নদীর পাড়ে দাড়ালে আমার মন খুব ভালো হয়ে যায়। সব সময় একটা মন হু হু করানো বাতাস বয়। কত কথা মনে পড়ে! অন্যসময় সেসব ভাবার প্রাসঙ্গিকতা প্রায় থাকেই না। আনন্দ আর চির পরিচিত ব্যস্ততা দেখতে দেখতে কখন প্রিয় স্মৃতি হাতড়ে গভীর বিষন্নতায় আচ্ছাদিত হয়ে যায় মন । নদীর পাড়ের মানুষদের চেহারা কেমন অন্যরকম। তাদের কথা ভিন্ন। নদীর পাড়ে যেতে পারলে আমি অনেক রাত করে ফিরি। কোন কাজ নেই, তাড়া নেই মনে করে ঘুরাঘুরি করি । নদীর ঘাটের ছোট বাজারগুলো আমার খুব পছন্দের যায়গা। ফেরার পথে অন্ধকার নির্জন চিকন রাস্তা। ভাটায় শুকনো বা অল্প পানির খাল ডিঙ্গানো, পাশ দিয়ে নদী থেকে ফেরা জেলেদের মাছ ধরা,বিক্রি ইত্যাদির কথা বলতে বলতে হল্লা করে বাড়ি ফেরা। যাদের অধিকাংশই নদীর পাড়ে বেড়ি বাঁধের উপর। কাছেই ভাংগনের হুমকির মুখে পুরান বসতি। জঙ্গল।
সাগরের চেয়ে বাড়ির পাশের মেঘনা আমার সবচে প্রিয়। বড় জোড় মোহনাটার ভয়ংকর উন্মত্ত রূপটা টানে। নদীর বিশালতায় কখনোই ভয় লাগে না। বর্ষায় পাহাড়ের মতো আকৃতির বিশাল ঢেউয়ের মুখে ভয় ছাপিয়ে দোলুনী আর কি কৌশলে এর আগের ঢেউ থেকে বাঁচা গেল সামনের দ্রুত এগিয়ে আসা ঢেউ থেকে মাঝি বা লঞ্চের কাপ্তান কিভাবে বাঁচার চেষ্টা করছেন এর অনুমান করতে ভাল লাগে।
নদীতে দূর থেকে বৃষ্টির প্রাচীর ধেয়ে চলা , এক দিকে রোদ আরেক দিকে মেঘের ছায়া দৌড়ে বেড়ানোর ছবি আমার গোপন সম্পত্তি। একান্ত কোন বন্ধুকে নিয়ে দেখাবো বলে কারো সাথে এই নিয়ে আলাপ করিনি কোন দিন। যদি জানাজানি হয়ে যায়!
প্রায় ৪০ বছর আগে নদীগর্ভে বিলিন পিতৃ পুরুষের ভিটা, আবাদী জমির কথা মনে পড়ে কখনো। মায়া লাগে। নদীকে খুব দুরভীসন্ধিমূলক ও নিষ্ঠুর গতিবিধির মনে হয়। অভিমান জেগে ওঠে। ‘ওই যে দূরে জাহাজটার আলো দেখা যায় তার কাছে তোমার দাদা বাড়ি ছিল। অনেক বড় বাড়ি ছিল . . . । ’ ৫/৬ বছরের বয়সের আমি বাবার মুঠি থেকে আঙ্গুল ছাড়িয়ে সামনের খোলা মাঠে দৌড়াতে শুরু করেছিলাম সে রাতে। পরক্ষণে আবার ধরা খেয়ে বাবার কথায় সম্বিত ফিরে পেয়েছিলাম। বাবার কথায় ভাল করে খেয়াল করে দেখেছিলাম, এটা খোলা মাঠ নয়। উজ্জল হলদেটে জ্যোৎস্নায় নদীর জল খোলা মাঠের মতো মনে হয়ে ছিল আমার কাছে। কোথাও রূপালী জ্যোৎস্না শব্দটা চোখে পড়লে বা শুনলে আমার ছোট বেলার ওই রাতে নদীর দিকে দৌঁড়ানোর দৃশ্যটা চোখে ভাসে।
বাড়ি ভাংগার পর আরো দক্ষিনে গিয়ে প্রমত্তা মেঘনার কাছেই বসত গেড়েছেন বাবা। নদী ভাংগা মানুষের চেহারায়একটা বিষাদ রেখা স্থায়ী হয়ে যায়। নিঃসঙ্গ হলেই এই রেখা গাঢ় হয়ে ভেসে ওঠে। তবে মেঘনা ছোট বেলা থেকে আমার ঘনিষ্ট বন্ধু। চরে চরে ভেসে বেড়ানো কিছু উদ্বাস্তু মানুষ আমার নিকটাত্মীয়।
এখন আমার প্রিয় নদী থেকে অনেক দূরে থাকি যদিবা। দুঃখের দিনগুলোতে মনের পাড়ে মেঘনার ঢেউ আছড়ে পড়তে দেই । ছলাৎ ছলাৎ শব্দে সারা দিন মেঘনা বইলো আজ। স্রোতশ্বীনি! হঠাৎ খেয়াল হলো নিজের ও যোগার করা নদীর অনেকগুলো ছবি আছে আমার কাছে। অনেক আগে থেকেই আমি নদীর ছবি জমাই ।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

