
‘আগোরা’ মুভিটা ইমরান ভাই’র ফরোয়ার্ড করা মেইল থেকে পাওয়া। ২০০৯ এর শেষের দিকে মুক্তি পাওয়া, খ্রীষ্টিয়ান মহলে বেশ বিতর্কের ঝড় তোলা মুভিটা আজকে দেখি, কালকে দেখি করে করে বেশ অনেকদিন চলে যাওয়ার পর অনেকটা জিদ করেই বসে পরলাম, এবার দেখেই ছাড়ব। ………… দেখার শুরুতেই চমকে উঠলাম হাইপেশিয়ার ফিলোসফি আর ম্যাথস ক্লাসে সিরিনের সাথে প্যাগান আর খ্রীষ্ট ধর্ম নিয়ে ঝগড়া করতে গিয়ে এরেস্টিসের ঠাট্টা শুনে, ‘you should move out to the desert, you won’t hear anything to offend you out there!’ লাইনটা অনেকটা গুলতি থেকে ছুঁড়ে দেয়া মার্বেল বলের মত এসে মাথায় লাগলো, দারুন একটা কথা বলেছেতো ছেলেটা!......মুভি চলতে থাকে; সিরিন আর এরেস্টিসের তর্ক থামাতে গিয়ে হাইপেশিয়া বলে, “More things unite us than devide us”! থমকে যাই, আসলেই তো! আমরা এভাবে কেন চিন্তা করিনা? কোর’আনেই তো বলা আছে, let us come to the points which are similar between us!

মুভিটার একের পর এক চরম কথা আর উপলব্ধিগুলো ভাবার মত। আমি ভুলে যাই দিনের টু ডু লিস্ট, ভুলে যাই সুপারভাইজারকে এখনো একটা মেইলের রিপ্লাই দেয়া হয়নি, ভুলে যাই একটু আগে ক্ষুধা লেগেছিল, অস্কার বিজয়ী অভিনেত্রী র্যাচেল ওয়াইজ অভিনীত হাইপেশিয়া চরিত্রটি আমাকে যাদুর মত ধরে রাখে! কিছুতেই কসমস থিউরী মিলাতে না পেরে অস্থির হাইপেশিয়ার সাথে সাথে আমিও অস্থির হয়ে উঠি, ওর জানার তৃষ্ণা যেন আমারও বুকের ভিতর, ভৃত্য এবং বন্ধুকে নিজের আবিস্কৃত থিউরী বালুতে একে বুঝাতে গিয়ে উচ্ছসিত হাইপেশিয়ার সাথে সাথে আমিও যেন খুশীতে ঝলমল করে উঠি। কিন্তু যখন ধর্মের নামে অন্ধ হয়ে যাওয়া খ্রীষ্টিয়ান পাদ্রীদের “আন-গডলিনেস” আর “উইচক্রাফ”র অভিযোগ শুনে হাইপেশিয়ার ইস্পাত কঠিন চেহারার ভাবলেশহীন চোখ পলকহীনভাবে এরেস্টিস আর সিরিলের দিকে তাকায়- একসময়ের তার অন্যতম সেরা দুই স্টুডেন্ট- আমার চোখে পানি চলে আসে, ‘ভিন্ন চিন্তা’র প্রতি মানুষের এই আদিম জিঘাংসা’র কী কোনো শেষ নেই?!

থিঅন, একাধারে হাইপেশিয়া’র বাবা, বন্ধু এবং টীচার; সবাই যখন পরামর্শ দেয় এরেস্টিসের মত চমৎকার ছেলের হাতে নিজের মেয়েকে তুলে দিতে পারা যে কোনো মেয়ের বাবার ভাগ্য, সমাজের আর সব ক’জন বাবার মত ভাবেননি থিঅন, জ্ঞানের প্রতি মেয়ের পাগলের মত নেশায় বাঁধা হয়ে দাঁড়াননি। বিয়ে দিয়ে দিয়ে মেয়ের শিক্ষকতা’কে বন্ধ করে দেননি, মেয়েকে চলতে দিয়েছেন নিজের পথে। যে সমাজে একটা মেয়ে পরিবারের অন্যান্য স্থাবর সম্পত্তির মতই একটা সম্পত্তি মাত্র, সে সমাজে যে ব্যক্তি এমন মহান বাবা হতে পারেন; সেই মহান ব্যক্তিই আবার ধর্মের অপমানের নামে কী করে মানুষদেরকে গনহারে খুন করে ফেলার নির্দশে সায় দেন, আমার বুঝে আসেনা! আমি হতভম্ব, রাগে দুঃখে অবাক হয়ে দেখি, প্যাগানরা অস্ত্র হাতে নেমে এসে ঘিরে ফেললো নিরস্ত্র খ্রীষ্টানদেরকে, নির্বিচার গনহত্যায় খ্রীষ্টানদের রক্তে লাল হয়ে গেলো আলেকজান্ড্রিয়া!

