সময়টা যেন দারুন ব্যস্ত, সেই সাথে অসুস্থও হয়ে উঠছে ক্রমশঃ। নিরব থাকতে থাকতে কখন সরব হয়ে উঠেছি, চিৎকার করতে পারছি না বলে কলমের চিৎকারে শামিল হতে দু'হাত চালালাম।খুব সকালে পান্তা আর মাছভাজা খেয়ে রিকশা খুঁজতে খুঁজতে কুয়াশামাখা প্রকৃতিতে হারিয়ে গেলাম। শেষমেষ উপকূল নামের বাসটি মুখ থুবড়ে পড়তে পড়তে রক্ষা পেল, আল্লাহ্ বাঁচালেন।প্রতিযোগিতা; সামনের ট্রাক তার আচরণ দ্বারা বলছে, কোনক্রমেই সাইড দেব না। উপকূল প্রতিযোগিতায় জিতবেই, অন্যথা তার ড্রাইভিং জীবনে কলংক লেপিত হবে। সংস্কার কাজে রাস্তায় জমানো বালির ঢিবিতে তুলে দিল। মাটিকাটা শ্রমিকরা অসহায় তাকিয়ে থাকলো; যেন মুহূর্তপূর্বে মৃত্যুকে এক নযর দেখে নিল। আমরাও সর্বশক্তিমানের প্রশংসার পর পর চালকের প্রতি উদ্গীরিত ক্ষোভটুকু গিলে খাচ্ছিলাম, কেননা গাড়ী নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে বেশ বেগ পেতে হয়েছে এবং সাথে পাওয়া হাতের ব্যথাটুকু যেন তাকে যাত্রীদের আক্রমণ থেকে রক্ষা করলো।যে গতি রাখে তাকে যেতে দাও, তুমি তোমার গতিতে চল; কেননা অনিয়ম পৃথিবীকে কেবলই ধ্বংস করতে পারে, গড়তে নয়।
২.
পৃথিবীর বহু জায়গার ন্যায় এতদ অঞ্চলেও মুসলমানদের জন্য তাদের নবীর সুন্নাত দাড়ী সওয়াবের সাথে সাথে জাগতিক পাওনা এক প্রকার সম্মাননা তুলে দেয় ধারকের চিত্তে।একান্ত চেনাজানা না থাকলে কোন দুষ্টকেও দাড়ীর কারণে সম্মান প্রদর্শন করেন মুসলিমগণ।দু’চোখে এমন বহু অভিজ্ঞতা লেগে আছে যে, স্বল্প শিক্ষিত কেউ দাড়ী রাখার কারণে নানাবিধ ইসলামী সম্মানসূচক সম্বোধনগুলো লাভ করেছে সাধারণের আলাপ চারিতায়।তো, চলছিলাম এক নতুন এলাকায়, জীবনে প্রথম যাওয়া, মৌখিক ঠিকানা, তদুপরি এমন কেউ নেই যাকে চিনি।সাতে পাঁচে জিজ্ঞেস করে করে পৌঁছুলাম ফুলগাজী। অপেক্ষা, কখন আসবে সিএনজি। পা পা করে পায়চারী করে যাচ্ছিলাম। কানে বাজলো দাড়ীওয়ালাদের নিয়ে নানা রসিকতা, হুজুরদের নিয়ে বিবিধ বিদ্রূপ। না, এই তো আট বছর আগেও অবস্থা অন্ততঃ সাধারণে এমনটি ছিল না। পাল্টে যাচ্ছে পরিবেশ, জলবায়ু আর সাথে সাথে যেন মানুষের রুচিবোধ ও আচরণগুলো। জানিনা কোথায় গিয়ে ঠেকবো।
৩.
ছেলেটি সিএনজিতে পাশাপাশি বসেছিল, পাশের বন্ধুর সাথে নানা কথা বলছিল আর মাঝে মাঝে আমাকে দেখছিল।বক্স মাহমুদ-এর গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই হালকা যোগ-জিজ্ঞাসা হলো। অচেনাকে চিনে জেনে যখন ফিরছিলাম, তখন আসরের সময় চলছিল॥ বাজারে আমাকে দেখেই সালাম এবং সৌজন্য সংলাপ সেরে নিল। ‘কোথাও যেন আপনাকে দেখেছি,খুব চেনা চেনা লাগছে’। ‘জানি না কোথায় দেখেছেন’। চায়ের হালকা আড্ডায় চলছিল আলাপচারিতা। ফেরার কথা জানাতেই ফোন করে ঢাকাগামী বাসের টিকিট বুক করে দিল মোবাইলে, সাথে সাথে বাতলে দিল পথের দিশা। টেম্পুর সামনেই বসেছিলাম, সাথে আরেক প্রবাসী। কথায় কথায় কোথায় যাচ্ছি, কিভাবে যাচ্ছি কথা হলো। নির্দিষ্ট বাসের ভাড়া নিয়ে দ্বিধা বিভক্ত হয়ে গেলাম চালকসহ কয়েকজন। কথাগুলো ঝুলে গেল দশটাকা কম-বেশী নিয়ে। অবশেষে পাশে বসা প্রবাসী স্থানীয় বাসিন্দা জানালেন- হাজারী ফিরেছে, জানিয়ে গেছে প্রতি টিকিটে দশ টাকা করে… তাই যাত্রীদের জন্য ভাড়া বাড়লো নির্দিষ্ট ভাড়া থেকে দশ টাকা বেশী। মালিক পক্ষের ভাষ্যানুযায়ী- ‘এটা জনগণ দেবে’। ত্রাস যেখানে রাজা, জনগণ তো সেখানে প্রজা হতেই বাধ্য।
৪.
