দুপুরের গরমটা কয়দিন ধরে অস্বাভাবিক বেড়েছে।
এয়ার কুলারের হীমশীতল বাতাস শরীর জুড়িয়ে দিলেও চোখটা কেন যেন জুড়াতে পারেনা। দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকা চোখের মনিদুটো ঘুমের খোজে দৃষ্টিগুলো এলোমেলো করে দেয়। ২৫০ তলা উচু অফিসের এই রুমটি থেকে নিচের রাস্তা সোজাসোজি দেখা যায়। রিভলভিং চেয়ারটায় গা এলিয়ে দিয়ে শরীরটা একটু হালকা করতেই রিভানের ঝিমানি আসতে থাকে। জানালা দিয়ে বাইরে চলে যায় তার এলোমেলো দৃষ্টি...... দুটো কাক যেন প্রচন্ড গরমে কা কা করছে একফোটা পানির আশায়। অস্বাভাবিক এই দৃশ্যটায় রিভানের ঘুম চোখ থেকে মুহূর্তেই চলে গেল যেন- পৃথিবীর বুকে পাখির দেখা ক্লোন-চিড়িয়াখানা ছাড়া অন্য কোথায় পাওয়া যায় না। রুমের সাথে লাগোয়া টয়লেটে যেয়ে চোখে মুখে ঠান্ডা পানির ঝাপটা দেয় রিভান- গরমে তার চোখজোড়া'র সাথে সাথে মাথাও কি আউলে যাচ্ছে? নাহলে সে এই শতাব্দীতে পাখির দেখা কিভাবে পাবে?
"আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম" - বেসিনের ওপরে আয়নার দিকে তাকিয়ে নিজের চেহারা দেখতে দেখতে রিহান আবারো বিড়বিড় করে বলল- আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। এখন তো আমাকে ঘুমালে হবে না।
ঘড়ির কাটার দিকে তাকালো রিভান। দুইটা পাচ। আরো পচিশ মিনিট আছে। ইন্টারকমে সেক্রেটারীকে কফি দিতে বলে চেয়ারে নিজেকে ডুবিয়ে দিল রিভান। মাথায় হাত দিয়ে একটা শিরা টিপে ধরে রিভান ভাবতে লাগলো- একটু পরে যে কনফারেনস টা শুরু হবে সেখানেও কি তার মাথা আউলে যাবে? আজকের কনফারেন্স টা তার জীবন-মরণ নির্ধারণ করছে বলা যায়- আজকে যদি তার প্রজেক্ট একসেপ্ট না হয় তাহলে নিশ্চিতভাবেই এই আড়াইশো তলার এই রুমটায় বসে আর এয়ারকুলারের বাতাস খেতে হবে না- ঘরে বসে ত্রিশির চেহারা দেখতে হবে। ত্রিশির চেহারাটা চোখের সামনে ভেসে উঠতেই অকারণে তার চোখমুখ শক্ত হয়ে গেল- মানুষ এতটা স্টুপিড হয় কিভাবে?
সেক্রেটারী মেয়েটা ধোয়া ওঠা সিনথেটিক কফির মগটা টেবিলের ওপর রাখতে রাখতে বলল, স্যার আপনার সময় তো হয়ে এলো বলে।
এরপর হঠাৎ রিভানের চেহারার দিকে তাকিয়ে বলল, ওহ নো স্যার , আর ইউ অল রাইট?
রিভান চেয়ারে হেলান দিয়ে সোজা হয়ে বসল। ক্রিশির চেয়ে এই মেয়েটা বরং হাজার গুনে ভালো আছে। ক্রিশির মত সুন্দর না, তাতে কি, স্মার্টনেস তো আর কম না। তাছাড়া প্রোগ্রামিং ভালোই পারে, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স নিয়েও হালকা পড়াশোনা আছে। গতসপ্তাহে রুটিন প্রজেক্টের একটা মডিউল পর্যন্ত রিভানের ইনস্ট্রাকশন নিয়ে করে দিয়েছে। ইস তার বউটা যদি এই মেয়েটার মত একটু হলেও হত! সারাদিন চ্যাটিং আর আড্ডাবাজি করলে কি হয়?
