somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মুক্তি

২৬ শে ডিসেম্বর, ২০১১ ভোর ৬:৫২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


এই নদী তীরে একদিন সংসার শুরু করেছিলাম আমরা। আমরা মানে আমি, ও আর মুক্তি। এতগুলো বছর পর আবারো এখানে এসে মনে হচ্ছে আমি ঠিক সে সময়টাতেই আছি। দূর্বল চোখে এ নদীটি ঠিক আগের মতোই উচ্ছল, ঠিক আগের মতোই তার স্বচ্ছ জলে সাঁতারের নিমন্ত্রণ! বাড়ির আঙ্গিনাটায় তার শরীরের গন্ধ, বন্ধ দ্বারটায় ওপাশে বুঝি তার উষ্ণ আলিঙ্গন! আমাকে সারিয়ে তুলতে তার প্রাণান্ত চেষ্টা, জীবনের সংগ্রাম, মুক্তির প্রথম হাঁটতে শেখা - সবকিছুই জীবন্ত। নিজ এলাকা ছেড়ে আমরা বসত গড়েছিলাম এখানটায়; দারিদ্রতা কিংবা ভয়ে নয়। এসেছিলাম মানুষের ঘৃণার হাত থেকে বাঁচতে। তারপর সম্বিৎ ফিরে পেয়ে কয়েক বছর সংসার গুছানোয় মত্ত ছিলাম। মুক্তির বয়স তখন সবে চার হয়েছে - সারাবাড়ি, নদীর পাড় ধরে তার ছোট ছোট পায়ে হেঁটে চলা, দুষ্টামি সব কিছুই যেন একটু আগেরকার। ছোটবেলায় ওর মতোনই হয়তো ছিলাম আমি। আর কিশোরী বয়সে ছিলাম এই নদীটিরই মতো! তো আমার সে ছোট বাচ্চাটাকে নিয়ে গিয়েছিলাম সেদিন নদীর ঘাটে। কাঁচা দাড়িতে হাত বুলাতে বুলাতে আর মুখে পান চিবাতে চিবাতে সামনে এসে গেল এক অবয়ব। চিনতে কোন কষ্ট হলনা আমার। ঘেন্নায় মুখে থুথুর বদলে মুখভর্তি বমি চলে আসলো, উগরে দিলাম রাস্তায়। এই লোকটার তখন ভীষন প্রতাপ, আগাগোড়া পরহেজগার। সবশুনে বুঝে আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম ঢাকায় চলে আসার। আজ কয়েক দশক পর মুক্তি এই জায়গায় বেড়াতে নিয়ে এলো আমায়।

ষোড়শি সে আমার বাবা ছিল, মা ছিল, ভাই ছিল, মুখের উপর অষ্ট প্রহর হাসি আর অভিমান ছিল। প্রথম গুলিতে আমার মুখ ফ্যাকাসে হল, দ্বিতীয় গুলিতে সুখগুলো হাওয়ায় মিলিয়ে গেল, তৃতীয় গুলিতে শরীর অবস হলো, আর চতুর্থটায় আমার বাক রুদ্ধ হল। চতুর্থটা যদি হিংস্র নখের বদলে গুলি হতো, তবে আমার রক্তে হয়তো সুঘ্রাণ হতো। আমার অহংকার সেদিন থেকে ক্ষয় হতে হতে ধূলায় মিশে গেল, বাতাসে ভেসে থাকলো বুকফাটা আর্তনাদ ও হিংস্রতা। কয়েকমাস পর ডিসেম্বরের প্রথম দিকে সুযোগ বুঝে পাহারারত একটা কুত্তাকে মেরে পালিয়ে যাই। কী দূর্গম ছিল সে পথ। অনাহারে, অপমানে, যন্ত্রণায় কয়েক কদম পথও ছিল সেদিন কয়েকশত মাইল। আমাকে উদ্ধার করেছিল যে জন, তিনি মুক্তির বাবা। তার আশ্রয়ে-শুশ্রুসায় ছিলাম তখন, জানতে পারলাম বিধ্বস্ত আমার ভেতর প্রাণের আকুতি। মুক্তির বাবা আমাকে স্ত্রীর মর্যাদা দিলেন, সেবা দিলেন, মুক্তিকে তার পরিচয় দিলেন। যুদ্ধ ফেরত এ মানুষটির হাতে বাঁচলো আরো দু'টি প্রাণ।

মুক্তির জন্মদিন পালন করা হয় ২৮ আগস্ট। সবই ঠিক আছে, শুধু ওর জীবন থেকে হারিয়ে গেছে একটি বছর। ও ৭৩ সন থেকে বয়স হিসেব করে। ও জানেনা যে ও যুদ্ধশিশু। ও জানেনা যে সবাই ওর মাকে নাম দিয়েছে বীরঙ্গনা, বীর যে নারী। এই বীরাঙ্গনা নামটায় কেমন যেন এক অবহেলা আছে, বিদ্রুপের ছায়া আছে, দায় এড়ানোর গল্প আছে। আমার সে শারীরিক মানসিক নিপীড়ন, একজনকে হত্যা, আমার ক্ষতিপূরণ শুধু কী ঐ একটি নামকরনে মাসুল হবে! আমি বীরাঙ্গনা, নামকরন ভালই হয়েছে! সবকিছু ঢাকা থাক, অবহেলা বিদ্রুপ আর অনাহারে থাক- ঠিক আগেরই মতোন। নষ্টদের অধিকার সমুন্নত থাক। তবুও এসবের বিনিময়ে মুক্তির মুখের হাসি অমলিন থাক। সে সারা জীবন জানুক সে মুক্তির সংগ্রামের মুক্তি নয়, সে মুক্তিযোদ্ধার সন্তান।

কাঁচা দাড়ি আজ শুভ্র হয়েছে, শুধু তার করাল থাবা আজো বুকে বিঁধে আছে। সারা জীবন পালিয়ে বাঁচা আর অবহেলার গল্প গোপনই থাক! আমি আজ বীরাঙ্গনা, সে আজ হয়েছে মহান! আর কবে আসবে ভোর, আর কবে গাইবো আমি মুক্তির গান, আর কবে জাতি দিবে আমার সঠিক ও প্রাপ্য প্রতিদান!!!?


উৎসর্গ: কাউন্সেলরজিসান শা ইকরাম কে আমার মুক্তির পর প্রথম পোস্টটি উৎসর্গ করছি।

সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে ডিসেম্বর, ২০১১ রাত ১:২৪
৩৭টি মন্তব্য ৩৭টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিলেন মমতার দলকে?

লিখেছেন ...নিপুণ কথন..., ০৯ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:২২


শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিয়েছেন মমতা ব্যানার্জিকে। কিভাবে? দুই দফায় পানিচুক্তি হতে দেননি মমতা। কংগ্রেসের মনমোহন সিং প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন এবং বিজেপির Narendra Modi প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন দুবার দুজনই বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন, দুবারই... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×