বেশ কিছু দিন হলো বাংলাদেশকে যেন খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। একাত্তরের সময়কার মানচিত্রখচিত অস্থায়ী পতাকাটির কথা বেশি মনে পড়ছে। সবুজ জমিনে রক্তলালের মধ্যে সোনালি মানচিত্রটি যেভাবে দাগানো ছিল, তাতে পুরোটা বোঝা যেত। দেশটাকে হারানোর কোনো সুযোগ ছিল না। কিন্তু আজ চতুর্মুখী চাপে সেই বাংলাদেশ যেন চুপসে যেতে বসেছে।
উত্তপ্ত ও অস্থির হয়ে উঠছে দক্ষিণ এশিয়া। একদিকে চীন আর অন্য দিকে ভারতের তুমুল উত্থান ঘটছে। বাংলাদেশ যেন আটকা পড়েছে দুটি পর্বতের মাঝখানের চাপা গিরিখাতের মধ্যে। অন্যদিকে দুনিয়ার সম্পদের ভাগবাটোয়ারা নিয়ে যুদ্ধের ঝড় জাগছে, অর্থনীতি কাঁপছে মন্দার ভূমিকম্পে। এইসব বৈশ্বিক ঘূর্ণির ধাক্কা আমাদের গায়েও লাগছে। কী আছে সামনের পথে, তার হিসাব আজ বড় বেশি প্রয়োজন।
মিয়ানমার হঠাত্ বাংলাদেশের সমুদ্রসীমার মধ্যে ঢুকে সেখানকার গ্যাসক্ষেত্রগুলোর মালিকানা দাবি করে বসেছে। সীমান্তের ওপারে তাদের কয়েক ব্যাটালিয়ন সেনা যুদ্ধপ্রস্তুতি নিয়ে দাঁড়িয়ে গেছে। চাপ বাড়াতে দলে দলে রোহিঙ্গাদের ঢুকিয়ে দিচ্ছে বাংলাদেশের ভেতর। একই সময়ে বাংলাদেশ সমুদ্রের গ্যাস তোলার প্রস্তুতি শুরু করলে একযোগে আপত্তি করে মিয়ানমার ও ভারত। ফলত বাংলাদেশকে জাতিসংঘের আদালতে সালিসের জন্য দৌড়াতে হচ্ছে। এদিকে ভারতের টিপাইমুখে বাঁধ নির্মাণের ঘটনাকেও ছাপিয়ে যাচ্ছে আরও উজানে ব্রহ্মপুত্রের উেস চীনের বাঁধ নির্মাণ। আমরা কি এখন আরেক দফা ‘বাঁচাও বাঁচাও’ বলে গলা ফাটাব? পরিহাস হচ্ছে, দুর্বল রাষ্ট্র যতই ফরিয়াদ করে বেড়াক, কর্তার ইচ্ছাতেই কর্ম হয়। পরাশক্তির ইচ্ছাই জাতিসংঘের রায়। মিয়ানমারের পেছনে রয়েছে চীন আর চীনের পেছনে রাশিয়া। বাংলাদেশের ব্যাপারে ভারত একাই এক শ হলেও সেরের ওপর সোয়া সের হিসাবে জুটেছে আমেরিকা। স্থল ও সমুদ্রে চারদিক থেকে আটকে যাচ্ছে দেশটা। নেপাল যেমন আছে চতুর্দিকে ভারতবেষ্টিত।
খালি চোখে এসব আঞ্চলিক সমস্যা কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতির ছক ধরে এগোলে বোঝা যায়, সবই পরাশক্তিগুলোর চরদখলের খেলা। আঞ্চলিক নিরাপত্তার প্রশ্ন সর্বদাই বৈশ্বিক নিরাপত্তা প্রশ্নের সঙ্গে জড়িত। পরিস্থিতি অনেকটা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগের সময়ের মতো। তখন যেভাবে বড় শক্তিগুলো যার যার মতো সামরিক জোট বানাচ্ছিল এবং বলি হচ্ছিল ছোটো রাষ্ট্রের স্বাধীনতা। সব নষ্টের গোড়ায় আছে তেল-গ্যাস তথা প্রাকৃতিক সম্পদ এবং বাণিজ্যিক ও সামরিক গুরুত্বসম্পন্ন অঞ্চলের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার টানাটানি।
