সকালে সিড়ির বাইরে পা দিয়ে ডাইনে বাঁয়ে তাকানোর সময় কানা গলির মাথায় চোখ আটকে গেল।

এলাকা ঘুরে ময়লা সংগ্রহ করার একটি ভ্যান দাড়ানো। ভ্যান না । স্যালো নাকি পাওয়ার টিলারের ইঞ্জিনে কি সব কিসিঞ্জারি করে ট্রাকের মতো বানানো।

পেছনে ময়লা রাখার জন্য উচু করা। কাবুল এক্সপ্রেস টাইপ একটা আয়োজন। এক পিচ্চি হুঁইসেল বাজাচ্ছে। ময়লার দুর্গন্ধ মেজাজ খিঁচড়ে দেয়ার মতো। তো, চোখ আটকে ছিল ড্রাইভারের দিকে। নির্লিপ্ত চেহারা নিয়ে বসে আছেন তিনি।

কোলে ৮/১০ মাসের একটা শিশু। মনে হয় নিজের মেয়ে। আক্কেল নেই। ময়লা টানার গাড়িতে করে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। এগিয়ে গিয়ে বললাম, ওকে না নিয়ে আসলে হতো না? ময়লা,রোদে অসুস্থ্য হয়ে যাবে তো! ড্রাইভার বললেন,বেশিক্ষণ থাকবে না। ওর মা কাজে গেছে।

যাবার সময় রেখে যাবো।
বুঝলাম না প্রথমে। যাই হোক, কথা বেশি আগানোর সুযোগ দেখলাম না। কি যুক্তিতে বলি। সাত সকালে মায়া লাগলো এই যা। নিজের রাস্তা মাফতে মাফতে মেলাতে চেষ্টা করলাম। বাচ্চাটার মা বুয়ার কাজ করতে গেছে কোন বাসায়। এই সময়টা বাবা সামলে রাখছেন ওকে। ভালোইতো এমনতো হতেই পারে। মা চাকরিতে বের হয়েছেন, বাবা ছোট বাচ্চাকে স্কুলে পৌঁছে দিচ্ছেন , বা কিছু সময় আগলে রাখছেন এমনতো হয়ই! এখানে বাচ্চাটা ময়লার গাড়িতে, এটা খচ খচ করছে শুধু!বাবা বাচ্চাটাকে যেভাবে মমতা ভরে কোলে রাখছিল আর ও যেমনি আদর খাচ্ছিল ,এটুকু কলজের উপশম হয়ে আছে যেন।
প্রায়ই দেখেছি , একেক দিন আসে যেদিন একই রকম সব ব্যপার চোখে আটকায়। পত্রিকার খবরের মতো। কয়েক দিন সব পত্রিকা একই রকম খবর ছাপে। একটা হুজুগের মতো থাকে। পরে আবার সবাই মিলে অন্য খবর ছাপে। (ছোট বেলার পরের কয়েক বছর এটা বিস্মিত করতো। সব সাংবাদিক এক সাথে এক খবর পায় কি ভাবে!) এমনি আজ বোধ হয় বাচ্চা দিবস।

রাস্তায় আজ সব বাচ্চা চোখে পড়তে লাগলো। মনে হয় আর কিছুর দিকে না তাকিয়ে বাচ্চাদের দিকেই তাকাচ্ছিলাম।
রাস্তায় শুধু বাচ্চা সাথে নিয়ে ভিক্ষা করে এমন ভিক্ষুকরাই আজ আশে পাশে ভীড় ঘুরতে দেখলাম মনে হয়। মন আগে থেকে নরম হয়ে ছিল বলে বাচ্চাগুলোর জন্য আজ বেশি মায়া লাগছিল। আহারে বাচ্চাগুলো কেমন ঘুমাচ্ছে। শুনেছি এদেরকে নাকি ভাড়া আনে ওরা। কি ওষুধ খাইয়ে দেয় না মেখে দেয় ,

