিত হয়। সেই বাজারে মাল বেচতে প্রয়োজন একগুচ্ছ সুন্দরী, যারা পণ্যের বহিরঙ্গের পণ্য হিসেবে বিকোবেন। সেই সুন্দরীকে হতে হবে অবশ্যই স্থানীয় -- থিঙ্ক গ্লোবালি, এ্যাক্ট লোকালি -- এই সমীকরণে। আর এক ভারতীয় বিশ্বসুন্দরী দিয়ে পুরো দক্ষিণ এশিয়ার বিশাল বাজারে প্রবেশ সম্ভব। সুস্মিতা-ঐশ্বরিয়া-প্রিয়াঙ্কা তো কেবল ভারতীয় আইকন নন, তারা দক্ষিণ এশীয় আইকন হয়ে ওঠেন বিশ্বসুন্দরী খেতাব পাবার সঙ্গে সঙ্গে।

আরেকটি মজার রাজনীতি হয়েছে মুসলিম দুনিয়া নিয়ে। অপেক্ষাকৃত রক্ষণশীল হিসেবে পরিচিত মুসলিম দেশগুলো থেকে বিশ্বসুন্দরী দেখা যায়না। তবে ২০০১ সালে টুইন-টাওয়ারে হামলার পরে যখন পশ্চিমা বিশ্বের কাছে মুসলিম-আইডেন্টি একটা রেসিস্ট্যান্স বা বিরোধী-পক্ষ হিসেবে হাজির হয়, তার ঠিক পরের বছরেই আমরা দেখতে পাচ্ছি মুসলিম দেশগুলো থেকে বিশ্বসুন্দরী খেতাব দেয়া হয়েছে। ২০০২ সালে মিস ওয়ার্ল্ড হন তুরস্ক থেকে এবং মিস ইন্টান্যাশনাল হন লেবানন থেকে। ব্যাপারটা কাকতালীয় ভাবলে ভুল হবে। বরং শত্রুপক্ষীয় রক্ষণশীল মুসলিম দেশগুলোর সংস্কারে আঘাত হানার জন্য যথেষ্ট খোলাপোশাকের একজন স্বদেশী বিশ্বসুন্দরী। আবার সেই সুন্দরীর মাধ্যমেই পণ্য ও ভোক্তাসংস্কৃতির অনুপ্রবেশ নিরবে মুসলমানদের 'রক্ষণশীলতা' নষ্ট করা সম্ভব হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির কড়া সমালোচক, লাতিন আমেরিকার নেতা, সমাজতন্ত্রী হুগো শভেজের দেশ ভেনেজুয়েলা থেকে বেশ কিছু বিশ্বসুন্দরী নির্বাচনের পেছনেও রয়েছে প্রায় একই রকম রাজনীতি। ২০০৮ ও ২০০৯ সালের মিস ইউনিভার্স, ২০০৩ ও ২০০৬-এর মিস ইন্টারন্যাশনাল নির্বাচিত হয়েছেন ভেনেজুয়েলার প্রতিনিধি। ২০০৩ সালে চীন থেকে মিস ওয়ার্ল্ড একই রাজনীতির আওতায় নির্বাচিত হয়েছেন। তাই বলা যায় ‘সৌন্দর্য ও ট্যালেণ্টের সমন্বয়’-এর আপ্তবাক্য বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কার্যকর নয়। বরং বিশ্বায়নকালে মুক্তবাজার অর্থনীতির দূত হিসেবে এইসব সুন্দরীদের নির্বাচন করা হয়, এবং মোটামুটি হিসেব কষে সুন্দরীদের মুকুট ভৌগোলিকভাবে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দেয়া হয়। এমনকি বর্ণবাদী এই প্রতিযোগিতা শ্বেতাঙ্গ বা বাদামি-ফর্সা সুন্দরীদের অবশ্যম্ভাবী বর্ণ হিসেবে একটা মানদণ্ড ঠিক করে দেবার পরও মাঝে মাঝে এর ব্যতিক্রম ঘটানো হয়, ‘কালোদের-জন্য-একজন-এ্যাম্বাসেডর’ খোঁজার স্বার্থে। এই বিবেচনাতেই ২০০১ সালে নাইজেরিয়া থেকে একজন কৃষ্ণাঙ্গ নারীকে দেয়া হয় মিস ওয়ার্ল্ড-এর খেতাব। একই বিবেচনায় আমাদের দেশে আয়োজন করা হয়েছে আদিবাসী 'প্রিয়দর্শিনী’ প্রতিযোগিতা, যে-প্রশ্নের উত্তর খোঁজার কথা আমি এই রচনার শুরুতেই বলেছি। অর্থাৎ আদিবাসীদের মধ্য থেকেও একজন সুন্দরী বেছে নেয়া, যাকে দিয়ে পণ্যের প্রমোশন করা যাবে এবং আদিবাসীদের কাছে পণ্যের বার্তা নিয়ে সহজে পৌঁছা যাবে। কেবল বর্ণ নয়, সব বয়সের প্রতিনিধিও খোঁজার দৃষ্টান্ত রয়েছে। একবার আমাদের দেশেই অনুষ্ঠিত হয়েছিল চল্লিশোর্ধ নারীদের প্রতিযোগিতা। স্মৃতি প্রতারক না হলে, সেই প্রতিযোগিতার নাম ছিল ‘প্যান্টিন ইউ গট দ্যা লুক’। এই হলো ভোক্তা-সংস্কৃতির নমুনা। তুমি মুসলিম হলেও মডেলিং করো, না হয় পোশাকটা একটু লম্বাই রাখো। তুমি একটু বয়েসী হলেও সেজেগুজে প্রতিযোগিতায় নামো। তুমি আদিবাসী হলেও র‌্যাম্পে আসো।

