‘‘খুবই জরুরি হলো রাজনৈতিক সমস্যাকে সামরিক সমস্যায় পরিণত করা। তার জন্য সহিংস আক্রমণ চালাতে হবে যাতে ক্ষমতাসীনরা সামরিক সমস্যাজনক পরিস্থিতিকে রাজনৈতিক সমস্যাজনক পরিস্থিতিতে পরিণত করে। এতে করে জনগণ তাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে এবং সেই জনগণ তারপর থেকে এই পরিস্থিতির জন্য সেনাবাহিনী, পুলিশসহ যা কিছুকে তাদের জীবনের জন্য সমস্যা মনে করে, তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করবে।’’
কার্লোস মারিঘেল্লা, ব্রাজিলিয় মার্কসবাদী বিপ্লবী, গেরিলা যুদ্ধের তত্ত্বকার
ঠিক এই ঘটনাই ঘটছে এখন পাকিস্তানে। সেখানকার সেনা ও লুটেরা শাসকরা ছোটো একটি সামরিক সমস্যাকে বিরাট রাজনৈতিক সমস্যায় পরিণত করেছে। কিন্তু আহাম্মকি এই যে, রাজনৈতিক চেহারা পাওয়া এই সমস্যাকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা না করে তারা মোকাবেলা করতে চাইছে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক যুদ্ধের কায়দায়। আমেরিকাও তাদের এই পথেই ঠেলে দিয়েছে। ফলত, জনগণ তাদের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে এবং শাসকরা ধাবিত হচ্ছে স্বখাতসলিলে_ স্বদেশ ও স্বজাতিশুদ্ধ। অল্প কথায় এই হলো পাকিস্তানের বর্তমান সংকটের সারমর্ম।
এবার আগের কিস্তি পাকিস্তান, তালেবান ও আমাদের খোয়াব: যা ঘটছে ও যা ঘটবে ১ পর থেকে:
শরিয়া ও সশস্ত্রপনা পাকিস্তানের উপজাতীয় পাবর্ত্য অঞ্চলে নতুন না। সেখানে বিচারবিভাগের হাত পৌঁছে না। পুলিশ ও আদালত দুর্নীতিবাজ। সাধারণ মানুষ সেকারণে বিচার-সালিশের জন্য মান্ধাতার আমল থেকেই শালিসিতে ভরসা করে আসছে। তালেবানরা এসে এই গোত্রীয় প্রথাকেই শরিয়া বলে চালাচ্ছে। অথচ বিশ্বের কোনো বিজ্ঞ আলেম একে ইসলামী বলবেন কিনা সন্দেহ। অন্যদিকে দুর্নীতিবাজ আমলা ও রাজনীতিবিদদের কারণে অতিষ্ঠ ঐ অঞ্চলের সাধারণ মানুষও রাষ্ট্রের অনুপস্থিতিতে হাতের কাছের তালেবানদের মাধ্যমে শান্তি ফিরে পেতে চেয়েছে।
এসব দেখেই বেনজীর ভুট্টোর ভাতিজি ফাতিমা ভুট্টো বলেন, ‘‘সোয়াতের মানুষ তালেবানদের চায়নি। কিন্তু তালেবানরা আছে, কারণ তারা রাস্তা বানিয়ে যোগাযোগের উন্নতি করেছে। যখন সরকারি বিদ্যালয় ও হাসপাতালগুলো টাকার অভাবে বন্ধ তখন তারা অন্তত বালকদের জন্য বিদ্যালয় খুলেছে, চালু করেছে চিকিৎসাকেন্দ্র। যখন আদালতগুলো সরকারি দুর্নীতিকে আড়াল করায় ব্যস্ত তখন তারা বিচার পৌঁছে দিয়েছে। ওরে আহাম্মক, পাকিস্তানের সমস্যা তালেবান নয়, দুর্নীতি।’’ বলাবাহুল্য, যেখানেই রাষ্ট্রের উপস্থিতি আলগা হবে, সরকার নাগরিকদের দেখভালের দায়িত্ব এড়াবে; সেখানেই স্থানীয় সামাজিক শক্তি রাষ্ট্র হয়ে উঠতে চাইবে।
একের পর এক মার্কিন বিমান হামলাও তালেবানদের পাল্লা ভারি করেছে। আর যেই তারা শরিয়ার দাবি তুলল এবং মোল্লা ওমরের আদলে বেয়তুল্লাহ মাসুদ নামে এক মৌলভীকেও যেই পাওয়া গেল ওমনি রব উঠলো, পাকিস্তান আফগানিস্তান হতে যাচ্ছে। অতএব চালাও যুদ্ধ! বিশ্ব রঙ্গমঞ্চের এই মারণখেলায় মুষ্ঠিমেয় পশ্চাদপদ তালেবানদের গুরুত্ব তাই সামান্যই। ইরাক আক্রমণের জন্য সাদ্দামের কাল্পনিক গণবিধ্বংসী অস্ত্রগুদামের যে ভূমিকা, এই রক্তাক্ত নাটকে এদের ভূমিকাও তার বেশি নয়। পরের দৃশ্যে যখন, চীন-ভারত আর মার্কিন-রাশিয়া মুখোমুখি হবে তখন কারুরই মনে পড়বে না কাহিনীর শুরু তালেবান নামক সমস্যা দিয়ে।
