নাহ, জীবদ্দশায়ও সুখে ছিলেন না রুবি। অন্তত তাঁর ঘরে ঢুকে তাই মনে হবে যে কারো। খুব সাধারণ আর মলিন কিছু আসবাব পত্র। মাটির প্রলেপ দেয়া বাঁশের চাটাইর বেড়াঅলা একচালা ঘর। ঘরটা সব মিলিয়ে ৮ ফুট বাই ১২ ফুটের বেশি হবে কি! যদিও তার স্বামী আবুধাবী চাকরি করে। ঘর থেকে রান্না করার খুপরির মতো জায়গাটায় যেতে হয় মুরগির খোপে ঢোকার মতো করে। স্থানীয় সাংবাদিকসহ আমরা ক’জন অবশ্য গেলাম তার খুন হয়ে যাওয়ার প্রায় ১ মাস ২ দিন পর। গত ১১ নভেম্বর। চোখ আটকে গেল একটি হাতে আঁকা ছবিতে।
দরজার উপর লাগানো। রুবির আঁকা। কথাগুলো মিলে যায় পুরোপুরি ওর নিজের জীবনের সঙ্গেই। গত ১ মাসেও রুবির ঘরে পুলিশ আসেনি। কোন ক্লু কি থাকা সম্ভব? পাশের ঘরেই থাকতো পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী রুবির খুনি। সম্পর্কে তার দেবর। কুদ্দুস মিয়া।
সে ঘরে এখন তালা লাগানো। ভাঙ্গা টেবিলের উপর একটা প্রেসক্রিপশন পরে
জনির বড় বোন ঝর্ণার অসুখের পর ডাক্তারের দেয়া পরামর্শ পত্র। জনির নানীর দায়ের করা মামলার অপর আসামী কুদ্দুসের স্ত্রী এখনো পলাতক। জনি ও ঝর্ণা তাদের নানীর সঙ্গে থাকলেও স্থানীয় মাদ্রাসায় ক্লাশ সেভেনে পড়ুয়া জনির ১৪ বছরের বড় ভাই জুবেল থেকে গেছে বড় চাচার ঘরেই। ওকে অনিচ্ছা সত্বেও জিজ্ঞেস করলাম খুনটা কে করেছে বলে মনে হয়? জুবেল নিঃসংকোচে বললো নানীর বাড়ির কেউ বিষ খাওয়াইয়া মারছে। জুবেল জানালো তাদের ঘরের হাড়ি পাতিল বস্তা বেঁধে রাখা হয়েছে ছোট চাচার ঘরে। জুবেলের চোখে সার্বক্ষণিক নিজের আশ্রয় হারানোর সতর্কতা। ভাবলাম, বড় হয়ে হয়তো নিজের বোনদের পাশে দাঁড়াবে সে। আচ্ছা মনে কষ্ট পেলে পাক। জিজ্ঞেস করলাম, বোনদের কি খবর ? জুবেল বললো, ছোট চাচা বিদেশ যাওয়ার আগে নানীর কাছে টাকা পাঠিয়েছে ওদের জন্য। (পরে খোঁজ নিয়ে জেনেছি জুবেলকে দেয়া এই আশ্বাস সত্য ছিল না। খুনের ঘটনার ১ দিন পর ওর ছোট চাচা বিদেশ চলে যায়।)
অনেক খুঁজেও একটা গ্রুপ ছবি পেলাম না । জনির বাবা ,মা,বোনদের সঙ্গে এক সাথে। আসলে কোন ছবিই নেই। আশ্চর্য!
