স্বাধীনতার চল্লিশ বছর পার হয়ে গেছে আর আমরা এখনও আছি বিভিন্ন আইন তৈরিতে ব্যাস্ত।এই আইন তৈরি হয় বিভিন্ন চাহিদার আলোকে...যেমন ইভ টিজিং এর কারণে যখন আমাদের স্কুল-কলেজ আর বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েরা বিচার না পেয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছিলো তখন সরকারের হুঁশ হলো এই নিয়ে একটা আইন করতে হবে...ব্যাস হয়ে গেল আইন...ধরতে পারলেই ফাইন।আমরা এখন অনেক ভদ্র...বাপরে...খবরদার মেয়েদের দিকে চোখ তুলে তাকালেও কঠিন সাজা ভোগ করতে হবে।আবার এই আমরাই নারী অধিকার বাস্তবায়ন নিয়ে দাঁত মুখ খিচাতে ব্যাস্ত...নারীর সমান অধিকার চাই...সংসদে আসন চাই...এবং এই অধিকারের পর পরই বাসের সিটের পাশে দেয়ালে লিখে রেখেছি ‘সামনের সারির নয়টি আসন দৃষ্টি প্রতিবন্ধি,মানসিক প্রতিবন্ধি এবং নারীর জন্যে সংরক্ষিত’...নারী কি তাহলে দৃষ্টি প্রতিবন্ধি আর মানসিক প্রতিবন্ধির সমতুল্য?
কোন এক প্রবাদে পড়েছিলাম...ঠিক মনে নাই উক্তি টা কার...তাহলো... ‘পথ পথিকের সৃষ্টি করে না...পথিকই পথের সৃষ্টি করে’।এই উক্তিটা আমার মতে বাংলাদেশের জন্যে প্রযোজ্য না।এখানে বেশ কিছুদিন লোকজন যেই রাস্তা দিয়ে হাটবে সেইটাই রাস্তা হয়ে যাবে...আর বিপত্তি এখানেই...ফ্লাই ওভার আছে মানুষ নাই...কিন্তু নিচে দেখবেন কি মহিলা...কি পুরুষ সবাই জান বাজি রেখে দৌড়াচ্ছে...জেমসের সেই ‘দে দৌড়’ গানের মত।এখানে আইন করা হয় এমনভাবে না যে না মানলে ফাইন দিতে হবে...এমনভাবে করা হয় না যে কেউ মানতে নিজে থেকেই বাধ্য থাকবে...এবং তা প্রতিনিয়ত।অবশ্য ফ্লাই ওভার গুলার স্থান নির্বাচন নিয়েও আছে বিতর্ক...যেমন সোহরোওয়ার্দি হাসপাতালের সামনে করা ফ্লাই ওভার টা পার হতে রাতের বেলা আমি নিজেই ভয় পাই...কারণ এই হাসপাতালের দিকের মুখ টা এমনভাবে করা যে...রাতের বেলা জামা কাপড় খুলে নিলেও কেউ দেখার নাই।
এদেশে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান কোন টি বলতে পারবেন? বাংলাদেশ বাস ও পরিবহন মালিক সমিতি...এবং এক কথায় পরিবহন মালিক সমিতি।এদের কে ভয় পায়না এমন ব্যাক্তি খুঁজে পাওয়া কঠিন...এমন কি আমাদের জানের জান নৌ-পরিবহন মন্ত্রী এবং সড়ক কে নরক বানানো মন্ত্রী আবুল সাহেব।একদিন গাজিপুরে যাব...সেদিন আবার বিশ্ব ইজতেমার কারণে অনেক ভিড়...কোন ক্রমে একটা বাসে উঠতে পারলাম...এমন সময় দেখি একজন ছাত্র কে টেনে হিচরে নিচে নামালো কয়েকজন লোক...তারপর সমানে চড় থাপ্পর।ব্যাপার কি জিজ্ঞেস করতেই বলল, ঐ ছাত্র নাকি বলছে সে গাজিপুর চৌরাস্তার কোন কলেজের ছাত্র...তাই টিকিট লাগবে না...আর এটাই তার দোষ।ছেলেটার জামা কাপড় ছিড়ে ততক্ষণে শেষ...জ্ঞান অর্জনের বই লুটোপুটি খাচ্ছে মাটিতে আর কাদায়...আর ছেলেটার চেহারার অভিব্যাক্তির কথা বাদই দিলাম।
রাত এগারোটার বাসে আসব ঢাকা...ঠিক পনেরো মিনিট পর বাসের ভেতর তীব্র প্লাষ্টিক পোড়ার গন্ধ্যে থাকা দায়...বাস থামানো হল রাস্তার পাশে...পরিমরি করে নেমে পরলাম।কি হয়েছিলো?এমন কিছুই না...সারাদিন রাস্তায় চলেছে তাই সার্কিট এর তার গরম হয়ে পুড়ে গেছে...এবং ফলাফল গাড়ির হেড লাইট জ্বল্বে না।ড্রাইভার কল দিলেন কতৃপক্ষকে...উনি সব দেখে বললেন...এইটা ঢাকা ছাড়া হবে না...আস্তে আস্তে চালায় চলে যান।আমরা প্রতিবাদ জানালাম...আমরা যাব না...উনি মুখের উপর বলে দিলেন...তিনি টাকা ফেরত দিতে পারবে না...পারলে যান আর না পারলে রাস্তায় দাঁড়ায় থাকেন।অগত্য সেভাবেই যাওয়া সেই ঘণ কুয়াশার রাস্তায়...কতবার যে লাগতে লাগতে লাগে নাই...তার হিসাব কিভাবে দেব?
