somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সিএনএনের ওয়েব পেইজে বাংলাদেশী পনের বছর বয়সী মা এবং মাতৃত্ব

১৩ ই সেপ্টেম্বর, ২০০৮ বিকাল ৫:০১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


সেদিন একটা বিষয়ে ডাটা বের করতে গিয়ে ‘বাংলাদেশ’ কী ওয়ার্ড দিয়ে গুগলে সার্চ দিয়েছিলাম। বিভিন্ন সাইটে ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ একটা পৃষ্ঠায় চোখ আটকে গেল। ঠিক আমাদের দেশের গ্রামের মেয়েদের মত একটা মেয়ে ছোট একটা বাচ্চা কোলে নিয়ে বাচ্চাটার দিকে তাকিয়ে আছে। ছবিটাতে এমন কোনো বিশেষত্ব নেই যে চোখ আটকাবে। কিন্তু তারপরও চোখ আটকালো, কারন ছবির মেয়েটার চেহারা এশিয়ান। দেশের বাইরে এলেই কেনো যেনো অবচেতন মনে চোখ সারাক্ষন বাংলাদেশী চেহারা খুঁজতে থাকে। সিডনীতে আসার পর আমি আর নিশু (আমার ফ্ল্যাটমেট) রাস্তায় বের হয়ে এশিয়ান চেহারা দেখলেই বাজি ধরতাম কোনটা বাংলাদেশী আর কোনটা বাংলাদেশী না। ছবির মেয়েটার এশিয়ান চেহারা দেখে হয়তো সেজন্যেই আনমনে ক্যাপশনের দিকে তাকালাম। এবং সাথে সাথে হেলান দেয়া থেকে ঝট করে সোজা হয়ে উঠে বসলাম। কারন ক্যাপশনে লিখা- A 15-year-old mother holds her 9-day-old baby in Bangladesh, where 153,000 newborns die each year. তাড়াতাড়ি ওয়েব সাইটের এড্রেসের দিকে তাকালাম। সিএনএন ডট কম, হেলথ সেক্টর। মনটা আরো খারাপ হল। কারন নিঃসন্দেহে ছবির নয় দিনের বাচ্চা কোলে পনের বছর বয়সী রোগা মেয়েটা এবং ছবির নীচের ক্যাপশনটা বাংলাদেশের অন্যতম নেগেটিভ সাইড। সিএনএনের মত আন্তর্জাতিক সাইটে নিজের দেশের নেগেটিভ কিছু দেখে কারো নিশ্চয়ই খুশী লাগবেনা। খবরটাকে যে উন্নত বিশ্বের মিডিয়ার তৃতীয় বিশ্ব নিয়ে অতিরঞ্জিত ফ্যান্টাসী বলে উড়িয়ে দিবো তারও কোনো উপায় নেই। কারন ছোটকাল থেকে আমি নিজে দেখে এসেছি আমাদের দেশে মাতৃত্বজনিত অবস্থায় অধিকাংশ মা আর শিশু কী ভয়ংকর অবস্থার মধ্য দিয়ে যায়।

আমার দাখিল পরীক্ষা চলাকালীন অবস্থায় একদিন সন্ধ্যায় হঠাৎ করে বাসার মেইন দরজায় প্রচন্ড শব্দে ধাক্কা। তাড়াহুড়ো করে দরজা খুলে দেখা গেলো আমাদের গ্রামের এক লোক। নীচে গলিতে টেক্সিতে রাখা তার বউ রক্তে ভেসে যাচ্ছে। ভদ্রমহিলা প্রসব বেদনায় কাতরাচ্ছে। দু’দিন ধরে তার প্রসব বেদনা চলছে, গ্রামের দাই-মহিলা দুইদিন চেষ্টার পর হাল ছেড়ে দিয়েছে। এখন ভদ্রমহিলার ব্যাথায় গলা দিয়ে আওয়াজ করারও আর শক্তি নেই। আমার মনে আছে, আম্মু কোনোরকমে বাসার কাপড়েই তৈরী হয়ে মহিলাকে নিয়ে হসপিটালে দৌঁড় লাগিয়েছিল সেই মুহূর্তেই। হয়তো ভদ্রমহিলার কপালে মৃত্যু ছিলনা বলেই এত অমানবিক কষ্টকর পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাওয়ার পরও সে বেঁচে গিয়েছিল, কিন্তু আমাদের দেশের বেশীরভাগ মহিলাই তার মত সৌভাগ্যবান হওয়ার সুযোগ পায়না। বংগবন্ধু মেডিকেল কলেজের প্রফেসর ডক্টর সাবেরা খাতুন জানান, যেখানে উন্নত বিশ্বে এমএমআর (মেটারনিটি মরটালিটি রেইট- মাতৃত্বজনিত মৃত্যু হার) গড়ে লাখে সর্বনিম্ন সাত থেকে সর্বোচ্চ চল্লিশজন, সেখানে শুধুমাত্র বাংলাদেশে গড়ে লাখে তিনশ বিশজন এবং বাংলাদেশে প্রতি ঘন্টায় মাতৃত্বজনিত কারনে মারা যায় তিনজন।(তথ্য- বাংলাদেশনিউজ ডট কম)।