এবার আসা যাক নারীর ক্ষমতায়ন ও সুন্দরী একইসঙ্গে ট্যালেন্টও -- এই ধারণার আলোচনায়। নৃবিজ্ঞানী সুসান রাঙ্কল (রাঙ্কল, ২০০৪) গবেষণা করেছেন মিস ইন্ডিয়া প্রতিযোগিতার পূর্বে নির্বাচিত ২৬ জন প্রতিযোগীর জন্য আয়োজিত প্রশিক্ষণ-প্রক্রিয়া নিয়ে। তিনি লক্ষ করেছেন নির্বাচিত ২৬ জনকে যেভাবে ঘষেমেজে সম্ভাব্য মিস ইন্ডিয়া বা মিস ওয়ার্ল্ড-ইউনিভার্স হিসেবে তৈরি করা হয়, তাতে প্রতিযোগীর অবদান সামান্যই। তার ভাষায়, ‘‘মিস ওয়ার্ল্ড হয়ে-ওঠার প্রক্রিয়াটাতে তিনি নিজে অবদান রাখেন সামান্যই। বরং, ‘এক্সপার্ট’রাই হচ্ছেন আসল লোক যারা মোট কাজের বেশিরভাগটা সম্পাদন করেন। খোদাই করে করে তারা তাকে একজন মিস ওয়ার্ল্ড যেমন হওয়া উচিত সেরকম আদর্শ-বস্তুতে রূপান্তর করে ফেলেন’’ (রাঙ্কল, ২০০৪: ১৪২)। এই পুরো ‘গ্রুমিং’-প্রক্রিয়া দেখে সুসান রাঙ্কলের ধারণা হয়েছে, ‘শরীর এমন একটা যন্ত্র যার বিভিন্ন পার্টস মেরামত করা যায়’ (রাঙ্কল, ২০০৪: ১৩৯)। এই মেরামতিতে ডায়েট, ভাষাভঙ্গী, ত্বক, ফ্যাশন ইত্যাদি নানা বিষয়ের এক্সপার্ট যুক্ত হন। দেখা যাচ্ছে প্রতিযোগীর সৌন্দর্য ও ট্যালেন্ট উভয়ই নির্মিত হচ্ছে অন্যের দ্বারা। আর তার ট্যালেন্টের বহর উদাহরণ দিয়ে দেখিয়েছেন রাঙ্কল। একজন প্রতিযোগী সবচেয়ে পছন্দের নারী হিসেবে হিলারি ক্লিনটনের নাম বলেছিলেন -- ‘কারণ তিনি হচ্ছেন প্রেম, ক্ষমতা আর দৃঢ়তার আদর্শ, যদিও তাঁর ছিল একটা দুর্যোগপূর্ণ ব্যক্তিগত জীবন’ (দেখুন রাঙ্কল, ২০০৪: ১৫০)। স্বামীর প্রকাশিত বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের পরও যিনি তার প্রেম ও দৃঢ়তা দিয়ে বিয়ে-রাজনৈতিক ক্যারিয়ার টিকিয়ে রাখেন তিনিই সুন্দরীর আদর্শ হবেন, এতে অবশ্য আশ্চর্য হবার কিছু নেই।

তথ্যসূত্র
http://en.wikipedia.org/wiki/Beauty_contest
সুসান রাঙ্কল (২০০৪), ‘সৌন্দর্য উৎপাদন’, সেলিম রেজা নিউটন অনূদিত, চন্দ্রাবতী, সুস্মিতা চক্রবর্তী সম্পা., রাজশাহী, ২০০৬।
প্রথম আলো, ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১০।

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/fahmidulhaqblog/29104053 http://www.somewhereinblog.net/blog/fahmidulhaqblog/29104053 2010-02-23 18:53:30
উঠে-দাঁড়াতে-প্রত্যয়ী সাইফুল সামিনের জন্য চলচ্চিত্র-উৎসব (আপডেট) প্রথম আলোতে প্রদায়ক হিসেবে কাজ করতো। অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনকভাবে ২০০৮ সালে রিপোর্ট কাভার করতে গিয়ে তেজগাঁওয়ে ট্রেন দুর্ঘটনার শিকার হয়। তার দুটি পা-ই কাটা পড়ে। হুইল চেয়ারে আসীন সাইফুল আবার দুই পায়ে উঠে দাঁড়াক, আমরা আন্তরিকভাবে তাই চাই। তার কৃত্রিম পা সংযোজনের চিকিৎসার ব্যয়ভারে অবদান রাখতে বিভাগের শিক্ষার্থীরা ১৫ ফেব্রুয়ারি, সোমবার থেকে টিএসসি অডিটোরিয়ামে এক চলচ্চিত্র-উৎসবের আয়োজন করেছে। উৎসব অর্জিত অর্থ সাইফুলের চিকিৎসায় ব্যয় হবে। তাই দর্শনীর বিনিময়ে দারুণ সব ছবি দেখতে চলে আসুন টিএসসিতে, শিডিউল দেখে, সুবিধেমতো। টিকেটের মূল্য ৫০ টাকা। উৎসবটির আয়োজক গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থীদের সংগঠন সিপিএমএস।

