এমেরিকায় চারতারিখ রাত আর অস্ট্রেলিয়ায় পাঁচ তারিখ সকাল। ঘুম ভাংতেই মোবাইলে এক বন্ধুর মেসেজ, ‘তাড়াতাড়ি টিভি খুলে দেখ্, শিকাগোতে কী অবস্থা!! খালি মানুষ আর মানুষ!’ টিভি খুলে দেখলাম ঠিক তাই। মানুষ যেনো গনহারে আসছে শিকাগো গ্র্যান্ট পার্কের দিকে। ব্লগে ঢুকেও দেখি সবার উত্তেজনা; মিনিটে মিনিটে লেটেস্ট খবরের আপডেট দিচ্ছে সবাই। এরমধ্যেই আরেক বন্ধুর উত্তেজিত ফোন ‘আরে দেখছোস কী অবস্থা?! তোর কী মনে হয়? ওবামা জিতবেতো?’ বন্ধুকে বললাম, ‘ওবামা জিতলে তোর কী লাভ বল দেখি? এত উত্তেজিত হচ্ছিস কেনো?’ বন্ধুর আরো দ্বিগুন উত্তেজিত গলা, ‘বলিস কী? আরে এমেরিকার নির্বাচন মানে পুরো পৃথিবীর নির্বাচন এইটা বুঝস্? দেখস্ নাই বুশ ক্যামন পুরা দুনিয়ার উপর রাজাগীরি ফলাইছে?’
উত্তেজিত বন্ধুকে খুঁচিয়ে তার উত্তেজনা আরো বাড়ানো সমিচীন মনে হলনা। কিন্তু মনের মধ্যে খুঁচখুঁচানী থেকেই গেলো। ওবামা জিতলে এমেরিকার পররাষ্ট্র নীতিতে কী আসলেই কোনো পরিবর্তন আসবে? ওবামা’র ‘ইয়েস উই ক্যান’ এর অর্থ ‘ইয়েস উই ক্যান কিল’ নাকী ‘ইয়েস উই ক্যান বিল্ড’? তার প্রচন্ড যাদুকরী শব্দ ‘চেইঞ্জ’ কী শুধুই ক্ষমতায় আসার চাল, নাকি আসলেই কিছু চেইঞ্জ আসবে? চেইঞ্জ আসলে সেই চেইঞ্জ কী ইহুদীদের চাপে শেষ পর্যন্ত ক্ষমতা সামলাতে নেগেটীভের দিকে আসবে নাকি চাপ সামলে পজেটিভের দিকে? একি সত্যিই রেসিজমের উপর মানবিকতার, যুদ্ধবাদী হায়েনাদের উপর শান্তিকামী সাধারন জনতার বিজয়; নাকি পর্দার অন্তরালের ‘ডার্টি-পলিটিক্স’- ইরাক, আফগানিস্তান দখল করা শেষ, পৃথিবীর বৃহৎ-অংশের তেলের মজুদ দখল করা শেষ, এখন পৃথিবীর মানুষের এমেরিকাকে থুথু মারার মানসিকতার পরিবর্তনের জন্যে ক্ষমতায় একটা কালো মানুষ এনে দুনিয়ার মানুষের চিন্তার গতি ঘুরিয়ে দিয়ে কিছুদিনের জন্যে এমেরিকার পররাষ্ট্রনীতির বিশ্রামগ্রহন?!
পর্দার অন্তরালে সে যাই হোক না কেনো, ওবামা জিতে গেলো। প্রচন্ড উত্তেজনায় যারা পারলে টিভির ভিতর দিয়ে গিয়ে ওবামাকে জড়িয়ে ধরে তারা নিজেরা নিজেরাই জড়াজড়ি করলো। সে উত্তেজনা আমার মধ্যেও সংক্রমিত হল। টিভিতে ওবামা আর ম্যাককেইনের বক্তব্য শুনতে গিয়ে রান্না পুড়িয়ে ফেললাম! কিন্তু তাতে বাসার কেউ কিছু মনে করলোনা, কারন সবার প্রিয় ওবামা জিতেছে! একজন প্রতিবেশী বৃদ্ধ অস্ট্রেলিয়ান বললেন, ‘জীবনে এমন কিছু ঐতিহাসিক ইভেন্ট দেখেছি যা কখনো দেখবো বলে কল্পনাও করিনি। এক সোভিয়েট ইউনিয়ন ভেংগে টুকরো টুকরো হয়ে যাওয়া; দুই বার্লিন ওয়াল ভেংগে দুই জার্মানী এক হয়ে যাওয়া; আর তিন ওবামার বিজয়-এমেরিকার প্রেসিডেন্ট একজন ব্ল্যাক হওয়া!’ বৃদ্ধের কথায় বুঝলাম এইমাত্র আমি নিজেও ভীষন রকম এক ঐতিহাসিক ইভেন্টের সাক্ষী হলাম। কিন্তু আমাকে যদি জিজ্ঞেস করা হয়, এই ঐতিহাসিক ইভেন্টের সবচে আকর্ষনীয় দিক কী ছিলো, আমি বলবনা ‘প্রথম ব্ল্যাক প্রেসিডেন্ট হওয়া’, এও বলবনা ‘পরিবর্তনের জন্যে গনমানুষের ভোটের মাধ্যমে ত্রাহি আর্তনাদের বহিঃপ্রকাশ’; বরং বলব- ‘হেরে যাওয়া ম্যাককেইনের বক্তব্য’। হ্যা, একজন বাংলাদেশী হিসেবে এই পুরো ইভেন্টে আমার কাছে সবচে অবাক আর আশ্চর্যজনক লেগেছে ওবামার কাছে হেরে যাওয়া রিপাবলিকান প্রার্থী জন ম্যাককেইনের হাজার হাজার মানুষের সামনে শেষ বক্তব্য!
