আমার প্রিয় পোস্ট

হাঁটা পথে আমরা এসেছি তোমার কিনারে হে সভ্যতা। আমরা সাত ভাই চম্পা মাতৃকাচিহ্ন কপালে দঁড়িয়েছি এসে _এই বিপাকে, পরিণামে। আমরা কথা বলি আর আমাদের মা আজো লতাপাতা খায়।

আমার সাঁই_আমি তাঁর জন্য অপেক্ষা করি।

২৪ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৯ রাত ৮:১৭

শেয়ারঃ
0 0 0

আমার ভয়, আমার রোমাঞ্চ, আমার দুঃসাহসসকল নিয়ে আমি আমার সাঁই_আমি তাঁর জন্য অপেক্ষা করি।

বিরাট মাঠের পারে বাড়ি। বছরে কয়েকবার সেই মাঠে খুনোখুনি লড়াই হয়। প্রথম ভয় সেই বাড়িতে। একদিকে নিকষ বাঁশঝাড়, আরেকদিকে গাছগাছালি ভরা অন্ধকার, আরেকদিকে কয়েকঘর প্রতিবেশী। বিরাট উঠানের পরে দেওয়াল দিয়ে ঘেরা। সেই দেওয়ালে সন্ধ্যা হলেই ছায়াদের নড়াচড়া দেখতাম। দেখতাম আর বুকে হিম ধরে যেত। কাউকে বোঝানো যেত না সেই ভয়। বয়স বেড়েছে দিনে দিনে, ছায়ারাও আসে না আর। তাদের আমি রেখে এসেছি শৈশবের সেই কুহককাতর জগতে। কিন্তু নিয়তির দেয়ালে কীসের যেন ঝলক দেখি, দেখি অন্তিম ভয় হয়ে নাচে সেইসব কৃষ্ণমূর্তি।

প্রথম দুঃসাহস ছিল একটি অন্ধ ও মৃত কূপ। দুভাই মিলে কীসের যেন টানে ঝুঁকে, তার ভেতরে তাকাতাম। অনেক আগে ওখানে লাশ পাওয়া গিয়েছিল। তলার অন্ধকারের দিকে তাকানোর রোমাঞ্চ আজো শিরার লহু চঞ্চল করে তোলে। রাত নামলে পড়োভিটার গহ্বর থেকে নিশাচর যেমন মুখ বাড়ায়, তেমনি বাস্তবের খোপ খুলে পরাবাস্তব রোমাঞ্চের জগতে উঁকি দিয়ে আসি। অন্ধকূপের মতো তারও টান শিহরিত করে, রোমাঞ্চভূক পতঙ্গ হয়ে মনে হয় ঝাপ দিই তার ইশারায়।

প্রথম দুঃস্বপ্ন এসেছিল দরবেশের বেশে। আশ্বিনের ‘বিকেলের দিকে যেই ঝড় আসে তাহার মতোন’ জ্বর আসতো শীত আসি-আসি করা বিকেলে। অসুখের জানালায় বসে আমি দেখি ঘুমন্ত ইঁদারা, পারদে ভাসন্ত চোখ। তারাদের চোখের হিম কুশের মতো এসে বেঁধে মনে। পরম বন্ধুর মতো ঘুম আসে, স্বপ্ন আসে। দেখি আমার জানালার পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন তিনি। কালো মানুষটির পরনে গৈরিক, মাথার মাথালও গেরুয়া, বুকের 'পরে ভোরের মতো আলো-আঁধারি দাড়ি। আধখোলা জানালা দিয়ে আমরা চোখে চোখে তাকিয়ে থাকি।

তাঁর মুখে অদ্ভুত হাসি ভাসে। কণ্ঠে স্নেহ ঝরিয়ে বলেন, ‘নাহ্ থাক, ঘুমাক’।
ঘুমের মধ্যে টের পাই বুকের ’পরে শ্বাস ফেলে চলে গেলেন তিনি। বোবা ধরার অবোধ কষ্টে আমি গোঁ গোঁ করতে থাকি। অনেক বার তিনি এসেছেন। অনেক কাল হলো তিনি আর আসেন না। বোবা ধরা স্বপ্ন আসে কেবল মাঝে মাঝে। রাতভর বৃষ্টি যখন, তপ্ত শরীর হিমে পোড়ে যখন, কোথাও বোবায় ধরা কুকুর করুণ আর্তনাদ করে যখন, আমি বুঝি এমন কোনো রাতেই তিনি আবার আসবেন। আমার ভয়, আমার রোমাঞ্চ, আমার দুঃসাহসসকল নিয়ে আমি আমার সাঁই_তাঁর জন্য অপেক্ষা করি।

৩.
এ অবধি তিনি আসেননি। জন্ম আর বিবাহ এসেছে একই লগ্নে, অঝোর বৃষ্টির মধ্যে। কণ্যা ও তুলার সন্ধিক্ষণে আমি তাহাদের পাই। প্রেম আসে সন্ধি পারায়ে।

