somewherein... blog badh bhangar awaaj recent posts http://www.somewhereinblog.net http://www.somewhereinblog.net/config_bangla.htm copyright 2006 somewhere in... সরকারি ফ্যাসিজম, নো পাসারান: ছাড়ান নাই হে নব্যরাজাকার
তারপরো লক্ষণ শুভ, আঘাতে আঘাতে তারা জাগিয়ে তুলছে মানুষকে, প্রহারে প্রহারে খরচ করছে শক্তি। স্বৈরশাসনের পতনের শুরু এভাবেই হয়।

শাহবাগে, পল্টনে, মীরপুরে, মোহাম্মদপুরে, ঢাবিতে কেবল গ্রেফতার আর গ্রেফতার। ভোর সাতটায় জাদুঘরের সামনে থেকে নারী-পুরুষ মিলিয়ে ১২ জনকে গ্রেফতার করা হয়। পিটিয়ে একজনের পা ভাঙ্গে পুলিশ, একজনের চোখে আঙ্গুল ঢুকানোর চেষ্টা করে, মেয়েদের প্রত্যেকেই হয় চড়-থাপড়ের শিকার। তুলনায় পল্টন এলাকায় ভোরের গ্রেফতারে নির্যাতন কম ছিল। সবার আগে গ্রেফতার হন আনু মুহাম্মদ। অবশ্য, গনঅসন্তোষের ভয়ে ঘন্টাখানেক পরেই তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। যুদ্ধসাজে ছিল পুলিশ ও র‌্যাব, জলকামান, টিয়ার-কামান। এ পর্যন্ত গ্রেফতার শতাধিক।

ভোরেই শাহবাগ-আজিজ মার্কেট-চারুকলা এলাকায় চলে পুলিশের দাঙ্গাবাজি অ্যাকশন। ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে গ্রেফতার হন কবি অভিজিত দাস। সাড়ে আটটার দিকে সিপিবির পাশের গলি থেকে নিশ্চিত গ্রেফতার জেনে স্লোগান দিতে দিতে আসেন বাসদের কেন্দ্রীয় নেতা রাজেকুজ্জামান রতন, গণসংহতি আন্দোলনের কেন্দ্রীয় নেতা জোনায়েদ সাকি, আবু বকর রিপন, ছাত্র-যুব আন্দোলনের কামরুল ইসলাম সবুজ। দেখামাত্রই তাদের আটক করা হয়, ‘রক্ত দেব জীবন দেব, তেল-গ্যাস দেব না’ স্লোগান দিতে দিতে প্রিজন ভ্যানে ওঠেন তাঁরা। নেতাদের গ্রেফতার দেখে দূরে দাড়ানো দীপক রায় স্থির থাকতে পারেনি। ছুটে আসা মাত্রই তাকেও আটক করা হয়। এখন পল্টন থানার হাজতঘর ভরা বিপ্লবী নেতাকর্মী।

মিছিল নিয়ে এগতে গিয়ে গ্রেফতার হন শ্রমিকনেত্রী মোশরেফা মিশুসহ তার কয়েকজন সহযোদ্ধা। জাতীয় কমিটির আহ্বায়ক ইঞ্জিনিয়ার শহীদুল্লাহর সঙ্গে হাইকোর্টের সামনে দিয়ে যাচ্ছিলেন গণসংহতি আন্দোলনের নেতা লেখক ফিরোজ আহমেদ, লেখক ও কর্মী নাসরিন সিরাজ অ্যানি, কর্মী বিথী চৌধুরী। পুলিশ তুলে নিয়ে যায় তাদেরও।
১১টায় যখন ঢাবির রাজু ভাস্কর্যে সমাবেশ শেষ করে চলে যাচ্ছিল জাতীয় কমিটির ছাত্রকর্মীরা, ঠিক তখনই শতশত পুলিশ তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। টিসএসসির ভেতরে আশ্রয় নেওয়া ছাত্রছাত্রীদের খুঁজে খুঁজে গ্রেফতার করে। রমনা পার্কে পালিয়েও রেহাই পায়নি অনেকে। শাহবাগ থানার হাজত ভরে গেছে ঢাবির শিার্থীদের দিয়ে। খবর পাচ্ছি সামারি কোর্টে অনেকেরই কারাদণ্ড নিশ্চিত করা হয়েছে।

১১.৫০ এ বাসদের গলিতে চলছিল সমাবেশ। সেখানে পুলিশ হামলে পড়ে, ইচ্ছামতো লাঠিচার্জ করে, মেয়েদের রাস্তায় ফেলে পেটায়। আওয়ামী গণতন্ত্রের স্বাদ বিএনপি জামাতের গণতন্ত্রের মতো বড়ই মধুর। বিএনপি যা করেছিল ফুলবাড়ী-কানসাটে, আওয়ামী লীগ আজ তার করার মহড়া দিল রাজধানী শহরে।

কারা দেশদ্রোহী? যারা দেশ বিক্রি করে তারা, নাকি যারা দেশের সম্পদ বাঁচাতে জানবাজি লড়ে তারা? হরতাল করা যদি দেশদ্রোহ হয় তাহলে হাসিনা-খালেদা কতবার দেশদ্রোহ করেছেন? যে জুলুম আজ সরকারি বাহিনী করেছে, তা সেনাশাসনকেও হার মানাবে। স্পষ্টতই মার্কিন দূতাবাসের হুকুমে জাতীয় কমিটির কর্মীদের ওপর তারা নির্যাতন-গ্রেফতারের স্টিমরোলার চালিয়েছে। সরকারি দাপট দেখে প্রভুরা খুশি হবে, কিন্তু এই জুলুমবাজি তোমাদের ‘রাজাকার’ হিসেবে দেশবাসীর কাছে চিনিয়ে দিল। যে বিএনপি চুক্তির কপি দেখেনি বলে হরতাল সমর্থন করতে পারেনি, সেই বিএনপি-জামাত এখন মসনদলোভী হরতাল ডেকেছে ৪৮ ঘন্টার। স্পষ্টতই তাদের এই হরতাল ডাকা জাতীয় কমিটির আন্দোলন এবং সরকারি নির্যাতন-নিপীড়নকে কিছুটা আড়াল করতে সহায়ক হবে। তারা আগেও রাজাকার ছিল, এখন বাড়তি যোগ হয়েছে রাজনৈতিক লুম্পেন চরিত্র।

লুটপাটের সরকারের প্রতিহিংসাই আজ চিনিয়ে দিচ্ছে কারা সত্যিকারের দেশপ্রেমিক, কারা জাতীয় সম্পদের পাহারাদার। যে অদৃষ্টপূর্ব ধড়পাকড় নির্যাতন চললো, তা ফ্যাসিবাদের সামিল। দেশবিক্রির ঠিকাদার আওয়ামী লীগ সরকার আজ প্রমাণ করলো, জাতীয় কমিটিই জাতির হয়ে কথা বলছে। মুখোশ খসে পড়ছে আর ভীত হয়ে পড়ছে তারা। জাতীয় কমিটির প্রতিপক্ষতা করে সরকার জাতীয় কমিটিকে জনগণের কমিটি হিসেবে এক ধাপে অনেক উঁচুতে নিয়ে গেল। প্রচার আন্দোলন এভাবেই পরিণত হচ্ছে প্রতিরোধ আন্দোলনে। প্রশ্ন হচ্ছে, সহস্র সাহসীরা বুক পেতে যে নির্যাতন-গ্রেফতার-লাঞ্ছনা নিয়ে সাম্রাজ্যবাদের দালালদের রুখে দিচ্ছেন, তখন আপনি/আপনারা কী করছেন?
লক্ষণ শুভ, আঘাতে আঘাতে তারা জাগিয়ে তুলছে মানুষকে, প্রহারে প্রহারে খরচ করছে শক্তি। স্বৈরশাসনের পতনের শুরু এভাবেই হয়।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/farukwasifblog/29406503 http://www.somewhereinblog.net/blog/farukwasifblog/29406503 2011-07-03 15:16:19
হরতাল ঠেকাতে সরকারের ইসলামি ফেউ মোকাবিলায় টোকাইদের আচরণবিধি
......................
আওয়ামী লীগকে ধন্যবাদ, ৩ তারিখের আগেই জাতীয় কমিটির হরতালকে তারা নৈতিক সফলতা দিল। জাতীয় স্বার্থরক্ষার প্রশ্নে লুটেরাদের নৈতিক হারটা হরতালের আগেই ঘটে গেল। প্রথমত, কনকো-ফিলিপিসের সঙ্গে চুক্তিটা হরতালের আগে প্রকাশিত না হওয়ায় হরতালের যৌক্তিকতা প্রতিষ্ঠিত হলো, দ্বিতীয়ত ‘দেশপ্রেমের’ দেমাগ প্রদর্শন শেখ হাসিনাকে আরো জনবিচ্ছিন্ন করলো, তিনি তাঁর অহংকারি পা মাটিতে ফেলতে ব্যর্থ হলেন। তৃতীয়ত, বন ও পাউরুটি মন্ত্রী (নামকরণের কপিরাইট রাজীব নন্দী) টোকাইদের জাতীয় স্বার্থরক্ষক ঘোষণা করায় অজস্র ছাত্র-তরুণদের সামনে টোকাই হওয়া একটা দেশপ্রেমিক দায়িত্ব হিসেবে হাজির হলো; ফলত টোকাই সমাজ সংখ্যায় আরো বাড়লো, স্বভাবে হয়ে উঠলো আরো দুর্দান্ত।

মুখে চুনকালি লাগায় এখন সরকার মান বাঁচাতে মাঠে নামালো চরমোনাইয়ের দলবলকে। কীসব হাবিজাবি কারণে তারা ১০ তারিখে হরতাল ডেকেছিল। কোথাও কলকাঠি নড়লো আর সেই অহেতুক হরতাল এসে পড়লো জাতীয় কমিটির আগামী কালের (৩ জুলাই) হরতালের ওপর। সরকার কেবল ডাণ্ডায় ভরসা পাচ্ছে না, নার্ভাস হৃদয়ে তাই ষড়যন্ত্রের আশ্রয় নিচ্ছে। কিন্তু কোনো যন্ত্রেই লাভ হওয়ার নয়। এখন টোকাইদের ডাণ্ডার বাড়ি মারলেও বিপদ, না ঠেকালেও বিপদ। এই অবস্থায় ইসলামওয়ারাই তাদের বিপদতারিনী বন্ধু। ৩ জুলাই তারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে জাতীয় কমিটির সঙ্গে। উদ্দেশ্য, একদিকে হরতালের বৈধতা ও সফলতাকে ছিনতাই করা, অন্যদিকে প্রগতিশীল দেশপ্রেমিকদের সঙ্গে ইসলামপন্থী প্রতিক্রিয়াশীলদের একাকার করায় ভাড়া খাটা। কৌশলটি নতুন নয়। তিনটা উদাহরণ মনে আসছে:


১. নারী উন্নয়ন নীতির ভাওতা প্রত্যাখ্যান করার আন্দোলন ঘুরিয়ে দিতেও এদের নামানো হয়েছিল। বাঘ ছেড়ে ফেউ খেদানোর উস্কানি দেওয়ার এই খেল জরুরি অবস্থার সময়ও আমরা দেখেছি। অনেকের মনে একটা সমীকরণ কাজ করে: মোল্লারা যা কিছুর বিরোধী আমরা তার সমর্থক। নারী সংগঠনসহ ‘প্রগতিশীল বলে পরিচিতি’ অনেকে এই ভাওতাবাজির চক্করে নারী নীতির প্রতারণা খুলে দেখানোর সুযোগই পেল না। সরকারের বিরোধিতাটা সেমিনারে সেরে মাঠের আন্দোলন চললো আমিনী গংদের বিরুদ্ধে। এতে আওয়ামী লীগের প্রগতিশীল ভাবমূর্তি রক্ষা পেল, নারীরা পেল না কিছুই।

২.জরুরি অবস্থার সময়ও নারী নীতি ঘোষণার পরে বিমানবন্দরের সামনে বাউল ভাস্কর্যকে কেন্দ্র করে একইভাবে পোষা হুজুরদের মাঠে নামানো হয়। হুজুরদের জুজু দেখিয়ে সেই নীতি স্থগিত করায় তখন ফখরু সরকারের আর অসুবিধা হয় না। খেলার নিয়মটা হলো, জুজুর ভয় দেখিয়ে প্রতিপদের তটস্থ করে তাদের ক্ষোভকে অন্যদিকে চালনা করা। নন ইস্যুকে ইস্যু করে আসল ইস্যুকে নজরের বাইরে রাখা।

৩. ২০০৬ সালের বিএনপি আমলে আগষ্টের শেষে ফুলবাড়ীতে এশিয়া এনার্জি বিরোধী সমাবেশে গুলি করে তিন কিশোর হত্যার প্রতিবাদে জাতীয় কমিটি ঢাকায় হরতাল ডেকেছিল। আওয়ামী লীগ হঠাৎ সেই হরতাল সমর্থন করে বসে। উদ্দেশ্য হরতালের জনসমর্থন ছিনতাই করা। মিডিয়াও একে আওয়ামী-বিএনপি বিরোধের ছকে ফেলে প্রচার দেয়। তাতে জাতীয় কমিটির ইমেজের ধার কিছুটা কমে এবং আওয়ামী লীগের কুম্ভীরাশ্রু মহিমা পায়।


৩ তারিখের টোকাই-বিপ্লবীরা তাই সাবধান। সামনে পুলিশের ডাণ্ডা, পেছনে মোল্লাতন্ত্রের ফেউ। পুলিশ আপনাদের থামাবে আর মোল্লারা আপনার ইমান ও নিশানকে কালিমালিপ্ত করবে। এমনকি শেষ মুহূর্তে বিশ্বাসঘাতকতায় সেরা বিএনপির সমর্থনও পেয়ে যেতে পারেন_ ২০০৬ এ যেমনটা করেছিল আওয়ামী লীগ। এই চতুর সরকারি চাল কেবল কথা বা বিশ্লেষণ দিয়ে ঠেকানো যাবে না। আবার ‘কিছু করার নাই’ বলে উপেক্ষা করাও উচিত হবে না। অপঘটনাকে পাল্টা ঘটনা দিয়েই ঠেকাতে হবে। নিজেদের কর্মসূচিকে নিজেদের শর্তেই পরিচিত করতে হবে। সুতরাং সমস্যা হলো: সরকার চেয়েছে বাম আর মোল্লাদের একাকার করে উন্নয়নের সমস্যা হিসেবে দেখাতে। মোকাবিলায় এমন ঘটনা ঘটাতে হবে যাতে সরকারি চাল বুমেরাং হয়ে যায়। অর্থাত স্পষ্ট হয় যে, জাতীয় স্বার্থ বিসর্জনের প্রশ্নে জাতীয় কমিটির বিরুদ্ধে ইসলামী আন্দোলনের হরতাল আসলে সরকারেরই চাল। তারা এখানে সরকারেরই পঞ্চমবাহিনী। এটা বোঝানো সম্ভব একইসঙ্গে পুলিশ-মাস্তান আর মোল্লাদের বিরোধিতা করার মধ্যে দিয়ে। জাতীয় কমিটির কর্মীরা যেখানে মাঠে থাকবে, সেখানে কোনোভাবেই ইসলামী শাসনতন্ত্রওয়ালাদের নামতে না দেওয়া, দরকার মতো ধাওয়া করতে হবে। প্রয়োজনে কেবল পুলিশের মার খাওয়া নয় মোল্লাদের মারও খেতে হবে। এই দৃশ্য মিডিয়ায় এলে মানুষ সহজেই বুঝে ফেলবে, সাম্রাজ্যবাদী লুণ্ঠনের বাস্তবায়ক আওয়ামী লীগ-বিএনপির সঙ্গে মোল্লাতন্ত্রও জুড়ি বেঁধেছে। সরকারি কূটচাল ঠেকাতে টোকাইদের চাল দিতে হবে সোজাসুজি- রুখে দাঁড়িয়ে। যে গিট্টু খোলা যায় না, সেই গিট্টু কেটে ফেলাই নিয়ম।

হরতালে টোকাইবিধি
জাতীয় সম্পদের ওপর বহুজাতিক সাম্রাজ্যবাদীদের দখল কায়েম নিছক অর্থনৈতিক লুণ্ঠন না; এটা জাতীয় স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও অর্থনৈতিক স্বাধিকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক আগ্রাসন। তাই এর বিরুদ্ধে আন্দোলনটাও সিভিকো-মিলিটারি-কর্পোরেটতন্ত্রের দুর্নীতি বিরোধী আন্দোলনের কায়দায় হওয়া উচিত হবে না। সংবিধান দিয়ে জুতা মোছা হবে না টুপি বানানো হবে, দেশের প্রধান রাজনৈতিক সমস্যা সেটা নয়। প্রধান সমস্যা হলো প্রকৃতি-জীবন-সম্পদ ও স্বাধীনতার ওপর সর্বগ্রাসী দখলের বাস্তবতা। যাঁরা এর বিরুদ্ধে, তিনি দলের হোন বা না হোন, বাম হোন বা না হোন, তাঁদের দায়িত্ব আগামী কালের হরতালে সর্বশক্তি দিয়ে নামতে হবে। কোনো জ্বালাও পোড়াও নয়, নিজের শরীরে রাষ্ট্রের হিংসা ধারণ করে প্রতিবাদ করুন। যে যেখানে আছেন সেখান থেকেই আপনার প্রতিবাদকে দৃশ্যমান করুন> প্রতিবাদী টিশার্ট বা ফেস্টুন বা পোস্টার গায়ে নিয়ে ঘুরুন> কয়েকজন এক হয়ে রাস্তার পাশে ব্যানার নিয়ে দাঁড়িয়ে যান> কিংবা গিটার হাতে শুরু করে দিন গান। হাতে জাতীয় কমিটির প্রচারপত্র রাখুন, যাকে পান তাকেই দিন>আড্ডা-আলোচনা-স্ট্যাটাস সবখানে এই প্রসংগ তুলুন। ফেসবুকের প্রোফাইল পিকে রাখুন জাতীয় কমিটির পোস্টার বা অন্য কোনো প্রাসংগিক ছবি। মোবাইলটাকে গণপ্রচারণার হাতিয়ার বানিয়ে তুলুন> মেসেজ, ছবি, ভিডিও আপলোড করতে থাকুন, ছড়াতে থাকুন। যা বিশ্বাস করেন, যে প্রতিবাদ মনে পুষে রাখেন, যে যুক্তি সঠিক মনে হয়, আগামী কাল তা প্রতিষ্ঠায় অন্তত এক পা আগান। নিজেকে বিশ্বাস করলে মানুষের কাছে যান, সহযোদ্ধাদের খুঁজে নিন। মনে রাখবেন, আন্দোলন শেয়ারের ব্যবসা নয়, এতে ক্ষতি হবে, ঝুঁকি আসবে কিন্তু আখেরে সর্বনাশ ঠেকানো সম্ভব হবে। হতেই হবে।

*ফটো কৃতজ্ঞতা নৃপ অনুপ
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/farukwasifblog/29406064 http://www.somewhereinblog.net/blog/farukwasifblog/29406064 2011-07-02 18:20:00
একাত্তরের অ্যান্টিথিসিসের মা জননী শর্মিলা বোসের লাশগণনার ভুতুড়ে ইতিহাস ২
একাত্তরের ইতিহাস ও অভিজ্ঞতার প্রাণভোমরা হলো বর্বর দখলদারদের প্রতিরোধের মাধ্যমে স্বাধীন সার্বভৌম জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার চেতনা। এই কারণেই একাত্তরের প্রাণ বিসর্জন ও নিপীড়নের অভিজ্ঞতা মানবতার ধ্বংসের বিরুদ্ধে মানবতার উত্থানেরমহত্ব অর্জন করে। শর্মিলা বোসেরা এই প্রাণভোমরাকেই হত্যা করতে চান। তাই গণহত্যা ও গণধর্ষণের কার্যকারণ ও মাত্রাকে ঢেকে দিতে তিনি যে ঐতিহাসিক প্রতরণার দাগ আঁকেন সেটা একে একে স্বাধীনতা আন্দোলন, বাঙালি জাতীয়তাবাদের আদর্শ, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ভিত্তি, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি সব কিছুকেই বিদ্ধ করে, নাকচ করে দেয়, সবকিছুর অ্যান্টিথিসিস হয়ে ওঠে। তিনি হয়ে ওঠেন একাত্তরের অ্যান্টিথিসিসের প্রণেতা।

এখানেই তাঁর থিসিস বা চিন্তা আর পাকিস্তানী সামরিক জান্তা ও তার দেশীয় দোসরদের চিন্তা একাকার হয়ে যায়। এ কারণেই শর্মিলা বোসের ইতিহাস এক বিষাক্ত ইতিহাস। তিনি বাংলাদেশের জন্মেতিহাসকেই বদলে দিতে চান। তিনি দিচ্ছেন নতুন সৃষ্টিতত্ত্ব বা জেনেসিস। এটাই তাঁর আগ্রহের মূল প্রণোদনা, তাঁর লক্ষ্য এবং এ জন্য তিনি সবচেয়ে স্পর্শকাতর ও অরক্ষিত জায়গায় আঘাত করেছেন। জয়া চ্যাটার্জি বেঙ্গল ডিভাইডেড বইয়ে ১৯৪৭ এর বঙ্গভাগের জন্য ভারতীয় কংগ্রেস এবং হিন্দু সাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদকে দায়ি করেন, দায়ি করেন তাদের সংখ্যাগুরু বাঙালি মুসলমান কৃষকের সঙ্গে ক্ষমতা ভাগাভাগি না করার মানসিকতাকে। আর শর্মিলা বোস করেন তার বিপরীত, পাকিস্তান-ভাগের জন্য অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতীয়তাবাদকে দোষী করেন, কারণ তা সংখ্যালঘু পাঞ্জাবী শাসকদের অধীনস্ততা মানতে চায়নি। তাই বাংলা ভাগ আর পাকিস্তান ভাগ এক ঘটনা নয়। কারণ বাঙালিরা এক জাতি কিন্তু পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের অধিবাসীরা ধর্মে এক হলেও জাতিতে এক নয়। শর্মিলা বোস তাঁর ঘোরগ্রস্থ চোখে তাদের এক জাতি ঠাউরেছেন বলেই পূর্ব বাংলায় পাকিস্তানী উপনিবেশ কায়েম তাঁর চোখে পড়ে না, বাদ পড়ে যায় একাত্তরের আগের ২৪ বছরের বঞ্চনা ও সংগ্রামের ইতিহাস। এজন্যই স্বাধীনতা যুদ্ধ হয়ে যায় ‘গৃহযুদ্ধ’ আর হানাদার ও মুক্তিযোদ্ধাদের তিনি এক পাল্লায় তুলে পরিমাপ করেন। কারণ তাঁর পাল্লা একটাই, দৃষ্টিও একরোখারকম সংকীর্ণ। একাত্তরের আগের স্বাধীনতা সংগ্রামকে ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী ষড়যন্ত্র’ হিসেবে দেখেন বলেই বাঙালিদের ওপর চালানো গণহত্যা ও গণধর্ষণের অভিযোগ হয়ে ওঠে ‘অতিরঞ্জন’ এবং বাঙালিদের বাড়াবাড়ির 'মানবিক' প্রতিক্রিয়া।

ইতিহাস লিখন অতিমাত্রায় রাজনৈতিক কাজ। সত্যিই, এই উপমহাদেশে রাজনৈতিক সংঘাতের আগুন ইতিহাসের বিতর্ক থেকেই পর্যাপ্ত বারুদের সরবরাহ পেয়ে আসছে। তাই ইতিহাস-নির্মাণও একটা রাজনৈতিক কাজ। শর্মিলা বোস এখানে একা নন, খোদ পাকিস্তানী রাষ্ট্রযন্ত্র এবং একাত্তরের ঘাতকরাও এখনো ভূতগ্রস্থের মতো বাস্তবতাকে অস্বীকার করে চলেছে। কিন্তু একাত্তর সাল বহু শতক আগের দিন নয়, একাত্তরের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার শিকার বিরাট এক জনগোষ্ঠী এখনো জীবিত, এখানো জীবিত মুক্তিযোদ্ধা, গণহত্যায় নিহতদের স্বজন এবং ধর্ষণের শিকার নারীরা।

শর্মিলার নতুন ইতিহাস পুস্তক মুক্তিযুদ্ধের ধারাবাহিকতা রক্ষাকারীদের জন্য একটা সতর্কতা। একাত্তরের প্রজন্ম এবং তাঁদের সন্তান-সন্তুতিরা জীবিত থাকাবস্থাতেই যদি মাত্র চল্লিশ বছর আগের ইতিহাস এমন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে, তাহলে আরো চল্লিশ বছর পরে কী হবে, তা ভাবা দরকার। দুর্বল ঐতিহাসিক নজর, পাতলা বুদ্ধিবৃত্তিক পেশী এবং জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক চেতনার বিবর্তন সম্পর্কে অপরিপক্কতা থেকে অনেকের মধ্যে এ ধরনের বিতর্ক অবিচলিতভাবে করার তাকদ দেখা যায় না। কিন্তু ইতিহাস উদঘাটন এবং তাকে জনমানুষের সংস্কৃতিতে জীবন্ত রাখার প্রচেষ্টা আতংক বা উত্তেজনা দিয়ে হবার নয়। চেনা কাহিনীর বাইরে কিছু ঘটলেই হা রে রে করে তেড়ে যাওয়া দিয়ে কিছুই অর্জিত হবে না। বিশ্বের সরকার ও নাগরিকদের জনমত তো বটেই, পরিবর্তমান দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের নাগরিকদের মধ্যেও স্বাধীনতার মোটাদাগের ইতিহাসে অভক্তি আসতে পারে।

বর্তমানে ‘মুক্তিযুদ্ধওয়ালাদের’ ব্যর্থতাকে পুঁজি করে ভুতুড়ে শক্তিগুলো দাপট অর্জন করতে পারে, বিশেষত বর্তমান সরকারের সমূহ ব্যর্থতা, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং ভারতীয় আধিপত্যের বাড়বৃদ্ধি তাদের জন্য মওকা মেলাতে পারে। সেরকম পরিস্থিতিতেই শর্মিলা বোসের ইতিহাসের অ্যান্টিথিসিস, একাত্তরের রাজনৈতিক অ্যান্টিথিসিসের জমিন যোগাতে পারে। একাত্তরের নথিবদ্ধ, দালিলিক প্রমাণের মহাফেজখানা সৃষ্টি, জনমানসে স্মৃতির পুনর্জাগরণ, শর্মিলা বোস কথিত ‘অশিক্ষিত’ বাঙালির শ্রুতিসাক্ষ্য ধারণ করে রাখা, সাত কোটির মধ্যে জীবন্ত দুই কোটি বা তারো কম মানুষের প্রত্যেকেরই বলবার মতো অভিজ্ঞতার যতটা সম্ভব সংরণ করা, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এ বিষয়ে দলীয় প্রভাবের বাইরে নিষ্ঠাবান গবেষণা উৎসাহিত করা খুবই প্রয়োজন। মনে রাখতে হবে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কোথাও তার সহযোগী যুদ্ধাপরাধীদের বিচার আজ অবধি হতে দেয়নি। তার ওপরে শীতল যুদ্ধের পটভূমিতে বাম ঘরানার আবহে বাংলাদেশের আবির্ভাবকে পুঁজিবাদী বিশ্বও ভালভাবে নেয়নি। সাবেক উপনিবেশিক দেশগুলোর জাতীয়তাবাদকে তাদের একাডেমিয়ায় সর্বদাই ত্র“টিপূর্ণ মনে করা হয়। বেনেডিক্ট এন্ডারসন কিংবা ওরিয়েন্টালিস্ট থিওরিস্টরা সেই তত্ত্ব ফেঁদে আসছেন: জাতিরাষ্ট্র ও জাতীয়তাবাদ তাঁদের চোখে ইউরোপের একচেটিয়া সম্পত্তি। বাংলাদেশের গণহত্যার ব্যাপারেও তারা সুচিন্তিতভাবে উদাসীন। অন্যদিকে বিজয়ী বাংলাদেশ একটা বিজয়ের ইতিহাস তৈরি করলেও তা মুক্তিযুদ্ধের ব্যাপকতা ও জটিলতাকে নিরসন করেনি। বিজয়ও এ কারণে তাই সম্পূর্ণ হয়নি। একাডেমিক ইতিহাস চর্চা থেকে এ সমস্যা মিটবে বলে মনে হয় না। এটাকে আগে মেটাতে হবে রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভেতর। এসব বিষয় বিবেচনা করে আওয়ামী-বিএনপির ছাতার অন্ধকার থেকে বেরিয়ে একাত্তরের বহুমাত্রিক জটিল ও গভীর খনিতে নামা প্রয়োজন। বাংলাদেশের ঐতিহাসিক বিকাশকেও ভারতের বগলের চাপ কিংবা পাকিস্তানের ভুতুড়ে কোটর থেকে বের করা দরকার। ভারতপ্রেমী-পাকিস্তানকেন্দ্রিক চাপে বাংলাদেশ হারিয়ে যাচ্ছে। একদল তরুণ গবেষকই এ কাজে আগুয়ান থাকতে পারে।

এক পাকিস্তানী সেনা বলেছিল যে, আমরা যাকে খুশি তাকে হত্যা করতে পারি, এর জন্য আমাদের কারো কাছে জবাবদিহি করতে হবে না। পাকিস্তান সরকার নিযুক্ত হামিদুর রহমান কমিশনও বলেছিল যে, বাংলাদেশ যদি গণহত্যা ও ধর্ষণের উপযুক্ত প্রমাণ দিতে পারে তাহলে বিবেচনা করা হবে। শর্মিলা বোসও লিখেছেন, ‘বাংলদেশিরা তাদের দেশের জন্ম নিয়ে উচ্ছ্বসিত, কিন্তু নিয়মসংগতভাবে ঐতিহাসিক রেকর্ড-রাখার কাজ তারা সামান্যই করেছে। এবং ১৯৭১ বিষয়ে ব্যাপক লেখালেখি হলেও তার বেশিরভাগই ভিত্তিহীন আবেগাক্রান্ত হওয়ার জন্য অগুরুত্বপূর্ণ।’ এইসব ঔদ্ধত্য ও অভিযোগ অংশত জায়েজ হয় আমাদের রাজনৈতিক দুটি বলয়ের আচরণের জন্যই। এখনও বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস নিয়ে রাষ্ট্রীয়ভাবে কোনো ঐকমত্য সৃষ্টি হয়নি। সেই কাজ এখন আইনের বলে উচ্চ আদালত দিয়ে করা হচ্ছে, কিন্তু ইতিহাসের শল্যচিকিতসা আদালত দিয়ে হবার নয়। এ দেশের উভয় অংশের শাসকরা আগে ইতিাসটাকে হত্যা করেছেন, তারপর এখন বলের ভিত্তিতে আদালতকে দিয়ে তা পুনর্লিখন করছে।

এখনও ব্যাপক ভিত্তিক ইতিহাস প্রণয়ন এবং গণহত্যা ও গণধর্ষণ বিষয়ে অকাট্য প্রমাণাদি-ভিত্তিক গবেষণা ও তথ্যপ্রমাণ গড়ে তোলা হয়নি। সেই পাকিস্তানী সেনার ঔদ্ধত্য, হামিদুর রহমান কমিশনের মিথ্যাচার কিংবা শর্মিলা বোসের নিপুণ প্রতারণার জবাব দিতে হলে উত্তেজনা বা আবেগের বশে নয়, ঠাণ্ডা মাথায় ইতিহাসের প্রকল্প হাতে নেওয়া দরকার। জাতীয়ভাবে সকল হত্যাকাণ্ডের বিবরণ লিপিবদ্ধ করা, সকল বধ্যভূমির সনাক্তকরণ, সকল নিহতের সংখ্যাগণনা, ধর্ষণের শিকারদের সম্মান ও নির্জনতা বাঁচিয়ে সংখ্যা নিরূপণ করতে হবে। তাতে যদি শহীদের সংখ্যা, নির্যাতিতার সংখ্যার ঊনিশ-বিশ হয়, তাতে কি মুক্তিসংগ্রামের ত্যাগ ও গৌরব কমে যাবে? শর্মিলা বোস একটা কথা ঠিক বলেছেন, আমরা কেবল ভিক্টিম হওয়ার বোধ নিয়ে সহানুভূতি কাড়ি। আমরা ভিক্টিম এবং আমরা প্রতিহতকারী বিজয়্ওি বটে। সেই বিজয় সংহত ও গণতান্ত্রিক চেতনায় রূপান্তরের জন্যই প্রয়োজন একাত্তর সম্পর্কে একটা গ্রহণমুখী উদার ও দৃঢ় ইতিহাস নির্মাণ করা। এবং তাকে সংবিধানের প্রিঅ্যাম্বল বা প্রেমিজের অংশ করা। এ বিষয়ে সংসদেও আলোচনা করে সিদ্ধান্ত পাশ করা উচিত। যুদ্ধাপরাধীদের ব্যাপক অংশের বিচারও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা জরুরি সময় থাকতেই। আলামত ও আবহা্ওয়া ভাল নয়। (যদিও আমার সন্দেহ যে শেষপর্যন্ত এটা জামাত শুদ্ধিকরণে মার্কিন প্রজেক্টের অংশ হবে, কয়েকজনের বিচার শেষে পুরো যুদ্ধাপরাধ ইস্যুটাকেই চিরতরে চাপা দেওয়া হবে)

পাকিস্তানী ভাষ্য আমাদের শোনা উচিত, কিন্তু সেই ভাষ্যই ইতিহাস এটা এক অসম্ভব দাবি। আখতারুজ্জামান মণ্ডল নামের এক মুক্তিযোদ্ধা দেখিয়েছেন কীভাবে শর্মিলা বোস পাকিস্তানী সেনা কর্মকর্তাদের আÍপ সমর্থনকেই নির্দ্বিধায় গ্রহণ করেছেন, কিন্তু উপক্ষা করেছেন বাংলাদেশি মুক্তিযোদ্ধাদের ভাষ্যকে। নিয়াজিকে তিনি সমীহ করেন, এবং মুক্তিযোদ্ধারা তাঁর চোখে হয়ে যায় ‘দুষ্কৃতিকারী’। এর সঙ্গে গবেষণা বা অনুসন্ধানের সম্পর্ক নাই, এটা পুরোপুরি রাজনৈতিক অবস্থান, পাকিস্তান রাষ্ট্রের দুর্বৃত্ত চেহারা ঢাকার চেষ্টা। একইসঙ্গে তা মোহাচ্ছন্ন ও নিপীড়িত পাকিস্তানী জনগণের নিপীড়কদের পাবলম্বন। যে পক্ষাবলম্বন তিনি এবং বাঙলাদেশ ও পাকিস্তানে নিযুক্ত সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত উইলিয়াম বি মাইলাম পাকিস্তানের সামরিক জান্তার জন্য এফ সিক্সটিন বিমান বিক্রির ওকালতি দিয়েও যৌথভাবে করেছেন। (মাইলাম সাহেবকে একবার মুখোমুখি পেয়েছিলাম, তিনি বলছিলেন বাংলাদেশের হয় পাকিস্তান নয়তো তুরস্ক মডেলে যাওয়ার সম্ভাবনার কথা। তাঁরা সম্ভাবনা বললে আমরা সেটাকে অভিসন্ধি বুঝবো। কেন? বাংলাদেশ কি তার নিজের মডেল হতে পারে না, যে মডেল হওয়ার সম্ভাবনা এদেশের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে!)

গবেষকের মন, চিন্তা, ঝোঁক ও পদ্ধতির মাধ্যমে গবেষক হিসেবে তাঁর অন্তরের ঝোঁক ও অভিপ্রায়টাই ধরা পড়ে। একই সঙ্গে উড্রো উইলসন সেন্টারের মতো ঘোর প্রতিক্রিয়াশীল প্রতিষ্ঠানের আশ্রয়ও সন্দেজনক। গবেষকও বিরাজ করেন না সমাজ-ইতিহাসের বাইরের কোনো স্পেসে, যেখানে বাঙালি গণহত্যা আর বিহারি হত্যা এক হয়ে যেতে পারে, আবার আমাদেরও উচিত নয় একেবারে উপেক্ষাও করা। পলিটিক্যাল কারেক্টনেসের ধুয়া তুলে ভুল প্রেক্ষিতে এলিট ডিসকোর্স ফাঁদা যেমন প্রতিক্রিয়াশীলতা, তেমনি পাকিস্তানীদের ধর্ষণের ঘৃণা করা আবার ধর্ষণের শিকারদের উপেক্ষার মধ্যে একটা প্রবঞ্চনা থাকে। অন্যদিকে, ইতিহাস সৃষ্টি করতে গিয়ে লোকমনের জীবন্ত মিথ, বিশ্বাস, কিংবদন্তী ও লোকশ্রুতিকে কেবল দরবারি ইতিহাসের উপাদান বানিয়ে রাখা চলবে না।

ইতিহাসের সঙ্গে চেতনার একটা সম্পর্ক আছে। চেতন মানুষ ইতিহাসকে সজীব রাখে, পূজা করে না। অতীতের মধ্যে বন্দী হয়ে যায় না। যে অতীতবন্দী সে ভূতগ্রস্থের মতো নিজের বর্তমান কাজ-কর্ম-চিন্তার নিয়ন্ত্রণ হারায়। ইতিহাসচর্চা তাই অতীতের উদ্ধার নয়, বর্তমানের বিনির্মাণও। পাকিস্তানী শাসকরা যে মিথ্যা ও ঘৃণার ওপর দাঁড়িয়ে নিজেদের পতন ডেকে এনেছিল এবং এখনো তারা যে আত্মপ্রবঞ্চনার ঘোরের দশাপ্রাপ্ত, সেই দশার মধ্যে নিজেও বন্দী শর্মিলা বোস। এখনো একাত্তরের পরাজয়ের ভূত তাদের আচ্ছন্ন করে রেখেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশে অনেক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও নতুন প্রজন্ম একাত্তরের চেতনায় নতুন করে উদ্দীপিত হচ্ছে- হোক তা উচ্ছ্বসিত ও শৈশবিক। একদিকে এই জাগর হওয়ার প্রক্রিয়া অন্যদিকে ভুতগ্রস্থতার বিকার; এই দুইয়ের লড়াই ইতিহাস চর্চার জমিনে চললেও আগামীর বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের প্রতিফলন ঘটা-নাঘটার সঙ্গেও তা সম্পর্কিত।
পাকিস্তান এখন ভূত, তাকে আমরা ফেলে এসেছি একাত্তরের রণাঙ্গনে। তার ক্ষমতা ভূতের মতো আছর কাটার ক্ষমতা, পেছনে টেনে রাখার ক্ষমতা। তার বিরুদ্ধে উপযুক্ত কবচ হলো একাত্তরের দর্পণে উপমহাদেশের রাজনীতিকে দেখার পরিষ্কার দৃষ্টি। কিন্তু ভুললে চলবে না, স্বাধীন হওয়ার পরদিন থেকেই বাংলাদেশ দ্বিজাতিতত্ত্বের ভ্রম সংশোধন করে মুখোমুখি হয়েছে তার সত্যিকার ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে। সেই পথে পাকিস্তান পেছনে, সামনে অতিকায় ভারত। শর্মিলা বোসও ভিন্নভাবে এই সমীকরণকেই ভারত-পাকিস্তানের যুদ্ধ বলে দেখাতে চান, দেখাতে চান গৃহযুদ্ধ হিসেবেও। আহমদ ছফা যেমন বলেন, বাংলাদেশের আবির্ভাব কেবল দ্বিজাতিতত্ত্বেরই খণ্ডন নয়, ভারতবর্ষীয় একজাতিতত্ত্বেরও নেতিকরণ। আমাদের তাই, বাংলাদেশি-বাঙালি মেকি গৃহযুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে, ইনক্লুসিভ ও উদার বাঙাল-পরিচয়ের রজ্জু আঁকড়ে ধরে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় একাত্তরের অসমাপ্ত সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নাই। জয় সম্পূর্ণ হয় ‌'যথাযথ' ইতিহাসে, হতে পারে সেই ইতিহাসও ত্রুটিপূর্ণ। কিন্তু ত্রুটিপূর্ণ হলেও ব্যাপকভিত্তিক স্বীকৃত ইতিহাসও আমাদের নাই। এর জন্য নিজেদের ছাড়া আর কাকে দোষ দেব?

মুক্তির শুরু একাত্তর, শেষ নয়। আর আমাদের ব্যথার পূজা আর সত্যের দায়ও হয়নি সমাপন।

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/farukwasifblog/29350245 http://www.somewhereinblog.net/blog/farukwasifblog/29350245 2011-03-24 11:45:57
একাত্তরের অ্যান্টিথিসিসের মা জননী শর্মিলা বোসের লাশগণনার ভুতুড়ে ইতিহাস
এক.
মুক্তিযুদ্ধের একাডেমিক ইতিহাস চর্চার খাতাটা প্রায় সাদাই ছিল অনেক দিন। শর্মিলা বোস সেখানে একের পর এক কদর্য কিছু দাগ রেখে চলেছেন। তাঁর একাধিক প্রবন্ধ-নিবন্ধ এবং সাম্প্রতিক প্রকাশিত বই দিয়ে তিনি স্বাধীনতা অর্জনে বাংলাদেশের মানুষের আত্মত্যাগ, গণহত্যা ও গণধর্ষণের অলংঘনীয় বাস্তবতাকে অস্বীকার করে চলেছেন। তাঁর দাবি মানলে মুক্তি সংগ্রামের রাজনীতি নাকচ হয়ে যায়। গবেষক বা লেখকের অনুসন্ধানের একটা অভিপ্রায় বা উদ্দেশ্য থাকে। শর্মিলা বোসের অভিপ্রায় বা উদ্দেশ্য হলো বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের চেতনা ও তত্ত্বের খণ্ডন। তিনি আসলে একাত্তরের অ্যান্টিথিসিস বা পাল্টা তত্ত্ব রচনা করে যাচ্ছেন। নতুন বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে তিনি বলেছেন, বাংলাদেশে গবেষণা ও মাঠকর্ম করতে আসার পর মুক্তিযুদ্ধে জড়িত ও সাক্ষিরা তাঁকে বলেছে, ‘এইসব ঘটনায় দুর্ঘটনাবশতভাবে ছাড়া সেনাবাহিনী নারীদের কোনো ক্ষতি করেনি। এসব ঘটনা থেকে যে ধরনটা দাঁড়িয়ে যায় তা হলো, পাকিস্তানি সেনাবাহিনী নারী ও শিশুদের বাদ দিয়ে কেবল বয়স্ক পুরুষদের নিশানা করেছিল।’ এটা বলেছেন কয়েকটি ‘ঘটনার’ ব্যাপারে। এরপরে সমগ্র মুক্তিযুদ্ধ বিষয়েই তাঁর রায় হচ্ছে, ‘কোনো সন্দেহ নেই যে ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তানে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছিল। অবস্থার সুযোগ নেওয়া সুবিধাবাদী যৌন অপরাধ বাদ দিলে, প্রশ্ন হলো, কোন মাত্রায় ধর্ষণ ঘটেছিল, কে কাকে শিকার করেছিল এবং সেসময় কোনো পক্ষ লাগাতারভাবে পরিকল্পনামাফিক ধর্ষণ চালিয়েছিল কিনা।’ তাঁর সিদ্ধান্ত: সেরকম কিছু পাকিস্তানী বাহিনী করেনি।

তাঁর দ্বিতীয় সিদ্ধান্তটি গণহত্যা বিষয়ে। অ্যানাটমি অফ ভায়োলেন্স প্রবন্ধের উপসংহারে তিনি লিখেছেন, ‘১৯৭১ সালের গৃহযুদ্ধে দুটি পক্ষ লড়েছিল, যাদের একপক্ষের বিশ্বাস তারা পাকিস্তানের ঐক্য রক্ষার জন্য লড়ছে, অন্যপক্ষ লড়েছে সুবিচারের সুযোগ এবং স্বাধীন বাংলাদেশে তাদের উন্নতি হবে এমন বিশ্বাসে। উভয়ের অবস্থানই রাজনৈতিকভাবে বৈধ। উভয় পক্ষই সহিংসতার পথে সমাধান চেয়েছে, সবাইই যুদ্ধের গৃহীত নিয়মকানুনের বাইরে গিয়ে নৃশংস কর্মকাণ্ড করেছে, এবং উভয়ই মানবতার অংশ। এই বৈশিষ্ঠ্যের কারণে অপরাধীকরণের (পাকিস্তানী সৈন্যদের) দাগ মেরে দেওয়ার বদলে বরং ১৯৭১-এর সংঘাত বিশেষভাবে সমঝোতা প্রয়াসের উপযোগী।’

এটাই শর্মিলা বোসের অভিপ্রায়, এই-ই তাঁর উদ্দেশ্য। অর্থাৎ তিনি পাকিস্তানের মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের দায়মুক্তি ঘটাতে চান এবং চান শত্র“ভাবাপন্ন দুটি দেশ ও জাতির মধ্যে, নিপীড়ক ও নির্যাতিতের মধ্যে, ঘাতক ও নিহতদের মধ্যে সখ্য স্থাপন করতে। কারণ, উভয়পক্ষই তো সমান দোষী! কারণ, তাঁর চোখে একাত্তরের যুদ্ধটা স্বাধীনতা যুদ্ধ ছিল না, ছিল ‘গৃহযুদ্ধ’। কারণ বাঙালিরা কোনো সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক কারণে নয়, কেবল ‘উন্নতির আশাতেই’ স্বাধীনতা চেয়েছিল, কারণ বাঙালিরাই অসহযোগ আন্দোলনের নামে আগে সহিংসতা ঘটিয়েছে, উস্কানি দিয়েছে, তারাও নৃশংস কর্মকাণ্ড করেছে। এই যদি হয় ইতিহাস তাহলে ‘ভুল বোঝাবুঝি’ মিটমাট করে নেওয়াই ভাল! মনে রাখা দরকার, পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষার নামেই, মুক্তিযুদ্ধকে গৃহযুদ্ধ বা ভারত-পাকিস্তানের যুদ্ধ আখ্যা দিয়েই রাজাকার-আল বদর, জামাতে ইসলামী যাবতীয় মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ ও বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। সুতরাং শর্মিলা বোসের প্রস্তাবটা কেবল পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধীদের মাফ করে দেওয়ারই নয়, বাঙালি ও বাংলাদেশি যুদ্ধাপরাধীদেরও মেনে নেওয়ার প্রস্তাব। এককথায়, এটা হলো বাংলাদেশের নাগরিকদের একাত্তরের রাজনৈতিক বাস্তবতাকে অস্বীকারের বুদ্ধিবৃত্তিক প্ররোচনা।

মুক্তিযুদ্ধে সবার ভূমিকার সমালোচনা হতে পারে, কিন্তু শহীদদের প্রাণদান আর যোদ্ধাদের সংগ্রামকে কোনোভাবেই বাতিল বা হেয় করা যায় না। মানবতার বিপুল ধ্বংসের পক্ষের যুক্তি বা অবস্থান যেমন মানবতাবিরোধী, তেমনি শর্মিলা বোস কিংবা মানেকশ’র স্বাধীনতা যুদ্ধকে ‘গৃহযুদ্ধ’ বা ‘ভারত-পাকিস্তান’ যুদ্ধ বলার মাধ্যমে বাংলাদেশের যুদ্ধকে এর অধীনস্থ করে দেখার অবস্থানও বাংলাদেশবিরোধী।

পাকিস্তান একে গৃহযুদ্ধ, ধর্মযুদ্ধ যে কোনো নামেই ডাকতে পারে, তাতে করে তাদের ঐতিহাসিক বিকার আরো প্রলম্বিতই হবে। ভারতেও অনেকে বৃহত রাষ্ট্রের উচ্চম্মন্যতার বাতিক থেকে একাত্তরের যুদ্ধকে ভারতের যুদ্ধ বলতে পারে এবং তার বাইপ্রডাক্ট হিসেবে বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে থাকেন। ১৯৭১-এ ভারতের বাংলাদেশকে সর্বোতভাবে সাহায্য করা নিশ্চয়ই ভারতের মহিমা, কিন্তু বাংলাদেশের জন্ম বা বিজয় কোনোটাই সেই মহিমার গুণে হয় নাই। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম এ অঞ্চলের জনগণের রাজনৈতিক ইতিহাসের বিকাশ এবং স্বাধীনতার আকাঙ্খার মধ্যে। এ বিষয়ে ছাড় দেয়া মানে ঐ রাজনৈতিক ইতিহাসকে ভুল বলে বাতিল করা নতুবা তাকে ঠিক মতো বুঝতে না পারা। শর্মিলা বোসও সেটাই করেছেন। গণহত্যা ও গণধর্ষণ অস্বীকারে তাঁর প্রয়াসের রাজনৈতিক মাজেজা এটাই এবং এখানেই তাঁকে মোকাবেলা করতে হবে একাত্তরের প্রতিরেধী চেতনা ও আধিপত্যবিরোধী সংগ্রামের প্রতি দায়বদ্ধ গবেষকদের। এ ধরনের চিন্তা মনে করে, একাত্তরে পাকিস্তান বাড়াবাড়ি না করলে, কিংবা শেখ মুজিবের হাতে ক্ষমতা তুলে দিলে, কিংবা আরো কী কী যেন করলে পাকিস্তান ভাংতো না। (সম্প্রতি লারকানা থেকে পাঠানো এক পাকিস্তানী সামরিক নির্দেশিকা পা্ওয়া গেছে, যাতে একাত্তরে তারা বিশ্লেষণ করে দেখাচ্ছে যে, শেখ মুজিব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হলে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে যাবে, অতএব তাকে ঠেকাও বা হত্যা করো, যেভাবে তারা জিন্নাহ-লিয়াকত-সোহরাওয়ার্দিকে হত্যা করেছে বলে অভিযোগ) সমস্যাটা আচরণের ছিল না, ছিল উভয় খণ্ডের ঔপনিবেশিক সম্পর্কের মধ্যে। দ্বিতীয় সমস্যা হলো খোদ পাকিস্তান রাষ্ট্রের আদর্শিক ভিত্তির দুর্বলতা। পাকিস্তান কেন এক থাকবে, এর যুক্তি তারা কাল্পনিক মুসলিম জাতীয়তাবাদ দিয়ে করে। ভারত যেমন করে কখনো প্রগতির নামে (নেহরুর জাতীয়তাবাদ), কখনো হিন্দুত্ববাদ (বিজেপির জাতীয়বাদ), কখনো পরমাণুবোমাসমৃদ্ধ অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি এবং হিন্দি ভাষা ও হিন্দি ছবির নামে (নিওলিবারেল সোনিয়া-মনমোহনের ইন্ডিয়া)। এখনো ভারত রাষ্ট্রের মধ্যে সব জাতি-বর্গ-শ্রেণীকে ধারণকারী মতাদর্শ ও রাজনীতি নির্মিত তো হয়ইনি, বরং দিনকে দিন সেই সম্ভাবনা তিরোহিত হচ্ছে। আলবৎ সেই রাজনীতি বাংলাদেশেও নেই। তারপরও আমরা এক জাতি বলেই এক স্বাধীন রাষ্ট্রে থাকবো তা-ই নয়, একাত্তরের ঐক্য ও যন্ত্রণার স্মৃতিও আমাদের সংহতির রসায়ন। সেকারণে আমরা বারবার মুক্তিযুদ্ধের নাম নেই, সকল কিছুর প্রেরণা বা প্রণোদনা আকারে এর কথা বলি। অনেক সময় রাষ্ট্রীয় বা দলীয় শয়তানির দোহাইও এখান থেকে টানা হয়। তাহলেও, একাত্তরের অভিজ্ঞতা এত ব্যাপক যে সহসা তার জীয়ন ক্ষমতা ফুরাবার নয়।