রিভান টাইটা ঠিক করতে করতে বলল, ইয়েস, ...ইয়েস। এরপর কফির একটা বিস্বাদ চুমুক দিয়ে বলল, চলো, যাওয়া যাক।
কিছুটা বিস্মিত হয়ে রিভানের পোর্ট ফোলিয়োটা গোছাতে গোছাতে সেক্রেটারী মেয়েটা রিভানের রুমের দরজা বন্ধ করে কনফারেন্স রুমের দিকে এগিয়ে চলল।
_________________________________________
রাত পৌনে বারোটার কাছাকাছি। গাড়ির জানালার কাচ নামানো, হালকা হিম হিম বাতাস জানালার কাচ গলিয়ে ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে। এই ঠান্ডার মধ্যেও রিভানের কপালে ঘাম, চোখ দুটো মনে হচ্ছে আগুনে পুড়ে যাচ্ছে। আজকের কনফারেন্সে কি অপমানটাই না তাকে করল সবাই মিলে! হাস্যকর! হা হা হা রিভান নিজেই পাগলের মত হেসে উঠে সজোরে ব্রেক কসলো গ্যারেজের ভেতর। "ভার্চুয়াল হিউম্যান চ্যাটিং এনভায়রোনমেন্ট!" আবার! গত কয়েক শতাব্দীর সবচেয়ে আলোচিত, সবচেয়ে বেশিবার হাতে নেওয়া আর প্রতিবারই সফলভাবে ব্যর্থ হওয়া এই প্রজেক্টের নামটাই কেন রিভান কনফারেন্সে তুললো, এটা জানতে চেয়েছেন বস। এতে নাকি তার ডেভেলপমেন্ট ফার্মের মর্যাদা ক্ষুন্ন হয়েছে। তারপরও যে প্রজেক্টের কাজ করতে যেয়ে বাঘা বাঘা পোগ্রামার আর সায়েন্টিস্টরা হিমসিম খাচ্ছে শতাব্দী ধরে, সেটা রিভানের মত "স্বস্তা" ইন্জিনিয়ার কিভাবে একমাসের মধ্যে বেটা রিলিজ করবে, এটা নিয়েও মিনিট পাচেকের মত হাসাহাসি হলো কনফারেন্সে। আর রিভান ডায়াসে বোকার মত দাড়িয়ে থেকে গোলাপী মুখটা নিয়ে কুলকুল করে ঘেমেছে। শেষে অবশ্য একমাসের সময় বরাদ্দ পেয়েছে সে, আর টাকাও, তবে এবার প্রজেক্ট ফেইলিয়র হলে নিশ্চিৎভাবেই চাকরিটা আর থাকবে না।
ঘরের লাইটগুলো সব নেভানো, হালকা নীল অন্ধকারে পুরো বাড়িটা ডুবে আছে। ক্রিশা? মেজাজটা আরো তিরিক্ষ হয়ে গেল রিভানের। ঘুমিয়ে পড়েছে নাকি মেয়েটা এত সকালেই? এটা তো হবার কথা না। ভিবি চ্যানেলে হাবিজাবি মেগা সিরিয়াল দেখে ভোর চারটায় ঘুমোতে যার রিশি। এইসব সিরিয়াল দেখে কি শেখলো ক্রিশা, এটা নিয়ে রিভানের সন্দেহ হয়। আজকাল রিভান ভাবে, ক্রিশা নিজেকে এইসব সিরিয়ালের চরিত্র ভাবতে শুরু করেছে।
পুরো বাসা খুজে ক্রিশা ক্রিশা ডেকেও যখন কোন সাড়া পেলো না, তখন রিভানের হার্টবিট বেড়ে গেলো। বেডরুমে ঢুকে লাইট টা জ্বালিয়ে দিতেই অবশ্য রিভানের ভয় পিউর বিরক্তিতে রূপান্তরিত হল, বারান্দায় বসে নেটওয়ার্কে আড্ডা পিটাচ্ছে ক্রিশা। পুরো বারান্দা জুড়ে হলোগ্রাফিক ছবিগুলোতে আড্ডায় উপস্থিত দের দেখে রিভান অবশ্য ভয় পেয়ে গেল- কি চেহারা আর সাজসজ্জা একেকটার! এরা কি সব চিড়িয়াখানা থেকে ছাড়া পেয়েএসেছে নাকি? এমন বীভৎস রূপ নেয় কেমনে মানুষ?
ক্রিশার দিকে তাকিয়ে চাপা চিৎকার দিয়ে পেছনে সড়ে এলো রিভান- ক্রিশার দুই গালে অংখ্য ফুটো, আর সেখানে কি সব রিং টাইপ অলংকার ঝুলছে।
এতক্ষণে রিভানকে দেখলো ক্রিশা। একটু বিরক্তই যেন হলো।ইশারায় বুঝিয়ে দিলো বিরক্ত না করতে। বিস্ময় ভরা চোখগুলো নিয়ে রিভান টলতে টলতে পেছনে সড়ে এলো। মাথাটা টিপে ধরে সাড়াদিনের না খাওয়া বিধ্বস্ত শরীরটা বিছানায় ফেলে দিলো রিভান।
ঠিক একমাস পর। বসের রুমে বসে আছে রিভান। সিনথেটিক কফিটায় চুমুক দিতে দিতে বসের রুমটা দেখছিল রিভান। আজকে সে হালকা এক্সাইটেড। এতদিনের সাধনার ফসল আজকে হয়তো তার হাতে আসবে!
বস রুমে ঢুকে কোনরকম ভনিতায় না যেয়েই বললো, নিশ্চয়ই কিছু পারোনি?
