কখনো ৩২ নং খাতার গল্প করবার ইচ্ছা আছে। সেই সিন্ধুতে যা পেয়েছিলাম, তারই বিন্দুখানিক এখানে দেবার চেষ্টা করেছি। এটা হয়তো গল্প কিংবা স্মৃতি কিংবা অজৈবনিক কিছু। তবে এ মানুষেরা সত্যি। তারা ছিল। এখনও হয়তো অপরাধ জগতের কোনো না কোনো চোরাগল্লিতে তারা দাঁড়িয়ে আছে। তাদের প্রতি আমার একটা ঋণ ছিল। এখানে সেটাই নিবেদন করার চেষ্টা করা গেল।
..........................................................
৩২ নং খাতায় এরকমটা হরহামেশাই ঘটে। মাঝে মাঝে সরিষার তেল কি সাবান খুঁজে পাই না। রাজ্জাক ভাইকে বলতেও সংকোচ। রাইটার মানুষ, তারই জিম্মায় থাকি। তার কাঠের বাক্সটার ভেতর একটা খাতায় সবার নাম লেখা। কেউ গেলে বা কেউ হারালে সেই খাতায় লাল-নীল দাগ পড়ে। ভুলচুক হলে রাইটারকেও একদিন কাটিয়ে আসতে হয় দুরমুশ সেলে। ফিরে আসার পর কমপক্ষে তিনদিন লাগে উঠে দাঁড়াতে।
সাবান-টাবান সিগারেট-টিগারেট এগুলা কিছু না। রাইটারের হেল্পার হিসেবে রাজু এগুলা নিতেই পারে। আবার রাতে তো সিদ্ধির যোগান ওই-ই দেয়। ওর আর ডাকু রমজানের জন্যই রাতটা রঙ্গিন রঙ্গিন হয়। রমজান ডাকু ছিল, আবার যাত্রার নায়কও ছিল। সারারাত রমজানের পাট দেখে শ'খানেক মুগ্ধ পুলিশ ভোরবেলা ওকে হাতকড়া পরাতে গেলে রমজান বলে, 'ওসি সাব, পালার গানগুলান কিন্তু আমরারই, নাগছে ক্যামুন'? ওসিরা সাধারণত আহাম্মক হয়। কিন্তু ইনি অন্যরকম। রমজান ডাকু বিনা হাতকড়ায় রাতজাগা যাত্রাপালার দর্শকরা ফ্যালফ্যাল চাহনির সামনে দিয়ে পুলিশের সঙ্গে চলে যায়। সেই রমজান এখন যাবজ্জীবন নিয়ে ৩২ নং ওয়ার্ডের গায়েন কাম প্রক্টর। রাতে সে যখন ওল্টানো থালিতে আঙ্গুল টুকে গান ধরে, 'যে আমারে আদর কইরে গো-ও-ও, নাম রাইখ্যাছে আদরিনী-ইই, আমি কী তার আদর জানি' গায়; দিলটা একেবারে ঠাণ্ডা হয়ে যায়। কোনাকাঞ্চি থেকে কেউ হয়তো তখন ডুকরে ওঠে। আর রমজান পাহারা আওয়াজ দ্যায়, 'মাঙ্গির পুত, শাউয়ার কাঠি ভাঙুম নিহি'।
এদিক থেকে রাজু একটু ধান্ধাবাজ টাইপের। তখন আমীর খান হিট। ওরও আমীর খানের মতো চোহারাছবি। শুক্রবার সকালে নায়কটি সেজে মুখে স্নো-পাউডার মেখেটেখে আমাদের আমীর খান ডেটিংয়ে যান। চওড়া বারান্দা পেরিয়ে নামলে চত্বরের মধ্যিখানে বাঁধানো আম গাছ। সেখানে ছায়ায় দাঁড়িয়ে সেন্ডেলের ফিতা লাগান এবং হাতের তালু দিয়ে চুল শান দেন। রোজ শুক্রবারে আমরা এ দৃশ্য দেখি। সপ্তাহে এই একদিন; ওর ঈদ।
