মোহাম্মাদ হোসেইন।
ইয়া মোটা ভ্রু, ট্র্যাডিশনাল মোচ আর দাঁড়ি, কালো চোখের মনি। আফগান এবং কবি। আমার তার কবিতা পড়ার সৌভাগ্য হয়নি বটে, কিন্তু যখনি জেনেছি তিনি কবি ছিলেন, আলাদা একটা সম্ভ্রম জেগেছে। মুহুর্মূহু গোলা আর কামানের আওয়াজ ভর্তি আফগানের মাটিতে ফুল, নারী আর প্রকৃতির কবি হওয়া তো চাট্টিখানি কথা নয়। কিন্তু কবির দূর্ভাগ্য, অস্ট্রেলিয়ান হাভার্ড গভার্নমেন্ট তার রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা নাকচ করে দিয়ে ফেরত পাঠিয়েছিলো পৃথিবীর অন্যতম এক্সট্রিমিস্ট বর্বর দল তালেবানদের অধীন আফগানিস্তানে। এবং কবির নাসারা আর কাফের(!)-দের দেশ অস্ট্রেলিয়ায় পালাতে চাওয়ার খায়েশ(!) চিরতরে মিটিয়ে দিয়েছে তালেবানরা। তার নিজ পরিবারের সদস্য সহ অসংখ্য দর্শনার্থীর সামনে পরিত্যক্ত কুয়ার ভিতর জীবন্ত ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে তার ভিতর গ্রেনেড ফাটিয়ে মোহাম্মাদ হোসেইনের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে!
একপক্ষ সাথে সাথেই মুখ আর কলম চালিয়ে তালেবান সরকারের গোষ্ঠী উদ্ধার করেছে। এতটুকু করলে আপত্তি ছিলোনা, কিন্তু সমস্যা বাঁধলো যখন তালেবানদের পাশাপাশি তারা ইসলামকেও টেনে আনলেন। এইপক্ষের উত্তর দিতে লেগে গেলেন আরেক পক্ষ। তালেবানরা যে ইসলামকে ব্যবহার করছে তাই বুঝিয়ে বলতে ব্যাস্ত হলেন তারা। ধর্মকে ব্যাবহার করে কেউ যদি পিশাচ হয়, তখন পিশাচের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো প্রয়োজন, ধর্মের বিরুদ্ধে নয়। এরমাঝামাঝি আবার দেখলাম ছোটখাটো আরেকপক্ষ তালেবানদের পক্ষেও বলছেন। মিডিয়ার ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে, এমেরিকান সৈন্য কর্তৃক তালিবান সেজে আসলে তালেবানদের ইমেজ নষ্ট (!!)করতে এমেরিকাই যে এসব ঘটাচ্ছে তা প্রমান করতে পারলেই যেনো তাদের শান্তি!! তারা এই ফাঁকে তালিবান সরকারের আন্ডারে আসলে মানুষ যে কত শান্তিতে (????) আছে, তার কাহিনীও কিছুটা বর্ণনা করার প্রয়াস পেলেন।
বিপদে পড়ে গেলাম আমি। আমার চোখের সামনে গ্লেন সাহেবের তোলা মোহাম্মদ হোসেইনের ছবিটাই খালি ভাসে। অসহায় চোখে তাকিয়ে কবি তখন জীবনের অ-নিরাপত্তার কথাই ভাবছিলেন হয়তো। বার বার আকুতি করেছিলেন সবার হাত ধরে, ‘একটু বাঁচার মত জায়গা দাও, ওরা আমাকে মেরে ফেলবে!’ কিন্তু এত বড় পৃথিবীতে কবি’র জায়গা হলনা। নৃশংসভাবে মরতে হল। পৃথিবীর একজন বাসিন্দা হিসেবে আমি তাই মনে মনে কবি’র কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করি। সব পক্ষ-বিপক্ষ বাদ দিয়ে, পৃথিবীর সব রাষ্ট্রের আর ধর্মের সীমানা পেরিয়ে, কবির বেঁচে থাকার জন্যে আকুতি ভরা চোখ দু’টোই কেবল ভেসে থাকে আমার চোখের সামনে।
Click This Link
বাংলাদেশে শহরে-গ্রামে মরে পড়ে থাকা কোনো নারী-লাশের ছবি অস্বাভাবিক কিছু নয়। একেকজন লাশ দেখে একেক সম্ভাবনার কথাই বলে, ‘শ্বাশুড়ি ননদ মিলে মেরে ফেলছে মনে হয়!’ ‘ধুর না যৌতুকের জন্যে জামাই নিজে মারছে’। ‘তোরা কেউ জানস না, রাতের আন্ধারে সবাই মিল্যা মারছে!’ আসলে কে মেরেছে তাই নিয়ে বিতর্ক হয়। নিজের মত প্রতিষ্ঠিত করতে না পেরে কেউ বিরক্ত হয়, আবার কেউ দ্বিগুন উৎসাহে নতুন তর্কে জড়ায়।
মরিচা গ্রামের রুবি বেগমও ঐরকম খরচ হয়ে যাওয়া গৃহবধুদের খাতায় নাম লিখিয়েছিলেন নয়ই অক্টোবর রাতে। পরদিন হয়তো সামান্য একটা দুই লাইনের খবর আসতো বিভিন্ন দৈনিকের ‘গ্রাম ও জনপদ’ পাতায়, আমরা সবাই নিতান্ত অবহেলায় খবরটার উপর একটু চোখ বুলিয়েই ভুলে যেতাম; কিন্তু গ্রাম জনপদ থেকে এই সামান্য খবরই বুকের ঠিক মাঝখানে ছুরি মেরে বসলো যখন ছবি বেরুলো- মৃত মায়ের লাশের শাড়ির নীচে মুখ ঢুকিয়ে বুকের দুধ খুঁজছে ক্রন্দনরত অসহায় একবছরের বাচ্চা জনি!
