টিপাইপন্থি ও ভারতপন্থি বাংলাদেশে এখন সমার্থক। গত পরশু শাহরিয়ার কবীর এবং কতিপয় আরো কয়েকজন ঢাকায় এ সেমিনারে টিপাই বাঁধ বিরেধিতা করে আমরা নাকি আমাদেরই ক্ষতি করছি বলে হম্বিতম্বি করলেন। আন্দোলনকারীদের রাজাকার আর কতিপয় বাম বলে আত্মপ্রসাদ লাভের চেষ্টাও করেছেন। তা শুনে আমরা বিমলানন্দ লাভ করেছি। তিনি ঠিকই বলেছেন, কিছু লোক যারা চিরকালই কৃপাসক্ত তাদের তো ক্ষতি হচ্ছেই। কারণ প্রভুরা রুষ্ট হচ্ছেন।
যাহোক, এরা যে তথ্যের ভিত্তিতে টিপাই বাঁধ হলে পানি বাড়বে আবার বন্যাও কমবে বলে দাবি করছেন, সেই তথ্যের উৎস ফ্যাপ ৬ নামের গণধিকৃত ও সরকারি ভাবে বাতিল ঘোষিত প্রকল্প। এদের পানি বিষয়ক চিন্তাটা প্রকৃতির ওপর মাস্তানির সমর্থক। এবং এটা যারা করে তারা মানুষকে দমনের পথই গ্রহণ করে। প্রকৃতি বিনাশী পানি ব্যবস্থাপনা তাই জনবিরোধী রাজনীতিরই ভায়রা ভাই।
এখানে অর্থনীতিবিদ ও পানি ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ ড. স্বপন আদনানের একটি লেখা তুলে দিচ্ছি। তিনি এবং আরো অনেকে মিলে ফ্যাপ প্রকল্পকে বাতিল করায় আন্দোলনে ছিলেন এবং গবেষণাও করেছেন।
এ লেখাটি আমি ছেপেছিলাম সমকালের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি সংখ্যায়। দুই কিস্তিতে এটা দেওযা হচ্ছে এ উদ্দেশ্যে যে, পানি ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে কিছু ধারণা হলে আমরা টিপাই নিয়ে আরো স্পষ্ট অবস্থানে যেতে পারবো।
বন্যা নিয়ন্ত্রণ: ইতিহাস ও পরিহাস ১
উত্তরবঙ্গের ১৯২২-এর বিপর্যয়কারী বন্যা নিয়ে গবেষণা করে অধ্যাপক প্রশান্ত মহলানবীশ ১৯২৭ সালেই লিখেছিলেন যে, এ দেশের নদীগুলো নাব্যতা হারাচ্ছে, ফলে নিচু এলাকার বিল থেকে পানি সহজে সরছে না। যদি নদীতে বাঁধ দেওয়া হয় তাহলে কিছুদিনের জন্য বন্যা রোধ হবে সত্যি, কিন্তু এর ফলে পলি জমে-জমে নদীতল ধীরে ধীরে উপরে উঠে আসবে এবং ভবিষ্যতে সেই বাঁধ উপচিয়ে বন্যার পানি নদী থেকে আবার ছড়িয়ে পড়বে। প্রায় তিন দশক পর ক্রুগ মিশনের পরামর্শে বন্যানিয়ন্ত্রণের জন্য এক বিশাল মাস্টার প্ল্যানের নীলনকশার কাজ শুরু হয়। সেই পর্যায়ে, ১৯৬৩ সালে আমেরিকার মিসিসিপি নদী কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান জেনারেল হার্ডিন এই মর্মে সতর্কবাণী দেন যে, এধরনের বিরাট বাঁধ নির্মাণের আগে এর সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়াগুলো যাচাই করে দেখা দরকার। ১৯৬৪-৬৫-এর দিকে নেদারল্যান্ডসের অধ্যাপক থাইসে খেয়াল করেছিলেন যে, ব্রহ্মপুত্র কিংবা পদ্মার মতো নদ-নদীকে বাঁধ দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। ৩৭ বছর আগে অধ্যাপক মহলানবীশ যা বলেছিলেন, প্রফেসর থাইসের বক্তব্যে তারই সমর্থন পাওয়া যায়: বাঁধের ফলাফল হিসেবে তলানি জমে নদীতল ধীরে ধীরে ওপরে উঠে আসবে। এ-জাতীয় সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া ঠিকমতো না জেনে-বুঝে তিনি এসব নদীতে বাঁধ না-দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন তৎকালীন সরকারকে।
কিন্তু ১৯৬৪ সালের মাস্টার প্ল্যান প্রণেতা এবং বাস্তবায়নকারীদের কানে এদের কারোর কথাই সম্ভবত প্রবেশ করেনি। তাদের হাতে
তখন ইউএসএইডের সহায়তায় ২ বিলিয়ন ডলারের প্রজেক্ট, তাও ১৯৬৪ সালের মুদ্রামানে! সারাদেশের বিভিন্ন জায়গায় ৫৮টা বড় বড় বন্যানিয়ন্ত্রণ ও সেচ (এফসিডি ও আই) প্রকল্পের জন্য বাঁধ নির্মাণ, ২০ বছরের কাজ। তখন কে শোনে কার কথা!
ফলাফল: ১৯৮০-র শেষাশেষি এই সারা গাঙ্গেয় বদ্বীপে মোটমাট ৭৫৫৫ কিলোমিটার বাঁধ তৈরি করা হলো, শ’খানেক পোল্ডার, তার সঙ্গে আর প্রায় আট হাজারের মতো জলনিয়ন্ত্রণ (হাইড্রলিক) কাঠামো। কিন্তু আদতে ঘটেছে কি? এসব বাঁধ যে সব সময় বন্যা থেকে মানুষকে রা করতে পেরেছে তা কিন্তু নয়। বরং অনেক সময় বন্যার চেয়েও খারাপ অবস্থার সৃষ্টি করেছে। যেমন ২২০ কিমি লম্বা ব্রহ্মপুত্রের পশ্চিম পাড়ের বাঁধের নানা জায়গায় মাটি ধসে গেলে অনবরত বোল্ডার বা বালির বস্তা ফেলে ফেলে সেসব স্থান মেরামত করতে হয়েছে। কোনো কোনো জায়গায় বাঁধ ভেঙে গেলে বন্যার স্রোত তার পেছনের রতি এলাকায় ঢুকে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করেছে। যেমন ১৯৮৭-৮৮ সালের প্রচণ্ড বন্যার সময় শস্যের সবচেয়ে বেশি তি হয়েছে ব্রহ্মপুত্র রাবাঁধের পেছনে। এছাড়াও এসব বাঁধের ফলে ব্যাহত হয়েছে খোলাপানিতে মাছের প্রজনন, মাছ-ধরা এবং নৌকার চলাচল। এতে একদিকে যেমন জেলে এবং মাঝিদের জীবিকা বিপন্ন হয়ে পড়েছে, অন্যদিকে সাধারণ কৃষক পরিবার যারা স্রেফ খাওয়ার জন্য মাছ ধরত তারাও ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে।
তাছাড়া, বিভিন্ন প্রকল্প এলাকায় সৃষ্টি হয়েছে বড় মাঝারি নানা ধরনের জলাবদ্ধতা। এসব মিলিয়ে, বন্যানিয়ন্ত্রণের নামে বাঁধ নির্মাণে যাদের সম্ভাব্য উপকারভোগী ভাবা হয়েছিল, গবেষণা করে দেখা গেছে যে, তাদের অবস্থা অনেক ক্ষেত্রেই আগের চেয়ে খারাপ হয়ে গেছে। এ তো গেল ১৯৬৪ সালের মাস্টার প্ল্যানের কথা। ১৯৮৮ সালের ভয়াবহ বন্যার পরপরই বন্যানিয়ন্ত্রণের তোড়জোড় আবার ব্যাপকভাবে শুরু হয়ে যায়। মঞ্চে আবির্ভূত হয় ফাড অ্যাকশন প্ল্যান (ফ্যাপ) নামে একটি বিশাল মহাপ্রকল্প (মেগা প্রজেক্ট)। এর উদ্যোগ আসে পৃথিবীর সবচেয়ে বিত্তশালী জি-৭ দেশগুলোর সভায়; যাদের মতে, বাংলাদেশের বন্যা তখন ‘আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে’। বিশ্বব্যাংককে দেওয়া হয় ফ্যাপের প্রকল্পগুলো সমন্বয়ের দায়িত্ব। অথচ, ফ্যাপের বিস্তারিত নীলনকশা তৈরি করতে গিয়ে বিশ্বব্যাংক ও অন্যান্য দাতা সংস্থাগুলো যেসব বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে নিযুক্ত করে
তারা কিন্তু এদেশের সাধারণ মানুষের বা বিশেষজ্ঞদের মতামত গ্রহণের কোনো উদ্যোগই নেয়নি। আর পুরো ঘটনাটাই ঘটে জনমত এবং সংবাদ মাধ্যমের দৃষ্টির আড়ালে, তদানীন্তন স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের ছত্রছায়ায়।
১৯৬৪-র মাস্টার প্ল্যানের আইডিয়া ছিল ‘ফ্লাড কন্ট্রোল অ্যান্ড ড্রেনেজ’ বা এফসিডি আর নবগঠিত ফ্যাপের উপজীব্য হলো ‘কন্ট্রোলড ফ্লডিং অ্যান্ড ড্রেনেজ’ বা সিএফডি। সিএফডির ধারণাটা হলো, বন্যার পানিকে আংশিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য কম্পার্টমেন্ট নামক খোপ খোপ এলাকায় জমিয়ে রাখা এবং পাম্প ও স্লুইস গেটের সাহায্যে তাদের মধ্যে পানির আগমন বা নির্গমন নিয়ন্ত্রণ করা। ফ্যাপের পত্তনের সঙ্গে সঙ্গেই এই পরিকল্পনাটি দেশ-বিদেশের বিশেষজ্ঞ মহলে সমালোচিত হতে থাকে। ১৯৮৯ সালের ৩০ নভেম্বর বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বার্ক) আয়োজিত এক আলোচনা সভায় উপস্থিত কৃষিবিদ, গবেষক এবং সমাজবিজ্ঞানীরা বলেন, ‘সারফেস ওয়াটার’ বা মাটির ওপরের পানিকে সরিয়ে দিয়ে বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ জলাভূমিকে খটখটে ডাঙ্গায় পরিণত করার যে ফ্যাপ-কৌশল, তা উৎপাদন বাড়ানোর জন্য খুব একটা ফলপ্রসূ হবে না। বরং, এর প্রস্তাবিত বাঁধ ও কম্পার্টমেন্টের নির্মাণ কাজগুলো এদেশের প্লাবনভূমির মৎস্য এবং বনসসম্পদের ওপরও বিরূপ প্রভাব ফেলবে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের সেদিনকার সেই সাহসী বক্তব্য যেন অর্ধশতালী আগের মহলানবীশ, কিংবা সিকি শতাব্দী আগের হার্ডিন-থাইজের সতর্কবাণীর কথাই মনে করিয়ে দিয়েছিল। বড় বড় বাঁধ বানিয়ে বন্যানিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করার আগে অন্য বিকল্পগুলোর দিকে মনোযোগ দেওয়ার সুপারিশ করা হয় বার্কের প্রতিবেদনে। যথা, আরো কী কী উপায় আছে যা দিয়ে অস্বাভাবিক বন্যার মোকাবেলা করা যায়, অথচ স্বাভাবিক বন্যার উপকারী ভূমিকাও অব্যাহত থাকে? জনগণের মতামতের বিষয়টির ওপরও জোর দেওয়া হয় এই আলোচনা সভায় এবং তার লিখিত