স্বাধীনতাযুদ্ধের আত্মদান, সংগ্রাম ও ধ্বংসের অভিজ্ঞতা হলো সেই বুনিয়াদি ভিত্তি যার ওপর বাংলাদেশ রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ভিত্তি দাঁড় করানো। আবার দেশি-বিদেশি রাজনৈতিক শক্তি এই ভিত্তিকে ওল্টানোর প্রকাশ্য ও গোপন কর্মসূচিও জারি রাখছে। এই দুই-ই মোটাদাগে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষের রাজনীতি বলে চিহ্নিত_ যদিও কার্যত মুক্তিযুদ্ধ রাজনৈতিক উত্তরাধিকারহীন। তাহলেও জনইতিহাস ও জনস্মৃতির মধ্যে মুক্তিযুদ্ধ তেমনই এক পরম ঘটনা, যাকে আগলে রাখার কাজ জনগণ করে এবং বারে বারে তা থেকে বৈধতার তকমা রাষ্ট্রকেও গলায় ঝোলাতে হয়। যুক্তিটা এরকম: বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, কারণ মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে। বাংলাদেশ সার্বভৌম থাকবে, কারণ তা লক্ষ লক্ষ শহীদের আত্মদানের ও সংকল্পের অলঙ্ঘনীয় বাস্তবতা। একাত্তরের রাজনীতির আলোচনা-সমালোচনা হতে পারে এই স্বীকৃতি দানের পরেই।

বাঙালিরা স্বাধীনতার ইচ্ছা করেছে এবং তার জন্য যুদ্ধ করার প্রস্তুতিও নিয়েছে। এই সংকল্প না থাকলে কারো পক্ষেই সম্ভব ছিল না বাংলাদেশকে মুক্ত করা। এই সংকল্প তিনটা ধারায় দিনে দিনে দানা বেঁধেছিল। প্রথমটি সাংস্কৃতিক: জাতীয়তাবোধের জায়গা থেকে বাংলার মানুষ পাকিস্তানি পরিচয় এবং তার মতাদর্শের সঙ্গে দূরত্ব বোধ করছে_ অর্থনৈতিক বঞ্চনা এর কার্যকারণ মাত্র। বাস্তবের পাকিস্তানের আগেই মনের পাকিস্তান শুকিয়ে মরেছে। এ থেকেই জন্ম নিয়েছে জাতীয়তাবাদের রাজনীত। জাতির মুক্তিকে এই রাজনীতি একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের আধারে প্রতিষ্ঠা করার কথা বলেছে (না পারুক, সেটা অন্য আলোচনা)। ৪৮-৭১ পর্যন্ত এরই বিকাশ আমরা বহুধারায় বহু ঘটনার মধ্যে দেখি। এরই চরম পর্যায়ে জন্ম নেয় তৃতীয় ধরনের সংগ্রাম: সামরিক সংগ্রাম। ৫২ সাল থেকে শুরু করে আগরতলা মামলা (আগরতলা ষড়যন্ত্র যে শেখ মুজিব করেছিলেন, সেটা এখন আওয়ামী লীগের নেতারাও স্বীকার করছেন) পর্যন্ত এর প্রথম ধাপ। দ্বিতীয় ধাপে দেখা দেয় একাত্তরের মার্চ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সশস্ত্র প্রতিরোধ। সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগ্রামের দীর্ঘ ইতিহাস হচ্ছে স্বাধীনতার সেই পর্বত, সশস্ত্র যুদ্ধ যার শিখর। এই শিখর পর্বেই ভারত-সহ আন্তর্জাতিক নানান শক্তির ভূমিকা দেখতে পাই। কিন্তু কেবল শিখরকেই স্বাধীনতার মূল দেহ ভাবলে পর্বতটাকে টিলা বলে ভ্রম হতে পারে। শর্মিলা বোসের সেই মতিভ্রমই হচ্ছে।

ঠিক যে, ১৯৭১ সালে উপমহাদেশে দুটি যুদ্ধ হয়েছিল। একটি বাংলাদেশের সঙ্গে পাকিস্তানের অন্যটি ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের। পাক-ভারত যুদ্ধ হচ্ছে সেই টিলা বিজয়ের যুদ্ধ। ভারত রাষ্ট্রের ইতিহাসে এটা এক গৌরবজনক অধ্যায় মাত্র, তার সমগ্র অস্তিত্বের প্রতীক বা তার সমমূল্য এই বিজয় পায় না। কিন্তু বাংলাদেশের জন্য তা তার জাতীয় অস্তিত্বের সমতুল ও পরিণতি। মানেকশ'র বিজয় বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা সম্ভব করেছে বা সেই বিজয়ের ফলে বাংলাদেশের জন্ম, এমন মনোভাবের মধ্যে যে অধিপতি সুলভ দৃষ্টিভঙ্গি বা তাকে মেনে নেয়ার মধ্যে যে সমর্পিত মনোভাব থাকে, তা আপত্তিকর। সৈনিকের কাজ নয় কোনো দেশ স্বাধীন করা। সেটা তাদের ক্ষমতার বাইরের ব্যাপার। সমগ্র জনগণের গভীর সাংষ্কৃতিক, রাজনৈতিক ও সামরিক প্রস্তুতি ও সংকল্প না থাকলে জাতীয় যুদ্ধে বিজয়ী হওয়া যায় না। এই জিনিষ সেনা কমান্ডে গঠিত হয় না।

যে পাকিস্তান মুসলমানদের একজাতি বলেছে, সেই পরে প্রমাণ করেছে, তারা এক জাতি নয়। ঐক্যটা কংগ্রেসি সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সাময়িক ও রাজনৈতিক কৌশলগত ছিল, এবং রাজনৈতিক কারণেই হিন্দু জমিদার শ্রেণীর ভীতি অপসারিত হওয়ায় ঐক্যটাও প্রয়োজন হারিয়েছে এবং ভেঙ্গে গেছে। একে দেশভাগ বলে না, বলে ভাঙ্গন এবং তা রাষ্ট্রের ভাঙ্গন। এর মাধ্যমে পাকিস্তান রাষ্ট্র পেয়েছে তার আসল রূপ। যে রূপটা বণিক-সামরিক পাঞ্জাবি এলিটতন্ত্রের, যা ব্রিটিশ-মার্কিনের ঔপনিবেশিক জের বহন করছে, ঔপনিবেশিক ব্রিটেন আর সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকার উত্তরাধিকার ও রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে কাজ করছে। আর বাংলাদেশের আবির্ভাব এই জোটেরই বিরুদ্ধে। যে কোনো রকম উপনিবেশিকতা ও আঞ্চলিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে ভাষাভিত্তিক, সেক্যুলার, কৃষকমেজাজি জাতিরাষ্ট্র হিসেবে_ একজাতি এক রাষ্ট্র হিসেবে (এটাই নিশ্চয় এই রাষ্ট্রের মকসুদে মঞ্জিল নয়, তবে সেটা অন্য আলোচনা)। দ্বিজাতিত্ত্বের মিছা আশা, কিংবা ভারতবর্ষীয় একজাতিতত্ত্বের মায়ার নাগপাশের বাইরে এর আবির্ভাব হয়েছিল, এই সত্যটা আমাদের মনে থাকা চাই। আর মান্য করা চাই যে, এই রাষ্ট্রের ভিত নির্মিত হয়েছে সংগ্রামে, রক্তে, অশ্র“তে আর আগুনে। যার সম্মান ও সার্থকতা আজ অবধি আমরা দিতে পারি নাই। সংশোধনবাদী ইতিহাস চর্চা এরই সুযোগ নিচ্ছে এবং নিতে থাকবে।

পরের পর্ব দেখুন :

(দয়া করে এখানে এখনই মেহেরজান নিয়ে বিতর্ক তুলবেন না। দুটি পর্ব পড়া শেষে যাদের আগ্রহ আছে তারা মেহেরজান প্রসংগে আলোচনা চালাতে পারেন। আশা করি, উত্তেজনা ও আতংক প্রশমিত হয়েছে, তাই আমার আগের লেখাগুলোকে ঠাণ্ডা মাথায় বুঝতে পারবেন। আমি আমার অবস্থানেই আছি, আশা করছি নিন্দাবাদীরা ভুল বুঝতে পারবেন, বাঙলা ভাষায় লেখা আমার বাক্যগুলোর বাঙলা মানেই করবেন। না পারলেও অসুবিধা নাই, চরিত্রহননের স্বাধীনতা আপনাদের আছে। আপনার সেটা চালিয়ে যান। আমি কেবল এখান থেকে সরে যাব।) ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/farukwasifblog/29350089 http://www.somewhereinblog.net/blog/farukwasifblog/29350089 2011-03-24 00:29:23
যুদ্ধ ও ভালবাসার মালিকানার মামলা ৪ : দুই এলিটের বাসনাবন্দী মুক্তিযুদ্ধ। আমার সিদ্ধান্ত
মেহেরজানের কাহিনীর প্রধান সংকট হলো মেহেরের প্রেম। এই প্রেমকে ঘৃণার বিরুদ্ধে একটা ‘নান্দনিক সমাধান’ বলে প্রস্তাব করা হয় ছবিতে। ওয়াসিম নিজেও তো ধর্ষক হতে পারতো, কিন্তু তাকে পাকসেনা থেকে রূপান্তর করা হয় বিপদে পড়া নিরীহ চরিত্রে। তাকে দিয়ে মেহেরের সম্ভাব্য ধর্ষণ ঠেকানো হয়। তার এই চরিত্র নির্মাণে বালুচ জাতপরিচয়ও কাজে লাগে। গোড়া থেকেই আমার প্রশ্ন ছিল এই রূপান্তর কোথায় ঘটছে, ইতিহাসে না কল্পনায়? মেহেরজানে যুদ্ধটা ঘটছে বাংলাদেশের ইতিহাসে ও জমিনে, কিন্তু প্রেমটা ঘটছে কাল্পনিক এক বাস্তবতায়। একাত্তরে এ ধরনের প্রেম যে ঘটেনি তা নয়, তার অজস্র সাক্ষ্যপ্রমাণ আছে। কিন্তু তা দিয়ে এই প্রেমকে জায়েজ করা যায় না। সেজন্য যারা ঐতিহাসিক সত্যতা চাইছেন, তারা ঠকবেন? কারণ সেরকম প্রমাণ ভুরি ভুরি আছে। প্রশ্নটা প্রমাণের নয়, প্রবণতায়।



মেহেরজানের মধ্যে দুটো রিকনসিলিয়েশনের প্রস্তাব আছে: একটা ৪৬ এর দাঙ্গা এবং ভারত বিভাগের সমালোচনা হিসেবে হিন্দু ও মুসলিমের মিলনের। যাতে হিন্দু ও মুসলিম পরিচয় ধারণ করেই তারা বাঙালিত্বে উত্তরিত হয়। নানাজান তাই বলেন, ‘আমরা হিন্দু ও মুসলিম পরস্পরকে কতল করেছি!’ এই ‘আমরা’ সম্প্রদায় পরিচয় ছাপিয়ে জাতি পরিচয়কে সামনে আনে। আবার অন্যত্র সেই জাতি পরিচয়কে ছাপিয়ে কৃষক বাঙালির কথা বলে। নানাজান যেকারণে আমার কাছে এক উত্তরণ-সন্ধানী চরিত্র। দ্বিতীয় রিকনসিলিয়েশনের প্রস্তাব হলো: নির্যাতিত ও নির্যাতকের জাতিকে ঘৃণা থেকে মুক্ত করার ‘নান্দনিক সমাধান’। সেই নান্দনিক সমাধানের আমেজই প্রেমের দৃশ্যাবলির ‘সৌন্দর্যে’, ফুল-পাখি-লতাপাতা দিয়ে আনা হয়। পুরো ছবিতেই বিভিন্নভাবে ‘বিউটি’ তৈরি করা হয়। প্রশ্ন হচ্ছে এই ‘বিউটি’র মনস্তত্ত্ব ও রাজনীতি কী? এটা কি ওরিয়েন্টালিস্ট চোখ নয়? এই মন কি বাস্তব অভিজ্ঞতাবিরোধী নয়? এই রোমান্টিক সংবেদন কি ভাববাদী মারেফতি নয়? এ দিকটি এখন পর্যন্ত ঘৃণার পূজারিদের কেউ মনে হয় খেয়াল করেননি।

আমার প্রশ্ন হলো, ব্যথার পূজা সমাপন করে আমাদের মন নির্ভার হলো কীভাবে, যে বিপরীত ‘অন্য’ কে ভালবাসতে পারি? কোন বাস্তবতায় সেটা সম্ভব? সেই বাস্তবতা বাংলাদেশে কবে তৈরি হলো? কিংবা যে অহিংসা (নানাজান) ও প্রেমের সমাধানের (বড় মেহের) ইশারাপাত হলো তা কার সমাধান, কার উপকারে? কোনো ব্যক্তির বেলায় এটা হলেও হতে পারে কিন্তু যে জাতির ত থেকে এখনো রক্ত ঝরছে, যে স্বজন হারানোরা এখনো ফরিয়াদি, তাদের এটার প্রয়োজন নেই। শৈল্পিক সাজেশন হিসেবেও এটা ধোপে টিকবে না। আন্তর্জাতিক পুরস্কারের আশা, পোস্ট কলোনিয়াল লিটারেচারের ঝোঁক কি এর পেছনে কাজ করেছে? হয়তো। তার আগে জানা প্রয়োজন, পাকিস্তান কি ক্ষমা চেয়েছে? সকল যুদ্ধাপরাধীর (বাংলাদেশি কি পাকিস্তানী) কি শাস্তি হয়েছে? পাকিস্তানের জনগণ কি তাদের দুর্বৃত্ত রাষ্ট্রের মানবিক রূপান্তর ঘটানোর মাধ্যমে একাত্তরের অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত করেছে? বাস্তবত এসব প্রশ্ন আসবে। ঐতিহাসিক ন্যারেটিভ, পলিটিক্যাল ন্যারেটিভ আর মানসিক ন্যারেটিভ এখানে এক মনজিলে পৌঁছে না। মেলে যে না তার প্রমাণ ছবির ভেতরেই আছে।

ছবির কোথাও এই প্রেমের বৈধতা দেওয়া হয়নি। নানাজান বলেন, ‘মেহের, তোমার কাছে আমি এটা আশা করিনি’। মেহেরকে তার ‘নিষিদ্ধ’ প্রেমের জন্য সবারই লাঞ্ছনা পায়। ফলে প্রেম দেখালেও প্রেমকে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়নি ছবিতে। কেবল একদম শেষে পরিণত মেহেরজানের একটা উক্তি ও একটা ভাস্কর্য অন্য কথা বলে। বলে ‘ক্রিয়েটিং এ নিউ ফর্ম’ এর কথা।



কী এই ‘নিউ ফর্ম’? আলিঙ্গনাবদ্ধ দুই নরনারীর ভাস্কর্য, যারা একাকার হয়ে নতুন আকার গঠন করেছে। এই আকারটাই কল্পনার ইউটোপিয়া। মেহের তার প্রেম নিয়ে অপরাধবোধেই ছিল এতদিন। কিন্তু যুদ্ধশিশু সারার সঙ্গে সংলাপ তার সেই অপরাধবোধ থেকে মুক্তির একটা পথ দেখায়। সারা যদি তার মায়ের ইতিহাস জেনে, একাত্তরের ইতিহাস বুঝে ক্ষমা করতে পারে, তাহলে তিনি কেন পারবেন না নিজেকে ক্ষমা করতে? তাই মেহের কানে প্রেমের ফুল গুঁজে নতুন এক ভাস্কর্য নির্মাণ করতে বসে। পরিকল্পনা করে নতুন এক প্রদর্শনীর, যার নাম হবে ‘ক্রিয়েটিং এ নিউ ফর্ম’। এই নিউ ফর্মটা হলো আরেকটা ইউটোপিয়া। ক্রিয়েটিং এ নিউ রিয়েলিটি, যেখানে বিচার হবে, অপরাধীরা বিলীন হবে, মানুষ ন্যায়বিচার পাবে। এর বিকল্প হতে পারে না কল্পনার মধ্যে নির্যাতক ও নির্যাতিতকে মিলিয়ে দেওয়ার ‘নিউ ফর্ম’।



কিন্তু অন্য একটি ব্যাখ্যা বলবে, মেহের আর ওয়াসিমের এই মিলন তো ইতিহাস ও দেশকালের বাইরে এক ব্যক্তিগত মিলন, যেখানে উভয়ই নিরীহ। তারা একাত্তরের দায়মুক্ত, কারণ তাদের প্রেম একাত্তরের মুক্তির চেতনার পক্ষেই। তাই তা বাস্তবতাকে অস্বীকার করে না। এটা বলবার জন্য মেহের ও ওয়াসিমকে ইনোসেন্ট ও বিউটিফুল করে নির্মাণ করা হয়েছে। তাদের অন্য চরিত্রগুলোর থেকে সুন্দর ও মানবিক করে দেখানো হয়েছে। তার জন্য এখানেও নেওয়া হয়েছে আমার আগে দেখানো সেই রূপান্তরের গতিসূত্র। মেহেরজানের চরিত্রগুলো সবাই প্রথমে যা থাকে শেষে তা থাকে না। বদলে যায়। কিন্তু সবার বদল একাত্তরে ঘটলেও (কারণ সেটাই তাদের জীবতকাল) মেহের ও যুদ্ধশিশু সারার বদল বর্তমানকাল পর্যন্ত চলতে থাকে। দুইজন এই রূপান্তর প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে শেষাবধি গ্লানিমুক্ত হয়: মেহের তার প্রেমের অপরাধবোধ থেকে আর সারা তার জন্মের কলঙ্ক থেকে। তাদের এই দায়মুক্তি সম্পন্ন হয় ইনোসেন্স থেকে এক্সপেরিয়েন্সের প্রক্রিয়ায়।



রবার্ট ব্লেইক ইনোসেন্স আর এক্সপেরিয়েন্স নামে দুটো অবস্থার কথা বলেছিলেন তাঁর সংস অফ ইনোসেন্স এন্ড সংস অফ এক্সপেরিয়েন্স নামক দুই গুচ্ছ কবিতায়। এখানে মেহের আর ওয়াসিম সংস অফ ইনোসেন্স এর প্রতীক। আর নানাজান আর নীলা হলো সংস অফ এক্সপেরিয়েন্স এর প্রতিভূ। মেহের অভিযোগ করে, ‘তোমরা কেউ আমাকে বুঝলা না।’ তার ইনোসেন্স দিয়ে সে যা বোঝে, তা আর কেউ বোঝে না বলে তার এই অভিযোগও ‘ইনোসেন্ট’। তাকে এরকম অ্যাবসলিউট ইনোসেন্ট বানাতে গিয়ে তার ভেতরকার সব খারাপ অভিজ্ঞতাকে নিষ্কাশন করে বের করে দেওয়া হয়, যাতে সে ঘৃণা করতে না শেখে। একাত্তরের অমানবিক দুর্দশার চিত্র ভুলিয়ে তার মনকে শিশুর মতো শূণ্য করা হয়। সেজন্য গণমৃত্যুর বীভৎসতার সাক্ষি মেহেরের মুখ দিয়ে বলানো হয়, ‘আমি স্ট্রং, আমি সব খারাপ কথা ভুলে যাব।’ কারণ না ভুলে যেতে পারলে তার ইনোসেন্ট ডিজুস টাইপের প্রেম ঘটতে পারে না। তবুও অন্তর্দ্বন্দ্বে টালমাটাল তার মনে হয়, ‘এটা (প্রেম) অসম্ভব’। এই টানাপড়েনের পরও মেহের ইনোসেন্টই থাকে। অথচ তখন চলছে জীবন-মরণ লড়াই। মেহেরের প্রেম যদি বাঙালির ন্যায্য ঘৃণা ধারণ করেই মনের সঙ্গে গভীর ফয়সালা করে ভালবাসাকে গ্রহণ করতো, তাহলে এতো সমস্যা হতো না। একাত্তরের নয় মাসে যেখানে মানুষের নয় বছরের সমান, সেখানে মেহেরের বয়স ও অভিজ্ঞতা বাড়ে না কেন? ঢাকার মেয়ে সে, রাজনীতি সচেতন পরিবারের মেয়ে সে, তার তো এমন হওয়ার কথা নয়? কেন একাত্তরের বাংলাদেশ থেকে লুকিয়ে সময় ও স্থানের বাইরে তার প্রেম বিরাজ করে? পোশাক-ভঙ্গিমা ইত্যাদি খুঁটিনাটি আলোচনায় না গিয়েও বলা যায়, কেন তার অভিজ্ঞতা তাকে কিছু শেখায় না, এটা আমার প্রথম প্রশ্ন?



একই কথা ওয়াসিম সম্পর্কেও। মেহেরের প্রেম সম্ভব করবার জন্য ওয়াসিমের বালুচ পরিচয়ে জোর দেওয়া হয়। এর ওপর দাঁড়িয়ে এখানেও রূপান্তরের লীলা চলে। ওয়াসিম মসজিদে গুলি চালাতে নারাজ হওয়ায় দলত্যাগী সেনা হিসেবে কোর্টমার্শালের সম্মুখীন হয়। এটা বিশ্বাস্য ঘটনা, এমনটা লাখে একটা হতে পারে। নৈতিক ও রাজনৈতিক বিচারে কারো জীবনই বিশুদ্ধ নয়। অবিশুদ্ধ পরিস্থিতিতে বিশুদ্ধ আচরণও আমরা মেহের ও ওয়াসিমের কাছে দাবি করছি না। তা দাবি করলে পাঠ্যপুস্তক লেখা ভাল, চলচ্চিত্র বা উপন্যাস করার দরকার নেই। কিন্তু তাকে তো তার নিজস্ব শৈল্পিক বা নৈতিক যুক্তির ওপর দাঁড়াতে হবে। সেটা করতে গিয়েই অনাবশ্যকভাবে প্রেমদৃশ্যগুলো দীর্ঘ করা হয়। তাতে ছবির রাজনৈতিক মেসেজটা হারিয়ে যায়, বড় হয়ে ওঠে ‘অরাজনৈতিক প্রেম’। তাই নানাজান ও মেহেরের চরিত্রের গতি শেষপর্যন্ত মেলেনি। ছবির নাম নানাজান না হয়ে কেন মেহেরজান হলো তা পরিষ্কার হয় না।



যাই হোক, বিশেষ ব্যতিক্রম নিয়েও সিনেমা হতে পারে। কিন্তু সেটাকে সর্বজনস্বীকৃত করতে ওয়াসিমের জন্য যে যত যত্ন নেওয়া হয়, সেই যত্ন মুক্তিযোদ্ধা পুরুষ চরিত্রের একজনও পায় না। যদিও শিমুল ও সুমন চরিত্র যথেষ্ঠ জোরদার। লাস্ট সামুরাই ছবিতেও শত্র“র মিত্র হওয়ার কথা আছে। সেখানে টম ক্রুজ দলত্যাগ করে সামুরাইদের নারীকে ভালবেসে সামুরাই হয়ে যায়। অর্থাৎ সে মার্কিন সেনা থেকে জাপানি সামুরাই হিসেবে সাংস্কৃতিক পুনর্জন্ম লাভ করে। এখানেও, ওয়াসিম কেবল দলত্যাগই করে না, সে মেহেরকে নিশ্চিত ধর্ষণ ও হত্যা থেকে বাঁচায়। তারপর নিয়ম অনুযায়ী মেহের তার প্রেমে পড়ে। প্রেমের টানে মেহেরও ব্যক্তিগতভাবে তাকে আর ঘৃণা করে না। আর ওয়াসিমও দিনে দিনে বদলে যেতে থাকে। সে বাঙালি হিন্দুর ধুতি আর বাঙালি মুসলমানের পাজামা-পাঞ্জাবি পরে। হাঁসকে ধান ছিটিয়ে খাওয়ায়। বাংলার পথ-ঘাটের ফুল-লতাপাতার সঙ্গে পরিচিত হয়, ছাগল ছানা কোলে নিয়ে আদর করে, মেহের তাকে বাংলা বলতে না পারার জন্য ভর্তসনাও করে। এককথায় বাংলার গ্রামীণ সংস্কৃতির মধ্যে নিমজ্জিত করে তাকে একধরনের মেটামরফসিসের মধ্যে নিয়ে যাওয়া হয়। মেহেরের প্রতি প্রেম ও সেনা হিসেবে অপরাধবোধ তাকে বদলে দেয়। এই বদলে যাওয়া ওয়াসিমকেই মেহের গ্রহণ করে, কারণ সে তখন আর পাকিস্তানী নয়, সাংস্কৃতিকভাবে রূপান্তরিত প্রায় বাঙালি। এভাবে একজন সম্ভাব্য ধর্ষক ও হত্যাকারী মানবিক ও প্রেমিক হয়ে দেখা দেয়। আর মেহের তার দ্বারা যেমন রক্ষিত হয়, মেহেরও তাকে রক্ষা করে। দর্শকের সামনে তখন উভয়কে গ্রহণ করার আবেগি চাপ তৈরি হয়।



ওয়াসিমকে বন্দী হয়। কিন্তু ওয়াসিম না হয়ে যদি আশ্রয় চাইতো কোনো পাকিস্তানী মেজরের কন্যা বা স্ত্রী, তার জন্য কী বরাদ্দ হতো? এই প্রশ্নও রয়ে যায়। যাহোক, এই দীর্ঘ পুনর্জন্ম প্রক্রিয়ার (দুই ঘন্টা ছবির প্রায় ২০-২৫ মিনিট) পরও তাদের প্রেম ডিজুস প্রেমের থেকে বেশি কিছু থাকে না। তাদের প্রেম ও বিচ্ছেদ দর্শকের মনে তেমন দাগ কাটে না, যতটা কাটতে পারে নীলা ও নানাজানের সংকট ও মৃত্যু। এই প্রেমের গল্পটা একাত্তরকে বোঝার জন্যও জরুরি বলে মনে হয় না। এটা যদি কেবল একাত্তরের যুদ্ধের মধ্যে একটা প্রেমের গল্প হতো, তাহলে একরকম। আবার ছবিটা মুক্তিযুদ্ধের একটা ভিন্ন রাজনৈতিক আখ্যান হলেও অসুবিধা ছিল না। কিন্তু এখানে ছবিটার রাজনীতি আর প্রেম তেল-জলের মতো আলাদাই থাকে। বঙ্কিমচন্দ্র মধ্যযুগীয় পটভূমিতে পাঠান রাজকন্যা রওশন আরা এবং রাজপূত বীর জয়সিং এর প্রেমকে এমন গভীর আত্মদহনের মাধ্যমে দেখান যে, তা অস্বীকার করা কঠিন হয়। সেই প্রেম বাতিল হলেও তাদের প্রতি একটা সহানুভূতি রয়ে যায়। কিংবা বিফোর দা রেইন ছবির কথাও বলা যায়। মেহেরজানে সেরকম তীব্রতা দেখা যায় না, যার জন্য দর্শকের মনে যুদ্ধের ভয়াবহতার মধ্যেও মানবিকতার জন্য কোনো স্থান বরাদ্দের প্রযোজন জাগতে পারে। আগে যেটা বলেছি, মেহেরজানের একাত্তর রাজনৈতিকভাবে যতটা আসে, মানবিক অভিজ্ঞতার ভয়াবহ দুঃসহনীয়তা হিসেবে ততটা আসে না। যে প্রেম এত গভীর নৈতিক সংকটের জন্ম দেয়, সেই প্রেমকে এত পাতলা হওয়ায় ছবির সম্ভাবনাটা থমকে যায়।



কোনো মানব-মানবী সম্পর্কের সীমান্ত ডিঙাতেই পারে, কিন্তু পরিণতির দায় তাদের বহন করতে হবে, আবেগের ভিত্তিটাকে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। মেহেরজানে সেটা হয়েছে দুর্বলভাবে। নানাজান যেমন ইতিহাসবন্দী, মেহের এখানে বাসনাবন্দী। এবং সেই বাসনার নিজস্ব দাবি ততটা জোরালো নয়। ফলে ওয়াসিমও নানাজানের মতো হারিয়ে যায়। নানাজান অমহিমান্বিত মৃত্যুর মধ্যে, আর ওয়াসিমের নৌকা কুয়াশার অস্পষ্টতার মধ্যে হারিয়ে যায়। সে কোথাও পৌঁছাবে না, কারণ সে এক ‘ভাগাওয়া সিপাহি’। ভারতের হাতে পড়া এবং বেঁচে যাওয়া নিরানব্বই হাজার পাকিস্তানী সেনার মধ্যে সে পড়বে না, বাংলাদেশ তাকে হত্যা করবে, পাকিস্তানও তাকে ছাড়বে না। সে তাহলে কোথায় যাবে? ওয়াসিম ইতিহাসের অনিবার্য অপচয়ের অনুভূতিই কেবল জাগাতে পারে। এটুকুই যা সাফল্য এই চরিত্রের, এর বাইরে পুরোটাই এই ছবির সবচেয়ে দুর্বল ও সমস্যাজনক অংশ। এই সমস্যার অস্তিত্ব মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অধিপতি চিন্তার মধ্যেও যেমন, তেমনি বিরাজ করে অভিজাত কল্পনাতেও। এজন্যই আগেই বলেছিলাম, মেহেরজান ছবির মেসেজ আসলে শাসকশ্রেণীর মুক্তিযুদ্ধ দর্শনের অন্তর্দ্বন্দ্বকেই প্রকাশ করে। আমরা যারা এর বাইরে তাদের প্রতিরোধী বয়ান হাজির করার সুযোগ তৈরি করে দেয় এই ছবি। মেহেরজান যা বাস্তবে দেখাতে পারে না, তার ফাঁক ইউটোপিয়া দিয়ে পূরণ করে। সেজন্যই বাস্তবে যুদ্ধাপরাধের বিচারের আগেই, অপরাধের প্রায়শ্চিত্য পাওয়ার আগেই চলে আসে রিকনসিলিয়েশনের নান্দনিক সমাধান। যে সুন্দর কষ্ট আর যন্ত্রণাকে আড়াল করে পাশ্চাত্যের মানবাবতাবাদী ভাবনার কাঁথায় ওরিয়েন্টালিস্ট সুঁইয়ের সেলাইমাত্র। কিন্তু এ জন্যই এই ছবিকে গণ বা মুক্তির শত্র“ বলে গণ্য করা অতিপ্রতিক্রিয়া হবে। অনুভূতি ও চেতনাকেও গণতান্ত্রিক করতে হয়। প্রথমত, যে প্রজন্মএই ছবি বানাচ্ছে এটা তার কল্পনার সীমাবদ্ধতা। একাত্তর তার কাছে বিষয় বা আবেগ, শরীর-মন দিয়ে জানা-বোঝা বাস্তবতা নয়। দ্বিতীয়ত, একাত্তরের সামাজিক ও পারিবারিক ইতিহাস আবেগের আতিশয্য আর ইতিহাস বিকৃতির লাল সালুতে ঢাকা। তৃতীয়ত, যে শ্রেণীর লোকেরা মূলত একাত্তরকে ব্যাখ্যা করে, একাত্তর সম্পর্কে সেই শ্রেণীর দূরত্বের বোধ। এই শ্রেণী একাত্তরেও মুক্তি সংগ্রামের রাজনৈতিক তীব্রতা ও ধ্বংসের ভয়াবহতা থেকে দূরে নিরাপদই ছিল। আজো বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের জীবন ও আকাংখা থেকে তারা দূরে। তাদের বাসনা জাতীয় বাসনা হতে পারে না। এই দূরত্বের কারণেই যুদ্ধের মানবিক-অমানবিক সব মাত্রাই মেহেরজানে ফিকে হয়ে যায়।



দাঁড়িয়ে থাকে কেবল রাজনৈতিক চিন্তাটা, যা ইতিহাসের অনেক গুমর ফাঁস করার সম্ভাবনা ধারণ করে। শ্রেণী বিবেচনার পাশাপাশি এই নিরিখটাও তাই আমাদের ভুলে যাওয়া চলবে না। একারণেই এই ছবি নিয়ে আমার অবস্থানটা দ্বান্দ্বিক গ্রহণবর্জনের ভারসাম্য রা করে বলে আমি মনে করি। পরিচালক সযতনে একাত্তরের সংগ্রামে কমিউনিস্টদের রাজনৈতিক ভূমিকার স্বীকৃতি দিলেও সুমনের মুখ দিয়ে ধর্ম সম্পর্কে যে কথা বলেন, তা মার্কসের শিক্ষাও নয়, ইতিহাসের সত্যও নয়। তারা যদি ধর্মকে আফিমই মনে করবে, তাহলে মাওলানা ভাসানী এত প্রভাব বিস্তার করেন কীভাবে? কীভাবে সেসময়ের কমিউনিস্টরা আওয়ামী লীগের থেকেও বড় কৃষক-শ্রমিক-ছাত্র সংগঠন ষাটের দশকে গড়ে তুলতে পেরেছিল? অবচেতনের সুক্ষ্ম কমিউনিস্ট বিদ্বেষের সঙ্গে উগ্র জাতীয়তাবাদীদের কমিউনিস্ট বিদ্বেষ তাই মিলে যায়। ছোটো মেহেরের মতো বড় মেহেও উচ্চশ্রেণীর মনমানসিকতা বহন করে। মেহেরজান ধনী ভাস্কর। একা থাকেন, নির্জনে শিল্পচর্চা করেন। এবং যে সৌন্দর্য চর্চা করেন, তা গ্রিক হেলেনিক-আর্য সংস্কৃত-আর ইউরোপীয় রেঁনেসার উচ্চবর্গীয় আদর্শের রসসিক্ত। বাংলার নিসর্গ ও লোকায়ত ফুলগুচ্ছ দিয়ে অবশ্য মাঝেমধ্যে একে ব্যালান্স করা হয়। একইভাবে নানাজানের ইসলাম আর কৃষকের ইসলামও এক নয়। নানাজান কৃষক স্বার্থের কথা বলেন কিন্তু নিজের শ্রেণী ভূমিকা সম্পর্কে অসচেতন। এটা তাঁর জন্য ‘স্বাভাবিক’, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্যও ‘স্বাভাবিক’। অন্যদিকে শিল্পী মেহের যে সর্বধর্মসমন্বয় করে, সেটাও কি আরেকটা ইউটোপিয়া নয়? আরেকটা ব্রাহ্মধর্ম বা সম্রাট আকবরের দিন ই এলাহির মতো উচ্চবর্গীয় হেজিমনিক প্রকল্প নয়?



মেহেরজানের গুরুত্ব হচ্ছে, তা ইতিহাসের অনেক অমীমাংসিত প্রশ্নকে আবার আলোচনায় এনেছে। ১৮৭২ সালের জনশুমারিতে আবির্ভূত হওয়া সংখ্যাগুরু বাঙালি মুসলমান, ৪৬-৪৭ এর দাঙ্গা ও দেশভাগ, একাত্তরের মুক্তিসংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষবিপক্ষে সব ধারা, নারীর একাত্তর ও যুদ্ধশিশু, সমকামিতা, কমিউনিজম, সেকুলারিজম, জাতীয়তাবাদ, প্রাচ্য-পাশ্চাত্য, অহিংসা ও সৌন্দর্যসহ এত প্রসঙ্গ উত্থাপিত হয়েছে যে, ছবির ভরকেন্দ্রটা অনেক সময় হারিয়ে গেছে। আর এসব প্রসঙ্গ যেসব তত্ত্বকাঠামো দিয়ে দেখা হয়েছে, তার সীমাবদ্ধতা নিয়েও ভাবা হয়নি। তত্ত্ব দিয়ে শিল্পের শরীর নির্মাণ করা যায় না। শিল্পকে তত্ত্বের সহায়তা নিলেও নিজস্ব দাবির ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হতে হয়। মেহেরজান ছবি তাই এক দারুণ উদ্যোগ হয়েও ট্রিটমেন্টে কেয়ারলেস। ইতিহাসের আখ্যানের মধ্যে উচ্চবর্গীয় বাসনার আধারে, তা শেষপর্যন্ত আমাদের ইতিহাসের মতোই অমীমাংসিত। কারণ, মুক্তিযুদ্ধকে এখানে উচ্চবর্গীয় এক ইতিহাস থেকে অন্য ইতিহাসে দেখানো হলেও তা শেষপর্যন্ত উচ্চবর্গীয় বাসনারই শিকার হয়।
২৯.১.১১
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/farukwasifblog/29316707 http://www.somewhereinblog.net/blog/farukwasifblog/29316707 2011-01-29 19:26:29
যুদ্ধ ও ভালবাসার মালিকানার মামলা ৩ : মেহেরজানের নারীরা এটা যখন লিখছি, তখন এই শুক্রবার দুপুরে খবর পেলাম বলাকা থেকে মেহেরজান ছবি নামানো হয়েছে, সিনেপ্লেক্স থেকেও নেমে যাবে আজকের শো-এর পর। যেহেতু অগ্রিম টিকিট বিক্রি হয়ে গেছে, তাই একদিন দেরি)। ওপর মহলের চাপে ওপর মহলের তৈরি ছবি বন্ধ হচ্ছে। বলি হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস স্বয়ং। ওপর মহলের নিষিদ্ধবাদীদের জয় হোক। তাদের হুমকি ও নিন্দার মধ্যে সুস্থ বিতর্ক করতে যাওয়াও আত্মঘাতী। কিন্তু নীতি ও দায়িত্বের স্বার্থে সেই আলোচনা আমাকে করতেই হবে। আমি ভুল হতে পারি, কিন্তু এটাও একটা বক্তব্য। কেউ আমাকে যুক্তির ভিত্তিতে খণ্ডন করতেই পারেন। কিন্তু আমাকে বেজন্মা-রাজাকার-টাকা খাওয়া সাংবাদিক বলা আমার পরিবারকে জঘন্যভাবে কলঙ্কিত করার বিরুদ্ধে আমি একা ও নিরস্ত্র। বহু বছর ধরে আমি আমার লড়াই চালাচ্ছি ডানপন্থার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের বিপ্লবী রূপান্তরের পক্ষে। এই চরিত্রহননো সহ্য করা সেই লড়াইয়ের অংশ। এরকম অবস্থায় মাথাঠাণ্ডা রেখে আলোচনা করা কঠিন। তবু চেষ্টা করছি।


আহমদ ছফা লিখেছিলেন, ‘একাত্তর মহাসিন্ধুর কল্লোল’। হাসান আজিজুল হক তাঁর বাংলাদেশ: পালিয়ে বেড়ায় দৃষ্টি এড়ায় প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘যদি কোটি মানুষের আমি একা আমার এই বুক থেকে খালাস করে দিতে পারতাম, যদি পুরো একটি আগ্নেয়গিরির লাভাস্রোতে কষ্টের শোকের ক্ষোভের ক্রোধের আক্রোশের উচ্ছ্বাস আমার একার বুক ফাটিয়ে বেরিয়ে আসতে পারত, যদি লক্ষ লক্ষ মানুষের অশ্র“ আমার দুখানি চোখ থেকে মুক্তি পেত, তাহলে হয়তো খানিকটা ন’মাসের অভিজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশ ঘটানো যেত।’ এ পর্যন্ত বলেই বলছেন, ‘কিন্তু কিছুই করা গেল না’।

আমি বলব এই যে গেল না, এটাই একাত্তরকে ধারণ করায় বাংলাদেশের শাসক-লেখক-শিল্পী-ইতিহাসবিদদের ব্যর্থতা। একাত্তর শাসকদের কাছে রাজনীতির বিষয়, আর যারা সেই রক্তকল্লোল সাঁতরে পেরিয়েছে, তীব্র জীবনীশক্তি আর ধ্বংসশক্তির লড়াই দেখেছে তাদের রয়েছে কেবল সেই অভিজ্ঞতার পাথর। যে পাথর আজো বুকে চেপে আছে, কিন্তু সেই ব্যথা খালাস করার কোনো সুযোগ রাখা হয়নি। একাত্তর নিয়ে যে কোনো কথা-কাজে-শিল্পে মানুষ তাই সেই নিকষ অভিজ্ঞতার ছাপ দেখতে চায়, যন্ত্রণা ও প্রতিবাদটা দেখতে চায়। প্রশ্ন উঠেছে মেহেরজানে কি আমরা তা দেখতে পাই?

গণহত্যা-গণধর্ষণ-নিপীড়ন ও বসতি পোড়ানো আগুন কি এই ছবিকে ছুঁয়েছে? আগেই বর্ণনা করেছি, কীভাবে ছবিতে একাত্তরের দুঃসহ অভিজ্ঞতা শুরুতেই অনুভব করিয়ে বোঝানো হয়েছে এই কাহিনী ঘটছে কোন পটভূমিতে। কিন্তু এই দেখানো আরো বাস্তব ও তীব্র হতে পারতো। আরো যুদ্ধ-মৃত্যু-নৃশংসতা দেখানোর কথা বলছি না। বলছি চরিত্রগুলোর মধ্যে, গ্রামের পরিবেশের মধ্যে সেই থম ধরানো যুদ্ধদিনের ছাপ ততটা জীবন্তভাবে ফুটে ওঠেনি। এটা ছবির শৈল্পিক দুর্বলতা। একই জিনিস দেখতে পাওয়া যাবে, তিন নারী চরিত্রের মধ্যেও, এমনকি মুক্তিযোদ্ধা চরিত্ররাও যেন প্রাণ খুলতে পারছে না, উঠে দাঁড়াতে পারছে না। নানা, মেহের আর ওয়াসিম যতটা যতœ পেয়েছে, ততটা যতœ অন্য চরিত্রগুলো পায়নি। মেহের ও নীলা এখানে বিশেষ। তার আলোচনা আমরা আলাদা করে ‘মেহেরজানের নারী’ অংশে আবারো করবো। আপাতত নানা চরিত্রের মধ্যে আরেকটু প্রবেশ করা যাক।

নানাজানের পাকিস্তান বিরোধিতা ছিল ৪০ থেকে ৭১ পর্যন্ত পাকিস্তানের প্রতারণার প্রতিক্রিয়া। যে প্রতারণার বিষে বিষাক্ত হয়েছিলেন পূর্ব বাংলার অধিকাংশ বুর্জোয়া রাজনীতিবিদরাও। আগের পর্বে নানাজান চরিত্রের যে বিশ্লেষণ দেখানো হয়েছে, তাতে প্রমাণ হয় তিনি একজন জাতীয়তাবাদী মুসলিম কৌম পুরুষ। জাতীয়তাবাদে যেভাবে শ্রেণীকে আড়াল করা হয়, কৌমচিন্তার কাঠামোতেও তা একইভাবেই ঢেকে রাখা হয় একাত্মতার ঝালরের নীচে। বাঙালি জাতীয়তাবাদ হিন্দু-মুসলিম পরিচয়কে নাকচ করে নয়, আত্মীকৃত করার মাধ্যমেই ভারসাম্যপূর্ণ রাজনৈতিক প্রকল্প হয়ে উঠতে পারে, এটা তাঁর থিসিস। মুসলমানিত্ব আর সেকুলার জাতীয়তাবাদীত্বের মধ্যে আবশ্যিক কোনো অন্তর্গত বিরোধ নেই বলে যদি মানি, তাহলে নানাজান চরিত্রকে গ্রহণ করতে অসুবিধা কোথায়? ভাসানী মুসলিম পরিচয় নিয়েই সাম্যবাদে সমর্থন দিয়েছিলেন, মুজিব মুসলিম পরিচয় নিয়েই বাঙালি জাতীয়তাবাদী হয়েছিলেন। ’৭২ এর ফেব্র“য়ারি মাসে কলকাতার প্যারেন্ড গ্রাউন্ডে দেওয়া বক্তৃতায় তিনি বলেছিলেন, সোনার বাংলা আমাদের থাকবে, পশ্চিম বাংলা ভারতের থাকবে। সেই বক্তৃতায় তিনি তাঁর বাঙালি জাতীয়তাবাদকে বাংলাদেশের গণ্ডীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ করে দেখিয়েছিলেন। পরবর্তীতে ওআইসি-তে যোগদান, ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা, মাদ্রাসা শিক্ষার বিস্তার এবং ভুট্টোর প্রতি ‘আও মেরে ভাই’ বলে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন সেই জাতীয়তাবাদের সীমা-সরহদ্দ। (দেখুন: বাঙালি জাতীয়তাবাদরে গণ্ডি কি বাংলাদশেই সীমাবদ্ধ?