কুষ্টিয়াতে দুটি ঘটনা দেখেছি চোখের সামনে...একটা বর্তমান শাপলা চত্বরের সামনে।রিকশার জন্যে দাঁড়ায় আছি হঠাত একটা রাস্তা পার হওয়া ভ্যান কে চাপা দিলো ট্রাক...প্রায় সাথে সাথেই দেখলাম এক তরুণ দোকানের ভেতর থেকে একটা রড বের করে ধাওয়া দিলো...শেষে না পেরে সে ট্রাকের ডালা ধরে উপরে উঠে গেলো...জনতা তখন উল্লসিত ‘আজ পাইছি ড্রাইভার কে’...ততক্ষণে ভ্যানওয়ালার ভবলীলা সাঙ্গ।সেই তরুণ ফিরে এলো খালি হাতে...জানলাম...সেই ট্রাক বাস ষ্ট্যান্ডে ঢুকতেই তাকে হুমকি দেয়া হয়েছে... ‘জানে বাঁচতে চাইলে ভাগ’
আরেকটা ঘটনার মত মর্মান্তিক ঘটনা আর কখনও যেন না দেখা লাগে।এইটা হলো চৌরহাস বলে একটা জায়গা আছে কুষ্টিয়ায় সেখানে।এক্ষেত্রে প্রথমে ট্রাক ওয়ালার দোষ নাই...হঠাত করে চোরাগলি থেকে এক সাইকেল আরোহী রাস্তার উপরে এসে পরে...ট্রাক ড্রাইভার কড়া ব্রেক করেন...ট্রাক টা সাইকেল আরোহীকে এসে মৃদু ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়...ততক্ষণে সাইকেল আরোহী ভয়ে আতঙ্গকে জ্ঞানহারা।এরপরের দৃশ্যে যা হলো তা খুবই বেদনাদায়ক...আশপাশের পথচারীরা চিৎকার শুরু করে দিলো আর এটা শুনে ট্রাক ড্রাইভার ভয় পেয়ে ভাবলো বোধহয় ঐ লোক মারা গেছে...ড্রাইভার ট্রাক ষ্টার্ট দিতেই দেখালাম সাইকেল আরোহী জ্ঞান ফিরে মাথা তুলেছে...ততক্ষণে পাবলিকের বাণীকে ড্রাইভার ভাবল হুমকি...এবং হতবিহ্বল হয়ে সেই সাইকেল আরোহীকে চাপা দিয়ে চলে গেল...একটা তীব্র মাথার খুলি ফাটার শব্দ পেলাম...‘কটাশ!!’
সেদিন কোন এক রাস্তার ফুটপাথ দিয়ে হাট ছিলাম...রাস্তায় তখন গাড়িগুলি ধুকছে...নানান শব্দে।হঠাত করে কয়েকটা মোটর সাইকেল আমার গায়ে এসে পরল...আমি অবাক হয়ে তাকাতেই এক মোটর সাইকেল আরোহী বলে উঠল, ‘আবাল নাকি?নাকি ঢাকা শহরে নতুন’...তার বলার ভঙ্গি দেখে ভাবলাম আমিই বোধহয় ভুল করেছি।এটা ঢাকা শহরে এখন একটা সাধারণ দৃশ্য।এই কথাটা বলার উদ্দ্যেশ্য...আইন যদি আমি আপনি বা আমরা নিজেরাই না মানি তো ট্রাফিক দিয়ে সারা বাংলাদেশ ভরে ফেললে কি উপকার হবে?রাস্তার ফুটপাথ তো হাটার জন্যে করা...সেখানে কেন মোটর সাইকেল উঠবে?আর এই অবৈধ ভাবে মোটর সাইকেল ফুটপাথে ওঠার জন্যে যদি কেউ হতাহত হয় তবে তার জন্যে দায়ী কারা হবে?কে শেখাবে আমাদের এইসব কথা?ঠিক এই ভাবেই ট্রাফিক সার্জেন্টও রাজকীয় কায়দায় রাস্তার উপর রেখে দেন তার বাহন...যেন আমিই তো রাস্তার রাজা...তুই কে?এমন দৃশ্য বহু দেখেছি যেখানে আইন প্রয়োগকারী সংস্থ্যার গাড়িগুলি সাধারণ মানুষের বাহন কে যাচ্ছেতাই ভাবে...প্রয়োজন থাকলে এক কথা কিন্তু প্রয়োজন ছাড়া কেন সাইরেন বাজিয়ে তাদের কে আগেই যেতে হবে?আর ভাষার ব্যাবহারের কথাটা না হয় থাকল।
