সমাজ পরিবর্তনে এবং সু্ন্দর সমাজ বিনির্মাণে যুব সমাজের ভূমিকা সীমাহীন। বিশেষ করে ইসলামের দৃষ্টিতে একজন মানুষের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সময়ই হচ্ছে তার যৌবনকাল। এব্যাপারে মহানবী সা•. তার এক হাদীসের মাঝে ইরশাদ করেনঃ
لا يضع قدما ابن ادم حتى يسئل عن خمس. عن عمره فيما افناه وعن شبابه فيما ابلاه وعن ما له من اين إكتسبه وفيما أنفقه و ماذا عمل فيما علم أوكما قال عليه الصلوة والسلام.
অর্থঃ "“কিয়ামতের দিন কোনো বনী আদমই পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর দেয়ার আগে এক কদম আগে বা পিছে নড়ার অনুমতি পাবে না। তার মধ্যে প্রথম প্রশ্ন হবে তার জীবন সম্পর্কে, কোথায় সে এটি ব্যায় করেছে। দ্বিতীয় প্রশ্ন করা হবে তার যৌবন কাল সম্পর্কে কি কাজে সে যৌবনকাল নষ্ট করেছে। তৃতীয় প্রশ্ন সম্পদ কিভাবে উপার্জন করা হয়েছে। চতুর্থ প্রশ্ন উপার্জিত সম্পদ কোন কাজে এবং কোথায় ব্যয় করেছে। পঞ্চম ও শেষ প্রশ্ন যে সকল বিষয়ে সে জ্ঞানার্জন করেছিলো তার কতটুকু আমল করেছে।”" (বুখারী)
এই হাদীসের মাঝে মহানবী সা• আমাদের বোঝাতে চাচ্ছেন যে, প্রতিটি মানুষের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সময় হলো তার যৌবনকাল। আর একারণেই কিয়ামতের দিন মহান আল্লাহ মানুষের জীবন সম্পর্কে প্রশ্ন করে তারপর আরো স্পেসিফিকভাবে তার জীবনের যৌবনকাল সম্পর্কেও জানতে চাইবেন। যার দ্বারা বুঝা যায় যে যৌবনকালের গুরুত্ব ইসলামে অপরিসীম। এছাড়াও অপর এক হাদীসে মহানবী সা• আরো ইরশাদ করেন, "মানুষের যৌবন কালের আমল মহান আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয়।"
কিন্তু আমাদের সমাজে চলমান খুবই দুঃখজনক একটি বাস্তবতা হলো, আমরা অনেক সময়ই আমাদের যুব-তরুণদেরকে দীন ও ইসলামের বিভিন্ন বিষয় থেকে ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃতভাবে অনেক সময়ই বিরত রাখার একটি চেষ্টা করে থাকি। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় যে, সুকৌশলে বা অবচেতনভাবে আমরা যুবকদেরকে ইসলাম সংক্রান্ত বিষয় থেকে দূরে সরিয়ে রাখি। এক্ষেত্রে তরুণ-যুবকদের সামনে তুলে ধরা হয় যে, যৌবনকাল হচ্ছে এনজয় করার সময়। শ্লোগান দেয়া হচ্ছে “লাইফ তো একটাই, ফ্রেশ থাকতে চাই।”
আর যদি কেউ বা কোন যুবক ইসলাম নিয়ে অধ্যয়ন করতে চায়, ইসলাম সম্পর্কে মানুষকে দাওয়াত দিতে চায় তাহলে তাকে উৎসাহ দানকারীর চেয়ে নিরুৎসাহিত কারীর সংখ্যাই সমাজে বেশি দেখা যায়। তাকে বলা হয় আরে রাখো, ধর্ম-কর্ম তো বার্ধক্যের জন্য। আগে কিছুদিন আনন্দ-ফুর্তি করো। নিজের ক্যারিয়ার গড়ো। তারপর এক সময় রিটায়ার্ড করার সময় হবে। ব্যবসায়ী হলে সন্তানদের বিয়ে শাদি করানোর পর হজে যেতে হবে। হজ থেকে এসে দাড়ি রাখবে। মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়বে। রোজা রাখবে। তখন এই সকল কাজের মাধ্যমে ইসলাম পালন করার বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করা যাবে।
ইসলাম যেখানে মুসলিমদের যৌবনকালকে এতো গুরুত্ব দিয়েছে। মুসলিম উম্মাহর শ্রেষ্ঠ সন্তানদের তরুণ ও যৌবনকালকে ইসলামের কাজে ব্যয় করার জন্য উদ্বুদ্ধ করেছে সেখানে আমাদের বর্তমান সমাজ কি করছে?
