-ডুব দাও।
-কী??! ডুব দিব মানে??
-আরে বাবা, এই রডটা ভালো করে ধর। দ্যান ডুব দাও একটা।
-সাঁতার শিখতে এসেছি, ডুব কেন দিব আন্টী?! আমার ডুব দিতে ভয় লাগে। আমি এর আগে দুইবার ডুবে গেছি!
-ডুব দিতে হবে। এটা নিয়ম। আমি তোমার হাত ধরে আছি। দাও, ডুব দাও!
-আল্লাহ!
সাহস করে চোখ বন্ধ করে ভুশশশ………
আপাতত ডুবাডুবিতে আছি। সাঁতার শিখা শুরু করেছি। ক’ মাস আগে লাস্ট ডুবে গিয়েছিলাম চট্রগ্রামে। কেউ বিশ্বাস করবেন? কোমড় সমান পানিতে!!!! ঐযে ঢেউয়ের মত রাইডটা,ওটা থেকে পড়েই আমার পা পিছলে গিয়েছিল। হেলে পড়েছিলাম পিছন দিকে। কিছুতেই পা নামাতে পারিনা। পানির প্রচন্ড প্রেশারে একসময় হাল ছেড়ে দেই। শা শা শূন্য শব্দ… খোলা চোখে পানির রঙ আর তাতে রোদের রিফ্লেক্ট দেখছিলাম…বুঝতে পারছিলাম মরে যাচ্ছি, কিন্তু কেউ আমাকে দেখছে না কেন? ভাবীতো পাশেই ছিল! ভাবী আমাকে খুঁজছেনা কেন? দম বের হয়ে যাওয়ার এত কষ্ট!! আচ্ছা, আম্মু কী বলবে? নিশ্চয়ই লাশ দেখে বলবে- আমার বোকা মেয়েটা শেষ পর্যন্ত কোমড় পানিতে ডুবে মরে গেল?!! ……
হাসবেন না, আমি তখন সত্যি এই কথাটাই ভাবছিলাম।
শেষ পর্যন্ত অবশ্য ভাবী পিছন ফিরে আমাকে না পেয়ে জ্ঞান হারানোর আগ মুহূর্তে ঝাপটে ধরে তুলে আনেন পানি থেকে। খোদা! জীবনে কারো যেন ডুবে যাওয়ার অভিজ্ঞতা না হয়।…… সেদিনই প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, সাঁতার শিখতেই হবে।
আপনারা যারা সাঁতার জানেন, তারা একটু টিপস দিননা! আমি পানি ভীষন ভয় পাই। মনে হচ্ছে, দু’দিন সাঁতার ক্লাসে গিয়ে তিনদিনের দিন হাল ছেড়ে দিব!
আপডেট-২
-আম্মু, তুমি কীভাবে সাঁতার শিখলা?
-ধুর, শিখছি কখন তাও তো মনে নাই। গ্রামে কী সাঁতার শিখতে হয়? নিজে নিজেই কখন সাঁতার কাটা শুরু করে গ্রামের বাচ্চারা ওরা নিজেরাও জানেনা।
-আব্বু, আপনি?
-তোমার দাদু আমাকে হাঁটা শেখার আগে সাঁতার কাটা শিখিয়েছে!
আমি ভাতের গ্রাসের দিকে মন খারাপ করে তাকিয়ে থাকি।
আম্মু হাসতে থাকে।
-তুই কে কীভাবে সাঁতার শিখছে তার উপর থিসিস করার চে’ মন দিয়ে শিখতে চেষ্টা কর। শিখে যাবি ক’দিনেই। দেখিস!
আমি এক্যুরিয়ামের মাছগুলো মনযোগ দিয়ে দেখি। ক্ষুদে মাছগুলো কখনো কখনো একদম স্থির ভেসে আছে পানিতে। একটু একটু করে পাখা নাড়ে। আবার সাঁতার কাটে…… অদ্ভূদ এক আত্নমগ্নতা। যেন ভীষন মগ্ন হয়ে যাওয়া নিজের ভিতর… পানি আর প্রান…দু’টোর সম্মিলনে ফুটে উঠে যেন শান্ত উচ্ছল বুদবুদ… প্রচন্ড উচ্ছল জীবনের উল্লাসের সাথে একই সময়ে কী করে ভীষন আত্নমগ্নতা ফুটে উঠতে পারে বুঝে আসেনা। ……মাছেরা কি সবচে সুখী?...... আমার মাথায় মাছ আটকে থাকে।
সাঁতারের ওখানে দুইটা আন্টি। একজন মোটকী আরেকজন শুটকী। মোটকী আন্টি ভীষন জদরাল মহিলা। আজকে যখন টিউবের জন্যে হাত বাড়ালাম, দেখি টিউবটা দূরে চলে গেল! ব্যাপার কী? পুল থেকে আরেকটু মুখ তুলে দেখি মোটকী আন্টি পাহাড়ের মত দাঁড়িয়ে আছেন। গম্ভীর গলা- ‘নো টিউব’।
-‘আন্টি প্লীজ!’
-উঁহু, ওভাবে তুমি সারাজীবনেও সাঁতার শিখতে পারবেনা।
আমার কে কু আকুতিতে ওনার মন গললনা একফোঁটা। নিজে নেমে এলেন পানিতে। বললেন- ‘পা পিছনে সোজা করে ছাড়িয়ে দাও। পুরো শরীরের ভর নিয়ে আসো দুই হাতের কনুইয়ে।…… হ্যা, এভাবে… কোমড়ের নীচে কিছুতেই ভর দিবানা। মনে রাখবা সাঁতারের প্রথম শর্ত- কোমড়ের নীচে একদম মাছের মত হালকা করে ছেড়ে দেয়া।…হ্যা, শরীর কিন্তু সোজা রাখো। মনে কর পানিটা একটা বিছানা… এইভাবে পা নাড়ো… পা নাড়ানোটা অটোমেটিক হবে। এবং পা যে নাড়াচ্ছো ওটা ভুলে যাও……’
মনে মনে গজ গজ করি। পা নড়ছে, অথচ ভুলে যাবো কী করে? তাহলেতো পা নাড়ানোই বন্ধ হয়ে যাবে!
‘…… এই দেখো, তুমি ভাসছো!’
বেশ অনেক্ষন পরে ওনার কথায় হুঁশ এল। আরে তাইতো!! আন্টি যে কখন হাত সরিয়ে নিয়েছেন টেরই পাইনি! মাগো! আমি পানিতে ভাসছি!!!! একটু বেশীই খুশী হয়ে গিয়েছিলাম, সাথে সাথে ভুশশশশশ! দুই ঢোক পানি গিলে, হাচড়ে পাচড়ে সোজা হয়ে দাঁড়াতেই, ‘ এ জন্যেই এতক্ষন বলিনি। শোনো মেয়ে, সাঁতার হচ্ছে মনের ব্যাপার। এতক্ষন কিন্তু তুমি ভেসে ছিলা নিজেই, যেই তোমাকে আমি বললাম, তুমি ডুবে গেলে!... লেটস স্টার্ট এগেইন, আসো… হ্যা, আমার হাত ধরো, সোজা রাখো হাত একদম স্থির। পিছনে ঠেলে দাও, সাব্বাশ! ভেসে থাকো। এবার আস্তে আস্তে পা নাড়ো……’
আন্টি হাঁটতে থাকে। ওনার হাত ধরে আমি সাঁতার কেটে কেটে ভাসতে থাকি। আমার নিজেরই বিশ্বাস হয়না, আমি পানিতে ভাসছি!!
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা জুলাই, ২০০৮ ভোর ৬:৩৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