সাইফুল সত্যিকারের মেধাবি একজন ছাত্র, অনার্সে অল্পের জন্য প্রথম শ্রেণী মিস করেছে। সাইফুল সামিনের উঠে দাঁড়ানোর প্রত্যয়ে আপনি সহযোগী হোন।

উৎসব শিডিউল

১৫ ফেব্রুয়ারি, সোমবার

সকাল ১০টা: উদ্বেধন+কুংফু পান্ডা
দুপুর ১টা: থ্রি ইডিয়টস
বিকেল ৪টা: প্রিয়তমেষু
সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা: স্লামডগ মিলিয়নার

১৬ ফেব্রুয়ারি, মঙ্গলবার

সকাল ১০টা: ব্ল্যাকআউট
দুপুর ১২টা: অ্যাভাটার
বিকেল ৩টা: থ্রি ইডিয়টস
সন্ধ্যা ৬টা: মনপুরা

১৭ ফেব্রুয়ারি, বুধবার

সকাল ১০টা: অন্তরমহল
দুপুর ১২টা: পা
বিকেল ৩টা: অ্যাভাটার
সন্ধ্যা ৬টা: থ্রি ইডিয়টস

আপডেট: আজ সকাল ১০টা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রে-ভিসি উৎসবটি উদ্বোধন করেছেন। থ্রি ইডিয়টসের প্রদর্শনীতে ব্যাপক জনসমাগম ছিল।

উৎসব নিয়ে প্রথম আলোর রিপোর্ট দেখুন: Click This Link]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/fahmidulhaqblog/29098168 http://www.somewhereinblog.net/blog/fahmidulhaqblog/29098168 2010-02-15 11:13:57
উঠে-দাঁড়াতে-প্রত্যয়ী সাইফুল সামিনের জন্য চলচ্চিত্র-উৎসব প্রথম আলোতে প্রদায়ক হিসেবে কাজ করতো। অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনকভাবে ২০০৮ সালে রিপোর্ট কাভার করতে গিয়ে তেজগাঁওয়ে ট্রেন দুর্ঘটনার শিকার হয়। তার দুটি পা-ই কাটা পড়ে। হুইল চেয়ারে আসীন সাইফুল আবার দুই পায়ে উঠে দাঁড়াক, আমরা আন্তরিকভাবে তাই চাই। তার কৃত্রিম পা সংযোজনের চিকিৎসার ব্যয়ভারে অবদান রাখতে বিভাগের শিক্ষার্থীরা ১৫ ফেব্রুয়ারি, সোমবার থেকে টিএসসি অডিটোরিয়ামে এক চলচ্চিত্র-উৎসবের আয়োজন করেছে। উৎসব অর্জিত অর্থ সাইফুলের চিকিৎসায় ব্যয় হবে। তাই দর্শনীর বিনিময়ে দারুণ সব ছবি দেখতে চলে আসুন টিএসসিতে, শিডিউল দেখে, সুবিধেমতো। টিকেটের মূল্য ৫০ টাকা। সাইফুল সত্যিকারের মেধাবি একজন ছাত্র, অনার্সে সে প্রথম শ্রেণী পেয়েছে।

সাইফুল সামিনের উঠে দাঁড়ানোর প্রত্যয়ে আপনি সহযোগী হোন।

উৎসব শিডিউল

১৫ ফেব্রুয়ারি, সোমবার

সকাল ১০টা: উদ্বেধন+কুংফু পান্ডা
দুপুর ১টা: থ্রি ইডিয়টস
বিকেল ৪টা: প্রিয়তমেষু
সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা: স্লামডগ মিলিয়নার

১৬ ফেব্রুয়ারি, মঙ্গলবার

সকাল ১০টা: ব্ল্যাকআউট
দুপুর ১২টা: অ্যাভাটার
বিকেল ৩টা: থ্রি ইডিয়টস
সন্ধ্যা ৬টা: মনপুরা