এসবের মধ্যে দরিদ্র কৃষকের সুন্দরী কন্যার মতোই অরক্ষিত ও বিপন্ন বাংলাদেশ। কেননা বিশ্বরাজনীতির নিম্নচাপটি মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরে এসেছে দক্ষিণ এশিয়ায়। ভারতের কাছে দক্ষিণ এশিয়া হলো তাদের বাড়ির উঠোন। নিজের উঠানে কে না খবরদারি করতে চায়? ভারতের এই চাওয়ার কারণে কোনো প্রতিবেশীর সঙ্গে এর সুসম্পর্ক নেই এবং প্রতিবেশীরাও তাকে নিয়ে তটস্থ। এ অঞ্চল তেল-গ্যাস সম্পদে পরিপূর্ণ এবং এর পাড়া-পড়শিরা সবাই বর্তমান দুনিয়ার বাঘা বাঘা খেলোয়াড়। আফগানিস্তান-পাকিস্তানের প্রতিবেশী চীন, ইরান, রাশিয়া ও ভারত। বাংলাদেশের প্রতিবেশী ভারত-মিয়ানমার-চীন। বিশ্বশক্তি হতে গেলে ভারত ও চীনকে আগে নিজের পাড়ায় দাপট প্রতিষ্ঠা করতে হবে, এখানকার গ্যাস-কয়লা-বন্দর-সড়ক-পানির ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং ভূসামরিক সুবিধা তার প্রয়োজন। চীনেরও বর্তমান উন্নতি বজায় রাখতে দরকার বাইরের জ্বালানি, নিরাপত্তার জন্য চাই বঙ্গোপসাগরে সামরিক উপস্থিতি। ভারতের জ্বালানি ক্ষুধা ও নিরাপত্তাভীতিও দিন দিন বাড়ছে। প্রতিবেশীদের ছায়াকে চীনের ছায়া বলে ভাবা শুরু করেছে তারা। চীন যাতে কোনোভাবে বাংলাদেশ-পাকিস্তানের গ্যাসসম্পদ, বাজার ও ভৌগোলিক অবস্থানের সামরিক সুবিধা পেতে না পারে, তার নিশ্চয়তা চায় ভারত। তা নিশ্চিত করতে আমেরিকা-ইসরায়েলকে সঙ্গে নিয়ে মাঠে নেমেছে তারা। ইতিমধ্যে আফগান-রুশ সীমান্তের দেশ তাজিকিস্তানে ভারত তার প্রথম সেনাঘাঁটি বসিয়েছে। আফগানিস্তানে তাদের সামরিক উপস্থিতি রয়েছে এবং ট্রানজিট-করিডোর ইত্যাদির মাধ্যমে বাংলাদেশেও তাদের প্রভাব বাড়ছে। মার্কিন ও ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সামরিক যোগাযোগ আগের যেকোনো সময়ের থেকে বেশি।
চীনের চাওয়াও কম নয়। জান্তাশাসিত মিয়ানমার মোটামুটি তাদের হাতের তালুতে। সেখানে দুটি বন্দর প্রতিষ্ঠা ছাড়াও পাকিস্তানের বেলুচিস্তানে গাদার বন্দর এবং ভারতের একেবারে গায়ের কাছে শ্রীলঙ্কায় আরেকটি বন্দর তাদের হাতে রয়েছে। অন্যদিকে আন্দামান থেকে বাংলাদেশের উপকূল, ওমান থেকে ইন্দোনেশিয়ার সাগর পর্যন্ত ভারতীয় নৌবাহিনীর দাপট। ভারত মহাসাগরের তীরের দেশ অস্ট্রেলিয়াও ঢুকছে। সব কিছুর ওপরে ‘মজা মারার ফজা ভাই’ হয়ে আছেন যুক্তরাষ্ট্র।
চীন, রাশিয়া ও ভারতের মাঝখানে মধ্য এশিয়ার মানচিত্রটি খেয়াল করলেই বোঝা যাবে, কেন ওবামা বুশের মতোই এ অঞ্চল ছাড়তে চান না। এ অঞ্চল এখন পাইপলাইনিস্তান নামে পরিচিত। ইরান থেকে একটি আর উজবেকিস্তান-তাজিকিস্তান থেকে অন্য যে তেলের পাইপলাইনটি আফগানিস্তান হয়ে বেলুচিস্তানের গাদার বন্দর দিয়ে ভারত মহাসাগরে আসছে, সেটির নিরাপত্তা দরকার। ইরানকে ধরার আগে পাকিস্তান ভেঙে কিংবা অন্তত তার পারমানবিক অস্ত্র কেড়ে নেওয়ার জন্য একযোগে কাজ করছে ভারত-মার্কিন-ইসরায়েলি অক্ষশক্তি। আমেরিকার আসল প্রয়োজন রাশিয়া ও চীনকে ঘিরে ন্যাটো শক্তিবলয় গড়ে তোলা। ভারত মহাসাগরে সামরিক ও বাণিজ্যিক প্রাধান্যও তাদের