Click This Link)

৭২ সালেই বদরুদ্দীন উমর ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের ভিত্তি’ নামক নিবন্ধে অভিযোগ করেছিলেন, শেখ মুজিব কার্যত বাংলাদেশী বাঙালি পরিচয়কে রাজনৈতিক রঙে রঞ্জিত করার মাধ্যমে বাঙালি মুসলিম জাতীয়তাবাদ পত্তন করছেন, যা আসলে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদেরই ভিত্তি। এবং যা শেষ বিচারে পাকিস্তানী জাতীয়তাবাদের আদলেই নির্মিত। এ কারণে যে, মুসলিম পরিচয় ছাড়া বাংলাদেশি কথাটার কোনো জাতীয়তাবাদী অর্থ হয় না। নানাজানের বাঙালি মুসলিম জাতীয়তাবাদী চরিত্রের যে রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক দুর্বলতা, তা আসলে তাঁর শ্রেণীরই দুর্বলতা। (এই উচ্চবর্গীয় রোমান্টিক জাতীয়তাবাদ যে শেষপর্যন্ত অধিকাংশ জনগোষ্ঠীকে ধারণ করতে পারবে না, শ্রেণী ও নিম্নবর্গের প্রতিনিধিত্ব যে তাদের দ্বারা সম্ভব হবে না, সেটা অন্য আলোচনা। সেটা আমরা উপসংহারের দিকে গিয়ে করবো।)



নানাজান নিশ্চিতভাবেই চলমান ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিলেন। বাঙালি কৃষকের যে মুক্তির কথা তিনি বলেন, তা বাস্তবায়নের ভরসা তিনি মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন শক্তির মধ্যে পান না। (স্বাধীনতার ৪১ বছর পরে একথা অকাট্য সত্য যে, তাঁর সংশয় প্রমাণিত হয়েছে) তাহলেও, মুক্তি সংগ্রামে তাঁর সমর্থনের প্রমাণ হিসেবে তাঁর মেয়েকে যুদ্ধে পাঠান, মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দেন, বলেন যে পাকিস্তান হলো দারুল হরব এবং পাকিস্তান আর্মির হাতে নিহত হন।

এসব থেকে আমার সিদ্ধান্ত হলো, যাঁরা তাঁকে মুসলিম লীগার ও মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী বলে দুষছেন, তাঁরা ভুল করছেন। তিনি বিপরে শক্তি তো ননই, বরং অহিংস জাতীয়তাবাদী ইউটোপিয়ার শহীদ। তাঁর নীতির মতোই ইউটোপিয় ছিল তা বাস্তবায়নের পন্থা। শেখ মুজিবও আলোচনার পথে অধিকার আদায় করতে চেয়েছিলেন। সে পথে সর্বোচ্চ সীমিত স্বায়ত্তশাসন এবং কমজোরি প্রধানমন্ত্রীত্ব তিনি পেতে পারতেন। কিন্তু স্বাধীনতা আলোচনা করে আসতো না। গান্ধিও একই ভুল করেছিলেন শ্রেণী দোষে। ফলে যে ঘৃণা ইংরেজের বিরুদ্ধে হওয়ার কথা, তা পথ না পেয়ে রিভার্স প্রক্রিয়ায় ভ্রাতৃঘাতী দাঙ্গায় পর্যবসিত হলো। ইতিহাস যখন রক্ত ছাড়া এগবে না, তখন তা এড়াতে গেলে আরো রক্তপাতকেই ডেকে আনা হয়। এবং তা হয় আÍঘাতী। আবারো বলছি, মিলগুলো গুণে নয়, লক্ষণে।

মেহেরজানের নারীরানানাজান যদি এই ছবির রাজনৈতিক ঈমান হন, তবে নারীরা হলো এই ছবির নিশান। জাতীয়তাবাদী ডিসকোর্সের মধ্যে নানাজানের ভূমিকা রা পেলেও শেষ বিচারে নারীদের বাঁচাতে পারেননি পরিচালক। উদ্দেশ্য যা-ই হোক, মেহের-নীলা বা সালমার প্রতি সুবিচার করা হয়নি। নানাজান বন্দী ইতিহাসের গোলকধাঁধায় আর মেহের বন্দী তার বাসনার পাকেচক্রে, নীলা বন্দী তার সাহসিকতায়, সালমা বন্দী তার কল্পলোকে আর মেহেরের মা ও আরেক খালা বন্দী পুরুষের ঘরকন্নার কাজে। ভিন্ন ভিন্ন প্রবণতার আইডিয়া হিসেবে এই নারীরা যতটা দাঁড়ায়, বাস্তব সত্তা হিসেবে ততটা প্রতিষ্ঠিত হয় না তাদের শেকড়। তাহলেও আইডিয়াগুলো বিশ্লেষণের দাবি জানায়। সেই বিশ্লেষণের অংশ হিসেবে আমি কাহিনীর মধ্যে কতগুলো স্রোত বা নকশার দিকে মনযোগ কাড়তে চাই।

ক. রূপান্তরের গতিসূত্র
ছবিতে যে কাহিনী বিবৃত হয়েছে, তা একধরনের রূপান্তরের গতিসূত্র মেনে চলে। এই রূপান্তর ঘটে মনোজগতের দ্বন্দ্বে নয় শুধু, স্বাধীনতাযুদ্ধের অভিজ্ঞতার চাপেও। এই অভিজ্ঞতা ও সেই সূত্রটা আমরা এখন চিহ্নিত করার চেষ্টা করবো।

১. [sbনানাজান: নানাজানের ঐতিহাসিক সফর (৪০ সালের লাহোর প্রস্তাব, ৪৬ এর দাঙ্গা, ৪৭ এর দেশভাগ ও দেশান্তর, পাকিস্তানের প্রতারণা, একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধ) তাঁকে মুসলিম লীগার থেকে বাঙালি জাতির পে সওয়ালকারী এক কমিউনিটি লিডার হিসেবে রূপান্তরিত করে। শেখ মুজিবের রাজনৈতিক রূপান্তরটিও কিন্তু একইভাবে ঘটেছিল। ইতিহাসের যৌক্তিক বিশ্লেষণ করার সমতা দেখালেও অভিজ্ঞতা নানাজানকে নিজেকে প্রত্যাহারের মরমি অভিমানের দিকে ঠেলে দেয়; যা যত সুন্দরই হোক অকার্যকর। তিনি প্রাসঙ্গিকতা থেকে অপ্রাসঙ্গিকতায় চলে যান। শুরুতে যে মহীরুহ থাকেন, দৃশ্যের পর দৃশ্যে সেই মহীরুহের পতন ঘটতে দেখি। ছবির অন্তিমে তিনি পতিত হন। তাঁর পতনের মাধ্যমেই গ্রামটি ধ্বংস হয়।

২. [sbনীলা: নীলা পূর্ববাংলার ছাত্র ইউনিয়ন করা বিপ্লবী নারী, এ ছাড়া তার অতীত সম্পর্কে আমরা কিছুই জানি না। তার সাহসিকতার প্রমাণ মেলে আর্মির কাছ থেকে পিতার লাশ দাবি করায়। তার নৈতিক উচ্চতা জানতে পারি, ধর্ষণের ট্রমা কাটিয়ে ওঠার আপ্রাণ চেষ্টায়। তার প্রেম ছিল, বিপ্লবের আশা ছিল, সক্রিয়তা ছিল। কিন্তু সব ধনের পুরুষ কর্তৃক নির্যাতনের অভিজ্ঞতা তাকে নিরাশ ও বিক্ষুব্ধ করে তোলে সব কিছুর প্রতি। পাকিস্তানী সৈন্যরা তার কাছে ‘সুয়োরের বাচ্চা, জানোয়ার’, যাদের সে নিজ হাতে খুন করতে চায়। বাড়ীতে আর্মিরা এলে না লুকিয়ে বরং সে বটি হাতে তাদের মারতে যেতে চায়। পুরুষের প্রতি কোনো প্রেমবোধ আর সে করে না। তার সাময়িক সঙ্গী সুমনের আকর্ষণের মধ্যেও সে কেবল শরীরিপণাই দেখে। ‘সব পুরুষই সমান’ হয়ে দেখা দেয় তার কাছে। এই নীলার দুটো পরিণতি হতে পারতো_ একাত্তরের অন্যসব নির্যাতিতদেরও যা হয়েছে। সে আত্মহত্যা করতে পারতো বা লুকিয়ে পড়তে পারতো কলঙ্ক দাগের নীচে। অথবা সে প্রতিশোধ নিয়ে শেষ হয়ে যেতে পারতো। দ্বিতীয় পথেই সে যায় এবং পেয়ারাবাগানের কমরেডদের সঙ্গে শহীদ হয়। এই ছবির অন্যতম চুম্বক চরিত্র এই নীলা। তারপরও দুর্বোধ্য থেকে যায়, সুমনের সঙ্গে তার যৌনসম্পর্কের মিনিং। সে কি এর মাধ্যমে ট্রমা থেকে বেরিয়ে আসতে চেয়েছিল? নাকি চেয়েছিল তার বিধ্বস্ত ও অপমানিত যৌনসত্তাকে রিকেইম করতে? এর উত্তরটি আমার কাছে স্পষ্ট নয়। যারা এধরনের নারী-অভিজ্ঞতা নিয়ে গবেষণা করেছেন, তাদের জেনেছেন, তারা এ ব্যাপারটির সুরাহা করতে পারেন। কিন্তু ঘটনাটিকে নিন্দনীয় বলার সুযোগ নেই। সন্তানের শোকে মা যদি পাগলের মতো হাসে, নীলা যদি পুরুষ ঘৃণা করে আবার পুরুষের কাছেই যায়, তা বোঝার মতো মন পুরুষের আছে কিনা আমি জানি না, জানি না কোন তাত্ত্বিক হাতিয়ার দিয়ে আমরা তার মনের এই দুরূহ অবস্থাকে ব্যাখ্যা করবো। দেখুন: সেইসব ‘বীরাঙ্গনা’, তাদরে না-পাক শরীর এবং একাত্তররে কাজলরখোদরে কথা
http://www.nirmaaan.com/blog/faruk-wasif/5796


৩. সালমা: সালমা বুদ্ধি প্রতিবন্ধী, বাবার আদরের সন্তান এবং দেশভাগের বীভতস অভিজ্ঞতার শিকার। সালমা গর্ভাবস্থায় তার মা ছেচল্লিশের দাঙ্গায় কলকাতা থেকে পালিয়ে আসবার সময় যে নৃশংস দৃশ্যের সামনে পড়েন, তা তাঁর মনে যে বিলোড়ন ঘটায়, তার প্রভাব পড়ে গর্ভে থাকা সালমার মধ্যে। ধারণা করি, সালমার জন্ম আর ভারত-পাকিস্তানের জন্ম একই সময়ে। যে বিকৃত পথে দুটি রাষ্ট্র জন্মায়, সেই ঐতিহাসিক বিকারই সালমাকে স্বাভাবিক জীবন থেকে বঞ্চিত করে। সালমা হয়ে ওঠে একইসঙ্গে প্রতিবন্ধী পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রতীক ও শিকার: অবিকশিত, বালসুলভ কল্পনাশ্রিত। সালমা ৪৭-এরই সন্তান। এই চরিত্রের মধ্যে আহমদ ছফার ওঙ্কার উপন্যাসের সেই বোবা মেয়েটির মিল পাওয়া যায়, যে ভাষাবঞ্চিত বাঙালির বলতে না পারার প্রতীক। সেই বোবা মেয়েটি ঊন্নসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের তেজে কথা বলে উঠতে চায়। জনতার রূপান্তরের সঙ্গে তারও রূপান্তর ঘটে। আর এক মুক্তিযোদ্ধাকে ভালবেসে সালমাও যেন মুক্তি পায় ইতিহাসের অভিশাপ থেকে। সালমার মাধ্যমে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্মপ্রক্রিয়ার গভীর অসঙ্গতির সমালোচনাই আসলে করা হয়, এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাংলাদেশের মানুষ সেই অসঙ্গতি থেকে যে বেরিয়ে আসছে, সেটাও বলা হয় তার প্রেমের অভিমূখে একজন মুক্তিযোদ্ধাকে স্থাপন করার মাধ্যমে। তার প্রথম জন্ম ছিল অপরিণত, দ্বিতীয় জন্মে তার মুক্তির পথ খুলে যায়। তারও ইতিবাচক রূপান্তর ঘটে। সে হয়ে ওঠে ‘জয় বাংলা’র মেয়ে।

পরের পর্ব: মেহেরজান ও তার নিষিদ্ধ প্রেম

আগের দুই কিস্তি
মেহেরজান: যুদ্ধ ও ভালবাসার মালিকানার মামলা ২
Click This Link

মেহেরজান: যুদ্ধ ও ভালবাসার মালিকানার মামলা ১
Click This Link

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/farukwasifblog/29316123 http://www.somewhereinblog.net/blog/farukwasifblog/29316123 2011-01-28 17:16:32
মেহেরজান: যুদ্ধ ও ভালবাসার মালিকানার মামলা ২ Click This Link

প্রচারণায় যা আড়াল করা হচ্ছে
চলচ্চিত্রতাত্ত্বিক গাঁস্ত রোবের্জ শিখিয়েছিলেন, ফিল্মের বেলায় শুরুর কয়েকটি দৃশ্য ও আবহ থেকেই একটি ছবি কী বলতে যাচ্ছে তার আঁচ-অনুমান পাওয়া যায়। প্রথম দৃশ্যেই ড্রাম-বিউগলের বাদ্যধ্বনির সঙ্গে ভারতবর্ষের মানচিত্র দেখানো হয় এবং বলা হয়, ‘১৯৪৭ সাল, ইংরেজ উপনিবেশিক শাসনের শেষ এবং হিন্দু প্রধান ভারত ও মুসলিম প্রধান পাকিস্তানের জন্ম।’ দৃশ্যে দেখি চাঁদ-তারা খচিত পশ্চিম ও পূর্ব পাকিস্তান; মাঝখানে ভারত। পরের মুহুর্তেই পূর্ব পাকিস্তানকে দেখা যায় মানচিত্রে ফাটল তৈরি করে দূরে সরে যেতে। ভাষ্যে বলা হয়, ‘গভীর সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক পার্থক্যের জন্য পাকিস্তানের উভয় অংশ পরস্পর থেকে দূরে সরতে থাকে।’ বঞ্চিত পূর্ব পাকিস্তান একপর্যায়ে স্বাধীনতা ঘোষণা করে এবং মানচিত্রে পূর্ব পাকিস্তানের চাঁদ তারার সাদা-সবুজ মুছে গিয়ে ভেসে ওঠে লাল সবুজ একাত্তরের পতাকা। আবহে শোনা যায়, শেখ মুজিবের ৭ মার্চের ভাষণ, ‘তোমাদের যা কিছূ আছে তা নিয়ে শত্র“র মোকাবেলা করো...এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম। জয় বাংলা।’ বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের শুরু।

ছবিরও শুরু সেখানে। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে যুদ্ধশিশু সারা ঘুরে ঘুরে দেখতে থাকে একাত্তরের স্মৃতিচিহ্ন। ৪১ বছর আগে তখন গ্রামে ঢুকছে পাকিস্তানী বাহিনী। জাদুঘরে গণহত্যার স্টিল ছবি, ধর্ষিতার ফটোগ্রাফ, গণহত্যায় নিহত শিশুদের লাশ। মুক্তিযুদ্ধের পরিচিত আবহ নির্মিত হয়ে যায় কয়েক মিনিটের মধ্যেই। এবং এ পর্যন্ত আপত্তির কোনো কারণ দেখি না।

এই পটভূমিতেই প্রতিষ্ঠা করা হয় বাংলাদেশের একটি গ্রামকে, যেখানে যুদ্ধ ক্রমশই তার ছায়া ফেলছে। পুরো ছবিতে যুদ্ধ-নৃশংসতার এই পটভূমির বিরুদ্ধে একটি কথা বা দৃশ্য নেই। সুতরাং প্রথম পাঁচ মিনিটকে বলা যায়, মুক্তিযুদ্ধের স্বীকৃত ইতিহাসের বর্ণনা, যার ভিত্তিতে ছবির চরিত্রগুলো এবং ছবির দ্বন্দ্বগুলো আত্মপ্রকাশ করবে। এটাই সেই ফাউন্ডেশনাল এক্সপেরিয়েন্স, যার নিরিখে কাহিনীটিও বিবেচিত হবে।

এবার ছবির শৈল্পিক বিচারের আগে ছবির ন্যারেটিভকে একাত্তরের ইতিহাস ও রাজনীতির নিরিখে যাচাই করা যাক। আমরা একে একে চরিত্রগুলো বিশ্লেষণ করে সে পথে যাব। সবার শেষে আসবে চলমান বিতর্ক নিয়ে পর্যালোচনা।

নানাজান চরিত্রের শেকড় কোন ইতিহাসে?
নানাজান এককথায় ইতিহাসের প্রতিনিধি। উপমহাদেশের জাতীয়তাবাদী রাজনীতির আবহে সৃষ্ট এক আইডিয়ার জীবন্ত মূর্তি। কোন আইডিয়ার? বাঙালি মুসলিম জাতীয়তাবাদের। কতগুলি ঐতিহাসিক-মতাদর্শিক ধারণা দিয়ে গড়া তাঁর চরিত্র। তিনি বাঙালি জাতীয়তাবাদের একটা ক্রাইসিসের একধরনের সমাধান হিসেবে নির্মিত হন। ছবিতে তাঁর বাঙালি মুসলিম জাতীয়তাবাদ বাংলাদেশী বাঙালি জাতীয়তাবাদের এক ঐতিহাসিক সংকটের আপাত সমাধান হিসেবে আসে। বাংলাশের রাজনৈতিক সমাজে বাঙালিত্ব আর মুসলমানত্ব পরস্পরের বিপরীত হিসেবে দেখার শক্তিশালী ধারা আছে। একাত্তরের একটা ব্যাখ্যান এটাও বলে যে, মুক্তিযুদ্ধ ছিল ইসলামের বিরুদ্ধে। সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্ম ও সংখ্যাগরিষ্ঠের আত্মপরিচয়ের এই ফাঁকের মাঝখানে সেতু হিসেবে আবির্ভূত হন নানাজান। বাংলাদেশের বাঙালি জাতীয়তাবাদের মধ্যে আবশ্যিকভাবে বাঙালি মুসলমানের মনও থাকবে, ছফা বলেছিলেন। শেখ মুজিবের বাঙালি জাতীয়তাবাদ এভাবেই নিজেকে ভারতীয় হিন্দু বাঙালিদের থেকে রাজনৈতিকভাবে নিজের বিশেষত্ব চিহ্নিত করেছিল। করতে হয়েছিল।

নানাজানের কিছু স্টেটমেন্ট তাঁর রাজনৈতিক চরিত্রকে চিনতে সাহায্য করবে।

রাজাকার নেতা পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষায় তাঁর সাহায্য চাইলে তিনি বলেন,

কোন পাকিস্তান? পাকিস্তান কায়েম করতে আপনাদের মতো সুবিধাবাদীরাই চেয়েছে। আমি কখনো পাকিস্তান আন্দোলন সমর্থন করিনি। পাকিস্তান স্টেটে বাঙালিদের অবস্থান সম্পর্কে বরাবরই সন্দিহান ছিলাম। ১৯৪০ এর লাহোর প্রস্তাবে বাংলার উল্লেখ ছিল না। লাহোর ও বাংলার মুসলমানরাও এক নয়।

এরপরও রাজাকার মুসলিম ভ্রাতৃত্ব ইত্যাদি কথা তুললে তিনি তাকে হাত তুলে থামান এবং বিদায় নিতে বলেন।
স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকে তিনি বলেন,

বাঙালির সংগ্রামের ইতিহাস দীর্ঘদিনের। কিন্তু বারবার সেই সংগ্রাম বেহাত হয়েছে। ...কৃষকদের সত্যিকার চাওয়া কে কবে বুঝেছে? ...এ ভূখণ্ডের মানুষ শ্রী চৈতন্য ও শাহজালালকে ভক্তি করে।

পাকিস্তানী মেজরের মুখের ওপর তিনি জবাব দেন।

কখনো সেপারেটিস্ট ছিলাম না। ৪৭ এর দেশভাগ সমর্থন করিনি। কিন্তু সময় আসে যখন মানুষ তার অধিকার আদায়ের জন্য উঠে দাঁড়ায়।

খেয়াল করার বিষয়, কথা হয় ইংরেজিতে, আলীগড়ের স্কলার হয়েও তিনি উর্দু জবান সচেতনভাবে পরিহার করেন।


৪৮ এ অর্ধেক দেশ হারালাম আর এখন (৭১-এ) হারাচ্ছি অর্ধেক মানুষ। আমি কখনো জিন্নাহর দ্বিজাতিতত্ত্বে বিশ্বাস করতাম না।... এক তরবারীর নীচে দুই বাংলার মুসলমানরা কোরবানী হলো।

বাঙালি মুসলমানের মন বিভক্ত কতটা বাঙালি আর কতটা মুসলমান তা নিয়ে। নানাজানের কাছে এর সমাধানসূত্র হলো, বাঙালি কৃষকের চৈতন্য।...যে জমিতে গামছা পেতে নামাজ পড়ে আবার সংগ্রামেও পিছপা হয় না।

দৃশ্যে তখন ভাসতে থাকে এস এম সুলতানের সংগ্রামী সবল কৃষকের চিত্রমালা। বাঙালির নিম্নবর্গীয় সেকুলার পরিচয়ের ভিত্তি সুলতানের এই কৃষকেরা।

পেয়ারাবাগান থেকে সিরাজ সিকদারেরবাহিনীর অন্যতম কমাণ্ডার জাহানারার চিঠি নিয়ে আসে কমিউনিস্ট মুক্তিযোদ্ধা জবা। তাঁকে তিনি আশ্রয় দেন এবং বসিয়ে সম্মান করে সাগ্রহে আমাদের নারী মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বগাথা জানতে চান। জিজ্ঞেস করেন,

বলুন মা, কীভাবে আমাদের জেনানারা বন্দুক হাতে মুক্তিযুদ্ধ করছে, কীভাবে আমাদের মেয়েরা স্বাধীনতা যুদ্ধ করছে?

তাহলে দাঁড়ালো এই যে, নানাজান খাজা সাহেব বাঙালি মুসলিম জাতীয়তাবাদী। তিনি সাম্প্রদায়িক দেশভাগ মানেন নি। দেশভাগের জন্য কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের সাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদকে দায়ী করেন। মুসলমানিত্ব ও বাঙালিত্বের মধ্যে যে তিনি কোনো বিরোধ দেখতে পান না। পশ্চিমা গণতন্ত্র, সেকুলারিজম ও কমিউনিজম দিয়ে বাঙালি কৃষকের মনকে বোঝা যাবে না, তাদের মুক্তিও এসবের মাধ্যমে আসবে না। কিন্তু কীভাবে আসবে তাও বলেন না। ইসলাম তাঁর আধ্যাত্মিক বিশ্বাস মাত্র। তাঁর পরিবারের সদস্যরা কেউ পর্দা করে না, মেয়েরা স্বাধীন, পুরুষরা মুক্তিযুদ্ধের প্রতি সহানুভূতিশীল। তিনি প্রগতিশীল পাকিস্তানী কবি ফায়েজ আহমেদ ফায়েজের কবিতা আউড়ান, যিনি একাত্তরে বাংলাদেশের পে ছিলেন বলে নির্যাতিত ও কারাবন্দি হয়েছিলেন। প্রকৃতি ও প্রাণ তাঁর অপার আগ্রহের আর ভালবাসার বিষয়।

রাজাকার ছাড়া সকলেই তাঁর আশ্রয়-প্রশ্রয় পায়। বাড়িতে হিন্দু শরণার্থীদের আশ্রয় দেন। তাঁর গ্রামে জয় বাংলার মুক্তিযোদ্ধা, কমিউনিস্ট মুক্তিযোদ্ধা সবাই আশ্রয় ও পৃষ্ঠপোষকতা পায়। তাদের তিনি খাওয়ান। কিন্তু গ্রামকে হানাহানি মুক্ত রাখতে সবাইকে অপারেশন চালাতে নিষেধ করেন। তাঁর ধারণা এতে গ্রামবাসীদের জীবন বাঁচতে পারে। এ জন্য স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা থেকে শুরু করে কমিউনিস্টরা পর্যন্ত তাঁকে পথের বাধা মনে করে। পিস কমিটিতে নাম লেখাতে তাঁর ঘৃণা হয়। এ জন্য তাঁকে মৃত্যুর হুমকি মাথায় নিয়ে চলতে হয়, অপমান আর লাঞ্ছনার শিকারও হন পাকিস্তানী আর্মির তরফ থেকে। অহিংসা তাঁর নীতি, রক্তপাতের মাধ্যমে কোনো অগ্রগতি ও সমাধানে তাঁর আস্থা নেই (যদিও মনে করেন, সময় আসে যখন মানুষ উঠে দাঁড়ায়)। পাকিস্তানী আর্মি যুদ্ধজয়ের জন্য দোয়া চাইলে তিনি বলেন, তারা যাতে নিরাপদে ফিরে যেতে পারে। তিনি যুদ্ধবিরোধী কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের প্রতি সহানুভূতিশীল এবং তার সক্রিয় সহায়তাকারী।

একটি চরিত্রের আগাপাশতলা বুঝতে আর কী লাগে? এককথায় বললে, নানাজান হলেন অহিংসা, বাঙালি মুসলমান কৃষকের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম ও মানবপ্রেমের বিশুদ্ধ নীতির বাস্তব প্রতিমা। বাস্তবে ইতিহাস তাঁর মতো করে চলেনি, যেমন চলেনি ভিন্ন অর্থে গান্ধি এবং শেখ মুজিবের কথায়ও। কিন্তু এঁদের জীবন ইতিহাসের আরেকটি সম্ভাবনার কথাও বলে। সেই সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা ইতিহাসেরও বিষয় শিল্পেরও বিষয়।

নীতির শহীদ

গান্ধি ও মুজিব চরিত্রের আইডিয়ার নির্যাস নানাজান। দুই নেতাই একটা মাত্রা পর্যন্ত সব ধরনের জাতীয়তাবাদীদের সমীহ পেয়েছিলেন। ৬৯-এর পর থেকেই বাম-ডান জাতীয়তাবাদীরা বারবার মুজিবের কাছে এসেছে, স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে আহ্বান জানিয়েছে বা নিজেরা যে সেই পথে যাওয়া খবর দিয়ে তার সমর্থন চেয়েছে। মুজিব দৃশ্যত তাদের বাতিল না করে ধারণের চেষ্টা করেছেন। গান্ধির মতোই মুজিবও শান্তিপূর্ণ অহিংস সংগ্রামকেই আনুষ্ঠানিকভাবে পন্থা হিসেবে নিয়েছেন এবং একইসঙ্গে স্বাধীনতা সংগ্রামের সকল ধারার যোগসূত্র হওয়ার চেষ্টা করেছেন বা তাকেই রাজনৈতিক কৌশল করেছেন। নানাজানও তা-ই করেছেন। এবং গান্ধি ও মুজিবের মতোই অহিংসার নীতির অকার্যকারিতা প্রমাণ হতে দেখেছেন। মুজিবও ২৫ মার্চ পর্যন্ত দৃশ্যত যুদ্ধ ঠেকিয়ে রাখার চেষ্টা করেছেন, সংলাপ চালিয়েছেন (যদিও ৭ মার্চের ভঅষণ যুদ্ধঘোষণার সামিল)। মুৃজিবের আত্মসমর্পণের যুক্তি ছিল যে, তাতের মানুষের জীবন বাঁচতে পারে (যদিও একে কেউ কেউ দায়িত্বহীনতা মনে করেন এবং কার্যত এ ঘটনা গণহত্যা ঠেকাতে পারেনি)। নানাজানও গ্রামে কাউকে অপারেশন করতে না দিয়ে বিপর্যয় ঠেকাতে পারেননি।

মুজিব নিজেকে কখনো বিচ্ছিন্নতাবাদী মনে করেননি। মেজরিটির অধিকার দাবি করা সেপারেটিজম নয়। সেটা হয় তখনই যখন মাইনরিটি মেজরিটির থেকে আলাদা হতে চায়। এ কারণে ৪৭-এ মুসলিম লীগ সেপারেটিস্ট এবং সেপারেটিস্ট হলো হিন্দু নিয়ন্ত্রিত বাংলা কংগ্রেস। অন্যদিকে ৭১-এ পশ্চিম পাকিস্তানের আচরণ সেপারেটিজমের পক্ষে কারণ তারাও বাংলা কংগ্রেসের মতো মেজরিটির দেশশাসন মানতে চায়নি। মুজিব তাই অভিযোগ করেন, ‘তিনি আমাদের কথা শুনলেন না, শুনলেন ভুট্টো সাহেবের কথা।’ ঠিক যেমন মাওলানা আজাদ, শরুৎ বোস, আবুল হাশিম, সীমান্ত গান্ধির কথা গান্ধি শোনেননি, শুনেছেন নেহরু ও প্যাটেলের কথা, এমনকি জিন্নাহর কথাও। রুশ বিপ্লবেও ইতিহাসের পরাজিত প্রস্থানে দেখতে পাই ট্রটস্কিকে। কিংবা আমাদের বেলায় তাজউদ্দীন আহমদকেও।

গান্ধির ঘোষিত পথে নয় বরং নেহরুর চক্রান্তেই দেশভাগ হয়েছে। নেহরুর কেবিনেট মিশন প্ল্যান পরিত্যাগ করার ঘোষণাতেই মুসলমানদের সঙ্গে ন্যায্য মতা বণ্টনের সম্ভাবনা তিরোহিত হয় এবং বলা যায়, নেহরুর এ সিদ্ধান্তই দেশভাগের মূল কারণ।

নানাজানের রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে কখনো মেলে অবিভক্ত বাংলার মুসলিম লীগের তরুণ জেনারেল সেক্রেটারি আবুল হাশিমের, যিনি সাম্প্রদায়িক দেশভাগের বিপে এবং কংগ্রেসের ভিন্নমতাবলম্বী শরৎ বসুর সঙ্গে মিলে গান্ধি-নেহরুর বিরুদ্ধে দাঁড়ান। তিনি প্রগতিশীল এবং কৃষক স্বার্থের পরে সংগ্রামী। আবার কংগ্রেসের প্র্যাকটিকাল দ্বিজাতিত্ত্ব কিংবা মুসলিম লীগের সাম্প্রদায়িক আইডলিজিক্যাল দ্বিজাতিতত্ত্বের বাইরে তাঁর অবস্থান। ছবির কোথাও তাঁকে মুসলিম লীগার হিসেবে প্রতিপন্ন করা হয়নি, এবং তিনিও এমন কিছু করেননি যাতে মনে হয় তাঁর অবস্থান পাকিস্তান প্রতিষ্ঠাকারী দলটির কাছাকাছি। বরং রাজাকারদের ইন্ধনে পাকিস্তান আর্মিই তাঁকে হত্যা করে। তাঁর জীবনের মতো মৃত্যুতেও তিনি প্রমাণ করেছেন, তিনি পাকিস্তানের শত্রু।

ছবিতে এটা স্পষ্ট। কিন্তু যদি এতটুকুই দেখানো হতো যে, তিন পই তাঁকে পথের বাধা মনে করে এবং তাঁর অপসারণ ছাড়া যুদ্ধের ইঞ্জিন চালু হতে পারছে না। এ কারণে তিনপই সুবহে সাদিকে তাঁকে হত্যার জন্য এগিয়ে আসে। এই তিন পরে কাদের হাতে তিনি নিহত হলেন তা রহস্য রাখাই ভাল ছিল। তাঁতে তাঁর ভুল বোঝা জীবনের মতো মৃত্যুও হয়ে উঠতো আরো ট্র্যাজিক ও ভাবনাসঞ্চারি। আমাদের সামনে তখন প্রশ্ন থাকতো এই মৃত্যুর তাৎপর্য কী? সেটাই হতো শিল্পের আরাধ্য সংকটবিন্দু।

আশ্চর্য নয় যে, গান্ধি ও মুজিবের মৃত্যুর সঙ্গেও তাঁর প্রতীকী মিল। তিন জন এক গুণের মানুষ নন, কিন্তু চরিত্রলক্ষণের এই মিল নানাজান চরিত্রের ঐতিহাসিক পরিণতির দিকে ইঙ্গিত করে। সেই পরিণতি ট্র্যাজিক এবং সেই ট্র্যাজেডি মুক্তিসংগ্রামের মানবিক ও ঐতিহাসিক জটিলতার অংশ হতো। আরো ভাবাত।

চলবে...
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/farukwasifblog/29315485 http://www.somewhereinblog.net/blog/farukwasifblog/29315485 2011-01-27 14:49:54
মেহেরজান: যুদ্ধ ও ভালবাসার মালিকানার মামলা ১
এই মামলায় প্রধান অভিযোগ: মেহেরজানের যুদ্ধ কি একাত্তরের যুদ্ধ? মেহেরের প্রেম কি দেশপ্রেমের চাইতেও বড়? এবং প্রেম স্বয়ং কি রাজনীতি ও জীবন-মরণের চাইতে বড়? দুটো উত্তরই বড় ‘না’ হয়ে দেখা দিয়েছে অনেকের মনে। এই মামলা জটিল এবং এর ইতিহাস সুপ্রাচীন। আসলে এই প্রশ্ন হয়তো ‘আমি কে, কী আমার পরিচয়’ এই প্রশ্নের মতোই পুরনো। তাহলেও বাঙালি মুসলমানের আত্মপরিচয়ের পেণ্ডুলাম যখন থেকে ডানে-বামে প্রবল দুলতে থাকলো সেই প্রথম বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময় থেকেই এই প্রশ্ন এই ভূখণ্ডের মধ্যবিত্ত সমাজকে ভোগাচ্ছে, সময়ে সময়ে তার প্রভাব উপচে নিম্নবর্গের রাজনৈতিক চেতনার ওপরও পড়েছে। মেহেরজান ছবির কাঁধে তাই দায়িত্ব পড়েছে, কেবল মুক্তিযুদ্ধই নয়, আত্মপরিচয়ের এই ধন্দের গ্রহণযোগ্য নির্মাণ দেখানো। এর ফয়সালা না হলে, এই ফাঁড়া না পেরুলে সকলই গরলই ভেল হয়ে যাবে। এবং মনে হবে, কীসের লাগিয়া এ ছবি বানানু। বাকি সব প্রশ্ন, বাকি সব চরিত্র ও ঘটনা এর নিরিখেই নির্ণিত হবে।

কিন্তু কার যুদ্ধ, কার ভালবাসা? কোন ময়দানে এর ফয়সালা হবে? বর্তমান রাজনীতির ময়দানে? নাকি ইতিহাসের মহাফেজখানায়? মেহেরজান ছবি থেকে কী প্রমাণ করার দায়িত্ব আমাদের? যা আমরা আগে থেকেই বিশ্বাস ও বন্দনা করি, এ থেকে তারই নিশ্চয়তা চাইছি কি? মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সব গল্প-কবিতা-চলচ্চিত্র-বর্ণনা-বক্তব্য কি সরকারি লাইন অনুযায়ীই হবে? এ বিষয়ক যাবতীয় ভাবনা-চিন্তা-শিল্পের বাঁধা ছক মজুদ আছে কোথাও? সবার দায়িত্বই হচ্ছে সেই ছককে পাহারা দিয়ে যাওয়া এবং কেবল তারই মনোছবি কপি করে সৃজনশীলতার মেহনত বাঁচানো?

ডান-বাম নির্বিশেষে তাই যেন এ ছবি নিয়ে এক ধরনের সাংস্কৃতিক গৃহযুদ্ধ দেখা যাচ্ছে। নিষিদ্ধ করার দাবি উঠছে, ওঠাচ্ছেন তাঁরাই যাদের আবার বাংলাদেশের ‘মুক্তবুদ্ধির’ জেহাদি গণ্য করা হয়। ওদিকে সিনেমা হলে পাবলিক টাকা দিয়ে টিকিট কিনে ছবি দেখে পয়সা উসুল মনে বাড়ি যাচ্ছে, কথা বলছে। ব্লগ-ফেসবুকের নারায়ে তকবির তাদের কাছে পৌছাচ্ছে না। সেটা পৌঁছে দিতেই প্রথম আলো বিজ্ঞাপন দিয়ে বিতর্ক আয়োজন করে তাদেরও টেনে আনছে। একটা কিছু হচ্ছে।

যুদ্ধ রাজনৈতিক না অরাজনৈতিক?
বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত সমাজে ও তাদের রাজনীতিতে মুক্তিযুদ্ধ সর্বদাই রাজনীতি রঞ্জিত একটি বিষয়। কিন্তু তাদের তৈরি সাহিত্য ও চলচ্চিত্রে মুক্তিযুদ্ধ নিতান্তই এক অরাজনৈতিক ঘটনার বেশি কিছু নয় সাধারণত। আখ থেকে রস বের করে নেওয়ার মতো মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক শাঁসটি বের করে নিয়ে ১৯৭১-কে কেবল যুদ্ধ, ধ্বংস, গণহত্যা ও নির্যাতনের অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখাই মোটামুটি মুখস্থ ঝোঁক। এই অভিজ্ঞতার বাঁকে বাঁকে ‘জয় বাংলা’ বলে তাকবীর দিলেই মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক মর্মটা প্রকাশ হয় না। অথচ জাতীয় মুক্তির রাজনৈতিক সংকল্প ছাড়া, প্রতিরোধী জাতীয়তাবাদের আদর্শিক উপাদানসিক্ত হওয়া ছাড়া মুক্তিযুদ্ধকে কীভাবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব?

এই প্রেক্ষিতে মেহেরজান রাজনৈতিক ছবি হিসেবে নির্মিত হয়েছে। এবং তার প্রতিক্রিয়াটাও রাজনৈতিক। এ বিতর্ক কেবল ছবিটাকেই উন্মোচিত করছে না, সাংস্কৃতিক এলিট বৃত্তের রাজনৈতিক সংস্কৃতির ছাঁচটাও চেনাচ্ছে। ছবিটা তৈরি করা, এর কাহিনীর ধারা এবং বিতর্কের উত্থাপকদের অভেদ এখানেই যে, সকলেই মোটামুটি এলিট গোষ্ঠীর মধ্যে পড়ে। বাকিরা এদেরই বিভিন্ন পক্ষে কাতারে কাতারে মোতায়েন হয়ে যাচ্ছে। আমি এখানে তৃতীয় একটি দৃষ্টিকোণ, তৃতীয় একটি পক্ষ হাজির করার চেষ্টা করবো, যা মুক্তিযুদ্ধের অমীমাংসিত কিছু এলাকায় প্রবেশ করবে এবং দেখাতে চাইবে জাতি ও জন-এর মধ্যকার ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক সংযোগটি কীভাবে উচ্চবর্গীয় জাতীয়তাবাদে আড়াল হয় এবং কীভাবে মেহেরজানও শেষ পর্যন্ত তা দেখাতে ব্যর্থ হয়।

এখানে বলা দরকার, স্বাধীনতাযুদ্ধের আত্মদান, সংগ্রাম ও ধ্বংসের অভিজ্ঞতারাজনীতির ঊর্ধ্বের বিষয়। এটাই সেই বুনিয়াদি ভিত্তি যার ওপর স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের রাজনীতি দাঁড়িয়েছে বা দাঁড়ানো উচিত। বাংলাদেশ কেন্দ্রিক যে কোনো রাজনীতির ভিত্তিও এটা। মুক্তিযুদ্ধের বৈধতা, তার সংগ্রাম, তার আত্মদান, তার অপমান-বিপর্যয়, য় ও ধ্বংসের অভিজ্ঞতার প্রতি তাই সমর্পিত না হয়ে পারা যায় না। জনইতিহাস ও জনস্মৃতির মধ্যেও মুক্তিযুদ্ধ তেমনই এক অ্যাবসলিউট ঘটনা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত, যাকে আগলে রাখার কাজ জনগণ করে এবং বারে বারে তা থেকে বৈধতার সমর্থন রাষ্ট্রকেও করতে হয়। কারণ সেটাই আমাদের অস্তিত্বের ভিত্তি। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, কারণ মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে। বাংলাদেশ সার্বভৌম থাকবে কারণ তা লক্ষ লক্ষ শহীদের আত্মদানেরসংকল্পের অলঙ্ঘনীয় বাস্তবতা। একাত্তরের রাজনীতির আলোচনা হতে পারে এই স্বীকৃতি দানের পরেই। মুক্তিযুদ্ধে সবার ভূমিকার সমালোচনা হতে পারে, কিন্তু শহীদদের প্রাণদান আর যোদ্ধাদের সংগ্রামকে কোনোভাবেই বাতিল করা যায় না। গেলে, তা হয়ে দাঁড়ায় বাংলাদেশবিরোধী। শর্মিলা বোস কিংবা মানেকশ’র বন্ধুবেশী শয়তানি এ কারণেই বাংলাদেশবিরোধী।

মেহেরজানের মূল ক্রাইসিস
ধর্ষক ও ধর্ষিতা, নিহত ও হত্যাকারী কীভাবে পরস্পরকে ভালবাসতে পারে? প্রথমত, উভয়ের মন থেকে ঘটনাটির স্মৃতি মুছে ফেলে যুদ্ধ ও সংঘাতের বাইরের জমিনে তাদের নিয়ে যেতে পারলে। অর্থাৎ অভিজ্ঞতাটা এবং ইতিহাসটাকে নাই করে দিলে, সেই শূণ্য সময়, সেই ফাঁকা স্পেসে তাদের মিলবার একটা সুযোগ থাকলেও থাকতে পারে। এবং সেই ভালবাসার সাক্ষি হতে হলে দর্শকদেরও সব ভুলে যেতে হয়, চলে যেতে হয় ইতিহাস, ভূমি, মানুষ আর স্মৃতির বাইরের সেই শূণ্যস্থানে।

কিন্তু স্মৃতি, যন্ত্রণা, ভয় ও ঘৃণা দ্বারা ভারাক্রান্ত একটি গ্রামে কীভাবে তা সম্ভব? সম্ভব নয় বলেই ভালবাসাটা হয় অপরাধী এবং পাত্রপাত্রীদের হতে হয় অভিযুক্ত। তারা হারিয়ে যায় এবং প্রত্যাখ্যাত হয়। সেই নিষিদ্ধ প্রেম হওয়ার আরেকটি পথ হলো, সময়কে উল্টোদিকে প্রবাহিত করে খোদ নির্যাতনের ঘটনাটিকে অতীতেই রদ করা, ঘটতে না দেওয়া। কিন্তু এ দুটোর কোনোটাই সম্ভব নয়। সম্ভব একমাত্র ভবিষ্যতে, যখন উভয় পক্ষ একটা রিকনসিলিয়েশন প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে গিয়ে নতুনভাবে মানবিক বন্ধন নির্মাণ করবে, সৃষ্টি করবে নতুন ইতিহাস এবং নতুন বাস্তবতা। তখন হয়তো তা সম্ভব। তার জন্য গত আড়াইশ বছরের ইতিহাসের ভুল ও বিকৃতি সংশোধন করতে হবে। কিন্তু উপমহাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে, পাকিস্তানের অধপাতি চরিত্রে যা আদতে এখনো অসম্ভও অবাস্তব।


মেহেরজান ছবির যে পটভূমি পরিচালক তৈরি করেছেন, সেখানে ওপরে বলা ওই সম্ভাবনা দুটির উল্টোটাই দেখি। কাহিনীর শুরু থেকেই বাঙালিদের মনে ঘৃণার ও যন্ত্রণার স্মৃতি প্রতিমুহূর্তে আরো ঘন ও তীব্র করা হচ্ছে। ছবির শুরু হচ্ছে শেখ মুজিবের স্বাধীনতার ভাষণ দিয়ে। শেষ হচ্ছে ছবির কেন্দ্রপুরুষের হত্যাকাণ্ড দিয়ে। মাঝখানে যুদ্ধ ও ভালবাসা, যন্ত্রণা ও প্রতিবাদ, ঘৃণা ও সহমির্মতার টেনশন। পাকিস্তানি ধর্ষণ-শিবির থেকে পালিয়ে গ্রামে ঢুকছে নীলা। দৃঢ়চেতা স্বাধীন চরিত্রের এই কমিউনিস্ট নারী সঙ্গে করে নিয়ে আসছে কেবল গণধর্ষণ ও নির্যাতনের ট্রমাই নয়, নিয়ে আসছে পাকিস্তানিদের হাতে তার বাবার নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ধাক্কাও।

গ্রামে ঢুকবার পথের উঁচু ঢাল। সেখানকার সেই নরম মাটি বেয়ে উঠবার সময় তার সেন্ডেল আটকে যায়, তার সেই কষ্টকর হাঁটাটাই বুঝিয়ে দেয়, কত প্রতিকুল তার এই যাত্রা এবং সামনেও রয়েছে কত বাধা। এই পথ দিয়েই সে আবার চলে যাবে পেয়ারাবাগানে, বন্দুক হাতে ‘শুয়োরের বাচ্চা খানসেনাদের’ হত্যা করতে। তাকে এগিয়ে দেবেন তারই নানাজান। পালিয়ে আসছে তার খালার পরিবারও_ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জামাই, আর তার তরুণী কন্যা মেহেরসহ। এই যাত্রায় তারাও চাুষ করেছে, হুমকিগ্রস্থ হয়েছে ভয়াবহ নিপীড়নের। খবর আসছে, পাকিস্তানী সেনারা গণহত্যা-নির্যাতন-জ্বালাও পোড়াও করতে আসছে এই গ্রামেও।

মেহেরের পরিবার আর নীলা বাড়ি পৌঁছবার আগেই হুমকি আসে স্থানীয় রাজাকারদের তরফে। হুমকি হয়ে আসে স্বয়ং এক পাকিস্তানী মেজর আর তার জিপ ভর্তি ট্রুপ। নানাজানের আরাম কেদারা দখল করে সেই মেজর বুঝিয়ে দেয়, নানাজান সম্মান ও মতাচ্যুত। এখন সেই মেজরের করুণার কাছেই তাকে সমর্পিত হতে হবে। পায়ের ওপর পা তুলে বসে থাকা উদ্ধত মেজরের সামনে অপমানিত নানাজানের দাঁড়িয়ে থাকার অর্থ আরো পরিষ্কার হয় যখন, নানাজানের আরাম কেদারার পাদানিতে লাথি দিয়ে মেজর ধমক দিয়ে সামনের ছোটো চেয়ারে তাকে বসতে বলে। ছবির একেবারে প্রথমেই নানাজান চিহ্নিত হয়ে যান এক ফলিং ফিগার হিসেবে, অক্ষম গোত্রপতি হিসেবে, যার আর নিজের পরিবার এবং নিজের সমাজকে রার ক্ষমতা নেই। ছবির বাকিটা জুড়ে, মৃত্যু পর্যন্তই আমরা তাঁর পতন ও পরাজয় দেখি। অবান্তর হয়ে যেতে দেখি, ইতিহাসের বাইরে চলে যেতে দেখি। এভাবে মুক্তিযুদ্ধের ৪১ বছর পর নানাজানের মতো চরিত্র এমন এক রাজনৈতিক পটভূমিতে হাজির হন, যখন তাঁর উপস্থিতির কোনো দাগ আর সমাজে নেই, যখন তাঁর প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে। তিনি হয়ে ওঠেন ইতিহাসের এক আপে, যার কোনো প্রতিনিধিত্ব নেই, যার গতি শেষ হয়েছে মরুতে।

২য় কিস্তি পড়ুন
মেহেরজান: যুদ্ধ ও ভালবাসার মালিকানার মামলা ২
Click This Link]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/farukwasifblog/29315479 http://www.somewhereinblog.net/blog/farukwasifblog/29315479 2011-01-27 14:42:27
ঋণ: ক্ষুদ্র, ভারতীয়, রক্তাক্ত
কেন ছোটোলোক বারেবারে মরে আর গায়, ''না, না, না, তোমাদের এ ই ঋণ কোনোদিন শোধ হবে না।’'

ক্ষুদ্র ঋণে আর ভারতীয় দানে স্বাধীনতার রক্তঋণ শোধ হয়ে গেছে না কি?]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/farukwasifblog/29288683 http://www.somewhereinblog.net/blog/farukwasifblog/29288683 2010-12-13 06:34:11
মৃত্যুদিবসের প্রশ্ন: ইয়াসির আরাফাতকে কি খুন করা হয়েছিল?
তাঁর অসুস্থতার ‘রহস্যময়’ ধরন থেকে অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, তাঁকে দীর্ঘ সময়জুড়ে বিষ প্রয়োগ করা হয়েছে। অপকর্মটি প্রমাণ করতে অনেক স্যাসাবুদও হাজির করা হয়। (এর আগে আরাফাতের ব্যক্তিগত চিকিৎসক ড. কুর্দি, ইসরায়েলের শান্তিবাদী নেতা ইউরি আভনেরিসহ বেশ কিছু পত্রিকা একই অভিযোগ তোলে- অনুবাদক) এমনকি তাঁর কোনো কোনো ঘনিষ্ঠজনের প্রতিও সন্দেহের আঙুল তোলা হয়। সাম্প্রতিক কিছু চাঞ্চল্যকর সংবাদ (আল-জাজিরা) এ বিষয়ে নতুন বিতর্ক ও ষড়যন্ত্রতত্ত্বের জন্ম দিয়েছে; খুলে দিয়েছে আলোচনার নতুন দরজা।

'''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''''
এ বিষয়ে গত বছরে ইউরি অভনেরির এই লেখাটা অনুবাদ করি। আরাফাতের মৃত্যুদিবসের প্রশ্ন : তাঁকে কি খুন করা হয়েছিল?_ ইউরি অ্যাভনরি তখন কেউ কেউ প্রশ্ন তোলেন যে, আমি কন্সপিরেসি থিওরিকে এন্টারটেন করছি। বিতর্ক হয়। সাক্ষসাবুদ আসে। সম্প্রতি আল জাজিরা সহ বেশ কিছু নিউজমিডিয়ায় একই অভিযোগের প্রচার হয়। ঝড় ওঠে।
এর আগে ডিক চেনির তৈরি গুপ্তহত্যা দলের কথা ফাঁস হয় http://www.slate.com/id/2222820/, অভিযোগ ওঠে যে সিআইএ বেনজীর হত্যার সঙ্গেও জড়িত। শেখ মুজিব, প্যাট্রিস লুমুম্বাসহ অনেকের নামও তালিকায় চলে আসবে সন্দেহ নাই।
ওদিকে এক বায়তুল্লাহ মেহসুদের সেকেন্ড হ্যান্ড দাবি করেন যে, বায়তুল্লাহ মেহসুদ ভারত ও ইসরায়েলের হয়ে কাজ করছে। কত রঙ্গ দেখি দুনিয়ায়। আরো অনেক কিছু দিনে দিনে জানা যাবে, এখন সেগুলো তুলছি না। পরে দেখা যাবে।
;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;;

পাঁচ বছর হলো আরাফাত মারা গেছেন। এর মধ্যে নৃশংস ইসরায়েলি কৌশলে বেশ কয়েকজন ফিলিস্তিনি নেতা খুন হন। তাঁদের বেশির ভাগই হামাসের নেতা। ফিলিস্তিনিরা ইসরায়েলের হাতে নিহত সবাইকে ‘শহীদ’ বলে ডাকে। আরাফাতও তাদের চোখে একজন ‘শহীদ’ নেতা। অর্থাৎ তাদের মধ্যে ব্যাপকভিত্তিক বিশ্বাস রয়েছে যে আরাফাতের স্বাভাবিক মৃত্যু হয়নি। আরাফাত যদি সত্যিই খুন হয়ে থাকেন এবং যেহেতু তিনি ইসরায়েলি বিমান হামলা বা কোনো গুপ্তঘাতকের গুলিতে প্রাণ হারাননি, তাহলে মূল যে প্রশ্নটা এখন ফয়সালা করতে হবে তা হলো, কে তাঁর হত্যাকারী এবং কীভাবে তাঁকে হত্যা করা হয়েছে?

