AMAR DESH newspaper a ekta article lekha hoise, ami share dilam as a note .....
প্রসঙ্গ : থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার
আবদুল্লাহ জহির বাবু
কোত্থেকে শুরু করব ভাবছি? বুঝতে পারছি না কাকে নিয়ে শুরু করব? প্রথমে ভালো দিকগুলো না বললে এটা হয়তো সমালোচনা মনে না হয়ে কুত্সার পর্যায়ে চলে যেতে পারে। তাই ভালো দিকগুলো আগে শুরু করা যাক। সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য ছায়াছবির আলোকসম্পাত ও চিত্রগ্রহণ। বিশেষ করে তিশার মা মারা যাওয়ার পর তার ট্রিটমেন্ট অসাধারণ। সবুজ মাঠের মাঝে ছোট পুকুর। সেই পুকুরে ভাসমান সাদা নৌকা একটা শুকনো গাছের নিচে বাঁধা, এই ট্রিটমেন্ট নিঃসন্দেহে অতুলনীয়। আফসোস, এই গুণী চিত্রগ্রাহক সুব্রত আজ আর আমাদের মাঝে নেই। বেঁচে থাকলে তার কাছ থেকে হয়তো এর চেয়ে আরও ভালো কিছু আমরা পেতাম। এ ক্ষতি অপূরণীয়।
নিজের চরিত্রে মোশাররফ করিম যথারীতি অসাধারণ। অভিনয়ের ডিটেলসের প্রতি তার তীক্ষষ্ট নজর ও পর্যবেক্ষণ চোখে পড়ার মতো। জেলহাজত থেকে ছাড়া পাওয়ার পর তিশার সঙ্গে তার তিন-চারটা দৃশ্য প্রশংসার দাবিদার। যদিও তার বক্তব্যের মাঝে অনেক ভুল এবং স্ববিরোধী সংলাপ ছিল, যেমন—বিয়ে না হওয়া সত্ত্বেও ডিভোর্স নিয়ে নিজের সঙ্গে নিজের ড্রামা, কীভাবে জেলহাজতে সে এলো সেই যুক্তির অভাব এবং কীভাবে তার জামিন হলো তা না দেখানো—এরকম খুঁটিনাটি কিছু বিষয়। তারপরও অভিনয়ের গুণ এবং গেটআপ-মেকফাপের কারণে তিনি চমত্কার উের গেছেন।
চরিত্র ছোট হওয়া সত্ত্বেও অনবদ্য অভিনয় করেছেন রানী সরকার ও আবুল হায়াত। কিন্তু কথা থেকে যায় আবুল হায়াতের অভিনয়ের এথিকস বা নৈতিকতা নিয়ে। ক্যারিয়ারের এই পর্যায়ে এসে তার মতো একজন গুণী মানুষ, নাট্যকার এবং কলামিস্ট কী করে একটি নেগেটিভ নারীলোলুপ চরিত্রে অভিনয় করলেন তা বোধগম্য হয়নি। যে চরিত্র মাথার নামাজের টুপি খুলে তিশার সঙ্গে সময় কাটানোর জন্য তার বাড়ির বাইরে দাঁড়ায়, নিজের স্ত্রীকে ফাঁকি দিয়ে তরুণীর সঙ্গে মোবাইলে প্রেম করতে চায় এবং তার সঙ্গে দৈহিক সম্পর্ক স্থাপনের আগ্রহ পোষণ করে, তাকে ঘর ভাড়া করে রাখে, এই চরিত্রে তার কি অভিনয় না করলেই হতো না?
একই কথা খাটে গায়ক তপুর ক্ষেত্রেও। তার গানের ব্যবহারগুলো ছিল অনবদ্য। সিচুয়েশন এবং মুডগুলো ছিল সঠিক। কিন্তু নিজেই নিজের নামধারী চরিত্রে অভিনয় করতে গিয়ে তিনি এমন কিছু দৃশ্যে অভিনয় করেছেন, যা বিস্ময়কর? আমরা জানি, যেসব চরিত্রে জনপ্রিয় বাস্তব চরিত্রের প্রজেকশন থাকে, সেগুলোতে বাস্তব মানুষটির চরিত্রকেই মাপকাঠি ধরা হয়। যদি তাই হয় তাহলে তপুর মতো একজন জনপ্রিয় গায়ক কীভাবে জেনে-বুঝে এমন একটি চরিত্রে অভিনয় করলেন? যেখানে তার চরিত্রের উপস্থাপনায় দেখানো হয়েছে—বান্ধবীর উপকার করে প্রতিদান চাইছে? বান্ধবীর সঙ্গে সুন্দর মুহূর্ত যাপনের জন্য জন্মনিরোধকের প্যাকেট কিনে নিয়ে তার বাড়ির দরজায় দাঁড়াতেও দ্বিধাবোধ করেন না? গায়ক তপুর চরিত্র কি এতই বায়বীয়? চরিত্রের নামটা তপু হওয়া কি এতটাই প্রয়োজনীয় ছিল?
