আমাদের স্কুলজীবনে, সেই ১৯৬৪-৬৫ সালের দিকে, আমরা যখন ফোর-ফাইভে পড়ি, তখন যেসব বিষয় নিয়ে আমাদের মধ্যে কথা কাটাকাটি হতো, সেগুলোর একটি ছিল_ কে বড় কবি? রবীন্দ্রনাথ, নাকি নজরুল? পাল্লাটা ভারী থাকত নজরুলের দিকেই। বলা হতো, নজরুলই নোবেল পেতেন; কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ষড়যন্ত্র করে কিছু একটা খাইয়ে তাঁর মাথা নষ্ট করে দিয়েছেন। আইয়ুব শাসনের রবীন্দ্রবিরোধিতা এবং নজরুলকে বড় করে দেখানোর নানামুখী চেষ্টায় আমাদের মগজ ধোলাইয়ের কাজটা ভালোই হয়েছিল বলা যায়। আরেকটি বিষয়ে আমাদের মধ্যে তর্ক হতো_ যুদ্ধ লাগলে কে জিতবে? পাকিস্তান, নাকি ভারত? স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলন তখনো দানা বাঁধেনি। বলা বাহুল্য, আমাদের কচি মন পাকিস্তানের পক্ষেই সায় দিত। আমাদের কেউ কেউ এমনও বলত_ ভারতের ১০ জন সৈন্যের সমান পাকিস্তানের একজন। 'নারায়ে তাকবির, আল্লাহু আকবার' ধ্বনির সামনে ভারতের ট্যাংক-কামান-বোমা কিছুই নয়_ বুকে থাবা মেরে বলত কেউ কেউ। ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় রেডিও পাকিস্তানের মিথ্যা প্রচারণাগুলো আমরা বিশ্বাস করতাম এবং যুদ্ধে পাকিস্তান অনেক পিছিয়ে থাকলেও যুদ্ধশেষে আমাদের ধারণা বদ্ধমূল হয়েছিল, পাকিস্তানই জিতেছে।
ঢাকা শহরের অন্তত পাঁচটি শিক্ষিত মধ্যবিত্ত (এখানে শিক্ষিত মানে বিএ-এমএ পাস) পরিবারকে চিনি আমি, যাদের ভারতবিরোধিতা 'এনজয়' করার মতো একটা বিষয়। খুবই অদ্ভুত আর মজার এই ভারতবিরোধিতা। তারা ভারতীয় সিনেমা ও টেলিসিরিয়ালে নেশাগ্রস্ত, তাদের কোনো কোনো সন্তান দার্জিলিং অথবা ভারতের অন্য কোথাও লেখাপড়া করে, জটিল ব্যাধিতে আক্রান্ত হলে ভারতে গিয়ে চিকিৎসা করায়, প্রমোদবিহারে যাওয়ার উদ্দেশ্যে ভারতীয় দূতাবাসে ভিসার জন্য লাইন লাগায়। অথচ তারা ভারতবিরোধী! ভারতের যেসব মুসলমান খ্যাতি অর্জন করেছেন, তারা তাঁদের দারুণ ভক্ত। কিন্তু এসব খ্যাতিমানের চেয়ে অধিক খ্যাতিসম্পন্নদের কোনো মূল্য নেই তাদের কাছে। তিন খান (শাহরুখ-সালমান-আমির) বলতে এরা পাগল; অমিতাভ বচ্চন তেমন কেউ নন। তারা ক্রিকেটে ভারতের বিপক্ষ দলকে সমর্থন করবে, কিন্তু আজহারউদ্দিনের নাম উঠলেই বলবে_ বিশাল ক্রিকেটার! প্রকৃতপক্ষে, তাদের ভারতবিরোধিতা মানে, হিন্দু-বিরোধিতা। মাধুরীর নাচ দেখলে তাদের মুসলমানিত্বের কোনো ক্ষতি হয় না, বরং তারা মুগ্ধ হয়; তবে মাধুরীর হিন্দুত্ব তাদের কাছে বিরাট পাপ। এই পরিবারগুলোর একটি ১০-১২ বছরের বালক শাহরুখ খানের ভীষণ ভক্ত। আমার ছোট ছেলে একদিন তাকে তামাশা করে বলল_ জানো, শাহরুখ খানের কিন্তু খৎনা করায়নি। কথাটা শুনে সেই ছেলের সেকি কষ্ট! সেই রাতে সে নাকি ঘুমাতে পারেনি। মজার ব্যাপার হচ্ছে, খ্রিস্টধর্মসহ অন্যান্য ধর্মের প্রতি এই পরিবারগুলোর তেমন বিদ্বেষ নেই; যত ঘৃণা হিন্দুত্বের প্রতি। বিষয়টি ১০০ ভাগ রাজনৈতিক। যেমন ফিলিস্তিন কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের মুসলমানদের হিন্দুধর্ম নিয়ে তেমন মাথাব্যথা নেই। তাদের