ভারত জুজু - হুমায়ূন আহমেদ
আমরা যখন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র তখন টঝওঝ ছিল প্রেসক্লাবের সামনে। যেকোনো উপলক্ষে আমরা মিছিল করে সেখানে যেতাম। 'আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদ নিপাত যাও' বলে বিকট চিৎকার দিয়ে আনন্দ নিয়ে ফিরে আসতাম। এটা ছিল রুটিন কার্যক্রম। আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদের এই চিৎকারে কিছু যেত-আসত না। তাতে কী? আমরা তো আমাদের দায়িত্ব পালন করেছি।
এক সময় দেখি পাশের দেশ ভারত তাদের জায়গা নিয়ে নিল। যত দোষ ভারত ঘোষ অবস্থা। ১৯৬৫ সালে ভারতের সঙ্গে যুদ্ধ বেধে গেল। আমরা অতি-উৎসাহী। নিয়মিতভাবে নিউ মার্কেটে কেউ না কেউ ভারতের স্পাই হিসেবে মার খেয়ে আধমরা হতো। আমরা খুশি ভারতীয় স্পাই তো ধরা পড়ছে। মহান পাকিস্তানের জন্যে আমাদের অন্তর আপ্লুত।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো একবার বললেন, ভারতকে শায়েস্তা করার জন্য প্রয়োজনে ঘাস খেয়ে হলেও পাকিস্তান অ্যাটম বোমা বানাবে। আমরা আনন্দিত চিত্তে ঘাস খাওয়ার প্রস্তুতি নিলাম। ভারত আমাদের চিরশত্রু_এটা ততদিনে মাথায় ঢুকে গেছে, কিংবা ঢুকানো হয়েছে।
১৯৭১ সাল, প্রিয় পাকিস্তানের বিরুদ্ধে শুরু হলো আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধ। ভারত আমাদের পাশে এসে দাঁড়াল। তখনো সমস্যা_ভারত কি আর মানবিক কারণে আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছে? ভারতের মতলব ভালো হওয়ার কোনো কারণ নেই। ভারত চাচ্ছে পাকিস্তান ভেঙে টুকরা টুকরা করতে। যেই মুহূর্তে তারা সফল হবে, পূর্ব পাকিস্তান চলে যাবে তাদের দখলে। আমাদেরকে হিন্দি কথা শিখতে হবে।
ব্যাপার কিন্তু সে রকম ঘটল না। তারপরও ভারতবিরোধী আগুন জ্বালিয়ে রাখা বাংলাদেশের রাজনীতির একটা ধারা হয়ে গেল।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দিলি্ল গেলেন। কিছু চুক্তি ভারতের সঙ্গে আমাদের হয়েছে। রাজনীতির একটা ধারা গলা ফাটিয়ে চিৎকার শুরু করলেন, বাংলাদেশ শেখ হাসিনা বিক্রি করে দিয়ে এসেছেন। লাভ-ক্ষতি কী হয়েছে আমি জানি না। আমি একটা জিনিসই জানি, বাংলাদেশ বিক্রি হবার না। শেখ হাসিনা কিংবা বেগম খালেদা জিয়া কেউ এই কাজটি করতে পারবেন না। ভারত জুজুর ভয় দেখানোর পুরানো খেলা কেন আমরা এখনো খেলছি?
ক্ষমতাধর যে রাষ্ট্রটি আমাদের পাশে, তার সাহায্য আমাদের ক্ষমতাবান হবার জন্য প্রয়োজন। তারা আমাদের নৌবন্দর ব্যবহার করবে, করুক। বন্ধুত্বের হাত আমাদের অবশ্যই বাড়াতে হবে। সারাক্ষণ 'ভারত সব নিয়ে নিল' বলে চিৎকার-চেঁচামেচির কিছু নেই। আমরা বার্মার মতো রুদ্ধ রাষ্ট্র হতে চাই না।
বলা হয়ে থাকে, একটি দেশের লেখকরা সেই দেশের আত্দা। এটা অনেক বড় কথা, আমি নিজে তা মনে করি না। অনেক দুষ্ট লেখক আছেন, দেশের আত্দা হবার তাঁদের যোগ্যতা নেই। দেশের সাধারণ একজন মানুষ হিসেবে আমি পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি_বন্ধুত্বের যে পথে আমরা এগুচ্ছি সেটাই শুদ্ধ পথ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন। কেউ যেন আবার ভেবে না বসেন আওয়ামী লীগের কাছে আমার কোনো দায়বদ্ধতা আছে। কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতি আমার দায়বদ্ধতা নেই। আমি দায়বদ্ধ আমার দেশের কাছে।
Click This Link

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