যাত্রা শুরু হয় সূর্যবিদায়ের কিছুক্ষণ পরই। রাতের শীতল বাতাসে আমাদের শরীরের চামড়াগুলো ঠান্ডা হয়ে এসেছিল। পাশে এসে বসলেন আরেক প্রবাসী, রুদ্ধ কণ্ঠে জানালেন কিভাবে মায়ের অসুস্থতার সংবাদ শুনে দেশে এসেও পিতাকে আর জীবিত দেখতে না পারার সীমাহীন কষ্টের কথা। কিছু কিছু ব্যথায় সান্ত্বনা দেয়াটাও অসম্ভব হয়ে উঠে। একসময় ঘুমিয়ে পড়লাম। থমকে দাঁড়ানো গাড়ীর ঝাঁকুনিতে বারবার ভাঙ্গে, তবে একেবারে থেমে যাওয়ায় পুরো ঘুমটাই চুরমার হয়ে সতেজ সটান বসলাম। আলো জ্বলে উঠলো। বাইরে তাকিয়ে দেখি পুলিশ এবং সাথে সিভিল পোষাকের কিছু লোক। কথাবার্তায় বুঝতে পারলাম নিয়মিত অনুসন্ধান। টর্চ হাতে লোকটি সামনের সীটগুলো দেখে দেখে চলতে চলতে যেই না এসে আলো ফেললো দাড়ীতে সাজানো অবয়বে; থেমে গেল সে। তার থেমে যাওয়া দেখে পাশের লোকটি উঠে দাঁড়ালো। না,অনুসন্ধানী তাকে বসিয়ে দিয়ে আমাকেই দাঁড়াতে বললেন। টর্চের আলোটি তখনো খেলা করছে আমার পুরো মুখটি জুড়ে।পরিপূর্ণ অনুসন্ধান হলো, কারুরই বুঝতে বাকী রইল না যে কেন শুধুমাত্র একজন ব্যক্তিকে অনুসন্ধান করা হলো। এমনকি কেউ কেউ শব্দ করে উঠলো- ‘অঅঅ’। এই ‘অঅঅ’ শব্দগুলো কানে খুব খুব করে বাজলো যেন- ‘জেএমবি???’!
নিশ্চিত কোন তথ্য না থাকলেও এদেশের প্রতিজন সচেতন নাগরিকই ইসলামের নামে হত্যা ও বোমাবাজী নির্ভর এ গোষ্ঠীর সম্পর্কে দু’ধরনের সিদ্ধান্তে আসতে পারে সহজেই।
এক) বর্তমান বিশ্বে ‘অপরাধের সূত্রপাতকারীরাই সাজে বিচারক’ আর আসামীর কাঠগড়ায় একচেটিয়াভাব ইসলাম ও মুসলিম।হতে পারে তেমন কোন অশুভ শক্তির হাতের পুতুল হয়েছে এ গোষ্ঠী। অথবা
দুই) নিজেরাই এ জঙ্গী পন্থায় কিছু অর্জনের প্রয়াসে সাধনা করে যাচ্ছে।
তবে দু’টোই যে ইসলাম ও মুসলমানদের জন্য ক্ষতিকর, তা বুঝি মৃত্যুও তাদের বুঝাতে পারেনি। ইসলাম বীরত্বের জীবনকে ও শাহাদাতের মৃত্যুকে অনেক উচ্চমর্যাদা দিয়েছে, তবে তা অবশ্যই মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের চিরন্তনী সুশৃংখল পথ ও পন্থায়।
স্বদেশের সাক্ষাতে এলাম দীর্ঘ আট বছর পর, কত বদলে গেছে, কত হারিয়ে গেছে, কতকি পেয়েছিও; যার বহুলাংশই নিরবে শেষ করে দিচ্ছে একটি জাতির প্রাণজল। একদিন হয়ত এ জাতির বুকেও চর জাগবে; জাতীয় মৃত্যুর চর। আর তা হবে চরিত্রের, আচরণের, ভাষার এবং নৈতিকতার।
১২ এপ্রিল ২০০৯, ঢাকা,বাংলাদেশ।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