একজন রাজনীতিবিদের গোপন-সুপ্ত এবং সুদৃঢ় ইচ্ছা থাকে রাজনীতির সর্বোচ্চ আসনে আসীন হওয়া। সারাজীবনের দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ার সফলতার সাথে পাড়ি দিয়ে একদম ঠিক সময়েই ম্যাককেইন প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হয়েছিলো। সে প্রেসিডেন্ট হলে হয়তো তার মৃত্যুর পর ‘ওয়ান অব দ্য মোষ্ট সাকসেসফুল পলিটিক্যাল লাইভস’ শিরোনামে বই লেখা হত। কিন্তু তা হয়নি। তার শেষ বয়সের শেষ ইচ্ছেটা তছনছ করে শেষ করে দিয়েছে ওবামা। বলতে গেলে ম্যাককেইনের সফল রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের ব্যার্থ যবনিকাপাত হল ওবামার কারনেই। অথচ কোথায় তীব্র রাগের ছাপ, কোথায় হেরে যাওয়ার ক্লান্তি, কোথায় কী, নিপাট হাসিমুখে ভদ্রলোক শক্ত পায়েই স্টেজে উঠে এসে দৃঢ় গলায় বললেন, ‘……এমেরিকার জনগন স্পষ্টভাবে তাদের মতামত জানিয়েছে। সিনেটর ওবামাকে প্রেসিডেন্ট হওয়ার জন্যে অভিনন্দন জানিয়ে আমি সম্মানিত বোধ করছি।………. সিনেটর ওবামার জয় এটাই প্রমান করে যে এমেরিকা তার বর্বর এবং নিষ্ঠুর অতীতকে পিছনে ফেলে এসেছে।… আমাদের দেশ একটা চরম ক্রান্তিলগ্নের ভিতর দিয়ে যাচ্ছে, আমি আমার সর্বাত্নক শক্তি দিয়ে পরবর্তী প্রেসিডেন্টকে এই ক্রান্তিকাল দূরীকরনে সহায়তা করার অংগীকার করছি। আমি এমেরিকার প্রতিটি নাগরিককেও অনুরোধ করছি নিজেদের ভিতরের সমস্ত পার্থক্য এবং ভেদাভেদকে পেছনে ফেলে নতুন প্রেসিডেন্টের নেতৃত্বে আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যত নিরাপত্তার জন্যে দেশগঠনের কাজে যোগ দিতে।………’
ম্যাককেইনের বক্তব্য শুনতে শুনতে আমি আমার দেশের নির্বাচন পরবর্তী অবস্থার কথা চিন্তা করছিলাম। স্থুল নির্বাচন, সুক্ষ নির্বাচন, বানোয়াট নির্বাচন, সাজানো নির্বাচন- হাবিজাবি গালিগালাজের তুফান স্পস্ট শুনতে পাচ্ছিলাম। রাস্তাঘাটে আগুন জ্বলতে থাকা বাস/মোটরসাইকেল, মিছিলে মিছিলে উত্তপ্ত শহর-ঘাট আর দুই তিনটা লাশের রক্ত-ও যেনো দিব্যচোখে দেখতে পাচ্ছিলাম। জন্ম থেকে এই দেখে অভ্যস্থ আমার কাছে তাই পরাজিত প্রার্থীর দেশের স্বার্থকে সবচে বড় করে দেখার এই মানসিকতা ভীষন আশ্চর্যজনক লাগছিলো! অবশেষে সারাদিন দেশের কথা ভেবেই গেলো। ওবামা তার পররাষ্ট্রনীতি চেইঞ্জ করুক বা না করুক, সে তার দেশের জন্যে কাজ করবে এটা ধ্রুব সত্য। আর আমাদের নেতারা?! সেনাবাহিনী এদের সবাইকে পিটিয়ে মেরুদন্ড ভেংগে দিয়েছে, তাও স্বভাব বদলাতে পারেনি! এই ডিসেম্বরের আঠারো তারিখ নির্বাচন। এবং যথারীতি নির্বাচনের আগের মুখস্থ নাটক মঞ্চস্থ হচ্ছে বরাবরের মত। রাজনীতিতে কোনো নতুন মুখ নেই, নতুন আশা নেই। সব ম্যাককেইনের মত বুড়োর দল লোল চাটছে ক্ষমতার চেয়ারে বসার কল্পনা করে। আর যেই-ই ক্ষমতায় আসবে পুরানো উদ্যমে নতুন করে লুটেপুটে খাবে; বালিশের ভিতরে, বিছানার জাযিমের ভিতরে, মাটি খুঁড়ে ক্যাশ ক্যাশ টাকা লুকাবে; টাকার বিছানায় ঘুমাবে; আর হা-ভেতে গ্রাম্য পেটের সাথে পিঠ লেগে আসা কৃষকের দল আবার পরবর্তী নির্বাচনের জন্যে মার খেতে খেতে জমি প্রস্তুত করবে! রাজনীতিবিদদের হাতে মার খেয়েই দিন কাটানোর কী এক অদ্ভূদ চক্রে আটকে গেছে দেশের মানুষগুলো!
