somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বাদামের খোসা

২০ শে জুন, ২০০৮ রাত ৮:২৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


বাদাম ভরা এল্যুমেনিয়ামের বড় ভান্ড। দু দিক দিয়ে গামছা বাঁধা। সে গামছা গলায় বেঁধে আট বছরের মহিন উদ্দিন বাদাম বিক্রি করে। বিক্রির টাকায় চলে তাদের সংসার। নোয়াখালীর মাইজদি শহরে কোর্ট বিল্ডিং আদালত পাড়া, বড়মসজিদ,স্কুল এসব জায়গাতেই তার পসরা নিয়ে ঘুরা ঘুরি। মুখে তার এখনো ভালো করে বোল ফোটেনি। মায়াবী এক শান্ত চেহারার মহিন মাইজদী শহর থেকে প্রায় কুড়ি কিলোমিটার দূরে চরকরমুল্লা থেকে বাদাম নিয়ে এখানে আসে। ওরা দশ বার জনের একটি দল। মহিনই সবার ছোট। তার বাবা সিদ্দিক উল্লাহ(৫০) গ্রামে বদলা দেন। এখন অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। বেশী কাজ করতে পারেননা। তারা মোট পাঁচ ভাই এক বোন। বড় দু’ ভাই শফিক(১৫) আর বাসার(১২) তারাও বাদাম বিক্রি করতো এখন আর করেনা। অন্য কাজ করে। তার ছোট দু’ভাই রিয়াজ(৪) আর ফার(২) বাড়িতে মায়ের কাছে থাকে। বোন সুরমার এখন তের বছর। এ বয়সেই তার বিয়ে হয়ে গেছে। মা সুজিয়া খাতুন(৪০) বাড়িতে সংসার দেখাশুনা করেন। গ্রামে তাদের এক চিলতে জমি আছে। ওখানে দোচালা টিনের ঘর। গ্রামের নূরুল ইসলাম মিয়া নামের একজন থেকে দুইটি গরু বর্গা নিয়েছে তারা। মা সারাদিন সে গুলো দেখভাল করে।
মাহিন প্রতিদিন দুইশ’ আড়াই শ’ টাকার বাদাম নিয়ে আসে। প্রতিদিন বিক্রি করে তার লাভ হয় আশি থেকে নব্বই টাকা। সারাদিন যত টাকা পায় সব তুলে দেয় তার মার হাতে।
আদালত পাড়ার সামনেই মাইজদী বড় দীঘি। আদালতে মামলা মকদ্দমা সহ নানান কাজে প্রচুর মানুষ আসে এখানে। দীঘির পাড়ে গাছের নীচে প্রায় সারাদিন আনেক ভীড় থাকে। মহিন ওদের কাছে ছুটে যায় বাদামের পসরা নিয়ে।
দীঘির পাড়ে বসে কথা হচ্ছিলো মহিনের সাথে।
বাদাম কিনে মানুষ ঠিক ভাবে পয়সা দেয়?
দেয়, কোনো অসুবিধা করেনা।
কেউ কোনোদিন টাকা নাদিয়ে চলে গেছে?
প্রশ্নটা শুনেই মহিন যেন একটু থমকে যায়।
‘গ্যাছে, কয়দিন আগে একটা লোক চাইর টাকার বাদাম কিনি টাকা দিব কই আর দেয়ন’
যে যায়গাটায় সেই বাদাম বিক্রি করেছিলো ঠিক সেদিকে তাকিয়ে মাথাটা ঝাঁকিয়ে তুলতুলে থুতনিটা একটু উপরে তুলে অনেকটা অভিমানের সূরে বলছিলো মহিন। বুক থেকে ছোট্ট একটা শ্বাস উথলে উঠলো। কোনো অভিযোগও নয়, ক্ষোভও নয়। শুধু অভিমান। মানুষের প্রতি তার অগাথ বিশ্বাস। কারো টাকা কেউ আত্মস্যাৎ করতে পারেনা। সে মানুষটা তার কষ্টের টাকা কেমন করে মেরে দিলো, মহিন সেটা বুঝে উঠতে পারেনা। বাদাম বিক্রি করতে করতে কতবার তার বাবার বয়সী সে মানুষটাকে খুঁজেছে। শে সে বুঝতে পারলো সত্যিই লোকটা তাকে প্রতারণা করেছে। ধীরে ধীরে ধূসর হয়ে আসছে সে চেহারাটা। কিন্তু মন থেকে হারিয়ে যায়নি সে মানুষটার প্রতারণার কথা, তার কষ্টের রোজগার সে চার টাকার কথা।
তাদের বাড়ির কাছে ব্র্যাক স্কুলে দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়তো সে। মহিন বলে রুমি আপার স্কুল।
স্কুলের বন্ধুরা, রুমি আপার কবিতা, কাগজ পেন্সিল বই এসবের কথা মনে পড়ে তার।
‘স্কুল বন্ধ করলে কেন’?
‘সে স্কুল থেইকা নাম কাইটা দিছে। বাবা কইছে আর যাওন লাইগবোনা’।
‘স্কুলে আবার পড়তে চাও’ ?
চোখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠলো মহিনের। কোনো সময় না নিয়েই জোর দিয়ে বলে উঠলো,
‘হ, যামু, আবার পড়মু’ , যেন এখনই ছুট দেবে স্কুলের দিকে।
তাহলে তোমার বাদাম কে বিক্রি করবে ? সংসার চলবে কেমন করে?
হঠাৎ ধপ করে মলিন হয়ে গেলো মহিন। এতক্ষণ হয়তো স্কুলের সে পরিচিত ছবি গুলো তার মনের ক্যানভাসে ফুটে উঠেছিলো। পরক্ষনে একটা কষ্টের কালো পর্দা এসে ঢেকে দিলো সব।