১৭ ফেব্রুয়ারি, বুধবার

সকাল ১০টা: অন্তরমহল
দুপুর ১২টা: পা
বিকেল ৩টা: অ্যাভাটার
সন্ধ্যা ৬টা: থ্রি ইডিয়টস
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/fahmidulhaqblog/29097943 http://www.somewhereinblog.net/blog/fahmidulhaqblog/29097943 2010-02-15 00:18:19
চলচ্চিত্র, শিশু ও সৃজনশীলতা: রাষ্ট্র ও সমাজের ভূমিকা সামাজিক সৃজনশীলতার স্বরূপ ও শিশুতোষ চলচ্চিত্র
আমাদের শিশুরা টেলিভিশনে প্রচারিত শিশুবিষয়ক অনুষ্ঠান দেখলে উঠে যান, কিন্তু বিজ্ঞাপন শুরু হলে ফিরে আসেন। এমনকি মায়েরাও শিখে গেছেন খাদ্যের প্রতি নিদারুণ অরুচিপ্রবণ শিশুদের খাবার গেলাতে হয় বিজ্ঞাপন গেলানো সহযোগে। এর অর্থ এই যে আমরা শিশুদের জন্য যে-অনুষ্ঠান বানাই তা শিশুদের আকৃষ্ট করতে ব্যর্থ। অথচ ছোট ছোট শটে বিভক্ত বিজ্ঞাপনের আধা মিনিটের কাহিনীচিত্র তাদের আটকে রাখে। কার্টুনছবিও শিশুদের কাছে আকর্ষণীয় হয় কারণ এর সম্পাদনার গতি তড়িৎ, শটসমূহ হ্রস্বতম, ক্ষণে ক্ষণে এর দৃশ্যপট পাল্টে যায়। উভয় মাধ্যমের আরেকটি মিলের জায়গা হলো ফ্যান্টাসি, মিথ্যামিথ্যি গল্প, লাগামহীন কল্পনার বিস্তার। আমরা জানি যে পণ্যের প্রতি আকর্ষণ তৈরি করতে বিজ্ঞাপন পণ্যটিকে ঘিরে অনেক ভ্রান্তি-মিথ্যার মিশেলে একটা ফ্যান্টাসি তৈরি করে। বিজ্ঞাপন ও কার্টুনের এই সাধারণ বৈশিষ্ট্যের বরাতে বলা যায়, শিশুরা গতিশীল-বর্ণিল ভিস্যুয়াল, ফ্যান্টাসি-রূপকথা, হতচ্ছাড়া কল্পলোককে আপন মনে করে। নিরেট বাস্তবতা, বা বাস্তবতার অবিকল উপস্থাপন তাদের কাছে পানসে, অনাকর্ষণীয় ঠেকে। ওয়াল্ট ডিজনি এটা জানতেন, তাই বিশ্বব্যাপী শিশুমানসে এখন ডিজনির উপনিবেশ।
বলা যায় বিটিভি ও কিছু বেসরকারী চ্যানেলে প্রচারিত শিশুদের জন্য নির্মিত অনুষ্ঠান শিশুদের আকর্ষণ করতে ব্যর্থ। টেলিভিশন-দেখতে-বাধ্য শহুরে শিশুরা বরং কার্টুন বাদে বড়োদের অনুষ্ঠান দেখতেই বেশি পছন্দ করে Ñ বিশেষত বিজ্ঞাপন এবং এমনকি বলিউডের নাচ-গান। বলিউডের গানেও রয়েছে গতিশীল-বর্ণির ভিস্যুয়াল, ফ্যান্টাসি।
তুলনাটা টেলিভিশনের অনুষ্ঠানের সঙ্গেই করছি, কারণ বাংলাদেশে শিশুতোষ চলচ্চিত্রের সংখ্যা এতই নগণ্য যে তা নিয়মিত কোনো ভিস্যুয়াল উপাদান হিসেবে আমাদের সামনে হাজির নেই।
কিন্তু আমাদের শিশুরা কীরকম সৃজনশীল ভিস্যুয়াল উপাদান আস্বাদন করছে? আমরা কী সামাজিক সৃজনশীলতার জগত তাদের উপহার দিচ্ছি? সেখানে শিশুতোষ চলচ্চিত্রের অবস্থান কোথায়? সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব কী সেক্ষত্রে? এই উত্তরগুলো অনুসন্ধান-বিশ্লেষণের পূর্বে বাংলাদেশের শিশুতোষ চলচ্চিত্র নির্মাণের একটি প্রেক্ষাপট হাজির করা দরকার।