শুধুমাত্র এক ছবির জোড়ে সাধারন মৃত্যু অসাধারন হয়ে উঠলো। ফটোগ্রাফার আরেকটু পরে গেলেই হয়তো এই অসামান্য ছবি মিস হয়ে যেতো- ফিসফিসিয়ে তাই বললেন অনেকে। অনেকেই জনির জন্যে উৎকন্ঠিত হলেন। আবার অনেকে এর বিচার দাবী করলেন যথারীতি। এবং বাকীরা এই মৃত্যুর বিচার যে হবেনা, তা নিশ্চিত হয়ে হতাশায় ডুবে গেলেন।
আর আমি ব্লগ থেকে পাওয়া রুবি বেগমের ছোট ছবিটা জুম করে বড় করে মৃত রুবি বেগমের চেহারায় আঁতিপাতি করে কিছু খুঁজি। ওরা যখন রুবি বেগমকে মেরে ফেলার জন্যে চেপে বসেছিলো তার উপর, রুবি বেগম যখন বুঝতে পারছিলেন এই তার শেষ নিঃশ্বাস, তখন তিনি কি ছোট্ট জনিকে আঁকড়ে ধরতে চেয়েছিলেন? তখন তিনি কি মৃত্যু যন্ত্রনার চে’ও অন্য কোনো তীব্র কষ্টে জনির মুখের দিকে একবার তাকাতে পেরেছিলেন? তখন কি তার চোখের কোনে পানি গড়িয়ে পড়েছিলো এই ভেবে যে ‘এই অন্ধকার রাতে ওরা আমাকে মেরে জনিকেও কী মেরে ফেলবে?’
রুবি বেগমের শেষ মুহূর্তে বাঁচতে চাওয়ার চরম আকুতি তার লাশের পড়ে থাকার ভংগিতেই স্পষ্ট। শাড়ি হাঁটুর উপর তোলা। দুই হাঁটু বেঁকে আছে। দুই হাত ছড়ানো দুই দিকে। একটু কাত হয়ে থাকা শরীরে একপাশের বুক থেকে সরে গেছে কাপড়ের লজ্জাচ্ছাদন, জনি যেখানে খুঁজে ফিরছিলো মায়ের বুকের খাবার।
রুবি বেগমের মৃত্যুর বিচার আর দশটা কেসের মতই বাতাসে মিলিয়ে যাবে, কয়েকটা পুলিশের ভুড়ি ঘুষের টাকায় আরেকটু উঁচু হবে, জনিও কোনো না কোনোভাবে বেঁচে থাকবে, বড় হবে, কিন্তু পুরো পৃথিবী মিলেও যদি প্রায়শ্চিত্য করে, তাও কি একবিন্ধু কমাতে পারবে রুবি বেগমের মৃত্যুর কষ্ট?