দুপুরের পরে ঘন্টাখানেকের জন্য ছাড়া হয় সবাইকে। তখন পায়চারি করতে করতে ওই আমগাছটার তলায় গিয়া বসি খানিক সময়। বেশিক্ষণ বসা ভাল না। সারাদিন বসে বসে থাকা হয় বলে চলে বেড়ানোর এইটুকু সুযোগ কেউ ছাড়ে না। ওই সময়টায় বিড়িটিড়ি খাওয়ার মজাই আলাদা। আমরা বিড়ি খেতে খেতে উঁচু দেয়ালের ওপারে বসতবাড়ির ছাদের কাপড় কিংবা পাশের বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের বন্ধ জানালা দেখি।
মাঝে মাঝে তাস খেলা হয়। তাস চালতে চালতে দাড়ির গোড়া প্যাঁচানো অরুণের মুদ্রাদোষ। আমি বলি, 'কী অরুণ সব কেশই কি প্যাঁচাও নাকি!'। ওইটকু মানুষের অত্ত বড় দাড়ি আর ইয়া লম্বা চুল। সে এক কাণ্ড বটে! দাবা ভাল খেলে আরমান ভাই। মুখের সামনে শূণ্যে আঙুল দিয়ে আঁক কষে অব্যর্থ চাল দেয়। লোকটা কথা কয় না তেমন। শরিয়তপুর বাড়ি। ফলের ব্যবসা করতো। ভাইঝির ওপর কারা যেন বোমা মারে। পরের তিনদিন সে আগুন হয়া তামা তামা হয়া ঘোরে আর আতিপাতি করে খোঁজে। চতুর্থ দিন রাতে বোমারুদের একজনকে পায়। মশারির মধ্যে ঘুমাচ্ছে। ঐ মশারি পেঁচিয়েই লোকটাকে কাঁধে করে মাঠে এনে ফেলে। খড়টড় যোগাড় করে আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়। তারপর সোজা এখানে এই ৩২ নং খাতার বাসিন্দা হয়।
দুই. কোথা থেকে যেন একটা গান ভেসে আসছে। কী যেন মনে করিয়ে দেয়া আর সুরে যেন পুলকের টান। গানটা আস্তে আস্তে আরো স্পষ্ট হয়। আমরা যেন এক চাপা গ্রহণ লাগা আলোর নীচে কোথায় চলেছি। একটা দীর্ঘ রজ্জুর মতো কী একটা আমাদের কাঁধে, গলা ঘেঁষে। একটা উতসবের গানের মধ্যে আমরা সার বেঁধে হেঁটে যাচ্ছি। কোথায় যেন আনন্দ লেগেছে। আর চাপা উজ্জল আলোর তলায় রাশি রাশি মেঘে ছাওয়া গানের পথ উঠে গেছে আকাশের দিকে। চারপাশে জ্যোতির্ময় কুয়াশার মত ঘোর আর সেই সুর তরলের মত ভিজিয়ে দিচ্ছে আমাদের। যত যাই, গানটা তত চেনা চেনা লাগে। হঠাত বুঝতে পারি, এটা স্বপ্ন। চাইছি স্বপ্নটা চলুক। কিন্তু গানটা যেন আরো পরিষ্কার হতে থাকে। মর্মে ঢুকে যেতে থাকে। আমাদের সবার ঘাড়ে গলা ঘেঁষে যাওয়া সেই রশিটাও আরো ভারি হতে থাকে। দমবন্ধ হয়ে আসে যেন। অকষ্মাত একটা ঝাঁকুনি দিয়ে গান চলে যায়, সুর চলে যায়, সেই আলোটা চলে যায়; আর আমি জেগে যাই।
বুকটা চেপে আছে। চাপা দমবন্ধ ভাব নিয়ে জানালা দিয়ে চেয়ে আছি। বাইরে কোথাও বাজতে থাকা গানটা তখনই শেষ হলো। আহ্! কী গান জানা হলো না!