সবই নাহয় বোঝা গেল। কিন্তু পাকিস্তানের জনগণকে তালেবানের গঞ্জনা সইতে হবে? না হবে না। পাকিস্তানের নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণী, সেখানকার আধুনিক মিডিয়া প্লাস জনগণের আন্দোলনই তালেবানদের সামাল দিতে সম। যদি পাকিস্তান সরকার, গোয়েন্দা সংস্থা এবং বিদেশি কিছু এজেন্সি তালেবানদের সহায়তা বন্ধ করে।
যে মাওলানা ফজালুল্লাহ এখন সোয়াতের প্রধান তালেবান প্রধান, পেশায় লোকটি ছিল সোয়াত নদীর ইমাম ধেরি ঘাটের লোক পারাপারের কারবারি। দড়িবাহিত চেয়ারে করে সেখানে লোক পারাপার করা হয়। প্রতি পারাপার ২ রুপি। এ দিয়ে যুদ্ধের রসদ সংগ্রহ তো দূরের কথা পরিবার চালানোই কঠিন। ২০০৫ সালে তিনি এফএম রেডিওতে ওয়াজ করা শুরু করে রেডিও মাওলানা খেতাব পান। অনেকের কাছেই তার হাস্যকর বয়ান বিনোদনের উপকরণ বৈ আর কিছু ছিল না। কিন্তু এই ফালতু চরিত্রই হাজার দুই সশস্ত্র লোকের সমর্থনে সোয়াতের মালিক বনে যান। তাদের বিপুল অস্ত্র, গোলাবারুদ, আধুনিক সরঞ্জামের উৎস এখনো অজানা। তারা সোয়াতের রাস্তাঘাট, স্কুল, হাসপাতাল, বিদ্যুৎকেন্দ্র সব কিছু ধ্বংস করলেও সরকার তাদের কোনো বাধাই দেয়নি। যদিও তাদের এই মতা একটা সংগঠিত দস্যুদলের বেশি না। অথচ বিনাবাধায় তারা তাদের কার্যকলাপ চালিয়ে যায়। তাই সোয়াতনিবাসি এক বিশ্লেষক প্রশ্ন তোলেন, (থ্যাংকস টু ভাস্কর দা)
Let me clear one thing that, the Talibans in Swat are composed of four groups, i.e. the locals (Swatis), Qabayalis (those belong to FATA),the banned Jehadi organisations from all over Pakistan (they are known as Panjabi Talibans here in Swat) and the forgniers ( Arabs, Tajik, Uzbek, Chechens, Indian etc). All these four groups work there under the umbrella of Pakistan government or government agencies. Here is a big question, you must want to ask, why the government itself want to do so? We are raising this question since last two year in Swat that why (and how) the government can do so? But this is what the ground reality. Because as I mentioned above how its possible for 2,000 militants to fight for two years against well-equipped 40,000 security forces and in the result 80% Swat is under the control of Militants and their power is growing.
More interestingly the illegal FM radio channel is still running. Can you believe that the government is not capable of banning this illegal FM radio? of course the government is, but it deliberately don’t want to ban it.