মহিন একবার বাদাম গুলোর উপর হাত ছুঁয়ে নিল। উদাস হয়ে তাকাল দীঘির জলের দিকে। দীঘির উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া মৃদু বাতাসে ছোট ছোট ঢেউ উঠে। সে ঢেউয়ের সাথে সাথে মহিনের মনের গহিনেও ছোট ছোট ব্যথার ঢেউ জাগে। জলের মধ্যে আকাশের ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘের ছায়া পড়ে। ঢেউয়ের সাথে সাথে সে আকাশটাও ভেঙ্গে চুরে যায়। অব্যক্ত বেদনায় মহিন নিজের ভিতর নিজেই কুঁকড়ে পড়ে। নীরব নির্বাক হয়ে যায় সে। কোনো কথা ফোটেনা তার মুখ দিয়ে।

ছোট্ট বাদাম ওয়ালা মহিনের মত কত মহিনের অব্যক্ত বেদনা গুমরে গুমরে উঠে তার খবর কেউ রাখেনা। মহিনের আকাশ ভরা স্বপ্নগুলো বাদামের খোসার মতই রাস্তার ধূলোয় গড়াগড়ি দেয়। আর জল কাদায় মিলিয়ে যায় কতশত মহিনের প্রাণ।


মাইজদি কোর্ট
১৯ জুন,২০০৮


সর্বশেষ এডিট : ২০ শে জুন, ২০০৮ রাত ১০:৫৭
৬টি মন্তব্য ৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে আব্বাসীদের জন্য হুমকি হয়ে আসছে- কী হবে খালেদ মহিউদ্দিনের?

লিখেছেন হিমন, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৫০

হোমো ইরেক্টাসদের প্রায় বিশ লাখ বছর আগের আগুনের ব্যবহার থেকে শুরু করে ছয় হাজার বছর আগের চাকা আবিষ্কার, ১৮৩১ সালের বিদ্যুৎ, গত শতাব্দীর অ্যান্টিবায়োটিক, আর এই সেদিনের ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন—... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×