শিশুতোষ চলচ্চিত্র নির্মাণ: ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
শিশুতোষ চলচ্চিত্র, চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অন্যতম জঁরা হিসেবেই বিবেচিত। চার্লি চ্যাপলিনের দি কিড (১৯২০), ডি-সিকার বাইসাইকেল থিফ (১৯৪৮), ফ্রাঁসোয়া ত্র“ফোর ফোর হান্ড্রেড ব্লোজ (১৯৫৯), সত্যজিৎ রায়ের পথের পাঁচালী (১৯৫৫) কিংবা সোনার কেল্লা (১৯৭৪), আব্বাস কিয়োরোস্তামির হোয়ার ইজ মাই ফ্রেন্ডস হোম (১৯৮৭), মজিদ মজিদির চিল্ড্রেন অব হ্যাভেন (১৯৯৭) -- এরকম অনেক মাস্টারপিস ছবির প্রধান কিংবা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র শিশু-কিশোররা।
কিন্তু বাংলাদেশে নির্মিত শিশুতোষ চলচ্চিত্রের সংখ্যা একেবারে নগণ্য, সংখ্যাটা হাতে গোনা যায়। বাংলাদেশে প্রথম শিশুতোষ চলচ্চিত্র নির্মিত হয় ১৯৬৬ সালে, ছবিটির নাম ছিল দি সান অব পাকিস্তান, পরিচালক ছিলেন ফজলুল হক। পাকিস্তান আমলে আর কোনো শিশুতোষ চলচ্চিত্রের নাম শোনা যায়না। মুক্তিযুদ্ধকালে মুজিবনগর সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় নির্মিত বাবুল চৌধুরীর প্রামাণ্যচিত্র ইনোসেন্ট মিলিয়নস-এ (১৯৭১) যুদ্ধের শিকার নারী ও শিশুদের ওপরে আলোকপাত করা হয়েছিল। এরপরে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম সর্বাঙ্গীন শিশুতোষ চলচ্চিত্র হিসেবে পাওয়া যায় এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী (১৯৮০)। বাদল রহমান পরিচালিত এই চলচ্চিত্রটি সরকারী অনুদানে নির্মিত হয়েছিল। অনুদানপ্রাপ্ত আরেকটি শিশুতোষ চলচ্চিত্র হলো দীপু নাম্বার টু (১৯৯৬)। মোরশেদুল ইসলামের দূরত্ব (২০০৪) ছবিটি নির্মিত হয়েছে বেসরকারী পর্যায়ে, ইমপ্রেস টেলিফিল্মের প্রযোজনায়। বেসরকারী পর্যায়ে বা এফডিসি থেকে আর কোনো সর্বাঙ্গীন শিশুতোষ ছবি নির্মাণের খবর পাওয়া যায়না।
তবে পূর্ণাঙ্গ শিশুতোষ না হলেও একসময় বাংলাদেশের মূলধারার চলচ্চিত্রে শিশুচরিত্রের বেশ প্রাধান্য ছিলো। এরকম কিছু চলচ্চিত্র নির্মিত হতো যেখানে শিশুচরিত্রই ছবিত্রে প্রধান চরিত্র থাকতো এবং তাকে ঘিরেই ছবির কাহিনী আবর্তিত হতো। সুভাষ দত্তের ডুমুরের ফুল (১৯৭৮), আজিজুর রহমানের অশিক্ষিত (১৯৭৮) কিংবা ছুটির ঘণ্টা (১৯৮০), শেখ নজরুল ইসলামের এতিম (১৯৮০) কিংবা মাসুম (১৯৮১), শহীদুল আমিনের রামের সুমতি (১৯৮৫) ইত্যাদি ছবির প্রধান চরিত্র বা অন্যতম প্রধান চরিত্র ছিল শিশু-কিশোর। আশির দশকে মাস্টার সুমন কিংবা মাস্টার শাকিল তারকাখ্যাতি পেয়েছিলেন, কারণ তারকা হয়ে ওঠার মতো যথেষ্ট পরিসরজুড়ে শিশু-কিশোর চরিত্রের উপস্থিতি থাকতো। সেসময়ের অনেক ছবিতেই ‘মাস্টার’ উপাধির কোনো না কোনো শিশু-অভিনেতার উপস্থিতি থাকতো। নব্বই দশক থেকে পারাবারিক-সামাজিক জঁরার ছবি কমে যাওয়ায়, এবং সহিংস-অপরিশীলিত রুচির ছবির সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায়, সা¤প্রতিক ছবিগুলোতে শিশুচরিত্র থাকে না বললেই চলে, থাকলেও তার উপস্থিতি স্বল্প সময়ের জন্য এবং সেও সহিংসতার কারণ বা অনুষঙ্গ হিসেবেই ছবিতে হাজির হয়। স্বাধীনধারার চলচ্চিত্র মাটির ময়নায় (২০০২) অবশ্য মূল চরিত্রসহ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি চরিত্রে শিশুদের উপস্থিতি রয়েছে।
তবে মূল সিনে-সংস্কৃতির বাইরে, অনেকটা অগোচরে, বাংলাদেশ শিশু একাডেমী ১৯৮০ সাল থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত ৫০টি ছবি প্রযোজনা করেছে। এরমধ্যে ২০০৮ সালে ৪টি ও ২০০৯ সালে ৪টি করে মোট ৮টি ছবি নির্মাণ করেছে শিশু-কিশোররাই। শিশু একাডেমী আয়োজিত ওয়ার্কশপের প্রডাকশন হিসেবে শিশু-কিশোররা এই ছবিগুলো নির্মাণ করেছে। কিছু ব্যতিক্রম বাদে শিশু একাডেমীর প্রাথমিকভাবে পছন্দের ফরম্যাট ছিল ১৬ মিমি এবং স¤প্রতি বেটাক্যাম ভিডিও এবং ডিজিটাল ভিডিওকে অনুমোদন দেয়া হচ্ছে। নানা দৈর্ঘ্যে এসব ছবি নির্মিত হয়েছে, কিন্তু বেশিরভাগেরই দৈর্ঘ্য ৩০ থেকে ৬০ মিনিটের মধ্যে। কিন্তু প্রডাকশন হিসেবে এইসব চলচ্চিত্র সিনে-সংস্কৃতি এবং শিশুমানসে খুব বেশি প্রভাব রাখতে পারেনি। এসব চলচ্চিত্রের পরিবেশন ও প্রদর্শনও জনমুখী হয়নি, বড়জোর শিশু একাডেমীর জেলা শাখার মধ্যেই ঘুরপাক খায় চলচ্চিত্রগুলো। এমনকি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন বিটিভিতেও সবগুলো ছবি প্রচার হয়নি, বেসরকারী চ্যানেলের কাছে এসব ছবি একেবারে অনাকর্ষণীয়, কারণ এগুলো বিজ্ঞাপন আনতে সক্ষম নয়। খান আতাউর রহমানের ডানপিটে ছেলে (১৯৮০) এবং সি বি জামানের পুরস্কার (১৯৮৫) শিশুদের আকৃষ্ট করতে পেরেছিল। আর কোনো ছবিই শিশুদর্শকদের আকৃষ্ট করতে পারেনি। সংবাদপত্র বা সমালোচকদের দৃষ্টি আকর্ষণও এসব ছবি করতে পারেনি। বাদল রহমানের ছানা ও মুক্তিযুদ্ধ (১৯৯৯) ছবিটি খানিক আলোচিত হয়েছিল ছবিটি নিয়ে মামলা-মোকদ্দমা হবার কারণে।
শিশু একাডেমীর ছবিগুলো শিশুদের আকৃষ্ট করতে ব্যর্থ হবার কারণ কয়েকটি। একটি হলো ছবির গল্প ও নির্মাণশৈলীর দুর্বলতা। শিশু একাডেমী থেকে জানা যায়, একবছরে মোট ১৮/১৯ লাখ টাকা বরাদ্দ থাকে শিশুতোষ চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য এবং তা বণ্টন করা হয় ৪/৫ জন পরিচালকের মধ্যে। এভাবে একজন পরিচালক পান সাড়ে ৩ লাখের মতো। এই অল্প টাকায় একটা ভালো মানের ছবি নির্মাণ একেবারেই সম্ভব নয়। আরেকটি কারণ হিসেবে উল্লেখ করা যায়, ছবিগুলোর বিষয়বস্তু। শিশু একাডেমী প্রযোজিত বেশিরভাগ চলচ্চিত্রের বিষয়বস্তু মুক্তিযুদ্ধ। একথা ঠিক যে শিশুদের দেশীয় সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্য বিষয়ে সচেতন করে তোলা দরকার বিভিন্ন সৃজনশীল প্রকাশের মধ্য দিয়ে, তবে মনে রাখতে হবে শিশুদের নিজস্ব পছন্দের কিছু জঁরা আছে। যেমন তারা অ্যাডভেঞ্চার ও রূপকথা বা ফ্যান্টাসি পছন্দ করে। আর পছন্দ করে অ্যানিমেশন। কিন্তু শিশু একাডেমীর চলচ্চিত্রগুলো সেসব বিষয় স্পর্শ করেনি বললেই চলে। বাংলাদেশে নির্মিত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দু’টি শিশুতোষ চলচ্চিত্র হলো এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী ও দীপু নাম্বার টু -- দুটিই ডিটেকটিভ/অ্যাডভেঞ্চার জঁরার ছবি।
চিল্ড্রেনস ফিল্ম সোসাইটির উদ্যোগে আন্তর্জাতিক শিশু চলচ্চিত্র উৎসব আয়োজন নিশ্চয়ই বাংলাদেশে সিনে-সংস্কৃতিতে একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন। সারা বিশ্বের বিভিন্ন স্বাদের শিশু-কিশোরউপযোগী চলচ্চিত্র দেখার সুযোগ করে দেবার পাশাপাশি এবারের ৩য় উৎসবে প্রতিযোগিতার জন্য শিশুদের নির্মিত চলচ্চিত্র আহ্বান করা হয়েছিল। ৬০টি চলচ্চিত্রের মধ্যে ৩৪ ছবি মনোনীত হয়েছে পুরস্কারের জন্য। এর মধ্য থেকে ৫টি ছবিকে পুরস্কৃত করা হবে। এদের মধ্য থেকে আমরা পাবো ভবিষ্যতের নির্মাতা, এটা আশা করা আতিশয্য হবেনা।