(Click This Link)
এই হলো পাকিস্তান ও তার পারমানবিক বোমার হুমকি (!!!) তালেবানদের শক্তিমত্তার ইতিহাস। এদের জেহাদি বলার থেকে আহাম্মকি আর কিছু হতে পারে না। কিন্তু বলা হচ্ছে। যেমনটা হয়েছিল কম্বোডিয়ার খেমাররুজ বাহিনীকে কমিউনিস্ট বলা বিষয়েও। কমিউনিস্ট চীন-ভিয়েতনাম-রাশিয়া তাদের অস্বীকার করেছিল। তারাও ভিয়েতনাম আক্রমণ করেছিল। আসলে আমেরিকা চেয়েছিল খেমারদের দিয়ে ভিয়েতনামে পরাজয়ের শোধ নিতে। খেমারদের উস্কানিতে ভিয়েতনাম কম্বোডিয়ায় ঢুকে পড়লে সেভিয়েতদের যে দশা আফগানিস্তানে হয়েছিল, সেই দশা ভিয়েতকংদেরও হতে পারতো। জাতিসংঘে খেমারদের বিরুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের আনা একাধিক প্রস্তাব মার্কিন ভেটোতে নাকচ হয়ে যায়। যাহোক, তালেবান জুজু আজ আমেরিকার দরকার ভারতের দরকার- মধ্য এশিয়ায় তাদের যুদ্ধ ও দখল মিশন সম্পন্ন করবার জন্য।
শরিয়া নিয়েও এখানে দুচারকথা না বললে নয়। ঐতিহাসিক ও ধর্মতাত্ত্বিক দিক থেকে শরিয়ার আবির্ভাব রণশীল ফাতেমি সাম্রাজ্যের আমলে। এর আরেকবার ফর্মেশন হয় কলোনিয়াল ভারত ও মিসরে ব্রিটিশ ও রোমান কোডের প্রভাবে ও প্রতিক্রিয়ায়। এ নিয়ে তালাল আসাদ ও তাজ হাশমীর কাজগুলো উল্লেখযোগ্য। এ বিষয়ে আমার মত হলো, শরিয়া বলে যা চালানো হয় তা সামন্তীয় ইসলামের সবচেয়ে নিকৃষ্ট রূপ। জামাতের ইসলাম অনেকটা পুঁজিবাদী বা বুর্জোয়া ইসলাম। সেকারণে তাদের ইসলামী আইনের ব্যাখা শরিয়ার থেকে আলাদা। সোয়াতের গোত্রপতিরা শরিয়া নামে যেটা চালাতে চায় তা আসলে নারী ও পুরুষের মুক্ত বিচরণের বিরুদ্ধে সামন্তীয় সহিংসতারই প্রকাশ। একই আচরণ পাওয়অ যাবে সামন্ত প্রাধান্যশীল যেকেনো হিন্দু-খ্রিস্টান বা বৌদ্ধ সমাজে। এর সঙ্গে ধর্মের যত না সম্পর্ক তার থেকে বেশি সম্পর্ক অনুন্নয়ন ও সামাজিক-অর্থনৈতিক অবিকাশের। যুগের পর যুগ এদের ফেলে রাখা হয়েছে অতীতের গহ্বরে। আশা করি, আমাদের বিজ্ঞ বন্ধুরা এদের কোরান ব্যাখ্যা বা অনুবাদ থেকে ইসলামের আইনী চিন্তার পাঠ নেবেন না। তবে বিষ্ময়করভাবে ইসলামফোবিয়ায় ভোগা পাশ্চাত্যের বর্ণবাদী বুদ্ধিজীবী ও সাইদী-ফজলুল্লাহদের শরিয়া চিন্তা প্রায়শই মিলে যায়। এই মিল না থাকলে ইসলামের পে বা বিপরে ব্যবসা ও রাজনীতি চলতো কীভাবে? এটা অনেকটা ‘কানায় দেখে, বোবায় শোনে ল্যাংড়ার নাচনা’ জাতীয় কায়কারবার।
