কথা রাখছেনা ভারতীয় সীমান্ত রক্ষি বাহিনী-বিএসএফ। প্রতিশ্রুতির পর প্রতিশ্রুতি দিলেও সীমান্তে তারা গুলি চালাচ্ছে। নির্বিচারে হত্যা করছে বাংলাদেশী নাগরিকদের। মাঝে কিছুদিন বন্ধ থাকলেও গত কয়েকদিনে সীমান্তে হত্যাকাণ্ড বেড়েছে। যা রীতিমত উদ্বেগের। এনিয়ে সমালোচনাও শুরু হয়েছে। সরকারের পররাষ্ট্রনীতি নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন কেউ কেউ। আমার দেশের মানুষকে এভাবে বিচার বহির্ভূতভাবে হত্যা করা হচ্ছে অথচ এনিয়ে সরকারের উদ্যোগ আশাব্যঞ্জক নয়। আমিও ব্যক্তিগতভাবে হতাশ। কিন্তু সব দোষ দেশের সরকার আর বিএসএফ’র উপর চাপিয়ে আমাদের দায়মুক্তির কোনো সুযোগ দেখিনা। প্রকৃত দোষী কে এটা বের করা দরকার সবার আগে। হত্যাকাণ্ডগুলোর দিকে একটু চোখ ফেরায়। সীমান্তবর্তী জেলায় সাংবাদিকতার সুবাদে অনেক ঘটনা আমি কাছ থেকে দেখেছি। গত ৯ এপ্রিল চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর ও নওগাঁর নীতপুর সীমান্তে বিএসএফ’র গুলিতে এক বাংলাদেশি মারা যান। তিনি হচ্ছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার রোকনপুর গ্রামের ফজলুল হকের ছেলে সানাউল্লাহ (৩০)। তিনি পেশায় গরু ব্যবসায়ী। ঘটনাটি ঘটে রাত ৩টার দিকে। বিজিবির পক্ষ থেকে সাংবাদিকদের ঘটনা সম্পর্কে যা বলা হয় তা হচ্ছে- ঘটনাটি ঘটে সীমান্তের ওপারে। শূন্যরেখা (জিরোপয়েন্ট) থেকে থেকে প্রায় দুইশ’ গজ ভেতরে ভারতীয় অংশে মারা যান সানাউল্লাহ। রাত তিনটার দিকে তিনিসহ কয়েকজন চোরাচালানী ভারত থেকে গরু নিয়ে নীতপুর সীমান্তের ২৭/২৮ পিলার সংলগ্ন এলাকা দিয়ে বাংলাদেশে ফিরছিলেন। এমন সময় ভারতের আগ্রাবাদ বিএসএফ ক্যাম্পের জোয়ানরা তাদের লক্ষ করে গুলি করে। এতে ঘটনাস্থলেই মারা যান সানাউল্লাহ।
অধিকাংশ ঘটনা এরকমই, ঘটে সীমান্তের ওপারে। অর্থাৎ বাংলাদেশি নাগরিকরা সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়া কেটে ভারত ভূখন্ডে প্রবেশ করে। এরপর সে দেশ থেকে চোরাইপথে গরুসহ অস্ত্র কিংবা মাদক নিয়ে দেশে ফিরে আসে। তখন গুলি চালিয়ে তাদের হত্যা করে বিএসএফ।
সীমান্ত সুরক্ষিত রাখতেই সব দেশ নিজ নিজ সীমান্তে বাহিনী নিয়োজিত করে। ভারতও এ ব্যতিক্রম নয়। সীমান্তের চোরাচালান ঠেকাতেই তারা গুলি চালিয়ে মানুষ হত্যা করে। তবে হ্যাঁ, এটা তারা অপরাধ করে। আন্তর্জাতিক সীমান্ত আইন লঙ্ঘন করে। গুলি না চালিয়ে তাদের ধরে সে দেশের প্রচলিত আইনে বিচার করার বিধান আছে। তারপরও তারা গুলি করে। ধরে নিচ্ছি বিএসএফ সীমান্তে হিংস্র ভূমিকা রাখে। কিন্তু আমার প্রশ্ন হচ্ছে- বিএসএফ’র এই হিংস্রতাকে উপেক্ষা করে সীমান্ত পাড়ি দেয়ার কী দরকার।
গত বছরের একটা ঘটনা বলি। একটি কাজে সীমান্ত এলাকায় গিয়েছি। অনেকের সঙ্গে কথা বলার এক পর্যায়ে পেলাম ১২ বছর বয়সী এক শিশুকে (নাম বলছি না)। সেও চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত। এতো অল্প বয়সে বিএসএফ’র তাক করা বন্ধুকের নল এড়িয়ে ভারতে গিয়ে গরু নিয়ে আসার গল্প শুনে আমি রীতিমত হতবাক। পদ্মা নদীতে তখন থৈ থৈ পানি। এই পদ্মা নদীই দু’দেশের সীমানা নির্ধারন করে। পদ্মার এপার বাংলাদেশ আর ওপার ভারত। সে জানায়, ইঞ্জিনচালিত নৌকাযোগে তারা পদ্মা পার হয়ে ভারতে উঠে। ভারতীয় ব্যবসায়ীরা চুক্তি মোতাবেক গরু বুঝিয়ে দেন। রাতে আঁধারে সেই গরু নিয়ে নেমে যায় পদ্মায়। কোনো একটি গরুর লেজ ধরে কিংবা মাঝে মধ্যে গরুর পিঠে চড়ে এপারে নিয়ে আসে। আতকে উঠার মতই কথা। পদ্মার এপাড় থেকে ওপার তখন প্রায় এক কিলোমিটার। এ দীর্ঘপথ সে এভাবেই পাড়ি দেয় জীবনের ঝুকি নিয়ে। তবে এভাবে গরু নিয়ে এসে প্রচুর টাকা আয়ও করে সে। একটি গরু নিয়ে আসার জন্য সে পারিশ্রমিক হিসেবে পায় ৩ হাজার টাকা। একসঙ্গে কমপক্ষে ১০ টি গরু নিয়ে আসতে পারে। অর্থাৎ এক রাতেই তার কমপক্ষে আয় ৩০ হাজার টাকা।
তার মত সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোর অনেক শিশুই চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত। জড়িত প্রাপ্ত বয়স্করাও। একটি বেসরকারি সংস্থার সঙ্গে কাজ করেছিলাম সীমান্তে। তখন দেখেছি সীমান্তের প্রায় ৮০ শতাংশ নারী-পুরুষ চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত। তারা প্রতিনিয়ত অবৈধপথে ভারতে প্রবেশ করে। যা ওই দেশের জন্য চরম হুমকির। সীমান্তের এই ৮০ ভাগ নারী-পুরুষকে যদি আমরা ঠিক করতে পারি। যদি তাদের ভারতে যাওয়া বন্ধ করাতে পারি তবেই বন্ধ হয়ে যাবে সীমান্তের হত্যাকাণ্ড, অন্যথায় নয়। তাই বলা বাহুল্য- আমার দেশের নাগরিকদের দোষেই তারা গুলি খেয়ে পড়ে থাকে সীমান্তে। আর তাদের ভুলের খেসারত দিয়ে হয় এ দেশের সরকারকে। শুনতে হয় কটুক্তি। দোষারপ করা হয় বিএসএফকে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


