বোমা-বারুদের ধোঁয়া কেবল আতঙ্কের ছোঁয়াই লাগায়নি, সম্প্রদায়ে-সম্প্রদায়ে, রাষ্ট্রে-রাষ্ট্রে অবিশ্বাসেরও সংক্রমণ ঘটিয়েছে। ফলে সত্য জানা হয়ে পড়ছে আরও কঠিন। নয়-এগারোর ধাক্কা এখনো দুনিয়াবাসীর হাড্ডিতে বাজছে, মুম্বাইয়ের ধাক্কা যে কোথায় গিয়ে বাজে, সেটাই এখন দেখার অপো।
মুম্বাই-ঘটনাকে প্রধানত দেখা হচ্ছে জর্জ বুশ প্রবর্তিত ওয়ার অন টেররের দর্পণে। পাশ্চাত্য সভ্যতা বনাম মুসলিম সন্ত্রাসের ছকে ফেলে এর বিচার করা হচ্ছে। সেই বিচারটি এ রকম: দেক্কান মুজাহিদিন>লস্কর-ই তৈয়েবা>আইএসআই>পাকিস্তান>মুসলিম সন্ত্রাসবাদ। অতএব দুয়ে দুয়ে চার, শুরু করা যাক দণি এশিয়ার সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ! শত্রু হিসেবে রেডিমেড হাজির পাকিস্তান। নাজুক মুসলিম দেশ হওয়ায় কিছু দুর্ভোগ আমাদের কপালেও যে জুটবে না তা বলা কঠিন।
অনেক ভারতীয় ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ওপরের ওই সমীকরণটিকে সন্দেহ করছেন। তাঁরা এর পেছনে ‘ইরাকের হাতে গণবিধ্বংসী অস্ত্র’ জাতীয় নতুন মিথ্যার সর্বনাশা আলামত দেখতে পাচ্ছেন। ঘটনাসূত্রে প্রকাশ পাওয়া কিছু আলামতের দিকে তাঁরা দৃষ্টিও আকর্ষণ করছেন।
১. বিবিসির একটি খবরে বলা হচ্ছে, কমপে কয়েকজন হামলাকারী মুসলিমও নয়, ভারতীয়ও নয়। ঘটনাস্থল ছত্রপতি শিবাজি রেলস্টেশনের এক ক্যাফে-মালিক পাপ্পু মিশ্র বিবিসিকে বলেন, ‘কালো পোশাক পরা দুই তাগড়া তরুণ একে-৪৭ রাইফেল নিয়ে’ আসে। তারা দেখতে ‘বিদেশিদের মতো ফরসা’। বাগদাদ থেকে আসা পর্যটক গাফফার আবদুল আমিরও লিওপোল্ড ক্যাফের সামনে ‘ভারতীয়দের মতো দেখতে নয়’ এমন দুজনকে গুলি চালাতে দেখেছেন। তাদের একজনের চুল ‘বাদামি’ এবং ‘আরেকজনের চুল পাংক ফ্যাশনে কাটা। তাদের পোশাক ছিল পরিপাটি।’ Click This Link
২. নাশকতার আরেকটি বড় জায়গা ছিল ইহুদি কেন্দ্র নারিম্যান হাউস। এক পুলিশ কর্মকর্তা সেখানে ঢুকে হতবাক হয়ে দেখেন যে তাঁকে ল্য করে গুলি ছুড়ছে এক শ্বেতাঙ্গ!