এখনো গ্রামে অনেক সময় প্রসব বেদনায় চিৎকাররত মা’কে খাটের পায়ার সাথে চারদিকে বেঁধে বাচ্চা হওয়ার জন্য অপেক্ষা করা হয়। আমার একজন খুবই নিকট আত্নীয়া মারা যাওয়ার অন্যতম কারন ছিলো, সাতমাসের গর্ভবতী অবস্থায় প্র্যাগনেন্সি সংক্রান্ত কারনে যখন তার খিঁচুনী শুরু হয়ে গিয়েছিল, বাড়ির সবাই তাকে ‘জ্বীনে ধরেছে’ বলে হাসপাতালে নেয়নি! এখনো গ্রামে প্রচুর গর্ভধারিনীকে ‘আঁতুর ঘর’ নামের একটা অস্বাস্থ্যকর ছোট রুমে ছালার উপর রাখা হয়। এসব আমার শহর থেকে হঠাৎ হঠাৎ গ্রামে বেড়াতে গিয়ে দেখা গুটিকয়েক অভিজ্ঞতা মাত্র। বাস্তবতা এরচে’ আরো অনেক মারাত্নক ও ভয়ংকর। আর এসব কারনেই মা ও শিশু মৃত্যু হার হ্রাসের ক্ষেত্রে পৃথিবীর যে ৬৮ টি দেশ এখনো পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ তার একটি।

শুধু গ্রাম নয়, মাতৃত্ব সংক্রান্ত দুঃখজনক জটিলতা শহরেও কম যায়না। সিডনী আসার ক’দিন আগে এক আত্নীয়াকে দেখতে গিয়েছিলাম চট্রগ্রাম মেডিক্যাল হসপিটালে। সরকারী হাসপাতালের সকরুন বাস্তবতার রেশ ধরেই এত বড় হাসপাতালে লিফটে উঠতে গিয়ে দেখি লিফট নষ্ট! খুঁজে খুঁজে পরবর্তী লিফটের সামনে গিয়ে দেখি ঠিক পাবলিক বাসের মত ধাক্কাধাক্কি করে ঠেসে মানুষ ঢুকছে লিফটের ভিতর! অতএব শেষ ভরসা সিঁড়ি। চারতলার ল্যান্ডিং-এ পা দিতেই দেখি নীচ থেকে খুব একটা শোরগোল উঠে আসছে। কৌতুহলী হয়ে উঁকি মেরে দেখি এক ডেলিভারী রোগীকে তিন চারজন জাপটে ধরে কোনোমতে টেনে-হিঁচড়ে তুনে আনছে সিঁড়ি বেয়ে। মহিলার সাথে সাথে সিঁড়ি দিয়ে উঠছে রক্তের বড় বড় ফোঁটা ফোঁটা দাগ। কোথায় স্ট্রেচার, কোথায় রোগীর জন্যে ইমার্জেন্সী লিফট, কোথায় কী!
লেবার ওয়ার্ডে গিয়ে দেখি আরেক কেয়ামত। একটা বেডও খালি নেই। নীচে ফ্লোরে পর্যন্ত রোগীতে ভরা। রুমের বাইরে বারান্দাও ব্লক হয়ে আছে রোগী আর রোগীর আত্নীয়-স্বজনে। হৈ-চৈ, চিৎকার-চেঁচামেচি, রোগীর কান্না সব মিলিয়ে সুস্থ মানুষও অসুস্থ হয়ে পড়বে এখানে বেশীক্ষন থাকলে। তারউপর আছে আয়া আর কর্মচারীদের প্রচন্ড দূর্ব্যবহার। আমার চোখের সামনেই নার্স এসে মাত্র বাচ্চা হওয়া এক মহিলার কাপড় এমনভাবে সবার সামনে চেইঞ্জ করে দিল যে, মহিলা লজ্জায় কেঁদে ফেললেন। কাঁদলেন কেনো, সে জন্যেও কর্কশ ভাষায় তাকে শুনতে হল- ‘সরকারী হসপিটালে আসার সময় লজ্জা শরম বাসায় রেখে আসতে হয় জানেন না?’ একজন সদ্য-প্রসূত সন্তানধারিনীর উপর এ ধরনের মানসিক অত্যাচার যে খুবই সাধারন ব্যাপার তা অবশ্য কিছুক্ষনের মধ্যেই টের পেয়েছিলাম।