ইচ্ছার তালিকায়। ভারত মহাসাগর দিয়েই দুনিয়ার সবচেয়ে বেশি বাণিজ্য হয়। এর ওপর নিয়ন্ত্রণ মানে বিশ্বের মোট বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করা। ভারত মহাসাগরের সবুজ পানিতে যারা দাপট করবে, দুনিয়ার দাপটের দণ্ডও তাদের হাতেই থাকবে। মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপত্র ফরেন অ্যাফেয়ার্স পত্রিকা বলছে, ভারত মহাসাগর হলো একবিংশ শতাব্দীর কেন্দ্রীয় মঞ্চ: ‘সাহারা মরুভূমি থেকে ইন্দোনেশীয় দ্বীপপুঞ্জ পর্যন্ত ইসলামের সমগ্র খিলানটিকে জড়িয়ে আছে বৃহত্তর ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চল...এর সীমার মধ্যে রয়েছে সোমালিয়া, ইয়েমেন, ইরান ও পাকিস্তান। এ সাগর ঘিরেই চলছে গতিশীল বাণিজ্য, আবার একে ঘিরেই দানা বেঁধেছে বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদ, জলদস্যুতা ও মাদক চোরাচালান। ভারত মহাসাগরের পূর্বপ্রান্তে বাস করে ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার শত শত কোটি মুসলমান।’ (রবার্ট ডি কাপলান, পাওয়ার প্লেজ ইন দ্য ইন্ডিয়ান ওশেন, ফরেন অ্যাফেয়ার্স, মার্চ/এপ্রিল ২০০৯)
ছড়াকার সুকুমার রায়ের হ-য-ব-র-ল-তে আছে, ‘ছিল একটা রুমাল হয়ে গেল বেড়াল।’ উপমহাদেশের পরিস্থিতিও তেমন। এই বৈশ্বিক প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা নিয়ে ওঠা সমস্যাটা তাই কেবল প্রতিবেশীদের কাজিয়া নয়, বিশ্বের রাজাধিরাজদের ফাঁদ। একইভাবে অসম শর্তে মার্কিন ও ব্রিটিশ কোম্পানির কাছে সামুদ্রিক গ্যাসক্ষেত্র ইজারা দেওয়ার বিষয়টা কেবল দুর্নীতির সমস্যা নয়, তা সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি। এ অবস্থায় যেকোনো যুদ্ধের বলি হবে বাংলাদেশ। বঙ্গোপসাগরে বসবে মার্কিন-ভারতের টহলঘাঁটি। পাতানো খেলায় আখেরে গ্যাসসম্পদ নেবে বিদেশি কোম্পানি আর সার্বভৌমত্ব হবে পরাশক্তির হাতের রুমাল।
সুতরাং, একদিকে মার্কিন-ভারত-ইসরায়েলের দক্ষিণ এশীয় অভিলাষ, অন্যদিকে চীন-রাশিয়া-ইরানের আঞ্চলিক নিরাপত্তার সংকটে বাংলাদেশের অস্তিত্ব টলমল। সম্ভবত, এর থেকে পরিত্রাণ পেতেই প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ঘন ঘন ভারত-আমেরিকা-ইউরোপ সফর করছেন, বলছেন বাংলাদেশকে ঘিরে ষড়যন্ত্রের কথা। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, স্বাধীনতার ৩৮ বছরেও বাংলাদেশ কোনো স্থায়ী মিত্র সৃষ্টি করতে পারেনি। একবার ভারতের দিকে, একবার পাকিস্তানের দিকে এবং সর্বদাই আমেরিকার কক্ষপথে পেন্ডুলামের মতো দুলছি আমরা। চারদলীয় জোট সরকারের আমলে চীনমুখী কূটনীতির জয়গান দেখা গেল। এখন আবার এমন ভারতমুখী জোয়ার চলছে যে, মনে হয় পদ্মার পানি উল্টা পথে গঙ্গা বেয়ে হিমালয়ে ছুটবে। ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিকতার বোঝাপড়াটুকু আর গড়ে উঠল না।