ছবিটির গল্পের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, ছবির মুখ্য চরিত্র তিশা কি বিবাহিতা না অবিবাহিতা? যদি অবিবাহিতা হবেন তাহলে মোশাররফ করিমের বাবা তাকে এবং মোশাররফকে বাড়িতে জায়গা দিলেন কেন? গলা ধাক্কা দিয়ে কেন বের করে দিলেন না? মোশাররফের বাবার বাড়িতে কি লিভ টুগেদার সামাজিকভাবে স্বীকৃত? উনি কোন দেশের বাসিন্দা? বাংলাদেশের নাকি পাশ্চাত্যের কোনো দেশের? মোশাররফ কেন খুন করলেন? কী অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে খুন করলেন তা পর্দায় আসেনি। দায়সারাভাবে তিশার চরিত্রটি পুলিশের ওসির সামনে অবশ্য বলেছে তার স্বামী কী কারণে জেলহাজতে। স্বামী? স্বামী কে? মোশাররফের সঙ্গে তো বিয়েই হয়নি? অথচ তিশা বারবার শ্বশুরবাড়ি-শ্বশুরবাড়ি বলে তাদের দোষারোপ করেছেন? তাহলে কি আমরা ধরে নেব, লিভ টুগেদার এবং বিয়ে সমার্থক শব্দ। ছবিটির রচয়িতা কি ভাষাতত্ত্বের নতুন কোনো ধারা শুরু করতে চাইছেন?
ছায়াছবির প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত একটাই চরিত্র। রুবা। এই চরিত্রেই রূপদান করেছেন তিশা। এটাকে থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার না বলে রুবা অথবা তিশার ডকুমেন্টারি বলাই ভালো। তার দ্বৈত সত্তা এবং তার শৈশবের সত্তা কাহিনীর বিবেকের চরিত্র। সম্পূর্ণ ছায়াছবিতে এমন কোনো দৃশ্য নেই, যে দৃশ্যে তিশা নেই। সব দৃশ্য তিশার চিন্তা-চেতনাকে নিয়েই। অথচ তিশার চরিত্রটিকেই সবচেয়ে ঠুনকো কাঠামোর ওপর দাঁড় করানো হয়েছে? তিশা চরিত্রের বাবা কে? কী করতেন? তাদের কী অবস্থায় রেখে মারা গেছেন—তার কোনো উল্লেখ গল্পে নেই? তাদের সামাজিক অবস্থান কেমন ছিল তা কোথাও বলা নেই। গল্পে দেখানো হয়েছে তিশার মা বাবাকে ছেড়ে তার নিজের প্রেমিককে বিয়ে করেছিল, এটা তিশার একটা বড় ক্ষোভ। এটাই যদি তার অভিযোগ হবে, তাহলে সে কী করে বিয়ে না করা সত্ত্বেও একজন পুরুষের সঙ্গে তার শয্যাসঙ্গিনী হয়েছিল?
আবার তার অবর্তমানে সে কী করে ছুটে গেল তারই বাল্যপ্রেমিক তপুর কাছে? এগুলো কি চরিত্রের স্ববিরোধিতা নয়? মা যদি দুশ্চরিত্রাই হয়ে থাকেন তাহলে তিশা নিজে কী? ছবির শেষ দৃশ্যে দেখানো হলো তপু মোশাররফ করিমের কাঁধে হাত দিয়ে হাঁটছে, সামনে তিশা। তার মানে কী দাঁড়াল? থার্ড পারসনটি কে? যে তার আগের প্রেমিক, নাকি যার সঙ্গে সে লিভ টুগেদার করছে?
ছবিটির দু’তিনটি চরিত্র ছাড়া সবাই নারীলিপ্সু। আবুল হায়াত, তার বন্ধু, শিল্পপতি সবাই। এমনকি একটা চরিত্রে দেখানো হলো, তিশার আশ্রয়দাতা ও চাকরিদাতা কচি সাহেবের গাড়িতে বারবার একই গান বাজছে—বেবি, আই ওয়ান্ট টু ... ইউ। গানটি শোনার পর তিশার সংলাপ ছিল এমন—আপনার কি গান শুনেই হয়ে যায়? এই সংলাপে কী বোঝাতে চেয়েছেন তিশা? কোথায় ছিল সেন্সর বোর্ড?
বাণিজ্যিক ছবি বলে মূল ধারার ছবিকে যারা কটাক্ষ করেন তাদের কাছ থেকে আমরা কি এর চেয়ে ভালো কিছু আশা করতে পারি না? আনিসুল হকের মতো একজন জনপ্রিয় আর নন্দিত লেখকের কাছ থেকে কি এর চেয়ে ভালো কিছু আশা করা খুব অন্যায়? নারীর প্রতি পুরুষের আকর্ষণটাই স্বাভাবিক, কিন্তু সেই আকর্ষণকে এতটা কদর্য উপস্থাপনা কি শোভনীয়? আমি যদি বলি থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার শালীনভাবে উপস্থাপিত একটা অশ্লীল ছবি—তাহলে কি খুব বেশি বাড়াবাড়ি হবে? নাকি আমরা ধরে নেব, আমরা অতি আধুনিক হয়ে গেছি! আমাদের বাস পাশ্চাত্যের কোনো অতি উন্নত দেশে!

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