রুবি হত্যা মামলার বর্তমান অবস্থাঃ
এই ঘটনাটার স্মৃতিচারণও খুব বেদনার মনে হয়। ঘটনাটা ছিল এরকম যে, গত ১০ অক্টোবর শুক্রবার ভোর বেলা রাজনগর উপজেলার কামারচাক ইউনিয়নের মরিচা গ্রামে লাঘাটা নদীর পূর্ব তীরে
প্রবাসী মাসুদ মিয়ার স্ত্রী ৩ সন্তানের জননী রুবি বেগমের লাশ ও লাশের পাশে তার কনিষ্ঠা এক বছর বয়সের শিশু কন্যা জলি বেগমকে জীবিত অবস্থায় পাওয়া যায়। এ সময় শিশু জনির মৃত মায়ের স্তন পানের চেষ্টা গ্রামবাসীকে হতবাক করে। পরে এই দৃশ্য পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হলে স্তম্ভিত হয়ে যায় সবাই। ১১ অক্টোবর শনিবার লাশের ময়না তদন্ত শেষে নিহত গৃহবধূর বাবার বাড়ি কমলগঞ্জ উপজেলার পতনউষার ইউনিয়নের গোপী নগর গ্রামে দাফন করা হয়। এ ঘটনায় গৃহবধূ রুবির মা সিতারা বেগম বাদী হয়ে কুদ্দুছ মিয়া ও তার স্ত্রী খায়রুন বেগমকে আসামী করে রাজনগর থানায় মামলা নং ০৩/১০-১০-০৮ইং দায়ের করেন। মামলা দায়েরের পর রাজনগর থানা পুলিশ নিহত গৃহবধূর দেবর কুদ্দুছ আলীকে গ্রেফতার করলেও তার স্ত্রী খায়রুন বেগমকে এখন পর্যন্ত গ্রেফতার করতে পারেনি।
মামলাটির বর্তমান অবস্থা একবাক্যে বলা মুস্কিল। ময়না তদন্ত রিপোর্ট এখনো এসে পৌঁছায়নি। মামলার সর্বশেষ অবস্থা নিয়ে জেলা পুলিশ সুপার সম্প্রতি মৌলভীবাজারে সংবাদ সম্মেলন করেন। সেখানে তিনি দাবী করেন, খুনিকে তারা সনাক্ত করতে পেরেছেন। পুলিশ জনির নানীর মামলার সূত্রে গ্রেফতার করে আসামী আব্দুল কুদ্দুসকে। এরপর রুবির ব্যবহৃত ফোন সেটটিসহ গ্রেফতার করা হয় এক ব্যক্তিকে।
সে জানায় তার ভাই তাকে এই ফোন সেট দিয়েছে। যার ওই ভাই দুটি হত্যা মামলার আসামী। খুনটি সেই করেছে বলে এখন পর্যন্ত পুলিশের ইঙ্গিত। ৯ অক্টোবর বাড়ি থেকে দুপুরে শিশু জনিকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যাওয়ার সময়ও তার হাতে এই ফোন সেট ছিল। এটা দিয়ে সে সর্বশেষ তার চাচাতো ভাইয়ের স্ত্রীর সাথে কথা হয়। সে তখন ডাক্তারের সামনে আছে বলে জানায়। পরিচিত জনদের সঙ্গে সেই তার শেষ কথা। পুলিশ অবশ্য বলছে তারা রুবির ফোন কলের লিস্টে দেখেছে সর্বশেষ রাত ১০ টা পর্যন্ত সে তার দেবর কুদ্দুস আলীর সাথে কথা বলেছে। পুলিশের আরো বক্তব্য রুবির কল লিস্টের ১শ ২০টি কলের মধ্যে ৯০ টিই সে করেছে দেবরকে। এই সূত্রে পুলিশের সন্দেহ রুবির সঙ্গে দেবর কুদ্দুসের শারীরিক সম্পর্ক ছিল। এসপির বক্তব্য রুবি খুন হওয়ার আগে ধর্ষণের শিকার হয়ে থাকতে পারে। এই আলামত পাওয়া গেছে। আর রুবিকে মারা হয়েছে শ্বাসরোধ করে। তার কাঁধে আঘাতের দাগ ছিল বলেও জানায় পুলিশ। পুলিশের বক্তব্য তাকে খুন করার পর লাঘাটা নদীর পারে নিয়ে ফেলে রাখা হয় মুখে বিষ ঢেলে।
খুনের কারণ হিসেবে পুলিশ যে সব তথ্য পেয়েছে তা হলো, নিহত রুবি বেগমের কাছ থেকে দেবর কদ্দুছ মিয়া ও তার স্ত্রী খয়রুন বেগম নিহত রুবি বেগমের কাছে জমি বিক্রি করবে বলে বিরাট অংকের টাকা নেবার পর জমি রেজিষ্ট্রি করে না দেওয়াতে নিহত রুবি বেগম টাকা ফেরত নিতে চাইলে দেবর কদ্দুছ মিয়া ও স্ত্রী খয়রুন বেগমের সাথে নিহত গৃহবধূ রুবি বেগমের ঝগড়া বিবাদ হয়। ৮ সেপ্টেম্বর কুদ্দুস তাকে বাড়ির উঠোনে ফেলে মারধর করে অনেক লোকজনের সামনে। এছাড়াও কিছুদিন আগে রুবির স্বামী তার ভাই কুদ্দুসের কাছে ৭০ হাজার টাকা পাঠায়। এই টাকা নিয়েও কুদ্দুসের সঙ্গে রুবির ঝগড়া হচ্ছিল।
এসব তথ্য প্রকাশিত ও স্থানীয়দের মধ্যে প্রচলিত।
নাগরিক কমিটির আহ্বায়কেরও।
জনি কেমন আছে ?