ইসরায়েলিদের তরফে আরাফাতের মৃত্যু কামনার বিষয়টি কখনোই গোপন থাকেনি। ২০০২ সালের ১ ফেব্র“য়ারি সাবেক ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী এরিয়েল শ্যারন কয়েক দশক আগে সুযোগ পেয়েও আরাফাতকে খুন না করার জন্য সংবাদপত্রে দেওয়া সাাৎকারে অনুতাপ করেন। ইসরায়েলি পত্রিকা মারিভকে তিনি বলেন, ১৯৮২ সালে লেবানন আগ্রাসনের সময়ই তাঁর উচিত ছিল আরাফাতকে ‘শেষ করে দেওয়া’। তাঁকে প্রশ্ন করা হয়, ‘তা না করার জন্য আপনি কি অনুতপ্ত?’ তিনি বলেন, ‘অবশ্যই অনুতপ্ত।’

আরাফাত যেদিন মারা যান, সেদিন বিবিসি তখনকার ইসরায়েলি বিরোধী নেতা শিমন পেরেজের একটি মন্তব্য প্রচার করে। পেরেজ বলেন, ‘ভালো হলো যে দুনিয়া তাঁর কবল থেকে রা পেল...মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে সূর্য এখন জ্বলজ্বল করছে।’ মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আরাফাত বছরের পর বছর ধরে বুলেটে তবিত তাঁর রামাল্লার সদর দপ্তরে গৃহবন্দী ছিলেন। জীবিত আরাফাত বিশ্বের কাছে ইসরায়েলের জন্য বিপর্যয়ের উৎস হয়ে ছিলেন। অতি নম্রতার জন্য ফিলিস্তিনিদের অধিকার আদায়ে সম না হলেও আন্তর্জাতিক মনোযোগের আলো আকর্ষণে তিনি সমর্থ ছিলেন। আরব, মুসলিম, ইউরোপীয় ও অন্যান্য জাতির সমর্থন আদায়েও তিনি অনেকটা সফল।

এখনো অনেকের চোখে তিনি হলেন পথের কাঁটা। তাদের বিশ্বাস, আরাফাত ইসরায়েলের জন্য ‘বাধা হিসেবে’ দাঁড়িয়ে থাকায় অবিচল। ফিলিস্তিনি কর্তৃপরে একটি অংশ তাঁর ওপর বিরক্ত ছিল, কারণ তিনি ঐক্যের স্বার্থে উপদলীয় সংঘাত বন্ধে কান্তিহীনভাবে চেষ্টা করে গেছেন এবং বিভিন্ন পকে ছাড় দিয়ে চলছিলেন। এভাবে তিনি ফিলিস্তিনি সমাজের ওপর ওই অংশের দাপট প্রতিষ্ঠার পথে বাধা দিয়ে গেছেন। ইসরায়েলও তাঁকে ঘৃণা করত। তিনি শরণার্থী সমস্যা ও জেরুজালেমের মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে ছাড় দিতে নারাজ ছিলেন। বুশ প্রশাসনও যখনই সুযোগ পেয়েছে, তাঁকে অপমান, অপদস্থ, বাতিল ও অপ্রাসঙ্গিক করে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। বারবার তাঁর জায়গায় মাহমুদ আব্বাস ও মোহাম্মদ দাহলানের মতো ব্যক্তিদের ‘বিকল্প নেতা’ হিসেবে প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করেছে।

খুবই আশ্চর্যের ব্যাপার যে, আব্বাসসহ ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের উচ্চপদস্থ ব্যক্তিরা সাধারণ ফাতাহ সদস্য ও সাধারণ ফিলিস্তিনিদের সামনে তাঁকে ‘শহীদ’ বলে সম্বোধন করেছে। এসবের উদ্দেশ্য ছিল তাঁর ভাবমূর্তি থেকে ফায়দা তুলে নিজেদের জনপ্রিয় করা। গল্পটি হয়তো এখানেই শেষ হয়ে যেত। আব্বাস ও দাহলানের মতো নেতারা নিজেদের শহীদ আরাফাতের মশালবাহী হিসেবে দেখিয়ে কেবল মুখের কথায় ফিলিস্তিনকে মুক্ত করার ‘বিপ্লব সাধনের’ স্বপ্ন দেখিয়ে যেতেন। ব্যাপারটা এ রকমই চলত, যদি না পিএলওর দ্বিতীয় প্রধান নেতা ফারুক কাদ্দুমি প্রকাশ্যে দলিল-দস্তাবেজ দেখিয়ে প্রমাণের চেষ্টা করতেন যে, আরাফাত খুন হয়েছেন। কাদ্দুমি অভিযোগ তুলেছেন, আব্বাস ও দাহলান এবং এরিয়েল শ্যারন ও মার্কিন উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী উইলিয়াম বার্নস মিলে আরাফাতকে গুপ্তহত্যার পরিকল্পনা করেছিলেন। এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত কয়েকজন ইসরায়েলি গুপ্তহত্যার শিকার হলেও অন্যরা এখনো বেঁচে আছে।

স্বাভাবিকভাবেই রামাল্লাভিত্তিক ফাতাহর নেতারা কাদ্দুমির বিরুদ্ধে গালাগালের ঝড় বইয়ে দিয়েছেন। আব্বাসের অভিযোগ, আগামী ৪ আগস্ট ফাতাহর দীর্ঘ প্রতীতি কংগ্রেস বানচালের জন্যই কাদ্দুমি এটা করেছেন। আর কাদ্দুমি বলছেন, এ অভিযোগ তিনি কংগ্রেসেই তুলতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আব্বাস স্বাধীন কোনো দেশে কংগ্রেস হওয়ার সিদ্ধান্ত বাতিল করে অধিকৃত পশ্চিম তীরে তার স্থান নির্ধারণ করায় তাঁকে আগেই এটা প্রকাশ করতে হলো। কাদ্দুমি তিউনিসিয়ায় নির্বাসিত আছেন, পশ্চিম তীরে তাঁর আসা সম্ভব নয়। কাদ্দুমি এও বলেছেন যে, একটি ‘বিপ্লবী’ আন্দোলনের সম্মেলন ইসরায়েলের অনুমতি নিয়ে তাদের ছত্রচ্ছায়ায় সফল হতে পারে না।

স্বাধীন কোনো তদন্ত কিংবা অকাট্য প্রমাণ ছাড়া কাদ্দুমির অভিযোগের সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া কঠিন। কিন্তু আরাফাতের মৃত্যু নিয়ে এমনিতেই সন্দিহান ফিলিস্তিনিদের জন্য বেশি প্রমাণের প্রয়োজন নেই। তারা আরাফাতের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের লাগাতার হুমকি ও হত্যাচেষ্টার সাক্ষী। সাধারণ ফিলিস্তিনি যারা, বিশেষত যাদের বসবাস গাজায়, তাদেরও বিশ্বাস যে দুর্নীতিগ্রস্ত কিছু ফিলিস্তিনি আরাফাত হত্যাকাণ্ডে জড়িত। একটি ক্ষুদ্র ফিলিস্তিনি এলিট গোষ্ঠী খোলাখুলিভাবে ফিলিস্তিনের জাতীয় স্বার্থ বিকিয়ে দিয়ে নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থতায় ব্যস্ত। দাহলান তো প্রকাশ্যেই গাজায় নির্বাচিত সরকারকে উচ্ছেদের পে কথা বলে গেছেন যখন ইসরায়েল গাজায় ঝাঁপিয়ে পড়েছে। ঠিক সে সময়টায় মাহমুদ আব্বাস ও দাহলানের ফিলিস্তিনি কর্তৃপ পশ্চিম তীরে আমেরিকার অস্ত্রে সজ্জিত ও প্রশিতি যোদ্ধাদের ইসরায়েলের শত্র“দের (হামাস সমর্থক) বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিয়েছে।

ফিলিস্তিনিদের মধ্যে ফারুক কাদ্দুমি খুবই শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি। পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনি নেতৃত্বের প্রতি অনাস্থা এবং কাদ্দুমির প্রতি আস্থা থেকে সহজেই তারা এই হত্যার অভিযোগে বিশ্বাস আনছে। কিন্তু করুণ ব্যাপার এই যে, এ বিষয়ে স্বাধীন তদন্ত করার বাস্তবতা এখন ফিলিস্তিনে নেই।

প্যালেস্টাইন ক্রনিকল থেকে অনুবাদ
রামজি বারুদ: প্যালেস্টাইন ক্রনিকল-এর সম্পাদক, দ্য সেকেন্ড প্যালেস্টিনিয়ান ইন্তিফাদা-এর রচয়িতা।




]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/farukwasifblog/29270276 http://www.somewhereinblog.net/blog/farukwasifblog/29270276 2010-11-11 13:32:40
ফুলবাড়ী যত দূর, লংমার্চ তত দূর
ঢাকায় বসে কারও পক্ষে কল্পনা করা কঠিন, গত ৩০ অক্টোবর ফুলবাড়ী কী ইতিহাস ঘটিয়ে ফেলেছে। কোনো মানুষ সেদিন ঘরে ছিল না। পথে মানুষ, পথের দুপাশে মানুষ, যত দূর চোখ যায় কেবল মানুষ আর মানুষ। ২০০৬ সালের ২৬ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের দিনটিতেও এ রকম ঢল নেমেছিল। সেদিন বহুজাতিক এশিয়া এনার্জি কোম্পানিকে ফুলবাড়ী থেকে বিতাড়নের দাবিতে জাতীয় কমিটির ডাকে বিরাট গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছিল। জমায়েত হয়েছিল ৬০-৭০ হাজার কৃষক। যথারীতি শান্তিপূর্ণ মিছিলে গুলি চলেছিল। বিডিআরের হাতে নিহত হয়েছিল তিন তরুণ আর আহত হয়েছিল শত শত।

এক ছাত্রনেতা ব্যানার হাতে দাঁড়িয়ে ছিলেন। একদল তরুণ এসে তাঁর হাত থেকে ব্যানার কেড়ে নিয়ে মিছিল শুরু করে দেয়। কার ব্যানার, কিসের ব্যানার কে চিন্তা করে? বাসদ আর সিপিবির মিছিল যেন শেষই হয় না। ওয়ার্কার্স পার্টি, গণসংহতি আন্দোলন, জাতীয় গণফ্রন্ট, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টিসহ অন্যদের মিছিলও ছিল চোখে পড়ার মতো বড়। জাতীয় কমিটির ব্যানারে মূল মিছিলটি যখন সাত দিন ধরে প্রায় ৫০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে মঞ্চের দিকে এগিয়ে আসছিল, মনে হচ্ছিল যেন একটা প্লাবন আসছে পায়ে হেঁটে। কি হিন্দু আর কি মুসলমান, কি বাঙালি আর কি আদিবাসী, কি গ্রামীণ আর কি শহুরে, কি প্যান্ট পরা আর কি লুঙ্গি-শাড়ি পরা—সব সেদিন একাকার। ফুলবাড়ী সেদিন আত্মশক্তিতে আত্মহারা হয়ে গিয়েছিল।

চার বছরের দরিয়াও মায়ের সঙ্গে এসেছে ঢাকা থেকে। মাকে সে প্রশ্ন করে, ‘মা, লাল পতাকা কোন দেশের পতাকা?’ লংমার্চ তখন দিনাজপুরে। ঢাকার গরম, ধুলা, ধোঁয়া আর গাড়িঘোড়ার জঙ্গলের মধ্যে এই পদযাত্রা যেন মহিমাহীন। কিন্তু শহর পেরোলেই গ্রাম আছে। আছে অন্য মানুষ, যাদের দাঁড়ানোর সময় আছে, তাকানোর চোখ আছে, কথা শোনার মন আছে। সেই সব অখ্যাত গ্রাম আর নিমশহরের মধ্য দিয়ে চলতে চলতে লংমার্চ যেন নদী হয়ে যায়। যেন দেশের বুক থেকে গড়ানো একটা রক্তের ধারা উত্তর-বাংলার গেরুয়া মাটির ওপর দিয়ে বয়ে চলছে। তারা স্লোগান দিচ্ছে, ‘চলো চলো চলো রে, ফুলবাড়ী চলো রে’; ‘সালেকিনরা ডাকে রে, ফুলবাড়ী চলো রে’; ‘তোমার বাড়ি আমার বাড়ি, ফুলবাড়ী ফুলবাড়ী’; ‘আমার মাটি আমার মা, উন্মুক্ত খনি হবে না’; ‘জনগণের কয়লা সম্পদ, রপ্তানি করা যাবে না’; ‘গ্যাসসম্পদ ব্যবহার করে কলকারখানা নির্মাণ করো’; ‘খনিজ সম্পদের মালিকানা, জনগণ ছাড়বে না’। সংহতি জানাতে আসা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক দলের অন্যতম নাসিম আখতার হুসাইন মিছিলের ঢল থেকে চোখ সরিয়ে ছোট্ট দরিয়ার ওই বিরাট প্রশ্নের জবাব দেন, ‘মারে, লাল পতাকা হলো মানুষের পতাকা।’

গ্রাম-শহর-বাজার-ঘাট-লোকালয়ের মাঝখান দিয়ে টানা সাত দিন ধরে হেঁটেছে হাজারো মানুষ। পথসভা হয়েছে অজস্র জায়গায়। বড় বড় জনসভা হয়েছে ঢাকার পরে টঙ্গী, গাজীপুর, টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ, শেরপুর, বগুড়া, পলাশবাড়ী, গাইবান্ধা, রংপুর, সৈয়দপুর ও দিনাজপুরে। চলার বেগে মনের আবেগও এত তীব্র হয়েছে যে স্কুলের বেঞ্চে ঘুমানো, হলুদ একদলা খিচুড়ি নামক খাদ্য খাওয়া, নোংরা দুর্গন্ধময় টয়লেটে লাইন ধরে প্রাকৃতিক কর্ম সারা—কোনো কিছুই কেউ গায়ে মাখেনি। বরং কৌতুক তৈরি হয়ে গেছে। জাতীয় কমিটির ছিল তিন দাবি: রপ্তানি না, উন্মুক্ত না, বিদেশি না। ছেলেরা তুলেছে আরেকটি দাবি, ‘খিচুড়িও না’।

৫০০ কিলোমিটার পথ। এই দীর্ঘ পদযাত্রায় যত গল্প তৈরি হয়, সেই মহাকাব্যের মহাসিন্ধুকে এই লেখার বিন্দুর মধ্যে বর্ণনা করা অসম্ভব। সাদুল্যাপুরে স্থানীয় ছাত্রলীগ ও ছাত্রদলের সভাপতি জাতীয় কমিটির আহ্বায়ক প্রকৌশলী শেখ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ আর সদস্যসচিব অধ্যাপক আনু মুহাম্মদের কাছে এসে জানিয়ে যান, আমাদের দল যা-ই করুক, আমরা আপনাদের পক্ষে। রংপুরে বক্তৃতা শেষে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছিলেন আনু মুহাম্মদ। পেছন থেকে লুঙ্গি পরা এক বৃদ্ধ এসে তাঁর হাত ধরে কাঁপা গলায় আস্থা জানিয়ে যান, ‘আপনাদের সংগঠন সৎ সংগঠন।’ সিরাজগঞ্জে ভিক্ষুকেরা পর্যন্ত এক টাকা করে চাঁদা দিয়ে গেছে। জাতীয় সম্পদ রক্ষা এবং বিদ্যুৎসংকট সমাধানের রূপরেখা জানিয়ে প্রকাশিত জাতীয় কমিটির ১০ টাকা দামের পুস্তিকাটির ১০ হাজার কপির একটিও ফেরত আসেনি। বিতরিত হয়েছে কয়েক লাখ লিফলেট। সাত দিনের দীর্ঘ পথে মানুষ মিলেছে মানুষের সঙ্গে, মন খুলে দেশের আলোচনা হয়েছে পথে-পথে।

লংমার্চ মানেই উদ্দীপ্ত তরুণ-তরুণীদের কাফেলা। আগে আগে সাদা পিকআপে মাইক বাজিয়ে গান গাইছে চারণ, সমগীত, গণসংস্কৃতি ফ্রন্ট, সম্পদ রক্ষা সংস্কৃতি মঞ্চ, বিবর্তনের শিল্পীরা। লংমার্চ মানেই শিল্পী কামরুদ্দীন আবসার, মাহমুদুজ্জামান বাবু, কৃষ্ণকলি, অরূপ রাহী, অমল আকাশদের নতুন দিনের নতুন গানের ভ্রাম্যমাণ কনসার্ট। লংমার্চ মানেই তথ্যচিত্র নির্মাতা জাঈদ আজিজ আর ফারজানা ববির দলের ক্যামেরায় ইতিহাসের সাক্ষ্যধারণ।

জাতীয় কমিটি এর আগে ঢাকা-বিবিয়ানা লংমার্চ করেছে গ্যাস রপ্তানি নিষিদ্ধের দাবিতে। ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে গিয়েছে বন্দর ইজারার প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে, ঢাকা-মংলা ছুটেছে সুন্দরবন ধ্বংস করে গ্যাসকূপ খননের পরিকল্পনার বিরুদ্ধে। এর বাইরে রোডমার্চ হয়েছে ঢাকা-ফুলবাড়ী, ঢাকা-টেংরাটিলায়। সর্বশেষ ঢাকা-কক্সবাজার সমুদ্রের গ্যাস ব্লক বিদেশি কোম্পানিকে ইজারা দেওয়ার বিরুদ্ধে। সফলতা কম নয়। গ্যাস রপ্তানির তোড়জোড় বন্ধ হয়েছে, বন্দর এখনো ইজারা হয়নি, সুন্দরবনে গ্যাসকূপ বিদেশিদের দেওয়া এখনো ঠেকে আছে। চূড়ান্তভাবে ২০০৬-এর আগস্ট অভ্যুত্থানের পরে তৎকালীন বিএনপি সরকারের পক্ষে রাজশাহীর মেয়র মিজানুর রহমান মিনু ও এক মন্ত্রী এসে জাতীয় কমিটির ছয় দফা মেনে আনুষ্ঠানিক চুক্তি করতে বাধ্য হন। সেই চুক্তিরও মূল কথা ছিল সারা দেশে কোথাও উন্মুক্ত খনি হবে না, কয়লা-গ্যাস রপ্তানি হবে না এবং বিদেশি কোম্পানির হাতে জাতীয় সম্পদের মালিকানা তুলে দেওয়া যাবে না। সে সময় শেখ হাসিনা ফুলবাড়ী গিয়ে এই চুক্তি সমর্থন করেছিলেন। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কিংবা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নিজেদের করা চুক্তি ও প্রতিশ্রুতি নিশ্চয়ই ভুলে যাননি। ফুলবাড়ীর এক সাঁওতাল যুবকের কথা তাঁদের জানাই। যুবকটির স্পষ্ট কথা: হাসিনা-খালেদা তো অস্থায়ী সরকার। সব সময় থাকবে না। স্থায়ী সরকার হলো জনগণ।

২০০৬-এ জমি-জিরাত-সংসার থেকে উচ্ছেদ হওয়ার ভয়ে লাখো মানুষ পথে নেমেছিল। আর এখন নেমেছে আত্মবিশ্বাসে ভর করে। সংগ্রামকে তারা করে তুলেছে উৎসব, আর উৎসব বাড়িয়ে দিয়েছে ঐক্য আর সংহতি। এভাবে ঢাকা যদি ক্ষমতা আর বিত্তের রাজধানী হয়, ফুলবাড়ী হয়ে উঠেছে জনতার সংগ্রামের রাজধানী। সেই রাজধানী ধানেরও রাজধানী, ফসলেরও খনি, কৃষি-প্রকৃতি আর প্রাণবান মানুষের ঠিকানা। উন্মুক্ত খনি নামক আত্মঘাতী ‘বোমা’ সেখানকার মাটিতে বসানো দেশের জন্যও হবে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। ফুলবাড়ীর গণরায় উপেক্ষা করার কোনো সুযোগ তাই কারও নেই।

লংমার্চের স্রোতের সঙ্গে মিলতে শত স্রোতে মানুষ এসে জনসমুদ্র তৈরি করেছিল। পাঁচ-ছয় ঘণ্টা থরথর কম্পিত হয়ে সেই সমুদ্র হাজারো স্রোত হয়ে আবার ফিরে গেছে। ফিরে গেছে সেই লালপুর, চকশাহবাজপুর, সেই লক্ষ্মীপুর, সেই হামিদপুর, সেই বুকচি আর সেই বারকোনাসহ ফসলে আর গাছে সবুজ গ্রামগুলোতে। কিন্তু যে মানুষ বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল, আর যে মানুষ ফিরে গেছে, দুই মানুষ আর এক নয়। এসেছিল বাঙালি চাষি, মজুর, কারিগর, স্কুলশিক্ষক, কর্মচারী, খুদে ব্যবসায়ী, ছাত্র ও ইমামরা; এসেছিল সাঁওতাল কিষান-কিষানি আর খেতমজুরেরা। ফেরার সময় তারা লংমার্চকেই বুকে ভরে নিয়ে গেছে, বদলে গেছে আত্মবিশ্বাসে। রাজপথের মহামিছিল এখন ফুলবাড়ীর পথ-ঘাট-মাঠ-নদী-সাঁকো দিয়ে, জঙ্গলের পাশ দিয়ে, মাঠভরা ধানের সমুদ্র থেকে উঠে আসা বাতাসের ঘ্রাণে নিঃশ্বাস নিয়ে, কার্তিকের জোছনায় মেঠোপথ দিয়ে গল্প করতে করতে ঘরে ফিরবে। তারপর অন্য দিনের থেকে কিছুটা দেরিতে ছেলে-পুলে-পরিবারের সঙ্গে মাটির মেঝেতে বসে গরম ভাত খাবে। আবারও কিছুদিনের জন্য তারা নির্ভয় হবে। কারণ, তারা ভরসা পেয়েছে, এই ভাত, এই ধান আর জোছনার অধিকার তারা হারিয়ে যেতে দেবে না। একটি উথাল-পাথাল দিনের স্মৃতি আর সাতটি দিনের ক্লান্তি নিয়ে লংমার্চ তখন গভীর নিঃশ্বাস ফেলে ঘুমিয়ে পড়বে।

তাদের এই ঘুম যাতে নিরাপদ থাকে, তার জন্য সরকার কি জেগে আছে? পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান গত সোমবার বলেছেন, উন্মুক্ত খনি হবেই (আমাদের সময়)। সরকার যদি একেই জাতীয় স্বার্থ মনে করে, মনে করে স্থল ও জলের বেশির ভাগ গ্যাসক্ষেত্র অসম শর্তে বিদেশি কোম্পানিকে দিলে জাতীয় স্বার্থের ক্ষতি হবে না আর বিদ্যুৎ সংকটও ঘুচে যাবে। তাহলে প্রথম প্রশ্ন, কেন বেশির ভাগ গ্যাসক্ষেত্র তাদের হাতে থাকা সত্ত্বেও গ্যাসের অভাবে বিদ্যুৎ হচ্ছে না, কল চলছে না? কেন এত সম্পদ নিয়েও বাংলাদেশ গরিব?

ফুলবাড়ী জেগেছে, ডেকেছে। আমরা কি জেগে আছি? নাকি, তথাকথিত উন্নয়নের চেতনানাশকে আচ্ছন্ন আমরাও? ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/farukwasifblog/29265552 http://www.somewhereinblog.net/blog/farukwasifblog/29265552 2010-11-02 13:05:13
আমরা রূপগঞ্জ, ফুলবাড়ী, কানসাট : তোমাদের স্বপ্নদোষে আমরা ঝরে যাব না বাদ
আমরা খোয়াব দেখি, একদিন আমরা পচানব্বই ভাগ, একদিন আমরা রূপগঞ্জ, ফুলবাড়ী, কানসাট। একদিন বন্যবর্বর আমরা তোমাদের সুখের ফুলহাতা জামা খুইলা নিয়া ফুল সুখী-সর্বহারা হব।

বিবাদ
আমরা মুক্তিযুদ্ধওয়ালা, আমরা ইসলামওয়ালা, আমরা দেশপ্রেমওয়ালা, আমরা বন্দুকওয়ালা, আমরা কালোচশমাওয়ালা, আমরা কলম-ক্যামেরা-তুলিওয়ালা, আমরা কর্পোরেটওয়ালা, আমরা আলিম-জালিম-কালিম-ডালিমকুমাররা, আমরা মাত্র ভগ্নাংশ যারা, ভগ্নাংশের নাটবল্টু বাকি পাঁচশতাংশ যারা_ আমরা ঐক্যবদ্ধ, আমরা অপ্রতিরোধ্য। আমরা আর আমাদের মামুরাই দেশ-জাতি-সার্বভৌমত্ব। আমরা হাবিল-কাবিল-সিবিল। আমরা আমরিকা-ভারত-সৌদি। আমরাই মুক্তিযুদ্ধ, গণতন্ত্র, উন্নয়ন, আধুনিকতা আর ইসলাম ভাজি। আমরা বাজিকর, তোমরা পাজি।

আমাদের ভয় নাই, ওলটপালট করে দে মা লুটেপুটে খাই। আমরা বাংলাদেশ প্রাইভেট লিমিটেড (একটি জনজাতীয় সাবসিডিয়ারি) কোম্পানি। তোমাদের জন্য কালাপানি।

তোমরা আমাদের বাস্তব, আমরা তোমাদের স্বপ্ন।

প্রতিবাদ
আর আমরা, সাড়ে তিন কোটি দারিদ্র্যসীমার শৈশব। তাদের সাত কোটি বাপ-মা, আমাদের দেড়-দুই কোটি ভাইবোন, আমরা মাটির সঙ্গে পোকার মতো সাঁটি, আমরা দুঃখের দিনে চোখ নামিয়ে হাঁটি। আমরা মন্ত্রচালিত-যন্ত্রচালিত ভুত। আমরা বিশ্বায়িত শ্রমদাস। আমরা লাখলাখ শিশুকন্যা, আমরা লাখ লাখ যোনিসমেত চোরাপথের রপ্তানি। আমরা হাইকোর্ট দেখা কানা আর কানি।

আমরা নদী-পানি-বন, গ্যাস-কয়লা-বন্দর-জমি-বীজ ছাড়াই মারাত্মক স্বাধীন। যুদ্ধ-সংগ্রাম-মেহনত আমাদের খাসলত। আমরা যতবারই মাখাই সাধের ছাতু, হয় গু। সেই গু মুখে মাইখা রাখাই আমাদের দেশপ্রেম, সেনাপ্রেম, গণতন্ত্ররতি। আমাদের রক্ত আর তোমাদের বিলাসী গুয়ে মাখামাখি হওয়াই শ্রী শ্রী সার্বজনীন মানবাধিকার।

সংবাদ
আমরা খোয়াব দেখি, একদিন আমরা পচানব্বই ভাগ, একদিন আমরা রূপগঞ্জ, ফুলবাড়ী, কানসাট। একদিন বন্যবর্বর আমরা তোমাদের সুখের ফুলহাতা জামা খুইলা নিয়া ফুল সুখী-সর্বহারা হব।

তোমাদের স্বপ্নদোষে আমরা ঝরে যাব না।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/farukwasifblog/29262468 http://www.somewhereinblog.net/blog/farukwasifblog/29262468 2010-10-27 17:39:24
পশ্চিমের মুসলমান ভীতি বনাম ভীতিকর পশ্চিমের ডিপ পলিটিকস ১
বাংলাদেশ-ভারত-পাকিস্তান-আফগানিস্তানে মুসলিম জঙ্গিবাদের বিরাট জুজু তৈরি করে জনগণকে ভীতসন্ত্রস্ত করা হয়েছিল। এখন দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশের জঙ্গি, ভারতের জঙ্গি, পাকিস্তানের জঙ্গি, আফগানিস্তানের জঙ্গিদের প্রধান গ্র“পগুলো আসলে সংস্লিষ্ট দেশগুলোর গোয়েন্দা সংস্থার সৃষ্টি, যে গোয়েন্দাসংস্থাগুলো আবার ৯-১১ এর পর থেকে আরো ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে যাচ্ছে। এর মানে এই নয় যে, রাজনীতির ময়দানে এইসব গ্র“প সক্রিয় নয়। সেখানেও তারা আছে, তবে তা বাংলাদেশের আন্ডারগ্রাউন্ড গ্র“পগুলোর থেকেও দুর্বল। মতার মদদ ছাড়া এদের নিজের জোরে কিছু করার মুরদ নাই।

সিআইএ-র আল কায়েদা, আইএসআই-এর লস্কর ই তাইয়েবা, র’এর ইন্ডিয়ান মুজাহেদীন আর আমাদের ‘তেনাদের’ জেএমবিকে ব্যবহার করা হয়েছে জঙ্গি ভীতির বাস্তবতা সৃষ্টি করার কাজে। এই চক্রের মধ্যে জড়িত হয়েছে মোসাদ। এরা প্রত্যেকেই সিআইএ-র ভাইবেরাদর। দুইয়ে দুইয়ে যোগ করলে তাহলে দাঁড়ায়, তারাই মুসলিম জঙ্গিবাদের জুজু তৈরি করেছে সামরিকায়ন, গণতান্ত্রিক অধিকার দমন, খনিজ সম্পদ দখল, অস্ত্র ও নিরাপত্তা সরঞ্জাম বিক্রি, মধ্যএশিয়ার সম্পদ ও ভূরাজনৈতিক গুরুত্বসম্পন্ন এলাকায় সামরিক ঘাঁটি প্রতিষ্ঠা, নিজ নিজ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের প্রতিক্রিয়াশীল পথে ঠেলে সেকুলার বনাম ইসলামপন্থী নামে কৃত্রিম দ্বন্দ্ব তৈরি করা এবং যেখানে মুসলমানরা সংখ্যালঘু যেমন ব্রিটেন বা ভারত, সেখানে তাদের জাতীয় শত্র“ হিসেবে দেখিয়ে শাসকশ্রেণীর সাম্প্রদায়িক ফ্যাসিস্ট কার্যক্রমের বৈধতা সৃষ্টি করা। এসব ঘটনার মধ্যে দিয়ে মুসলিম অসহিষ্ণুতার উত্থানকে দেখানো হলেও আসলে ঢাকা দেওয়া হচ্ছে, তথাকথিত সেক্যুলার পুঁজিবাদী শক্তির ফ্যাসিস্ট হয়ে ওঠার বাস্তবতাকে। তাই তারা যাকে দেখাচ্ছে তাতেই অন্ধ হওয়ার বদলে খোদ যারা এসবের হোতা সেদিকেই নজর দিতে হবে।

একটি উদাহরণ বিশ্লেষণ করলেই ডিজাইনটি ধরা পড়ে: মুম্বাইয়ের তাজ হোটেল হামলায় লস্কর ই তাইয়েবা জড়িত বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। কিন্তু সেই প্রমাণের কেঁচোর গর্তে পাওয়া গেছে বড় এক গোখরা। লস্কর ই-তাইয়েবাকে দিয়ে হামলার আয়োজনের পরিকল্পনাকারী হিসেবে বেরিয়ে এসেছে মার্কিন নাগরিক ডেভিড কোলম্যান হেডলির নাম। তিনি পরিচিত সিআইএ-এফবিআইয়ের এজেন্ট বা ইনফর্মার হিসেবে। তাঁর সঙ্গে সহযোগিতা করেছে মোসাদের এজেন্ট। আমেরিকানরা তার হামলার পরিকল্পনা আগে থেকে জানতো, ভারতীয়রাও জানতো যে সমুদ্র পথে সন্ত্রাসী হামলা আসবে। কিন্তু সবাই মনে হয় ঘটনাটা ঘটতে দিয়েছে। দ্বিতীয়ত, এই হেডলির সঙ্গে ভারতের হিন্দু জঙ্গিদেরও যোগাযোগ ছিল। তৃতীয়ত, হেডলি এর পরের হামলার ল্যবস্তু হিসেবে এলইটিকে দিয়ে ডেনমার্কের সেই নবীর কার্টুন প্রকাশকারী পত্রিকার দপ্তর উড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল। তিনি সফল হলে বিশ্বব্যাপী মুসলিম বিদ্বেষের জোয়ার সুনামি হয়ে দেখা দিত, তৈরি হতো প্রতিটি দেশে আরো কঠোর সিকিউরিটি এন্তেজাম, মুসলিম বিদ্বেষ এবং ইরানে হামলার প্রাসঙ্গিকতা।

৯-১১-র হামলার সঙ্গে আল কায়েদার সংস্লিষ্টতার কোনো প্রমাণ অদ্যাবধি আমেরিকা দিতে পারেনি। বিশ্বব্যাপী অজস্র বিশেষজ্ঞ ও সচেতন নাগরিকদের বিশ্বাস এটা যুক্তরাষ্ট্র সরকারের ইনসাইডারদেরই কাজ। এর পে অজস্র প্রমাণও তারা হাজির করেছে। আমার যুক্তিতে অফিসিয়াল গল্পে বিশ্বাস করাটা আহাম্মকি ছাড়া আর কিছু না। এখানে বেনেফিট অব ডাউট যুদ্ধবাজ বুশ প্রশাসন পাবে না, পেতে পারে সরকারি গল্পের গুমর উন্মোচনকারীরা। এর সঙ্গে মুম্বাইয়ের তাজ হোটেলে হামলাকে মিলিয়ে পাঠ করলে, সবখানেই হেডলির মতো ইনসাইডারদের হাত পাওয়া যাবে।

অন্যদিকে সাম্প্রতিক তদন্তগুলোয় প্রমাণ হয়েছে যে, ভারতের গুজরাতে মুসলিম নিধনের সূত্রপাতকারী গোধরা এক্সপ্রেসের আগুন, মালেগাঁও, আজমীর, আহমেদাবাদসহ গত কয়েক বছরের আলোচিত সন্ত্রাসবাদী নাশকতাগুলোয় ভারতীয় হিন্দু জঙ্গিবাদী সংগঠন অভিনব ভারত, আরএসএস প্রভৃতির হাত ছিল। এসব ঘটনা উদ্ঘাটনকারী পুলিশ কর্মকর্তা হেমন্ত কারকারে মুম্বাইয়ে তাজ হোটেল অপারেশনে রহস্যজনকভাবে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। শক্ত অভিযোগ উঠেছে যে, তাঁকে ষড়যন্ত্র করে হত্যা করা হয়েছে।

গত আগস্টে (২০০৯) ভারতীয় সাপ্তাহিক তেহেলকায় কংগ্রেস এমপি দিগি¦জয় সিং বলেন, ভারতে ঐ সময়ের পরপর বোমা বিষ্ফোরণগুলির পেছনে রয়েছে বিজেপি। তিনি এমনকি ভারতীয় পার্লামেন্টে তথ্যপ্রমাণও হাজির করার কথা বলেন। তাঁকে তা করতে হয়নি। তার আগেই মহারাষ্ট্র, তামিলনাড়–, গুজরাত ও বিহারসহ গত কয়েক বছরে আলোচিত বেশ কয়েকটি বোমা বিষ্ফোরণের সঙ্গে বিজেপি তথা সংঘ পরিবারের সরাসরি সংযোগ আবিষ্কৃত হয়েছে। মহারাষ্ট্রের সন্ত্রাসবিরোধী পুলিশ স্কোয়াড নাশকতায় জড়ানোর অভিযোগে আটক করেছে সন্ন্যাসিনী সাধ্বী প্রজ্ঞা ঠাকুরসহ এক সামরিক কর্মকর্তাকে। তাদের জবানি থেকে যা বেরিয়ে আসে তা এক কথায় ভয়াবহ। গত সেপ্টেম্বরে গুজরাত ও মহারাষ্ট্রের বোমা বিষ্ফোরণের সঙ্গে ঐ নেটওয়ার্কের জড়িত থাকবার আলামতও মিলেছে। ভারতজোড়া সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক তৈরি করা হয়েছে। বিভিন্ন রাজ্যে চালু আছে প্রশিণ শিবির। এদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হলো, হিন্দু জনজাগরণ মঞ্চ, পানভেলের সান্তনা আশ্রম এবং ১৯৩৫ সালে জিন্দু উগ্রবাদী বি.এস. মুঞ্জে প্রতিষ্ঠিত সেন্ট্রাল হিন্দু মিলিটারি এডুকেশন সোসাইটির ভোনশালা মিলিটারি স্কুল। এসব অভিযোগ ও আলামত ভারতে সন্ত্রাসবাদের নতুন মুখচ্ছবি সাজিয়ে তুলছে। বিজেপি’র হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির সঙ্গে মিলিয়ে একে বলা হচ্ছে, ‘হিন্দু সন্ত্রাসবাদ’। তা যদি হয় তাহলে সরকারি চোখে ভারতীয় গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার প্রধান হুমকি হিসেবে যে মুসলিম সন্ত্রাসবাদের ভয় সৃষ্টি হয়েছিল, তার ধার অনেকটাই য়ে যায়। পাশাপাশি মুসলিম জঙ্গিবাদ চালানের দায়ে অহরহ বাংলাদেশ ও পাকিস্তানকে যেভাবে নিন্দামন্দ করা হতো, তার গুরুত্বও কমে যায়। কারণ, ‘হিন্দু জঙ্গিবাদ’ বলে যাকে দেখা যাচ্ছে, তা তো খোদ ভারতীয় সমাজ-রাষ্ট্রের ভেতরই বেড়ে উঠেছে। শুধু তা-ই নয়, বাংলাদেশ বা পাকিস্তানে যেমন ‘জঙ্গিবাদ’ কমবেশি সরকারি প্রশ্রয় পেয়েছিল, ভারতেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। তবে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতীয় পরিস্থিতির প্রধান পার্থক্য এখানেই যে, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে তা মূলধারার রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি। কিন্তু ভারতে তা মুলধারার রাজনীতি তথা ভারতের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল হিসেবে এবং ৭-৮ টি রাজ্যের সরকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।

বিজেপি শাসিত রাজ্যের স্কুল পর্যায়ে পাঠ্যপুস্তকে তাদের ভাবাদর্শ চারিয়ে দেওয়া হয়েছে। দিল্লিসহ বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের ভাবাদর্শ বিরোধী পাঠ্যতালিকা বাদ দেওয়ানোর চেষ্টা হচ্ছে এবং তা সফলতাও পেয়েছে কিছুটা। আক্রান্ত হচ্ছেন শিল্পী ও অধ্যাপকেরা।

এর বাইরে: আফগানিস্তানের পুতুল শাসক হামিদ কারজাই সম্প্রতি তার প্রভুদের সঙ্গে গোস্যা করে ফাঁস করেছেন যে, আফগানিস্তানের বেশিরভাগ বিষ্ফোরণই ভাড়াটে পশ্চিমা সিকিউরিটি এজেন্সিগুলোর কাজ। মোটিফ না বোঝার কোনো কারণ নেই। ইরাকে প্রথম দিকে যে গাড়িবোমা বিষ্ফোরণ হতো, তার অনেকগুলিই ছিল আমেরিকা থেকে চুরি যাওয়া গাড়ি। এসব ঘটনা আফগানিস্তান ও ইরাকে মার্কিন সামরিক উপস্থিতির অজুহাত হিসেবে দারুণ কাজে লেগেছে।

১৯৯৯ সালে কলকাতা বিমানবন্দরে ছয়জন হুজুরকে আটক করা হয়, তারা বাংলাদেশে আসছিল। পরে তারা স্বীকার করে যে, তারা ইসরায়েলি নাগরিক, বাংলাদেশে জঙ্গি আউটফিট বুঝতে তাবলীগের ছদ্মবেশে এখানে আসতে চেয়েছিল। প্রশ্ন তোলা দরকার যে, গ্রেনেড হামলার গ্রেনেড বা সারাদেশে ৫০০ বোমার অর্থ কারা দিয়েছিল?

এরকম অজস্র উদাহরণ দেওয়া যাবে। যার বেশিরভাগই প্রকাশিত হয়েছিল মেইনস্ট্রিম মিডিয়ার কোনাকুনচির মধ্যে। আমি দাগিয়ে রেখেছি পুরো চিত্রটা বুঝবার জন্য।
কানাডিয় গবেষক নাওমি কেইন তাঁর ডিজাস্টার ক্যাপিটালিজম এ ডিপ পলিটিকস নামের একটি ধারণা সামনে এনেছেন। তিনি দেখাচ্ছেন যে, রাজনীতির উপরিস্তরে অনেক কিছুরই জš§ বিভিন্ন শক্তিশালী সংস্থার লুকানো কার্যক্রমে। গোয়েন্দা সংস্থা, প্রভাবশালী বিজনেস সার্কেল, মিডিয়া ম্যাগনেট, লবিস্টসহ নানান ক্ষমতাশালী গ্র“প সরকার, জনগণ, মিডিয়াকে বিশেষ পথে চালিত করে। রাজনীতির গতি ও সরকারের অনেক কর্মসূচি তারাই নিয়ন্ত্রণ করে। এটাকে তিনি ষড়যন্ত্র বলতে রাজি নন, বলতে চান ডিপ পলিটিকস। ফলে আমার বলা গুপ্ত যোগাযোগগুলোকে ষড়যন্ত্র তত্ত্ব বলে নাকচ করার ঘোর বিরোধী আমি। ষড়যন্ত্র তত্ত্ব বরং সেগুলোই যেগুলোর পক্ষে পাবলিকলি যাচাইযোগ্য প্রমাণ হাজির করতে পারা যায় না। ইরাকের গণবিধ্বংসী অস্ত্র, আল কায়েদার টুইন টাওয়ার ধ্বংস তেমনই ষড়যন্ত্র তত্ত্ব। সাম্রাজ্যবাদ বিশ্বব্যাপী এক মুসলিম ষড়যন্ত্র আবিষ্কার করে ইসলাম ও মুসলমানদের আক্রমণের নিশানা করেছে। এর সঙ্গে তুলনীয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে ইহুদী ষড়যন্ত্র ও ইহুদিদের কুকর্মের কথা বলে ইহুদী নিধনের জমিন তৈরির আয়োজন। এদের কাছে সেসময়ের ইহুদী আর আজকের মুসলমান কেবল আধিপত্য বিস্তারের বলিমাত্র।

(আগামি পর্বে সমাপ্ত) ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/farukwasifblog/29261865 http://www.somewhereinblog.net/blog/farukwasifblog/29261865 2010-10-26 19:52:44
আহ্বান: শিশুদের নিয়ে বড়দের অবলোকনকাম ঠেকান, বেহুশ বিনোদনের খপ্পর রুখুন
আমরা একে বন্ধ করায় সরকারি নীতিমালা ও সামাজিক নজরদারি দাবি করেছি। চেয়েছি মানুষ সোচ্চার হোক। এই লেখা ও এই দাবি আট সেপ্টম্বরের প্রথম আলোর অনলাইন সংস্করণে সর্বাধিক পঠিত ও আলোচিত হয়েছে। এটা একটা সূচক এবং একে শিক্ষিত-নাগরিক-শহুরে মধ্যশ্রেণীর জনপ্রিয় দাবিও বলা যেতে পারে। প্রচলিত জরিপগুলো এর থেকে সীমিতভাবে জনমত যাচাই করে জনমত জানায়। সেই বিচারে বলা যায় এটা জনমতেরই দাবি। এই সরকার (কোন সরকার না?) মধ্যবিত্ত আশ্রিত উচ্চবিত্তের সরকার। (সমস্যার আলোচনাটাও হয়েছে মধ্যবিত্ত পরিসরে। রাষ্ট্র যাদের পোছে না সেইসব হতদরিদ্র উপেক্ষিত শিশু ও তাদের পরিবারের কথা বলা হয় নাই এবং ভদ্রলোকি মিডিয়ায় তাদের প্রবেশাধিকার নাই।) তো সেই মধ্যবিত্ত আশ্রয় করে চলা সরকার কেন এই দাবি আমলে নেবে না? আর কেনই বা আমরা যার যা সাধ্য সে অনুসারে আওয়াজ তুলব না??? ইভ টিজিংয়ের চেয়ে এটি তো কম বড় সমস্যা না? এখনই ঠেকাতে না পারলে প্রজন্মের পর প্রজন্ম এই ক্ষতির খেসারত আমাদের টানতে হবে।

বিনোদনের ছাপ্পা যদি আমাদের অন্তরাত্মাকে, আমাদের সামাজিক দায়কে নিস্তেজ না করে থাকে, যদি নিজ নিজ শিশুদের প্রতি, অনাগত প্রজন্মের প্রতি, সংস্কৃতির অবশিষ্ঠ জোরগুলি রক্ষার প্রতি আমরা নির্বিকার ঔদাসীন্য না দেখাই, তাহলে লিখুন, বলুন, করুন এবং আওয়াজ তুলুন: স্যাটেলাইট চ্যানেল তথা হিন্দি চ্যানেলের রিয়েলিটি শো'র মাধ্যমে শিশুদের যৌন-উপাদান করার প্রচেষ্টা বন্ধ করুন।


শিশুদের নিয়ে বড়দের বেহুঁশ বিনোদন থামান

রাষ্ট্রের পতন হয় সশব্দে, কিন্তু নীতি-নৈতিকতার মৃত্যু ঘটে নীরবে, দিনে দিনে। আমাদের সমাজে নীতির মৃত্যু এ রকম নিঃশব্দেই হচ্ছে। টেলিভিশনের কিছু কিছু অনুষ্ঠানে তার আভাস মিলছে। মধ্যপ্রাচ্যে আমাদের শিশুদের উটের দৌড়ের জকি করা নিয়ে দুনিয়াজুড়ে অনেক কথা হয়েছে। টেলিভিশনের মাধ্যমে শিশুদের বিনোদনের জকি করা নিয়ে সরব হওয়ার সময়ও চলে এসেছে।

বাকী অংশ দেখুন

Click This Link

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/farukwasifblog/29252218 http://www.somewhereinblog.net/blog/farukwasifblog/29252218 2010-10-10 00:37:56
ভারতে মাওবাদী বিদ্রোহ নিয়ে অরূন্ধতী রায়: অরণ্যে, কমরেডদের সঙ্গে দরজার নিচ দিয়ে আসা খামে মোড়া টাইপ করা ছোট্ট চিঠিটি ভারতের গুরুতর নিরাপত্তা হুমকির সঙ্গে আমার মোলাকাত নিশ্চিত করেছে। মাসের পর মাস আমি তাদের জবাবের জন্য প্রতীক্ষা করছিলাম। আমাকে ছত্তিশগড়ের দান্তেওয়াদার মা দান্তেশ্বরী মন্দিরে তাদের জন্য অপেক্ষা করতে হবে।

দান্তেওয়াদা এক অদ্ভুত শহর। যেন কোনো সীমান্ত শহরকে ভারতের একদম মধ্যস্থলে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। এটিই হলো একটি যুদ্ধের উৎপত্তিস্থল, যেখানে সবকিছু উল্টে গেছে। এখানে পুলিশ সাদা পোশাক পড়ে আর বিদ্রোহীরা পরে ইউনিফর্ম। বন্দীরা এখানে মুক্ত আর জেল সুপার জেলবন্দী। ধর্ষিতারা এখানে পুলিশ হেফাজতে আর সরকারি মদদের খুনে বাহিনী সালভা জুদামের ধর্ষকরা বক্তৃতা দেয় বাজারে।
ইন্দ্রাবতী নদী পেরুলেই মাওবাদী নিয়ন্ত্রিত এলাকা। পুলিশ একে বলে ‘পাকিস্তান’। সেখানে গ্রামগুলি বিরান কিন্তু জঙ্গলে গিজগিজ করছে মানুষ। এই অরণ্যের জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ভয়াবহ এক যুদ্ধ ঘোষণা করেছে ভারত সরকার। প্রকাশ্যে তারা এর অস্তিত্ব স্বীকার না করলেও এই যুদ্ধ নিয়ে সরকার গর্বিত। ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী (এই যুদ্ধের সিইও) পি চিদাম্বরম বলেছেন ‘অপরাশেন গ্রিন হান্ট’ বলে কিছু নেই, এসব মিডিয়ার সৃষ্টি। অথচ বিরাট অঙ্কের টাকা ঢালা হচ্ছে এর পেছনে, জমায়েত করা হচ্ছে লাখ লাখ সেনা। এই যুদ্ধের রণাঙ্গন মধ্যভারতের অরণ্য হলেও, আমাদের সকলের জন্য এর পরিণতি গুরুতর।

বনের মধ্যে মুখোমুখি হওয়া দুই পক্ষের সামর্থ্য অতুলনীয়। একদিকে বিপুল আধাসামরিক বাহিনী, যাদের রয়েছে অর্থ, অস্ত্রক্ষমতা, মিডিয়া ও এক উদীয়মান পরাশক্তির দম্ভ। অন্যদিকে রয়েছে মামুলি অস্ত্রে সজ্জিত সাধারণ গ্রামবাসী, যাদের পেছনে রয়েছে দারুণ সংগঠিত, প্রচণ্ডভাবে উদ্দীপ্ত মাওবাদী গেরিলাদের লড়াকু শক্তি। রাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের লড়াইয়ের ইতিহাস অনেক পুরনো: পঞ্চাশের দশকের তেলেঙ্গানা বিদ্রোহ, ষাট দশকের শেষ থেকে সত্তর দশক অবধি পশ্চিম বঙ্গ, বিহার, অন্ধ্র প্রদেশের শ্রীকাকুলাম এবং আবার আশির দশক থেকে অন্ধ্রপ্রদেশ, বিহার ও মহারাষ্ট্রে তারা লড়েছে। এখন পর্যন্ত এই লড়াই চলছে। পরস্পরের কৌশল ও যুদ্ধপ্রণালী দুই পক্ষের কাছেই অনেক পরিচিত। প্রতিবারই মনে হয়েছে, মাওবাদীরা কেবল পরাজিতই নয় একেবারে নির্মূল হয়ে গেছে। কিন্তু প্রতিবারই আগের থেকে সংগঠিত, সঙ্কল্পবদ্ধ এবং প্রভাবশালী অবস্থায় আবার তাদের আবির্ভাব ঘটেছে। আজ আবার তাদের অভুত্থান ছড়িয়ে পড়ছে ভারতের খনিজ সমৃদ্ধ ছত্তিশগড়, ঝাড়খণ্ড, উড়িষ্যা ও পশ্চিমবঙ্গের বনাঞ্চলে। ভারতের লাখ লাখ আদিবাসীর এই মাতৃভূমি আজ কর্পোরেট জগতের স্বপ্নভূমিও বটে।

শহুরে সুবোধ ভদ্রলোকদের পক্ষে বিশ্বাস করা সহজ যে যারা নির্বাচনকে ভাওতাবাজি মনে করে, সংসদকে বলে শুওয়ের খোয়াড় এবং যারা খোলাখুলি ভারতীয় রাষ্ট্রকে উচ্ছেদ করতে চায়; সরকারের সঙ্গে লড়াই চলছে সেই মাওবাদীদের। তারা সহজেই ভুলে যায়, মাও-য়ের জšে§রও শত বছর আগে থেকেই মধ্যভারতের উপজাতীয় জনগণ প্রতিরোধ চালিয়ে আসছে। না লড়লে তারা মুছে যেত। হো, ওরাঁও, কোল, সাঁওতাল, মুন্ডা ও গন্ডরা বারেবারে ব্রিটিশ সরকার, জমিদার ও সুদখোর মহাজনদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে। প্রতিবারই নৃশংসভাবে তাদের দমন করা হয়েছে, খুন হয়েছে হাজারে হাজারে, কিন্তু তারা বশ মানেনি। এমনকি স্বাধীনতার পরের প্রথম অভ্যুত্থানগুলোও ঘটিয়েছে তারাই। নকশালবাড়ী আন্দোলনকে ভারতের প্রথম মাওবাদী আন্দোলন বলা হয়। তখন থেকেই নকশালী রাজনীতি ও আদিবাসীদের প্রতিরোধ একাকার।

ভারতের সরকারগুলো সবসময় তাদের প্রান্তিক করে রেখেছে। ১৯৫০ সালে গৃহীত ভারতের নতুন সংবিধানে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক বিধিগুলো বহাল রাখা হলে আদিবাসীদের জš§ভূমিগুলো রাষ্ট্রের হাতে চলে যায়। রাতারাতি রাষ্ট্র তাদের খেদিয়ে অল্প কিছু জায়গার মধ্যে জড়ো করে। তারা বঞ্চিত হয় বনের ফলফলাদি থেকে, তাদের জীবনযাত্রাকে বেআইনী করে দেওয়া হয়। তারা ভোটাধিকার পায়, কিন্তু হারায় তাদের জীবনধারণের উপায় আর সম্মান।

প্রতিবারই যখন বড় বাঁধ, সেচপ্রকল্প কিংবা খনি করার প্রয়োজনে বিপুলসংখ্যক মানুষকে সরাতে হয়েছে প্রতিবারই তখন ‘উপজাতীয়দের মূল ধারায় সামিল’ করা অথবা তাদের ‘উন্নয়নের সুফল’ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। কেবল বাঁধ বানাতেই ভারতে তিন কোটি মানুষকে উচ্ছেদ হয়ে যেতে হয়েছে। তারা হলো ভারতের প্রগতির বাস্তুহারা, আর তাদের বড় অংশই হলো উপজাতীয়। তাই যখনই সরকার আদিবাসীদের কল্যাণের কথা বলে, তখনই তারা দুশ্চিন্তায় পড়ে।

অতিসম্প্রতি ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পি চিদাম্বরম জানিয়েছেন, তিনি চান না উপজাতীয় সংস্কৃতি ‘জাদুঘরে থাকুক’। কিন্তু পেশাগত জীবনে কর্পোরেট আইনজীবী হিসেবে বেশ ক’টি খনি কোম্পানির হয়ে কাজ করার সময় আদিবাসীদের কল্যাণে তাঁর আগ্রহ ছিল বলে জানা জায় না। গত পাঁচ বছরে ছত্তিশগড়, ঝাড়খণ্ড, উড়িষ্যা ও পশ্চিমবঙ্গের সরকার খনি কোম্পানিগুলোর সঙ্গে শত শত বিলিয়ন ডলারের শত শত সমঝোতাপত্র সই করেছে। ইস্পাত ও লৌহ কারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র, অ্যালুমিনিয়াম পরিশোধনাগার, বাঁধ ও খনির জন্য করা এসব চুক্তির সবই হয়েছে গোপনে। এসবের মাধ্যমে টাকা বানাবার স্বার্থে আদিবাসীদের বসতি ছাড়তেই হবে।
অতএব, এই যুদ্ধ।

একটি দেশ যা নিজেকে বলে গণতান্ত্রিক, তা যখন নিজ সীমান্তের ভেতরেই যুদ্ধ ঘোষণা করে, তখন কেমন হয় সেই যুদ্ধ? প্রতিরোধের কোনো সুযোগ তখন থাকে কি? মাওবাদী কারা? তারা কি কেবলই কোনো অচল মতবাদ কায়েম করতে চাওয়া নৈরাজ্যবাদী? সশস্ত্র সংগ্রাম কি সর্বদাই অগণতান্ত্রিক?