৩. আমেরিকার সিবিসি নিউজকে দেওয়া সাাৎকারে ভারতের এক ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক অরুণ আস্থানা জানান, ‘খবর রয়েছে যে হামলার ১৫ দিন আগে থেকেই নারিম্যান হাউসে জঙ্গিরা থাকা শুরু করে। সেখানে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র, গোলাবারুদ ও খাদ্য মজুদ করা হয়।’ স্থানীয় লোকজনও কিছুদিন থেকে নারিম্যান হাউসে বিদেশিদের আনাগোনা দেখেছে এবং পুলিশে খবরও দিয়েছিল (সিএনএন-আইবিএন টেলিভিশনে প্রচারিত)। বিস্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে, ভেতরে মাত্র দুজন সন্ত্রাসী থাকার পরও একদম শেষমুহূর্তের ঠিক আগে নারিম্যান হাউসে অভিযান পরিচালিত হয়নি। তাও সেটা হয়েছে স্থানীয় জনগণের চাপে পড়ে।
৪. মুম্বাইয়ের কামা হাসপাতালে আক্রমণকারী সন্ত্রাসীদের মারাঠি ভাষায় কথা বলতে দেখা গেছে (মহারাষ্ট্র টাইমস)। মহারাষ্ট্রের সন্ত্রাস দমন বিভাগের প্রধান হেমন্ত কারকারে ও তাঁর দুজন সহকারীকে যারা গুলি করে, তাদেরও মারাঠি ভাষায় কথা বলতে শুনেছেন একজন প্রত্যক্ষদর্শী।
৫. ঘটনাবলির মধ্যে সবচেয়ে রহস্যময় হলো হেমন্ত কারকারের মৃত্যু। মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেশমুখ ঘটনার খবর পান সকালেই। অথচ সকাল নয়টা ৪৫ থেকে বেলা তিনটা পর্যন্ত তাজ হোটেলে পুলিশ আসেনি। এ রকম অরতি অবস্থায় তাঁকে সেখানে পাঠানো হলো কেন? কেন বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট ও হেলমেট পরে থাকা সত্ত্বেও গুলি তাঁকে বিদ্ধ করল? তাঁর মৃত্যুর পূর্ণ বিবরণ এখনো প্রকাশ করা হচ্ছে না কেন?
হেমন্ত কারকারে সম্প্রতি বিজেপির হিন্দু জঙ্গিবাদ তথা মালেগাঁও, আহমেদাবাদ, নান্দেদ প্রভৃতি বোমাবাজির পেছনে হিন্দু জঙ্গিবাদীদের ভূমিকার উšে§াচন ঘটান। তাঁর সহযোগী অন্য দুজন ছিলেন সন্ত্রাসবিরোধী স্কোয়াডের সহপ্রধান এবং প্রধান সন্ত্রাসবাদ বিশেষজ্ঞ। আগের দিন ফোনে তাঁর বাড়ি বোমা মেরে উড়িয়ে দেওয়ার এবং হত্যার হুমকি এসেছিল। তিনি বলেছিলেন, ‘আমি বুঝছি না, কেন এই কেসটা নিয়ে ভয়ঙ্কর রাজনৈতিক চাপ আসছে।’ সেটা বোঝার সুযোগ আর তিনি পেলেন না। তাঁর দায়িত্বে পরে যিনি আসবেন, এ ঘটনার পর নিশ্চিত যে তিনি বিজেপির জঙ্গিত্ব তদন্তে ভয় পাবেন।
ঘটনার তাৎপর্য বুঝতে জানা দরকার যে এ ঘটনার মোটিফ কী এবং কারা এতে লাভবান হচ্ছে? প্রথমত, ভারতে যে মুহূর্তে হিন্দু জঙ্গিবাদের গোমর ফাঁস হওয়ায় বিজেপি বেকায়দায়, সে মুহূর্তে ইসলামি সন্ত্রাস ঘটিয়ে বিজেপিকে দায়মুক্ত করার মতো আহাম্মকি কেন করবে মুসলিম জঙ্গিরা? কেন তারা বিজেপিকে দায়মুক্ত করতে চাইবে, যখন সামনেই নির্বাচন এবং বিজেপির পরাজয় প্রায় নিশ্চিত? করবেই যদি, তবে কেন ভারতীয়দের ছেড়ে ব্রিটিশ-আমেরিকান-ইসরায়েলিদের জিম্মি করা হলো? তাজ হোটেলের কসংখ্যা এক হাজারেরও বেশি। অল্প কজন জঙ্গি কীভাবে এত বড় হোটেলকে টানা ৬০ ঘণ্টা দুর্ভেদ্য করে রাখতে পারল? সে সময় ভেতরে কী ঘটছিল? কেন নারিম্যান হাউসের ঘটনা থেকে দীর্ঘ সময় প্রশাসনের দৃষ্টি দূরে রইল? কোথাও কিছু লুকানো হচ্ছে?
সরকারও স্বীকার করছে যে এত বড় কাণ্ড ঘটাতে শতাধিক কর্মী বাহিনী দরকার। যদি তারা বহিরাগতই হবে, তাহলে তাদের নড়াচড়া, প্রস্তুতি, হোটেলের ভেতর অতিথির ছদ্মবেশে অস্ত্র মজুদ করা কিছুই কেন ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর নজরে পড়ল না? তারা কি ঘেসো বাঘ?