ক্ষোভ খ্রিস্ট ও ইহুদি ধর্মের প্রতি। দেশের কিছু মানুষের মধ্যে হিন্দু-বিদ্বেষ এত প্রবল যে, বাচ্চাদের বাংলা নামের মধ্যেও তারা হিন্দুত্ব খুঁজে বেড়ায়। সবচেয়ে দুঃখজনক, স্কুলের ডিগ্রিধারী অনেক শিক্ষক তাঁদের কোনো ছাত্র কেন খাঁটি ইসলামী নাম রাখেনি, এ নিয়ে তাকে তিরস্কার করে থাকেন। মাধুরী একটি সুন্দর নাম। এই নামের কোনো মেয়েকে নাজেহাল করার মতো শিক্ষকের অভাব নেই এ দেশে। মূল প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে প্রথমেই বলে নিতে হয়, এতক্ষণ যাদের কথা বলা হলো, তারাই বিএনপির ভারতবিরোধিতার রাজনীতির প্রধান অবলম্বন।
প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের পর বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম জিয়া সাফ সাফ বলে দিয়েছেন, ভারতের কাছে দেশ বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। তাঁর এই মন্তব্যের জন্য অবশ্য প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করার দরকার ছিল না। সফর শুরু হওয়ার আগেই চোখ বুঁজে বলে দেওয়া যেত, তিনি এমন কথাই বলবেন, এ জন্য রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই। এই ছকে-বাঁধা রাজনীতি অনেকটা ঢাকাইয়া বাংলা সিনেমার মতো। নায়ক ও ভিলেন কখন কেমন আচরণ করবেন, দর্শক আগে থেকেই টের পায়। যা হোক, আমাদের বিরোধীদলীয় নেত্রী দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব নিয়ে খুবই চিন্তিত। বাস্তবতা হচ্ছে, যাদের জন্য তাঁর রাজনীতি, সেই জনগণ স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব নিয়ে মোটেও উদ্বিগ্ন নয়। বিরোধীদলীয় নেত্রী স্বাধীনতা বলতে কী বোঝেন, তিনিই জানেন। দেশটা স্বাধীন সত্য, কিন্তু এটা এখনো কার্ল মার্ক্স কথিত করহমফড়স ড়ভ ভৎববফড়স বা স্বাধীনতার রাজ্য হতে পারেনি। জনগণ চেতন বা অচেতনভাবে সেই রাজ্যেই পেঁৗছতে চায়। এ এমন এক রাজ্য, যেখানে মানুষ পাবে সব বিষয়ে অধীনতামুক্ত একটি জীবন। সেই জীবনে পেঁৗছার জন্য অনেক শর্তের মধ্যে প্রয়োজন একটি বড় শর্তপূরণ_ অর্থনৈতিক সচ্ছলতা। সন্তান আপেল খেতে চাইলে যে পিতা একটি পেয়ারাও কিনে দিতে পারে না, সে কি স্বাধীন? অথবা সংসারের দুঃখ-কষ্টের ওপর বাড়তি দুর্ভোগ হিসেবে যখন নেমে আসে স্বামীর নির্যাতন, তখন সেই নারীর জীবনে ভৌগোলিক স্বাধীনতার তাৎপর্য কী? যা অন্যের জন্য সম্ভব, অথচ আমার কাছে অসম্ভব, সেই অবস্থাটা কখনোই স্বাধীনতা নয়। এ দেশের ৮০ শতাংশ মানুষই এমন অবস্থার মধ্যে জীবনযাপন করে। অর্থাৎ, তারা একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের অধিবাসী হলেও স্বাধীনতার রাজ্যের অধিবাসী নয়। আমাদের বিরোধীদলীয় নেত্রী অনেক আগেই স্বাধীনতার রাজ্যে পেঁৗছে গেছেন। সুতরাং তিনি দেশের ভৌগোলিক স্বাধীনতা নিয়েই বেশি উদ্বিগ্ন। প্রকৃতপক্ষে, তিনি দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব নিয়ে মোটেই উদ্বিগ্ন নন। ভালো করেই জানেন, তিনি শ্রীলঙ্কা-নেপাল-ভুটান ইত্যাদি রাষ্ট্র যেমন টিকে আছে, বাংলাদেশও তেমনি