শিশুতোষ চলচ্চিত্র ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব
শিশুতোষ চলচ্চিত্র যেহেতু ব্যবসায়িক নিশ্চয়তা দেয়না তাই বাণিজ্যিক স্টুডিও থেকে শিশুতোষ চলচ্চিত্র নির্মাণের সংখ্যা কম থাকে। এই শূন্যস্থান পূরণে সরকারকেই এগিয়ে আসতে হয়। ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহারলাল নেহেরুর আগ্রহ এবং উদ্যোগে ১৯৫৫ সালে চিলড্রেন্স ফিল্ম সোসাইটি গঠন করা হয়। সরকারের সহযোগিতায় এখান থেকে প্রতিবছর ভারতের বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষায় ২০-২৫টি শিশুতোষ চলচ্চিত্র তৈরী হয়। স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশ নরওয়ে, সুইডেন ও ডেনমার্কে শিশুতোষ চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য সরকার নানা ধরনের কর্মসূচি হাতে নেয়। এজন্য এসব দেশ শিশুতোষ চলচ্চিত্রের মান ও সংখ্যা উভয় দিক থেকেই সমৃদ্ধ। নরওয়েতে ২০০০-২০০৬ সময়কালে ১৭টি শিশুতোষ চলচ্চিত্র নির্মিত হয়। নরওয়েজিয়ান ফিল্ম ইনস্টিটিউট শিশুতোষ চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়। সরকারী নানা সমর্থনের কারণে নরওয়েতে আজ ৭০টি চিল্ড্রেনস ফিল্ম সোসাইটি রয়েছে যার সদস্যসংখ্যা ৯ হাজার। আমরা যদি (সাবেক) সোভিয়েত ইউনিয়ন, চেকোস্লাভিয়া, হাঙ্গেরী, বুলগেরিয়া, পোল্যান্ডের দিকে তাকাই, তখন দেখি অগুনতি সব শিল্পবোধসম্পন্ন নান্দনিক শিশুতোষ চলচ্চিত্রের এক বিশাল ভাণ্ডার। এক পর্যায়ে কেবলমাত্র বুলগেরিয়াতেই প্রায় হাজার খানেক ১৬ মিমি প্রেক্ষাগৃহ নির্মিত হয়েছিল শিশুতোষ চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর জন্য। এরকম পৃথিবীর নানা সমৃদ্ধ-সিনে-সংস্কৃতির দেশে শিশুতোষ চলচ্চিত্র নির্মাণে সরকারী পৃষ্ঠপোষকতার নিদর্শন পাওয়া যায়।
বাংলাদেশেও শিশুতোষ চলচ্চিত্র নির্মাণে সরকারের কিছু উদ্যোগ লক্ষ করা যায়। শিশু একাডেমীর মাধ্যমে এপর্যন্ত ৫০টি শিশুতোষ ছবি নির্মাণের কথা আগেই বলেছি। আর রয়েছে অনুদান প্রথা। জানা যায় ১৯৭৮ সালে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ভালো চলচ্চিত্র নির্মাণকে উৎসাহিত করতে সরকারী অনুদান প্রদানের ঘোষণা দেন। এর আওতায় প্রতিবছর ৩টি ছবি নির্মাণে সরকারী অনুদান প্রদানের সিদ্ধান্ত হয়, যার মধ্যে একটি অবশ্যই শিশুতোষ চলচ্চিত্র হবে বলে শর্ত আরোপ করা হয়। এরই আওতায় এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী চলচ্চিত্রটি নির্মিত হয়। তবে এই অনুদানপ্রথা নিয়মিত থাকেনি। বেশ কয়েকবছর পরে অনুদানের মাধ্যমেই দীপু নাম্বার টু নির্মিত হয়। দেখা যাচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি শিশুতোষ চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে সরকারী অনুদানে। ৩য় আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব-এ বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষণা দেন যে এখন থেকে প্রতিবছর ৫টি চলচ্চিত্রকে অনুদান দেয়া হবে এবং এর মধ্যে অবশ্যই একটি শিশুতোষ চলচ্চিত্র অন্তর্ভুক্ত থাকবে। প্রধানমন্ত্রীর এই ঘোষিত শর্ত শিশুতোষ চলচ্চিত্র নির্মাণে উল্লেখযোগ্য নিয়ামক হবার সম্ভবনা রয়েছে। প্রতিবছর যদি অনুদানের মাধ্যমে একটি করে শিশুতোষ ছবি নির্মিত হয়, তবে আমরা আরও অনেক এমিল বা দীপুর কাহিনী পেতে থাকবো। এখন দেখতে হবে অনুদানপ্রথা নিয়মিত থাকছে কিনা এবং যোগ্য লোককে অনুদান দেয়া হচ্ছে কিনা।
শিশু একাডেমীর চলচ্চিত্র প্রযোজনার প্রকল্পটি নতুনভাবে ভাবা দরকার। কারণ এতগুলো চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে কিন্তু তার প্রভাব তেমন অনুভূত হয়না। অর্থবরাদ্দ বাড়ানো দরকার, দরকার এর সুষ্ঠু পরিবেশন ও প্রদর্শন। বিটিভিতে ক্রমান্বয়ে সবগুলো ছবি প্রচারের ব্যবস্থা নেয়া দরকার। অন্য বেসরকারী চ্যানেলগুলোতে ছবিগুলো স¤প্রচার করার উদ্যোগও নেয়া দরকার। ১৯৮০ থেকে ১৯৮৪ সালে নির্মিত কিছু চলচ্চিত্রের প্রিন্ট নষ্ট হয়ে গেছে। যেগুলো ভালো আছে সেগুলোকে ডিভিডি ফরম্যাটে ট্রান্সফার করে ফেলা দরকার। শিশুদের নির্মিত চলচ্চিত্র প্রযোজনার উদ্যোগটি ভালো। তবে প্রতিবছর অন্তঃত ১টি ছবির অর্থ অ্যানিমেশনের জন্য বরাদ্দ করা দরকার। অ্যানিমেশন ছবি শিশুরা খুব পছন্দ করে, কেবল ডিজনি বা পিক্সারের অ্যানিমেশন নয়, বাংলা অ্যানিমেশনই বাংলাদেশে জনপ্রিয় হতে পারে। মীনা সিরিজ বা টোনাটুনির প্রডাকশন এক্ষেত্রে উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যায়। বাংলাদেশে এখন কম্পিউটারনির্ভর থ্রি-ডি অ্যানিমেশন দুর্লভ নয়।

