somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

চড়ুই পাখির নকশা!

১১ ই মার্চ, ২০০৮ বিকাল ৩:৪৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

খুব ছোট বেলায় যখন আমরা দুইরুমের একটা বাসায় থাকতাম, আমাদের ছোট কিচেনটার ভেন্টিলেটারে দুইটা চড়ুই পাখি বাসা বেঁধেছিল। আমাদের বাসাটা ছিল অন্ধকার, চারিদিকে বড় বড় বিল্ডিং’র ভীড়ে আমাদের ছোট বাসাটাকে খুঁজে পেত না সূর্যের আলো। কিন্তু ঐ ভেন্টিলেটর ভেদ করে পড়ন্ত বিকেলে কীভাবে যেন ফাঁকফোঁক দিয়ে এসে ঢুকতো একটুকরো রশ্মি। ভেন্টিলেটরের চারটা পাখার ফাঁক দিয়ে আসা রশ্মি অদ্ভূদ এক নকশা তৈরী করতো কিচেনের মেঝেতে। তারমধ্যে যখন চড়ুই পাখি দুইটা উড়াউড়ি করতো, আমি ভীষন ভাল লাগায় যেন আরেক জগতে চলে যেতাম। পুতুল খেলতেও ভুলে যেতাম চড়ুই পাখি আর সূর্যরশ্মির আলো-আঁধারির নকশা দেখতে দেখতে।

তখন সব ভাই-বোন মিলে আমরা একটা খেলা খেলতাম। সবার হাত মাটিয়ে বিছিয়ে একজন কিল দিতে দিতে ছড়া বলতে থাকবে। ছড়াটার শেষ শব্দ যার হাতের উপরে শেষ হবে, তার সেই হাত বাদ। অনেকগুলো ছড়ার মধ্যে একটা ছড়া আমার খুব প্রিয় ছিল। …
চড়ুই পাখি বারটা/
ডিম পেরেছে তেরটা/
একটা ডিম নষ্ট/
চড়ুই পাখির কষ্ট!

আমার খুব অবাক লাগতো! এতগুলো ডিম থেকে একটা ডিম নষ্ট হলে কী-বা আসে যায়?
আম্মু বলতো- তোমার বাকী চারভাইবোন থেকে একজন চলে গেলে তোমার কেমন লাগবে?
আমি তাও বুঝতাম না।
তারপর একদিন হঠাত করে ‘নজিনি’ (ওকে দুষ্টুমী করে আমরা এই চাইনিজ নামে ডাকতাম!) মরে গেল! একদম বিনা নোটিশে…
আমি প্রথম বুঝলাম চড়ুই পাখির যত ডিম-ই থাকুক, একটা ডিমও যদি নষ্ট হয়, তাহলে তার বুকটাও ঠিক এভাবেই টুকরো টুকরো হয়ে যায়।

ইসলামাবাদে যখন প্রথম ঈদ ভেকেশানে ফরেনার স্টুডেন্ট ছাড়া আর সবাই চলে গেছে যার যার বাড়িতে, গ্রুপ-ট্রাভেলেও বেরুতে ইচ্ছা করছিলনা বলে একলা থেকে গেছি হল-ওয়ানের থার্ড ফ্লোরে… আমার ফ্লোরের একদম শেষপ্রান্তে শুধু একটা কেনিয়ান মেয়ে আছে; তখনো দিনের সবচে বড় সময় চলে যেত হল-ওয়ান গার্ডেনে চড়ুই পাখিদের উড়াউড়ি দেখে।
কেনিয়ান মেয়েটা অবাক হয়ে যেত। আমার সাথে বসত। তারপর একসময় ধৈর্য্য হারিয়ে উঠে যেত। আমার কেন যেন সূর্যের আলোয় ফুল আর চড়ুইদের খেলা দেখতে কিছুতেই বিরক্তি লাগতোনা। এক একসময় ঘাসের উপর শুয়ে যেতাম ক্লান্ত হয়ে। তাও রুমে ফিরতে মন চাইতোনা। চড়ুই দেখতে দেখতে, আকাশ দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে যেতাম ঘাসের উপরেই।
কেনিয়ান ওর নাম ছিল- ট্যাটু।
জিজ্ঞেস করেছিলাম ‘ট্যাটু’ অর্থ কী?
বলল- আমাদের লোকাল ভাষায় এর অর্থ-‘তিন’।
-তিন?!
- হ্যা। আরবীতে যেমন চারনাম্বার বাচ্চা মেয়ে হলে নাম রাখে ‘রাবিয়া’(চার), ওরকম আমাদের ওখানেও তিন নাম্বার মেয়ে হলে নাম রাখে ‘ট্যাটু’।
-এক-কে কী বল?
-মোজা।
-মোজা?!! তুমি জানো আমাদের ভাষায় মোজা কাকে বলে?!
-কাকে?
-সকস্ কে!
-হাহাহাহাহাহা!
-আর দুই?
-বিলি।
আমি তখন ওকে তিনটা চড়ুই পাখি দেখিয়ে হাতের আঙ্গুল দিয়ে গুনে গুনে দেখাই- হেয়ার ইস মোজা, দ্যাটস বিলি এন্ড হেয়ার ইস ট্যাটু!!
ও হাসতে হাসতে লনের সিড়ি থেকে বলতে গেলে গড়িয়ে পড়ে যায়!


