somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আমার শেকড়ের উষ্ণতা

৩১ শে জানুয়ারি, ২০০৮ বিকাল ৩:০৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

রাতে আকাশে চাঁদ নেই বলে বাইরে ঘুটঘুটে অন্ধকার। গ্রামে কারেন্টও ঠিক যেন সন্ধ্যা হওয়ার অপেক্ষায় থাকে। সন্ধ্যা হলেই ওদের ছুটি। অতএব একমাত্র ভরসা, সেই হারিকেন আর চেরাগ।
দু’টা চেরাগ দু’দিকে নিয়ে মুন্নি, সম্রাট, ফরহাদ আর আমি লুডু খেলতে বসি। সম্রাট কিছুতেই ঘর খেলবেনা, তাই সাপ খেলা। কিন্তু দশ মিনিটেই লুডু খেলা মাথায়! ওরা তিনজনই যখন নব্বই’র ঘরে, সাপের খাদ্য হতে হতে আমি তখনো বিশ পেরুতে পারিনি! সাপ খেললেই কেন যেন আমাকে সবসময় বড় সাপগুলোই পায়! চেরাগের আলোয় সাপগুলোকেও কেমন জীবন্ত দেখায়। সাপ কি সর্বভূখ? কে জানে……
ফরহাদ দান চুরি করেছে! কিন্তু ধরা খেয়েও স্বীকার করছেনা। সবার সম্মিলিত হৈ চৈ এর মধ্যেই আমার সাতাশ’র ঘরে বসে থাকা গুটি মুন্নির বিরাশি’র ঘরের গুটির সাথে চেইঞ্জ করে ফেললাম। ফরহাদের সাথে কোনো রকম একটা মিটমাট করে মুন্নি দাল চালতে গিয়েই…… ‘চোররর! আপুকে ধরো!’
আমি এক দৌঁড়ে ততক্ষনে ফুপুর আঁচলের তলে!
খেলায় জিততে না পারলে অন্তত খেলা ভেঙ্গে দিয়ে চলে আসাই মনে হয় সবচে সহজতর।

রাতে শাহানার সাথে নুরু ফুপুর বাড়ি। আমার অন্যতম প্রিয় জায়গা। বাড়ির উঠোন পেরিয়ে বাধঁ এবং বাঁধের উপর দাঁড়ালেই সাগর। এদিকের বীচ আইসোলেটেড। এটা যেন আমাদের বাড়ির সমুদ্র।
নিজেদের একটা সমুদ্র থাকে ক’জন মানুষের?

খুব ভোরে শাহানাকে জোর করে ঘুম থেকে তুলে ডেকে নিয়ে এলাম বাঁধের উপর। ভীষন শীত। সাথে হালকা কুয়াশা। সাগর শান্ত। পানির পরে পানি। তারোপরে পানি।
যতদূর চোখ যায় সাগরের গাঢ় নীলিমায়
সকাল বেলার রোদ পাখি হয়ে যায়……
কে বলেছিল? জীবনানন্দ?
আপাতত আমাদের সমুদ্রে আমিই জীবনানন্দ হয়ে যাই।
আকাশ, সমুদ্র আর আমি……. শাহানা চাদর মুড়ি দিয়ে শুধু দুইটা চোখ বের করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। সমুদ্রের পাশে রাত দিন থেকে থেকে ও কিছুতেই বুঝেনা আমি সমুদ্রের কাছে আসার জন্যে এমন পাগল হয়ে যাই কেন।
কান আর মাথা আরো ভাল করে ঢেকে নিয়ে আবার তাকায় আমার দিকে।
জিজ্ঞেস করে-‘কী দেখ?’
‘সমুদ্র’
‘দেখার কী হইল এইটা?’
‘মনের চোখ খোলো। তুমিও দেখবা’।
‘হ, কাম কাজ নাই’।
আমি চুপ।
‘তোমরা শহরের মানুষ সব আজাইরা। সমুদ্রের পাশে আইসে তাকায়ে থাকো ঘন্টার পর ঘন্টা। লাভটা হয় কি? এখানে থাকবার বললে তো আবার থাকোনা!’
আমি কিছু বলিনা, যদিও বুকের গহীন থেকে বলতে ইচ্ছা করে- আমাকে রেখে দে শাহানা! বিশ্বাস কর, আমি থেকে যাব!
কিন্তু আমি কিছু বলিনা।
বালুতে পা ঘষে ঘষে হাঁটি। বালুতে নকশা হয়ে যায়। একটু দূরে গিয়ে সেই নকশাই মুগ্ধ হয়ে দেখি। রোদ উঠে।
বাঁধের উপর থেকে মোজাম্মেল ডাকছে। ফুপু পিঠা বানিয়েছে।

ফিরে এসে উনুনের তাপের কাছে বসি।
ভাঁপা পিঠা।
ফুঁপু যত্ন করে খাওয়ায়। খেতে খেতেই বলে- ‘পাগলামী করেই জীবন পার করবা? বড় হবানা?’
আমার কথা বলতে ইচ্ছা করেনা। গরম গরম ভাঁপা পিঠা একটু একটু করে ভেংগে মুখে দেই আর মাথা উঁচু করে বাঁধের উপর দিয়ে সমুদ্র দেখতে চেষ্টা করি।
‘কথা বলনা ক্যান। ফুপু খারাপ তো বলিনাই। জীবনটা গাংগের নাও না। যেমনে ভাসাইলা তেমনে ভাসবো না। বানের পানিতে না ডুবলে মানুষে ফুটা করে ডুবাই দিবে'।
আমার মুখ ভর্তি ভাঁপা পিঠা।
ফুপুর দর্শনের সাথে উনুনের ভাঁপ আমাকে উষ্ণ করে তুলে। একবার ইচ্ছা হয় বলি -বক বক করো নাতো ফুপু!
বলা হয়না। কাছের মানুষদের স্নেহের অত্যাচার মাথা পেতে নেয়াই নিয়ম।
ঠান্ডা এক ঝলক বাতাস উনুনের ছাই উড়িয়ে নিতে চায়। ফুপু ব্যাস্ত হয়ে পড়ে। আমি নিশ্চিন্ত মনে আরেকটা ভাঁপা পিঠা হাতে নিয়ে উষ্ণতার ছোঁয়া পেতে চেষ্টা করি……

সর্বশেষ এডিট : ০১ লা জুলাই, ২০০৮ ভোর ৬:৫৯
৪৩টি মন্তব্য ১৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে আব্বাসীদের জন্য হুমকি হয়ে আসছে- কী হবে খালেদ মহিউদ্দিনের?

লিখেছেন হিমন, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৫০

হোমো ইরেক্টাসদের প্রায় বিশ লাখ বছর আগের আগুনের ব্যবহার থেকে শুরু করে ছয় হাজার বছর আগের চাকা আবিষ্কার, ১৮৩১ সালের বিদ্যুৎ, গত শতাব্দীর অ্যান্টিবায়োটিক, আর এই সেদিনের ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন—... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×