রওনা হওয়ার আগের দিন ঘুমঘোর স্বরে মা বললেন, ‘আমার কেবল মনে হচ্ছে, ভারতের এখন একটা বিপ্লব প্রয়োজন।’

ইন্টারনেটের একটি লেখা বলছে, মাওবাদী সংগঠনগুলোকে ‘নেতৃত্বহীন’ করার জন্য ইসরায়েলের মোসাদ ভারতের ৩০ জন উচ্চপদস্থ পুলিশ অফিসারকে টার্গেট করে গুপ্তহত্যার প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। (বাংলাদেশেও জরুরি অবস্থার সময়ে গঠিত সোয়াত (ঝডঅঞ) বাহিনীর একদল উচ্চপদস্থ অফিসারকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ব্ল্যাকওয়াটার। ইরাক ও পাকিস্তানে সিআইএ-র ভাড়াটে হিসেবে গণহত্যা চালাবার পর এরা নামপরিবর্তন করে রাখে ঢবথঅনুবাদক) সংবাদ মাধ্যমে খবর আসছে, ইসরায়েল থেকে অনেকগুলি যন্ত্র কেনা হয়েছে: লেজার রেঞ্জ-ফাইন্ডার, থার্মাল ইমেজিং ইক্যুইপমেন্ট এবং চালকবিহীন বিমান। মার্কিন সেনাবাহিনীতে এগুলো খুবই জনপ্রিয়। গরিবদের বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য মোক্ষম সব অস্ত্র।

রায়পুর থেকে দান্তেওয়াদা যাওয়ার ১০ ঘন্টা পথের অঞ্চলটিকে বলা হয় ‘মাওবাদী উপদ্রুত’ এলাকা। উপদ্রব ও সংক্রমণ নির্মুল করাই নিয়ম। এভাবে গণহত্যার শব্দ আমাদের ভাষায় ঢুকে পড়েছে। রায়পুরের ঠিক বাইরেই বিরাট এক বিলবোর্ডে বেদান্ত ক্যান্সার হাসপাতালের বিজ্ঞাপন। এই কোম্পানি (এখানেই একসময় চাকরি করতেন আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী) উড়িষ্যার যেখানেই বক্সাইটের খনি বানায় সেখানেই একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থায়ন করে। এভাবেই খনি কোম্পানিগুলো আমাদের মনে জায়গা করে নেয়। তাদের এই কৌশলের নাম কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপন্সিবিলিটি (সিএসআর)_ সামাজিক ভাবে দায়বদ্ধ কর্পোরেট। এই সিএসআর-এর মাধ্যমেই তারা তাদের অর্থনৈতিক কায়কারবার ঢেকে রাখে। কর্ণাটক রাজ্যের সাম্প্রতিক একটি প্রতিবেদন বলছে, প্রতি টন লোহার জন্য খনি কোম্পানি সরকারকে দেয় ২৭ রুপি আর তাদের লাভ হয় ৫০০০ টাকা। বক্সাইট কিংবা অ্যালুমিনিয়াম খনিতে লাভের হার আরো আরো বেশি। এভাবেই প্রকাশ্য দিবালোক বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার লুট হয়ে যাচ্ছে। এই টাকা দিয়েই তারা নির্বাচন, বিচারক, সংবাদপত্র, টিভি চ্যানেল, এনজিও ও সাহায্য সংস্থাগুলোকে কিনে রাখতে পারে। তাই কোথাও ক্যান্সার হাসপাতাল দেখলেই আমার সন্দেহ হয়, আসেপাশে কোথাও খনি রয়েছে।

পথে পড়লো ব্রিগেডিয়ার বি. কে. পনওয়ারের বিখ্যাত সন্ত্রাসবিরোধী ও জঙ্গলযুদ্ধ প্রশিক্ষণ কলেজ। তাঁর কাজ হলো দুর্নীতিবাজ ও বখাটে পুলিশ সদস্যদের প্রশিক্ষণ দিয়ে জঙ্গল-কমান্ডো বানানো। প্রতি ছয় সপ্তাহে এখান থেকে আটশ পুলিশ সদস্য যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিয়ে বেরয়। ভারত জুড়ে এরকম আরো বিশটি কলেজ হচ্ছে। এভাবে পুলিশদের সেনা বানানো হচ্ছে (কাশ্মীরে হচ্ছে উল্টোটা। সেখানে সেনাবাহিনীই পুলিশের কাজ করছে)। যা-ই করা হোক, জনগণ তাদের শত্র“।

দান্তেশ্বরী মন্দিরে আমি সময়মতোই পৌঁছলাম। কথামতো আমার হাতে ক্যামেরা ও নারকেল, কপালে টিপ। কিন্তু ক্যাপ পরা কাউকে দেখা গেল না। কয়েক মিনিটের মধ্যে একটি কিশোর আমার সামনে এল। কিন্তু সঙ্কেতবাক্য বললো না। সঙ্গে একটি আউটলুক পত্রিকা ও কলা আনবার কথা তার, সেগুলোও দেখা গেল না। একটি চিরকুট দিল সে, তাতে লেখা: ‘আউটলুট পত্রিকা পাওয়া গেল না’। আর কলা?
‘খেয়ে ফেলেছি’, কিশোরটি বললো, ‘ক্ষুধা লেগেছিল’।

তার কাঁধে একটি ঝোলা। তার নাম মাংটু। এই নাকি ভারতের বৃহত্তম নিরাপত্তা হুমকি?
মন্দির থেকে হেটে কিছুটা এগলেই সব কিছু দ্রুত ঘটতে লাগলো। মটরবাইকে করে দুটো লোক এল। তাদের পেছনে চড়ে বসলাম। জানি না কোথায় যাচ্ছি। স্থানীয় পুলিশ সুপারের বাড়ি পার হলাম। গতবার এখানে এসে তার সঙ্গে কথা হয়। সেই এসপি অকপটে বলেছিলেন, ‘দেখুন ম্যাম, খোলাখুলি বলছি, এই সমস্যার সমাধান পুলিশ বা সেনাবাহিনী দিয়ে হবে না। এইসব উপজাতীয়দের সমস্যা হলো তারা লোভ বোঝে না। তাদের লোভী করে তুলতে না পারলে আমাদের কোনো আশা নেই। আমি আমার বসকে বলেছি, বাহিনীগুলো সরিয়ে নিন আর প্রত্যেক আদিবাসীদের বাড়িতে একটি করে টেলিভিশন দিয়ে দিন। দেখবেন, সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে।’

আমরা শহর পেরিয়ে এলাম। তিন ঘন্টা চলার পর হঠাৎ একজায়গায় তারা থামলো। আমি আর মাংটু নেমে পড়লাম। ঝোলা কাঁধে নিয়ে আমি এই পুচকে অভ্যন্তরীণ হুমকির পিছু পিছু রাস্তা ছেড়ে বনের ভেতর গিয়ে ঢুকলাম। দিনটা দারুণ সুন্দর। বনের মেঝে ঝরাপাতায় সোনায় মোড়া। কিছুটা যাওয়ার পর একটা নদী পড়লো। ‘ওই পারে’ সেই এসপি বলেছিলেন, কাউকে দেখামাত্র গুলির নির্দেশ দেওয়া আছে’। নদীটা পার হতে হতে আমার সেই কথা মনে পড়লো। কিন্তু মাংটুকে মনে হলো নিশ্চিন্ত। ওর পিছু পিছু আমিও ঢুকে পড়লাম মাওবাদী অধ্যুষিত দণ্ডকারণ্যের অরণ্যের আরো গভীরে। ...
অরণ্যে থাকার শেষ রাতে একটি পাহাড়ের ঢালে আমরা ক্যাম্প করলাম। এটা পেরুলেই সেই রাস্তা, যেখানে আমাকে মটরবাইক থেকে নামিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এ ক’দিনে বনটাও যেন বদলে গেছে। চিরাউঞ্জি, তুলা আর আমগাছগুলোয় ফুল আর মুকুল ফোটা শুরু করেছে।

কুদুর গ্রামবাসীরা থেকে আমার জন্য সদ্য ধরা মাছ পাঠিয়েছে। আর পাঠিয়েছে বন থেকে পাওয়া অথবা তাদের ফলানো একাত্তর পদের ফল, সবজি, কালাই ডাল, পতঙ্গের একটি তালিকা। সামান্য একটি তালিকা অথচ এটাই যেন তাদের দুনিয়ার মানচিত্র।

বনে খবর আসে ছোটো ছোটো চিরকুটে করে। ওরা বলে বিস্কুট। আমার জন্য এরকম দুটি বিস্কুট এসেছে। কমরেড নর্মদা পাঠিয়েছে একটি কবিতা আর কমরেড মাসে পাঠিয়েছে সুন্দর এক চিঠি (অথচ কখনো কি জানবো কে এই নারী?)।
কমরেড সুখদেবের কম্পিউটারে আমি ইকবাল বানোর গাওয়া ফায়েজ আহমদ ফায়েজের লেখা হাম দেখেঙ্গে গানটি তুলে দিলাম। গানটি তিনি গেয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট জিয়া-উল হকের দুঃশাসনের সময় লাহোরের একটি বিখ্যাত কনসার্টে।

যখন বাতিল আর অভিশপ্তরা বসবে উঁচুতে
সব মুকুট আর সিংহাসন ধূলায় লুটাবে,
হাম দেখেঙ্গে

গানের জবাবে লাহোরের পঞ্চাশ হাজার দর্শক একসঙ্গে আওয়াজ তুলেছিল, ইনকিলাব জিন্দাবাদ, বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক। এত এত বছর পর সেই আওয়াজ আবার এই অরণ্যে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। অদ্ভুত, এই মিল।


‘যারা ভুল করে মাওবাদীদের বুদ্ধিবৃত্তিক অথবা বাস্তব সাহায্য করবে’ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাদের হুমকি দিয়েছেন। সঙ্গীত ভাগাভাগি করা কি সেরকম অপরাধের পর্যায়ে পড়ে?
ভোরবেলা আমি বিদায় নিলাম। হাঁটা শুরু করার পর এই প্রথম দেখলাম নীতি আর সুখদেব তাদের একে ৪৭-এর সেফটি ক্যাচ অন করে নিল। ‘আমাদের ওপর আক্রমণ শুরু হলে আপনি কী করবেন, জানেন?’, বললো সুখদেব।
‘হ্যাঁ’, বললাম আমি, ‘সঙ্গে সঙ্গে আমরণ অনশন ঘোষণা করবো’।
পাথরের ওপর বসে সে হাসতে লাগলো।

এক ঘন্টা ধরে আমরা পাহাড়ে উঠলাম। নীচে সেই রাস্তা, যা দিয়ে অরণ্যে ঢুকেছিলাম। লুকিয়ে থেকে আমরা মটরবাইকের আওয়াজের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। যখন তা আসলো, লাল সালাম বলে বিদায় জানাল ওরা। লাল সালাম কমরেড।
পেছন ফিরে দেখি, তারা সেখানে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। হাত নাড়ছে। ছোটো এক বন্ধন। ওই মানুষেরা স্বপ্ন নিয়ে লড়াই করছে, যখন দুনিয়া বাস করছে দুঃস্বপ্নের মধ্যে। প্রতি রাতে আমার এই সফরের কথা মনে আসে। সেইসব রাতের আকাশ, সেইসব বনের পথ। আমি যেন দেখি, আমার টর্চের আলোয় ক্ষয় হয়ে যাওয়া চপ্পলের ওপর কমরেড কমলার পা হেঁটে চলেছে। জানি, সে এখনো ছুটে বেড়াচ্ছে। ছুটছে, কেবল তার নিজের জন্য নয়, আমাদের সকলের হয়ে আশাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য।

আউটলুক থেকে করা মূল রচনার সংক্ষেপিত অনুবাদ।

মূল রচনার লিংক Click This Link
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/farukwasifblog/29121098 http://www.somewhereinblog.net/blog/farukwasifblog/29121098 2010-03-22 00:35:45
পরাশক্তিগুলোর গিরিচাপে বাংলাদেশ অথবা জাতীয় স্বার্থ যখন কারো হাতের রুমাল
উত্তপ্ত ও অস্থির হয়ে উঠছে দক্ষিণ এশিয়া। একদিকে চীন আর অন্য দিকে ভারতের তুমুল উত্থান ঘটছে। বাংলাদেশ যেন আটকা পড়েছে দুটি পর্বতের মাঝখানের চাপা গিরিখাতের মধ্যে। অন্যদিকে দুনিয়ার সম্পদের ভাগবাটোয়ারা নিয়ে যুদ্ধের ঝড় জাগছে, অর্থনীতি কাঁপছে মন্দার ভূমিকম্পে। এইসব বৈশ্বিক ঘূর্ণির ধাক্কা আমাদের গায়েও লাগছে। কী আছে সামনের পথে, তার হিসাব আজ বড় বেশি প্রয়োজন।

মিয়ানমার হঠাত্ বাংলাদেশের সমুদ্রসীমার মধ্যে ঢুকে সেখানকার গ্যাসক্ষেত্রগুলোর মালিকানা দাবি করে বসেছে। সীমান্তের ওপারে তাদের কয়েক ব্যাটালিয়ন সেনা যুদ্ধপ্রস্তুতি নিয়ে দাঁড়িয়ে গেছে। চাপ বাড়াতে দলে দলে রোহিঙ্গাদের ঢুকিয়ে দিচ্ছে বাংলাদেশের ভেতর। একই সময়ে বাংলাদেশ সমুদ্রের গ্যাস তোলার প্রস্তুতি শুরু করলে একযোগে আপত্তি করে মিয়ানমার ও ভারত। ফলত বাংলাদেশকে জাতিসংঘের আদালতে সালিসের জন্য দৌড়াতে হচ্ছে। এদিকে ভারতের টিপাইমুখে বাঁধ নির্মাণের ঘটনাকেও ছাপিয়ে যাচ্ছে আরও উজানে ব্রহ্মপুত্রের উেস চীনের বাঁধ নির্মাণ। আমরা কি এখন আরেক দফা ‘বাঁচাও বাঁচাও’ বলে গলা ফাটাব? পরিহাস হচ্ছে, দুর্বল রাষ্ট্র যতই ফরিয়াদ করে বেড়াক, কর্তার ইচ্ছাতেই কর্ম হয়। পরাশক্তির ইচ্ছাই জাতিসংঘের রায়। মিয়ানমারের পেছনে রয়েছে চীন আর চীনের পেছনে রাশিয়া। বাংলাদেশের ব্যাপারে ভারত একাই এক শ হলেও সেরের ওপর সোয়া সের হিসাবে জুটেছে আমেরিকা। স্থল ও সমুদ্রে চারদিক থেকে আটকে যাচ্ছে দেশটা। নেপাল যেমন আছে চতুর্দিকে ভারতবেষ্টিত।

খালি চোখে এসব আঞ্চলিক সমস্যা কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতির ছক ধরে এগোলে বোঝা যায়, সবই পরাশক্তিগুলোর চরদখলের খেলা। আঞ্চলিক নিরাপত্তার প্রশ্ন সর্বদাই বৈশ্বিক নিরাপত্তা প্রশ্নের সঙ্গে জড়িত। পরিস্থিতি অনেকটা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগের সময়ের মতো। তখন যেভাবে বড় শক্তিগুলো যার যার মতো সামরিক জোট বানাচ্ছিল এবং বলি হচ্ছিল ছোটো রাষ্ট্রের স্বাধীনতা। সব নষ্টের গোড়ায় আছে তেল-গ্যাস তথা প্রাকৃতিক সম্পদ এবং বাণিজ্যিক ও সামরিক গুরুত্বসম্পন্ন অঞ্চলের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার টানাটানি।

এসবের মধ্যে দরিদ্র কৃষকের সুন্দরী কন্যার মতোই অরক্ষিত ও বিপন্ন বাংলাদেশ। কেননা বিশ্বরাজনীতির নিম্নচাপটি মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরে এসেছে দক্ষিণ এশিয়ায়। ভারতের কাছে দক্ষিণ এশিয়া হলো তাদের বাড়ির উঠোন। নিজের উঠানে কে না খবরদারি করতে চায়? ভারতের এই চাওয়ার কারণে কোনো প্রতিবেশীর সঙ্গে এর সুসম্পর্ক নেই এবং প্রতিবেশীরাও তাকে নিয়ে তটস্থ। এ অঞ্চল তেল-গ্যাস সম্পদে পরিপূর্ণ এবং এর পাড়া-পড়শিরা সবাই বর্তমান দুনিয়ার বাঘা বাঘা খেলোয়াড়। আফগানিস্তান-পাকিস্তানের প্রতিবেশী চীন, ইরান, রাশিয়া ও ভারত। বাংলাদেশের প্রতিবেশী ভারত-মিয়ানমার-চীন। বিশ্বশক্তি হতে গেলে ভারত ও চীনকে আগে নিজের পাড়ায় দাপট প্রতিষ্ঠা করতে হবে, এখানকার গ্যাস-কয়লা-বন্দর-সড়ক-পানির ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং ভূসামরিক সুবিধা তার প্রয়োজন। চীনেরও বর্তমান উন্নতি বজায় রাখতে দরকার বাইরের জ্বালানি, নিরাপত্তার জন্য চাই বঙ্গোপসাগরে সামরিক উপস্থিতি। ভারতের জ্বালানি ক্ষুধা ও নিরাপত্তাভীতিও দিন দিন বাড়ছে। প্রতিবেশীদের ছায়াকে চীনের ছায়া বলে ভাবা শুরু করেছে তারা। চীন যাতে কোনোভাবে বাংলাদেশ-পাকিস্তানের গ্যাসসম্পদ, বাজার ও ভৌগোলিক অবস্থানের সামরিক সুবিধা পেতে না পারে, তার নিশ্চয়তা চায় ভারত। তা নিশ্চিত করতে আমেরিকা-ইসরায়েলকে সঙ্গে নিয়ে মাঠে নেমেছে তারা। ইতিমধ্যে আফগান-রুশ সীমান্তের দেশ তাজিকিস্তানে ভারত তার প্রথম সেনাঘাঁটি বসিয়েছে। আফগানিস্তানে তাদের সামরিক উপস্থিতি রয়েছে এবং ট্রানজিট-করিডোর ইত্যাদির মাধ্যমে বাংলাদেশেও তাদের প্রভাব বাড়ছে। মার্কিন ও ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সামরিক যোগাযোগ আগের যেকোনো সময়ের থেকে বেশি।

চীনের চাওয়াও কম নয়। জান্তাশাসিত মিয়ানমার মোটামুটি তাদের হাতের তালুতে। সেখানে দুটি বন্দর প্রতিষ্ঠা ছাড়াও পাকিস্তানের বেলুচিস্তানে গাদার বন্দর এবং ভারতের একেবারে গায়ের কাছে শ্রীলঙ্কায় আরেকটি বন্দর তাদের হাতে রয়েছে। অন্যদিকে আন্দামান থেকে বাংলাদেশের উপকূল, ওমান থেকে ইন্দোনেশিয়ার সাগর পর্যন্ত ভারতীয় নৌবাহিনীর দাপট। ভারত মহাসাগরের তীরের দেশ অস্ট্রেলিয়াও ঢুকছে। সব কিছুর ওপরে ‘মজা মারার ফজা ভাই’ হয়ে আছেন যুক্তরাষ্ট্র।

চীন, রাশিয়া ও ভারতের মাঝখানে মধ্য এশিয়ার মানচিত্রটি খেয়াল করলেই বোঝা যাবে, কেন ওবামা বুশের মতোই এ অঞ্চল ছাড়তে চান না। এ অঞ্চল এখন পাইপলাইনিস্তান নামে পরিচিত। ইরান থেকে একটি আর উজবেকিস্তান-তাজিকিস্তান থেকে অন্য যে তেলের পাইপলাইনটি আফগানিস্তান হয়ে বেলুচিস্তানের গাদার বন্দর দিয়ে ভারত মহাসাগরে আসছে, সেটির নিরাপত্তা দরকার। ইরানকে ধরার আগে পাকিস্তান ভেঙে কিংবা অন্তত তার পারমানবিক অস্ত্র কেড়ে নেওয়ার জন্য একযোগে কাজ করছে ভারত-মার্কিন-ইসরায়েলি অক্ষশক্তি। আমেরিকার আসল প্রয়োজন রাশিয়া ও চীনকে ঘিরে ন্যাটো শক্তিবলয় গড়ে তোলা। ভারত মহাসাগরে সামরিক ও বাণিজ্যিক প্রাধান্যও তাদের ইচ্ছার তালিকায়। ভারত মহাসাগর দিয়েই দুনিয়ার সবচেয়ে বেশি বাণিজ্য হয়। এর ওপর নিয়ন্ত্রণ মানে বিশ্বের মোট বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করা। ভারত মহাসাগরের সবুজ পানিতে যারা দাপট করবে, দুনিয়ার দাপটের দণ্ডও তাদের হাতেই থাকবে। মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপত্র ফরেন অ্যাফেয়ার্স পত্রিকা বলছে, ভারত মহাসাগর হলো একবিংশ শতাব্দীর কেন্দ্রীয় মঞ্চ: ‘সাহারা মরুভূমি থেকে ইন্দোনেশীয় দ্বীপপুঞ্জ পর্যন্ত ইসলামের সমগ্র খিলানটিকে জড়িয়ে আছে বৃহত্তর ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চল...এর সীমার মধ্যে রয়েছে সোমালিয়া, ইয়েমেন, ইরান ও পাকিস্তান। এ সাগর ঘিরেই চলছে গতিশীল বাণিজ্য, আবার একে ঘিরেই দানা বেঁধেছে বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদ, জলদস্যুতা ও মাদক চোরাচালান। ভারত মহাসাগরের পূর্বপ্রান্তে বাস করে ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার শত শত কোটি মুসলমান।’ (রবার্ট ডি কাপলান, পাওয়ার প্লেজ ইন দ্য ইন্ডিয়ান ওশেন, ফরেন অ্যাফেয়ার্স, মার্চ/এপ্রিল ২০০৯)

ছড়াকার সুকুমার রায়ের হ-য-ব-র-ল-তে আছে, ‘ছিল একটা রুমাল হয়ে গেল বেড়াল।’ উপমহাদেশের পরিস্থিতিও তেমন। এই বৈশ্বিক প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা নিয়ে ওঠা সমস্যাটা তাই কেবল প্রতিবেশীদের কাজিয়া নয়, বিশ্বের রাজাধিরাজদের ফাঁদ। একইভাবে অসম শর্তে মার্কিন ও ব্রিটিশ কোম্পানির কাছে সামুদ্রিক গ্যাসক্ষেত্র ইজারা দেওয়ার বিষয়টা কেবল দুর্নীতির সমস্যা নয়, তা সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি। এ অবস্থায় যেকোনো যুদ্ধের বলি হবে বাংলাদেশ। বঙ্গোপসাগরে বসবে মার্কিন-ভারতের টহলঘাঁটি। পাতানো খেলায় আখেরে গ্যাসসম্পদ নেবে বিদেশি কোম্পানি আর সার্বভৌমত্ব হবে পরাশক্তির হাতের রুমাল।

সুতরাং, একদিকে মার্কিন-ভারত-ইসরায়েলের দক্ষিণ এশীয় অভিলাষ, অন্যদিকে চীন-রাশিয়া-ইরানের আঞ্চলিক নিরাপত্তার সংকটে বাংলাদেশের অস্তিত্ব টলমল। সম্ভবত, এর থেকে পরিত্রাণ পেতেই প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ঘন ঘন ভারত-আমেরিকা-ইউরোপ সফর করছেন, বলছেন বাংলাদেশকে ঘিরে ষড়যন্ত্রের কথা। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, স্বাধীনতার ৩৮ বছরেও বাংলাদেশ কোনো স্থায়ী মিত্র সৃষ্টি করতে পারেনি। একবার ভারতের দিকে, একবার পাকিস্তানের দিকে এবং সর্বদাই আমেরিকার কক্ষপথে পেন্ডুলামের মতো দুলছি আমরা। চারদলীয় জোট সরকারের আমলে চীনমুখী কূটনীতির জয়গান দেখা গেল। এখন আবার এমন ভারতমুখী জোয়ার চলছে যে, মনে হয় পদ্মার পানি উল্টা পথে গঙ্গা বেয়ে হিমালয়ে ছুটবে। ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিকতার বোঝাপড়াটুকু আর গড়ে উঠল না।

বিশ্বের কূটনৈতিক মানচিত্রে বাংলাদশ তাই আবছা হয়ে আসছে। জাতীয় স্বার্থের পক্ষে রাজনীতিতে কিংবা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রশ্নে বড় দল দুটির স্বচ্ছ ও সম্মানজনক দৃষ্টিভঙ্গি আছে বলে মনে হয় না। উপমহাদেশের রাজনৈতিক পাটাতনেও আমাদের নিজস্ব ভূমিকা বলে কিছু নেই, নেই কার্যকারিতা। আমরা দুলছি বড় রাষ্ট্রের ঢেউয়ের ধাক্কায়—কাণ্ডারিবিহীন।

বাংলাদেশ কেবল পাকিস্তান থেকে বেরিয়ে আসা রাষ্ট্র নয়, নয় কেবল ভারত রাষ্ট্রের প্রতিবেশী ও সেই রাষ্ট্রের বাঙালিদের ‘অপর’ অংশের দেশ। জনস্বার্থের খবর নাই, খামোখাই ‘জাতীয়তাবাদ’ নিয়ে রীতিমতো মনস্তাত্ত্বিক গৃহযুদ্ধ বাধিয়ে মানুষের মগজ ঘুলিয়ে খান একশ্রেণীর রাজনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবী। তাদের এক দল পাকিস্তানের কোটরে আস্তানা গেড়ে ভারতের দিকে খবরদারির আঙুল তোলে; আরেক দল ভারতের কাঁধে শুকপাখি হয়ে বসে, পাকিস্তানের প্রেত তাড়ানোর মন্ত্র পড়ে যাচ্ছে। দুটোই ভারত ও পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়া। তাহলে কর্তারূপ বাংলাদেশের ক্রিয়া কই? যে বাংলাদেশ বয়সে চল্লিশ হতে চলল, যে বাংলাদেশ এমন এক সময়ে রক্ত দিয়ে স্বাধীন হয়েছে যখন বিশ্বে স্বাধীন রাষ্ট্রের আবির্ভাব প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছিল, যে বাংলাদেশ উপমহাদেশের নিপীড়িত জাতিগুলোকে পথ দেখিয়েছিল, জবাব দিয়েছিল সাম্প্রদায়িক দেশভাগের; যে বাংলাদেশ যুগের পর যুগ ধরে সোনার বাংলার স্বপ্ন দেখেছে, যে বাংলাদেশ সহস্র বছর মর্যাদার সঙ্গে টিকে থাকতে চায়, যে বাংলাদেশের মানুষ কর্মঠ, উদার ও গণতান্ত্রিক, সেই বাংলাদেশ কারও প্রতিক্রিয়া হতে পারে না। আমরা চলব আমাদের নিজস্ব ভালো-মন্দের হিসাবে। সেই হিসাবের খাতিরে সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব ও সমান সমান সম্পর্ক হতে বাধা কোথায়? ওপরে বাহাদুরি আর ভেতরে খয়ের খাঁগিরির কপটতা আর কত?
ঘরে-বাইরে যে সমস্যার চক্রে আজ আমরা ঢুকে পড়েছি, তা আসলে বহু দিনের অবহেলা আর নির্লজ্জ আত্মস্বার্থচরিতার্থতার জমাট ফল। এর খেসারত দিতে হচ্ছে বর্তমান প্রজন্মকে। বিশ্বায়নের সুবিধা তাই আমাদের হলো না, আমাদের বরাতে জুটল কেবলই বঞ্চনা।

হরিণের বিপদ তার মাংসের স্বাদে। আমাদের বিপদও আমাদের সম্পদ ও স্বাধীনতার জন্য যেমন, এই স্বার্থপর দৌড়ের জন্যও তেমন। কিন্তু দেশের দিকে তাকিয়ে কি মনে হয় কোথাও পৌঁছানো যাচ্ছে? ভেতরে-বাইরে কোণঠাসা হয়ে উদ্ভ্রান্তের মতো চলছে দেশটা। কী ছিল আর কী হলো!
বাংলাদেশকে তাই খুঁজে বেড়াই। ‘সে কেবল পালিয়ে বেড়ায়, দৃষ্টি এড়ায়, ডাক দিয়ে যায় ইঙ্গিতে।’

* লেখাটি আজকের প্রথম আলোর সম্পাদকীয় পাতায় প্রকাশিত হয়েছে। ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/farukwasifblog/29038096 http://www.somewhereinblog.net/blog/farukwasifblog/29038096 2009-11-05 14:19:28
দৃকের ঘটনায় চীন বা তিব্বত নয়, সার্বভৌমত্ব প্রশ্নে মামলাটা সরকারের সঙ্গে
ঘটনা যে আকাশ থেকে পড়ে না তা তো আমরা জানিই। ল্যাম্পপোস্টকে ভারতীয় দূতাবাসের সামনে প্রতিবাদ করতে দেওয়া হলো না। অকথ্য জুলুম-নির্যাতন হলো। মার্কিন-ব্রিটিশ তেলকোম্পানির স্থানীয় এজেন্ট পেট্রোবাংলার সামনে প্রতিবাদ করায় বেদম পিটুনি খেতে হলো আনু মুহাম্মদসহ তেল-গ্যাস কমিটির অজস্র কর্মীকে। ফরহাদ মজহারের ঢাকা কাবে ঢুকতে না পারার বিরুদ্ধে তাঁর ক্ষোভ ও তাঁর লুঙ্গি পরাকে ‘মৌলবাদী’ বলে বদনাম দেওয়া হলো। সমুদ্রের গ্যাস ইজারার বিরুদ্ধে জনআন্দোলন থেকে শুরু করে গার্মেন্ট শ্রমিকদের ন্যায্য আন্দোলনকে সরকারের মন্ত্রীরা বললেন ‘ষড়যন্ত্র’। এখন দৃকের ফটকে তালা ঝুললো। এগুলো কীসের আলামত? এসবের যে কোনোটির সঙ্গে যে কারোরই দ্বিমত এমনকি বিরোধ থাকতে পারে, কিন্তু প্রহার করা, পা ভেঙ্গে দেওয়া কিংবা তাদের ঘরবাড়ি-প্রতিষ্ঠানে তালা দেওয়া, বদনাম দিয়ে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করা ফ্যাসিবাদী খাসলত। এইটা ভুললে চলবে না।

ঠিক যে চীন-ভারত বুঝা দরকার। তবে তার জন্য তিব্বত বা কাশ্মীর যাওয়ার দরকার নাই। দৃকে গেলেই চলতো। দৃক এলিট পেইন্ট না বার্জার পেইন্ট না রক্সি পেইন্ট সেটা পরের আলোচনা। এই দুইকে এক নিঃশ্বাসে করলে অনেক সময় কিংকর্তম্যবিমূঢ় হতে হয়। একাত্তরে অনেকে এরকম দশায় পড়েছিলেন।

আমাদের অধিকার রয়েছে ইরাক-আফগানিস্তান-ফিলিস্তিন বা তিব্বত-মণিপুর-কাশ্মীর কিংবা মাওবাদী-তালেবান কিংবা মার্কিন-ভারত-চীন বা ইসরায়েলের বা যে কারো পে বা বিপে মতপ্রকাশ করবার। কে ভুল বা কে সঠিক তা নিয়ে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর মধ্যে বিতর্কও চলতে পারে। এটুকু আইনী স্বাধীনতা নাগরিক অধিকারের গোড়ার শর্ত। এটুকু হলো পায়জামার ফিতা, এটা না থাকলে কোনো গেরো দিয়েই সংবিধানের লজ্জাস্থান ঢাকবার কোনো সুযোগই পাবে না বুর্জোয়া আইন ও নৈতিকতা। নাগরিকের বিবেকের জিম্মাদার রাষ্ট্র বা প্রতিষ্ঠান নয়, ব্যক্তি বা সমাজ স্বয়ং। এ চিন্তা ছাড়লে বিপদ।

কথা হলো, রাষ্ট্রযন্ত্র বলপ্রয়োগের মাধ্যমে একটি আলোকচিত্র প্রদর্শনী বন্ধ করে দিয়েছে। এর জন্য কোনো অজুহাত দেখানোরও দরকার মনে করে নাই তারা। ১৯৯৩ সাল থেকে অন্তত হাজার দুই প্রদর্শনী হয়েছে সেখানে। সারাদেশে অহরহই তা হয়ে আসছে। তবে কি সবই বেআইনী? পুলিশ না বললেও আমরা জানি, ভারতের সঙ্গে যে মৈত্রী চুক্তি করা হয়েছিল শেখ মুজিব আমলে, পরের সব সরকার যা নবায়ন করেছে এবং সংসদে যা বিধানের মর্যাদা পেয়েছে; সেখানে এরকম ধারা আছে যে, বন্ধুরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কিছু বলা যাবে না। আর কার সঙ্গে এরকম চুক্তি করা আছে কে জানে? এটা গেল একটা দিক।

মামলাটা তাই আগে রাষ্ট্রের সঙ্গেই মীমাংসা করে নেওয়া দরকার। এই রাষ্ট্র আজ সাম্রাজ্যবাদের আড়কাঠি বনে গেছে। একে মুক্ত করতে হলে জনগণের বিরুদ্ধে এর যে দাঁতনখ সেটাকে চিনতে হবে, ঠেকাতে হবে। রাষ্ট্রকে জনগণের অধীন করা ছাড়া বাইরের চাপ বা আঘাত কিছুই মোকাবেলা করা যাবে না। কারণ, টিকে থাকতে গেলে রাষ্ট্র প্রয়োজন। সেকারণেই তার ওপর নিজেদের অধিকার ও ক্ষমতাকায়েম ছাড়া উপায় নাই।

দৃক এখানে একাই ভিক্টিম হয়নি, ভিক্টিম হয়েছে স্বাধীন নাগরিক তৎপরতা। দৃক বা এর কর্ণধার শহীদুল আলমের পোস্টমর্টেম করে এ দিকটা ঢাকা যাবে না। বরং অবৈধ চাপের কাছে নতিস্বীকার না করে শহীদুল আলম রাষ্ট্রের অন্যায় ক্ষমতাপ্রয়োগকে উদোম করে দিয়েছেন। দালাইলামার নির্বাসনে যাওয়ার ছবি দেখানোর ইচ্ছা জেগেছিল যে ফটোগ্রাফারের, চাপের মুখেও তিনি তাঁর নাম-ধাম-নিবাসের তথ্য এসবি-কে দেননি। এটা যদি কৌশলী চালও হয়, সেটা তাঁরই বাহাদুরি। পুলিশের কর্ডনের মাঝখানে শহীদুল আলমের একা দাঁড়িয়ে থাকা এ ক্ষেত্রে আলোকচিত্রী, আলোকচিত্র এবং মতপ্রকাশের অধিকারের প্রতি পিতৃসুলভ দায়িত্বের পরিচয়ই মনে হয়। আর আমরাও জানলাম কোন ‘গণতন্ত্রের’ সামিয়ানা তলে আমাদের বাস।

কাশ্মীর বা মণিপুর বা আসামের স্বাধীনতা আন্দোলনে নানান শক্তির ‘হাত’ থাকতে পারে, কিন্তু মোটাদাগে এগুলো কারো পকেটের আন্দোলন নয়। কিন্তু দালাইলামা ভারতের পকেটে বসে আন্দোলন চালাচ্ছেন। সম্প্রতি তিনি ওবামার কাছে সাম্রাজ্যের কৃপা প্রার্থনাও করে এসেছেন। ভারতের অরুণাচলের ধর্মশালায় তাঁর আস্তানাটি আর কিছু নয় ‘র’ ও সিআইএ-র আখড়া। অর্থের যোগানও কম নয়। ধর্মশালার বিক্ষোভকে তিব্বতের রাজধানী লাসা’র বিক্ষোভ হিসেবে দেখানোয় সিএনএন-এর জারিজুরিও ফাঁস হয়ে গিয়েছে। তার মানে এই নয় যে, তিব্বতে চীন বর্বর দখলদারি বজায় রাখেনি। ঠিক ভারত যেমনটা করছে কাশ্মীরে-মণিপুরে।

দক্ষিণ এশিয়া উত্তপ্ত ও অস্থির হয়ে উঠছে। বাঙলাদেশেরো এক সীমান্তে চীন-মায়ানমার আর বাকি তিন দিকে ভারতের তুমুল উত্থান ঘটছে। বাংলাদেশ যেন আটকে পড়ছে এ দুটি পর্বতের মাঝখানের চিপা গিরিখাতের মধ্যে। দুটি চলন্ত জাহাজের মাঝখানে পড়া ডিঙিনৌকার মতো বাংলাদেশ উথাল-পাথাল দুলছে। বিশ্বের পরাশক্তিগুলো দুনিয়াকে নিজেদের মতো সাজাতে গিয়ে যুদ্ধের ঝড় জাগাচ্ছে, অর্থনীতিতে ঘটাচ্ছে ভূমিকম্প। এসবের ঝাপট আর কম্পনে আমরাও কম কাঁপছি না। ভারতীয় দূতাবাসের নির্দেশে নির্যাতিত ও বন্দী হওয়া ছাত্রছাত্রীরা কিংবা মার্কিন-ব্রিটিশ কোম্পানির স্বার্থে নিপীড়িত তেল-গ্যাস রা আন্দোলনের কর্মীরা সেই পরাকম্পনের আঘাত নিজেদের দেহে অনুভব করেছেন। দৃকের ঘটনায় চীনা ড্রাগনের হল্কাও টের পাওয়া গেল।

আর টের পাওয়া গেল যে, দেশ আর দেশ নাই। এইটা এখন প্রদেশ। প্রদেশের মেজাজ থেকে নয়, হবুচন্দ্র কি গবুচন্দ্র পরাশক্তির চাওয়া-পাওয়ার বাইরে এই দেশ, এর মানুষ এবং এর রাজনৈতিক গন্তব্যের নিরিখেই ঘটনার বিচার করা উচিত। যে চিন্তা ও তৎপরতা বাস্তব মানুষের স্বার্থের মধ্যে তার নোঙর পাতে না, তার সঙ্গে মরিয়ার্টি বা পিনাক বা কোনো চীনা অংবংচং-এর খুঁটির জোরে নড়া ছাগমন্ত্রীদের কী তফাত?

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/farukwasifblog/29037129 http://www.somewhereinblog.net/blog/farukwasifblog/29037129 2009-11-03 19:19:04
বাহের দেশের ভাওয়াইয়া নারীর ব্যথা কী মায়া না গাইলেন মাহুত রে'

প্রায় পিঠাপিঠি চারটি সিনেমা হল। চারটিতেই একযোগে নাইট শো ভাঙলে সাতমাথার মোড়টা অনেকক্ষণ গমগম করতে থাকে মানুষের ভিড়ে। যে যেদিকেই যাক, সাতমাথায় আসতেই হয়। তারা আসে খেলাশেষে স্টেডিয়াম থেকে বেরুনো মানুষের মতো। একটু আগে দেখা সিনেমাটি গরম চায়ের সঙ্গে মিশিয়ে না খেলে তাদের আশ মেটে না। সেটা মেটাতে আর দিনের শেষ আড্ডাবাজি সারতে বড়জোর আরও পনেরো মিনিট। রাত তখন বারোটা পেরোয়।

সাতটি রাস্তা যেখানে মিলেছে সেখানটায় চা-লাড্ডু-বনরুটি-পান-সিগারেটের দোকানগুলো ঘিরে কিছু লোক তার পরও খামোখা থেকে যায়। ঢাকা থেকে আসা যাত্রীদের ধরবে বলে পনেরো-বিশটা রিকশাও মোটামুটি জটলা পাকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। তাদের চালকেরা সাধারণত বগুড়ার পুবের যমুনার নদীভাঙা এলাকার কৃষক। লোকে বলে ‘পুবা’। বাদবাকিদের বেশির ভাগই রংপুর-কুড়িগ্রামের আধিয়ার। তখনো ঢাকার লোকেরা ‘মফিজ’ বলে এদের নাম ফাটায়নি। তবে তারা পরস্পরের ‘বাহে’, মানে ‘বাবা হে’। তাদের দেশ-গ্রামের পরিচয়ও নাকি ‘বাহের দেশ’।

যাত্রী না আসা পর্যন্ত এই বাহেরা রিকশার হ্যান্ডেলে পা, পিঁড়ির মতো সিট আর যাত্রীর আসনে শরীরটা এলিয়ে সটান শুয়ে জিরোয়। থানার দিকে যে রাস্তাটা গেছে তার গোড়ার ফ্রেন্ডস অডিওতে তখনই ফুল ভলিউমে বাজতে শুরু করবে বাবুল কিশোরের বিচ্ছেদী গান, ‘আমি কেমন করে পত্র লিখি গো’, কিংবা ফেরদৌসী রহমান কি আর কারও কণ্ঠে ভাওয়াইয়া, ‘ওকি ও বন্ধু কাজল ভোমরা রে’। এই মধ্যরাতে বিক্রিবাট্টার আশা না থাকলেও কী আশায় দোকান খুলে রেখে গানে গানে পত্র লেখা বা কাজল ভোমরার কথা বলে বোঝা ভার। হয়তো আমারই মনের খেয়াল, কিন্তু মনে হয় বিদেশ-বিভুঁইয়ে আছে বলেই ওরা এমন উতলা। ওদিকে ফেরদৌসী তাঁর পরমা গলায় গাইতে শুরু করেন—
‘ও কি গাড়িয়াল ভাই
কত রব আমি পন্থের দিকে চায়া রে\
যেদিন গাড়িয়াল উজান যায়
নারীর মন মোর বুরিয়া রয় রে\
ও কি গাড়িয়াল ভাই
কত কাঁদিম মুই নিধুয়া-পাথারে।
ও কি গাড়িয়াল ভাই
হাঁকাও গাড়ি তুই চিলমারীর বন্দরে।’

তারা কি তবে নিধুয়া-পাথারে হাহাকার করে বেড়ানো কোনো নারীর জন্য পথে পথে বাওকুংটা বাতাসের মতো ‘ঘুরিয়া ঘুরিয়া মরে’? যখন আর সে মৈষাল নয়, নয় গাড়িয়াল বন্ধু; সে যখন ওই গরু বা মহিষের ঢংয়েই দুই উরু আর পাছা নাচিয়ে রিকশা চালায়, তখন তার চ্যাংড়া মনে কিসের ফাপর গুমরে মরে কে জানে?
‘মইষ চড়ান মোর মইষাল বন্ধু রে
বন্ধু কোন বা চরের মাঝে
এলা কেনে ঘণ্টির বাজন
না শোনেঙ মুই কানে মইষাল রে।’
কৃষ্ণের বাঁশি শুনে নয়, গাড়িয়ালের গরুর গলার ঘণ্টি শুনে আকুল হয়ে বাড়ির বাহির হয় ভাওয়াইয়া রাধা। কিন্তু গাড়িয়ালের গাড়ি কি আর এ পথে আসে? মৈষাল গেছে সেই চেংড়িদের দেশে, যারা ‘জানে ধুলা পড়া’, যারা ‘ছল করিয়া কাড়িয়া নিবে/হাতের দোতরা মইষাল রে।’ এবং ‘সেই না দেশে পুরুষ বান্ধা/থাকে নারীর কেশে রে।’ কিন্তু আমাদের রাধাও কম যায় না। ওঝা যেমন সাপের বিষ ঝেড়ে নামায়, তেমনি ‘মুই অভাগী ঝারেঙ বন্ধুক/ক্যাশের আগাল দিয়া রে।’

বাহেদের পূর্বপুরুষ ছিল কৃষিসমাজের সবচেয়ে তলাকার মৈষাল-গাড়িয়াল—মূলত রাখাল। ভাওয়াইয়া গানের মর্মে যে বিরহ-বেদনার গল্প, তার নায়ক এই মৈষাল আর নায়িকা তার ‘যুবা নারী’। এরাই বাহের দেশের রাধা-কৃষ্ণ। তিস্তা বা ধরলা এদের যমুনা। নিধুয়া-পাথার এদের বৃন্দাবন, শিমিলা বৃক্ষ (শিমুল) এদের কদম, বগাবগি কিংবা ডাহুকডাহুকি এদের শুকসারি। আর চিলমারীর বন্দর এদের মথুরা। কৃষ্ণ যেমন মথুরায় গিয়ে আর ফেরে না, ভাওয়াইয়া নারী তার গাড়িয়াল বন্ধুকেও তেমনি হারায় চিলমারীর বন্দরে বা আরও ওপরে কোচবিহারের গোয়ালপাড়ায় কিংবা আসামের কামাখ্যা পাহাড়ে। কিংবা সে বান্ধা পড়ে ব্রহ্মপুত্র কি তিস্তার কোনো চরে জোতদারের বাথানে—
‘বাথান বাথান করেন মৈষালরে
মৈষাল, বাথান কইরচেন বাড়ি—
যুবা নারী ঘরে থুইয়া,
কায় করেন চাকিরি মৈষাল রে।...
বাথান ছারেক, বাথান ছারেক রে
ও মৈষাল ঘুরিয়া আইসেক বাড়ি,
গলার হার বেচেয়া দিম মুঞি
ঐ চাকিরির কড়ি মৈষাল রে।’
মৈষাল আর তার যুবা নারীর প্রেম-দাম্পত্য মিলনহীন। তারা যেন চিরবিরহী ডাহুক-ডাহুকি। সামন্ত সমাজে মৈষালের স্বাধীন কোনো ভূমিকা নেই। বাপ-ভাই আর স্বামীর শাসনে নারীটি অবরুদ্ধ। তার প্রেমিক পেটের টানে দূরের দেশে ঘোরে কিংবা আটকে যায় চাকরির ফাঁদে। এই করুণ জীবনের মর্মব্যথা ফুটে ওঠে আব্বাসউদ্দীনের গলায়—
‘ফান্দে পড়িয়া বগা কান্দেরে।
উড়িয়া যায়রে চকোয়া পঙ্খি
বগীক বলে ঠারে
তোমার বগা বন্দী হইছে ধর্লা নদীর পারে।
এই কথা শুনিয়া বগী দুই পাখা মেলিল—
ওরে ধর্লা নদীর পাড়ে যায়া দরশন দিলরে;
বগাক দেখিয়া বগী কান্দেরে
বগীক দেখিয়া বগা কান্দেরে।’

ভাওয়াইয়া নারী-পুরুষ এভাবে তাদের সমাজের বন্ধন আর জমিদারি শোষণের ফাঁদে বন্দী হয়ে পরস্পরের জন্য কাঁদে। কিংবদন্তির গণসংগীতশিল্পী হেমাঙ্গ বিশ্বাস লিখেছেন, ‘এইসব ছবি কালিদাসের বা রবীন্দ্রনাথের হাত থেকে কোনো দিনই আসতে পারে না।’ কারণ, ‘প্রকৃতির সঙ্গে দ্বন্দ্ব ও মিলনের সম্পর্ক যে জনসমাজের, তাদের কণ্ঠেই এই ধরনের গান জাগতে পারে।’ (গানের বাহিরানা) তাই ভাওয়াইয়া উত্তরের জনসমাজের জাতীয় গীত।

জনসমাজ বললে আসলে তেমন কিছু বোঝায় কি? আঠারো/উনিশ শতক পর্যন্ত বৃহত্তর রংপুর-দিনাজপুর-কোচবিহার অঞ্চলে ব্যাপক আকারে নতুন জনবসতি ও আবাদের পত্তন হতে থাকে। বন কেটে পতিত জমি হাসিল করতে গিয়ে কোচ ও রাজবংশী জাতিগোষ্ঠীর মানুষের সঙ্গে বাঙালি কৃষিজীবীরা একাকার হয়ে যায়। এদের বিরাট অংশ মুসলমানও হয় (রিচার্ড ই ইটন, রাইজ অব ইসলাম ইন বেঙ্গল ফ্রন্টিয়ার)। রাজবংশী ও কোচ সমাজের কৌম জীবনের ছাপ তাই ভাওয়াইয়া গানের পরতে পরতে। সংস্কৃতির ভেতর সমন্বয়ের মধ্যে সংঘাতের লক্ষণগুলো চামড়ায় বসন্ত দাগের মতো এখনো ধরা পড়ে। মৈষাল, গাড়িয়াল বা মাহুতের স্বাধীন বিচরণের আকাঙ্ক্ষা আর দরিদ্র কৃষক-কন্যার প্রণয়-প্রতিবাদ সেই ইশারাই করে।

এক নদীতে কয়েকটি স্রোতের মধ্যে একটি যেমন প্রধান, ভাওয়াইয়ার আবহে নারী-মনের বাসনা-বেদনা-বিদ্রোহ তেমনই এক প্রধান স্বর। নারীর এই নিরন্তর আকুলতাই ভাওয়াইয়া গানের প্রাণভোমরা। তাদের মনে তখনো কৌম সমাজের সাম্য ও প্রকৃতিবাসের টান ফুরায়নি। গণনাট্য সংঘের অন্যতম প্রাণপুরুষ হেমাঙ্গ বিশ্বাস মনে করেন, নারীর স্বাধীন প্রেমকে রক্ষণশলীতার নিগড়ে বাঁধার চেষ্টা হলে ভাওয়াইয়া নারী তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। বাপ-ভাই যখন তাকে বাল্য বয়সে স্বামী নামক এক অচেনা লোকের কাছে টাকা নিয়ে বিয়ে দেয়, সেই অভাগিনী তখন বাবা-ভাই ও সেই স্বামীকে ক্ষমা করে না। মন পোড়ে তার বগার জন্য, মৈষাল বা গাড়িয়াল বন্ধু বা প্রেমিক কাজল ভোমরার জন্য। মদাসক্ত স্বামীর অত্যাচারে জর্জরিত এই নারীর আশ্রয় তখন চ্যাংড়া দেবর।
‘ও মোর ভাবের দেওরা
থুইয়া আয় মোক বাপ ভাইয়ার দেশে রে
বাপ ভাই মোর দুরাচার
বেচেয়া খাইছে মোক দুরান্তর রে
বেচেয়া খাইছে মোক মদকিয়ার ঘরেরে।’
তার কাছে, ‘স্বামী আমার যেমন তেমন/দ্যাওরা আমার মনের মতোন/দ্যাওরা মরলে হবো পাগল, হবো দেশান্তরী রে’। তার এমন প্রণয়ই তার প্রতিবাদ। সমাজপতিদের চাপে তার আপনকীয়া প্রেম যেখানে অবরুদ্ধ, সেখান থেকেই তা পাহাড়ের তলার ঝরনার মতো পরকীয়া প্রেমের খাতে বইতে শুরু করে। তার আপনকার প্রেমের কথাই সে বলে রাধা-কৃষ্ণের বরাতে। কিন্তু তার এই প্রেম রাধা-কৃষ্ণের লীলা নয়, এ তার ব্যক্তিগত ‘সোনার চান্দ’কে পাওয়ার বাসনা। আমরা দেখব, কৌম সমাজের আপনকীয়া প্রেম যখন নিয়ম ও শাস্ত্রের চাপে আর প্রকাশিত হতে পারছে না তখন তার প্রেমিক কালা হয়ে যায় কৃষ্ণ, আরও পরে প্রেমিক কৃষ্ণ প্রভু কৃষ্ণে রূপান্তরিত হন। কিন্তু ভাওয়াইয়া নারীর প্রেম নিজেকে বদলাতে অস্বীকার করে। তার মৈষাল তার আপনকীয়াই, পরকীয়া নয়। কীর্তন-পদাবলি ইত্যাদির সঙ্গে এখানেই তার তফাত। এ পার্থক্য কেবল সুরে বা ভাষায় নয়, এখানেই ভাওয়াইয়া নারীর নিজস্ব স্বর ও আবেগের বিশিষ্ট গড়নটিকে প্রেমের অন্যান্য আখ্যান থেকে আলাদা করা যায়।