এতে বাচ্চাগুলো খালি ঘুমায়। কি একটা এনজিও ক্যাম্পেইন করছে বাচ্চাদের ভিক্ষাবৃত্তিতে ব্যবহার না করার দাবী নিয়ে। মানববন্দন টন্দন করছে গত মাস খানেক ধরে। ওদের এক জনকে প্রশ্ন করেছিলাম এই বাচাদের খাওয়ানোর জন্য কোন ফান্ড নেই? যেমন বাচ্চাসহ কাউকে ভিক্ষা করতে দেখলে নিয়ে আপনাদের কাছে রাখলেন ,বা কিছু টাকা দিলেন। এমন? উনি তাদের লক্ষ উদ্দেশ্য বর্ণনা করে কি কি বুঝিয়ে দিলেন। তার মধ্যে ভিখারির বা তার সন্তানের জন্য সরা সরি কোন উপকার দেখলাম না। বরং মনে হলো ভিক্ষা যাতে লোকজন না দেয় এমন ক্যাম্পেইন এটা। সরকার শপথ নেয়ার ক দিন পর না বলেছিল, ভিক্ষুকদের পুনর্বাসনের জন্য লোন দিবে! ওটার আরতো কিছু শুনলাম না। উল্টো কদিন আগে শুনলাম বোধ হয় ভিক্ষুক পেলে মাসের জেল দেয়া হবে।
আহারে, দেখি দুটা টাকা দেই! রফিক আর তার মা আসছে

এদিকে। কত দিন দেখছি ওদের। দূরে দুই ভিখারিকে দেখলাম চা খাচ্ছে আর তামাশা করছে।

কিছুক্ষণ পর এসে করুণস্বরে ভিক্ষা চাইবে। রফিকদের দু টাকা দিলাম দেখে বাচ্চাসহ আরেক জন এগিয়ে গেল। বাচ্চাটাকে কিছু খাওয়াবো দেন। বললাম, বাচ্চা ছাড়া আসো তাহলে দিব। পরে আর কথা বাড়ালাম না। রাগ করে কি হবে! সাহায্য চাইতে এসেছে , কিছু দিবও না আবার উল্টা সিধা কথা বলার দরকার কি। পারলে কিছু দিই !
নাহ! আজ ভিক্ষুক দিবস। নিচের দিকে তাকালাম।

দেখি কয়েকজন মিলে কোরাস গেয়ে

ভিক্ষা করছে। সুরটাও দারুন। একটা ছবি তুলি, জানলা দিয়ে বাইরে হাত বের করে। ছবিটার নাম দেয়া যায় পাখির চোখে ভিখিরি।
সন্ধ্যার আগে আগে সামনের রাস্তায় গেলাম। এক বাচ্চা মেয়ের প্রান খোলা খলখল হাসি দেখে ভীষণ ভালো লাগলো।

ভিক্ষুকদের কাঠের গাড়ি। বাবার সাথে চেপে বসেছে তার কিশোরী মেয়ে। গাড়ি ঠেলছেন মেয়েটির মা। রাস্তা ফাঁকা। একটু দৌড়ে গাড়ি ঠেলছিলেন মহিলা। মেয়ে এই আনন্দে আত্মহারা। ওর মা , বাবাও এতে খুশি।

ভিক্ষা শেষে বাড়ি ফিরছেন বুঝি তারা!
মোবাইল বের করে ছবি তোলার চেষ্টা করতেই মুখ লুকালেন ওঁরা। ছলাৎ এক ঢেউ অপরাধ বোধ গ্রাস করলো। ওরা ছবি তুলতে পছন্দ করছিলেন না। কেন এটা করতে গেলাম। ওদের হাসি দেখে, সকালে বাবার কোলে ছোট মেয়েটাকে লেপ্টে

থাকতে দেখে খুব আনন্দ লেগেছে।
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই জুন, ২০১০ রাত ৩:১৫