রাত ১২টা ছুঁই ছুঁই। অনেকের নিকট রাতের শুরু হলেও আমার রুটিনে এতক্ষণে ঘুমানোর কথা। তড়িঘড়ি লেখা সেরে দ্রুত বিছানায় যাবার ব্যাস্ততা। সকালে ছোট্ট একটি এ্যাসাইনমেন্ট জমা দিতে হবে। অকস্মাত মোবাইল বেজে উঠলো। অচেনা নম্বর।
ধরতেই ওপাশ থেকে মেয়ে কণ্ঠ শোনা গেল। অবাক হলাম।
আপনি কি . . . বলছেন?
হ্যা, বলছি!
অতপর চুপচাপ। সাড়া না পেয়ে একটু তাড়া দিলাম,
'হ্যা বলুন কে বলছেন?'
খুব ধীরে সুস্থে মেয়েটি বললো, 'আমাকে আপনি চিনবেননা, আপনি কি করেন?'
বেশ আকর্ষণীয় ও ব্যাক্তিত্বসম্পন্ন কণ্ঠ, পরিষ্কার উচ্চারণ, খুবই স্মার্ট ভঙ্গি। থেমে থেমে রিলাক্স মুডে কথা বলছে।
-আমি স্টুডেন্ট। - জবাব দিলাম।
-কোথায় পড়েন?
'আমি ঢাবিতে পড়ি'।
একটু বিরতি দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম- 'কিন্তু আপনি কে, কি বলবেন বলুন'?
'আমার নাম স্পৃহা।'
স্মৃতি হাতড়ে এমন কারো নাম খুজে পেলাম না। আমার কোন ক্লাসমেট কি হবে? না তাও তো না। ইদানিং আমার ক্লাসের অনেকেই একটি ব্যাপারে ফোন করছে, সহযোগিতা নিচ্ছে, যাদের সাথে হয়তো সাধারণত ফোনালাপ কিংবা বাক্যালাপ হয়না। আমিও চেষ্টা করছি সাধ্যমত সহযোগিতা করার। কিন্তু এই নামের কাউকে . . । বুঝলাম পরিচিত না। আবার অন্য সেকশনের ও হতে পারেকি? সবার নাম তো জানিনা। ভাবতে ভাবতেই বললাম-
হ্যা, বলুন কি বলবেন? - একটু তাড়া দেই।
আপনি কি খুব ব্যস্ত? তাহলে পরে কথা বলি-
তাড়ার ভাবটা একটু কমিয়ে ঠাণ্ডা কণ্ঠে বললাম, 'না ব্যাস্ত না। বলুন কি বলবেন?'
আপনি কোথায় থাকেন?
শান্ত কণ্ঠেই জায়গার নাম বললাম।
'তাহলে তো বেশি দূরে না'- স্পৃহা মন্তব্য করলো। ' আচ্ছা এমবিএ কোথায় করবেন? ঢাবিতেই না দেশের বাহিরে?'
'সিদ্ধান্ত নেই নি'।
একটু থেমে বললাম- 'জ্বি, আপনি কি করেন, কি জন্য করেছেন বলুন'?
'আমি নর্দান ইউনিভার্সিটিতে বিবিএ ফার্স্ট সেমিস্টারে পড়ছি।'
একটু বিরতি দিয়ে বললো, 'জ্বি ভাইয়া, প্রয়োজন ছাড়া কি কথা বলা যাবেনা? আপনার সাথে যদি এই কয়েক মিনিট কথা বলি তাতে তো কোন অসুবিধা হবার কথা নয়।'
আবারও হোচট খেলাম। রাত বিরাতে তো আমার কাছে কোন মেয়ে কখোনো ফোন করেনা।
আমার বিরক্ত হবার কথা ছিল, কিন্তু তার কথা বলার স্টাইল বিরক্ত হতে দিচ্ছিলনা। ভাবলাম ভদ্র ভাষায় বিদায় করি।
জবাব দিলাম, 'প্রয়োজন ছাড়া কথা বলার মত সময় তো আমার নেই।'
-আপনি ব্যাস্ত এখন। তাহলে সকালে করি?
