somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

হাসান আজিজুল হককে কথাশিল্পবিষয়ক ৭ প্রশ্ন

২০ শে জুলাই, ২০০৮ সন্ধ্যা ৭:৪৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

: একটা গল্প আপনার ভেতর কীভাবে বেড়ে ওঠে?

হাসান আজিজুল হক : গল্প যতক্ষণ মনের মধ্যে দানা না বাঁধে ততক্ষণ পর্যন্ত লিখি না। আমার মধ্যে খুব ধীরে ধীরে গল্প দানা বাঁধে। কোনো একটা গল্পের চরিত্র বা ঘটানা অনেকদিন ধরে মধুচক্রে মধু জমার মতোই আস্তে আস্তে পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়। আমি সাধারণত জোর করে গল্প তৈরি করি না এবং একটানা লিখি না। প্লট মাথায় এলে, অনেকদিন ধরে মনের ভেতর লালন করতে করতে লিখি। এরকমভাবে লিখি বলে, আমার বেশিরভাগ গল্পই প্রথমে মনে মনে লেখা হয়।
তবে একটা বিষয় কি, অনেক গল্পকার তার গল্পের শেষ দৃশ্যের কথা আগেই ভাবতে পারেন কিংবা জেনে যান। এক্ষেত্রে অবশ্য গল্পটা ঘটানাবহুল হলে শেষ দৃশ্যটার কথা গল্পকার ভাবতে পারেন বা জানতে পারেন। অনেক সময় এ জাতীয় গল্পে ঘটনার নাটকীয়তাও থাকে। কিন্তু চিন্তাপ্রধান বা ভাবপ্রধান গল্পের ক্ষেত্রে কখনই শেষ দৃশ্যের কথা ভাবতে হয় না। আমার গল্প সাধারণত কাহিনীপ্রধান হয় না। তাই আমার গল্পের শেষ দৃশ্যের কথা আমি আগে থেকেই ভেবে রাখতে পারি না। একটা অনিশ্চয়তা নিয়েই আমার গল্প মনে মনে এগুতে থাকে।

: গল্প লেখার বীজ আপনার ভেতরে কোথা থেকে আসে?

হাসান আজিজুল হক : কখনো কখনো পরিচিত গাছপালার মধ্যে অপরিচিত গাছ দেখা যায়। আমাদের মনে তখন হয়তো প্রশ্ন জাগতে পারে, কোথা থেকে এলো এ গাছের বীজ? বিদেশ থেকে, নাকি বাতাসে ভেসে ভোসে। গল্পও কি ওইভাবে আসে? জানি না। যেমন ধরো, একটা গল্প আমি লিখতে চাচ্ছি, গল্পটা হলো-Ô বাবা প্রায় পঙ্গু অবস্থায় অন্ধকার ঘরে বসেই থাকে। সে চোখেও দেখে না। ছেলে প্রতিদিন রাত দশটায় ফেরে। ছেলে বাবাকে বলে, তুমি বসেই যখন আছ তবে অন্ধকারে কেন? ..
এ গল্পটা কিন্তু এখনো লেখা হয়নি। কিছুতেই হচ্ছে না। কেননা সম্পূর্ণ গল্পটা আমার মনের মধ্যে দানা বাঁধেনি কিংবা গল্পটার বীজই পরিপূর্ণ হয়নি।
আপনার ভেতর কতবার খসড়ায় বা ড্রাফটের পর একটা গল্প তৈরি হয়?
হাসান আজিজুল হক : গল্পের ড্রাফট আমি সাধারণত করি না। আমি আগেই বলেছি গল্পটা প্রথমে মনে মনে লিখি। তবে একটা কথা না বললেই নয়, তা হলো- যখন গল্পটা মনে মনে সম্পূর্ণ অবস্থার মধ্যে আসে তখন ওই গল্পটা না লেখা পর্যন্ত ঠিক স্বস্তি পাই না। ফলে ওই গল্পটার হাত থেকে নিস্তার পাওয়ার জন্যই দ্রুত লিখে ফেলি।
আমি মনে করি, একটা লেখাকে বা গল্পকে যতদূর পারা যায় কম শব্দে বা কম বাক্যে প্রকাশ করা উচিত। এক্ষেত্রে গল্পে ব্যবহৃত কোনো বাক্য বা শব্দ যেন বৃথা না যায়। এ জন্য গল্প লেখা হলে, আমি সাধারণত অন্য এক পাঠক হয়ে গল্পটা পড়ি। এই কোজ রিডিংয়ের ফলে অনেক সময় গল্পের কোনো কোনো জায়গা হয়তো পরিবর্তন করি বা বাদ দেই। বলা যেতে পারে, গল্পটা ঠিক করি। গল্পের অনেক অপ্রয়োজনীয় ডালপালা ছাঁটি।
কোন বিশেষ প্রেরণা থেকে আপনি কথাশিল্প নিয়ে কাজ করছেন?