এই লেখার হেডিংটা দিলাম ‘বিশ হাজার টাকায় কেনা তারেক মাসুদ আর মিশুক মুনির সহ পাঁচজনের লাশ’...আর বললাম কি?আপনারা হয়ত ভাবতে পারেন, ‘চাচার মাথা গেছে’।আসলে আমার মাথা ঠিকই আছে...বাংলাদেশে বসবাস করে একটা কথা যে কোন আলোচনায় যেয়ে থামে তার তো ইয়ত্তা নাই...তাই বেশি বকা।একজন ড্রাইভার কে এখন আর লাইসেন্স পেতে পরীক্ষা দিতে হবে না...মাননীয় নৌ-পরিবহন মন্ত্রীর চাপের কাছে নতি স্বীকার করেছেন আবুল সাহেব।কেন এই ব্যাবস্থ্যা?কারণ হিসেবে মন্ত্রী মশায় দেখিয়েছেন অদ্ভুত যুক্তি...বি আর টি এর নাকি লোকবল নাই এত মানুষের পরীক্ষা নেবার।অথচ বি আর টি বলছে।।তারা জরুরী অবস্থায়ও বিশেষ ব্যাবস্থায় পরীক্ষা নিয়ে লাইসেন্স দিয়েছে।মাননীয় মন্ত্রী শাহ জাহান খা সাহেব শুধু জলের উপরই দাপট দেখাচ্ছেন না...রাস্তায় তার গাড়ী থাকাতে এই দাপট এখন ডাঙ্গায়।বাংলাদেশ সরকার আমাদের রাস্তার রাজা ড্রাইভারদের জন্যে করেছেন বিশেষ আইন...মাথা পিছু মানুষ হত্যায় জরিমানা গুনতে হবে বিশ হাজার টাকা...অনাদায়ে কিছুদিনের কারাভোগ।কিছুদিন আগে শাহবাগে মা আর ছেলে রাস্তা পার হচ্ছিলেন...ঘাতক বাস এসে মায়ের সামনে বাচ্চাকে ছিটকে রাস্তায় মেরে ফেলল...শাস্তি হিসেবে ড্রাইভার কত টাকা দিছেন জানিনা...কিন্তু ঠিকই জামিনে মুক্তি পেয়ে পরিবারকে হুমকি দিচ্ছে... ‘কত দিন আটকায় রাখব?এইবার তোগরে মারমু রাস্তায়’...তারমানে কি এটা দুর্ঘটনা নাকি হত্যাকান্ড?ধরে নেন আজকে কারো ক্ষোভ আছে আমার উপরে...সেই ব্যাক্তি একটা গাড়ি নিয়ে রাস্তায় পিষে মারল তারপর বিশ হাজার টাকা জরিমানা গুনল...ব্যাস হয়ে গেল?
গতকালের দুর্ঘটনায় কাদের চুয়াডাঙ্গা ডিলাক্সের সেই ড্রাইভার হত্যা করেছে তা সে জানে কি?কিংবা জানার মত রুচি বোধের মানুষ সে?কিন্তু দেখা যাবে পাঁচ লাশের প্রতিটার জন্যে বিশ হাজার টাকা করে একলক্ষ টাকা গুনলেই সে খালাস।হায়রে অভাগা বাংলাদেশি...আমরা তারেক মাসুদ,মিশুক মনিরের লাশ চল্লিশ হাজার টাকায় কিনতে পারি।এই বিশ্ব সেরা মানুষের হত্যাকান্ডের মুল্য বিশ হাজার টাকা।হয়ত সেই চিত্র দেখলে অবাক হবনা যখন শোকে পাথর ক্যাথরিন মাসুদ আর মিশুক মনিরের পরিবার কে বুকে জড়ায় ধরে...হাতে বিশ হাজার টাকার চেক ধরায় দেয়া হবে...চারপাশে ক্যামেরার ফ্লাশ...আর মন্ত্রীর চোখে মুখে কৃত্রিম শোকের ছায়া।যে দেশে বিশ হাজার টাকায় তারেক মাসুদ আর মিশুক মনিরের মত বাংলাদেশ কে বিশ্বে চেনানো মানুষের লাশ কিনতে পাওয়া যায় সে দেশে চলচ্চিত্র ধ্বংস হয়ে যাবে এবং ‘যৌবন আমার লাল টমেটো’ মার্কা গান সমৃদ্ধ্য সিনেমা তৈরি হবে সেটাই স্বাভাবিক।
বিশ হাজার টাকায় কেনা তারেক মাসুদ আর মিশুক মুনির সহ পাঁচজনের লাশ।
সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই আগস্ট, ২০১১ দুপুর ১:৫১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