তিন.আমরা থাকি একটা পুরনো দক্ষিণমুখী লাল লম্বা দালানে। পুরো জেলখানাটা দুপুরের খাওয়ার পরে একটু শুনশান থাকে। ৩২ নং খাতার প্রাণীরা তখন যার যার ঘাম আর হাঁসফাঁসানিতে জারজার হতে হতে ঝিমায়। ঘামে কম্বল, জামা আর মেঝে ভেসে গেলে সেটাতে পিঠ ঠেকালে একটু ঠাণ্ডা লাগে। এরকম সময় টুপ করে দোতলার কয়েদিদের ওয়ার্ডে চলে যাই। নীচতলাটা হাজতিদের আর ওপরটায় দাগি কয়েদিদের জায়গা। দিনে ওরা কাজে যায়। জেলের ভেতরই নানানরকম খাঁটুনির ব্যবস্থা আছে। মাঝে মাঝে লুকিয়ে তাদের কারো বিছানায় শুয়ে শুয়ে ভাবতাম। এখানে এসে বিরাট শিকওয়ালা জানালা দিয়ে আকাশ দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে যেতাম। নীচতলায় এসবের কোনো বালাই-ই নাই। আজ সেখানে শুয়ে আবার সেই স্বপ্নের কথা মনে হলো। ইস্ কোথায় যেন আনন্দ লেগেছে!
চার. এসময়টায় হাঁটুর ওপর থুতনি লাগিয়ে জগন্নাথ ঠাকুরের মতো না হয়ে উপায় খাকে না। গুনতি হবে এবং গুনতিতে কোনো ঝাউলিমাউলি চলবে না। সকাল-সন্ধ্যা গুনতি ঠিক আছে তো সব ঠিক। ওই যে গুনতি দারোগা আসছে। রমজানের পান্টির কয়েকটা বাড়ি এর-তার পিঠে পড়ায় সবাই বেশ সিজিলমিছিল করে বসে। আর দুনিয়ার বদমাইশি শালা তখনই চাগান দেয়। এ ওর পাছায় কাঠি দেয়, সে তাকে কম্বল পালিশের জন্য জেঁকে ধরে। তারই মধ্যে একেকজনকে দেখা যায় হাসির ঠেলায় হঠাত ছেড়ে দেয়া স্প্রিংয়ের মতো তড়পাচ্ছে।
কিন্তু আজ সব শুনশান। রমজান পান্টি দিয়ে নিজের ঊরুতে বাড়ি মারতে মারতে ঘুরপাক খাচ্ছে। চোখটা আর মানুষের নাই, কুকুরের মতো লাল। বুঝলাম ভর সন্ধ্যাতেই সিদ্ধি টেনে মেজাজ তিখা করে আছে। আমাদের কোণাটায় রাজ্জাক রাইটার তার কাঠের বাক্সের ওপর বসে গরাদের বাইরে তাকিয়ে আছে। তার পাতলা দাড়ি বাতাসে কাঁপে। ওদিকে সাত-আটজন দাবার দানের দিকে ঝিম মেরে তাকিয়ে আছে। যেন যে কোনো মুহূর্তে সেখান থেকে থেকে বিষ্ফোরণ ঘটবে। মুহূর্তে খেয়াল করলাম কেউ কারো মুখের দিকে তাকাচ্ছে না।
ধ্বক করে উঠল বুকের ভেতর। বুঝলাম, খবর চলে এসেছে। রাজুকে দেখলাম না। ওর আগেই কি খবরটা চলে এসেছে! আজ ছিল ওর রায়ের তারিখ। সকাল বেলা সেজেগুজে বেরিয়ে গেছে এক হাবিলদারের সাথে। ওদিকে মেয়েদের ওয়ার্ড থেকে সিরাতকেও বের করা হয়েছে। এক মামলার আসামি বিধায়, দুজনকে একসঙ্গেই কোর্টে তোলা হয়। একসঙ্গেই ওরা কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে দিনের পর দিন সওয়াল-জবাব শোনে। আজকেও শুনেছে নিশ্চয়।
