এখন জানি দাঁত ব্যথা নিয়ে রসিকতা শুধু ব্যথা সারার পরই করা সম্ভব।এর মাহাত্মও শুধু তারাই স্বীকার করবেন যারা ভুক্তভোগী মানে শিকার হয়েছেন। কোন মনিষি এক কালে প্রথম বলেছিলেন , তারপর এখন প্রায় সবাইই সুযোগ পেলে বলেন, ‘অভিজ্ঞতার বিকল্প নেই। যত অভিজ্ঞতা জীবনে তত প্রাজ্ঞ ’ । অজ্ঞাত সময়ে অজ্ঞাত ব্যক্তি অজ্ঞাত কারো কাছে হরেক অভিজ্ঞতার পেছনে না ছোটার পরামর্শ দিয়ে বলেছিলেন, ‘ পানিতে ডোবার অভিজ্ঞতা থাকলে অন্য অভিজ্ঞতা না থাকলেও চলে । কোন মতে বেঁচে বের হয়ে আসো । ব্যস ।’ অজ্ঞাত উপায়ে জানা এই এই বক্তব্য এখন অর্বাচিনের মনে হয়। কারণ,জীবনের উল্লেখযোগ্য সেরা অভিজ্ঞতা হিসেবে দাঁত ব্যথার নাম থাকা জরুরী। তা না হলে তথ্য বিকৃতি হয়। এই বক্তব্য অবিলম্বে অবশ্যমান্য করা উচিত।
এক নৈমত্তিক প-িত যদিও জানালেন, দাঁত ব্যথা ওয়ার্ল্ড পেইন রেঙ্কিংএ সেকে-। অবিশ্বাস করায় প্রমাণে মরিয়া হয়ে তিনি জানান এক নাম্বার মেইন হলো লেবার পেইন। মানে মায়েদের সন্তান জন্ম দেয়ার দুঃসহ ব্যথার পর পরই ভয়াবহ ব্যথা হিসেবে অবস্থান করে নিয়েছে, দাঁত ব্যথা। বিদেশী কোন কোন বড় সাস্থ বিষয়ক কাগজের রেফারেন্স দেয়ায় তার কথা আর বিশ্বাস করলাম না। এ হলো সেই প্রকৃতির মানুষ যারা টুকি টাকি কথা বা কাজও বিদেশী প-িতদের নাকের সামনে দিয়ে ঘুরিয়ে এনে তার দোহাই দিয়ে গুরুত্ব পেতে চায়।
সন্দেহ দুর করার জন্য পরিচিত এক সন্তান সম্ভবাকে জিগ্যেস করলাম। তার উত্তরটা বেশি গ্রহন যোগ্য মনে হলো। তিনি বললেন, তোমার দাঁত ব্যথার অব মূল্যায়ন করবো না। এই ভাবে ভাবলে তোমার ভাল হবে, মনে করো সন্তান প্রসব মানে ব্যথার সমাপ্তি। কিন্ত দাঁত ব্যথা মানে তোমার শুরু হলো। তাই দাঁত ব্যথাই বিশ্বের এক নম্বর ব্যথা ধরতে পারো।
আমি একজন ভবিষ্যত মায়ের মহত্ব আর উদারতা দেখে মুগ্ধ হয়ে বলি,ওটা মায়েদের সবচে বড় পেইন। আর এটা পুরুষদের সবচে বড় পেইন।
আরেক জন বললেন , দাঁত ব্যথা ? প্যারাসিটামল,নাপার কোন পাত্তাই নেই এখানে। ওষুধ শুরুই হয় অনেক উপর থেকে। যেগুলো খেলে আবার পেট ফুলে ওঠে। তা বন্ধ করতে আবার অন্য অষুধ খেতে হয়। খালি পেটে খেয়ো না, খালি পেটে কখনো দাঁতের অষুধ খেয়ো না। পেট ফুটো হয়ে ট্যাবলেট আবার হাতে চলে আসবে । একজন বানী চিরন্তনী শুনিয়ে দিলেন একটা। প্রেম সবই ভোলাতে পারে। শুধু দাঁত ব্যথা ছাড়া। কোটেশনটা একটু এদিক ওদিক হতে পারে। পরের কয়েক দিনের তীব্র ভোগান্তিতে অন্য অনেক কিছুর সাথে সাথে ওই মহামূল্য বানীখানাও হুবহু থাকেনি। মাত্র ব্যথা কমলেও ভুলে যাওয়া সব কিছু এখনো ফেরত আসতে শুরু করেনি মাথায়।
দাঁত নিয়ে বিভ্রান্তিরই বা শেষ কোথায় ? দাঁত ব্যথা শুনে একজন বললেন আমার আক্কেল দাঁত চারটাই ফেলে দিতে হয়েছে। জিগ্যেস করলাম , এতে অসুবিধা হয় না ? বললো, না। বত্রিশটা দিয়েই চলে যাচ্ছে। বত্রিশটা মানে কি ! সব মিলিয়ে চৌত্রিশটা হয় নাকি ! সে কিছুতেই না মানলে সামনের দিকের দুটো দাঁত নকল লাগিয়েছেন , মাড়ির উপর নিজে পাঁচটি ফাঁকা এমন এক প্রাজ্ঞ শালিসির মাধ্যমে সিদ্ধান্ত জানান। তিনি ফোকলা হেসে জানান সাত আর দুই নাম্বার দাঁত দুটা আমি নিজেই টেনে ফেলে দিয়েছি !
