somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বাংলাদেশের মানুষের মন -২

৩০ শে নভেম্বর, ২০০৭ সকাল ১০:২৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

প্রথমেই উদাসীনতা ও নিস্পৃহতার প্রসঙ্গে আসা যাক৷ বাংলাদেশের মানুষ তার পরিপাশ্বর্ের ঘটনাপ্রবাহের ব্যাপারে উদাসীন, আপাতঃদৃষ্টিতে সেরকমই মনে হয়৷ চারপাশে যা কিছু ঘটে যাচ্ছে, সেসব তারা এমন এক গভীর উদাসীনতা ও নিস্পৃহতা নিয়ে অবলোকন করে যে, মনে হয়, এসব তাদের জীবনে নয়, অন্য কারো জীবনে ঘটছে, এবং সেই অন্য কারো সঙ্গে তাদের বিন্দুমাত্র সম্পর্ক নেই৷ তো বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ দেখে দেখেই কাটিয়ে দিচ্ছে সারাটি জীবন৷ কোথাও যেন তাদের কোনো অংশগ্রহণ নেই, আর এই ধরনের দর্শকদের যা স্বভাব, সবকিছুই তারা মেনে নেয়, কিংবা নিজেকে মানিয়ে নেয় সমস্ত কিছুর সঙ্গে৷ যা কিছু ঘটে যাচ্ছে সেসবের সঙ্গে সে তাই খুব কমই নিজেকে সংশ্লিষ্ট করে তোলে৷ ব্যতিক্রম যে নেই তা নয়, তুমুল অংশগ্রহণের উদাহরণও এই জনগোষ্ঠীর মধ্যেই আছে_মুক্তিযুদ্ধ৷ ওই সময় বাঙালীর হাজার বছরের ইতিহাসে যা ঘটেনি, তাই ঘটেছিলো, বাঙালী একসঙ্গে সবাই মিলে একই ঘটনায় সংশ্লিষ্ট হয়ে গিয়েছিলো৷
এই বৈষয়িক উদাসীনতার বিষয়টি আমাদের জন্য একইসঙ্গে ইতিবাচক ও নেতিবাচক৷ নেতিবাচক এই অর্থে যে, একজন মানুষের যদি কোনো বৈষয়িক লক্ষ্য না থাকে তাহলে সে কোথাও পেঁৗছাতে পারে না৷ অল্পে তুষ্ট হলে তার প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধার ব্যাপারে সে থাকে উদাসীন৷ একটি জাতির ক্ষেত্রেও এই কথা সত্যি৷ কে জানে হয়তো এ কারণেই এদেশে মার্কসবাদী রাজনীতির ব্যাপক সাফল্যের সম্ভাবনা ও বিপ্লবের বহুবিধ কারণ ও উপাদান ছড়িয়ে থাকলেও এই রাজনীতি মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পায়নি৷ এদেশের মানুষের পক্ষে পুরোপুরি বস্তুবাদী হয়ে ওঠা কঠিন, প্রায় অসম্ভবই বলা যায়; ফলে একটি বস্তুবাদী দর্শনকে গ্রহণ করা তাদের পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠেনি৷ মার্কসবাদী রাজনীতির নেতা-কর্মীরা যখন তাদের বক্তব্য নিয়ে মানুষের কাছে গেছেন, তখন মানুষ এই বক্তব্যের মধ্যে তাদের বৈষয়িক মুক্তির সম্ভাবনা দেখতে পেলেও তাদের দার্শনিক প্রশ্ন ও কৌতূহলের কোনো উত্তর পায় নি৷ এই নেতা-কর্মীরা কখনো মানতে পারে নি যে, এদেশের মানুষের কাছে লেনিনের চেয়ে লালন গুরুত্বপূর্ণ, কারণ লালন তাদেরকে বৈষয়িক মুক্তির পথ না দেখালেও তাদের দার্শনিক ক্ষুধা অনেকখানিই মেটান৷ এই মেনে না নেয়ার ফলে মানুষের মনের কাছে তাদের পক্ষে পেঁৗছুনো সম্ভব হয় নি৷