Click This Link
আ’ইশা ইবরাহীম। সোমালিয়ান তেরো বছরের মেয়ে। ওর দূর্ভাগ্য ও সোমালিয়ায় জন্মেছিলো, তাও এমন এক এলাকায় যা নিয়ন্ত্রন করছে তালেবানদেরই সহোদর গ্রুপ ‘আল শাহাব’ মিলিশিয়া। তিনজন নরপশু তাকে ধর্ষন করলো। অসহায় বাবা বিচারের আকুতি জানিয়ে দ্বারে দ্বারে ঘুরলেন, ব্যার্থ জন্মদাতার বিচার চাওয়াই কাল হলো। ধর্মকে ঢাল বানিয়ে নতুন ফতুয়া দিয়ে তের বছরের বালিকাকে টেনে হিঁচড়ে বেঁধে নিয়ে আসা হল স্টেডিয়ামে। শত শত মানুষের সামনে গর্ত খুঁড়ে তাকে বুক পর্যন্ত মাটি চাপা দেয়া হল। ট্রাক ভর্তি করে আনা হল পাথর। সবাই নির্বিচারে পাথর মারলো তাকে। রক্ত গড়ালো তার মাথা বেয়ে, বুক বেয়ে, গলা বেয়ে, চোখ বেয়ে, নাক বেয়ে। ব্যাথায়, কষ্টে, লজ্জায়, ঘৃনায় আর দুঃখে সে চিৎকার করে কেঁদেছিলো। পৃথিবীকে অভিশম্পাত দিয়েছিলো। পাথরের অবিরাম আঘাতে মরতে মরতে মরার আগেই তাকে মরতে হয়েছিলো হাজারবার। হাজার হাজার দর্শনার্থীর মধ্যেও কিছু মানুষ ছিলো! প্রতিবাদ করতে গিয়ে তাদের মধ্যে এক যুবকও গুলি খেয়ে মরলো।
অতি চমৎকার অস্ত্র না চাইতেই চলে এলো এক পক্ষের কাছে। ধর্মের চৌদ্দগোষ্ঠী উদ্ধার করে তারা মুখে ফেনা তুলে ফেললেন। পৃথিবীতে যত অত্যাচার-অনাচার হয়েছে তার অধিকাংশই ধর্মের কারনে এই অজুহাতে ধর্মকেই পারলে খুন করে ফেলেন তারা! অপরপক্ষ একে ‘সম্পূর্ণ অনৈসলামিক, ইসলামিক আইনে উলটা ধর্ষনকারীর সাজা হবে, এমনকি এই মেয়ে যদি এডাল্টারীও করতো তাও ইসলাম তাকে শাস্তি দিতে পারতোনা, কারন সে নাবালিকা! এতো পুরোপুরি বর্বর ঘটনা’; এই বলে তারা নিজেদেরকে ডিফেন্ড করলেন। যুক্তি পালটা যুক্তি চলতেই থাকলো। হয়তো মনের গভীর অঞ্চলে তারা এমন কোনো ঘটনার জন্যেই অপেক্ষা করছিলেন নিজেদের বুদ্ধিবৃত্তি প্রমান করার জন্যে। এমনেষ্টী ইন্টারন্যাশনালের এত চ্যানেল, এত শক্তি, এত পাওয়ার, ঘটনাকে কেউ থামাতে পারলোনা। কিন্তু ঘটে যাওয়ার ঠিক পরপরই আ’ইশা হয়ে উঠলো এমনেষ্টীর অন্যতম ইস্যু।
কিন্তু এদের সবার ইস্যু-ননইস্যুর ভীড় ঠেলে, পক্ষে-বিপক্ষে বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনা পর্যালোচনা ছাপিয়ে, আমার চারপাশে হাহাকার তুলে তের বছরের মেয়েটির না শোনা মৃত্যু-চিৎকার। অনলাইনে আঁতিপাঁতি করে খুঁজি আ’ইশা ইবরাহীমের ছবি। পাইনা। কিন্তু মনের ভিতর স্পষ্ট দেখি, তের বছরের এক মেয়ে কী প্রচন্ড কষ্টে বুক পর্যন্ত মাটি চাপা হয়ে পাথরের অবিরাম আঘাত খেতে খেতে একটু একটু করে মৃত্যুর দিকে আগাচ্ছে!
Click This Link
আমি সহ্য করতে পারিনা।
পুরো পৃথিবী অসহ্য হয়ে উঠে।
অসহ্য হয়ে উঠে মৃত রুবি বেগমের বুকে একবছরের জনির বুকের দুধ খোঁজার ছবি।
অসহ্য হয়ে উঠে মোহাম্মদ হোসেইনের অসহায় এবং আকুতিভরা চোখের বাঁচতে চাওয়ার মিনতি।
অসহ্য হয়ে উঠে আ’ইশা ইবরাহীমের তীব্র এবং তীক্ষ্ণ মৃত্যু-আর্তনাদ।
আমার নিজেরই চিৎকার করে এ পৃথিবীকে অভিশাপ দিতে ইচ্ছে হয়।
ইচ্ছে হয় সবাইকে শুনিয়ে গলা ফাটিয়ে বলি- ‘অমানুষের দল, তোরা ধ্বংস হ’!’

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