ছোট থাকতে ক্লাসে যখন পড়ালো আমাদের জাতীয় পাখি দোয়েল; আমি অবাক হয়ে বইয়ের ছবি দেখতাম। দেখতে খারাপ লাগতো না। কিন্তু কেন যেন মনটা পড়ে থাকতো চড়ুই পাখির কাছে। বইয়ে ছবি দেখলেও আমি দোয়েল পাখি চিনতাম না অনেক বড় হয়েও! মাত্র ক’বছর আগে প্রথম দোয়েল পাখি চিনেছি আমার ফুপাতো বোনের কাছে। আমাদের বাড়ির পুকুরের পাশের গাছে বসে ছিল। দেখে ভীষন অবাক হয়ে ভেবেছি- ধুর! এটা একটা জাতীয় পাখি হল?! তারচে’ চড়ুই পাখি হাজারগুনে সুন্দর!

এরপর যাযাবরের মত নিজের থাকার জায়গা বার বার চেইঞ্জ হতে থাকায় চড়ূই পাখিদের হারিয়ে ফেলি নাগরিক ব্যাস্ততায়। অনেক অনেক দিন পর, সেদিন পরীক্ষার পড়া পড়ছিলাম।পড়তে পড়তে আকাশ দেখা আমার প্রিয় অভ্যাস।জানালা দিয়ে তাকিয়ে আছি, হঠাত খেয়াল হল, একি!! এসির খোপ থেকে একটা জলজ্যান্ত চড়ুই পাখি বের হচ্ছে!! আমি হা করে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই দেখি আরেকটা!!
দ্রুত উঠে জানালার শাটার খুলে দেখি- আরে তাইতো!!
এসির খোপের ভিতর চড়ুই পাখির বাসা!



নীচেই রাস্তা থাকায় আমি সাধারনত শাটার খুলিনা।গাড়ির আওয়াজ আমার ভালো লাগেনা। কিন্তু এখন, প্রতিদিন ভোরে শাটার খুলে চুপ করে চেয়ারে বসে থাকি। সকাল বেলা এই দুইটা চড়ুই যেন ভীষন ব্যাস্ত থাকে। এই বের হয়, এই ঢুকে, একটা আরেকটার সাথে চিউক চিউক করে কী যেন বলে; যেন দু’জনে মিলে সারাদিনের প্ল্যান ঠিক করে। সূর্যটা ভালো করে উঠতে শুরু করলেই দু’জনে চলে যায় খালি বাসা ফেলে।


আমি যেন সারাদিন পড়ার ফাঁকে ফাঁকে পাহারা দেই ওদের ছোট্ট বাসাটা!
তারপর আবার যখন ওরা ফিরে আসে সন্ধ্যায়, আস্তে আস্তে উঁকি দিয়ে দেখে নেই- ওরা দু’জন ভালই আছে।

এখনো ওদের দু’জনের চিউক চিউক শুনতে শুনতে লিখছি আর ভাবছি- পড়ার টেবিলের জানালার পাশে চড়ুই পাখি থাকা মন্দ না! :) B-)
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা জুলাই, ২০০৮ ভোর ৬:৪৫
৪৭টি মন্তব্য ১৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে আব্বাসীদের জন্য হুমকি হয়ে আসছে- কী হবে খালেদ মহিউদ্দিনের?

লিখেছেন হিমন, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৫০

হোমো ইরেক্টাসদের প্রায় বিশ লাখ বছর আগের আগুনের ব্যবহার থেকে শুরু করে ছয় হাজার বছর আগের চাকা আবিষ্কার, ১৮৩১ সালের বিদ্যুৎ, গত শতাব্দীর অ্যান্টিবায়োটিক, আর এই সেদিনের ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন—... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×