বিশ্বের কূটনৈতিক মানচিত্রে বাংলাদশ তাই আবছা হয়ে আসছে। জাতীয় স্বার্থের পক্ষে রাজনীতিতে কিংবা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রশ্নে বড় দল দুটির স্বচ্ছ ও সম্মানজনক দৃষ্টিভঙ্গি আছে বলে মনে হয় না। উপমহাদেশের রাজনৈতিক পাটাতনেও আমাদের নিজস্ব ভূমিকা বলে কিছু নেই, নেই কার্যকারিতা। আমরা দুলছি বড় রাষ্ট্রের ঢেউয়ের ধাক্কায়—কাণ্ডারিবিহীন।
বাংলাদেশ কেবল পাকিস্তান থেকে বেরিয়ে আসা রাষ্ট্র নয়, নয় কেবল ভারত রাষ্ট্রের প্রতিবেশী ও সেই রাষ্ট্রের বাঙালিদের ‘অপর’ অংশের দেশ। জনস্বার্থের খবর নাই, খামোখাই ‘জাতীয়তাবাদ’ নিয়ে রীতিমতো মনস্তাত্ত্বিক গৃহযুদ্ধ বাধিয়ে মানুষের মগজ ঘুলিয়ে খান একশ্রেণীর রাজনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবী। তাদের এক দল পাকিস্তানের কোটরে আস্তানা গেড়ে ভারতের দিকে খবরদারির আঙুল তোলে; আরেক দল ভারতের কাঁধে শুকপাখি হয়ে বসে, পাকিস্তানের প্রেত তাড়ানোর মন্ত্র পড়ে যাচ্ছে। দুটোই ভারত ও পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়া। তাহলে কর্তারূপ বাংলাদেশের ক্রিয়া কই? যে বাংলাদেশ বয়সে চল্লিশ হতে চলল, যে বাংলাদেশ এমন এক সময়ে রক্ত দিয়ে স্বাধীন হয়েছে যখন বিশ্বে স্বাধীন রাষ্ট্রের আবির্ভাব প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছিল, যে বাংলাদেশ উপমহাদেশের নিপীড়িত জাতিগুলোকে পথ দেখিয়েছিল, জবাব দিয়েছিল সাম্প্রদায়িক দেশভাগের; যে বাংলাদেশ যুগের পর যুগ ধরে সোনার বাংলার স্বপ্ন দেখেছে, যে বাংলাদেশ সহস্র বছর মর্যাদার সঙ্গে টিকে থাকতে চায়, যে বাংলাদেশের মানুষ কর্মঠ, উদার ও গণতান্ত্রিক, সেই বাংলাদেশ কারও প্রতিক্রিয়া হতে পারে না। আমরা চলব আমাদের নিজস্ব ভালো-মন্দের হিসাবে। সেই হিসাবের খাতিরে সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব ও সমান সমান সম্পর্ক হতে বাধা কোথায়? ওপরে বাহাদুরি আর ভেতরে খয়ের খাঁগিরির কপটতা আর কত?
ঘরে-বাইরে যে সমস্যার চক্রে আজ আমরা ঢুকে পড়েছি, তা আসলে বহু দিনের অবহেলা আর নির্লজ্জ আত্মস্বার্থচরিতার্থতার জমাট ফল। এর খেসারত দিতে হচ্ছে বর্তমান প্রজন্মকে। বিশ্বায়নের সুবিধা তাই আমাদের হলো না, আমাদের বরাতে জুটল কেবলই বঞ্চনা।
হরিণের বিপদ তার মাংসের স্বাদে। আমাদের বিপদও আমাদের সম্পদ ও স্বাধীনতার জন্য যেমন, এই স্বার্থপর দৌড়ের জন্যও তেমন। কিন্তু দেশের দিকে তাকিয়ে কি মনে হয় কোথাও পৌঁছানো যাচ্ছে? ভেতরে-বাইরে কোণঠাসা হয়ে উদ্ভ্রান্তের মতো চলছে দেশটা। কী ছিল আর কী হলো!
বাংলাদেশকে তাই খুঁজে বেড়াই। ‘সে কেবল পালিয়ে বেড়ায়, দৃষ্টি এড়ায়, ডাক দিয়ে যায় ইঙ্গিতে।’
* লেখাটি আজকের প্রথম আলোর সম্পাদকীয় পাতায় প্রকাশিত হয়েছে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