আর ডেভিস, হাইপেশিয়া’র দাস ছেলেটা- দাসত্ব থেকে মুক্তি পেতে খ্রীষ্ট ধর্ম’কে আপন করে নিতে গিয়ে ভালবাসা আর মুক্তির মাঝখানের দ্বন্দে যে অনবরত রক্তাক্ত হতে থাকে; ক্ষুধার্ত মানুষগুলোর বুভূক্ষ চেহারা আর আকুতি ভরা হাতের আবেদন এড়াতে না পেরে প্রভুর জন্যে কেনা রুটিগুলো বিলিয়ে দিয়ে অন্যরকম স্বর্গীয় অনুভূতিতে যে আপ্লুত হয়ে উঠে; অবশেষে যে কিনা শুধুমাত্র ধর্মের নামে দানবের মত একের পর এক খুন করে যায় নিরপরাধ মানুষ……… ‘আগুন’ ‘আগুন’ চিৎকার শুনে বাঁচাতে গিয়ে রাতের বেলা ট্র্যাপে পড়ে ডেভিসের চোখের সামনেই খুন হয়ে যায় সাথের মানুষগুলো, বদলায় জুইশদের রক্তে লাল হয়ে উঠে রোমান শাসিত আলেকজান্ড্রিয়ার অলি-গলি…… জুইশ মহিলাটা দৌঁড়ায়, তাকে ধাওয়াকারী টেনে ছিঁড়ে ফেলে তার পরনের কাপড়, উলংগ নারীর চরম অপমানে নিংড়ে তোলা অসহায় শরীরটাকে ঘিরে জান্তব উল্লাসে হৈ হৈ করে উঠে তারা…… খুনের পর খুন! অসহায় অবুঝ ছোট্ট মেয়েটা রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে বুক ফাটা কান্নায় আকুল হয় উঠে, এত দানবদের মাঝখানে এখানে মানুষ কোথায় বাচ্চাটাকে বাঁচানোর?! … এত পাশবিকতার পরও ডেভিসের কোথায় যেন এক ফোঁটা মনুষত্ব্য কথা বলে উঠে, “I was forgiven, but now I can’t forgive!”
প্যাগানদের রক্তের সমুদ্রে আলেকজান্ড্রিয়াকে ডুবিয়ে দিয়ে খ্রীষ্টানরা যখন ক্ষমতায়, তখন ‘প্রভূ’র নাম দিয়ে চলে মানুষ খুনের পাশবিক আর জান্তব লালসা পূরনের প্রতিযোগীতা। “God want’s us to….”; “This is God’s will to…”; বিশপ যেন ‘প্রভূ’র সরাসরি প্রতিভূ, প্রভূ কী চান সে শুধু বিশপই জানেন। আর মানুষ?! কোনো বিশ্বাসের প্রতি অন্ধ হলে মানুষ তার স্বাভাবিক বিবেক বুদ্ধিও যে জলাঞ্জলি দিয়ে দেয়, তা আর নতুন কি! যখন বিশপ বাইবেল থেকে পাঠ করে, “I want women not to teach or take control over a man, but to be in silence” [ I Tim (2:11-14)], বাইবেলের নামে যখন হাইপেশিয়ার দন্ড নির্ধারিত হয়, আমি ঘৃণায় কুঁকড়ে উঠি।
আমার বুঝে আসেনা, নিজের ধর্মকে সত্য প্রমান করতে কেনইবা অন্যের বিশ্বাসকে আঘাত করতে হবে, নীচু প্রমান করতে হবে? অথবা খুন করে ফেলতে হবে? নিশ্চিহ্ন করে দিতে হবে? এ কেমন উম্মাদনা যার কারণে মানুষ অন্য মানুষের রক্ত পান করতে, যত নিষ্ঠুরভাবে সম্ভব খুন করতে, সে খুনের আনন্দ নিতে উম্মাদ হয়ে উঠে?! অথচ এ মানুষদেরই কেউ কেউ আবার অন্য ধর্মের সহপাঠীকে খুন হয়ে যাওয়া থেকে বাঁচাতে গম্বুজের মত সামনে এসে দাঁড়ায়, হাতের অস্ত্র ফেলে দিয়ে চিতা বাঘের মত ছুটে যায় ভালবাসার মানুষগুলোকে বাঁচাতে, নিজে রক্তাক্ত হয়, তাও চায় ভালবাসার মানুষগুলো নিরাপদে থাকুক!
