সকালে বের হওয়ার জন্য তৈরী হচ্ছিলাম। বসার ঘরে অপরিচিত লোকের কথা শুনে গলা বাড়িয়ে দেখি রশিদ ফকির। তাকে ঘিরে আছে বাসার সবাই।রশিদ মিয়া প্লাস্টিকের ব্যাগ থেকে শাড়ি লুঙ্গি বের করে ওসবের পাড়-জমিন দেখাচ্ছেন। জানলাম,আব্দুর রশিদ ঈদে তার নিজের জন্য একটা লুঙ্গি,বউয়ের জন্য ১শ ৭০ টাকায় একটা বউয়ের জন্য ও একই দামে ছেলের বউয়ের জন্যও শাড়ি কিনেছেন।
কিছুক্ষণ পর বাড়ির উদ্দেশে রওনা হবেন তিনি। আব্দুর রশিদের মধ্যে এক ধরনের শিশু সুলভ তাড়াহুড়া। এর মধ্যেই জিঙ্গেস করলাম কয় টাকা পেলেন আঙ্কেল?
আব্দুর রশিদের মধ্যে আজ ভিখারি ভিখারি ভাবটা নেই।
আব্দুর রশিদ দেখলাম সার্বক্ষণিক কথা বলে।
আমি হিসেব করি,১০/১২ দিন হবে প্রথমবার আসার পর অতিবাহিত হলো। এর মধ্যে ৩ হাজার টাকা । মন্দ কি! লোকটার একটা জিনিস পছন্দ হলো , সে আমাকে নিজের উপর ভরসার যায়গাটুকু জানিয়ে কোন একটা যায়গায় দুশ্চিন্তা মুক্ত করেছেন। মনে হলো সব মানুষের বাঁচার যাই হোক নিজস্ব ভরসার যায়গা থাকে।
জিঙ্গেস করি,স্বাস্থ্য কেমন এখন? খেতে পারেন?
রশিদ মিয়া বলেন,পেশাব হলুদ খুব। মাথা ঝিম ঝিম করে। তবে বাড়ি গেলে এই কয় দিনে ভাল হয়ে যাবেন। সঙ্গে আরো কি কি বলেন।আমার খারাপ লাগাটা জেগে ওঠতে চায়। তবে তিনি বাড়ি গেলে তার পর্ণকুটিরের ছায়া তাকে হয়তো সুস্থ্য করে ফেলবে এই ভরসা জাগে।ভাবি এই লোকটা এতো খারাপ স্বাস্থ্য নিয়ে রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে এক টাকা,দুই টাকা জোগার করার চেষ্টা হরেছেন কিভাবে! তার মতো আরো কত মানুষ করছে!
আব্দুর রশিদ আবার আসবেন বলে চলে গেলেন। যাবার আগে দরজায় দাড়িয়ে জিঙ্গেস করলেন,বাবার জন্য দেশের থেকে কি আনবো?মাশ কলাই খান?
লোকটা আদিখ্যেতা দেখে মেজাজ খিচড়ে ওঠে। বলি, না-কিছুই খাই না। আপনার কিছু আনা লাগবে না। বলি ,আপনি কি রোজা? কিছু খেয়ে যাবেন নাকি?আব্দুর রশিদ বলেন,তিনি চৈত্র মাসেও রোজা রেখেছেন,এখন কার দিন ব্যাঙের লাফের এক লাফ।
আব্দুর রশিদ চলে যাওয়ার পর, মনে আসে সে শাড়ি নিয়ে যাওয়ার পর তার পরিবারের সদস্যরা কি করবে। দুর থেকে তাকে বাড়ি ফিরতে দেখে বাবা এসেছেন বাবা এসেছেন বলে বোধ হয় দৌড়ে যাবে তার ছোট ছেলেটা। কিন্তু,রশিদ তো ছেলেটার জন্য কিছু কিনলেন না! ছোট একটা মেয়েও আছে বলেছিলেন কি? যাক,যার যার জীবন তার তার।
আব্দুর রশিদের অসুস্থতা খুব ভয়ংকর নয় বলেই মনে হচ্ছে। কিন্তু প্রথম তার সঙ্গে কথা বলার পর খুব ভড়কে গিয়েছিলাম। কি এক ঘোরে পেয়ে বসেছিল। চাচ্ছিলাম, দ্রুত সুস্থ হোক বুড়োটা।
আব্দুর রশিদ এর আগের বার খেতে আসার দিন কি করবো কি করবো ভেবে গ্রামীণের স্বাস্থ্য সেবার হেল্প লাইনে ফোন করে পরামর্শ চেয়েছিলাম।৭৮৯। এই সেবাটা আমার খুব পছন্দের। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকগণ প্রথম কলেই ফোন ধরেন। খুব মনযোগ দিয়ে সমস্যা শোনেন এবং পরামর্শ করেন।
এ দফা ফোন করলে এক ভদ্র মহিলা ফোন ধরলেন,তাকে সমস্যার কথা বললে তিনি যে পরামর্শ দিলেন সে উপায়ে আব্দুর রশিদের চিকিৎসা সম্ভব নয়। বলছিলেন, কিছু খেতে পারেন না মানে কি?খান না ? খেতে ইচ্ছে করে না? না খেলেও স্যালাইন ওয়াটার খাওয়াতে হবে। ঠান্ডা পানি,ফ্রুট জুস। আর ফুল বেড রেস্ট। বললাম আমি যার অসুখের কথা বলছি তিনি খুব হাঁটা হাঁটি করেন। অনেক সময় রোদেও ঘোরেন। চিকিৎক বললেন,না না একদম রোদে হাঁটা হাঁটি করা যাবে না। আমি লজ্জিত হয়ে বললাম লোকটা রাস্তার পাশে থাকেন,খুব গরিব। এ ক্ষেত্রে কি করা যায় একটু জানিয়ে হেল্প করবেন? তিনি কি একটা টেবলেটের নাম বললেন,৫ এমজি। বললেন,খাবার আগে তিন বেলা খেতে হবে।এত রুচি বাড়বে। আর ফুল রেস্ট কিছু দিন। ঠান্ডা পানি। ঠিক হয়ে যাবে। আগে কখনো ও প্রান্ত থেকে ফোন কাটা হয়েছে এমনটা হয় নি। সেদিন কেটে দেয়ায় নিজেকে আহাম্মকের মতো লাগছিল। ওষুধ ঠিক আছে। কিন্তু এই রোগীর ক্ষেত্রে তো এই ওষুধ যায় না।
আব্দুর রশিদের জীবীকার পরিকল্পণা জেনে একটু নির্ভার লাগছে।
এতোক্ষণে আব্দুর রশিদ পৌঁছে গেছেন নিশ্চয়। এতোক্ষণে কি!দুপুরের মধ্যেই পৌঁছে যাওয়ার কথা। এখন বোধ হয় নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে। সকালে আবার ঈদ না ! ঈদ মোবারক আব্দুর রশিদ।
রশিদ ফকিরকে নিয়ে আগের লেখাটা এখানে দেখতে পারেনঃভিখারি আব্দুর রশিদের স্বাস্থ্যটা ভাল যাচ্ছে না

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