শিশুর সৃজনশীলতা, সমাজ ও চলচ্চিত্র
আমরা শিশুদের জন্য যে ভিস্যুয়াল জগত উপহার দিচ্ছি তা খুব বেশি নিরাপদ নয়। গ্রামীণ শিশুরা অবশ্য এইসব ভিস্যুয়াল জগত থেকে বেশ দূরে রয়েছে। কিন্তু শহুরে বা আধা শহুরে পরিমণ্ডলে শিশুদের জন্য রয়েছে টেলিভিশন যাতে তারা উপভোগ করছে কার্টুন নেটওয়ার্ক আর বিজ্ঞাপন। কার্টুন ধারবাহিকগুলো সহিংসতায় পরিপূর্ণ। আমেরিকান সাইকোলজিকাল এসোসিয়েশনের এক জরিপে দেখা গেছে আমেরিকান শিশু ও টিন এজাররা বছরে ১০,০০০ খুন, ধর্ষণ ও শারীরিক আক্রমণের ঘটনা দেখে টেলিভিশন থেকে। আমাদের এদিকে যে কার্টুন সিরিয়াল প্রচার হয় তা তো আমেরিকারই প্রডাকশন। আর শিশুরা বিজ্ঞাপনে তো এমনি এমনি আকৃষ্ট হয়না, খোদ শিশুই বিপণনকারীদের অন্যতম টার্গেট-অডিয়েন্স। স্ট্রাসবার্গার এবং উইলসন মনে করেন তিন কারণে বিপণনকারীরা শিশুদের টার্গেট করে: এক. শিশুরা একইসঙ্গে ক্রেতাও (টিফিনের পয়সা ও আত্মীয়ের দেয়া পকেটখরচ একেবারে কম হয়না), দুই. শিশুরা পিতা-মাতার ভোক্তা আচরণে প্রভাবিত করে (জেদ-কান্নাকাটির মাধ্যমে), তিন. আজকের শিশুই কালকের প্রাপ্তবয়ষ্ক ভোক্তা। এভাবে শিশুর মানসিক বিকাশ মানুষ হিসেবে নয়, ভোক্তা হিসেবে গড়ে উঠছে। অন্যদিকে যেসব শিশু-কিশোর ইন্টারনেট ব্যবহার করে, তাদের জন্য ভার্চুয়াল জগত হয়ে উঠেছে অধিক অনিরাপদ। পর্নোগ্রাফির পাশাপাশি শিশু পর্নোগ্রাফিও ইন্টারনেটে সুলভ। সবমিলিয়ে তার জন্য একটি রুচিশীল, সৃজনশীল, আনন্দময় জগত উপহার দিতে আমরা ব্যর্থ হচ্ছি। এই ভিস্যুয়াল জগতে চলচ্চিত্র একটি বড়ো অংশীদার। সমাজের নীতিনির্ধারক, মিডিয়াকর্ণধার, চলচ্চিত্রনির্মাতা-প্রযোজকদের দায়িত্ব রয়েছে শিশুদের জন্য নিরাপদ ও আনন্দময় একটি জগত উপহার দেবার।
ডিজনি-পিক্সার যেমন পিনোকিও, শ্রেক, ফাইন্ডিং নিমো, আইস এজ-এর মতো রূপকথাকাহিনী আমাদের উপহার দিতে পারে, তেমনি বাংলাভাষী পরিচালক সত্যজিৎ রায় গুপি গাইন বাঘা বাইন ফ্যান্টাসি-সিরিজ আমাদের উপহার দিয়েছেন। টিভি সিরিয়ালের তুলনায় একক চলচ্চিত্র অনেক বেশি সৃজনশীল, শক্তিধর কল্পনায় ভরপুর হতে পারে। এবং আকর্ষণীয় শিশুতোষ চলচ্চিত্র ব্যবসায়িকভাবে সফলও হতে পারে -- দীপু নাম্বার টু যেমন ব্যবসায়িকভাবে সফল ছিল। তাই প্রযোজনা-প্রতিষ্ঠানগুলোকে শিশুতোষ চলচ্চিত্র নির্মাণে এগিয়ে আসতে হবে। প্রদর্শকদেরও এসব ছবি প্রদর্শনের আগ্রহ দেখাতে হবে। স্কুল এবং শিশুতোষ প্রতিষ্ঠানগুলোও কিন্তু দেশী-বিদেশী শিশুতোষ চলচ্চিত্রের প্রদর্শনের ব্যবস্থা করতে পারে। আজকাল ডিভিডি সার্কিটে এককালে দুর্লভ অনেক ছবিই পাওয়া যায়।