দুই.
ভাওয়াইয়ার সুর-কাঠামো আধুনিক গান তো বটেই ‘লোকগীতি’র অন্য অন্য ধারা থেকেও আলাদা। অনেকে একে আর্য ঘরানার বাইরে অনার্য বাহিরানা হিসেবে চিনতে চান। লালনের গান বাউলে গাইলে এক রকম, ভাটিয়ালির ঢংয়ে গাইলে এক রকম আর রাবীন্দ্রিক ভঙ্গিতে গাইলে আরেক রকম। মনের ভাব প্রকাশেও পার্থক্যটা স্পষ্ট। রবীন্দ্রনাথ যদি বলেন, ‘আমার মন কেমন করে’, ভাওয়াইয়া নারী বলবে, ‘সোনা বন্ধু বাদে রে কেমন করে গাও রে’। প্রেয়সীর বর্ণনায় রবীন্দ্রনাথের ‘তুমি সন্ধ্যার মেঘমালা’ হলে ভাওয়াইয়া বলবে, ‘তুই কালা যেমন দান্তাল হাতি/মুঞিও নারী তেমন ভর যুবতীরে।’ এমন জীবন্ত আর মন-দেহের সপ্রাণ প্রকাশে কীর্তন বা বৈষ্ণব গানের কৃষ্ণের দেহজ কামের বর্ণনাকেও পানসে মনে হতে পারে। ভাব প্রকাশের সকল উপাদান ও রূপক কর্মের আর চারপাশের দেখা জগত্ থেকে নেওয়া। বিমূর্ততার কোনো সুযোগ সেখানে নেই।
বাহের দেশের প্রকৃতি চড়া সুরে বাজে। এই গান মানব-মানবীর ভাবাবেগকে প্রকৃতির উচ্ছ্বাস দিয়েই বোঝে। নিধুয়া-পাথারের রুক্ষতা আর তিস্তা বা ধরলার খরস্রোতের মতোই তাদের জীবন। প্রকৃতির লীলার মধ্যেই তারা তাদের জীবনের অর্থ ও মনের ভাষা খুঁজে পায়। মানবশরীর আর প্রকৃতিশরীরের আলোড়ন-বিলোড়ন ছাড়া কিছুই প্রকাশ হতে পারে না সেখানে। হয়তো তাদের মধ্যে তখনো শরীর আর মনের ভেদ জাগেনি। এ দুয়ের টানাপোড়েনে ভোগা বা এদের শাসন করার ধাত তাদের নয়।

তিন.
একটি প্রশ্ন তার পরও উঠতে পারে: গানের কল্পনা আর জীবনের বাস্তবতার মধ্যে কি কোনো যোগাযোগ ধরতে পারা সম্ভব? জীবনের কোন অভিজ্ঞতা থেকে আসে এই আবেগ, কীসে গড়া হয় ভাবনার ভুবন? দিগন্তে যেভাবে আকাশ আর মাটিকে মিলতে দেখেও সেই মিলন অধরা রয়ে যায়, শিল্প আর জীবনের সম্পর্কের সুতাটিও কি তেমনই অধরা? গীতিকার সুরকার আব্দুল লতিফের আত্মজীবনীতে বলা একটি ঘটনায় সেই সুতার একটা প্রান্ত যেন সহসা মিলে যায়। সেই গল্প দিয়েই শেষ করি: ভাষা আন্দোলনের পরে আব্দুল লতিফ হুলিয়া মাথায় পালিয়ে গিয়েছেন দক্ষিণাঞ্চলের এক গ্রামে, বন্ধুর বাড়িতে। গ্রামের সম্পন্ন কৃষক পরিবার। আদর-যত্নের কমতি নেই। কিন্তু বিড়ম্বনা শুরু হলো সেই বাড়ির পরিচারিকা মেয়েটিকে নিয়ে। চৌদ্দ-পনেরো হবে বয়স। দিনের বেলা সেবা-যত্ন যা করার করে, কিন্তু রাতে সে তাঁর ঘরে শুতে আসে। হাত-পা টিপে দিতে চায় ইত্যাদি। এহেন দশায় পড়ে তিনি ধরলেন শিল্পী বন্ধুকে। বন্ধু ততোধিক বিব্রত হয়ে যে ব্যাখ্যা দেন তা অনেকটা এ রকম। ওই অঞ্চলের রীতি হলো, অতিথি এলে বাড়ির ‘দাসী-বাঁদীদের’ দিয়ে তাঁকে খুশি রাখতে হয়। লতিফ সাহেব তারপর মেয়েটির সঙ্গে কথা বলেন এবং জানতে পারেন তার বাড়ি রংপুরে। খুবই গরিব তারা। বাপ-ভাই তাকে এক রকম বেচেই দিয়েছে এদের কাছে। বলতে বলতে মেয়েটি কাঁদে।

মুস্তাফা জামান আব্বাসীর সম্পাদনায় প্রকাশিত ভাওয়াইয়া গানের সংকলন ভাওয়াইয়ার জন্মভূমি বইয়ে একটি গান দেখে চমকে উঠি। মনে হয় এটি যেন সেই মেয়েটিরই দুর্বিষহ জীবনের কথা—যা কাউকে বলা যায় না, এমনকি মাকেও না। গানটিতে এক অভাগিনী নারী বলছে—ও কাক তোমার হাতে আমি এই চিঠি তুলে দিলাম। তুমি এই চিঠি মাকে দিও। কিন্তু মা যখন জলের ধারে যাবে, তখন এ চিঠি দিয়ো না, মা জলে ঝাঁপ দিয়ে মরবে। মা যখন ভাত রাঁধে তখনো দিয়ো না, তাহলে মা অনলে ঝাঁপ দেবে। যখন মা শাড়ি পরবে, তখনো না, মা তাহলে সেই শাড়ি দিয়ে গলায় ফাঁস নেবে। গানটির শেষে মেয়েটি বলছে—
‘যখন মাও মোর নিদ্রারে যাইবে
পত্র থুইবেন কাগা সিথানের পরে
ওকি কাগা দেইখবে মাও মোর সকালে উঠিয়ারে।’
গানের সুরে ও ভাষায় এক বিষাদসিন্ধুর কলকল ধ্বনি কি আমরা শুনতে পাচ্ছি? আব্দুল লতিফের বর্ণিত কাহিনীর মেয়েটিই যেন লিখেছে ওই চিঠি?
শিল্প ও জীবন হয়তো কোথাও মিলে আছে আমাদের অগোচরে; এমনকি ইতিহাসও। বাংলার লোকগীতি আসলে বাংলার পল্লী পরিবেশে বয়ে যাওয়া কৃষক জীবনের আখ্যান, আঞ্চলিকতার খোপে খোপে বেড়ে ওঠা এই ভূখণ্ডের মানবিক ইতিহাস। সেই মানুষের আদমসুরত ওখান থেকেই এঁকে নেওয়া সম্ভব। আমাদের নিম্নবর্গীয় সমাজের লিখিত সাহিত্য নেই বললেই চলে। যা আছে তা তাদের নিজস্ব লিখন নয়। একমাত্র লোকগান-লোকসাহিত্যই সেই আধার, সেখানে তাদের আনন্দ-বেদনা, আশা-আকাঙ্ক্ষা-স্বপ্ন-ভালোবাসার খাঁটি বয়ান আমরা শুনতে পারব। পাব সেই দেশজ মনের খোঁজ যা হয়তো বিদেশি শাসনে, নানান বিপরীত সাংস্কৃতিক চাপে নিজেকে হারিয়ে ফেলেনি, বিকৃত হয়নি। আমাদের যৌথ মনের শৈশব জানতে তার কাছে তাই ফিরতেই হয়।

বাহের দেশ দূরের কোনো অঞ্চল নয়, কুড়িগ্রামের সীমান্তে তিস্তা, ধরলা আর ব্রহ্মপুত্রের মাঝখানে আড়াই হাজার বছর পুরোনো চিলমারীর বন্দর আজও আছে। সেই বন্দরে এখনো অজস্র দেশি নৌকা ভেড়ে। তার পরও চিলমারীর পথে-বন্দরে পা রেখে মনে হয় সেটা যেন অন্য কোনো জগত্, অন্য কোনো সময়। তার বাস যতটা বাস্তবে মনের গভীরেও ততটাই। গাড়িয়াল-মৈষাল-মাহুত বন্ধুরা সেখান থেকে আর ফিরতে পারে না। ভাওয়াইয়া নারী তার কাছে কিরা কাটে, ‘কোন দিন আসিবেন বন্ধু কয়া যান কয়া যান রে’। কিন্তু সে ফেরে না। কারণ, ‘মইষের চাকরির ভীষণ দায়, মনের বাঘ মইষালক ধরিয়া খায় রে’।

পিছুডাক মৈষালকে ছাড়ে না। সময়ের খাদ থেকেও কে যেন ফের জিজ্ঞেস করে, ‘ও তোমরা গেলে কি আসিবেন, আমার মাহুত বন্ধুরে।’ ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/farukwasifblog/29034680 http://www.somewhereinblog.net/blog/farukwasifblog/29034680 2009-10-30 16:20:20
ইসলাম, সম্প্রদায় ও পরিচয় বিষয়ে দশটি নোক্তা
২. ভারতে বিজেপি বা জার্মান নাৎসিরাও কিন্তু ক্যাথলিসিজম ও আর্যবাদের মিশ্রণে ফ্যাসিবাদের আদর্শিক ভিত্তি নির্মাণ করছিল। শিল্পায়ন ও তার ভিতের ওপর দাঁড়ানো সামরিক সক্ষমতা তাদের অভিলাষী করেছিল। আমেরিকায় বা ইউরোপের বাকি অংশে এটা এখনো কঠিন। তিনশ বছরের মানবতাবাদী সংগ্রাম, শ্রেণী সংগ্রাম ও পুরুষতন্ত্র ও বর্ণবাদবিরোধী ঐতিহ্য। ভারতেও একইসঙ্গে উপমহাদেশের সবচে শক্তিশালী গণতান্ত্রিক চেতনা আছে আবার এই ভারতই এখন ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িক ঘৃণার শক্ত আশ্রয়। ইসলাম বাংলাদেশে মেইনস্ট্রিমে নাই, ভারত-পাকিস্তানে আছে।

৩. পশ্চিমা এলিট এমনকি গরিবদেরও আত্মপরিচয় নিয়ে সংকট এখনো জাগে নাই। সেখানকার গরিব ও কালো মানুষটিও সভ্য দুনিয়ার অহংকার আর ক্রাইস্টের ছত্রছায়া অনুভব করে জাতগর্ব উপভোগ করে। এই মনের জোর বাদবাকি বিশ্বে নাই তাদের মাজার জোর কম থাকার জন্য। । ফলে তাদের হয় জাতি বা ধর্মের কাছে ফিরতে হয় অথবা এসব ছেড়ে কাল্পনিক বিশ্বজনীনতার নামে সাদা-জুডিও-খ্রিস্টান-সাম্রাজ্যের মাস্তুলে লটকে থাকার নিয়তি নিতে হয়। তারা ইতিহাস-ভূগোল ও সংস্কৃতি থেকে বিতারিত বা পরিত্যক্ত হয়। আমাদের সুশীল সেকুলারদের বড় অংশই এই পথ ধরেছেন। মধ্যবিত্তের 'আধুনিক' অংশ কর্পোরেট পুঁজি ও তার বাজারের মধ্যে এতই আত্তীকৃত হয়ে গেছে যে, এদের কোনো প্রতিবাদ করার মতাই নাই। এরা বরং দেশ ছেড়ে যাবে অথবা দেশে মার্কিন বাহিনীকে স্বাগত জানাবে। এ অংশটির সুবিধাবাদীতাই তাদের ধর্মীয় বা সেকুলার পথে সংগ্রামী হতে বাধা দেবে।

৪. অন্যদিকে জামাতি ইসলাম বা ব্রাদারহুডের মতো যারা তারাও এক প্রতিক্রিয়াশীল বুর্জোয়া ইসলামকে বিকশিত করছে। এদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক ভিশন এটা প্রমাণ করে। এরা মোটাদাগে পরাশক্তি ও দেশীয় শাসকদের সঙ্গে কোলাবরেশন করে ক্ষমতা বাড়ায়। এমনকি আমিনী গংও কিন্তু এখানকার বিত্তবানদের মধ্যেই পড়ে। আর অন্য একদল আছে রাজনীতিতে যারা কৃষক-সামন্ত ইসলামের প্রতিভূ। এরা অবক্ষয়শীল আবার চরম শোষিত। প্রায়শই এরা কোনো গোপন বা প্রকাশ্য খুঁটি এমনকি আইএসআই-র-সিআইএ-মোসাদ এদের হাতিয়ার হয়, জেনে না জেনে। আবার এদের শ্রেণী থেকেই কিন্তু ভারতে মাওবাদীরা আসছে। বাংলাদেশে শ্রেণীসংগ্রাম তীব্র হলে এই শ্রেণীর একটা লড়াকু ভূমিকা পাওয়া যাবে। জেএমবি যারা গঠন করে তারা এদের এই প্রবণতাকেই এক্সপ্লয়েট করে এবং ধ্বংস করে।
কার্যত অধিকাংশ মাদ্রাসা ছাত্র মানবতের জীবন-যাপন করে। সবকিছু থেকে বঞ্চনার পর ধর্ম ছাড়া তাদের আর কিছু থাকে না। তারওপর তাদের একটা গহ্বরের মধ্যে আমরাই তো আটকে থাকতে দিয়েছি। তাদের সুপ্ত শ্রেণীক্রোধ বিকৃতপথে জেহাদের মধ্যে ভাষা খুঁজে পায়। এইটুকু না থাকলে তারা নিজেকে মানুষই বলে গণ্য করতে পারতো না। মানুষ হওয়ার পর তারা দেখে কিছুই তাদের নয়। তখন যা কিছু তাদের নয়, তাকে তারা ঘৃণা করতে শেখে। তাই তাদের বিপক্ষে চালনা করা কারো কারো জন্য সম্ভব হয়।

৫. বাংলাদেশে রাজনৈতিক ইসলামের প্রধান ধারাটি মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত নির্ভর। জামাতের বেশিরভাগও অ-মাদ্রাসায় শিক্ষিত। এরা সুবিধাবাদী ও সংস্কারবাদী। তাদের মধ্যপন্থায় নিজেদের মতো মডার্নিটি সৃষ্টি করতে চায়। বিশ্বায়ন পরবর্তী আত্মপরিচয় সংকটও এদের ইসলামের দিকে ঝুঁকিয়েছে। ধর্মের বৈষয়িক ভিত সরে যাওয়ায় রাজনীতির মাধ্যমেই সে আবার নিজেদের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। রাজনীতি ছাড়া তা সম্ভবও নয়। এটা সকল ধর্মের বেলাতেই কমবেশি সত্য।

৬.এদেশের লোককে ধর্মভীরু বলে আসলে কী বোঝানো হয়? তাহলে তো শরিয়াই কায়েম হতো। এই বলাটাও ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার। ধর্মভীরু জনগণ কার্টুন বা ভাস্কর্য নিয়ে মাতে নাই। এটা যারা বলে তারা একদিকে মানুষের ধর্মবিশ্বাসকে তোয়াজ করে ধর্মের ভয় দেখিয়ে নিজেদের কোনো কার্যসিদ্ধি চায়। বরং নিম্নবর্গের ধর্মচর্চা অপ্রাতিষ্ঠানিক ও খোলামেলা হওয়ায় তা মানবিক সংস্কৃতিতে বাধ সাধে না। উচ্চবর্গ জ্ঞান, বিত্ত, অবস্থান সবকিছুকেই সামাজিক-সাংস্কৃতিক পুঁজি বানিয়ে নিজেদের ক্ষমতায়ন ঘটায়। ধর্ম তাদের বাহন। উভয়ের ধর্মবোধ আপাতভাবে মিললেও বাস্তব মতাদর্শিক সংগ্রাম জারি থাকলে তার মধ্যে ভেদ আনা সম্ভব।


৭. সত্তর আর আশির দশকে ইসলামের দুটো সংস্করণ হয় : মৌলবাদী আর লোকায়ত। আবার তাদের প্রয়োজনেই আজকে তা ইসলামো-ফ্যাসিস্ট আর মডারেট ধারায় বিভাজিত। সবই তাদের লীলা। অথচ বিশ্বের একমাত্র আত্মস্বীকৃত ধর্মরাষ্ট ইসরাইলকে বর্ণবাদী ও ফ্যাসিস্ট বলা যাবে না। তাকে রার বুশীয় দাপট, তার প্রতি পাশ্চাত্য সিভিল সমাজের বড় অংশের সমর্থন কোনো সাম্প্রদায়িকতা নয়? হলিউডি সিনেমায় অজস্র ক্রুশের ব্যবহার থেকে শুরু করে মার্কিন সমাজে পাদ্রীদের প্রাধান্য কখনোও বিবেচিত হবে না রক্ষণশীলতা বলে। বুশ বা গোর বা ওবামার মুখে 'দুনিয়ায় ঈশ্বরের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা সম্ভব' কথা এলেও তাদের সেকুলারিজমের সতীত্ব যায় না। বৈশ্বিক পোপতন্ত্রকে বলা যাবে না প্রতিক্রিয়াশীলতার দুর্গ। (ভাগ্যিস মুসলিমরা এরকম কোনো বৈশ্বিক ধর্মতাত্ত্বিক ঘাঁটি এখনও বানাতে সম হয়নি। তাহলে তাদের যাত্রা আরো দূর অস্তই হতো কেবল) আর হিজবুল্লাহর মতো জাতীয়তাবাদী, দেশপ্রেমিক দলকে বলা হবে ধর্মীয় সন্ত্রাসী। আমাদের বিবেক হিজবুল্লাহ বা হামাসের প্রতিরোধে সামিল হতে চায়, কিনতু চিন্তা বলে, ‘ও তো মৌলবাদী’। ঔপনিবেশিক ঠুলি পড়া চোখে আমরা কেবল তাদের দাড়ি বা টুপিই দেখি। যে সেক্যুলার বাস্তব জাতীয় সংগ্রামের মাটিতে তাদের পা পোঁতা সে জমিনে আমাদের নজর পড়ে না। লেবাননি প্রতিরোধ ধর্মীয় জেহাদ নয়, তা জাতীয় প্রতিরোধ। যদিও এ ফেকড়া তুলেই পশ্চিমা মিডিয়া ঔপনিবেশিক শিায় শিতিদের প্রতিবাদস্পৃহাকে আধুনিকতার আংটা দিয়ে লটকে রাখে শূণ্যে। জনগণের ফরিয়াদকে যদি আমরা ধর্মের জিম্মায় রেখেই খুশি থাকি, তবে জনগণ ‘মৌলবাদের’ দলে গেলে আমাদের আপত্তি থাকবে কেন? জনগণের দায়িত্ব কী চেতনায় আর কী আমলে আমরা নিচ্ছি?

৮. বৈশ্বিক মিডিয়া-এনজিও ও ইঙ্গ-মার্কিন-ইসরায়েলি-ভারতীয় মিডিয়া মিলে ইসলাম> নিরাময় অযোগ্য অসুখ> জঙ্গও> জনসংখ্যা সমস্যা> প্রগতি ও গণতন্ত্রের বাধা = বিশ্বসমস্যা; এরকম এক সমীকরণ প্রচারের মাধ্যমে অনেকটুকু প্রতিষ্ঠা করতে সম হয়েছে। সেই কার্য যেভাবে কারণ জন্ম দেয় সেভাবে এদের ইন্ধনে যেমন আল কায়েদা-তালেবান তৈরি হয়েছে, তেমনি তৈরি হচ্ছে হুজি-জেমমবি-লস্কর ইত্যাদি। এভাবে মুসলিমপ্রধান দেশগুলোকে অস্থির, হীনম্মন্য, আত্মদ্বন্দ্বে দীর্ণ এবং কাবু রাখার ফাঁদ সক্রিয় আছে। এর বিপরীতে আরেক জিঘাংসার রস চোঁয়াতে দেখি আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে। আরবের প্রতিরোধ দেখিয়ে বঙ্গীয় প্রাতিষ্ঠানিক ইসলাম,তথা শরিয়াবাদীদের উত্থানকে মজলুমের উত্থান বলে চালাবার চেষ্টাও দেখি। বুঝি যে, একাত্তরের প্রত্যাঘাতের জমিন তৈরি চলছে।

১০. ইসলাম নামক জুজুর ভয় যে প্রায়শই তা ইহুদী-বিদ্বেষের মতো জায়গায় চলে যায়, তা নিয়ে হুশিয়ার হওয়া দরকার। বুশের ডকট্রিন বা ক্ল্যাশ অব সিভিলাইজেশন তত্ত্বের দিন শেষ হয়নি। সেকারণেই ইরাক-আফগানিস্তান-সোমালিয়া-গুয়ানতানামো প্রভৃতির মধ্যে মুসলিম হলোকস্টের পদধ্বনি কিন্তু শোনা যাচ্ছে। এর বিরুদ্ধে এখনই সচেতন না হলে রমা রঁল্যারা যে ফাঁদে পড়েছিলেন সেই ফাঁদে আমাদেরও পড়তে হবে।

১১. মুসলিম দেশগুলো আসলে সাবেক উপনিবেশিত এবং বর্তমানে নয়া উপনিবেশবাদের প্রত্য শিকার বা দখলাধীন দেশ। এদের শাসকরা দুনিয়ার নিকৃষ্ট গোছের (জাতীয়তাবাদী তুরস্ক-ইরান বা মিসরের নাসের এরকম কিছু ব্যতিক্রম বাদে)। এদেও সমাজে শিল্পায়ন ও ভূমিসংস্কার এবং সার্বজনীন সেকুলার শিক্ষা না আসার সব কুফলই প্রায় পেকে গেছে। এখানে বাইরে থেকে আঘাত করলে সংগ্রামের রক্ত বরং পুঁজ হয়ে বেরুবে। একদিকে ভেতরের সাংস্কৃতিক সামাজিক সংগ্রাম অন্যদিকে রাজনীতিতে কৃষক-শ্রমিক-মধ্যবিত্ত-আদিবাসী-নারী জনসমষ্ঠির জাতীয় সংগ্রাম প্রয়োজন। দরকার বিউপনিবেশন আর রাজনীতিতে বিকেন্দ্রীকৃত সংগ্রামী ক্ষমতার গঠন।

*** কোনো ধর্মই তার নিজের গুণে বা গ্রন্থের জোরে বলবান এই বিশ্বাসও একধরনের অলৌকিকতায় বিশ্বাস। বরং তা সমাজ-ইতিহাস-স্বার্থ ও মনোজগতের জটিল বিন্যাসে সক্রিয় থাকে। বাস্তবের ভাল-মন্দ প্রয়োজনই তা মেটায়। তাই ধর্মীয় জগতের সমালোচনাকে শেষপর্যন্ত বাস্তবজগতের সমালোচনা হিসেবে দাঁড় করাবার প্রয়োজন থেকেই যায়। এবং ঐ বাস্তবের মধ্যেই খুঁজতে হয় তার শেকড়বাকর; বেদ-কোরান-পুরান-টেস্টামেন্টের পাতায় বা কোনো বিশ্বাসীর মনের জটিল গুহায় অভিযান চালাবার পথ অনেকসময়ই সর্পকে রজ্জু আর রজ্জুকে সর্প ভ্রমে গিয়ে দাঁড়ায় কিংবা আপন লেজ গিলবার মতো বিপদে গিয়ে শেষ হয়।

*লিখতে গিয়েছিলাম মন্তব্য হয়ে গেল এই জিনিস। ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/farukwasifblog/29030483 http://www.somewhereinblog.net/blog/farukwasifblog/29030483 2009-10-23 11:25:20
রসু খাঁ চরিত ১ : যদি সে আমাদেরই লোক...
১. রসু খাঁ এভাবে এমনিতেই কাবু নৈতিকতার এই পুরুষালি সমাজের অনৈতিকতার বিষবটিকা হিসেবে হাজির হয়েছে। শয়তানের বিপরীতে যেমন দেবতারা পূজিত হন, রসু খাঁ-র বিপরীতের তেমনি আদর্শ হবেন তারা, যারা রসু খাঁ নন। তাকে ঘৃণা করে নীতির মেরুদণ্ডকে পোক্ত করার এই সুযোগ কে ছাড়ে? আইন তাকে শাস্তি দিয়ে মহিমান্বিত হবে। পুলিশ পাবে বাহবা, মিডিয়া পাবে জনমত গঠনের শিরোপা। তাকে শাস্তি দিয়ে আইন ‘অশুভ’কে কোরবানির মহিমা নেবে। নৈতিক পরিতৃপ্তির ঢেকুর উঠবে সমাজের চিকন ও ফোলা সব উদরে। এর মাধ্যমে সবকটি প্রতিষ্ঠান ও সমাজের প্রায় সকল অংশ রসু খাঁর বিরুদ্ধে নিজেদের মধ্যে গভীর বন্ধন অনুভব করবে এবং তার শাস্তিদান প্রক্রিয়ায় একজোট হবে। রসুহীন সমাজ হবে আগের থেকে ‘মানবিক’। এক রসু খাঁ তার ‘ভয়াবহ চরিত্র’ দিয়ে, তার বিরুদ্ধে ঘৃণার গ্রহীতা হিসেবে বাদবাকিদের শুদ্ধি ঘটাবে। কিন্তু তার পরেও পুরুষরা নিরাপদ পুরুষ হবে কি? নারীরা পাবে কি অধিকতর নিরাপত্তা? নাকি রসু খাঁ ঢাকাবাসীর ভূমিকম্পের ভয়ের মতো অচেতন ভয় হিসেবে কাজ করে যাবে?

কিন্তু আমি তাকে আলাদা ভাবতে পারছি না। একাত্তরের জেন্ডারসাইডের ভূমি কিন্তু এই বাংলাদেশী সমাজই। দিনের পর দিন এর থেকে ভয়াবহ খুন-ধর্ষণ চালানো রাজাকারেরা, দিনের পর দিন পরিকল্পিতভাবে ক্রসফায়ার করে চলা বীরেরা, টর্চার সেলে বীভৎস অত্যাচার চালনো ব্যক্তিরা, ২০০১ সালে অজস্র সংখ্যালঘু পরিবারে খুন-ধর্ষণ-পোড়ানোর নায়কেরা। পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিবাসী গ্রাম জ্বালিয়ে-কুপিয়ে গণহত্যা করা সেটলার ও সেনাবাহিনীর বীরপুঙ্গবেরা। পিলখানা হত্যাযজ্ঞের ঘাতক এবং এখন প্রায় প্রতিরাতে পিটিয়ে সেপাই মারার হোতারা, প্রতিটি বড় রাজনৈতিক দলের পোষা কিলার ও তাদের গডফাদাররা এবং মাফিয়া ব্যবসায়ীরা, কোথায় রসু খাঁ’র থেকে আলাদা? প্রেমের অভিনয় সাজিয়ে গোপনে ভিডিও করে বাজারে ছাড়ার ব্যবসা তো বিকারহীন ভাবেই চালায় অনেক পুরুষ, অপমানে কতজন নারী আত্মহত্যা করেছে তার সংখ্যা কখনো না গুণেই। এদের সিরিয়াল অপরাধের পেছনে মদদ থাকে, আইন থাকে, রাষ্ট্রীয় ছাড়পত্র থাকে, থাকে রাজনৈতিক বা আদর্শিক অজুহাত এবং কখনো কখনো মুনাফা ও সম্মানও। এসব অপরাধের নৈতিক ও আইনী চাপ শেয়ার করার জায়গা আছে বলে, এগুলো মিডিয়ায় জঘন্য-বিকৃত অপরাধ হিসেবে চিত্রিত হয় না বলেই কি এদের অপরাধ রসু খাঁ-র থেকে কম? এদের যে কারো আঘাত করবার মতা রসু খাঁর থেকে বেশি, অপরাধের রেকর্ডও অনেক গুণ বেশি। এরাও রসু খাঁর মতো চরম অপরাধ করে এসে নির্বিকারভাবে স্ত্রী-পুত্র-কন্যার প্রতি দায়িত্ব পালন করে যায়। পাথরে চুমা দিয়ে পাপ রেখে আসা, আর শয়তানের মিনারে ঢিল ছুঁড়ে পুণ্যবান হওয়ার এই অভিনয়, অপরাধীকে আমাদের বাইরের কেউ কল্পনা করে খুশি থাকার এই আত্মতৃপ্তি, রসু খাঁকে বিকারগ্রস্থ আর আমরা সবাই সুস্থ এই বিজ্ঞাপনের শান্তি আমরা নিতে পারি না। বিকার ও পাপ সব তলার নিম্নবর্গীয় বৃত্তে, যত ওপরে তত মধু আর আলো এই শ্রেণীগত বায়াস তো রসু কাহিনীর পরতে পরতে ছড়ানো।

রসু খাঁ-র লাভ এন্ড হেট-এর সমীকরণ আমাদের মধ্যে, বাকিসব পুরুষের মধ্যেও কি ক্রিয়াশীল নয়? নারীকে ডাকিনী ও দেবীর মধ্যে ভাগ করে ঘৃণা ও ভালবাসার ব্যায়াম আমাদের মনও করে না কি? রসু খাঁর বেলায় এই ভারসাম্য ভেঙ্গে গেছে এবং পুরুষের যে মূর্তি বেরিয়ে গেছে, তা কি তার মধ্যেই সুপ্ত কিন্তু সম্ভাবনাময় প্রবণতা নয়, যাকে আমরা যুদ্ধ-দাঙ্গা ইত্যাদির মধ্যে পূর্ণ রূপে আর আপাত শান্তিকালীন সামাজিক লেনাদেনার মধ্যে কম-বেশি ঘটতে দেখি না? রসু খাঁ যা করেছে যা আর কেউ কদাচ করেনি_ কম বা বেশি মাত্রায়?

না, আমি তার অপরাধের ভয়াবহতাকে খাটো করে দেখছি না। বরং ভয়াবহতাটা যে আরো ছড়ানো ভাবেই বিদ্যমান_ নারীর বিরুদ্ধে বলি, যাবতীয় অধস্তনতার বিরুদ্ধে বলি, এবং তার বিশেষ বিশেষ ছবি-ই কেবল আমাদের মিডিয়া-মারফত-জানাবুঝা অভিজ্ঞতায় ধরা পড়ে, বাকিটা আমরা ভুলে থাকি। তাই আরামে থাকি। কিন্তু কোনো প্রায় অসম্ভব, অদ্ভুত ও অসহ্য পরিস্থিতিতে তা বেরিয়ে আসে।

চার্লি চ্যাপলিনের সিটি লাইটস ছবিতে একটা অসাধারণ পরিস্থিতি আছে। এক সিরিয়াস ভদ্রলোক মশাই ভুল করে একটা ছোটো হুইসল বাঁশি গিলে ফেলেন এবং একের পর এক হিক্কার শিকার হন। বাঁশিটি তার পেটের ভেতর কোথাও আটকে থাকা অবস্থায় তার হিক্কার দমক শুরু হয়। আর বাঁশির দরজায় বাতাস লাগে। এরকম হাস্যকর অবস্থায় বেচারা যতবার হিক্কা দেয় ততবার তার পেটের ভেতর থেকে অদ্ভুত এক হুইসল বেজে উঠতে থাকে। বিব্রত বেচারা মরিয়া হয়ে শব্দটি লুকাতে যায়, কিন্তু খুঁজে পায় না কী করবে। সে বোঝাতে যায় যে যেটা বাজছে সেটা তার শরীরের অংশ নয়। ওটা বহিরাগত জিনিস, কিন্তু তা তার নিয়ন্ত্রণে নাই। ওটা আমার শরীরের ভেতর বসেই আমার সর্বনাশ ঘটাচ্ছে।

যতই ভাবি না কেন, রসু খাঁ আমাদের সমাজের বাইরের এক বিকারগ্রস্থ পাষণ্ড। সে আমাদের ভেতর বসেই বাঁশি বাজিয়ে দিয়েছে, যাতে আমরা নিজেরাই_ পুরুষপ্রধান মানুষেরা সবাই ধরা পড়ে গেছি।

আগামি কিস্তি: রসু খাঁ ফেনোমেনা বনাম আইন ও নৈতিকতার থইকাঠি।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/farukwasifblog/29026581 http://www.somewhereinblog.net/blog/farukwasifblog/29026581 2009-10-16 01:32:36
এই গোকুলে সবজির দামে রসু খাঁ’র চোখ মানুষ নিজেকে টের পায় অন্য মানুষের মধ্যে ....কার্ল মার্কস।

খুবই গুরুত্বপূর্ণ খবর! ‘সবজিও মধ্যবিত্তের আওতার বাইরে’-দৈনিক আমার দেশ। সর্বদাই যে তা নিম্নবিত্তের আওতার বাইরে ছিল। তা খবর নয়, তা ‘বাস্তবতা’। ‘বাস্তবতা’ খবর হয় না। মিডিয়ায়, রাষ্ট্রের দরবারে, শপিং মলে আর টেলিভিশনে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আঙিনায়, মধ্যবিত্ত নিজেকে নিয়েই মত্ত। আত্মপ্রেম এর ‘ধর্ম’। অধিকারগুলো তার, নীতিগুলো তার, সুখ-দুঃখগুলোও তার। আমার আর আমাদের।

এই ‘আমি’ ও ‘আমরা’র সীমার ওপারে বাস করে কোনো এক ‘রসু খাঁ’। আমি ও আমরা নিশ্চিত, কোনো মহতাদর্শ দিয়ে আমাদের বলয়ে সিরিয়াল খুনী ‘রসু খাঁ’-কে নেব না মানব না। সবজির আওতার বাইরের নিম্নবিত্তের মানবেতর জীবন এবং তাদের থেকে আসা খুনীর বিকারগ্রস্থতা তাহলে কোথায় জন্মালো? সমাজ-রাজনীতি-ইতিহাসের বাইরে তো সে নয়। ‘এই গোকুলে শ্যামের প্রেমে, কে না মজেছে সখী!’ তাহলে সবারে বধিল যে, সে কি আমাদের গোকুলেরই সন্তান নয়?

এই প্রশ্নের সিবিল মীমাংসা নাই। তাই রসু খাঁ-কে আমরা ফুকো সাহেবের ক্ষমতার আকার-বিকারের ব্যকরণে আর সবজির দামকে মার্কসের সংগ্রামী দুনিয়ায় পাঠিয়ে পরস্পরের চোখে নিশ্চিন্তে তাকাব। কিন্তু অজস্র নারীদের খুন ও ধর্ষণের পর সে যে নারীকে জোর করে বউ করেছে, তার চোখের দিকে তাকাতে পারবে কি আমাদের সর্বদ্রষ্টা চোখ? তা পারবো না বলেই বাস করবো সেইসব গডফাদার, নেতা, শিল্পপতি, মিডিয়াশেঠ ও জেনারেলদের রাজত্বে। মিডিয়ায় তারা নায়ক বা খলনায়ক কখনো হন বটে, তাঁদের মানবত্তোর ঊর্ধ্বতনের আরশ কদাচ টলে না।

পত্রিকার পাতায় রসু খাঁ-র কাহিনী উপভোগ শেষে, মনের ধর্ষকাম-মর্ষকাম চরিতার্থতার পর রসু খাঁ-কে সরাসরি সম্প্রচারিত ফাঁসি দেওয়া যায়। আর ক্ষমতাবিত্তমত্তদের আইনী-বেআইনী ওপেন আর ক্রসখুনের সিরিয়াল দিয়ে বানানো যায় একটা মহিমান্বিত গণকবর। শোকের মহিমা উপভোগের মতো এমন গণখুনের গণকবর অনেক দেশেরই নাই।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/farukwasifblog/29025103 http://www.somewhereinblog.net/blog/farukwasifblog/29025103 2009-10-13 15:32:20
শান্তির জলপাই পাতা মুকুটে থাকে না
আপনার অভিষেক হলো ২০ জানুয়ারি। এর দশ দিনের মধ্যেই আপনার নাম নোবেলের মনোনয়নের জন্য জমা পড়ে। আপনি সেদিনই বিজয়ী হয়ে গিয়েছিলেন। সম্রাটদের পরীক্ষা দেওয়ার দরকার হয় না। আমেরিকার হারানো ভাবমূর্তি ফেরাতে দরকার ছিল একজন বিনয়ী সম্রাটের এবং একটি নোবেল শান্তি পুরস্কারের। আপনার মধ্যে দুটোই আজ এক দেহে মিলে গেল। আপনি এই গ্রহের সবচেয়ে সম্মানিত ও সৌভাগ্যবান রাজপুত্র, কায়রোর সুধী সমাবেশে আপনার সালামের জবাবে আপনাকেও জানাই শুভেচ্ছার সালাম।

অথচ যুদ্ধ-সামরিকায়ন-দেশ দখল আর করের টাকার হরিলুটের সিলসিলা কিছুই তো পাল্টায়নি। প্রেসিডেন্টের রং বদল হয়েছে মাত্র। সাদার জায়গায় এসেছেন কালো আর উদ্ধত আহাম্মকের বদলা খাটছেন একজন সুদর্শন, সদাহাস্যময় ও বুদ্ধিমান প্রেসিডেন্ট। জর্জ বুশের বিষের বীণ দুনিয়াকে ভীত করেছিল, আপনার আশার বাঁশিতে জেগেছিল প্রতিকারের সাধ। রাজনীতি থেকে আশা হারিয়ে গিয়েছিল, আপনি তার পুনর্জন্ম ঘটালেন। আমাদের দেশেও উঠলো দিনবদলের হুজুগ। কিন্তু আপনিই একে একে ফিরিয়ে নিয়েছেন সব প্রতিশ্রুতি, ধ্বংস করেছেন সেইসব আকুল আশাকে। নোবেলজয়ের দিন আপনি হোয়াইট হাউসের সিচুয়েশন রুমে আফগানিস্তানসহ পশ্চিম এশিয়ার ভাগ্যনির্ধারণের বৈঠক করছিলেন। ‘যুদ্ধ পরিষদের’ সেই বৈঠকে সেনাপতি ছিলেন, উপরাষ্ট্রপতি ছিলেন, হিলারি ক্লিনটনসহ ছিল আপনার ডান ও বাম হাতেরা। এর আগের দিন মার্কিন কংগ্রেস আপনাকে ৬৮০ বিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা বরাদ্দ দেয়। ঐ বৈঠকে আপনি যখন আফগানিস্তানে আরও ৪৫ হাজার সেনা পাঠাতে রাজি হলেন, একই সময়ে অসলোয় ঘোষিত হলো আপনার নাম।

সঙ্গে সঙ্গে আপনার ওয়্যার কাউন্সিলের নাম হয়ে গেল ‘পিস কাউন্সিল’, যুদ্ধগুলো হয়ে গেল শান্তি, বৈশ্বিক সামরিক আধিপত্যের কর্মসূচির নাম হয়ে গেল মানবিক উদ্যোগ আর দুনিয়ার সবচেয়ে বড় সেনাবাহিনীর কমান্ডার ও অজস্র ভয়ঙ্কর অস্ত্রের মালিক আপনি বনে গেলেন শান্তির দূত। আজ থেকে যেই আপনার আগ্রাসী বাহিনীর বিরুদ্ধে দাঁড়াবে বা আপনার সমালোচনা করবে যে রাজনীতিক; তারা হয়ে গেল সন্ত্রাসী বা স্বৈরাচার। মার্কিন রাষ্ট্রযন্ত্র ও পেন্টাগন আপনার গায়ে বুশের রেখে যাওয়া যে নেকড়ের ছাল পরিয়েছিল, হরিণের মসৃণ চামড়ায় নোবেল কমিটি তা ঢেকে দিল। আজ আপনি সমালোচনার ঊর্ধ্বে। আপনাকে কুর্ণিশ।

অর্থনৈতিক মন্দায় আপনার দেশসহ বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ সর্বস্বান্ত হয়েছে। কিন্তু ওয়ালস্ট্রিটের লুটেরাদের আপনি বুশের কায়দাতেই বেইল আউটের নবযৌবন দিয়েছেন। আপনি বুশের অগণতান্ত্রিক কালাকানুনের একটাও সরাননি। গুয়ানতানামো বে-এর দোজখ বন্ধের বদলে মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা দিতে তৃতীয় দুনিয়ার গোপন কারাগারে নির্যাতন চালানোর বন্দোবস্ত করেছেন। আপনি মার্কিন দেশে নতুন স্বাস্থ্যবীমা কর্মসূচিকে অবহেলায় পরাজিত হতে দিয়েছেন। আপনার হাত দিয়েই এক-তৃতীয়াংশ মার্কিন নাগরিকের ব্যক্তিগত কর সামরিক খাতে চলে যাচ্ছে। তাহলেও মিডিয়ার কল্যাণে আপনার সুবচনী হাসি আর সুবোধ চেহারা আমাদের ভাবতে শেখায়, আপনি আমাদের আত্মীয়। সবাই আমাদের শেখায়, আর আমরা মগজ খাটানো বাদ দিয়ে ভাবি বিশ্ব-সম্রাট তো আমাদের আত্মীয়ই লাগে! আপনাকে তাই আমরা ভুলব না।

নোবেল কমিটি আপনাকে পুরস্কার দেওয়ার কারণ হিসেবে বলেছে, ‘ওবামা পরমাণু অস্ত্রবিহীন পৃথিবীর জন্য কাজ করেছেন, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মধ্যে সংলাপের পরিবেশ এনেছেন এবং বহুপক্ষীয় কূটনীতিকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছেন।’ আমরা জানি, স্নায়ুযুদ্ধের পরের সবচেয়ে বড় সামরিক আয়োজন আপনি হাতে নিয়েছেন। রাশিয়া-চীন-ইরান আর উত্তর কোরিয়া ঘিরে (First Strike Global Missile Shield System) ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন হচ্ছে। আগাম পারমাণবিক হামলার জন্য প্রস্তুত পেন্টাগন। রোমান সাম্রাজ্যের আদলে আফ্রিকায় আফ্রিকম (African Command) আর দক্ষিণ আমেরিকায় সাউথকম (Southern Command) কায়েম হয়েছে। ভেনেজুয়েলাকে সামলাতে কলাম্বিয়ায় সামরিক ঘাঁটি বসছে, হন্ডুরাসের জনপ্রিয় সরকার উচ্ছেদ হয়েছে আমেরিকারই মদদে। পাকিস্তানের সার্বভৌমত্বকে খেলো করে দিয়ে সেখানে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে আপনার চালকহীন বিমানগুলো। আপনার আমলে ইসরায়েলে সামরিক সাহায্য কমার কথা থাকলেও বেড়েছে। ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চলে একসঙ্গে একাধিক বড় যুদ্ধ চালানোর জন্য তৈরি করা হচ্ছে পেন্টাগনকে। বীভত্স সব অস্ত্র যোগ হচ্ছে তাদের ভাণ্ডারে। মহাকাশ, সমুদ্র আর বিশ্বের ভূমির সামরিকায়নের যে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে তা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকেও হার মানাচ্ছে। আপনি এই সব আয়োজনের মধ্যমণি হয়ে বসে আছেন। আপনাকে উপেক্ষা করে সাধ্য কার?

আপনার শান্তির সশস্ত্র আহ্বানে বিশ্বাস রাখেনি ইরান, তালেবান ও উত্তর কোরিয়া। পাকিস্তান ও মিয়ানমারের সামরিক জান্তা পাচ্ছে ছাড়। রুশ ভালুক পুতিন আপনার বন্ধুত্ব নেননি। আপনার আহ্বানে ফিলিস্তিনে জবরদখল বসতি স্থাপন ও হত্যা বন্ধ করেনি ইসরায়েল। আপনি তার উপহাসের পাত্র। আপনি ভারতের সঙ্গে পরমাণু চুক্তি করেছেন তাকে দিয়ে চীনকে সামাল দেওয়ার জন্য, ভারতকে এ অঞ্চলের আমেরিকা বানানোর জন্য। তাতে করে এশিয়ায় অস্ত্র প্রতিযোগিতা আরও বেড়েছে।
কিন্তু এটা ঠিক যে, বেকার কূটনীতিকেরা আরামকেদারা থেকে উঠে বসতে বাধ্য হয়েছেন। তাদের এখন সাম্রাজ্যের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত ছুটে বেড়াতে হচ্ছে। কারণ বিশ্বের কেন্দ্র আমেরিকা হলেও তার বৃত্তটি ছোট হয়ে গেছে। আপনার দেশ যখন ইরাক-আফগানিস্তান নিয়ে ব্যস্ত ছিল তখন ইউরোপে রাশিয়া ও তুরস্ক, এশিয়ায় চীন ও ইরান এবং আরবে মিসর ও সিরিয়া নিজস্ব বৃত্ত তৈরি করে ফেলেছে। এদের সঙ্গে সমঝোতা না করলে উদ্দেশ্য হাসিল হবে না। আমেরিকার দম কমিয়ে দিয়েছে ইরাক ও তালেবান, আরেকটি বড় যুদ্ধ আপনি এখনই করতে পারবেন না। সাম্রাজ্যের এই দুর্বলতাকেই গুণ বলা নোবেল কমিটির অবদান। সামরিকায়ন, অবৈধ যুদ্ধ ও দাপটেরই সবুজ সংকেত এই পুরস্কার। আপসপন্থার আড়ালে ছুরির শান আপনারই কেরামতি।

জনতার আশাকে আহত করলেও আপনি পতনমুখী সাম্রাজ্যের আশাকে চাঙা করেছেন। আবার একাধিপত্য আসবে বলে আপনাকে নেতা মেনেছে পাশ্চাত্য। আপনি শিল্পায়িত দেশগুলোকে দিয়েছেন বাস্তব ভরসা আর এশিয়-আফ্রিকীয়-ল্যাটিনো-আরব ও মুসলিমদের সামনে দিয়েছেন রংদার বক্তৃতা। আপনার হাসিকে বিশ্বাস করতে ইচ্ছা হয় মানুষের, আপনার হাত নাড়ায় তারা তবু অভয় পেতে চায়। আপনার আশার স্পর্ধার কাছে তারা তাদের নিজস্ব আশাবাদ খুইয়ে ফেলেছে। তারা হারিয়ে ফেলেছে বিজ্ঞাপন ও রাজনীতির ভেদ। তাদের চোখে এই শতাব্দীর প্রথম রাজনৈতিক নায়ক তো আপনিই! আঞ্চলিক নায়কদের দিন শেষ। সাম্রাজ্যের সর্বত্র আপনি যাতে সূর্যসমান হন, নোবেল তারই বিনিয়োগ। ধন্য আশা কুহকিনী!

নোবেল কমিটি বলেছে, পুরস্কার দিয়েছি ‘এ কারণে যে তিনি যা অর্জন করতে চাইছেন আমরা তাতে সমর্থন দিতে আগ্রহী। ...আমরা পরিষ্কার সংকেত দিচ্ছি যে, তিনি যা কিছুর পক্ষে আমরা তারই পক্ষে।’ তাহলে কি নোবেল কমিটি নতুন সম্রাটের অসীম ক্ষমতাকেই অভিষিক্ত করছে? আপনার আমলনামায় বড় কোনো সুকৃতি এখনো লেখা হয়নি। মাত্র আট মাসে সেটা সম্ভবও নয়। তাহলে এ পুরস্কারের কী কারণ? কারণ ছাড়া যদি কার্য না-ই হয় পুরস্কার তাহলে ফলল কীভাবে? ঝিয়ের পেটে মায়ের জন্ম যা, আপনার নোবেলপ্রাপ্তিও তা। জর্জ বুশ আগাম আক্রমণের ধারা চালু করেছিলেন। নোবেল কমিটি দিল আগাম পুরস্কার। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের মতোই এ পুরস্কারও যখন অহেতুক ও ব্যর্থ বলে প্রমাণ হবে, তখন দেওয়া হবে পরিবর্তিত বাস্তবতার দোহাই। বাস্তবতাকে ইচ্ছামতো সাজানো ও ব্যাখ্যা করার ক্ষমতা আছে বলেই যুদ্ধ করে আসার পর উড্রো উইলসন, টেডি রুজভেল্ট, হেনরি কিসিঞ্জার, শিমন পেরেজদের মতো মার্কিন-ইসরায়েলি প্রেসিডেন্টরা শান্তির শিরোপা জিততে পারেন! সাবাস নোবেল কমিটির তেলেসমাতি!

ধন্য আশা কুহকিনী! আশার দাবিতেই আপনি জনপ্রিয় হয়েছেন। কিন্তু আপনি যে আশার সমাধির খাদেম হতে চলেছেন সেই সমাধিতে ইরাক-ফিলিস্তিন-আফগানিস্তানসহ অনেক আশার বৃক্ষ শুকিয়ে কাঠ হচ্ছে। বুশ-ব্লেয়ারের উত্তরসূরি হয়ে তাদেরই দেওয়া মুকুটে আপনি পরলেন সেই বৃক্ষের একমাত্র সবুজ পাতাটি—যার নাম ছিল আশা। কেবল আশা জাগানোর জন্যই আপনাকে ভালোবেসেছিল এশিয়া-আফ্রিকা-ল্যাটিন আমেরিকার কালো মানুষেরা। আশার সওদাগর, আমরা কি তবে আশার অধিকারও হারালাম?

