১)
পুড়ে গেল রায়ের বাজার নিমতলী বস্তি। টিভি স্ক্রীনের ভিতর থেকে আগুনের লেলিহান শিখা বেরিয়ে যেন পুড়িয়ে দিচ্ছিল বাংলাদেশ।
মালেকা বেগম, বানু, নুরজাহান, শাহানা কাঁদছে পাগলের মত।
‘মায়ের চিকিতসার লাইগ্যা বিশ হাজার টেহা জমাইছিলাম, হেই ট্যাহা আমি অহন কই পামু? আমার মারে কেমনে চিকিতশা করাইমুরে আল্লা?!’
‘আমার পোলাডার শারা শইল জইল্লা গেছেগা! আমার ঘর গেল, পোলাডাও যদি যায় আমি কী নিয়া বাঁচুম?!”
একহাজার ছয়শ’ আশিটি ঘরের সাথে সাথে পুড়েছে একহাজার ছয়ট আশিটি পরিবারের বেঁচে থাকার নূন্যতম অবলম্বন।এবং এদের সাথে সাথেই কি দারিদ্রতার পথে আরো এক পা বাড়ালো না বাংলাদেশ?
২)
বাসা থেকে ইউনিভার্সিটি সাত টাকার রিকশাভাড়া। খুব বেশী হলে দশটাকা। সেদিন যথারীতি সাতটাকা বের করে দেয়ার সাথে সাথে রিকশাওয়ালার চড়া গলা- ‘এইডা কী দিলেন?’
আমি অবাক- ‘কেন? কী হয়েছে? সাতটাকা দিয়েইতো আসি!’
‘পনের ট্যাহা দেন!’
রিকশাওয়ালার সোজা কথা। সাতটাকা ফেরত ধরে রেখেছে আমার দিকে।
‘পনের টাকা?! সবচে বেশী হলে দশটাকা বলেন! পনের টাকা বললে তো অন্যায় হবে’।
‘হ। পাঁচ ট্যাহা বেশী ভাড়া চাইলেই ন্যায়- অন্যায় হুনাইয়া দিলেন, আর গভারমেন যে ডাইল-চাউলের দাম হু হু কইরা বাড়াইল হেইডা অন্যায় হইলনা? দেন দেন, দশ ট্যাহাই দেন!’
আমি থমকে যাই।
আমার লজ্জা লাগে দশটাকা দিতে। পনের টাকা দিয়ে একবারও রিকশাওয়ালার চেহারার দিকে না তাকিয়ে ঢুকে যাই ভার্সিটিতে।
এসব অতি-দরিদ্র মানুষগুলোর দিয়ে তাকিয়ে আমাদের সরকার কি লজ্জা পায় একবারো?
৩)
আমাদের দো’তলার বারান্দা দিয়ে রাস্তা দেখা যায়।
অনেকদিন পরে সেদিন ভোরে বারান্দায় দাঁড়ালাম। এ কুয়াশাভেজা শীতের মধ্যেও রাস্তায় জগিং’এ নেমেছেন অনেকেই। অনেক বৃদ্ধ-বৃদ্ধা দল বেঁধে হাঁটছেন।হাঁটতে হাঁটতেই চলছে গল্প। অনেকেই একাকী দৌঁড়াচ্ছেন খোশ-মেজাজে।একা হোক বা দল বেঁধে, সবার গায়েই দামী শাল/গরম কাপড়। অনেকের হাতে পায়েও মোজা। মাথায় কান টুপি। ঠান্ডা না লাগার যাবতীয় প্রস্তুতি নিয়েই শরীর চর্চায় বের হয়েছেন সবাই।
কিন্তু আস্তে আস্তে আধাঘন্টার মধ্যেই পালটে গেল দৃশ্যপট। সুখী সুখী চেহারার দামী গরম কাপড় গায়ে মর্নিং-ওয়াকরত মানুষগুলো কমে গিয়ে আস্তে আস্তে বেরিয়ে আসে গার্মেন্টসের পথযাত্রীরা। আমি চুপচাপ দেখতেই থাকি। বেশীরভাগই মেয়ে। কেউ একলা, কেউ আরকজনের সাথে, কেউ দলে দলে। কিন্তু সবার পায়েই দ্রুততা। কারো মুখেই গল্প নেই। গায়ে যতটুকু কাপড় আছে ততটুকু দিয়েই হাত,পা, মুখ ঢেকে রাখার প্রানান্ত চেষ্টা। পুরানো কাপড়ে তাও শীত মানেনা। তাই ওরা আরো দ্রুত পা চালায়। তাতে যদি শরীর গরম হয়!
একটা মেয়েকে দেখি, এ শীতেও তার গায়ে হাতাকাটা কামিজের সাথে ফুটপাতের বিশটাকা দামের জর্জেটের ওড়না। সেই ওড়না দিয়েই মাথা আর হাত প্যাচিয়ে হাতদুটো বুকের কাছে বটে রেখে দ্রুত হাঁটছে কোনো দিকে না তাকিয়ে।ওকে দেখে আমার নিজেরই শীত লেগে উঠে।
আধাঘন্টা আগের আর পরের দৃশ্য তুলনা করতে গিয়ে খেই হারিয়ে ফেলি আমি। রায়ের বাজার বস্তির আগুন, বাজারের দ্রব্যমূল্যের আগুন, আর এই শীতের ভোরে দুঃখের আগুন আমাকে একটু একটু করে গ্রাস করে।
আমিও পুড়তে থাকি আমার বাংলাদেশের সাথে।
(published in today’s JJD, readers forum.
Thank you)
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা জুলাই, ২০০৮ সকাল ৭:০৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