প্রসঙ্গটি অধিকারের
সৃজনশীল উপকরণসমৃদ্ধ চলচ্চিত্র দেখতে পাওয়া শিশুদের অধিকারের মধ্যে পড়ে। শিশুরাই রাষ্ট্র ও সমাজের ভবিষ্যত, তাই তাদের জন্য নিরাপদ, সৃজনশীল, আনন্দময় জগত উপহার দেয়া বড়োদেরই কর্তব্য। সমাজের সব ক্ষমতা বড়োদের হাতে, তাই শিশুবান্ধব পরিবেশ তৈরির দায়িত্ব বড়োদেরই।
শিশুতোষ চলচ্চিত্রের বিষয়টি তাই সামগ্রিক প্রেক্ষাপট থেকে দেখতে হবে। একটি সমন্বিত চলচ্চিত্র নীতিমালা প্রণয়ন করা প্রয়োজন যেখানে শিশু চলচ্চিত্রের বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করতে হবে। সেখানে অনুদানপ্রথা বিষয়ক প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণাটির বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা থাকতে হবে। শিশুদের জন্য নির্মিত চলচ্চিত্রকে প্রমোদকরমুক্ত করতে হবে। শিশুদর্শকদের টিকেটমূল্য যথাসম্ভব কম রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। শিশু একাডেমীর চলচ্চিত্রগুলোকে আরও সমৃদ্ধ করতে হবে, বিষয়বস্তুতে বৈচিত্র্য আনতে হবে এবং ছবিগুলোকে শিশুদের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। পুরনো ছবিগুলোকে বিটিভিসহ অন্যান্য চ্যানেলে পর্যায়ক্রমে প্রচার করার ব্যবস্থা নিতে হবে। অ্যানিমেশন চলচ্চিত্রের বিকাশ ঘটাতে হবে। কেবল অ্যানিমেশন দিয়েই শিশুদর্শকদের আকৃষ্ট করা শুরু হোক তবে।

[তৃতীয় ‘আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব, বাংলাদেশ’-এ ২৭ জানুয়ারি, ২০০৯ তারিখে পঠিত প্রবন্ধের পরিমার্জিত রূপ এই লেখাটি।]
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/fahmidulhaqblog/29093480 http://www.somewhereinblog.net/blog/fahmidulhaqblog/29093480 2010-02-08 16:57:15