দৃশ্যত বড় মাত্রার নাশকতায় ভারত যে ঝাঁকুনি খেয়েছে, তার সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া হচ্ছে আমেরিকার ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের’ শিবিরে ভারতকে আরও ঢুকিয়ে ফেলা। তিন পরাশক্তির নাগরিকদের জিম্মি হওয়ার মধ্য দিয়ে ভারত ইতিমধ্যে সেদিকে ঝুঁকেও পড়েছে। এর ফল হতে পারে, একে দণি এশিয়ার নয়-এগারো আখ্যা দিয়ে ইরাক ও আফগানিস্তানের মতো পাকিস্তান ও বাংলাদেশের টুঁটি চেপে ধরা। নবনির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাও কিন্তু সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের কেন্দ্র দণি এশিয়ায় সরিয়ে আনার কথা বলেছিলেন। অন্যদিকে এ ঘটনার পর ভারতে যাঁরা বিজেপির ফ্যাসিবাদী উত্থানের হুঁশিয়ারি জানাচ্ছেন, যারা মুসলিম নিধন ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে সোচ্চার, যারা আমেরিকার সঙ্গে ভারতের দোস্তালির বিরোধী, তারাও কোণঠাসা হলো।
অন্যদিক থেকেও একে দেখা যায়। ভারতের সরকারি ভাষ্যমতে পাকিস্তানভিত্তিক লস্কর-ই-তৈয়েবা হামলায় জড়িত। এর মানে, ‘আমেরিকার ট্রয়ের ঘোড়া’ আইএসআই-ও জড়িত। কান টানলে মাথা আসে। আইএসআইকে ধরে টান দিলে মার্কিন সিআইএ-ও চলে আসে। লস্কর-ই-তৈয়েবার দুই নেতা মাওলানা মাসুদ আজহার সিআইএ ও হাফিজ সাইয়েদ ব্রিটিশ এম১৬-এর হয়ে আফগানিস্তান ও বসনিয়ায় কাজ করেছেন। যে আইএসআইয়ের প্রধান নিয়োগ পান মার্কিন পছন্দ অনুযায়ী, যে সংস্থাটি অদ্যাবধি সিআইএ পরিচালিত অপরাশেনগুলোর গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী, সেই আইএসআইএ কোথাও জড়িত থাকা মানে সিআইএরও জড়িত থাকা। তাহলে মুম্বাই সন্ত্রাসের পূর্ণাঙ্গ সমীকরণটি দাঁড়ায় এ রকম: দেক্কান মুজাহিদিন>লস্কর-ই-তৈয়েবা>আইএসআই>সিআইএ>মার্কিন ওয়ার অন টেরর। সুতরাং খল যদি খুঁজতে হয়, সেটা মুসলিম সন্ত্রাসবাদের মধ্যে না খুঁজে, যারা দুনিয়ায় অন্তহীন যুদ্ধের খেলা খেলে চলেছে, তাদের মধ্যেই খোঁজা দরকার। ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সম্প্রদায়ের মধ্যে মুম্বাই-সন্ত্রাসে আইএসআই-সিআইএ-মোসাদের মদদ থাকার কথা বলা হচ্ছে।
আগুন ছাড়া ধোঁয়া ওঠে না, প্রেতি ছাড়াও কিছু ঘটে না। মুম্বাই-সন্ত্রাসও ঘটেছে বিশেষ একটা প্রেক্ষিতে। কিছুদিন আগেই মালেগাঁও, নান্দেদ, আজমির, পাটনা, সমঝোতা এক্সপ্রেস, আহমেদাবাদসহ গত কয়েক বছরের আলোচিত বোমা হামলাগুলোর পেছনে বিজেপি তথা সংঘ-পরিবারের হাত আবিষ্কৃত হয়েছে। আটক হয়েছেন ১০ জন হিন্দুত্ববাদী। এঁদের মধ্যে দুজন কর্মরত সেনা কর্মকর্তাও ছিলেন। ভারতীয় সেনাবাহিনীর বিভিন্ন স্তরে আরও হিন্দুত্ববাদী থাকার খবরও বেরিয়েছে। তাদের দেওয়া তথ্য থেকে ভারতজোড়া জঙ্গিবাদী নেটওয়ার্কও ক্রমশ উন্মোচিত হচ্ছিল। বেরিয়ে আসছিল তাদের মিলিটারি স্কুলের কথা, বিভিন্ন রাজ্যের প্রশিণ-শিবিরের কথা। এদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হলো, হিন্দু জনজাগরণ মঞ্চ, পানভেলের