-না সকালেও আমার কাজ আছে।
-তাহলে কখন ফ্রি থাকবেন বলুন। সে সময়ে করি।
-দেখুন প্রয়োজন ছাড়া কথা বলার মত ফ্রি সময় আমার নেই।
-কেন প্রয়োজন ছাড়া কি মানুষ কথা বলেনা? একটি ছেলে একটি মেয়ের সাথে কিছুক্ষণ কথা বলবে তাতে কি প্রয়োজন খুব জরুরী বিষয়? এই যে আপনার নিকট থেকে ব্যাস্ততার মধ্যেও পাচ মিনিট সময় নিয়ে নিলাম। আরও পাঁচ মিনিটও আপনি দিতে পারবেন।
-দেখুন, আমি এ ব্যাপারে আগ্রহী নই। আর মাঝ রাত গল্প করার মত অনেক ছেলেকে আপনি ঢাকা শহেরে পাবেন।
-আপনি কি ভাবছেন আপনাকে আমি খুঁজে বেড়াচ্ছি?
-সেটি আপনি ভাল জানেন।
-জ্বি না। আর আপনাকে আমি সবসময় ডিস্টার্ব করবো না। আপনি বিরক্ত না হলে মাঝে মধ্যে হয়তো কিছুক্ষণ কথা বলবো। কিছুটা সময় কাটাবো।
-আমি তো বললাম এ ব্যাপারে আমি আগ্রহী নই।
'-অদ্ভুত ব্যাপার। ছেলেরা তো মেয়েদের সাথে কথা বলতেই চায়। আপনাকেই ব্যাতিক্রম দেখলাম!' -খুনসুটির মতই শোনালো কথাটি।
-আমার নম্বর কোথায় পেয়েছেন?
-নম্বর পাওয়া তো খুব বড় বিষয় নয়। আপনি কি আল্পনাকে (সঠিক নামটা মনে পড়ছেনা) চেনেন?
-এই নামে কাউকে চিনি বলে মনে পড়ে না।
আমি একটু লম্বা নিশ্বাস নিয়ে ধীরে সুস্থে বলি, - 'আমার নম্বর আপনি কষ্ট করে যোগার করেছেন, আমি কোথায় থাকি তা আপনি জেনে নিয়েছেন আগেই, আমি কিসে পড়ি তাও আপনি জানেন, শুধু আমি কি ধরণের ছেলে এইটুকুই জেনে নিতে পারলেননা? তাহলে তো আর আপনাকে কষ্ট করে ফোন করে মোবাইলের টাকা খরচ করতে হতো না। স্যরি।' . . . লাইনটা কেটে দিলাম।
চেয়ারে হেলান দিয়ে কতক্ষণ ঝিম মেরে বসে রইলাম। ধীরে ধীরে বই খাতা গুছিয়ে বিছানার দিকে অগ্রসর হলাম। আমার জীবনে ছোট্ট কিন্তু নতুন একটি অভিজ্ঞতা যোগ হলো।
আমার কাছে মনে হচ্ছে এই ছোট্ট ঘটনাটিকে অনেকভাবেই ব্যাখ্যা করা যায়।
সত্যি ঘটনাটাকে গল্পের আবহ দেবার চেষ্টা করলাম। নতুন লেখক। গল্প লেখার অভিজ্ঞতা নেই। 'প্রবাল যাচাইয়ে' আমার প্রচেষ্টা আর সম্ভাবনা এবং গলদ নিয়ে কি ধরণের মূল্যায়ন হয় দেখার অপেক্ষায় রইলাম।
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে জানুয়ারি, ২০০৮ সকাল ১১:২৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