রিভান একটু সময় নিয়ে কফির মগটা শেষ করলো। এরপর উঠে দাড়িয়ে একটা হাসি দিয়ে বললো, আমি অত্যন্ত দু:খিত বস, প্রোজেক্টের কাজটা আমি সফলভাবে শেষ করতে পারিনি।
বসের মুখটা আরো কালো হয়ে গেলো। কিছুক্ষণ পর বললো, তোমার নিশ্চয়ই মনে আছে কোন চুক্তিতে তুমি প্রজেক্টের কাজটা নিয়েছিলে।
ইয়েস স্যার। এটেনশন হয়েদাড়ানোর ভঙ্গিতে বললো রিভান/
- শর্তমতে তুমি এখন আমাদের কর্পোরটেরের বাইরের কেউ।
= হ্যা বস, শর্তমতে তাই!
- তোমার প্রজেক্টের জন্য বরাদ্দকরা এক মিলিয়ন ইউনিট তিনমাসের মধ্যে তোমারফেরত দেবার কথা।
= ইয়ে বস, সময়টাকি আরো একমাস বাড়ানো যায়না?
- রিভানের চোখের দিকে তাকিয়ে শেষপর্যন্ত বস বলল, ঠিকআছে, তোমাকে একমাস বেশি সময় দেওয়া হলো। চারমাসের মধ্যে তুমি তোমার প্রজেক্টের জন্য বরাদ্দকরা ইউনিট ফেরত দেবে।
অফিস থেকে বের হয়েই গাড়িটা ঘুরিয়ে নিয়ে এ শতাব্দীর জায়ান্ট- এ.আই ফার্ম মার্স ডেভেলপার্সের দিকে গাড়ি ছোটালো রিভান।
______________________________________
একবছর পরের কথা। মার্স ডেভেলপার্স ইনকরপোরেট এর ভার্চুয়াল হিউম্যান চ্যাট এনভায়রনমেন্ট এখন এই গ্রহটার হটকেক। বস্তা বস্তা ইউনিট দিয়ে বিভিন্ন কোম্পানীগুলো মার্সের কাছ থেকে সার্ভার-একসেস কিনে নিচ্ছে। এই চ্যাট এনভায়রনমেন্টের বৈশিষ্ট্য হলো, এখানে ভার্চুয়াল মানুষদের সাথে চ্যাটিং করা যায়। কেন্দ্রীয় সার্ভারে লগিন করে সেখানের ভার্চুয়াল ক্যারেকটারের হলোগ্রাফিক স্ক্রীনে লাইভ ভিডিও চ্যাট করে যদি কারো মনে হয় সে আসল মানুষের সাথে চ্যাট করেনি, তাহলে সে ইউনিট রিটার্ন দাবি করতে পারবে। মার্স ডেভেলপার্সের সম্পূর্ণ ব্যবসাসফল এই প্রজেক্টের মূল ডেভেলপার রিভান জো, একজন তরুণ, প্রতিভাবান ইন্জিনিয়ার যিনি খুবই সম্প্রতি তার স্ত্রী ক্রিশাকে হারিয়েছেন একটি সড়ক দুর্ঘটনায়।
ভিবি মডিউলে'র রিপোর্টারের গলায় নিজের সম্পর্কে করা প্রতিবেদনটা দেখতে দেখতে হঠাৎই রিভানের মনটা অন্যমনস্ক হয়ে গেল। ক্রিশার কথা মনে পড়ায় সে কি অসুস্থ হয়ে যাচ্ছে দিনদিন?
গলায় ঝুলানো আইডিকার্ডটা দরজার সামনে ধরতেই কেন্দ্রীয় সার্ভারের দরজাটা খুলে গেল। হিমশীতল করিডোরটা পেরিয়ে অবশেষে রিভান শেষের ঘরটায় চলে গেল- যেখানে তার করা ভার্চুয়াল চ্যাট প্রজেক্টের মূল সার্ভার রয়েছে।
কাপা হাতে এডমিনিস্ট্রেটরের পাসওয়ার্ড দিয়ে দরজাটা খুলে ফেললো রিভান। সে ছাড়া এই পাসওয়ার্ড আর কারো জানার কথা নয়।
ঘরের মাঝখানে গিয়ে কালো স্ক্রীণটা আস্তে আস্তে চালু করল রিভান।
ক্রিশা, কেমন আছো? ভাঙা গলায় কোনমতে কথাটা শেষ করলো রিভান। তার দৃষ্টি এখন স্বচ্ছ ক্যাপসুলটার ভেতর তরলে ভাসতে থাকা ক্রিশার মস্তিষ্কটার দিকে। অজস্র নেটওয়ার্ক কেবল ক্রিশার খুলি ভেদ করে ভেতরে চলে গিয়েছে। মাটি থেকে দৃষ্টি তুলে নিয়ে ক্রিশার চোখের দিকে তাকালো রিশান।
আশ্চর্য! ক্রিশার চোখজোড়া যেন আগের চেয়ে বেশি জীবন্ত।
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই জুন, ২০০৯ রাত ৯:৩৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