শান্তি কখনো মুকুটে থাকে না, সাম্রাজ্যের ক্ষমতায় থাকে না। শান্তি গুমরে মরছে যুদ্ধক্ষেত্রে, উদ্বাস্তু শিবিরে, ক্ষুধার্তদের উদরে, স্বজনহীন শিশুদের কান্নায়। শান্তি শায়িত আছে বিশ্বের সব গণকবরে। বাংলাদেশ, ইরাক, আফগানিস্তান, ফিলিস্তিন, আর্মেনিয়া, বসনিয়াসহ সব গণহত্যাকে যখন আপনি গণহত্যা বলে চিনবেন, যারা তা ঘটিয়েছিল তাদের যখন শান্তির ঘাতক বলে মানবেন এবং ওই সব গণকবরে শায়িতদের আত্মীয়-পরিজন-দেশবাসীকে সমকক্ষের মর্যাদা দেবেন, সেদিনই আপনি শান্তির রাজপুত্র হবেন।

রূপকথার রাখাল স্বপ্নে মুকুট পেয়ে রাজা হয়ে যেতে পারে, জনতার রাখালকে তা অর্জন করতে হয়। আপনাকেও তা অর্জনের আহ্বান জানাই। কারণ আশার মৃত্যু নাই এবং আশা সর্বদাই স্পর্ধাবান।

*লেখাটি আজকের প্রথম আলোয় প্রকাশ পেয়েছে।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/farukwasifblog/29024491 http://www.somewhereinblog.net/blog/farukwasifblog/29024491 2009-10-12 14:19:03
আমার সাঁই_আমি তাঁর জন্য অপেক্ষা করি।
বিরাট মাঠের পারে বাড়ি। বছরে কয়েকবার সেই মাঠে খুনোখুনি লড়াই হয়। প্রথম ভয় সেই বাড়িতে। একদিকে নিকষ বাঁশঝাড়, আরেকদিকে গাছগাছালি ভরা অন্ধকার, আরেকদিকে কয়েকঘর প্রতিবেশী। বিরাট উঠানের পরে দেওয়াল দিয়ে ঘেরা। সেই দেওয়ালে সন্ধ্যা হলেই ছায়াদের নড়াচড়া দেখতাম। দেখতাম আর বুকে হিম ধরে যেত। কাউকে বোঝানো যেত না সেই ভয়। বয়স বেড়েছে দিনে দিনে, ছায়ারাও আসে না আর। তাদের আমি রেখে এসেছি শৈশবের সেই কুহককাতর জগতে। কিন্তু নিয়তির দেয়ালে কীসের যেন ঝলক দেখি, দেখি অন্তিম ভয় হয়ে নাচে সেইসব কৃষ্ণমূর্তি।

প্রথম দুঃসাহস ছিল একটি অন্ধ ও মৃত কূপ। দুভাই মিলে কীসের যেন টানে ঝুঁকে, তার ভেতরে তাকাতাম। অনেক আগে ওখানে লাশ পাওয়া গিয়েছিল। তলার অন্ধকারের দিকে তাকানোর রোমাঞ্চ আজো শিরার লহু চঞ্চল করে তোলে। রাত নামলে পড়োভিটার গহ্বর থেকে নিশাচর যেমন মুখ বাড়ায়, তেমনি বাস্তবের খোপ খুলে পরাবাস্তব রোমাঞ্চের জগতে উঁকি দিয়ে আসি। অন্ধকূপের মতো তারও টান শিহরিত করে, রোমাঞ্চভূক পতঙ্গ হয়ে মনে হয় ঝাপ দিই তার ইশারায়।

প্রথম দুঃস্বপ্ন এসেছিল দরবেশের বেশে। আশ্বিনের ‘বিকেলের দিকে যেই ঝড় আসে তাহার মতোন’ জ্বর আসতো শীত আসি-আসি করা বিকেলে। অসুখের জানালায় বসে আমি দেখি ঘুমন্ত ইঁদারা, পারদে ভাসন্ত চোখ। তারাদের চোখের হিম কুশের মতো এসে বেঁধে মনে। পরম বন্ধুর মতো ঘুম আসে, স্বপ্ন আসে। দেখি আমার জানালার পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন তিনি। কালো মানুষটির পরনে গৈরিক, মাথার মাথালও গেরুয়া, বুকের 'পরে ভোরের মতো আলো-আঁধারি দাড়ি। আধখোলা জানালা দিয়ে আমরা চোখে চোখে তাকিয়ে থাকি।

তাঁর মুখে অদ্ভুত হাসি ভাসে। কণ্ঠে স্নেহ ঝরিয়ে বলেন, ‘নাহ্ থাক, ঘুমাক’।
ঘুমের মধ্যে টের পাই বুকের ’পরে শ্বাস ফেলে চলে গেলেন তিনি। বোবা ধরার অবোধ কষ্টে আমি গোঁ গোঁ করতে থাকি। অনেক বার তিনি এসেছেন। অনেক কাল হলো তিনি আর আসেন না। বোবা ধরা স্বপ্ন আসে কেবল মাঝে মাঝে। রাতভর বৃষ্টি যখন, তপ্ত শরীর হিমে পোড়ে যখন, কোথাও বোবায় ধরা কুকুর করুণ আর্তনাদ করে যখন, আমি বুঝি এমন কোনো রাতেই তিনি আবার আসবেন। আমার ভয়, আমার রোমাঞ্চ, আমার দুঃসাহসসকল নিয়ে আমি আমার সাঁই_তাঁর জন্য অপেক্ষা করি।

৩.
এ অবধি তিনি আসেননি। জন্ম আর বিবাহ এসেছে একই লগ্নে, অঝোর বৃষ্টির মধ্যে। কণ্যা ও তুলার সন্ধিক্ষণে আমি তাহাদের পাই। প্রেম আসে সন্ধি পারায়ে।

জন্মের কথা মনে হলে গর্ভের ঘোলা অন্ধকারের সঙ্গে হলুদ আলোর মেশামেশির দৃশ্য দানা বাঁধে। যেন জল মেশানো ঘন রংদুটি পরস্পরকে গ্রাস করতে চাইছে।গর্ভের অন্ধ ঈশ্বর মাটির দুনিয়ায় সন্তানজন্ম পায় আর নাড়ি কেটে পরমকে হারায়। অথচ অন্ধের চোখ তো ঈশ্বর স্বয়ং। মনের মধ্যে সেই চক্ষু অপলক। তা মলিন দেখে না, সহি দেখে। তা সংসার দেখে না, বিশুদ্ধ প্রেম দেখে।
জননীর পিঞ্জর ছাড়িয়ে মায়াবি পর্দা সরিয়ে চলে আসছি তোমার পৃথিবীতে। আমাকে নিয়েছ যদি রাখবে তো মা? জীবনের চৌকিতে বসিয়ে আমায় তুমি গেছ স্নানে। আর আমার যে একা লাগে! আমি পারি না। উঠোন পেরিয়ে বাঁশঝাড়ের শীতল ছায়ার তলার স্নানঘর আমায় টানে। হাঁটি হাঁটি পায়ে আমি তো তোমার কাছেই যেতে চেয়েছি। উঁকি দিয়েছি দরজার ছোট্ট ফুটোয়। সেই বুঝি আমার প্রথম পাপ। স্নানরতা তুমি জানলে না, আয়েশা হয়ে গেলে তুমি মা; অভিশাপ দিলে: জহরে কহরে মরবি। হায় হাসান, হায় নীল জহর! হায় হোসেন, হায় লাল খুন! মা, তুমি দিলে বর, তাই আমি জহরে জহরে নীলকণ্ঠ শিব। তুমি দিলে শাপ, তাই মাটিতে সিজদা রাখা উবু পিঠে ছুরি খেয়ে চলি।

মৃত্যুর লগ্নের কথাও মনে আসে। মনে আসে এক জোড়া পা, অঝোর বর্ষণের সন্ধ্যায় গোড়ালি ডোবা জলা পেরিয়ে চলে যাচ্ছে। সমস্ত আয়ু নিয়ে সে দাঁড়িয়ে ছিল পথের ধারে। এ পথ ধরেই এসেছিল জনম, এসেছিল বয়সের সাথী, এসেছিলে অধরা স্বপ্ন তুমি।

বয়স হারাতে হারাতে আজো আমি সং হয়ে দাঁড়িয়ে আছি পথের ধারে। অশ্রু বয়ে যাওয়া খাঁড়ির মুখে উদ্দালক হয়ে বারবার বাঁধ জাগিয়েছি তোমাকে থামাব বলে, হে শ্যাম হে মরণ...

এ চোখে নামুক শঙ্খ, দিগন্তরেখার সব খাঁজ ভরে যাক শ্মশানভষ্মে। উঠতি আঁধার তখনি দেখে নিক, কার বুকে জমে আছে কতটুকু জল। কার চোখে কোন অন্ধকার দেখে আলো হতে চেয়েছিল কে?

অকুলের সঙ্গীর জন্য অপেক্ষা করছি বর্ষণমুখর সন্ধ্যার গ্রহণলাগা অন্ধকারে।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/farukwasifblog/29015231 http://www.somewhereinblog.net/blog/farukwasifblog/29015231 2009-09-24 20:17:55
হরতালের পক্ষে-বিপক্ষে, সাফল্য-বিফলতা এবং বিরাজনীতিকরণের কামেলগণ
গতকালের হরতাল বিষয়ে মনজুরুল হকের এই মূল্যায়নই ঘটনার নির্যাস হিসেবে মনে করি। বাধ্য না হলে করার দরকার নাই। হরতাল ডাকলেও মানুষকে বাধ্য করা চলবে না এটা আমি সর্বাংশে মানি। তারপরও এবারের:

হরতাল ডাকাই মোক্ষম ছিল, কারণ, সরকার চুক্তি করে ফেলেছে গোপনে। জেনেভা থেকে ফিরে গত আট তারিখে হাসিনা চুক্তি সই করেছেন। তার মানে আলোচানর প্রয়োজন বা সুযোগ তিনি খোলা রাখার প্রয়োজন মনে করেননি। তাঁর ওপর নিশ্চয়ই প্রবল চাপ ছিল এবং তাঁর দলের মেরুদণ্ড ছিল ইলাস্টিকের মতো কোমল।

কিন্তু যারা জনস্বার্থ রক্ষার রাজনীতি করে, এটা তাদের কাছে দেশের বুকে ছুরিকাঘাত। এতে মারাত্মক রক্তক্ষরণ হবে, কিন্তু মরবে না। এখন ঘাতককে ঝটকা ধাক্কা দেওয়াই একমাত্র করণীয় আরেকবার ছুরি খাওয়া থেকে বাঁচতে চাইলে। হরতালটা ছিল সেই চেষ্টা। অনেকে অপেক্ষা করতে বলেন, তাদের ধৈর্য অসীম কারণ তাদের হারাবার কিছু নাই। অথবা তারা এ মুহূর্তে ব্ড় সংগ্রামে যাবার সাহস রাখেন না।

সফল বলবার কারণ:
১. জাতীয় সম্পদ রক্ষার প্রশ্নকে রাজনীতি ও রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় আলোচ্য বিষয় করা গেছে। জাতীয় কমিটি জনস্বার্থের বলকে সরকারের কোর্টে ঠেলে দিতে সক্ষম হয়েছে। আমাদের সাফল্য এটাই যে, গত ক'দিনে জাতীয় গণমাধ্যমে এবং মানুষের মনেও একটাই, প্রশ্ন এটাই গ্যাস নিয়ে কী হচ্ছে? সরকারের ভূমিকা কি সঠিক? সরকার এত রাখঢাক করছে কেন? মানুষের এই আগ্রহ জাগানো মিটিং-মিছিল করে বা প্রচারপত্র বিলিয়ে সম্ভব ছিল না।

২. সরকারকে এখন ডিফেন্সিভ অবস্থানে গিয়ে আত্মপক্ষ সমর্থন করতে হচ্ছে। হরতাল ঘোষণা এবং তার আংশিক পালনের এটাই নৈতিক বিজয়। হরতাল এক্ষেত্রে শক্তিপ্রয়োগ না হয়ে নৈতিক চাপ ও প্রচারকৌশল হিসেবে অনেকটাই সফল। বলাবাহুল্য সরকারের ব্যাখ্যা ইতিমধ্যেই তোতলা ভাষাভঙ্গিমা অর্জন করেছে।
বিপদ একটাই ছিল, সেটা হলো সরকার বা অন্য কোনো অপশক্তির স্যাবোটাজ, আগুন ও খুনের সম্ভাবনা। সেটা হয় নি বলে রক্ষা।

৩. জনস্বার্থে হরতাল ডাকা যায়, সেই হরতাল পালনে কাউকে বাধ্য না করেও আবেদন জানানো যায়, পথের মানুষের কাছে কীসের বিরুদ্ধে হরতাল সেটা ব্যাখ্যা করার এই বিনয়ী কিন্তু সবল ধরন রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন দৃষ্ঠান্ত। জাতীয় কমিটির সংযম এবং সরকারের বাধা না দেওয়ার মনোভাব এবং বিএনটিকে স্যাবোটাজ না করার জন্য ধন্যবাদ।

পরোক্ষ লাভ

*দক্ষিণ এশিয় ও মার্কিন-চীন ইত্যাদি কারণে পানি অনেক দূর গড়াবে। ট্রানজিট-বন্দর-সেনা ঘাঁটি ইত্যাদির ঢেউও এতে যোগ হবে। এই আন্দোলনে বামপন্থি সেকুলার ও দেশপ্রেমিক নাগরিকদের জোট জাতীয় কমিটি এক ধাপ এগিয়ে থাকলো পথ দেখানোয়।

*বামপন্থি অনৈক্যের মধ্যে আশা ও উদ্দীপনা দিয়ে ঐক্য আরো বাড়লো।

*বামের যারা সংগ্রাম করবে আর যারা সাইনবোর্ড বেচে এমপি হবে/হয়েছে তাদের পার্থক্য করা গেল।

দোদুল্য মান, সুবিধাবাদী ও পাতি-আমলীগারদের মুখোশও খসলো কিছুটা। বিদেশি বিনিয়োগের মৌলবাদের জসমে জলুসে কিছুটা গোচনাও পড়লো।

পরিশেষে বিপদের দিনে মানুষকে বাঁচাতে না পারলেও, তাদের হুশিয়ারি জানানো, তাদের হয়ে লড়াই করার মানুষের যে একেবারে অভাব পড়ে নাই, সেই জানান দেওয়াটা দেওয়া হল। পরের বার আর এবিসিডি বুঝিয়ে কাজ শুরু করতে আর হবে না। নানান জায়গায় অনেক ছোটো ছোটো গ্রুপ, ব্যক্তি, গোষ্ঠী জানতে জানাতে ও লড়তে তৈরি হচ্ছে সেই খবর লুটেরাদের গদিবালিশে বসত করা ছারপোকারা টের পেয়েছে। এদের নাচটাও আমরা দেখলাম, সেটাই বা মন্দ কী! আবার অনেক মিত্রও যাঁর যাঁর অবস্থান থেকে হরতাল বিরোধিতা করেও আন্দোলনের ইস্যুকে সমর্থন করেছেন। এদের শত্রু বানানো বা সেটা ভাবা আহাম্মকি। কিন্তু কাক ও কোকিলের পার্থক্য ভোলা চলবে না।

তাদের জানিয়ে দেওয়া চাই, এদেশটা গোলটেবিল মিটিং করে প্রতিষ্ঠা পায় নাই, বাপের তালুকের উত্তরাধিকারও কেউ নয়। এর প্রতিষ্ঠা হয়েছে রাজনৈতিক সংগ্রাম ও রাজনৈতিক জাতীয় যুদ্ধের মাধ্যমে। হরতাল কোনোভাবেই করা যাবে না এমন বিরাজনীতিকরণের চিন্তা সিভিল-মিলিটারি-কর্পোরেট চিন্তা। পুতুপুতু মুখোশের আড়ালে নৃশংস দখল ও যুদ্ধ এদের কমূসূচি। লিবারেলিজম এদের নতুন রাজনৈতিক ধর্ম। একে প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না। এরা সবকিছু বণিক আর বিশ্বব্যাংকীয় আমলা এবং মার্কিন-ভারতের প্রভুদের কথাতেই হবে বলে বিশ্বাস করে। পার্থক্য যে, আমরা তা করি না।

আগের লেখা : কন্সপিরেসি অব সাইলেন্সের মধ্যে জাতীয় সম্পদ রক্ষায় একটি মরিয়া হরতাল : Click This Link]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/farukwasifblog/29011029 http://www.somewhereinblog.net/blog/farukwasifblog/29011029 2009-09-15 19:14:11
কন্সপিরেসি অব সাইলেন্সের মধ্যে জাতীয় সম্পদ রক্ষায় একটি মরিয়া হরতাল
এও জানি, যে কৃষক সারের অভাবে জমিতে রুইতে পারে না, সে এখনো ভাল করে জানে না তারই গ্যাস সার না হয়ে বিদেশি কোনো কারখানার কাঁচামাল হবে। আমি জানি, পেট ও মালিকের ঠেলায় ঠিকই রিকশা নিয়ে বের হবে মঙ্গাদেশের কোনো রিকশাচালক। গার্মেন্টসের মেয়েটি ঠিকই যাবে কারখানায়। বড়লোকি কারগুলিও লা লা রি রি করে চলবে, যেমন দাপটে চলে প্রতিদিন। আর দালাল-বেনিয়ারা তাদের অশ্লীল ভেংচানি দেখাতেই থাকবে গণপ্রতারণামাধ্যমগুলোতে। আমি জানি শহরগুলো প্রতিক্রিয়াশীলদের দুর্গ, তা ঢাকাই হোক আর নিউইয়র্ক হোক। জানি যে, ঢাকায় খুটি না পুতে দিল্লি-ওয়াশিংটন-প্যারিস নিরাপদ বোধ করবে না।

জানি সত্য, জনভিত্তিক দলগুলোর রুপার কাঠির সঙ্গে জনগণের দুঃখ-শোক ঠেকানিয়া জেদের সোনার কাঠির মিল যতদিন না হচ্ছে, ততদিন এই শহরে বিপ্লবীদের মিছিল আর গরিবের হাহাকার, পরস্পরকে ডেকে ডেকে হয়রান হবে। মাথা খুঁড়বে কর্পোরেটের পাথুরে দেয়াল আর রাজপথের কালো পিচে। তাদের প্রতিবাদসভা লুন্ঠিত দেশের শোকসভা হয়ে থাকবে, তাদের প্রেস রিলিজের অক্ষরগুলো কর্পুরের মতো উবে যাবে। কিন্তু কাল তাদের দেখাদেখি হবে, কাল হরতাল। মগজ-অবশ মানুষেরা দূর থেকে আজম বিদ্রোহীদের দেখে বিব্রত হবে। কিন্তু স্বেচ্ছায় নিজেদের বন্ধ না করে কে কবে বন্ধ করতে পেরেছে ফেরাউনি অনাচার? আমার ঘরে আর মনেই তো উপনিবেশিক সংসার।

এক বৃদ্ধ প্রকৌশলী তাঁর জমি বিক্রি করে বিবিয়ানার গ্যাস রপ্তানী ঠেকাতে লংমার্চের খরচ যোগাড় করেন। আশি বছর বয়সেও পথ হাঁটেন। এক অধ্যাপক জাতীয় স্বার্থের প্রবক্তা হওয়ার অপরাধে পা-ভাঙ্গা মার খেয়ে পড়ে থাকেন রাজপথে। বয়সে তরুণ কিন্তু জাতীয় স্বার্থরক্ষার দায় বিষয়ে নাড়ির জ্ঞান টনটনা এমন একদল ছাত্রছাত্রী-মজুর আর পেশাজীবীরা প্রতিদিনের কঠিন জীবন আরো কঠিন হয়ে যাওয়ার হুমকি নিয়েও লড়াইয়ের ময়দানে মাটি কামড়ে পড়ে থাকে। কারণ, তাদের চোখে-মনে দেশের প্রতিমা প্রতিষ্ঠিত। দেশ তাদের কাছে সিভিকো-মিলিটারি-কর্পোরেট ফোঁড়ার পুঁজ মোছার সংবিধান আর পতাকা নয় কেবল। দেশ মানে মানুষ ও তার স্বার্থের যোগফল।

সেই মানুষ মাটির ওপর দাঁড়িয়ে। সেই মাটি চারদিক থেকে ঘেরাও। সেই ঘেরাওয়ের মধ্যে জীবন-জীবিকা-সম্পদ আর স্বাধীনচেতা মন আহত ও জ্বলন্ত। সার্বভৌম শব্দের মহিমা আর জ্বালা তারা একাত্তরের মতোই রক্তের ছলক আর বেইমানির বিষে জেনেছে। তাই হরতাল হবে। যুদ্ধ যখন চাপিয়ে দেওয়া হয়, তখন লড়াই কোনো পাত্রী-বাছাই অপশন নয়। সেটা হচ্ছে, সেটা চলছে, সেটা চলবে।

ফুলবাড়ীতে এশিয়া এনার্জিকে ঘেরাও করে তাড়ানো হয়েছে। জয় এসেছে। ঢাকাতেও হরতাল হবে, জয়ের পথে এক ধাপ এগতে। জয় তৈরি জিনিস নয়, জয় দিনে দিনে তিলে তিলে আসে। এই হরতালে তাদের জানাজানি হবে, তারপরের মিছিলে ওঠাপড়া ঘটবে, এভাবেই চলবে আরো কয়েক বছর। এই চলার মধ্যে দিয়ে শক্তি সংগ্রহ করা, এক পা এগিয়ে দু পা পিছিয়ে, আবার লাফ দিয়ে এগনোর পথেই আন্দোলন সংগ্রাম হবে, সংগ্রাম শক্তি হবে, শক্তি নিজেকে আত্মপ্রকাশ করবে। সেই আত্মপ্রকাশ জাতীয় ভাবে বৈধ হবে।

হাসিনার কিছুই করবার নেই। এদেশের লুটেরা বড়লোক-আমলা-মিলিটারি-এনজিও বলয়েরও কিছুই করবার নেই। তারা বিশ্বপুঁজির ফোরম্যান_চৌকিদার। লুটের মালের ভাগ তাদের মাংসে-মজ্জায়, শিক্ষায় আর দীক্ষায়। বিশ্বব্যাংকীয় ট্রিকল ডাউন ইফেক্ট (দেশে ধনী বাড়লে তার ছিঁটেফোঁটা পেতে পেতে গরিবও স্বচ্ছল হবে) অনুসারে জাতীয় সম্পদ লুণ্ঠনের অংশ তারাও পায় ঠিকাদারি, বিজ্ঞাপন, স্পন্সর, চাকরি ইত্যাদির রকমে। ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকা মধ্যবিত্তরা সিপাহি বিদ্রোহে ভীত হয়, ব্রিটিশ চলে গেলে সভ্যতা চলে যাবে বলে টাই আর গাউন ভিজিয়ে কাঁদে। এরা কাশিমবাজার কুঠির সন্তান। এদের বোঝাবার কিছুই নাই সোনা।

তবুও জানাই, সেনা-তত্ত্বাবধায়কি জরুরি আমলে দালাল ম তামিমের করা পিএসসি অনুসারে, তাল্লো-কনকোরা উৎপাদন খরচ বাবদ নেবে ৫৫ ভাগ, তারপর লাভ বাবদ নেবে বাকি ৪৫%-এর আশি ভাগ। শুভঙ্করি গণিতের ফাঁকিতে আমার গ্যাস মজুদের মাত্র সাড়ে আট ভাগ আমার। তাও আবার সেটা গভীর সমুদ্র থেকে আনতে হবে আমাদেরই। সেটা যেহেতু আনা সম্ভব না, সেহেতু আমাদের সাড়ে আট শতাংশসহ মোট ১০০ ভাগই তারা রপ্তানি করবে। নেবে কে? নেবে জ্বালানী ক্ষুধার্ত ভারত। আন্দোলন-লংমার্চ করে বিবিয়ানার পাইপলাইনে রপ্তানি ঠেকালেও এখন সমুদ্রসীমা দখলের হুমকি দিয়ে এলএনজি করে জাহাজে করে নেবার খায়েশ তাদেরই। তাদের করুণাধন্য মুক্তিযুদ্ধের দলের নব্য-রাজাকার হওয়া এভাবেই পাকা হলো। দশচক্রে ভগবান এভাবেই ভূত হলেন। সেই ভূতের সতকার এখন জাতীয় কর্তব্য।

প্রথম বিএনপি আমলে ২৩টা ব্লকে দেশটা ভাগ করে প্রায় সবগুলোই তুলে দেওয়া হলো শেল-কেয়ার্ন-অক্সিডেন্ডালের কাছে। মাগুরছড়া-টেংরাটিলা ব্লো আউট, উৎপাদনের ৮৫ ভাগ নিয়ে নেওয়া। টেন্ডারের একশ কোটি টাকার খনন হয়ে যায় তিন হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত। ইচ্ছামতো তোলা বা না তোলা দিয়ে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে রাখা। যেখানে সমতলের গ্যাস পূর্ণদমে তুললেই বর্তমান চাহিদার প্রায় সবটাই মেটে, সেখানে সমুদদ্রের গ্যাস হরিলুট করে দেওয়ার এত উত্তেজনা কেন সরকারের? কারণ, এটাই তার জরুরি অবস্থা পাড়ি দিয়ে ক্ষমতায় বসবার কাফফারা। এই কাফফারা বিএনপি-জামাত যেমন দিয়েছে আজ আমলীগকেও তেমন দিতে হবে। কিন্তু জনগণ কেন যক্ষের ধন ভক্ষকেরে দেবে?

বাপেক্স-পেট্রবাংলাকে ধ্বংস করা হয়েছে, যেমন ধ্বংস করা হয়েছে আদমজীকে। কৃত্রিম ভাবে দশকের পর দশক বিদ্যুৎ সংকট জারি রেখে মানুষকে বাধ্য করা হবে গ্যাস-কয়লা বিদেশিদের দিতে হাঁ বলাতে। অথচ বাপেক্সের রেকর্ড বিশ্বমানের। আশি বছরের অভিজ্ঞতা, সেভিয়েত কারিগরি সহায়তা সব হাওয়ায় মিলালো কেবল সরকারের মীরজাফরিতে। অথচ দেশী প্রকৌশলীরাই ভাড়া খাটে দেশদখলের বহুজাতিকে। দেশের বিজ্ঞানীরা বিদেশে পাড়ি জমায় টিকতে না পেরে। জ্বালানী মোশাররফকে একটা গাড়ি দিলেই গ্যাসক্ষেত্র পাওয়া যায়, শেখ হাসিনাকে তাহলে তারা কি দিয়েছে তা আর বলবার অপেক্ষা রাখে না। টিপাই নিয়ে মাতম তোলা বিএনপি-জামাত কেন নিশ্চুপ তা জানতেও ভেতো বাঙালির গবেষণার প্রয়োজন নাই। তাই শিক্ষিত-উপনিবেশিক মধ্যবিত্তকে শিখাবার-বোঝাবার কিছু নাই। যেতে হবে জনতার কাছে। যদিও মিডিয়া কুৎসা দেবে, খবর ছাপবে না, অর্ধবুঝমানদের ব্রেনওয়াশ করবে বর্ণচোরা পাতিবুদ্ধিজীবীরা। ভয় বা ঘুষের মারণাস্ত্রে কিনে নেবে। সংগ্রাম জিনিসটাকে এরা অভিধান ও জনজীবন থেকে বাতিল করে দিয়েছে। এরা পা চাটবে, তাতেও না হলে আত্মবিক্রয় করবে, কিন্তু এদের মরা মাজা আর সোজা হবার নয়।

আজ বিশ্বায়িত, ভোগবাদী, কৃষি ও খনিজ বিনাশী মধ্যবিত্ত বিত্তবাসনাই পরাশক্তির বড় সহায়। এদের শহর আর এদের বিলাস মেটাবার জন্য এরা কৃষি জমি, নদী, বন, খনি আর নারী, শিশু, ভাষা সব বিকাতে আর পোড়াতে রাজি। এরা আর জাতির অংশ নয়, এরা বিজাতীয় পুঁজির রক্তস্রাব। সেই পুঁজির মূত্রফেনায় এরা ঢেকুর তুলতে বিন্দুমাত্র মর্মযাতনায় ভোগে না। তবুও আনু মুহাম্মদের মার খাওয়ার দৃশ্য কিংবা জাতীয় কমিটির ডাকা হরতাল অনেকের চিত্তে দ্বিধার জন্ম দিয়েছে। এটা ভাল। সুবিধাভোগীরা লড়াইয়ের বেগের সামনে পড়ে দুলতে থাকে, ছদ্ম প্রগতিশীলতার যুক্তিতে পাশ কাটাতে চায়। সেই দৃশ্য ভাসতে শুরু করেছে, ইনানো-বিনানো কান্না আর কোন্দল তারা গাইতে লেগেছে। লাগুক, জড়তা ভাংবার প্রথম মুহূর্তে এরকম দেখা যায়।

দুনিয়ায় কীসে থেকে কী হয়, দুয়ে দুয়ে কারা ঘর শূণ্য করে দেয় সেটা মানুষ বোঝে। কিন্তু কোন লড়াই তার লড়াই, সেটা প্রমাণের আছে দেশপ্রেমিক নাগরিক সংগঠনগুলোর। পরীক্ষা ছাড়া সীতাও পার পান নাই, আমরা তো কোন ছার! পরীক্ষা আমরা দেব, সেটা জনগণের কাছে। বুর্জোয়াদের তোষক-বালিশে মজমা বসানো ছারপোকাদের কাছে নয়।

যত ছোটোই জাতীয় সম্পদ রক্ষার এই হরতাল নতুন এক তরঙ্গ। আর আন্দোলন তো ব্যবসা নয় যে লাভ দেখে শেয়ার কিনব। কাল হারব জেনেও আত্মনিয়োগ প্রয়োজন, নইলে পরশু দাঁড়াবার জায়গা থাকবে না। আর পরশু যদি দাঁড়িয়ে থাকতে পারি, তার পরদিন মুখোমুখি টক্কর দেওয়ার তাকদ জনগণই যুগিয়ে দেবে। আমরা আশাবাদী। আমাদের অতীত লোপাট, বর্তমান বেদখল, একমাত্র ভবিষ্যতই আমাদের। ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/farukwasifblog/29009962 http://www.somewhereinblog.net/blog/farukwasifblog/29009962 2009-09-13 21:33:28
সোয়াইন ফ্লু : দায়গুলো অন্য কারো, মৃত্যুগুলো আমাদের
এ অবস্থায় সরকারের একটি সিদ্ধান্তে ভয় আরও বেড়েছে। এখন থেকে পরীক্ষা না করেই কারও সোয়াইন ফ্লু হয়েছে কি না তা শনাক্ত করা হবে। কারণটা সরকারি ভাষায়, ‘দেশে সোয়াইন ফ্লুর বিস্তার বেড়ে যাওয়ায়...’। দেশে সোয়াইন ফ্লু বেড়ে যাওয়ার প্রমাণ কী? প্রমাণ পত্রিকার সংবাদ। বুধবার পর্যন্ত আক্রান্ত ব্যক্তির সংখ্যা ২৫৯। পরীক্ষা ছাড়া এই ২৫৯ জন যে সোয়াইন ফ্লুতেই ভুগছে, তা বুঝব কীভাবে? এই পদ্ধতি অবৈজ্ঞানিক ও অনিরাপদ। এজন্যই প্রবাদে বলে, রোগী সারায় ডাক্তার কিন্তু ডাক্তার সারাবে কে? সম্প্রতি ভুল প্রেসক্রিপশনে নিষিদ্ধ ও ক্ষতিকর প্যারাসিটামল সিরাপ হয়ে সরকারি হিসাবেই ২৭টি নিষ্পাপ শিশুর ঝরে যাওয়া এখনো মনে কাঁটা বিঁধিয়ে রেখেছে। জনস্বাস্থ্য নিয়ে হেলাফেলার এই খাসলত তবুও গেল না?

তথ্যগুলো কীভাবে আসে?
আমাদের সরকার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং মার্কিন সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোলের (সিডিসি) পন্থাই অনুসরণ করছে। গত মে মাসে ডব্লিউএইচও মহামারির সতর্কতা লেভেল ৫ থেকে ৬-এ তোলে। এর অর্থ, মহামারি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। কীভাবে তারা এটা বুঝল? ঘটনার ধারা খেয়াল করুন। ২৯ এপ্রিল ডব্লিউএইচও জানায়, নয়টি দেশে ১৪৮ জন আক্রান্ত হয়েছে এবং মারা গেছে একজন। কিন্তু জানানো হয় না যে এই ১৪৮টি ঘটনার কতগুলো ল্যাব-পরীক্ষায় প্রমাণিত আর কতগুলো সন্দেহের ভিত্তিতে সাব্যস্ত। এটা না করে ডব্লিউএইচও ও সিডিসি একযোগে বলে যে যেহেতু রোগ ছড়িয়ে গেছে, সেহেতু এখন আর পরীক্ষার প্রয়োজন নেই (ডব্লিউএইচও, ব্রিফিং নোট, ২০০৯)। এর পরপরই ডব্লিউএইচও-র বৈশ্বিক পরিসংখ্যানে সোয়াইন ফ্লু আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে থাকে। তাদের যুক্তি অদ্ভুত, যেহেতু রোগ ছড়িয়েছে সেহেতু পরীক্ষা নিষ্প্রয়োজন। সদস্য দেশগুলোকে নিশ্চিত আক্রান্তের তথ্য দিতে না বলার কারণটি ডব্লিউএইচওর প্রধান মার্গারেট চ্যান পরিষ্কার করেননি। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, ১৩ আগস্ট পর্যন্ত গোটা বিশ্বে এক লাখ ৮২ হাজার ১৬৬ জন আক্রান্ত হলেও মারা গেছে মাত্র এক হাজার ৭৯৯ জন। এই এক হাজার ৭৯৯ জনের মৃত্যুর মূল কারণ যে সোয়াইন ফ্লু, তার বৈজ্ঞানিক প্রমাণও হাজির নেই। অথচ সিডিসি গত ২৮ মে বলছে, ‘আমাদের হাতে ১১-১২টি মৃত্যুর খবর আছে। ...এর মধ্যে ১০ জনের বেলায় অন্য রোগের উপস্থিতি ইনফুয়েঞ্জাজনিত সমস্যাকে মারাত্মক করেছে।’

এভাবে বাড়িয়ে ধরা এবং অন্য রোগের উপসর্গগুলোকে হিসাবে না ধরার ফল বিভ্রান্তিকর। ইংল্যান্ডে সম্ভাব্য আক্রান্ত হিসেবে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে তিন হাজার ৯০৬ জন। বিপরীতে স্কটল্যান্ডে নিশ্চিতভাবে আক্রান্তের সংখ্যা মাত্র ৪৩ জন। ব্রিটেনে অধিকাংশ তথ্য স্বাস্থ্যকর্মীর দ্বারা সংগৃহীত নয়। কেবল তাই-ই নয়, সেখানে অনলাইনে ও সরাসরি টেলিফোন নম্বর দিয়ে বলা হয়েছে, যাঁরা আশঙ্কা করছেন তাঁরা যেন ওই নম্বরে ফোন করে পরামর্শ নেন। যিনিই ফোন করছেন, তাঁর নাম আক্রান্ত হিসেবে লিপিবদ্ধ হচ্ছে। এভাবে সঠিক পদ্ধতি অনুসরণ না করায় আক্রান্তের সংখ্যা অনেক বাড়িয়ে দেখানো যাচ্ছে। একই জিনিস বাংলাদেশেও ঘটছে। ডব্লিউএইচও থেকে শুরু করে আমাদের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের রোগশনাক্ত পদ্ধতির বিবর্তনটা অনেকটা এ রকম: প্রথম ধাপে পরীক্ষা করা, পরের ধাপে সন্দেহের ভিত্তি ঠিক করা এবং সর্বশেষ রোগীকে নিজে নিজেই ঠিক করতে বলা (Self Categarization)। অথচ কে না জানে যে, রোগের উৎস, সঠিক অবস্থা ও ধরন না জেনে ব্যবস্থা নেওয়া আত্মঘাতী!

মেক্সিকোর ভেরাক্রুজ শহরের একটি গ্রাম থেকে এই ভাইরাস ছড়িয়েছে বলা হচ্ছে। যেখানে মেক্সিকোর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সোয়াইন ফুতে মৃতের সংখ্যা মাত্র সাত বলে নিশ্চিত করেছে, ডব্লিউএইচওর প্রধান দাবি করেছেন, মেক্সিকোয় সোয়াইন ফুতে মারা গেছে ১৭৬ জন!
আমেরিকায় একমাত্র সিডিসিই ভাইরাসের প্রকৃতি শনাক্ত করতে সম। গোটা আমেরিকা মহাদেশের তথ্যগুলোও তারাই সরবরাহ করছে। আর বৈশ্বিকভাবে তথ্য দিচ্ছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। তাদের এই একচেটিয়া অবস্থানের ভুল হলে, কে তা শোধরাবে? গলদটা গোড়ায় হলে সব ক্ষেত্রেই ভুল হতে বাধ্য। বার্ড ফুর বেলায় ডব্লিউএইচওর পদ্ধতি ও ভবিষ্যদ্বাণী ভুল প্রমাণ হয়েছে। তাই আজ জনস্বার্থে দাবি ওঠা দরকার যে রোগ শনাক্তকরণ, আক্রান্তের সংখ্যা নিরূপণ ও চিকিৎসা বিষয়ে স্বচ্ছতা আনা হোক। এসব বিষয়ে আইসডিডিআরবি কিংবা তাদের কোনো সিস্টার কনসার্নের একচেটিয়া অধিকার অতি বিপজ্জনক। ভোলা যাবে না যে, জনস্বার্থে বিপজ্জনক জীবাণু গবেষণার অভিযোগে এই প্রতিষ্ঠানকে এক দশক আগে সরকার কর্তৃক বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। এও মনে রাখা দরকার যে, এর প্রতিষ্ঠা হয়েছে ষাটের দশকে মার্কিন-পাকিস্তান-তুরস্ক মিলে সিয়াটো-সেন্টোর চুক্তির অধীনে। এই চুক্তির বিরোধিতা করেই ভাসানী আওয়ামী লীগ ছেড়ে ন্যাপ গঠন করেন।

কারও গুদাম পোড়ে, কেউ আলুপোড়া খায়
প্রবাদ হচ্ছে, কারও গুদাম পোড়ে আর কেউ সেই পোড়া আলু খায়; আবার লবণও চায়। বিশ্বব্যাপী কোটি কোটি মানুষকে সোয়াইন ফুর টিকা দেওয়ার জন্য তোড়জোড় লেগে গেছে। ডব্লিউএইচও প্রায় ৫০০ কোটি টিকা কেনার পরিকল্পনা নিয়েছে। মার্কিন সরকার বরাদ্দ করেছে ৪০০ কোটি ডলার। ফ্রান্সে বাধ্যতামূলক টিকাদানের খরচ ধরা হয়েছে ১০০ কোটি ডলার। মন্দার এই সময় ওষুধ কোম্পানিগুলোর একচেটিয়া ব্যবসা ঠেকায় কে? অথচ ১৯৭৬ সালে আমেরিকার নিউ জার্সির ফোর্ট ডিক্স সামরিক ঘাঁটি থেকে সোয়াইন ফু ভাইরাস ছড়িয়ে পড়লে ১২৫ মিলিয়ন ডলারের টিকাদান কর্মসূচি হাতে নেয় মার্কিন সরকার। চার কোটি লোককে টিকা দেওয়ার পর দেখা যায়, রোগের থেকে ওষুধ বেশি বিপজ্জনক। কর্মসূচিটি বন্ধ হয়। এই ভাইরাসে মারা গিয়েছিল সর্বমোট একজন। কিন্তু টিকায় মারা গেছে ৩০ জনেরও বেশি এবং ৫০০ জন আক্রান্ত হয়েছে গুইলেঁ-বার নামের মারাত্বক প্যারালাইসিসে (সিবিসি নিউজ আর্কাইভ)।

২০০৫ সালের বার্ড ফু-হিড়িকেও অনেক হইচই হয়। এর প্রতিষেধক তামিল ফুর পেটেন্ট নেওয়া ছিল মার্কিন ঝবধৎষব কোম্পানির। প্রতিরামন্ত্রী হওয়ার আগে ডোনাল্ড রামসফেল্ড ছিলেন এর সিইও। মন্ত্রী থাকা অবস্থাতেই তিনি এর বিরাট অঙ্কের শেয়ারের মালিক। বিশদ বলার সুযোগ নেই। কেবল এটুকু বলি, এ পর্যন্ত বেশির ভাগ টিকাই ব্যর্থ প্রমাণিত হয়েছে (http://www.i-sis.org.uk)। রোগ ঠেকানোর সেরা উপায় হচ্ছে, স্বাস্থ্যসম্মত জীবনপ্রণালী, দূষণহীন পরিবেশ ও সুষ্ঠু খাদ্যাভ্যাস। মিসাইল মেরে শত্র“ দমন করা যায়, কিন্তু মিসাইলসদৃশ অ্যান্টিবায়োটিক ও অ্যান্টি-ভাইরাস সব ক্ষেত্রে মানবশরীর সয়নি। বর্তমান সোয়াইন ফু-র চলতি ভ্যাক্সিনটিও কিন্তু ব্যবহারকারীদের শরীরে মারাÍক পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ÔIt’s The Vaccines Stupid!’ (Click This Link)

গোড়া আছে, সেখানে হাত দিন
বার্ড ফুর ঘটনায় ডব্লিউএইচও ভেবেছিল, স্থানীয় জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা যা-ই হোক, তাদের দ মেডিকেল আমলাতন্ত্রই মহামারি ঠেকাতে সম। ১৯৯৭ সালে ডব্লিউএইচও বিভিন্ন দেশের সরকারের সঙ্গে মিলে মহামারি রোধের একটা কৌশল দাঁড় করায়। আক্রান্ত এলাকাকে বিচ্ছিন্ন করে সবাইকে ধরে ধরে ভ্যাক্সিন (যদি থাকে) দিয়ে দেওয়াই ছিল এর কৌশল। কিন্তু এতে কাজ হয়নি। কারণ, এখনকার অণুজীবাণুগুলো দ্রুতই দুনিয়াময় ছড়িয়ে পড়তে পারে। বার্ড ফুর বেলায় তা-ই হয়েছিল।

যেসব কারণে মহামারির জন্ম হয় এবং যেসব এলাকা ঝুঁকিপূর্ণ সেসব কারণ দূর করা এবং সেসব এলাকাকে সহায়তা করার বদলে ধনী দেশগুলো জৈব গবেষণায় টাকা ঢেলেই খালাস। এরই ফল হলো দৈত্যাকারের ওষুধ কোম্পানির উদয়। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর দাবি, অ্যান্টি-ভাইরাল টিকাগুলো ওষুধ কোম্পানিগুলোর মুনাফার কবল থেকে উন্মুক্ত করে দেওয়া হোক, যাতে সরকারিভাবেই এগুলোর উৎপাদন ও বণ্টন করা যায়। সোয়াইন ফু সেই প্রয়োজনটাই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল। স্বাস্থ্য তদারকি, বৈজ্ঞানিক ও রোগনিয়ন্ত্রণকারী অবকাঠামো, সবার জন্য মৌলিক চিকিৎসাসেবা এবং বৈশ্বিকভাবে জীবনরাকারী ওষুধ সহজপ্রাপ্য করা দরকার। কিন্তু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা মনে হয় এর দায়িত্ব বহুজাতিক ওষুধ কোম্পানির হাতেই ছেড়ে রাখতে চায়। তামিল ফুর প্রতিষেধকের একচেটিয়া নিয়ে নিয়েছে রোশে, নোভার্টিস, বাক্সটার ও গ্ল্যাক্সোস্মিথকেইনসহ গোটা কয়েক কোম্পানি। এই সেপ্টেম্বরে টিকাগুলো বাজারে আসবে। বৈশ্বিক মহামারি ঘোষণার জন্য এরাই নিরন্তর ডব্লিউএইচওর ওপর চাপ জারি রেখেছিল। সোয়াইন ফু ভাইরাস দেখা দেওয়ার এক বছর আগেই ২০০৮-এর আগস্টে বাক্সটার এর টিকার পেটেন্টের আবেদন করে। এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে অস্ট্রিয়ায় এদের গবেষণাগার থেকে ভাইরাসবাহী উপাদান ছড়িয়ে পড়ার কথা ডব্লিউএইচও তো বটেই বাক্সটারও স্বীকার করেছে। এর জন্য তাদের কোনো শাস্তি হয়নি।

যে প্রক্রিয়ায় বার্ড ফু তৈরি হয়েছিল, সেই প্রক্রিয়াই সোয়াইন ফুর বিবর্তনকে এগিয়ে দিয়েছে। ভাইরাস বিশেষজ্ঞদের বিশ্বাস, অতি উৎপাদনশীল যান্ত্রিক কৃষি ও করপোরেট বাণিজ্যিক খাদ্যশিল্পই হলো ইনফুয়েঞ্জার রূপান্তরের কারণ। যেমন বার্ড ফু ছড়ানোর জন্য থাইল্যান্ডে শারোয়েন পকফান্ড এবং সোয়াইন ফুর জন্য মেক্সিকোয় খামার করা মার্কিন স্মিথফিল্ডকে দায়ী করা হয়। অদ্যাবধি এদের কেউ জরিমানা করেনি, কিন্তু জনগণের টাকার শ্রাদ্ধ করে অনির্ভরযোগ্য শত শত কোটি টিকা কেনা হচ্ছে। অন্যদিকে বার্ড ফুর ধাক্কায় বাংলাদেশসহ অনেক দেশের অজস্র ক্ষুদ্র খামার পথে বসেছে আর এখন সোয়াইন ফুর সময় মিসরসহ অনেক দেশের গ্রামীণ শূকরপালকেরা হাহাকার করছে। বহুজাতিক পরিবেশবিধ্বংসী খামার ও কারখানাগুলো গ্যাট ও নাফটা চুক্তির বলেই তৃতীয় দুনিয়ায় চলে আসতে পারছে এবং বিপর্যস্ত করছে এখানকার জীবন ও প্রাণীদের বাস্তুসংস্থান। এখানে শ্রম ও কাঁচামাল সস্তা এবং সরকার কমবেশি দুর্নীতিগ্রস্ত। সুতরাং নো জবাবদিহি, নো সতর্কতা। পাখি বা শূকরের কী দায়? সুতরাং সোয়াইন ফু না বলে একে নাফটা ফু বলাই শ্রেয়।

মার্কিন পিউ রিসার্চ সেন্টার তাদের এক যুগান্তকারী প্রতিবেদনে জানায়, ‘শিল্পের মাধ্যমে বিরাট আকারে গবাদিপশু উৎপাদন-ত্রেগুলোতে মারাÍক সব ভাইরাসের চক্র সৃষ্টি হয়ে চলেছে। এসব ভাইরাস মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমিত হওয়ার মতো রোগ-ব্যাধির জন্ম দিতে পারে।’ কিন্তু এসব কোম্পানি অমিত মতাধর। বিশ্বব্যাপী এদের রাজনৈতিক মতাও কম নয়। এরা পিউকে বাধা দেয় এবং তহবিল বন্ধের হুমকি আসে। বিশ্বের চিকিৎসা-ব্যবস্থা, চিকিৎসক ও চিকিৎসা পদ্ধতি অনেকভাবেই এদের হাতে বাঁধা। গত ২ সেপ্টেম্বর মার্কিন আদালত বহুজাতিক ওষুধ কোম্পানি ফাইজারকে ২.৩ বিলিয়ন ডলার জরিমানা করেছে ভুয়া ওষুধ তৈরি ও বিক্রির জন্য। এসব ওষুধ বাজারজাত করায় চিকিৎসকদের ঘুষ দেওয়া ছিল তাদের কৌশলের অংশ।

দায়গুলো তাদের কিন্তু মৃত্যু-ক্ষতি-ভয় কেন কেবল আমাদেরই?
সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ সন্ত্রাস কমাতে পারেনি, ভাইরাসবিরোধী যুদ্ধও ভাইরাস ঠেকাতে অম হবে। তবে ব্যবসায়িক দিক থেকে তাদের সফলতার কোনো জুড়ি নেই। এর মানে জনস্বাস্থ্যের আরও অবনতি এবং জীবন বাঁচানো ওষুধের ওপর বড় ওষুধ কোম্পানিগুলোর একচেটিয়া আধিপত্য। এসব করপোরেটের পাথুরে দেয়ালে মাথা খুঁড়ে মরে প্রতিকারের আশা ও সম্ভাবনা। যুদ্ধ-মহামারি-আর্থিক সংকট-জলবায়ু পরিবর্তন তারা ঘটায় কিন্তু মরে ও ধোঁকে সাধারণ মানুষ। দায়গুলো তাদের কিন্তু মৃত্যু-ক্ষতি-ভয় কেন কেবল আমাদেরই হবে?

