না ভোট প্রসঙ্গে এই চুটকিটি মনে পড়লো। এক লোক কুকুরের লেজে একটা পাইপ ঢুকিয়ে বসে আছে। তো লোক যায় পাশ দিয়ে আর হাসে। একজন তো বলেই ফেলে, আরে বোকা ওর লেজ কী আর সোজা হয়! লোকটির উত্তর: না ভাই, আমি লেজ সোজা করতে পাইপ ঢোকাইনি, পাইপ বাঁকা করার জন্যই লেজ ধরে বসে রয়েছি।
বিষয়টা নিয়ে সংক্ষেপে তড়িঘড়ি করে এভাবে ভাবতে চাইছি। দেখা যাক দাঁড়ায় কিনা।
১. পরাশক্তি প্রেরিত আমাদের সিভিকো-মিলিটারি-কর্পোরেট রেজিম চেয়েছিল গোটা রাজনৈতিক নের্তৃত্বকেই 'নাই' করে দিতে। সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে, এখন এসেছে 'না'। তাঁদের যে নাই করে দেওয়া রাষ্ট্রের মাথায় বসতে চেয়েছিল, এখন তার ঠাঁই হয়েছে ব্যালট পেপারের নিচে। রূপান্তরটি লক্ষ্যণীয়।
২. বুঝলাম 'না' একটা তরিকা, একটা পছন্দ। সুতরাং না-য়েরও একটা রাজনীতি রয়েছে। কিন্তু দল রয়েছে কি? আপাতভাবে সিভিল সোসাইটি, শহুরে মধ্যবিত্তের একটা অংশ, সিভিল সোসাইটির জুনিয়র তরফ (নির্বাচন উপলক্ষে দেশে এসে না-য়ের পক্ষে সেমিনার, পোস্টার এবং মিডিয়ায় সক্রিয়) এবং তার থেকেও হয়তো বেশি করে বিদ্যমান রাজনীতিতে মোহশূণ্য হওয়া নাগরিকরা এর পক্ষপাতি। এই না রাজনৈতিক হলেও নির্দল। এই নির্দলীয় না-বাদী রাজনৈতিক আচরণ দেশকে রাজনীতিশূণ্য করার বাতিল কর্মসূচির সঙ্গে কোনো সম্পর্ক রচনা করে কি? অসচেতনভাবে হলেও?
৪.
ক. না-বাদ থাকা মানে এমনি এমনি থাকা নয়। যেহেতু ব্যালটে ও সমাজে না-য়ের ধারা বিদ্যমান। সেহেতু ধরে নেয়া চলে যে, ব্যালটের না জয়যুক্ত হতেও পারে। তা করতে হলে সমাজের না-বাদীদের ব্যাপক ততপর হতে হয়। ধরা যাক, এ ধরনের তৎপরতা জয়ীও হলো একটি অথবা অধিকাংশ আসনে। তা যদি হয়, তাহলে প্রশ্ন এই যে, না-বাদ যদি এতই প্রবল হতে পারে ( এবারে না হলেও আগামীবার, কিংবা তার পরের বার), তাহলে সেই না-বাদীরা একটি রাজনৈতিক দল খুললেই তো ল্যাঠা চুকে যায়। তারা ভাল রাজনীতিই উপহার দিতে পারেন। আর যদি তা না পারেন, তাহলে না-র কোনো ভবিষ্যত নাই। তা বিচ্ছিন্ন কিছু মানুষের আকাঙ্ক্ষা বা হতাশার প্রকাশ ঘটাবে মাত্র। সে পথে জনগণ যাবেন কেন?
খ.এদেশের জনগণ স্বীধন নাগরিক হিসেবে নিজেদের ভাবেন না এখনো। রাষ্ট্র যদি রাষ্ট্র হিসেবে না দাঁড়ায় জনগণের বড় অংশ নাগরিক হিসেবে নিজেদের সংগঠিত করতে পারেন না। আমাদের এখানে রাজনীতি ও রাষ্ট্রের সঙ্গে জনগণের বেশিরভাগের সম্পর্ক প্যাট্রন-ক্লায়েন্ট সম্পর্ক। যার কিছু নাই, সেই মুরুব্বি ধরবেই। সুতরাং সে কখনো না ভোট দেবে না। কারণ, রাষ্ট্র দেয় না তাকে কিছু, কিন্তু নেতারা তো কিছু দেয়: কাজ, ত্রাণ, চাকুরি ইত্যাদি। যাদের প্যাট্রনের প্রয়োজন নাই যারা বৈষয়িক ভাবে সম্পন্ন কিংবা চেতনাগতভাবে 'দীক্ষিত', যার এখানকার রাজনৈতিক বৃত্ত ও রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য না করলেও চলে, সে এটা পারে। না ভোট তার ভূমিকা রাখার একটা পন্থা হলেও হতে পারে।
৫. সুতরাং, না-এর একদিকে থাকছে বিদ্যমান প্রার্থীদের খারিজ করা। ব্যালটে যদি না মার্কা থাকে, তাহলে তা কোনো না কোনো বা সব প্রার্থীদের বিরুদ্ধেই যাবে। অন্যদিকে না হচ্ছে নতুন কোনো রাজনীতির আকাঙ্ক্ষা। না-য়ের প্রচারকদের সেই রাজনীতির রূপটি কী হবে সেটা স্পষ্ট করতে হবে। যদিও না দেয়ার মধ্যে দিয়েই বিমূর্ত ভাবে সেটা তারা করছেন। এটাকে মূর্ত করলে তখন আর না-মার্কা থাকবার প্রয়োজন পড়ে কি?
৬. তাহলে দাঁড়াচ্ছে, না একটা অন্তর্বতীকালীন ব্যাপার। একসময় যেমন তত্বাবধায়ক সরকারের ফর্মূলা এসেছিল, এখন তেমন এসেছে না ভোটের সুশীল ফর্মুলা। তত্ববধায়ক সরকার ব্যর্থ হয়েছে, না-ও ব্যর্থ হবে। তাহলে এই হুজুগে মাতার ফজিলত কী?
৭. এরশাদ আমলেও হ্যাঁ-না ভোট হয়েছিল। এবারে সেই প্রেসিডেন্সিয়াল হ্যাঁ-নাকে সংসদীয় পদ্ধতির মধ্যে চালিয়ে দেয়া হয়েছে। হ্যাঁ-না ভোট ছিল বন্ধ্যা। কারণ সেখানে সবসময়ই হ্যাঁ-কেই জয়ী করবার ব্যবস্থা থাকতো। অন্যভাবে না জয়ী হলেও এরশাদের বদলে অন্য কাউকে হ্যাঁ করার অর্থাত প্রার্থী বদলটা স্বতঃসিদ্ধ হতো না।
৮. সিস্টেম সবময় সবাইকে তার জালের আওতার মধ্যে বা ভাবাদর্শের মশারির মধ্যে রাখতে পারে না। সিস্টেম বেশি ব্যর্থ হলে বেশিরভাগ লোকই ওইসবের বাইরে চলে যায়। তারা তাদের ক্ষোভ প্রকাশের রাস্তা খোঁজে। উপযুক্ত ও সাহসী নের্তৃত্ব দাঁড়িয়ে গেলে জনগণ সেই ক্ষোভকে ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটানোর পথে নিয়ে যেতে পারেন। তখনই আবির্ভাব ঘটে নতুন রাজনীতির। না-ভোট সেই সম্ভাবনাকে ঠেকিয়ে রাখতে পারবে তা নয়। তবে সেখানে কিছুটা চোখে ধুলা তো দিতেই পারে। আমি অ্যাকশনের পক্ষে, না ভোট জাতীয় ইনঅ্যাকশনে কোনো কাজ হয় বলে বিশ্বাস করি না।
৯. মীরপুরে দেখা যাচ্ছে, কোনো কোনো প্রার্থীর পোস্টারের পাশে কে বা কারা 'না ভোট' দেবার স্টিকার লাগিয়ে যাচ্ছে। হতে পারে কোনো সৎ নাগরিক তা করছেন। অথবা করছে তার বিরোধী পক্ষ। এতে করে ঐ প্রার্থীর ভাবমূর্তি কিছুটা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ই। এ থেকে দেখা যাচ্ছে, না ভোটের অস্ত্র না-বাদীদের হাতে থাকছে না পুরোটা, ভোটের আগেই তা চলে যেতে পারে বিদ্যমান রাজনৈতিক শঠদের কারো না কারো হাতেই।
১০.যাত্রাপালায় বিবেকের একটা ভূমিকা স্বীকৃত। বিবেক কিছু না করলেও ভাল ও মন্দের ভেদ চিনিয়ে দেয়। দর্শকের সহানুভূতি কার দিকে যাওয়া উচিত তার সিগনাল তোলে ট্রাফিকের মতো। না-ভোটের এই ভূমিকা থাকতে পারে। রাজনীতির অধপতনের একটা ব্যারোমিটার তা হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু পতন চিহ্নিত হলে প্রতিকার কি আবারও সেই দলগুলোর কাছেই আরেকবার প্রার্থী চাওয়া। এভাবে চাইতেই থাকা। যে লুটেরারা কোনোভাবেই পাল্টাবে না, যাদের লেজ কিছুতেই সোজা হবে না, তাদের লেজ সোজা করার এই মেহনত তাহলে কার কাজে লাগবে? ১৯৯০ এর পরের দেড় দশক এবং ১/১১ এর পরের দুই বছর প্রমাণ করেছে এদেশে আমূল পরিবর্তনই একমাত্র বিকল্প। এবং বিদ্যমান নায়ক-খলনায়কদের কেউই তা দিতে পারে না। সেই পরিবর্তনের শক্তি আসতে পারে নতুন কোনো জায়গা থেকে। সুপ্ত জনগণের ভেতরে নতুন রাজনীতি ও সংগঠন দঁড়ানোর মাধ্যমে। এই উপলব্ধি যদি সঠিক হয়, তাহলে না ভোট তার পথে বাধা না হোক, ছোট্ট গোলকধাঁধা। জেনেশুনে তাতে পা দেব কেন? লেজ সোজা হয় না বলে নিজেদের বাঁকা করার কী মানে?
পুনশ্চ: দেশ নিয়ে বহুরকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। সেসবের ফল আমাদের অনেক কিছু শেখাচ্ছে। সুতরাং না ভোটের পরীক্ষাটাও হয়ে যেতে অসুবিধা কী? সব দেখা শেষ না হলে নতুন কী আর এমনি আসবে?

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