জন্মের কথা মনে হলে গর্ভের ঘোলা অন্ধকারের সঙ্গে হলুদ আলোর মেশামেশির দৃশ্য দানা বাঁধে। যেন জল মেশানো ঘন রংদুটি পরস্পরকে গ্রাস করতে চাইছে।গর্ভের অন্ধ ঈশ্বর মাটির দুনিয়ায় সন্তানজন্ম পায় আর নাড়ি কেটে পরমকে হারায়। অথচ অন্ধের চোখ তো ঈশ্বর স্বয়ং। মনের মধ্যে সেই চক্ষু অপলক। তা মলিন দেখে না, সহি দেখে। তা সংসার দেখে না, বিশুদ্ধ প্রেম দেখে।
জননীর পিঞ্জর ছাড়িয়ে মায়াবি পর্দা সরিয়ে চলে আসছি তোমার পৃথিবীতে। আমাকে নিয়েছ যদি রাখবে তো মা? জীবনের চৌকিতে বসিয়ে আমায় তুমি গেছ স্নানে। আর আমার যে একা লাগে! আমি পারি না। উঠোন পেরিয়ে বাঁশঝাড়ের শীতল ছায়ার তলার স্নানঘর আমায় টানে। হাঁটি হাঁটি পায়ে আমি তো তোমার কাছেই যেতে চেয়েছি। উঁকি দিয়েছি দরজার ছোট্ট ফুটোয়। সেই বুঝি আমার প্রথম পাপ। স্নানরতা তুমি জানলে না, আয়েশা হয়ে গেলে তুমি মা; অভিশাপ দিলে: জহরে কহরে মরবি। হায় হাসান, হায় নীল জহর! হায় হোসেন, হায় লাল খুন! মা, তুমি দিলে বর, তাই আমি জহরে জহরে নীলকণ্ঠ শিব। তুমি দিলে শাপ, তাই মাটিতে সিজদা রাখা উবু পিঠে ছুরি খেয়ে চলি।

মৃত্যুর লগ্নের কথাও মনে আসে। মনে আসে এক জোড়া পা, অঝোর বর্ষণের সন্ধ্যায় গোড়ালি ডোবা জলা পেরিয়ে চলে যাচ্ছে। সমস্ত আয়ু নিয়ে সে দাঁড়িয়ে ছিল পথের ধারে। এ পথ ধরেই এসেছিল জনম, এসেছিল বয়সের সাথী, এসেছিলে অধরা স্বপ্ন তুমি।

বয়স হারাতে হারাতে আজো আমি সং হয়ে দাঁড়িয়ে আছি পথের ধারে। অশ্রু বয়ে যাওয়া খাঁড়ির মুখে উদ্দালক হয়ে বারবার বাঁধ জাগিয়েছি তোমাকে থামাব বলে, হে শ্যাম হে মরণ...

এ চোখে নামুক শঙ্খ, দিগন্তরেখার সব খাঁজ ভরে যাক শ্মশানভষ্মে। উঠতি আঁধার তখনি দেখে নিক, কার বুকে জমে আছে কতটুকু জল। কার চোখে কোন অন্ধকার দেখে আলো হতে চেয়েছিল কে?

অকুলের সঙ্গীর জন্য অপেক্ষা করছি বর্ষণমুখর সন্ধ্যার গ্রহণলাগা অন্ধকারে।

 

লেখাটির বিষয়বস্তু(ট্যাগ/কি-ওয়ার্ড): স্মৃতিপ্রেমজন্ম-মৃত্যু ;
সর্বশেষ এডিট : ২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৯ বিকাল ৩:১১ | বিষয়বস্তুর স্বত্বাধিকার ও সম্পূর্ণ দায় কেবলমাত্র প্রকাশকারীর...

 

১. ২৪ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৯ রাত ৮:২৮
আমআঁটিরভেঁপু বলেছেন:
অদ্ভুদ ভাল লাগলো লেখাটা। আবারো পড়বার মতন।
৩. ২৪ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৯ রাত ৮:৪০
ফারুক ওয়াসিফ বলেছেন: আম আঁটির ভেঁপু, আপনি প্রথম পাঠক, আপনাকে প্রণাম।
৪. ২৪ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৯ রাত ৮:৪১
ফারুক ওয়াসিফ বলেছেন: স্বপ্ন কথক, আপনাকেও।
৬. ২৪ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৯ রাত ৯:০৮
ফারহান দাউদ বলেছেন: কয়েকবার পড়বার মতন।
৭. ২৪ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৯ রাত ৯:০৮
পথে-প্রান্তরে বলেছেন: আহারে ! বড় ভালো লাগল । আমিও সঙ্গীর জন্য অপেক্ষা করছি বর্ষণমুখর সন্ধ্যার গ্রহণলাগা অন্ধকারে আপনার সাথে ।
৮. ২৪ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৯ রাত ৯:২০
ফারুক ওয়াসিফ বলেছেন: পড়বার জন্য কৃতজ্ঞ।
৯. ২৪ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৯ রাত ৯:২১
রাগ ইমন বলেছেন: বহুদিন পর মন জুড়ানো প্রাণ ভরানো লেখা পেলাম। দারুণ! দারুণ! দারুণ!