সান্ত্বনা আশ্রম এবং ১৯৩৫ সালে হিন্দু উগ্রবাদী বিএস মুঞ্জে প্রতিষ্ঠিত সেন্ট্রাল হিন্দু মিলিটারি এডুকেশন সোসাইটির ভোনশালা মিলিটারি স্কুল। সংঘ-পরিবারের তরফে বাংলাদেশে হিন্দুদের নির্যাতনের প্রতিশোধে এখানেও হিন্দু জঙ্গিবাদের শাখা খোলার সংবাদও প্রকাশ পায়; (টাইমস অব ইন্ডিয়া, ২৪ নভেম্বর, ২০০৮)। এসব অভিযোগ ও আলামত ভারতে সন্ত্রাসবাদের নতুন মুখচ্ছবি সাজিয়ে তুলছে। বিজেপির হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির সঙ্গে মিলিয়ে একে বলা হচ্ছে, ‘হিন্দু সন্ত্রাসবাদ’। সব মিলিয়ে বিজেপি বাবরি মসজিদ ধ্বংস ও গুজরাত গণহত্যা করেও এতটা ভাবমূর্তির সংকটে পড়েনি, যতটা এসবে পড়েছে। সামনে পাঁচটি রাজ্যে নির্বাচন। জঙ্গিত্বের দায়ে সেই নির্বাচনে বিজেপির মার খাওয়ার ভয় ছিল। সে রকম সময়েই ফাঁস হলো হিন্দু জঙ্গিবাদ, তথা হিন্দু ফ্যাসিবাদ। একেই বলে বাড়া ভাতে ছাই। কিন্তু মুম্বাই-সন্ত্রাস তাদের পায়ের নিচে আবার মাটি ঠেকাল। ইতিমধ্যে নির্বাচন পিছিয়ে নেওয়া হয়েছে এপ্রিলে। অতএব কেল্লা ফতে।
উপমহাদেশের পরিস্থিতি দ্রুত চরমে চলে যাচ্ছে। ভারতের হুমকির মুখে পাকিস্তানের জঙ্গিবাদীরা ও সরকার একজোট হচ্ছে। পাকিস্তান এক লেজুড় ও ভঙ্গুর রাষ্ট্র হয়ে দাঁড়াচ্ছে, সেখানকার জঙ্গি গোষ্ঠীরাও উপমহাদেশে তাদের জাল ছড়াচ্ছে। তাদের দমনের অজুহাত তুলে এ অঞ্চলে আমেরিকা-ইসরায়েলের সামরিক প্রভাবও বাড়তেই থাকছে। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে বিচলিত ভারতে বিজেপি’র হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি স্পষ্টভাবেই এর পক্ষে। এর জন্য যে মতাদর্শিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক সামর্থ্য লাগে, এশিয়ায় তা একমাত্র ভারতেরই আছে। সুতরাং একদিকে আধুনিক ফ্যাসিবাদ, অন্যদিকে ধর্মীয় প্রতিক্রিয়াশীলতার উত্থানের মধ্যে উপমহাদেশের জনগণের ভূতভবিষ্যৎ বলি হচ্ছে। এ রকম সময়ে ‘সভ্যতার সংঘর্ষ’ তত্ত্বের ভাইরাস মুক্ত মস্তিষ্কে ভাবা দরকার। সমস্যার গোড়া ধর্মবিশ্বাসের মধ্যে নয়, দুনিয়ায় একক পরাশক্তির সাম্রাজ্য কায়েমের খায়েশের মধ্যে। যুদ্ধখেকো রাজনীতি ও অর্থনীতির মধ্যে। তারা এক হাতে জঙ্গি পয়দা করছে কিংবা নিপীড়িতদের খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে জঙ্গি করে তুলছে, তারাই আবার জঙ্গি দমনের নামে যুদ্ধ-পরিস্থিতি জিইয়ে রাখছে। একেই বলে সাপ হয়ে দংশন করে ওঝা হয়ে ঝাড়ার কেরামতি।
মুম্বাইয়ের ঘটনা ভারত তথা উপমহাদেশের জনগণের জন্য যে হুমকি বয়ে আনছে, এর সার্বিক বিশ্লেষণ ছাড়া আজ পথ পাওয়া কঠিন
আরো জানতে দেখুন:
http://www.countercurrents.org/biju061208.htm
Click This Link
http://www.sachalayatan.com/faruk_wasif/20114
http://www.countercurrents.org/raina191108.htm
সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই ডিসেম্বর, ২০০৮ দুপুর ২:১৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