মানুষ আমাকে অবাক করে। ‘আগোরা’ আমার সে অবাক হওয়ার মাত্রা বাড়িয়ে দেয় মাত্র। ঘৃণায় কুঁকড়ে যেতে যেতে এই আমি-ই আবার মানুষগুলোর প্রেমে পরে যাই, যখন এরাই আবার যুদ্ধবিদ্ধস্থ, দূর্গ বন্দী, পেটে খাবার নেই, পরিস্কার কাপড় নেই, যখমে লাগানোর অষুধ নেই, এ অবস্থাতেও ভাবছে! চিন্তা করছে! জ়ানতে চাইছে! বুঝতে চাইছে! সাধারন একটা মুভি’র সিন, অথচ আমার বুকের ভিতর কান্না জমে যায়। মানুষেরা আসলে খারাপ না। এই এরেস্টিসই তো একটু আগেই হাইপেশিয়ার নিষেধ সত্ত্বেও খ্রীষ্টিয়ানদেরকে খুন করেছে উম্মাদের মত; অথচ এখন কেমন হাইপেশিয়ার পাশে বসে শহরের বৃদ্ধ জ্ঞানী মানুষটার কথা শুনে যাচ্ছে! এই জানতে চাওয়ার দূর্দম তৃষ্ণাই কি মানুষকে জন্তু থেকে আবার দিন শেষে আলাদা করে দেয়?
আলেকজান্ড্রিয়া’র আগোরা ধবংস হয়ে গেছে সে বহুকাল আগে, শেষ হয়ে গেছে রোমানরা, এমনকি খ্রীষ্টধর্মের নাম দিয়ে নির্বিচার অত্যাচারে জ্ঞানী-গুণীদের রক্ত পান করা, হাজারে হাজারে মানুষ খুন করা পাদ্রীদের রাজত্বও শেষ হয়ে গেছে সে অনেক কাল আগে। কিন্তু এখনো থেকে গেছে মানুষের মধ্যে প্রতিপক্ষের রক্তপানের আদিম লালসা। থেকে গেছে জান্তব নির্যাতনে প্রতিপক্ষ যখন কষ্টের সীমা পার হয়ে গোংগায়, তখন পাশবিক উল্লাসে উৎসবে মেটে উঠা। সবাই বলে মানুষ সভ্য হয়েছে, আমি সে সভ্যতার কোনো চিহ্ন খুঁজে পাইনা কোথাও। আগোরা এখনো পৃথিবীর অলিতে গলিতে, আগোরা এখনো বিশ্ব রাজনীতির প্রতিটা দরবারে। আগোরা এখনো মানুষের মনের ঘুপচিতে।
এর মধ্যেই হাইপেশিয়ারা যায় আসে। মানবতা’র জয়গান গেয়ে যায়। প্রতিটা আগোরা’কে পৈশাচিক খুনের উৎসব থেকে বাঁচিয়ে জ্ঞানকেন্দ্র করে তোলার স্বপ্ন দেখে। আর এসব স্বপ্নই হয়তো এখনো বাঁচিয়ে রেখেছে পৃথিবীকে……………
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে মার্চ, ২০১০ ভোর ৪:১১