কিন্তু আজ যখন মানবজাতি বিপন্ন, তখন আগুন কে লাগিয়েছে তা বেশি দিন গোপন থাকবে না। এক রিকশাচালককে বলতে শুনি, ‘যাক, কোথাও থোওয়া যায় না, তাই ভয়।’ আমরা ভীত, কারণ আমরা আমাদের ভয়গুলোকে কোনো সরকার, কোনো বিশেষজ্ঞ সংস্থা কিংবা কোনো বৈশ্বিক নেটওয়ার্কের জিম্মায় রেখে শান্তি পাচ্ছি না। কিন্তু আমাদের শিশুদের জীবনের দায়িত্ব, মানবজাতির অস্তিত্বের ভার নিতে হবে আমাদেরই। জনগণের সতর্কতা ও নজরদারির তাই কোনো বিকল্প নেই। কারণ, আমাদের কেবল আমরাই আছি।

(গত তিন তারিখে এই লেখার সংক্ষিপ্ত একটি সংস্করণ প্রথম আলোর উপসম্পাদকীয় পাতায় প্রকাশ পায়।) ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/farukwasifblog/29006888 http://www.somewhereinblog.net/blog/farukwasifblog/29006888 2009-09-08 17:28:46
বিকাল সাড়ে তিনটায় টিএসসিতে আনু মুহাম্মদসহ খনিজ রক্ষা আন্দোলনে হামলার প্রতিবাদে সভা
তারা বলে, দরকার হলে জীবন দেব, আনু ভাইয়ের জন্য। কুড়িগ্রাম থেকে প্রতিবাদ সমাবেশ ও মিছিলের খবর আসে। জাহাঙ্গীরনগরে দিনে দুটি করে মিছিল হওয়ার খবর পাই। শনিবার আবার তারা নামবে, গ্যাস-কয়লা আর তাদের শিক্ষক আনু মুহাম্মদের জন্য। দুটোকেই বাঁচাতে হবে। আনু ভাইয়ের ওপর এর আগেও হামলা হয়েছে, গাড়ি চাপা দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। টাটা-শেভ্রনের দালালরা হুমকি দিয়েছে। কোটি কোটি টাকা খরচ করে বিদেশ থেকে বিশেষজ্ঞ ভাড়া করে যমুনা রিসোর্টে তিন দিন ধরে সেমিনার করে কয়লাখনির জন্য, শতশত কোটি টাকা ঘুষ-বিজ্ঞাপন আর আইনুন নিশাতদের , ড. কামালদের কিনতে ব্যয় করে, তারা আনু মুহাম্মদদের শায়েস্তা করার তাকদ রাখে। নাইজেরিয়ায় শেল কোম্পানি কেন জারো ওইয়া নামের সেখানকার এক লেখককে ফাঁসিতে ঝুলিয়েছে। তারা অমিত ক্ষমতাধর।

আজও দেশের অনেক জায়গায় প্রতিবাদ হয়েছে। আজ আমরা জনসংস্কৃতি মঞ্চ থেকে সভা করছি টিএসসি স্বোপার্জিত স্বাধীনতা চত্বরে। বিকাল সাড়ে তিনটায়। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, বিচারপতি গোলাম রাব্বানী, সৈয়দ আবুল মকসুদ, পিয়াস করিম প্রমুখ সহ অনেকে যোগ দেবেন। আপনিও চলে আসুন।

ওই বুট ওই লাথি, ওই আমাদের শিক্ষক, ওই পড়ে মার খায় জনতার লোক]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/farukwasifblog/29004579 http://www.somewhereinblog.net/blog/farukwasifblog/29004579 2009-09-04 14:22:21
ওই বুট ওই লাথি, ওই আমাদের শিক্ষক, ওই পড়ে মার খায় জনতার লোক
আমাদের এই বিষাক্ত স্বাভাবিকতা, আমাদের এই অসহ্য কাপুরুষতা, আমাদের এই নির্লজ্জ নিরাপত্তাকাতরতার খেসারত দিতে দিতে আমাদের পশ্চাদদেশ লাল হয়ে গেছে, আমাদের সবুজ দেশটা ধর্ষণে ধর্ষণে মধ্যাঙ্গে স্থায়ী লাল রক্তিমা নিয়ে চললেও আমরা বলবো, ওই লাল স্বাধীনতার সূর্যের আভা। কোনো এক রাষ্ট্রদূতের থাপ্পর খেয়েও আমরা মুখে হাসি ধরে রাখি। দেশের মাটির তলার গ্যাসসম্পদ সাবাড় হয়ে গেলেও, সমুদ্রের গ্যাস বিদেশি বেনিয়াদের তুলে দেব বলে আমরা দিনবদলের সরকার আনি।
অবোধ পশু-পাখির সামনে ন্যাংটো হতে কেউ লজ্জা পায় না। এদেশের অসংগঠিত নেতৃত্বহীন জনতাকে হাসিনা-খালেদার সরকার, ইঊনূস-আবেদেন সিভিল সোসাইটি আর মরিয়ার্টি-পিনাক-ওয়ালিকদের কাশিমবাজার কুঠির বালবংশধররা দেশকে ন্যাংটো করতে লজ্জা বোধ করেন না। জনগণকে নির্বোধ ঠাউরে নিয়ে ন্যাংটা দশার খ্যামটা নাচে তারা বিব্রত হয়না। এই ন্যাংটার নাই বাটপারের ভয়ের দেশে আনু মুহাম্মদরা মার খাবেই।

ভুলতে গিয়েও তবু ভুলি না, এই ব্যক্তি ব্যক্তি নন কেবল। বাল্যকাল থেকে বিচিত্রায় লিখতে শুরু করা আনু মুহাম্মদ, দীর্ঘকাল বিপ্লবী রাজনীতির সংগঠক আনু মুহাম্মদ, জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও সম্পদ রা আন্দোলনের অন্যতম নেতা আনু মুহাম্মদ, দেশের প্রায় একমাত্র মার্কসীয় অর্থনীতিবিদ, বিশ্বব্যাংক-এডিবি-আর এনজিওদুর্গে অনবরত আঘাত হানা আনু মুহাম্মদ, ফুলবাড়ী কয়লাখনি রা আন্দোলনের সাফল্যের অন্যতম নায়ক ফুলবাড়ীবাসীর প্রাণাধিক আনু মুহাম্মদ, রাজনৈতিক অর্থনীতির জনপ্রিয় লেখক আনু মুহাম্মদ অনেক বিচারেই এক নিঃসঙ্গ বিদ্রোহী, এক বিরল শেরপা। বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশিরভাগ শিক্ষকের মতো নন তিনি। বেশিরভাগ বুদ্ধিজীবীদের মতো তিনি ক্ষমতার নানানমহলের মধু খেয়ে মহান হতে পারেননি। দালালির সুবিধায় ওপরমহলের রাকবচ জোটেনি তাঁর। তিনি এদের অনেকের জন্য অনিরাপদ। তাই গোপন মহল থেকে তাঁর বিরুদ্ধে হুমকি আসে অনবরত। তাঁর রিকশাকে আঘাত করে পা ভেঙ্গে দিয়ে যায় অচেনা পাজেরো। তাঁর ওপর বোমা পড়ে। আর আজ বাংলাদেশের পুলিশ সমুদ্রের গ্যাস বিদেশিদের তুলে দেওয়ার প্রতিবাদ মিছিল থেকে তাঁকে রাজপথে শুইয়ে পেটায়, লাথি মারে।

ওই পুলিশ আর তাদের অভিভাবক সাহারা খাতুন, ওই ওসি আর তার প্রভু বেনিয়া অধিপতি, ওই সরকার আর তার প্রভু মার্কিন-ভারত, তারা ওখানে এক অধ্যাপককে এক শিক্ষককে এক প্রতিবাদী মনীষাকে পদাঘাত করছে না কেবল, পদাঘাত করছে বাংলাদেশের বিলুপ্ত প্রজাতির এক মানুষকে, যিনি তাঁর সামর্থ্যরে সর্বস্ব দিয়ে জনতার সংগ্রামের সামনের সারির লোক, সার্বভৌমত্বের এক নিঃসঙ্গ কিন্তু অবিচল প্রতিনিধি। আজ তাঁকে তারা লাঞ্ছিত করেছে। তা করার আগে ওই পুলিশকে, ওই মন্ত্রীকে, ওই সরকারকে এবং কাল বেশিরভাগ পত্রিকায় মামুলিভাবে ছাপা হওয়া এই সংবাদটির সাংবাদিকরা কি তাদের সভ্যতার পোশাক, তাদের মানবিকতার শিক্ষা, তাদের দেশাত্মবোধের দায় সব খুলে অসভ্য, অমানবিক, বর্বর, গণবিরোধী এক সুবিধাবাদী কীট হয়ে যায়নি? যাচ্ছে না কি?

এই কীটেরা আজ দেশকে খাবলে খাচ্ছে। জনতাকে ধোঁকা দিয়ে মার দিয়ে চুপ করিয়ে রাখছে। দেশকে যুগের পর যুগ ধরে বিক্রি করে দিতে দিতে তারাও সব বিক্রি হয়ে গেছে। আশা মরলেই সুবিধাবাদ জন্মায়। তারা আশাহীন, তাই আত্মবিক্রয়ের সোনা সঞ্চয় করে চলেছে। তাদের সোনার ভোগে লাথি থথু ধিক।

তবুও আমরা সব সয়ে যাই। কারণ আরামের বিষ্ঠায়, ভয়ের গাদে আর লোভের পাপে আমরা এতদিনে কচ্ছপের মতো শক্ত খোল বানিয়ে নিয়েছি। বিপদ দেখলে তাতে ঢুকে পড়া রপ্ত করেছি। মাঝে মাঝে আরামে বা ব্যারামে তারা গলা বাড়ায় বটে, তবে ওটুকুই সার। দেশের মাটিতে তারা কেবলই অসার। ফুলবাড়ী-কানসাটের শহীদ কৃষকসন্তানরা মাঝে মাঝে এই খোলে আঘাত করেন, মাঝে মাঝে আনু মুহাম্মদরা এই খোলে মাথা ঠোকেন, কিন্তু কুম্ভের ঘুম ভাঙ্গে না। আনু মুহাম্মদরা ভাঙ্গেন কিন্তু কদাচ মচকান না।

আনু ভাই, আপনার এই অবমাননা ব্যক্তিগত নয়, জাতীয়। আপনার সঙ্গে আর যারা মার খেয়েছে তারাও এই দুষ্কালে অল্পকটি শিখা। এই শিখা নিভবে না, কারণ আঘাত আছে, কারণ দেশ ভেতরে ভেতরে জ্বলছে, কারণ ভদ্রলোকরা সুখে থাকলেই দেশের মানুষ সুখে থাকে না। এই অসহায়ত্ব এক মুহুর্তের জন্য ভুলি না। তাই আমরা লড়ে যাই, কিছুটা বাঁচি কিছুটা মরি, পারলে মারি, আবারো লড়ি। এই আমাদের ব্রত এই আমাদের দগ্ধ ক্ষত।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/farukwasifblog/29003659 http://www.somewhereinblog.net/blog/farukwasifblog/29003659 2009-09-02 20:14:52
সিভিকো-মিলিটারি-কর্পোরেট গণতন্ত্রে জনগণ কি আছেন? ভোটারদের সত্যাগ্রহ লেখাটি কিছু বিতর্ক ও গুরুত্বপূর্ণ ভাবনাকে উস্কে দিয়েছে। বিশেষ করে বন্ধু এম হাসান হীরা ফেসবুকে আমার আগের লেখার লিংকে যে প্রশ্ন তুলেছেন তার প্রেক্ষিতে চিন্তাটাকে আরেকটু খোলাসা করা জরুরি মনে করলাম। গত তিন বছরে যা ঘটেছে তার দাগগুলো পাঠ করা এবং ভবিষ্যত রাজনীতির মানচিত্র ধরাই ছিল আমার ইচ্ছা। একইসঙ্গে সত্যিকার দিনবদলের সনদের ভূমিকা কী হতে পারে সেদিকেও চোখ রেখেছি। শুরু করেছিলাম মন্তব্য দিয়ে। পরে দেখি বড় হয়ে গেল।

জনগণ কি আছেন?
আমাদের এখানে শিক্ষিত বাবুদের একটা কালচার হচ্ছে, সবকিছুর জন্য জনতাকে দোষারোপ করা। কেউ তাদের রাজনীতি-সচেতন দেখতে চায়, কেউ তাদের হেদায়েত করবার চায়, আর কর্পোরেট সিভিল সোসাইটি ও এনজিওরা চায় তাদের আলোয় ভরিয়ে দিতে। এঁরা সবাই জনগণকে করতে সর্বদা উত্তেজিত থাকেন। কিন্তু জনগণও (আপাতদ শব্দটাকে হিসেবের সুবিধার জন্য অখন্ড রাশি হিসেবে ধরে নিচ্ছি ) যে নীরব অ্যাকশনে রাজনৈতিক নেতৃত্ব বিনাই কিছু কিছু কাজ করে, যাকে আমলে নিতে হয়, সেটা দেখানোই আমার মূল প্রতিপাদ্য ছিল।

এদেশে জাতি নেই জনতা আছে
আমাদের কলোনিয়ালিজম ও বর্ণপ্রথার সংক্রমণ ঘটা এই দেশে অখন্ড জাতি বলে কিছু নেই। আধুনিক জাতিগঠনও ইউরোপের মতো এখানে হয়নি। এখানে ব্রাহ্মন-মুঘল-পাঠান এবং ইংরেজি বা আরবি-উর্দু শিক্ষিত বাঙালি আর বৃহত্তর কৃষক-কারিগর-ব্রাত্য আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সমাজ ও জাত এক নয়। ফলে উপনিবেশিত বাস্তবতা রয়ে যাওয়া এই রাষ্ট্রের ভেতরে একদিকে উচ্চবর্গীয় জাতীয় প্রকল্প অন্যদিকে নিম্নবর্গীয় শ্রেণীপুঞ্জকে এক দাগে রাখা সম্ভব না। কেবল শ্রেণী দিয়েও বা শ্রমিক বলেও পুরাপুরি চেনা যাবে না, ধরা যাবে না।

বিশিষ্ট মার্কসবাদী স্লাভোস জিজেক যেমন বলছেন, ‌'কমনস', যারা সব অর্থে তলার বাসিন্দা। এদের মধ্যে মধ্যবিত্তের একটা অংশও আছে। আছেন নারীরা, সমগ্র কৃষক জনগোষ্ঠী, কওমি মাদ্রাসা পড়ুয়ারা, আছে বিহারি শরণার্থী, উত্তর-দক্ষিণের পরিবেশ উদ্বাস্তু, ঢাকা-চট্টগ্রামের বস্তিবাসী, হিজড়া, পাহাড়ি জনগোষ্ঠী, মান্দি-সাঁওতাল প্রভৃতিরা। এই তলার অংশকেই মোটাদাগে জনগণ বলছি। এটাকে একটা পিছল প্রত্যয় হিসেবে ব্যবহার করেছি। বৈশিষ্ঠ্যের ও রাজনৈতিক কর্মসূচিভিত্তিক তত্ত্বের ছাই দিয়ে একে পরে শ্রেণী-বর্গ-সম্প্রদায় ও স্বার্থ দিয়ে আলাদা আলাদা করে বুঝতে হবে একথা ঠিক, কিন্তু উচ্চবর্গের বিপরীতে তারা চিরন্তন জনগণ, এবং তাদের জীবন চলে চিরন্তন জরুরি অবস্থার মধ্যে। তার ভেতরেই তারা নড়াচড়া করে, ফাল দেয় ও মানিয়ে নেয়। তাদের জীবন বয়ে যায়। তাদের দিনবদল হয় না, যদি না বিপ্লবীরা সেই দিনবদলের সনদ তৈরি করে, জনপ্রিয় করে এবং তার জন্য লড়াই করে। এই লড়াই আজকের পরিবেশে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক প্রভাব সৃষ্টির পথে, একটু একটু করে ট্রেন্চ দখলের সাংষ্কৃতিক পথে এবং চূড়ান্তভাবে নির্বাচন ও গণঅভ্যুত্থান পরিচালনার তাকদ অর্জনে সফল হবে। এর জন্য প্রয়োজন নতুন শুরু, নতুন আবির্ভাব।

লেনিন একদা লিখেছিলেন, পর্বতারোহণের মাঝখানে গিয়ে দেখলেন যে আর ওঠা যাবে না এ পথে। তখন আপনাকে আবার নেমে গিয়ে অন্য পথে যাত্রা শুরু করতে হবে, যদি আপনি শিখর ছুঁতে চান। বাংলাদেশের বামপন্থিদের অবদান অনেক। তাদের বড় অংশই সৎ ও নিষ্ঠাবান বলে মনে করি। কিন্তু বৈরী অভিজ্ঞতার চাপ, ক্রমাগত ভুল ও বাস্তব পরিস্থিতি বলছে, অসফলতার পাহাড় থেকে নেমে বিপ্লবের পর্বতমুখে আবার যাত্রা শুরু করতে। লেনিনই তো বলেছিলেন, যে উত্তরাধিকার আমরা অস্বীকার করি। আমাদের এখন দুর্বল-নাজুক-আত্মতৃপ্ত আপসের উত্তরাধিকার ত্যাগ করে সংগ্রামের ও বিচক্ষণতার উত্তরাধিকারকে তুলে ধরবার প্রয়োজন রয়েছে।

রাষ্ট্র যখন সমাজের বিরুদ্ধে
আমার দ্বিতীয় উপপাদ্য ছিল যে, জনগণ যেমন সরকার তেমন নাও হতে পারে। হেগেলের দেশ জর্মনে কিংবা ইউরোপীয় দেশগুলোতে যেখানে এরকম উপনিবেশিক ভেদ বা জাতপ্রথা ছিল না, ছিল না আশরাফ-আতরাফ, (একদা ইহুদি, জিপসি ও মুসলিমদের দাবিয়ে রাখা হয়েছে কিংবা আজকে মুসলিমরা ইউরোপের সংখ্যালঘু হিসেবে সেসময়কার ইহুদিবিদ্বেষের মতো জাতবিদ্বেষের শিকার একথা আমরা মনে রাখছি অবশ্য। বর্তমান আলোচনায় এই বিশেষ অবস্থার আলোচনা জরুরি নয়।) এবং সেখানে শিল্পবিপ্লব ও রিফর্মেশন ইত্যাদির মাধ্যমে আধুনিক জাতিগঠন প্রকল্পে একধরনের বানানো রাজনৈতিক ঐক্য সৃষ্টি করা হয়েছে। এর ভিত্তিতে সেখানে কমবেশি জাতীয় রাষ্ট্র নির্মাণ হয়েছে এবং জাতীয় সরকারও প্রতিষ্ঠিত আছে। হেগেলের কথা সেসব দেশে সত্য হতে পারে। কিন্তু আমাদের এখানে রাষ্ট্র ও নাগরিকদের মধ্যে উপনিবেশিক বৈষম্য, শাসক ও শাসিতের মধ্যে প্রভু ও অধীন সম্পর্ক, জাতীয় ও আঞ্চলিকের মধ্যে কেন্দ্র ও প্রান্তিক বিভাজন। ইউরোপীয় পুঁজিবাদে ক্যাপিটাল আর লেবারের মধ্যে থাকে কেবল ম্যানেজার। পুঁজি ও শ্রমিকের মধ্যে এখানে জমিদার-মহাজন-মধ্যস্বত্বভোগী বসে থাকে। সুতরাং এখানে সবসময় জনগণ ও জাতি এক নয়, জনগণের বড় অংশের সম্মতির ভিত্তিতে রাষ্ট্র এখানে কাজ করে না।

'ডমিন্যান্স উইদাউট হেজিমনি'
ফলে এই রাষ্ট্রের শাসন হেজিমনি বা আদর্শিক বুঝ দিয়ে হয় না, হয় সরাসরি বলপ্রয়োগে। ঠিক যেমনটা ইংরেজ আমলেও হতো। এ অর্থেই আমি বলি, এখানে জনগণ যেমন সরকার তেমন নয়। উভয় পদার্থ এখানে বিক্রিয়া করে না, মেশে না। (একইকারণে মধ্যবিত্ত-বুর্জোয়া থেকে আসা বিপ্লবের প্রতিনিধিরাও পায়ের তলায় মাটি পান না।) এবং কোনো আইন বা আদর্শের বন্ধন এদের মধ্যে তেমন জোরদার নয়। এখানে চলে, 'ডমিন্যান্স উইদাউট হেজিমনি'।
এর ফলে বহিরাগত বা স্থানীয় শাসকরা এখানে তাদের শেকড় জনগণের ভেতর তেমন চারিয়ে দিতে পারে না। তাহলেও সেভিয়েত পতনের পরের এক দশকে (এনজিও-মিডিয়া-মিভিল সোসাইটির জয়জয়কারের এ যুগ মুক্তবাজারেরও প্রধান্য বিস্তারের যুগ) বাজারের সঙ্গে সঙ্গে বিরাট মধ্যবিত্ত গড়ে উঠেছে। এদের মধ্যে সরাসরি সাম্রাজ্যবাদ তাদের প্রতিষ্ঠান এবং তাদের জীবনাদর্শের প্রতি সমর্পিত হবার আকাংখা তীব্র হয়েছে। দেশীয় শাসক-বিত্তবানদের নব্বইভাগই পরিণত হয়েছে দালাল শ্রেণীতে। একইসঙ্গে নগর প্রসারিত হয়েছে এবং তা হয়ে দাঁড়িয়েছে সাম্রাজ্যবাদ ও গণশত্রুদের দুর্গ। এসবের মাধ্যমেই বাংলাদেশ রাষ্ট্র তার অধীন জনগণের ওপর মতাদর্শিক প্রভাব তথা উন্নয়ন, ক্ষুদ্রঋণ, সন্ত্রাসদমন, গণতন্ত্র, মুক্তবাজার, নারীর পণ্যায়ন, ভোগবাদ, প্রকৃতিদখল ইত্যাদি বিষয়ে শাসকগোষ্ঠীর চিন্তা ও ভাবাদর্শকে কিছুটা গেঁথে দিতে সক্ষম হয়েছে, অর্থাৎ অধিপতিদের মতাদর্শের হেজিমনি জনগণের মধ্যে কিছুটা সংক্রমণ ঘটিয়েছে।
গত নির্বাচনে সেকারণে জনমতের প্রবাহিত হওয়ার খাত তারাই ঠিক করে দিতে পেরেছে বলে মনে হয়। এ নির্বাচনকে তাই শাসক মতাদর্শের সাময়িক আধিপত্য কায়েমের লগ্ন বলেও চিহ্নিত করা যায়। সাময়িক কারণ, স্বার্থের চরম শত্রুতার কারণে এ দুইয়ের এক হওয়ার কোনো সুযোগ বর্তমান রাষ্ট্রব্যবস্থায় নেই। কারণ, এই রাষ্ট্র সরাসরি সমাজের বিরুদ্ধে এবং জনগণের অস্তিত্বের বিপরীত কোণে বেড়ে উঠেছে।

গণশত্রুদের সিভিকো-মিলিটারি-কর্পোরেট গণতন্ত্র
''উপনিবেশিক যুগেও গণতন্ত্র ছিল। সেখানে কেবল অভিজাত-বাবু ও লাটসাহেবদের হাতেই ক্ষমতা থাকতো। আজকের পরিস্থিতি তার থেকে ভিন্ন কী? ১৯৩০ এর দশকের শেষে ৪৮ শতাংশ কৃষকের হাতে দুই একর করে জমি ছিল। আশিভাগ মানুষই ভূমির অধিকারি ছিলেন। আজ প্রায় আশিভাগ মানুষ ভূমিহীন, সত্তর ভাগ দারিদ্র্য সীমার নীচে। এই ব্যবধান ক্রমেই বাড়ছে। রাজধানী ঢাকায় দাসোপম দারিদ্র্য আর দাসমালিকসম সম্পদের কেন্দ্রীভবন বিষম চেহারা পাচ্ছে। প্রবৃদ্ধি যা হয় তার সমস্ত সুফলভোগী মধ্যবিত্ত-উচ্চবিত্তরা। তারা দেখছে, সম্প্রতি তাদের জীবনে যে বিলাস ও স্বাচ্ছ্যন্দ এসেছে, তার বিরুদ্ধে তলার লোকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ দানা বাঁধছে। এরকম অবস্থায় যে সরকারই দমনমূলক কার্যক্রম নেবে, এলিট বাহিনী গঠন করে এই ক্ষমতাবান শ্রেণীগুলোকে নিরাপত্তা দেবে, তাদেরই এরা সমর্থন করবে। জঙ্গি বা মাওবাদী দমন কাজে তাই এদের এত উৎসাহ।

এভাবে সিভিকো-মিলিটারি-কর্পোরেট উন্নয়ন রূপ নিচ্ছে ফ্যাসিবাদের। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, অধিকার রক্ষা কিংবা দারিদ্র্য বিমোচন তো দূরের কথা তারা নিজেরাই ঐসব আকাংখার ধামার ওপর চেপে বসে ইংরেজ আমলের মতো নতুন উপনিবেশিক দখলদারির সহযোগী হয়ে উঠেছে। গত এক শতকের উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের ফল যদি এই হয়, তাহলে আজ একে চ্যালেঞ্জ জানাবার সময় এসেছে। দরকার হয়ে পড়েছে এর ঘোর থেকে বেরিয়ে আসার। মুক্তির পথযাত্রী বাংলাদেশের ১৫ কোটি মানুষের সহস্র বছরের বঞ্চনা, অপমান, দাসত্বের ঘেরাটোপ থেকে বেরুনোর সংশপ্তকীয় সংগ্রামে সামিল হবার। তার জন্য সবার আগে প্রয়োজন রাজনীতির ইস্যুকে রাজনীতি দিয়ে বুঝে নেবার। দ‌রকার রয়েছে হারানো দাবিগুলোর পক্ষে আবার দাঁড়াবার।'' ('জরুরি অবস্থার আমলনামা'/শুদ্ধশ্বর/ শাহবাগ)

হারানো দাবিগুলোর সপক্ষে
''মার্কিন নিওলিবারেলিজমের বাহন সিভিকো-মিলিটারি-কর্পোরেট গণতন্ত্রের প্রধান বৈশিষ্ঠ্য বিরাজনীতিকরণ। তিরিশের দশক থেকে ভূমি সংস্কার, জাতীয় মুক্তি, সার্বভৌমত্ব, সাম্য, জাতীয়তাবাদ, শিল্পায়ন, মেহনতির মুক্তি ইত্যাদি প্রত্যয় রাজনীতির আবেগ ও নির্দেশনা হিসেবে হাজির ছিল। আজ তারা নিপীড়িত শ্রেণী ও জনগোষ্ঠীর বিকাশের এ দাবিগুলোকে তাদের নিজস্ব এজেন্ডা দ্বারা প্রতিস্থাপন করেছে। শিক্ষিত সমাজের বৃহত অংশের ওপর তাদের এসব চিন্তার আধিপত্যও প্রতিষ্ঠা হয়েছে। মিডিয়া ও এনজিও এরই এমবেডেড বাহিনী। সমাজের জায়গায় তারা প্রতিষ্ঠা করেছে ক্যালিবান সিভিল সোসাইটি, আর বুদ্ধিজীবীরা হলো রবিনসন ক্রুশোর অর্ধসভ্য-অর্ধবন্য ফ্রাইডে। রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব বদলে গেছে পুঁজি ও কর্পোরেটের একচ্ছত্র ক্ষমতায়। রাজনৈতিক সমাজ, সিভিল সোসাইটি ও মিলিটারির অসবর্ণ বিবাহ হয়ে যাচ্ছে তাদের হাতে। সাবেকি বুর্জোয়া রাজনীতিবিদদের ক্ষমতার ভিত টলে গেছে। সমাজকে লুণ্ঠিত ও ক্ষমতাহীন করার ফলে সমাজ আর তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসবে না, সেই শক্তিও সমাজের নেই_ যেটা জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের যুগে ছিল।
আবার যেহেতু দক্ষ প্রশাসনিকতা ও ব্যবস্থাপনা দেওয়ার মুরদও এরা রাখে না, সেহেতু বিশ্বের চালক অর্থনৈতিক ও সামরিক সংস্থাগুলোর আস্থাও তারা হারিয়েছে। উপরন্তু তাদের সামনে চ্যালেঞ্জ নিয়ে দাঁড়ানো সিভিল সোসাইটি। এদের আন্তর্জাতিক যোগ পোক্ত, তারা বিশেষজ্ঞ জ্ঞানের অধিকারী সুতরাং তাদের প্রশাসনিকতা ও ব্যবস্থাপনা মজবুত (গুড গভর্নেন্স ও গুড ম্যানেজমেন্ট)। অতএব তারাই ফিট।

সব শাসনের ভিতে থাকে আইন ও বলপ্রয়োগের ক্ষমতা। এক্ষেত্রেও সিভিল সোসাইটির ভিত দুর্বল হওয়ার জো নাই। রাষ্ট্রের স্থায়ী দুই খুঁটি আমলাতন্ত্র এবং সেনাবাহিনীর সঙ্গে তদের মিলন তো সোনায় সোহাগা। সোনা আর সোহাগার এই মিলনে মুক্তির রাজনীতি কি তবে কর্পূরের মতো উবে যাবে? হ্যাঁ, এক ধরনের রাজনীতির দিন শেষ। আবার এরকম পরিস্থিতিতেই নতুন রাজনীতির উদয় হয়।

তার জন্য আবার আমাদের ফিরিয়ে আনতে হবে বুনিয়াদী রাজনৈতিক প্রশ্নগুলো_ যে প্রশ্নগুলোকে তারা নিওলিবারেল শব্দবন্ধ দিয়ে সরিয়ে দিয়েছে। জনবিচ্ছিন্ন বিকেন্দ্রীকরণ জনগণের রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের পথ বন্ধ করারই কৌশল। গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তিদানের নামে ক্ষমতাকে সমাজের বাইরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। কৃষকের প্রাণের দাবি ভূমি সংস্কারের মাধ্যমে জমির মালিকানা ফেরত পাওয়া। এটা দমাতে ও বিভ্রান্ত করতে ক্ষুদ্রঋণের কর্মসূচি আনা হয়েছে। নারীকে পুরুষতন্ত্রমুক্ত করার কর্মসূচিকে নারীর ক্ষমতায়নের নামে একদিকে অধিকতর শ্রমশোষণ অন্যদিকে তার যৌনতাকে বাজারের ভোগ ও চোষণের টানেলে ঢোকানো হচ্ছে। রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রশ্নকে 'ওয়ার অন টেররের' পরিভাষায় ব্যক্তির নিরাপত্তার প্রশ্ন হিসেবে দাঁড় করানো হয়েছে। ব্যক্তি স্বাধীনতা ও মৌলবাদ প্রতিরোধের নামে জাতীয় রাষ্ট্র আজ করদ রাজ্যে পরিণত হয়েছে। দেশ চলছে কাশিমবাজার কুঠির নির্দেশে।

এই সিভিকো-মিলিটারিতন্ত্রের মডেল সবচে ভাল দেখা যায় মার্কিন প্রশাসনের মধ্যে। রাজনীতি ও রাষ্ট্রমতার কেন্দ্র থেকে জনগণকে সেখানে ‘চিরতরে’ সরিয়ে রাখা হয়েছে। আমেরিকার নতুন বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তোলার এই-ই হলো তরিকা। এখন আলোকিত বিশেষজ্ঞরা মগজ বেচে এরই খয়েরখাঁগিরি করে। সিভিকো-মিলিটারি জোট পুঁজির পথের কাঁটা সরায় বলপ্রয়োগের হস্তে। সাম্রাজ্যবাদের ঢালাইমেশিনে এরা এখন এক ছাঁচে গড়া হচ্ছে। ষাট থেকে আশির দশকে ল্যাটিন আমেরিকায় যে কায়দায় গণআন্দোলন দমন করা হয়েছিল, এখানেও সেই একই কায়দায় এলিট বাহিনী দিয়ে রাষ্ট্রের শঙ্কা নাশ করা হচ্ছে। ভারতে মাওবাদী উত্থান আর মুসলিম মিলিট্যান্সি সামাল দিতে এবং নেপালের মাওবাদী জোয়ার এদিকে যাতে না ছড়ায় তার জন্য তৈরি করা হচ্ছে অটুট নিরাপত্তাজাল।'' ('জরুরি অবস্থার আমলনামা'/শুদ্ধশ্বর/ শাহবাগ)

'প্রগতি ও গণতন্ত্র'কে নতুন করে সংজ্ঞা দিতে হবে
আজ গণতন্ত্র, উন্নয়ন, নির্বাচন, সুশাসন ও প্রগতির সংজ্ঞা পাল্টে যাচ্ছে। ষাট-সত্তর দশকে জাতীয়বাদী আন্দোলনের যুগে এগুলো জনগণের রাজনৈতিক মুক্তিকে বোঝাতো। রাজনৈতিক মুক্তির প্রশ্নকে আজ কর্পোরেট ক্যাপিটাল, সাম্রাজ্যবাদ ও তাদের রংবেরংয়ের সহযোগিরা হঠিয়ে এনেছেন ছদ্ম-মুক্তির নানান এজেন্ডা। ইরাকে গণতন্ত্র ও শান্তির নামেই হামলা হয়েছিল, আফগানিস্তানে নারী মুক্তির নামেই আগ্রাসন চলেছে, ফিলিস্তিন বা কাশ্মীরে সন্ত্রাস দমনের নামেই জাতিগত গণহত্যা চলে আসছে। আধুনিকতার দোহাই দিয়েই কর্পোরেট-মিডিয়া ভোগবাদী কামজর্জর তারুণ্যের নির্মাণ ঘটাতে চায়। উন্নয়নের নাম করেই তৃতীয় দুনিয়ার নিঃস্বকরণ চলছে। বিশ্বের চারশো কোটি কৃষিজীবীর অস্তিত্ব আজ উন্নয়নের নামেই হুমকির মুখে, অন্যদিকে যুদ্ধ পরিণত হয়েছে স্থায়ি ব্যাপারে। গণতন্ত্রের বটিকা গেলানোর পথেই আমাদের মতো দেশের পরজীবী শাসকদের কেনাবেচা সহজ হয়ে গিয়েছে। এই শব্দগুলো তাই কোনো নিরীহ টার্ম নয়, এগুলো তীব্রভাবে রাজনৈতিক বাগধারা। এসবের খপ্পর থেকে বেরিয়ে জনগণের নিজস্ব রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার জনগণতন্ত্র কায়েমের শর্ত।

সিভিকো-মিলিটারি-কর্পোরেট গণতন্ত্র আর জনগণের সত্যিকার গণতন্ত্রের বিরোধই হবে আগামী দিনের বাংলাদেশের মূল রাজনৈতিক বিরোধ। বাকিসব একে আড়াল করবারই রংঢং মাত্র। এইসব রংয়ে রঞ্জিত হতে দেওয়া কেবল রাজনৈতিক সুবিধাবাদই নয় আজ, বিপন্ন মানবজাতি তথা বিপন্ন স্বদেশের মানুষের সঙ্গে বেইমানির সামিল।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/farukwasifblog/28997512 http://www.somewhereinblog.net/blog/farukwasifblog/28997512 2009-08-21 17:22:40
গত নির্বাচনে ভোটারদের ‘সত্যাগ্রহের’ অপ্রকাশিত কিছু সত্য
নির্বাচনটি যে ‘ঐতিহাসিক’, তা নিয়ে কারও সন্দেহ নেই। মতার মসনদ কার হলো তার নিরিখে নয়, কীভাবে এবং কোন অবস্থায় এমন ‘ঐতিহাসিক’ বিজয় এসেছে, তার বিচারে। জরুরি অবস্থা, জেল-জুলুম, ফৌজি হম্বিতম্বি মানুষকে খুব একটা উত্তেজিত করেনি। তারা বরং উপযুক্ত মুহূর্তের জন্য অপো করেছে। ২৯ ডিসেম্বর ২০০৮-এর মোম মুহূর্তে ভোটারের বেশে তারা তাদের ‘নীরব’ অ্যাকশনটি করে দিয়েছে। সেটাই ছিল তাদের এক ঢিলে দুই পাখি মারার কর্ম। একদিকে সেনা-সমর্থিত জরুরি অবস্থা, অন্যদিকে রাজনীতি-আশ্রিত দুর্নীতিবাজ, ধর্মব্যবসায়ী, মিথ্যার ব্যাপারিদের জবাব দিয়ে দেওয়া। মওলানা ভাসানীর ভাষায় ‘অলাইকুম আসসালাম’ বলে দেওয়া।

জরুরি অবস্থা অনেক ক্ষেত্রেই আইনের বরখেলাপ ঘটিয়েছিল। তার জবাবে আইন অমান্য প্রতিবাদ তেমন হয়নি। এ জন্যই একে বলছি গান্ধীর সত্যাগ্রহ বা শেখ মুজিবের অসহযোগ। আজকের সীমিত গণতন্ত্রের টাইট বাঁধনে গণ-আন্দোলনের সুযোগ থাকে না। এ রকম অবস্থায় নির্বাচনের মাধ্যমে অপশাসন পাল্টানোর সুযোগ নিতে দেখা যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের গত নির্বাচন এর আদর্শ উদাহরণ। মানুষ মনের মতো সরকার পায়নি সত্য, কিন্তু ‘যারে সইতে নারি’ তার বিদায় হয়েছে। এ জন্যই তা ‘সত্যাগ্রহ’। কিন্তু কোন সত্য তারা সেদিন তুলে ধরেছিল? জনতার সেই সত্য আর জনতা-সমর্থিত সরকারের সত্য কি এখন এক দাগে এক মাপে মিলছে? দাগে-দাগে মিলিয়ে দেখা যাক।

এক. ২৯/১২-এর নির্বাচন সরাসরি ১/১১-এর খণ্ডন বা নেমেসিস। যে অবস্থা ও যে শক্তি একে ডেকে এনেছিল, ২৯/১২-তে জনগণ তাদের অস্বীকার করেছে। নির্বাচনের আগে ইলেকশন ওয়ার্কিং গ্র“পের (ইডব্লিউজি) এক জরিপে দেখা যায়: ৮৭ ভাগ ভোটার মনে করে, যে দলেরই সরকার হোক, নির্বাচিত সরকার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের চেয়ে ভালোভাবে দেশ চালাবে ((http://asiafoundation.org)। নিশ্চয়ই দ্রব্যমূল্য বাড়া এবং মতার অনেক কর্তার দুর্নীতি তাদের এটা ভাবতে বাধ্য করেছিল।

দুই. ১৯৫৬ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগ মরণধাক্কা খেয়েছিল, বিএনপি-জামায়াত জোট তেমন ধাক্কা না খেলেও, তাদের চালচলন বদলাতে হবেই, হুঁশিয়ারির সেই লাল পতাকা ভোটাররা উড়িয়ে দিয়েছেন। আওয়ামী লীগের হাতে আছে আরও প্রায় সাড়ে চার বছর, কিন্তু বিএনপির হাতে সেই সময় নেই, যদি পরের নির্বাচনে সবুজ কার্ড পাওয়ার আশা দলটি করে থাকে।

তিন. প্রমাণিত হয়েছে ‘বিদেশি বন্ধুরা’ নয়, জনগণই বাংলাদেশি গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় সহায়। বিদেশিরা সমর্থন দিয়েছিল ১/১১-এর অনির্বাচিত সরকারকে। অথচ ২০০৮-এর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে প্রমাণিত হয়, জনগণের ঝোঁক নির্বাচন ও রাজনীতিবিদদের দিকে। অতীতেও পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো এবং তাদের আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এরশাদের সামরিক স্বৈরাচার, বিএনপি-জোটের দুই আমলের ‘সেনা-সমর্থিত’ সরকারকে সমর্থন দিয়ে তাদের মেয়াদ বাড়াতে সাহায্য করেছে বলে অভিযোগ আছে। অথচ ওই সব আমলেই বেশি হারে আইন-আদালতকে তুচ্ছ করা, দলীয়করণ এবং কালো টাকা ও দুর্বৃত্তদের প্রতিষ্ঠা তথা রাজনৈতিক ইঞ্জিনিয়ারিং ইত্যাদি হয়েছে। খেয়াল করলে দেখা যাবে, এই সময়ই রাজনীতি থেকে সাধারণ মানুষ ক্রমশ পরিত্যক্ত হয়েছে।

চার. ‘সত্যাগ্রহ’ বা ‘ঐতিহাসিক’ কথাটা বাড়িয়ে বলা নয়। ভোটের দিন যাই সাভার অঞ্চলে। ঘুরে ঘুরে যা দেখি, এককথায় ‘তীর্থযাত্রী’ ও ‘তীর্থদর্শন’। ভোটকেন্দ্রগুলো ছিল তীর্থস্থানের মতোই জনাকীর্ণ ও মুখর। পশ্চিমা দেশের মতো মানুষ কাজ সারার মতো ভোট দিয়েই চলে যাচ্ছে না। যিনি সকালে এসেছেন, তিনি দুপুর পর্যন্ত রয়ে যাচ্ছেন। যিনি দুপুরে খেয়েদেয়ে এসেছেন, তিনি সন্ধ্যা পর্যন্ত ভোটকেন্দ্রের সামনের মাঠে বা চত্বরে বসে আড্ডা-আলোচনা ইত্যাদি করছেন। মহিলারা এসেছে সেজেগুজে_ যেন ঈদ লেগেছে। ফতুল্লার পোশাকশ্রমিক ভোটের ছুটিতে সাভারের গেরুয়ায় গ্রামের বাড়িতে এসে বন্ধুবান্ধব নিয়ে ভোট দিতে বেরিয়েছেন। তাঁর কারখানার শ্রমিকেরা অনেকেই নাকি ভোট দিতে বাসে-ট্রেনে-লঞ্চে করে দূরদূরান্তে গ্রামের বাড়ি গেছেন। প্রাচীন লোকশ্র“তি আছে, ন্যায়ের পে নাকি গায়েবি জিন-ফেরেশতারা এসে যুদ্ধ করে দিয়ে যায়। এমনিতে যাঁদের সাড়াশব্দ কম পাওয়া যায়, দেশের সেই হতদরিদ্র মানুষ সেই গায়েবি সৈনিকদের মতো নীরবে এসে নীরবে মহাজোটকে জয়যুক্ত করে দিয়ে গেছেন।

এই ভোটারদের বড় অংশই কিন্তু গ্রাম-শহরের গরিব মানুষ। সেদিক থেকে এই সরকার গরিব ও বঞ্চিতদের রায়ে আসা সরকার। গত এক যুগের লাগামছাড়া বাজার অর্থনীতি, দিশাহীন উন্নয়ন প্রকল্প ও রাষ্ট্রীয় লুটপাটের সর্বনাশা কার্যক্রমের বিরুদ্ধেও তাঁরা সেদিন একযোগে ‘না’ বলেছেন। যেহেতু ওই সময়টায় বিএনপি ক্ষমতায় ছিল, সেহেতু খেসারতটা বিএনপিকেই দিতে হয়েছে বেশি। অস্ফুট হলেও এটা মুক্তবাজারি বাড়াবাড়ি, করপোরেট উন্নয়ন, রাজনৈতিক মাফিয়াতন্ত্র এবং যুদ্ধাপরাধী ও ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে জনগণের শ্রেণীসংগ্রামেরই প্রকাশ। ঠিক যেমন পূর্ব বাংলার দরিদ্র কৃষকেরা ১৯৪৬-এ জমিদার শ্রেণীর বিরুদ্ধে মুসলিম লীগের জোতদারদের জয়ী করেছিলেন, অনেকটা সেভাবেই। কিন্তু মুসলিম লীগ তাদের চরম হতাশ করেছিল। এ জন্যই তীব্র আশার শিখর থেকে সাধারণ মানুষ আবার হতাশার খাদে পড়তে বাধ্য হলে বিজয়ীদের জন্য এর প্রতিক্রিয়া হবে ভয়াবহ। গতকালই এক বয়স্ক রিকশাচালককে বলতে শুনি, ‘আওয়ামী লীগের মেরুদণ্ড গরিবরা, কিন্তু গরিবদের সঙ্গে কী লাগাইছে সরকার?’ তাঁর অভিযোগ ছিল ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে রিকশাচালকদের হয়রানি করা বিষয়ে। এ রকম আশাভঙ্গের স্বাদ স্বাধীনতা-পরবর্তী আওয়ামী লীগ সরকার অনেকটা পেয়েছিল।

পাঁচ. প্রমাণিত হয়েছে, যুদ্ধাপরাধীদের সামাজিক ভিত্তি খুবই নাজুক। এই নির্বাচন জনবিচ্ছিন্ন উগ্রপন্থা প্রত্যাখ্যান করে তাকে রাজনৈতিক হুমকির পর্যায় থেকে আইনশৃঙ্খলা সমস্যার পর্যায়ে নামিয়ে এনেছে। পাশ্চাত্যের বহু বিশ্লেষক, গবেষক ও কূটনীতিকের ‘বাংলাদেশ হবে পরবর্তী আফগানিস্তান’, ‘ককুন অব টেরর’জাতীয় মুখস্থ বুলিকে নাকচ করে ভোটাররা প্রমাণ করেছেন, ধর্মীয় সহনশীলতা, নমনীয় ধর্মনিরপেতা ও অসাম্প্রদায়িকতাই বাংলাদেশের জনগণের রাজনৈতিক মেজাজের মূল সুর। গণযুদ্ধ, গণ-অভ্যুত্থান এবং গণভোটই তাঁদের প্রধান রাজনৈতিক অস্ত্র। একাত্তর থেকে এ অবধি এর বাইরে প্রমাণ নেই। তাই দেখা গেল, পাকিস্তানের মতো পশ্চিমা হস্তপে, আলজেরিয়ার মতো সরকারি দমন-পীড়ন, কিংবা মার্কিন-ব্রিটিশ প্রশিক্ষিত গোয়েন্দা ও তাদের যন্ত্রপাতি দিয়ে যা করা যায়নি, তা ভোটাররাই করে দিয়েছেন। এখনো দুর্নীতি, অগণতন্ত্র ও ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে জনগণই বড় রাকবচ। এবং এই জনগণ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের মুসলিম ভোটার। দুঃখ যে, ওপরতলার অনেকেই এই মানুষের প্রতি আস্থা না রেখে ভরসা করেন আরও ওপরের ‘বিদেশি বন্ধুদের’। আমাদের বিভিন্ন সরকারও জনগণের এই উদার ধর্মনিরপে সামাজিক চেতনার বিপরীত রাষ্ট্রীয় নীতি চাপিয়ে দিয়েছে। পঁচাত্তর-পরবর্তী পাশ্চাত্যের মদদপুষ্ট এসব সরকারই ইসলামের রাজনৈতিক অপব্যবহার বেশি করেছে। শেখ হাসিনাও কম যাননি। ২২ জানুয়ারির নির্বাচন সামনে রেখে তিনি তো খেলাফত মজলিসের সঙ্গে চুক্তিই করে ফেলেছিলেন! তার পরও প্রতিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভোট ৫-১০ শতাংশ করে বেড়েছে। কারণ, তারা একেই মনে করেছে মন্দের ভালো। দুঃখ এই, ‘মন্দের ভালো’র বাইরে সত্যিকার বিকল্প এখনো দানা বাঁধেনি, আর আশা এই, ‘মন্দের ভালো’ বাছতে বাছতে ‘ভালো’র ভালো জন্মানোর পরিবেশ হয়তো সৃষ্টি হবে।

বাংলাদেশি সমাজ মোটাদাগে গণতন্ত্রভক্ত এবং ধর্ম বিষয়ে প্রাণখোলা ও উদার, কিন্তু রাষ্ট্র তা নয়। বলা যায়, সমাজ ও রাষ্ট্রের এই বিরোধই বাংলাদেশের মূল সমস্যা। ‘বিদেশি বন্ধুদের’ প্রতি আবেদন, বাংলাদেশের গণতন্ত্র নিজ থেকেই কায়েম থাকতে সক্ষম। হস্তক্ষেপ ও সবক নয়, আমাদের প্রয়োজন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া চালু রাখায় নিঃশর্ত সহযোগিতা। তাতে আমাদের গণতন্ত্রের গণতন্ত্রায়ণ সহজ না হোক, কিছু বাধা অন্তত কমবে। গত নির্বাচনের ‘সত্যাগ্রহের’ এটাও এক পরম সত্য।

ছয়. স্বাধীনতার রক দাবিদার আওয়ামী লীগ কিন্তু তাদের স্লোগান ও ইশতেহারে তাদের এসব বাহারি বুলির ব্যবহার কম করে সুফল পেয়েছে। কিছুটা পিছু হটে মুক্তিযুদ্ধ ও জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক আদর্শকে তারা সাংস্কৃতিক আদর্শে পরিণত করে নিয়েছে আরও আগে। উভয় জোটই কমবেশি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পরাশক্তির মুখাপেক্ষী। তা হলেও বরাবরের মতো বিএনপি-জামায়াত ভারত-বিরোধিতা ও ধর্মীয় আত্মপরিচয়ের রাজনীতি দিয়ে নিজেদের আলাদা দেখাতে চাইছে। কিন্তু এই কার্ড গত নির্বাচনে খুব একটা কাজ করেছে বলে মনে হয় না। এখন সরকার দিচ্ছে সুশাসন, দ্রব্যমূল্য কমানো ও আইনশৃঙ্খলা রার প্রতিশ্রুতি আর বিএনপি জোট নিয়েছে সার্বভৌমত্ব রক্ষার অবস্থান। টিপাইমুখ বাঁধ, বিডিআর বিদ্রোহ, ট্রানজিট প্রভৃতি প্রশ্নে আওয়ামী লীগের কিছুটা নমনীয় ও ধীরে চলো নীতির সুযোগ নিতে চাইছে তারা। হারানো সমর্থন ফিরে পাওয়ায় এটাই তাদের বর্তমান কৌশল। নির্বাচনে প্রভাব না ফেললেও প্রতিকূল আঞ্চলিক পরিস্থিতির জন্য সার্বভৌমত্বের রাজনীতির আবেদন আপাতত বেশি বলেই মনে হচ্ছে। সরকার যদি এ ব্যাপারে সতর্ক ও স্বচ্ছ না হয়, তাহলে এটাই হতে পারে তার একিলিসের হিল অর্থাৎ সেই নাজুক জায়গা, যেখানে আঘাত করে তাকে ধরাশায়ী করা সম্ভব।

সাত. তৃতীয় দফায় নির্বাচিত হলে খালেদা জিয়ার পরিবারের ডায়ন্যাস্টি বা রাজবংশ হিসেবে দাঁড়িয়ে যাওয়ার ভয় ছিল। সমর্থন তুলে নিয়ে নতুন ডায়ন্যাস্টির পথে কাঁটা বিছিয়ে দিয়েছেন ভোটাররাই। একদিক থেকে ‘মাইনাস টু’ সফল; কারণ দুই পরিবারের দুই তনয় ক্ষমতার বাইরে থাকতে বাধ্য হয়েছেন। এ দেশে যতবারই কোনো রাজনৈতিক পরিবার ডায়ন্যাস্টি হতে গেছে, ততবারই জনগণ তা রুখে দিয়েছে। বাহাত্তরের পর মুজিব পরিবারের একচ্ছত্র ক্ষমতার তাপে জনসমর্থন উঠে যাওয়াতেই ঘাতকদের পক্ষে ষড়যন্ত্র সফল করা সম্ভব হয়েছিল। বিষয়টা যদি দুই নেত্রী বুঝতে পারেন, তাতে তাঁদের ও দেশের_সবারই মঙ্গল।

উপসংহার: ভোটের দিন দেখেছিলাম, ক্যাডাররা ভোটকেন্দ্র থেকে দূরে দাঁড়িয়ে ভোটারদের তেল-তোয়াজ দিয়ে যাচ্ছে। আজ পরিস্থিতি পাল্টে গেছে। ভোটারের সারিতে যাঁরা সেদিন দাঁড়িয়েছেন, তার সঙ্গে মতার সারিতে আজ যাঁরা দাঁড়িয়ে, তাঁদের মধ্যে দূরত্ব কেবলই বাড়ছে। জনগণের সত্যাগ্রহ আর মতাসীনদের পালিত সত্য এক থাকছে না। গরিব মানুষ ‘ভদ্রলোক-বাবুদের’ ভোট দেয় বটে, কিন্তু প্রয়োজন না মিটলে তাঁদের প্রত্যাখ্যান করতে দেরি করে না। জনগণ বদলানোর আগে শাসকদের খাসলতই বদলাতে হবে। কি অর্থনীতি কি রাজনীতি, সবখানেই জনগণ দায়িত্বশীল বলেই দেশটা চলছে এবং টিকে আছে। এই সত্য উপলব্ধি করতে হবে।

যে অতীত মৃত, তা ইতিহাস নয়। কেননা, ইতিহাস একমাত্র বর্তমানেই বেঁচে থাকে। সেই বর্তমানে গত নির্বাচনের ঐতিহাসিক শিক্ষা ও সত্য এখনো জাগ্রত। একইভাবে জাগ্রত জরুরি অবস্থার ক্ষত। প্রজাতন্ত্রে রাজশক্তি ও প্রজাশক্তির ভারসাম্য রাখার স্বার্থে এই দুই-ই মনে রাখা দরকার।

সরকারের আগমণের পটভূমি সম্পর্কে দেখুন নির্বাচনের আগে প্রথম আলোয় প্রকাশিত লেখা : 'সামনে আসছে শুভ দিন'...কিন্ত কার জন্য? ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/farukwasifblog/28996527 http://www.somewhereinblog.net/blog/farukwasifblog/28996527 2009-08-19 19:02:40