ছোটরা গ্রামে দাঁত পড়লে কাগজে মুড়িয়ে ইদুরের গর্তে ফেলতো। একটা ছড়াও আছে । মুখ কালো করে বলতে হতো, ইদুর ভাই আমার দাঁতটা নিয়ে তোমার চিকন দাঁতটা দিও। বড়শির নাইলন সুতা কুট করে কাটা। খটাশ করে বড়ইর আঁটি ভাঙ্গার গ-া গ-া কৃতিত্ব দেখানো দাঁতের এই বেহাল দশা হবে কে কবে জানতো ।
তবে যাই বলুন, এই মাথাই শ্রদ্ধায় অবনত হয়ে আসে সেই দুরদর্শী দার্শনিকের জ্ঞানে; যিনি বিলক্ষণ বুঝেছিলেন বাঙ্গালী দাঁত থাকিতে দাঁতের মর্যাদা বোঝে না। দাঁত ব্যথা হবার পর জানা যায়, বাঙ্গালী শুধু দাঁতের মর্যাদা বোঝেই না যে তাই না,দাঁত খোয়ানোর পর তা লুকিয়েও রাখে। পাশের লোকটিকে চেপে ধরে জিঙ্গেস করুন, এক পর্যায়ে হা করে দাঁত বের করে বলবে তার এই কয়টা ক্ষয়ে গেছে , এই কটায় ক্যাপ লাগানো,ওই কয়টায় রুট ক্যানেল করা। এই প্রমাণ হরহামেশা মিলেছে। দাঁত ব্যথা হলে নিজ থেকেই আগ বাড়িয়ে জানাবে আমার এই কটা দাঁতই নেই! এমনকি অনেক সুন্দরী মেয়েরও দাঁত থাকে না ! অন্তত দাঁতের ব্যথা থাকে।
স্টিফেন হকিংসএর দাঁত ব্যথা আছে কি না কে জানে। তবে ১৯৯৮ আর ২০০২ সালে অসাধারণ কৃতিত্ব দেখানো ব্রাজিলের ফুটবল খেলোয়ার রিভালদোরও দাঁত ছিল না। ছোট বেলায় অপুষ্টিতে ক্ষয়ে পরে খসে পরেছিল। দাঁত ব্যথা শুনে জানালেন এক ক্রীড়ামোদী। এই প্রসঙ্গে তিনি সদ্য শেষ হওয়া বিশ্বকাপ ফুটবলের অন্য বিখ্যাত খেলোয়ার যারা ছোট বেলায় অপুষ্টিতে ভুগেছিলেন তাদের কাহিনি ফাঁদতে গেলে ডাক্তারের কাছে যেতে দেরী হয়ে যাচ্ছে বলে পালিয়ে আসি। পেছনে শুনি এতোক্ষণ গম্ভিরভাবে দাড়িয়ে থাকা কমিউনিস্ট বন্ধুটি বলছেন, এটাতো ঠিক বলেছেন। ভয়াবহ ব্যপার। আমাদের চল্লিশ লাখ গার্মেন্টস শ্রমিকের মুখের দিখে তাকিয়ে দেখুন কেমন ঠোঁট ঠেলে দাঁত বের হয়ে আছে। তার মানে পুষ্টির অভাব ! বেশ খানিকটা এগিয়ে গিয়েছি বলে তাদের কথা আর শুনতে পাই না। ব্যথা না থাকলে এই আলাপ অনেক ক্ষণ করা যেত।
