মা আমার ঢেকি আসে।
-ঢেকি আসে মানে?
- ওই যে, ঢেকি , ঢেকি আসে।
- কি বলছিস বাবা, ঢেকি আসে আবার কি?
- ওই যে পেটের মধ্যে ঢেকি আসে।
ছেলের কাতর কণ্ঠের অভিযোগ মা বুঝতে পারেননা। গভীর ভাবে সন্তানের মুখের দিকে তাকান। সমস্যাটা বোঝার চেষ্টা করেন। ছেলের সেই একই অভিযোগ, কণ্ঠে কান্নার দমক।
- মা, পেটের মধ্যে, গলার মধ্যে ঢেকি আসে।
-মা কোলে তুলে নেন। কদিনের জন্য গ্রামের বাড়ি বেড়াতে এসে ছেলেটা সারাদিন আগানে বাগানে ঘুরে বেড়ায়, পুকুরের হাসের গায়ে ঢিল মারে, পাটখড়ি দিয়ে গাড়ি বানিয়ে ভো দৌড় দৌড়ায়, কোথায় কি খায়, কি হলো তার? ভাবতে ভাবতে কোলের সন্তান ঢেকুর তোলে।
মা সব বুঝতে পারেন। ভালোবাসার চুমু একে বলেন, আরে বোকা, ঢেকি না, ঢেকুর। সন্তান লজ্জা পায়, মায়ের কোলে মুখ লুকায়।
হ্যা সে সন্তান আজকের আবাবিল। তখন বয়স হয়েছিল চার কি পাঁচ। শৈশবের কোন কোন স্মৃতি খুব জ্বলজ্বল হয়ে হৃদয়ে গেঁথে থাকে। সমস্যার কথা বুঝিয়ে বলতে না পারার সেদিনকার কষ্টটা আজও মনে পড়ে। কিছুতেই মনে আসছিল না ঢেকুর শব্দটি। কেনই বা আসবে। তখন তো ছিল ভাষা শিক্ষার বয়স।
- - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - -
আমার দেশের মাতৃভাষা স্বাধীন হয়েছে আজ অর্ধশতক পেড়িয়ে গেল। গ্রামের অর্ধশিক্ষিত নারী পুরুষ আজও ডাক্তারের ব্যাবস্থাপত্রের লিখন বুঝতে হাতড়ে বেড়ায় পড়ুয়ার সন্ধানে। উচ্চশিক্ষার ময়দান অচেনা ভাষায় রুদ্ধ। আদালতের রায় অচেনা ভাষায়। অফিস অর্ডার, সার্কুলার, বিজ্ঞাপণ - সে তো বিদেশী ভাষায়। জ্ঞানের জগতে, জানার জগতে, আলোর জগতে উঁকি দিতে গেলেই সাধারণ ছাপোশা মানুষগুলো দুর্বোধ্য ভাষার ছাদে দরাম করে টোকর খায়, ভাগ্যকে অভিশাপ দেয়, বড়-লোকদের গালি দেয়।
একটি করে বছর গড়ায়, আমরা নগ্ন পায়ে পুষ্প হাতে ছুটে চলি শ্রদ্ধাঞ্জলী দিতে। না পারলাম সর্বস্তরে মাতৃভাষাকে, চেনা ভাষাকে প্রতিষ্ঠিত করতে, না পারলাম অচেনা ভাষাকে সবার মাঝে পরিচিত করিয়ে দিতে।
- - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - -
'বালক বালিকার হঠাৎ চোখে চোখ পড়লো, এক অদ্ভুত আবেশে বিজড়িত হলো, মা-বাবা-পরিবার-সমাজ সবাইকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে হারিয়ে গেল দুজন দুজনায়।' সমাজ আর পরিবাবার ভাঙ্গার এক অব্যার্থ পুরিয়া দিলেন এক লেখক, ছাপার হরফে মলাটের ভেতরে চরে হাজির হল বই মেলায়। সবাই বাহবা জানান, কদিন পরে নাটক-সিনেমা আকারে টিভির পর্দায় হাজির হয়। বাহ বাহ, বাংলা ভাষার কি অমূল্য খেদমত। তরুন প্রজন্মের জন্য এক স্বার্থক উপহার।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রাত দিন মাটি করে বিজ্ঞানের জটিল আলোচনাগুলো সহজীকরণ করেন, বাংলায় শিক্ষার এক দিগন্ত খুলে দেন- কজনে রাখে তার খোঁজ, এক সীমিত পরিসরে মর্যাদ পান। টক শোতে আড্ডার বিষয় হয়না, পত্রিকায় আলোচনা হয়না। কারো মুখেও শোনা যায়না।
মানুষের গতিময়তা আর সম্ভাবনাকে সঠিক রাস্তায় চালিত করে যে ধর্ম, সুন্দর আর কল্যাণের পথ নির্দেশক, ইহ জাগতিক ও পরকালীন সাফল্যের সূত্র, সে গ্রন্থেরও অনুবাদ হয় বাংলায়। আলোচনা আর ব্যাখ্যার রচনা চলে অবিরাম, প্রকাশনার এক বিশাল কর্ণার গড়ে ওঠে বাংলাবাজার জুড়ে। কিন্তু . . কিন্তু তা যেন মাতৃভাষার জন্য কোন অবদানই নয়। আবহেলিত এক সাহিত্য বিশ্ব।
- - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - -
সুন্দর পৃথিবী গড়তে ভাষা হোক গতিময় বাহন। মায়ের ভাষায়, চেনা ভাষায় মনের কথাগুলো বাঙময় হোক। কল্যাণের সিঁড়ি হোক মায়ের ভাষা। ভাষা হোক সুন্দরের দ্যোতনা।
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে ফেব্রুয়ারি, ২০০৮ দুপুর ২:২১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