আজ যদি আমরা আমাদের সমাজের দিকে তাকাই তাহলে দেখতে পাবো যে, সকল মিডিয়া, স্থানীয় ও জাতীয় প্রশাসনসহ সকল ব্যবস্থা গুলো আজ আমাদের যুব-তরুণদেরকে যেন বিপথগামী করার মহান দায়িত্বে নিয়োজিত। আজকে কেউই একটি তরুণ-যুবককে বলেনা তার যৌবন কালের মূল্যবান সময়টিকে ইসলামের কাজে ব্যয় করার জন্য। তাকে কেউ স্মরণ করিয়ে দেয় না যে, কিয়ামতের দিন দ্বিতীয় প্রশ্ন করা হবে তার যৌবনকাল সম্পর্কে।
মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানী ও কর্পোরেট মিডিয়া গুলো ভালো নায়ক, গায়ক, অভিনয় শিল্পী, সুন্দরী প্রতিযোগীতায় বিজয়ী হওয়া, ভালো ক্রিকেটার হওয়া, এভারেষ্টের চূড়ায় ওঠার মতো ঠুনকো বিষয়াবলীকে আমাদের আজকের তরুণ-যুবকদের সামনে তাদের জীবনের সাফল্যের মানদন্ড নির্ধারণ করে দিচ্ছে।
আজকের তরুণকে জিজ্ঞেস করুন কোন দলে কয়জন খেলোয়ার আছেন তাদের নাম-ধাম সব কিছু সে বলতে পারবে। জিজ্ঞেস করুন এই সপ্তাহে ইউএস টপচার্টে অবস্থানকারী সিনেমা গুলোর নাম কি, সে অবলীলায় বলে দেবে। জিজ্ঞেস করুন হলিউড-বলিউডের কোন নায়িকার সাথে কার প্রেম চলছে, সে তাও বলতে পারবে। কিন্তু তাকে যদি জিজ্ঞেস করেন মৃতুøর পর কবরে তাকে প্রথম কয়টি ও কি কি প্রশ্ন করা হবে? কিয়ামতের দিন কোন প্রশ্নের উত্তর দেয়ার আগে সে নড়তে পারবে না? -দেখবেন অধিকাংশ যুবকই বলতে পারবে না। কারণ কেউ তাকে এসব বিষয়ের গুরুত্ব প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেনি।
আজকে টিভিতে বিজ্ঞাপন দেখানো হচ্ছে -বাংলাদেশের নাম নাকি সাকিবুল হাসান। সাকিবুল হাসান কোন মহা ব্যক্তি?
তিনি একজন ভালো ক্রিকেটার। তার মানে কি একজন ভালো ক্রিকেটার হওয়াই এই উম্মাহর সন্তানদের সামনে সবচেয়ে বড় অর্জন? দেখানো হচ্ছে নবজাতক সন্তানদেরকে তাদের পিতা-মাতা সাকিবের নামে নাম রাখছে।
হায় আফসোস! শত আফসোস!!
একটা সময় ছিলো, যখন মুসলিম মা-বোনেরা তাদের সন্তানদেরকে সাহাবীদের নামে নাম রাখতেন। মুসলিম বীর যোদ্ধা আর দিগ্বিজয়ী বিরদের পরিচয়ে নিজেদেরকে পরিচয় দিতে গর্ববোধ করতেন। হযরত খালিদ বিন ওয়ালিদ, মুসান্না বিন হারেসা, মুহাম্মাদ ইবনে কাসিম, সালাহউদ্দীন আইয়ূবী, তারিক বিন যিয়াদপ্রমুখ মুসলিম বীর সেনানীদের মতো হওয়াই ছিলো মুসলিম যুবকদের স্বপ্ন। কিন্তু আজকের মুসলিম উম্মাহর যুব-তরুণদের অনেকে হয়তো জীবনেও এই মহান ব্যক্তিদের নামই শুনেনি। আর এটি আমাদের সমাজের যুব-তরুণদের অবক্ষয়ের অন্যতম প্রধান কারণ।
একটা সময় ছিলো, যখন মুসলিম যুবকরা নির্যাতিত মানবতাকে মানব রচিত মতাদর্শের জুলুম থেকে মুক্ত করাকেই প্রকৃত বিজয় বলে বুঝতো। বিশ্বের দিকে দিকে ইসলামের বাণী ছড়িয়ে দেয়ার মাঝেই তারা খুঁজে পেতো সফলতা আর স্বার্থকতা।
মুসলিম যুব-তরুণদের সোনালী যুগের সেই জয়ের নেশা আর বিজয়ের স্বপ্নের কারণেই স্পেনের বুকে উড্ডীন হয়েছিলো আলোর মশাল। তারিক বিন যিয়াদের নেতৃত্বে মুসলিম সেনাবাহিনী বিশাল সাগর পাড়ি দিয়ে জাবালুত তারেক বা জিব্রাল্টার প্রণালীর মুখে এসে দাঁড়িছিলেন। রাজা রডারিকের মানবরচিত মতবাদ আর স্বেচ্ছাচারী শাসনের শৃংখল থেকে স্পেনবাসীকে মুক্ত করে তাদেরকে দিয়েছিলেন এক রবের ইবাদতের সোনালী রাজপথ।
চলবে...

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