ততক্ষণে অন্য চিন্তা মাথা চেপে ধরেছে। গল্প শুনে শুনে ব্যথার চেয়ে ভয় দাঁতের ডাক্তারদের । অনেক বার নাকি আসতে হয়। এক বারে দাঁেতর চিকিৎসা শেষ হবার নজির কম। এক বন্ধু ঝগড়ায় মধ্যস্ততা করতে গিয়ে দু পক্ষের ঘুষিতে দাঁত হারান একটি। অনেক চেম্বার ঘুরে , শেষ জনের কাছে এই সমাজ সেবার সর্বনিম্ন মূল্য দাড়ায় চৌদ্ধ হাজার টাকা। আমরা পরে হিসেব করেছি বন্ধুটির সব মিলিয়ে দন্ত সম্পদ আছে চৌদ্ধ গুন বত্রিশ,সমান সমান চার লাখ আট চল্লিশ হাজার টাকা। এই জন্যই বুঝি দাঁতকে অমূল্য সম্পদ বলে লোকে !
চেম্বারে অনেক দাঁতের ছবি টানানো । দাঁত নিয়ে কত আয়োজন! খুব স্বার্থপর ব্যথা। অন্য কোন কিছু নিয়ে ভাবতে দেয় না। আর জিহ্বা কিছুক্খণ পর পর ওখানেই খোঁচা দেয় !
এর মাঝেও চার পাশে দাঁতের ছবি পত্রিকার একটা খবর মনে করে দেয়। কিছুদিন আগে কাগজে বের হয়েছে এক ক্লিনিকের ডাক্তার বিরিয়ানি খাওয়াবে বলে কয়েকটা শিশুকে ভুলিয়ে ভালিয়ে নিয়ে দাঁত তুলে নিয়ে প্র্যাকটিস করেছে। এক জনের দাঁত তোলা দেখে ফেলে অন্যরা দৌড়ে খবর দিলে লোক জন তাদের ধাওয়া দেয়। দাঁত তুলতে পারলে দাঁতের ডাক্তারদের কি রকম যেন পয়েন্ট বাড়ে। আমারও দাঁত তুলে দিবে নাতো ! মনে মনে খেয়াল রাখি অবশ্যই নজর রাখতে হবে কোন নবিশ ডাক্তারের হাতে যেন না পরি। তারাই অনেক দাঁত তোলার অভিজ্ঞতা জোগার করে পুরাদস্তর ডাক্তার হয়। বেদেনীদের দাঁতের চিকিৎসায় ভেল্কি দেখিয়ে তুলার মধ্যে পোকা ঢুকিয়ে তা দাঁত থেকে বের করেছে দাবি থাকতো। আর পোকা প্রতি একটা রেটও ছিল। পোকা আগেই মজুদ ছিল সন্দেহ থাকলেও ব্যথার সময় বেদেনীদের কদরের অন্ত থাকতো না।মুলামুলি ও সমালোচনাটা হতো পরে ।
সুন্দরবনের বাওয়ালিরা নাকি আতঙ্কে বাঘের নাম মুখে আনেন না। মামা ডাকেন। না হয় তিনি ডাকেন। দাঁত নিয়ে এই হাস্য রসের সময় আমারও আতঙ্কে গা হিম হয়ে আসছে। মুখ খুলতেও ভয় হচ্ছে।সামনের দিরে দাঁতগুলো যদি লেখাটা দেখে ফেলে ! এর পরের দফায় ফাজলামোর শোধ তুলে নিবে সুদে আসলে। ব্যথা হবে হাজার গুন বেশি। তীব্র ও টন টনে। জ্ঞান হারানোর ঠিক আগে আগে নিয়ে ঝুলিয়ে রাখবে দাঁত মামা ! না হয় ব্যথা উঠবে মাঝ রাতে। সকাল পর্যন্ত এবার মাথা কুটে মরো। আর যাই হোক যখন তখন দাঁতের ডাক্তার মেলে না।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