প্রতিবেদনে। অথচ এর প্রতি রাষ্ট্রীয় প্রতিক্রিয়া ছিল একেবারে নাটকীয়। তৎকালীন এরশাদ সরকার বার্কের এক্সিকিউটিভ ভাইস-চেয়ারম্যান ড. মতলুবুর রহমানকে ঠুনকো অজুহাতে অবসর নিতে বাধ্য করে। যেসব দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞ সেদিন বার্কের সভায় ফ্যাপের সমালোচনা করেছিলেন তাদের সরকার এবং দাতা সংস্থার সম্মিলিত চাপে নানাভাবে
নিগৃহীত এবং কোণঠাসা করে ফেলা হয়।
নব্বইয়ে এরশাদের পতনের পর বিচারপতি সাহাবুদ্দীনের তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফ্যাপের কার্যক্রম মূল্যায়নের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, ভূগোলবিদ, অর্থনীতিবিদ এবং প্রকৌশলীদের সমন্বয়ে একটা জাতীয় টাস্কফোর্স গঠন করে। এই টাস্কফোর্সের প্রতিবেদন একদিকে ফ্যাপের কারিগরি বা প্রায়োগিক দিক নিয়ে সমালোচনা করেছে, পাশাপাশি এটিও দেখিয়েছে যে, কীভাবে সরকার জনমতের তোয়াক্কা না করে দিনের পর দিন ফ্যাপের কার্যক্রম চালিয়ে গেছে। নিয়তির পরিহাস হলো, নব্বইয়ের গোড়ার দিকে ফ্যাপেরই বিভিন্ন সমীক্ষার ফলাফল স্পষ্টতই দেখায় যে, এদেশের মানুষ সাধারণত বন্যাকে উপকারী হিসেবেই দেখে। তারা বন্যাকে ‘নিয়ন্ত্রণ’ করতে চায় না, যদি না সেটা খুব মারাত্মক আকার ধারণ করে। ১৯৬৪-র মাস্টার প্ল্যানের প্রত্ক্রিয়া মূল্যায়ন করতে গিয়ে ফ্যাপের গবেষকরাই বলেন যে, এই প্রকল্পগুলোর পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের কোনো পর্যায়েই জনগণকে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা হয়নি। বেলা শেষে, ফ্যাপের ক্ষেত্রেও এই উক্তি সত্য হয়ে দাঁড়াল।
যেখানে রাষ্ট্রযন্ত্র এবং তার সহযোগী দেশি-বিদেশি শক্তিগুলো বাংলাদেশের বন্যাকে ‘নিয়ন্ত্রণ’ করার ব্যাপারে এতখানি একাট্টা ছিল, সেখানে মাস্টার প্ল্যান বা ফ্যাপের কার্যত্রক্রমের বিপরীতে বারবার এত সমালোচনার জন্ম হল কী করে? বাংলাদেশের গাঙ্গেয় বদ্বীপের বন্যানিয়ন্ত্রণ-সংত্ক্রান্ত কর্মকাণ্ডের ইতিহাসে এটাই সম্ভবত সবচেয়ে বর্ণাঢ্য দিক। এক কথায় বললে, বাঁধ-প্রযুক্তির বিপরীতে গড়ে ওঠা গণমানুষের প্রকাশ্য ও গোপন প্রতিরোধই ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। সে সম্পর্কে দু-চার কথা না বললেই নয়।
আগামী পর্বে দেখুন
স্বপন আদনান : গবেষক ও অধ্যাপক, ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুর
এ বিষয়ে আজকের প্রথম আলোয় আমার কলামের জন্য দেখুন : সহি টিপাইনামা: জল্পনা আর কল্পনার গণিত Click This Link

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