সোয়াতের যোদ্ধারা শরিয়া নামে যা বলতে চাইছে তা আসলে দীর্ঘদিনের অপশাসনে ভোগা তলাকার মানুষের হঠাৎ পাওয়া মতার বিকার। যথাযথ রাজনৈতিক দর্শন ও নের্তৃত্বহীন নিম্নবর্গীয় মানুষ যদি বাইরের উস্কানি ও মদদে হঠাৎ শক্তিশালী হয়, তাহলে মতার নির্বিচার ব্যবহার ঘটে থাকে। সোয়াতের অস্ত্রধারীদের যদি সবচেয়ে নরম সমালোচনাও করতে হয় তো বলতে হয়, তারা বিভ্রান্ত, বিপথগামী ও পাক-মার্কিন মিলিটারি স্ট্যাবলিশমেন্টের ক্রীড়নক কৃষক-বিদ্রোহী মাত্র। শ্রেণীবিভক্ত সমাজের পীড়ন ও শোষণ, রাষ্ট্রীয় অবহেলা, মার্কিন হামলা-নির্যাতনের বিরুদ্ধে তাদের প্রতিবাদ শরিয়া নামের ফাঁদে পড়ে আত্মঘাতীই হয়েছে। এর নামেই তারা তাদের প্রতিহিংসা চরিতার্থ করছে। তাদের এইসব ক্ষোভ-বিক্ষোভকে ব্যবহার করছে পাকিস্তানের সরকারি এজেন্সিগুলো। তাদের দেওয়া অস্ত্র ও মদদ এখন কমলেও বাইরের এজেন্সির সহায়তা তারা পাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। কারা তা দিচ্ছে, তার জন্য আমরা অনুমান ও পর্যবেণ কাজে লাগাতে পারি। নৈরাজ্যের কারণেও স্থানীয় কিছু মানুষ তাদের সমর্থন করছে। যতদিন সামন্তবাদ টিকে থাকবে ততদিন এই ধারাই চলবে।
‘তালেবানি জেহাদ’ আর যুক্তরাষ্ট্রের কল্পিত নিরাপত্তাহীনতার চিৎকারের বাইরে তাই সত্যিকার মানুষের সত্যিকার সমস্যার দিকে নজর দিতে হবে। তালেবানদের ছাপিয়ে দেখতে হবে আফগানিস্তান-পাকিস্তানের সত্যিকার দুঃখী মানুষদের, সোয়াত থেকে পালিয়ে আসা দশ লাখেরও বেশি উদ্বাস্তুদের, এই উদ্বাস্তুদের যারা ঘরে টেনে আশ্রয় দিচ্ছে, রাস্তার পাশে তাদের জন্য খাবার ও পানি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকছে সেইসব সাধারণ পাকিস্তানীদের।
সরকারি ভাষ্য মতে মাত্র হাজার দুয়েক অর্ধপ্রশিক্ষিত অস্ত্রধারীদের জন্য চল্লিশ হাজার সৈন্য, ভারি সাঁজোয়া বহর আর মার্কিন ড্রোন ও ক্ষেপনাস্ত্র প্রয়োগেরই ফল এই মিলিয়নেরও বেশি উদ্বাস্তু ও আরো কয়েক মিলিয়ন মানুষের দুর্ভোগ। এই মাত্রারিক্ত বলপ্রয়োগের মধ্যে গাজায় চালানো ইসরায়েলি হামলার মিল আছে। এর উদ্দেশ্য কেবল যোদ্ধাদেরই হত্যা করা নয়, সমগ্র জনগণের জীবন এমনভাবে দুঃসহ ও মর্মান্তিক করে তোলা যাতে জনগণের প্রতিরোধ ইচ্ছা বিলীন হয়। কেননা আফগান সীমান্তের জনগোষ্ঠীরাই তো আফগান তালেবান যোদ্ধাদের রিক্রুটমেন্ট, আশ্রয়, রসদ ও সমর্থন যুগিয়ে আসছে। ন্যাটোর আফগান বিজয়ের জন্য তালেবানদের পশ্চাদভূমি তাই পুড়িয়ে দেওয়া প্রয়োজন। সেজন্য মার্কিন যুদ্ধপরিকল্পনাতেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। আফগানিস্তানে মার্কিন সেনাপতি বদলও এর অংশ। বর্তমান সেনাপতি ম্যাকক্রিস্টাল ইরাকে গুপ্তহত্যা, গণহত্যা, গাড়িবোমা বিষ্ফোরণ, সাদ্দামকে ধরার কর্মকাণ্ডের হোতা। কাউন্টার টেররিজমের বদলে তারা নিয়েছে কাউন্টারইনসার্জেন্সির মেথড। ভিয়েতনামেও এই পদ্ধতির প্রয়োগ হয়েছিল। জয় অসম্ভব জেনে এই অঞ্চলকে যতটা পারা যায় পঙ্গু করে যাওয়াই সম্ভবত তাদের এখনকার লক্ষ্য।