টিকে থাকবে। তাঁর যত উদ্বেগ, তার সবটাই নিজের অথবা তারেক রহমানের প্রধানমন্ত্রিত্ব নিয়ে। আর এ কারণে গঠনমূলক রাজনীতির পথ পরিহার করে দেশের একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক হিন্দুবিরোধী, প্রকারান্তরে ভারতবিরোধীদের ওপর ভর করতে চান তিনি। তাঁর কাছে মনে হয়েছে, এ পথটি অপেক্ষাকৃত সোজা এবং মসৃণ। এ দেশে বহু মানুষ জমিজমা বিক্রি করে হজ করতে যান। অর্থাৎ, তাদের কাছে খাদ্যের চেয়ে ধর্ম বড়_ বিরোধীদলীয় নেত্রীর জানা আছে এ তথ্য।
পলিটিক্যাল গিমিক পরিহার করে বেগম জিয়া প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরকে অর্থনীতির মানদণ্ডে মূল্যায়ন করতে পারতেন। চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর ভারতকে ব্যবহারের সুযোগ করে দিলে দেশের অর্থনীতির যদি কোনো ক্ষতি হয়, তাহলে সেই ক্ষতি কিভাবে এবং কত হবে, তার একটা হিসাব দিতে পারতেন তিনি। ছয়তলা ভবনের মালিক যদি কিছু ফ্ল্যাট ভাড়া না-দিয়ে পুরোটাই অনাবশ্যকভাবে ব্যবহার করেন, তাহলে কি সেটা বুদ্ধিমানের কাজ? নাকি তা সেকেলে সামন্তবাদী সংস্কৃতি। সামন্তবাদী অর্থনীতিতে ভোগটাই মুখ্য; প্রফিট-মোটিভ নেই সেখানে। বেগম জিয়া পুঁজিবাদী মুক্তবাজার অর্থনীতিতে বিশ্বাস করেন। কথা ও কাজে এত অমিল নিয়ে রাজনীতি করা যায়? পারস্পরিক ব্যবসা-বাণিজ্য কি অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপের শামিল? এক ইউরো ইউরোপের প্রায় দুই ডজন দেশের মধ্যে চলাচল করছে। পৃথিবীর বহু বিখ্যাত বন্দর ব্যবহার করছে একই সঙ্গে অনেক দেশ। এসব ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কোনো দেশেরই স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব বিপন্ন হয় না। বেগম জিয়ার কথা শুনলে মনে হয়, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের তীব্র যুদ্ধ চলছে, জল-স্থল-অন্তরীক্ষে ভারতীয় কিছু একটা দেখা গেলেই সেটাকে গুলি করে ফেলে দিতে হবে।
'৭১ সালের চরম সংকটের সময় ভারত একটি সাহায্যকারী দেশ হিসেবে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল। সেই ভারতই যদি স্বাধীনতা-উত্তর সময়ে আধিপত্যবাদী চরিত্র গ্রহণ করে আমাদের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব বিপন্ন করতে চায়, তাহলে তা রুখতে হবে কিভাবে? সে জন্য দরকার অতি উচ্চমানের কূটনীতি। চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর ব্যবহার করতে দেওয়া না-দেওয়ার সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। বরং কার্যকর কূটনৈতিক তৎপরতা দ্বারা বন্দর দুটি ব্যবহারের বিষয়টিকে বাংলাদেশের জন্য অধিক লাভজনক করে তোলা সম্ভব। বেগম জিয়া সেই পথে হাঁটবেন না, জানা কথা। চিরচেনা, বহু ব্যবহারে বিবর্ণ ঘাসের সেই পুরনো ভারতবিরোধিতার পথটাই তাঁর খুব পছন্দ।
মাহবুব কামাল
লেখক : সাংবাদিক
http://www.kalerkantho.com/
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১০ ভোর ৫:৪৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