পাঁচ. লকআপের ঘন্টা বাজিয়ে দিল ঘন্টি। এখনও ফিরল না রাজু। আমরা বসে আছি। শিকের ভেতর দিয়ে বাইরের চত্বর, চত্বর পেরিয়ে চৌবাচ্চা। তার পরে লোহার বেড়ার ওপারে গুদামের মতো একটা টিন শেড। ওটার নাম আমদানি। নতুন চালান এলে প্রথম রাতটা তাদের ওখানেই কাটাতে হয়। সন্ধ্যার আলোর মধ্যে সেটাকে একটা মালবাহী জাহাজের মতো লাগে। প্রথম রাতটায় আমাদের সাতজনকে ওখানে রেখেছিল। পরদিন বিকালে যার যার ওয়ার্ড ভাগ হওয়ার সময় রাজ্জাক রাইটার আমাদের নিতে রাজি হয়। বিছানা-কম্বল-গোসলের পানি ইত্যাদি বাবদ সপ্তাহে জনপ্রতি পাঁচশ টাকা চুক্তি।
গুণতি শেষ। কয়েকটা ঠোঙ্গা বারান্দায় এ মাথা ও মাথা করে। সেন্ট্রিদের এ নামেই ডাকা হয়। রাজুর বিয়ে হয়েছে এখানেই। কিংবা হয়তো ওরা আগেই বিয়ে করে রেখেছিল। কে জানে?
কেবল বিয়েই। সেই সুবাদে শুক্রবার সকাল করে ওদের দেখা করতে দিত। মুখোমুখি শিকের এপার ওপার বসে ওরা কী কথা বলতো? গরাদের দুদিক থেকে দুটো হাত এসে কী তখন একটা জায়গায় মিলত? ওরা কি পরস্পরকে অভয় দিত? তবে আমাদের ভাগের সাবান চোরাই পথে যে রাজু মারফত সিরাতের কাছে চলে যেত, সেটা নিশ্চিত। এজন্যই রাজু কিছু নিলে আমরা কিছু মনে করতাম না। বরং চোখ টিপে হাঁসতাম।
খুনটা ওরা দুজন মিলেই করেছিল। আদালতেও সেটা প্রমাণ হয়েছে। কিংবা ওরা করেনি। কে জানে? রাজু এ নিয়ে মুখ খোলে না। তবে আজকে আর ছাড়ব না। বলতেই হবে, যে মরেছে সে কেন মরেছে? কিংবা এসব প্রশ্ন আজ অবান্তর। ৩২ নং খাতার মানুষেরা কখনো এসব কথা তোলে না। যা হবার তা নাকি হয়-ই, আর যখন হয় তখন নাকি কেউ ঠেকাতে পারে না। আরমান কি জানতো না, মশারির মধ্যে পেঁচিয়ে একজনকে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারলে কী হয়? কিংবা সাভারের শেরআলী কি জানে না, মাকে খুন না করেও মায়ের ঘাতক হিসাবেই ওর বিচার হবে? ৩২ নং খাতায় এসব প্রশ্ন তোলা আহাম্মকি।
আমরা বসে আছি। আমগাছটা থেকে ঝুরঝুর করে অন্ধকার পড়ে সবকিছু কালিকালি করে দিচ্ছে। সবগুলো ওয়ার্ডে তালা পড়বে এখনই। দূরের একটা দালানে শিকের সঙ্গে কেউ টিনের থালি বাজাচ্ছে। রাজুর আসার সময় হলো।
আহ স্বপ্নে আসা গানটা কী ছিল যদি জানা যেত!

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