আফগানিস্তানে ন্যাটোর বিরুদ্ধে লড়াইরত তালেবান, জাতীয়তাবাদী ও মাওবাদীদের সঙ্গে পাকিস্তানের তালেবান বলে পরিচিতদের মৌলিক দুটি পার্থক্য আছে। পাকিস্তানি অংশ যারা, তারা মার্কিনিদের থেকে প্রধান শত্র“ মনে করে নিজ ধর্মের মুসলিমদের, যারা তাদের দৃষ্টিতে প্রকৃত মুসলিম নয়। শরিয়ার প্রধান প্রয়োগ কিন্তু স্বধর্মীদের ওপরই তারা করতে চায়। তাদের সপে সালাফি মতবাদকে তারা ব্যবহার করে। এ কারণে আফগান তালেবানরা এদের পছন্দ করে না। তাদের যোগ সিআইএ-আইএসআই স্পন্সরড আল কায়েদার সঙ্গে। ইরাকের স্বাধীনতা যোদ্ধারাও এদের তাদের জাতীয় ঐক্যের শত্র“ মনে করে। আফগানিস্তান মুক্ত করায় এদের এই মতবাদ বাধাস্বরূপ।
গত বছরের শেষ দিকে আফগান তালেবানরা ন্যাটোকে এমনভাবে পর্যুদস্ত করে এবং জনগণের সমর্থন অর্জন করে এবং ন্যাটোকে তাদের সঙ্গে কিছুটা সমঝোতায় আসতে হয়। তাদের সাফল্যে আফগান জনগণসহ অনেক প্রগতিবাদীও আনন্দিত হয়েছিল। এবং তারা কিন্তু শরিয়ার দাবি বিশেষ তোলে নাই। খেয়াল করার বিষয়, ন্যাটো যখন সেখানে বিপর্যস্ত তখনই কিন্তু মঞ্চস্থ হলো সোয়াত নাটক। আফগানিস্তানে মার্কিন ব্যর্থতা থেকে দৃষ্টি সরে গেল পাকিস্তান সরকারের ব্যর্থতার দিকে। আমেরিকা আবারো চলে এলো আপারহ্যান্ডে। ‘বন্যবর্বর’ তালেবান আর ‘জঘন্য’ শরিয়ার ভয় দেখিয়ে আপাত মার্কিনবিরোধীদেরও তারা পে ভিড়িয়েছে। বাংলাদেশেও যদি বাংলা ভাই টাইপ লোক দেশ দখল করতে যায়, অনেকেই নিরূপায় হয়ে মার্কিন-ভারতের কাছে আশ্রয় চাইতে পারে। কিন্তু কেউ কেউ বাংলা ভাইদের আসলে বাঘকে পথ দেখানো ফেই বলে চিনতে পারে। এবং ফেউয়ের পেছনের বাঘকে মোকাবেলার সঠিক পথ খঁজে পেতে পারে।
তাই শরিয়া হলো সেই এসিড টেস্ট। যে-ই আজ শরিয়ার কথা তুলবে ধরে নিতে হবে সে-ই প্রত্য বা পরোক্ষে ভারত-মার্কিন-ইসরায়েলের হাতকেই শক্তিশালী করছে। এই তিন রাষ্ট্রের কথা বলছি এ কারণে যে, তারাই আজ বিশ্ব পুঁজিবাদী আগ্রাসী বলয়ের কেন্দ্রীন হয়ে উঠেছে যার যার ইতিহাস-ধর্ম-পুঁজির প্রভাবে। দেশে দেশে জাতীয় মুক্তি লড়াইয়ে শরিয়ার দাবির থেকে ধ্বংসাÍক আর কিছু হতে পারে না। এ বিষয়ে কোনো আপসের সুযোগ নাই।