আমি নিজে এ ধরনের তিক্ত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছিলাম আমার ক্লাসমেট তমার (সংগত কারনেই প্রকৃত নাম গোপন করা হল) প্রথম বাচ্চা হওয়ার সময়। চট্রগ্রাম ম্যাটারনিটিতে ওর যখন পেইন উঠে, তখন ওর পাশে ওর হাসবেন্ড আর আমরা দুইজন ক্লাসমেট ছাড়া ওর আর কেউ ছিলনা। পারিবারিক কোনো একটা সমস্যার কারনে ওর নিজ বাবামা সেসময় উপস্থিত ছিলেন না। এম্নিতেই প্রথম বাচ্চা, তারউপর রক্তের সম্পর্কের কেউ পাশে নেই, বিশেষ করে মা, তাই স্বাভাবিক ভাবেই ও একদম ভেংগে পড়েছিলো। সেই অবস্থাতেই বাচ্চা হওয়ার পর ডেলিভারী রুম থেকে কেবিনে ফেরত আনার সময় নার্সরা ওকে যেভাবে টেনে হিঁচড়ে উঠাচ্ছিল আর ও ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল ব্যাথায়, তা জীবনেও হয়তো ভুলা সম্ভব হবে না আমার পক্ষে। আমি প্রতিবাদ করায় নার্স একটা এমন জোড়ে ধমক দিয়েছিল যে তমা নিজেও ভয়ে জোড়ে পর্যন্ত কাঁদার সাহস পাচ্ছিলনা। নার্সের সোজা কথা- ‘রোগীরে কেমনে নিয়া যাইতে হয় আমরা জানি। শিখাইতে আইসেন না। আপনে আমাদের থেকে বেশী জানলে নিজে আলগাইয়া নিয়া যান’!

ওয়েস্টার্ন লাইফের প্রচুর নেগেটিভ সাইড আছে যা শুধু তাদের নিজেদের জন্যেই না, বরং সমগ্র মানব সভ্যতার জন্যে ক্ষতিকর। কিন্তু তাদের যেসব পজেটিভ সাইড আছে, তার মধ্যে মাতৃত্বের প্রতি সম্মান বেশ লক্ষ্যনীয়। সিডনীর রাস্তায় হাঁটার সময় আমি প্রায়ই দেখি গর্ভবতী মায়েরা সহজ সাবলীল ভাবে হেঁটে চলে যাচ্ছে। আশেপাশের সবাই সতর্কভাবে তাকে পথ করে দেয়। গর্ভবতী মহিলা বা বাচ্চা সাথে মহিলা বাসে উঠার সময় বাস ড্রাইভার বাসের দরজা দিয়ে উঠার পা-দানী সুইচ টিপে উঁচু থেকে মাটির লেভেলে নামিয়ে দেয় যেনো সে মহিলার উঠতে কোনো রিস্ক না থাকে। বাসে এবং ট্রেনে বাধ্যতামূলক স্পেশাল সিট থাকে বাচ্চা সাথে মহিলা, গর্ভবতী মহিলা, বয়স্ক এবং প্রতিবন্ধীদের জন্যে।

মাতৃত্ব পৃথিবীর সবচেয়ে জটিল, রহস্যময় এবং সেনসিটিভ বিষয়, যার একচেটিয়া ভার পুরোটাই মেয়েদের উপর। চাষী ছাড়া যেমন একটা জমি আবাদ হয়না, তেমনি মেয়েরা যদি একযোগে মাতৃত্বকে অস্বীকার করে বসে, তাহলে পৃথিবীর আবাদীকরন প্রক্রিয়া থেমে যেতে বাধ্য। অথচ একটা মেয়ে তার পুরো জীবনের রিস্ক নিয়ে বিপুল অমানুষিক কষ্টের মধ্য দিয়ে এই আবাদীকরন প্রক্রিয়া চালু রেখে যায়। তার সে অসামান্য অবদানকে যদি নিরাপদ এবং সম্মানজনক না করা যায়, তাহলে কোনোক্রমেই সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব নয়।

২০টি মন্তব্য ১৯টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে আব্বাসীদের জন্য হুমকি হয়ে আসছে- কী হবে খালেদ মহিউদ্দিনের?

লিখেছেন হিমন, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৫০

হোমো ইরেক্টাসদের প্রায় বিশ লাখ বছর আগের আগুনের ব্যবহার থেকে শুরু করে ছয় হাজার বছর আগের চাকা আবিষ্কার, ১৮৩১ সালের বিদ্যুৎ, গত শতাব্দীর অ্যান্টিবায়োটিক, আর এই সেদিনের ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন—... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×