মাঝরাতে হঠাৎ চিৎকার করে ওঠে জনি। কিছুক্ষণ কেঁদে থেমে যায় নিজ থেকেই। ওর নানীর অনুমান মায়ের জন্য কাঁদে।
এমনিতে জনির স্বাস্থ্য একটু ভালোর দিকে।
জনির খাবার দুধের ব্যবস্থা হওয়ার পর
নিশ্চিন্ত বোধ করছেন ওর নানী।
আর জনির বড় বোন ঝর্ণাকে গতকাল মানে ১৭ নভেম্বর স্থানীয় রাধাগোবিন্দ
সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করা হয়েছে ক্লাশ থ্রিতে। কাল থেকে তার বার্ষিক পরীক্ষা।
সাহায্য:১৩/১১/০৮
বলা ভাল ইমিগ্রেশন এইড জনি, তার নানী ও বোনের ভরন-পোষণ, দায়িত্ব নেয়ার ঘোষণা দেয়া সত্বেও অনেকে এখনো জনিকে সাহায্য করার জন্য তার বাড়ি চলে
আমেরিকা থেকে ফিরেই গত ১১ নভেম্বর ঢাকা থেকে পতন ঊষার গোপীনগর গ্রামে গিয়ে জনির পরিবারের সদস্যদের কাছে ৩ হাজার টাকা ও খাদ্য সামগ্রী পৌঁছে দিয়ে আসেন সাবিনা ইয়াসমিন নামের এক ভদ্র মহিলা।
এর মধ্যে জনি দুদিন তার নানী ও বোনসহ ঢাকায় ছিল। তাকে আদ-দ্বীন হাসপাতালে চিকিৎসককে দেখিয়ে ওষুধ কিনে দিয়েছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তি।
এছাড়া ১৩ নভেম্বর সন্ধ্যায় কমলগঞ্জ থানা নির্বাহী কর্মকর্তা জনিকে দেখে ২ হাজার টাকা দিয়ে এসেছেন।
সাহায্য:১৪/১১/০৮
শ্রীমঙ্গলের সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন
সাহায্য:১৮/১১/০৮
মুন্সিবাজার শাখা সোনালী ব্যাংকে ভাস্করসহ স্থানীয় সাংবাদিকদের উদ্যোগে জনির সাহায্যের জন্য করা এ্যাকাউন্টে ৫ হাজার টাকা পাঠিয়েছেন। ফাতেমা নামে এক ভদ্রমহিলা।
জনির জন্য সাবিনা ইয়াসমিনের দেয়া গাভী থেকে আধা লিটারের কিছু বেশি দুধ দোয়ানো হয়। জনির যা লাগে সেটুকুই নেয়া হয়। বাকি টা গাভীর বাছুরটি খেয়ে নেয়
তবে ওর একটা মশারি দরকার। মাছি ঝামেলা করে ও ঘুমানোর সময়। আর ঝামেলা করে বাড়ির ১৫/২০টা পিচ্চি! ওরা দিন ভর উঠানে লাফালাফি করে, আর চিল্লিয়ে বাড়ি মাথায় তুলে রাখে
এতেও ঘুমে ডিস্টার্ব হয় জনির।
জনিকে নিয়ে বিস্তারিত আরো জানতে কৌতুহলীদের জন্য
ভাস্কর চৌধুরীর...জনিরা জলে উঠুক প্রতিশোধের আগুনে
এবং
মানবীর...ডিসপোজেবল মানবীদের কথা- আরেকটি ছবি, আরেকবার ভুলে যাবার পালা!!!
পোস্ট দুটি রেফার করছি।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