হাসান আজিজুল হক : এটুকু বলতে পারি, আমার গল্প পড়ার বা লেখার ইচ্ছা তো অনেক পুরনো। কেন লোকে লিখতে চায় বা কোন কারণে লোকে লেখে এটা বলা মুশকিল। তবে বেশ ছোটবেলা থেকেই আমার ঝোঁক ছিল পড়া আর লেখার দিকে। গল্প লেখার ক্ষেত্রে কোনো প্রেরণার কথা নির্দিষ্ট করে বলা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। ছোটবেলায় আমি একটা অজপাড়াগাঁয়ে ছিলাম। কিন্তু সাহিত্যের পাঠে প্রকৃতির ছবি, মানুষের ছবি দেখার খুব আগ্রহ ছিল। এক্ষেত্রে হতে পারে সেটা পথের পাঁচালি, হতে পারে সেটা খুব সাধারণ একটা ঘটনাবহুল বই বা কোনো গোয়েন্দা গল্প।
বলা যায় খুব বুভুক্ষা আর ক্ষুধা নিয়ে আমি পৃথিবীর দিকে তাকাতাম। একটা দীর্ঘ দুপুর হয়তো আমার কেটে যেত বইয়ের মধ্যেই। মনে আছে ‘পৃথিবীর জীবজন্তু’ নামে একটা বই আমি পড়েছিলাম। সেখানে জেনেছিলাম নিউজল্যান্ডের অদ্ভুত সব পাখিদের কথা, তাদের অভ্যাসের কথা। ওই সময় আমার এসব পড়ার দিকে যেমন ঝোঁক ছিল তেমনি ঝোঁক ছিল লেখার দিকে। তখন আমি কখনো কখনো বন্ধুদের মুখে মুখে বানিয়ে বানিয়ে গল্প বলাতাম।
ষাটের দশকের একেবারে গোড়া থেকেই আমার লেখক জীবনের শুরু। তখনই আমি ঠিক করেছিলাম, আমি লিখব। সরকারি চাকরি করব না, আমলার চাকরি করব না। লেখার সুবিধার জন্য সবচেয়ে কাছাকাছি পেশা অধ্যাপনাকেই বেছে নিলাম। এটা কিন্তু আমার কোনো ভুল সিদ্ধান্ত ছিল না। এ পেশায় কারও কাছে কোনোভাবেই কোনো কিছু আমাকে বাঁধা রাখতে হয়নি। তবে সেটা থেকে ধনও আসেনি আবার দারিদ্র্যও আসেনি।

: ছোটগল্পের তুলনায় আপনার উপন্যাস খুব বেশি চোখে পড়ে না। সাম্প্রতিক সময়ে দীর্ঘ কোনো উপন্যাস লেখায় কী হাত দেবেন?

হাসান আজিজুল হক : আমি তো মূলত ঔপন্যাসিক হিসেবেই পরিচিত হতে চেয়েছি। আমি উপন্যাসের ব্যাপারে অনেক উচ্চাকাক্সক্ষা করতাম বলেই কি অপেক্ষা করতাম। জানি না। তবে যে উপন্যাসটা আমি লিখতে চেয়েছি তা কিন্তু শেষ করা হয়নি। আমার বেশ কয়েকটা অসমাপ্ত উপন্যাস পড়ে আছে। মেট্রিক পরীক্ষার পর আমি একটা উপন্যাস লেখা শুরু করেছিলাম। উপন্যাসটা পরে আর আমার লেখা হয়ে ওঠেনি।
একটা উপন্যাস রয়েছে শামুক। ওই উপন্যাসটা আমি আর খুঁজে পাইনি। শামুকটা যদি উদ্ধার করতে পারি, দেখব সেটা বই আকারে প্রকাশ করা যায় কি না। আর একটা লেখা অসমাপ্ত, সেটা ১৯৬৯ সালে লিখতে শুরু করা। ঐতিহ্য বের করেছে আমার উপন্যাস শিউলি। অতি সাম্প্রতি সত্যিকার অর্থে উপন্যাস লিখলাম আগুনপাখি।
এ মুহূর্তে দীর্ঘ বিস্তারিত লেখা আমার স্মৃতিকথা মাঝখানে রেখে দিয়ে ওটা লেখা। ওটাকে উপন্যাস বলা যাবে কি না আমি ঠিক জানি না। খুব ঘটনাবহুল জীবন তো আমাদের নয়। তবে রাষ্ট্রীয়ভাবে, মানসিকভাবে জীবনযাপনে খুব ঝড়ঝাপটার মধ্য দিয়ে আমাদের যেতে হয়েছে। সময় অনেক বদলেছে, সে ঝড়ঝাপটার কথা আমার লিখতে ইচ্ছে করলেও পাঠকদের সেটা পড়তে ইছে হয়তো নাও করতে পারে। তবে পাঠকের ইচ্ছা থাকুক আর না থাকুক, আমাকে তো কাজ করতে হবে। ইতিহাসের নিরবচ্ছিন্নতার কাজ।

: আপনার লেখায় আপনার প্রিয় লেখকের প্রভাব পড়ে?