এই জটিল ও বর্ণাঢ্য দৃশ্যপটের মধ্যে তাই সত্যিকার মানুষের সত্যিকার নড়াচড়ার দিকে আমাদের নজর দিতে হবে। কতিপয় মোল্লা আর পাকিস্তান-মার্কিন জেনারেলদের ছাপিয়ে তাকাতে হবে দুর্ভাগা পাক-আফগান জনগণ আর হতাশ ও আত্মহত্যাপ্রবণ মার্কিন সৈন্য ও মন্দার শিকার মার্কিন জনগণের দিকে। এদের কারোরই আরেকটি যুদ্ধের প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন পুঁজির গ্রাস আর সামরিক আগ্রাসনে হারানো বাড়ি-চাকরি আর পারিবারিক শান্তি ফিরে পাওয়া। তালেবান বা আমেরিকা কেউ তাদের জীবনকে মুক্ত করবে না। আফগানিস্তানে করেনি, ইরাকে করেনি। একই কথা তালেবানদের বেলাতেও সত্য। তাদের লড়াই অনেক ক্ষেত্রেই আত্মঘাতী হয়েছে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে বা স্বদেশের মাটিতে বিদেশি সৈন্যের উপস্থিতির বিরুদ্ধে তাদের প্রতিবাদ সমর্থনীয় হতো। কিন্তু তারাই যখন শরিয়া প্রতিষ্ঠার নামে নিজ ধর্মের নারী-পুরুষকে ফুটন্ত উনুন থেকে জ্বলন্ত কড়াইয়ে ফেলতে চায়, যখন আমেরিকার ড্রোন হামলার মতোই নিরীহ জনসাধারণের ওপর বোমা হামলা চালায়, তখন এ আত্মঘাতের চেহারাটি ধরা পড়ে। নিজ ধর্মের মানুষদের রক্তাক্ত করার এ প্রক্রিয়াটি অনেকটা আতর তৈরির প্রক্রিয়ার মতো।
সিলেটের পাহাড়ে এখনো আতরের চাষ হয়। আতর পাহাড়ে সারি সারি আতর গাছ। বয়স্ক গাছে দা দিয়ে কুপিয়ে রেখে দিলে সেখান থেকে রক্তের মতো ঘনরস পড়ে। গাছের সেই রক্ত বা রস থেকেই তৈরি হয় সুবাসিত আতর_ পবিত্র ও সুন্দর ওই মৃতের প্রসাধন। তালেবানদের ইসলাম যেন এ রকমই কোনো এক আতর পাহাড়ের আতর গাছ। সাম্রাজ্যের আঘাতে একদিকে তারা আহত হয়, আবার সেই তারাই নিজ জাতি-ধর্মের নারী-পুরুষের স্বাধীনতা কেড়ে নিয়ে সমাজদেহে রক্তরণ ঘটায়। তাদের লড়াই যেদিন ওই আতর পাহাড় থেকে নেমে আসবে, নিজ সমাজদেহকে পীড়ন করে ‘আতর চাষ’ বন্ধ করবে, সেদিনই তা পথ খুঁজে পাবে মুক্তির_ নিজের ও বিশ্বের, এমনকি ধর্মেরও। তা যদি হয়, তাহলে ধর্মীয় ব্যানারের তলে মাথা খুঁড়ে মরা জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের অবরূদ্ধ নদী শত ধারায় বিকশিত হয়ে সাম্রাজ্যবাদবিরোধিতার নতুন যুগের সূচনা করবে।
আল কায়েদা ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ আজ আগুনের মতো। আগুনে হাত দিলে হাত পোড়ে, এ অভিজ্ঞতালব্ধ সত্য। এই জ্ঞানের জন্য নতুন করে হাত পোড়ানোর আর প্রয়োজন নাই।
(দ্বিতীয় পর্বের সমাপ্তি এখানেই। এর বাইরে আরেকটি লেখার প্রয়োজন হবে, যেখানে তালেবান বা জেহাদিদের মতাদর্শিক ও রাজনৈতিক বিচার করা হবে। এই লেখাটা অনেকটা বিবরণমূলক। সাম্রাজ্যবাদ ও জেহাদ পরস্পরের বিপরীত হতে পারে কিনা সেটাই হবে আমার পরের আলোচনার প্রাণ ও পরিচয়। আগের আলোচনায় উত্থাপিত বাদবাকি প্রশ্নগুলোর উত্তর যথাসাধ্য সেখানেই দেওয়া হবে)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

