আশার সমাধির নাম বাংলাদেশ। অপেক্ষার ডাকনামও এই বাংলাদেশ। আসে আসে করেও কোনো কিছুই এখানে আসে না, কিন্তু অমানিশার মধ্যেও তার আবির্ভাবের সম্ভাবনা ফুটে থাকে ধ্রুবতারার মতো। নাক চেয়ে নরুণ পেলেও আমাদের আশা, একদিন নাক মিলবে। আমরা অপেক্ষা করছি, একদিন অপেক্ষার বোন আশা ফিরে আসবে। আমাদের প্লাটফর্মে ইতিহাসের ট্রেন থামবে।
আমরা অপেক্ষা করি। এই অকহতব্য বাস্তবতায় এই আমাদের বেঁচে থাকার সঞ্জীবনী। আশার সমাধিতে জলসিঞ্চন করে তাতে আমরা বেদনার ঘাস ফলাই। আশার ভাই অপেক্ষা আমাদের জাগিয়ে রাখে। এক একটি যুগ আমরা পেরিয়ে আসি। পেরিয়ে আসি লোকক্ষয়, মারি ও মন্বন্তর। ক্ষোভে ও তাপে আমাদের বুক বসে যায়। আমাদের পদ্মা আর তিস্তার মতো খর হয়ে ওঠে চোখ_ আঁশু ঝরে না।
শত শত বছর ধরে যার যার স্বল্পায়ুর মধ্যে পেতে চেয়েছি অনেক কিছু, কিন্তু ইতিহাস যত আদি তেমনি দীর্ঘ আমাদের জাতীয় লাঞ্ছনার পরিসীমা।
আমাদের ট্রেন আর যেন আসে না, আমাদের মঙ্গা আর যেন কাটে না। আমাদের ফৌজি উপদ্রব আর যেন শেষ হয় না। তবুও আমরা অপেক্ষা করি। ফাঁসির দড়ি গলায় নিয়ে যেমন অপেক্ষা করে দণ্ডিত পুরুষ। তেমনি আমরা অপেক্ষা করছি আরো কিছু নিঃশ্বাসের, আরো কিছু আলোর, আরো কিছু প্রিয় মুখচ্ছবির_আরো কিছু মরণশীল আস্বাদনের। অন্তিম দীর্ঘশ্বাসের জন্য জমিয়ে রাখি দম। অভিজ্ঞতার বিষে ভরে যায় আমাদের রোমকূপ। সেই ব্যথার মোচন নাই।
আমরা ফুটপাথবাসী অপেক্ষা করি, একদিন গ্রামে ফিরব। আমরা গরিব মানুষ অপেক্ষা করি একদিন কিছু একটা হবে, আর ভাত তুলে দেব সন্তানের মুখে। সে হাসবে তখন বিজ্ঞাপনশোভিত অমলিন হাসি। হতভাগ্যা নারীটি অপেক্ষা করে তার মেয়ে এই পতিত জীবন থেকে পালাবে। এভাবে একজীবন কেটে গেলে সে ভাবে, তার মেয়ের মেয়ে, কিংবা তার মেয়ের মেয়ের মেয়ে নিশ্চয়ই অন্যজীবন পাবে। তারপর কবরে গিয়ে অপেক্ষা করে কখন খুলে যাবে বেহেশতের দরজা। আর দুনিয়ার মাবুদকে পাবে কাঠগড়ায়। অপেক্ষা ছাড়া মানুষ পারে না, পশুর দশাকে মেনে নিতে নিতে পশু হয়ে যাওয়া থেকে এই তাকে বাঁচিয়ে রাখে।
দিনবদলের অপেক্ষা না থাকলে আমরা জীবিত প্রেত হয়ে ঘুরতাম। আর হায় প্রেতেরাই বসায় আজ দিনবদলের রঙিন মজমা। একদিন দুঃশাসনের অবসান হবে এই ভরসা না থাকলে কলমকে নিজ নিজ পশ্চাদদেশে ঢুকিয়ে বাহ্য করা বন্ধ করে দিতাম। দিতে দিতে পেটের ভেতর মল জমতে জমতে জমতে জমতে পাথর হতে হতে একদিন পাথরপ্রতিম হয়ে যেতাম। সেই মলজমাট পাথর দিয়ে জাতির পিতা-ভাই-বোন-ভাবিদের ভাস্কর্য বানাতাম।
আমরা অপেক্ষা করি। আমাদের মা ভোর রাতে বাসরাস্তায় গাড়ি থামার শব্দে জেগে ওঠে। আমাদের বাবা অপেক্ষা করে মনি অর্ডারের জন্য আর স্বপ্নে কাকে দেখে যেন হুহু করে কেঁদে ওঠে। 'বাবা বাবা' করে রব করে। আমি অপেক্ষা করি, একদিন বাড়ি যাব, একদিন মায়ের কোল নেব। একদিন কাঁদব। একদিন শিশু হতে হতে ছোট হতে হতে জরায়ুতে ফিরে গিয়ে জলজ ঘুম দেব।
আর সেই ঘুমের স্বপ্নে দেখব এক আশার পৃথিবী। কেমন ঘোরের মত রোদের পৃথিবী। আবার তোমার সন্তান হয়ে সেখানে জন্ম নেব 'আশা' কিংবা 'অপেক্ষা' হয়ে। আমরা হব সেই পৃথিবীর আদম ও হাওয়া। তারপর দুজন মিলে ত্যাজ্য করে দেব ইতিহাস, এবং হে খোদা তোমাকেও।
আমাদের আশার কোনো পরকাল নাই।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