তারেক জিয়াকে প্রথম যখন রাজনীতিতে আনা হল, মার খাওয়া মানুষ খড়কুঁটো আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকার চেষ্টার মত তারেক জিয়াকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতে চেষ্টা করেছিলো। সুদর্শন এই যুবকের চেহারায় প্রয়াত পিতার দেশপ্রেমের ছাপ খুঁজে বের করতে চেয়েছিলো। কিন্তু সে স্বপ্ন ভংগ হতেও বেশীদিন লাগেনি। দেশপ্রেম তো অনেক দূরের কথা, ক্ষমতাসীন সরকারের সমান্তরালে আরেক গোপন সরকার চালিয়ে ‘সেকন্ডম্যান’ খেতাব পান তিনি। দরিদ্রের দারিদ্রতাকে বেঁচে দিয়ে যা কামিয়েছেন তাই খেয়ে খেয়ে তার যুবক শরীরে ভুড়ি গঁজিয়ে বৃদ্ধ খেলিয়েদের সাঁড়িতে যোগ দেন। মানুষের ঐ ক্ষীন স্বপ্নকে তারেক জিয়া মূলত লাথি মেরে গুঁড়িয়ে দেন। শিকাগোর গ্র্যান্ট পার্কে প্রেসিডেন্ট হিসেবে মেরুদন্ড সোজা করে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে হাত নাড়তে থাকা বারাক ওবামা আমাকে বার বার তারেক জিয়ার কথাই মনে করিয়ে দেয়। তারেক জিয়া যদি খাদক না হয়ে প্রকৃতই সেবক হত, তার নিজ থেকে প্রাইম মিনিস্টার হতে হতোনা, দেশের মানুষই মাথায় করে তাকে প্রাইম মিনিস্টার পদে বসিয়ে দিতো। কারন দেশের মানুষ অনেক মার খেয়ে, অনেক ত্যাক্ত হয়েই তাকে দেখে নতুন স্বপ্ন বুঁনেছিলো। আমার হঠাৎ করে দুঃখ লাগলো তারেক জিয়া বারাক ওবামা হতে পারলোনা বলে! উলটো রাস্তার কুকুরের মত এখন মার খেয়ে পড়ে আছে হসপিটালে।
প্রতিটা নিউজ চ্যানেল, প্রতিটা স্ক্রীনে এখনো বারাক ওবামার খবর। এবং বারাক ওবামার সাথে প্রাসংগিকভাবেই যেসব নাম চলে আসছে তাদের একজন হলেন মার্টিন লুথার কিং। কিংবদন্তি এই মহানায়ক বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়তে লড়তেই প্রান দিয়েছেন। বারাক ওবামার পূর্বসুরী এই মহানায়কের সবচে বিখ্যাত উক্তি ছিলো, ‘আই হ্যাভ আ ড্রীম। …… আমি একটি স্বপ্ন দেখি।… আমি স্বপ্ন দেখি একদিন আমার চারসন্তান এমন এক দেশে বাস করবে যেখানে তাদের গায়ের রঙ দিয়ে বিচার করা হবেনা, বিচার করা হবে যোগ্যতা দিয়ে। আমি স্বপ্ন দেখি একদিন দাসের সন্তান আর সেই দাসের মালিকের সন্তান একই চেয়ারে পাশাপাশি বসবে……’। অনলাইনে খুঁজে খুঁজে মূল বক্তব্যটি বের করলাম। বক্তব্যের প্রতিটা লাইনে মার্টিন লুথার কিং’র স্বপ্ন আমাকে আমার দেশের সাধারন মানুষের স্বপ্নের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছিল। লুথারের দেখা ১৯৬৩ সালের সেই স্বপ্নের বাস্তব রুপায়ন আজকের বারাক ওবামা।কিন্তু মার্টিনের স্বপ্নের মাত্র সাত বছর পর ১৯৭১ সাল থেকে বাংলার মানুষ জনগনের প্রতিনিধিত্বকারী যে সুস্থ শাসন-ব্যবস্থার স্বপ্ন দেখে আসছে, তার জন্যে আর কতবছর অপেক্ষা করতে হবে??

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



