কেউ যদি আমাকে জিজ্ঞেস করে ‘তোমার প্রিয় টীচার কে?’; একদম নিশ্চিত আমি খেই হারিয়ে ফেলবো। এত্তগুলো প্রিয় টীচার, কাকে রেখে কার কথা বলবো?! একদম পিচ্চি কালে ক্লাস ফাইভের বৃত্তির জন্যে শফি হুজুর আর কাশেম স্যারের প্রতিটা দিন, উইকডে’জ অথবা উইকেন্ড, বাসায় এসে জোড় করে পড়তে বসানো, যাদের অবদানে ক্লাস ফাইভ, এইট আর দাখিলে স্কলারশিপ পাওয়া। এমনকি আলিমে পর্যন্ত যখন ফিজিক্স কিছুতেই মাথায় ঢুকেনা, পাগল হয়ে যাচ্ছি ফিজিক্সের যন্ত্রনায়, বয়স হয়ে যাওয়া কাশেম স্যারের তখনো মায়া, ‘আচ্ছা আসো দেখি, আমি তোমার মাথায় ছিদ্র করে ঢুকাতে পারি কিনা!’ অদ্ভূদ ব্যপার, যে কেমিস্ট্রিতে অবশ্যই লেটার পাবো বলে ধরে ছিলাম, সেই কেমিস্ট্রিতে না এসে লেটার আসলো ফিজিক্সে!
শফি হুজুর কোনো বেতন টেতনের তোয়াক্কা না করেই চলে আসেন বাসায়, ‘তাড়াতাড়ি আসো, আমার কাছে মাত্র পনের মিনিট আছে, এতদিনেও তোমাকে আরবী’র মজাটা বুঝাতে পারলাম না!’ যেদিন প্রথম কোনো এক বাই-এন্যুয়াল সিরিমনিতে এরাব গেস্টদের সুবিধার্থে জীবনে প্রথম এরাবিকে ছোট্ট একটা স্বাগত বক্তব্য দিয়েছিলাম স্টুডেন্টদের পক্ষ থেকে, বার বার মনে পড়ছিল শফি হুজুরের কথা।
শাহওয়ালীউল্লাহ’র আইয়ুব স্যারের ক্লাস গম গম করে ডেকে উঠা ‘মা’; অস্থির আমাকে স্থির বানাতে হামিদ স্যারের কথায় কথায় ছড়া ‘ফারজানা/ এত বেশী নড়াচড়া করিস না!’; আরাফাত আমাকে ক্লাসে চেয়ার ছুঁড়ে মেরেছিল, কাঁদতে কাঁদতে স্কুল ফাটিয়ে ফেলেছিলাম, তাহের স্যারের আরাফাতকে মারতে মারতে বেত ভেংগে ফেলা; আর স্কুলের শহীদুল্লাহ স্যারের কাছে বাসায় আমাদের ভাই বোনদের কোর’আন পড়তে শেখা।
মনে আছে, একবার শহীদুল্লাহ স্যারকে শুধুমাত্র দাঁড়ি-টুপির কারণে রাতের অন্ধকারে দূর্বৃত্তরা ধরে বেঁধে ঘাস দিয়ে পেঁচিয়ে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিলো! স্যার অনেকদিন পড়াতে আসতে পারেননি, হসপিটালে ছিলেন। স্পষ্ট মনে আছে আমি কিছুতেই বুঝে পাচ্ছিলাম না কেনো একটা মানুষ দাঁড়ি থাকলে আর টুপি পড়লে কেউ তাকে আগুন্ ধরিয়ে মেরে ফেলতে চাইবে! আম্মুকে বারবার জিজ্ঞেস করছিলাম, ‘আব্বুরও তো দাঁড়ি আছে! নানাভাই’রওতো দাঁড়ি আছে! ওদেরকেও কি আগুন্ ধরিয়ে দিবে?!’ আম্মু কী উত্তর দিয়েছিলো মনে নেই, কিন্তু মানুষের হিংস্রতা’র যে চিহ্ন দেখেছিলাম শহীদুল্লাহ স্যারের চেহারায়, এক চোখ চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হওয়া স্যার যতবার পড়াতে আসতেন, স্যারকে দেখলেই আমার চরম মন খারাপ হতো।
সলিমা সিরাজে সিদ্দিক স্যার, যিনি প্রাণপনে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিলেন, আমাকে ইংলিশ শিখিয়েই ছাড়বেন! উলটো তর্ক বাঁধিয়ে দেই নেকাব আর বোরকা নিয়ে! স্যারের কথা, ‘ইংলিশে বলো, যা বলবা ইংলিশে বলো!’ স্যারের সাথেই আমার প্রথম তর্ক করতে শেখা, সে অবদানেই কি জীবনে যত এক্সট্রা কারিকুলাম একটিভিটজ’র পুরুষ্কার পেয়েছি তার আশি ভাগই ‘উপস্থিত বক্তব্য’ প্রতিযোগীতার?! হয়তো।
অথবা শাহনাজ আপা’র বায়োলজি ক্লাসে প্রথম যখন স্টেথোস্কোপ কানে লাগিয়ে ক্লাসমেটের নাড়ীর আওয়াজ শুনতে গিয়ে প্রথম ধুকপুক টা এত স্পষ্টভাবে কানে যেতেই প্রচন্ড ভয় পেয়ে কান থেকে স্টেথোস্কোপ টান মেরে খুলে ফেলে দিয়ে সভয়ে পিছিয়ে গিয়েছিলাম! শাহনাজ আপা হো হো করে হাসতে হাসতে গলায় আটকে গিয়েছিলেন, ‘তুই একটা নাড়ীর আওয়াজ শুনেই এমন ভয় পেলি?! তোকে দিয়ে জীবনেও ডাক্তারী হবেনা’! কেনো যে অমন ভয় পেয়েছিলাম প্রথমবার!
(বাকী অংশ পরের পর্বে)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