হাসান আজিজুল হক : নির্দিষ্ট প্রিয় লেখক তো সাধারণত কারও থাকে না। ফলে দেশে-বিদেশে খ্যাত-অখ্যাত অনেক প্রিয় লেখক আছে আমার। মার্কিনিদের মধ্যে আর্নেস্ট হেমিংওয়ে এবং হেমিংওয়ের গুরু স্টিফেন ক্রেইন আমার প্রিয় লেখক। স্টিফেন ক্রেইনের ছোটগল্পগুলো আমার কাছে অসাধারণ মনে হয়েছে। এডগার অ্যালান পোও প্রিয়। তবে মোপাসাকে খুব প্রিয় বলতে পারি না।
অপরদিকে চেকভ ও রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প আমার খুবই ভালো লাগে। অর্থাৎ কালোয়াতির চেয়ে রস এবং সংগীত আমার অনেক ভালো লাগে। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় বা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তো প্রিয়ই। এখন অসম্ভব প্রিয় যদি কাউকে বলি তিনি হচ্ছেন বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়। অবসরে আমার লাইব্রেরির সামনে একা থাকলে, ওই মুহূর্তে কিছু পড়তে ইচ্ছে হলে আমি বিভূতি, অবন ঠাকুর বা সুকুমার রায় টেনে নিয়ে পড়ব। তবে আমি যখন চাইব তখনই অতিশয় দুস্প্রাপ্য ও দুষ্পাঠ্য বইও মন দিয়ে পাঠ করতে পারব। যেমন- কান্টের ক্রিটিক অব পিউর রিজন বা মার্কসও পড়তে পারি। তবে অবসর সময়ে কিন্তু ওইসব টানব না। আর কখনই নিজের লেখা বই টানব না। খুব অপছন্দ করি।

: সমকালীন কথাশিল্পের কোন কোন বৈশিষ্ট্য আগের ধারা থেকে আলাদা করেছে?

হাসান আজিজুল হক : সব কিছুই বদলাচ্ছে। বদলানো যদিও স্বাভাবিক তবে সব বদলই যেন এক ধরনের। আমাদের এখানে বেশিরভাগ বদলই যেন স্বাভাবিক নয়। এ বদল যেন বিকাশহীন।
বিকাশ ও বদলের মধ্যে কিন্তু পার্থক্য আছে। আমার কাছে মনে হয় এখানকার বেশিরভাগ বদলই কৃত্রিম। অনেক বদলকেই আমার কাছে মনে হয়, কাকের ময়ূরের পুচ্ছ ধারণ।
আজকের পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে প্রায়ই ভাবি, সভ্যতার সঙ্গে মানুষ কীভাবে নিজেকে মিলিয়ে নিচ্ছে। গ্রিকরা এক সময় খুঁজত, মানুষের সর্বোচ্চ আকাক্সক্ষার বস্তু কী। আমার কাছে মনে হয়, কোনো চিন্তাই এখানে ঠিকমতো দাঁড়াচ্ছে না। এ সময়ের জীবন ও জীবনের সম্পর্কগুলো যেন স্থিত অবস্থা থেকে সরে গেছে। এ সময়টা যেন কেবল ইন্দ্রিয় সেবা এবং ভোগে মত্ত, যার ছাপ অনেক সময় সাহিত্যেও পাওয়া যায়।


লেখাটি দৈনিক ডেসটিনিতে ১৮.০৭.০৮ তারিখে প্রকাশিত
সর্বশেষ এডিট : ২২ শে জুলাই, ২০০৮ বিকাল ৫:১৭
৯টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে আব্বাসীদের জন্য হুমকি হয়ে আসছে- কী হবে খালেদ মহিউদ্দিনের?

লিখেছেন হিমন, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৫০

হোমো ইরেক্টাসদের প্রায় বিশ লাখ বছর আগের আগুনের ব্যবহার থেকে শুরু করে ছয় হাজার বছর আগের চাকা আবিষ্কার, ১৮৩১ সালের বিদ্যুৎ, গত শতাব্দীর অ্যান্টিবায়োটিক, আর এই সেদিনের ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন—... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×