কেবল ১টা ছোট শব্দ , নাকি আমার ভুল? ৩য় প্যারায় ১ম লাইনে মূত কুপ?
১০. ২৪ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৯ রাত ৯:৩০
সেলিনা শিরীন শিকদার বলেছেন: খুউব ভালো লাগলো লেখাটি। অনেক শুভেচ্ছা।
২৫ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৯ সকাল ১১:১৪

লেখক বলেছেন: আপনাকেও শুভেচ্ছা।

১১. ২৪ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৯ রাত ৯:৩০
ফারুক ওয়াসিফ বলেছেন: ঠিক ধরেছেন। ঠিক করে দিলাম। অনেক ধন্যবাদ।
১২. ২৪ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৯ রাত ১০:৫৪
সাধারণমানুষ বলেছেন: প্রিয়তে নেবার মতন দারুন একটা লেখা।
১৩. ২৫ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৯ সকাল ১১:১৩
ফারুক ওয়াসিফ বলেছেন: অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।
১৪. ২৫ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৯ বিকাল ৪:৫২
মাঠশালা বলেছেন: ভালো লাগছে, অনেক।
১৬. ২৬ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৯ সকাল ৯:১৭
রাজর্ষী বলেছেন: জটিল রকমের লেখা। ভালো লাগলো খুবই।
১৭. ২৬ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৯ বিকাল ৪:২৯
ফারুক ওয়াসিফ বলেছেন: অনেক ধন্যবাদ রাজর্ষী
১৮. ২৭ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৯ সকাল ৯:৫৪
শ্যাজা বলেছেন: ভালো লাগা সব সময় বলে বোঝাবো যায় না তাই সে পথে গেলাম না।
১৯. ২৭ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৯ বিকাল ৫:৪৯
ফারুক ওয়াসিফ বলেছেন: আমি বুঝতে পেরেছি।
২০. ২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৯ রাত ৯:৪৯
রাজীব_নন্দী বলেছেন: ‌'দোল পূর্ণিমা নিশি নির্মল আকাশ
মন্দে মন্দে বহিতেছে মলয় বাতাস,
লক্ষ্মী দেবীর বামে বসে কহে নারায়ণ
শুনিতেছে কত কথা সুখের কারণ...'

মা-পিসি-দিদির মুখে প্রতি বিষুদবারে সহস্রবার শোনা। প্রতিবার শোনা প্রতিবার মধুপানের মতই মিষ্ট এই আমার প্রিয় পাচাঁলী। লক্ষ্মীর পাচাঁলী। মনে হচ্ছে এই চ্যকোনা বাক্সটি (কম্পুটার) আমাকে সেই ছন্দ, সেই লয়, সেই গীতি শুনাচ্ছে। আমি সামনে পেছনে হালকা দুলুনিতে গ্রাস করছি আমার সমস্ত আনন্দ। শৈশবের সেই পাচাঁলীর মতোই কোমল-পেলব-শান্ত-স্নিগ্ধ লেখাটি ---------এক ক্লিকে প্রিয়'তে।

আন্তর্জালিক দুনিয়ায় টেরই পেলামা না 'আজ ২৪ তারিখ'! সেই প্রাতে গোল মাহমুদের দরবারে হাজির থাকতে না পারার মত অপরাধ-গোস্তাকি কি মার্জনা করা হবে?
যদি হয় তবে, বুড়িয়ে যাওয়ার জন্য সহস্রবার শুভ কামনা।

ভালো লাগা সব সময় বলে বোঝানো যায় না। তাই সে পথেই হাঁটলাম...
২১. ৩০ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৯ বিকাল ৫:৩৬
ফারুক ওয়াসিফ বলেছেন: শুভকামনা আপনাকেও রাজীব। মিহির সেনগুপ্তের বিষাদবৃক্ষটা পড়েন। এমন শৈশবিক পাঁচালী আর স্লোকে ভরা অসামান্য এক বিষণ্ন কাব্য।

আর তারিখটা ছিল ২২ সেপ্টেম্বর।

 

মোট সময় লেগেছে ০.৯১৮৮ সেকেন্ড

 

সামহোয়‍্যার ইন...ব্লগ বাঁধ ভাঙার আওয়াজ, মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল্যাটফর্ম। এখানে প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর...
© সামহোয়্যার ইন...নেট লিমিটেড | ব্যবহারের শর্তাবলী | গোপনীয়তার নীতি
আর এস এস ফিড

পোস্ট আর্কাইভ

আমার লিঙ্কস

আমার বিভাগ

    কোন বিভাগ নেই