এই যে উদাসীনতা আর নিস্পৃহতার কথা বললাম, এগুলো আছে বলেই হয়তো বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে আছে এক অদ্ভুত নিরাসক্তি৷ ঘটমান ঘটনাসমূহে তারা এমনভাবে অংশগ্রহণ করে যে, মনে হয় এসবে তাদের কিছুই যায় আসে না৷ অনেক সময় তারা অংশগ্রহণ পর্যন্ত করে না, কেবল দেখে যায়৷ মাঝে মাঝে মনে হয় এতো যে নিরাসক্তি তাদের, তারা কি একবারও ভেবে দেখে না যে, এসব ঘটনা তাদের জীবনে কী ভয়ংকর বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে? মাঝে মাঝে আমি কল্পনা করতে চাই পলাশীর আম্রকাননে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব যখন ইংরেজদের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত, তখন আশেপাশের কৃষকদের ভূমিকা কি ছিলো? তারা হয়তো তাদের দৈনন্দিন জীবনের ধারাবাহিকতায় মাঠে কাজ করছিলো, যুদ্ধ শেষ হলে হয়তো একজন আরেকজনকে জিজ্ঞেস করেছিলো, আজকে কি ঘটলো৷ হয়তো যুদ্ধের কথা জেনে এ-ও জানতে চেয়েছিলো, কে হারলো, কে জিতলো, কিন্তু তাদের নবাব হেরে গেছেন শুনে তাদের বিশেষ কোনো প্রতিক্রিয়া হয়েছিলো বলে মনে হয় না৷ এই পরাজয়ের সংবাদটিকে হয়তো তারা একটি মাত্র বাক্য দিয়ে গ্রহণ করেছিলো_'ও আচ্ছা৷' কিন্তু এই ঘটনা যে তাদের জীবনে কী দীর্ঘস্থায়ী ভয়ংকর বিপর্যয় ডেকে আনলো তা তারা ভেবেই দেখে নি৷ এ কথা সত্যি যে, নবাবের সঙ্গে বৃহত্তর জনজীবনের কোনো সম্পর্ক ছিলো না, ফলে নবাবের জয়পরাজয়ে তাদের বিশেষ কোনো ভাবান্তর না থাকাই স্বাভাবিক৷ তাই বলে নিজেদের নবাব হেরে গেলো বিদেশী একদল লোকের কাছে এটা কি কোনো প্রভাবই ফেলবে না তাদের মনে?
আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্র যা প্রচার করে এবং রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীরা যেসব কথা বলেন তার অধিকাংশই বিভ্রান্তিপূর্ণ৷ এ প্রসঙ্গে আমি আমার একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা আপনাদের বলতে চাই৷ কয়েকবছর আগেও পার্বত্য চট্টগ্রাম বাঙালীদের জন্য ছিলো নিষিদ্ধ অঞ্চল৷ এমন একটি ধারণা রাষ্ট্রীয় ভাবেই দেয়ার চেষ্টা করা হতো যে, ওখানে সব ভয়ংকর লোকজন বসবাস করে, সুযোগ পেলেই তারা আমাদেরকে হত্যা করবে, অতএব নিতান্ত বাধ্য না হলে ওখানে যাওয়ার দরকার নেই৷ ওই অবস্থায় আমি দু'বার রাঙামাটি গিয়েছিলাম, কিন্তু ভুলেও কোনো পাহাড়ী মানুষের সঙ্গে ভাব জমাতে চেষ্টা করিনি, ভয়ে৷ বলা তো যায় না, কখন কি হয়ে যায়! আমার একজন চাকমা বন্ধু আছে, কলেজে-বিশ্ববিদ্যালয়ে একসঙ্গে পড়াশোনা করেছি৷ অথচ এই অমায়িক বন্ধুটির অভয়বাণীও কোনো কাজে আসেনি, দু'বারই গিয়েছি ওকে না জানিয়ে৷ মনে আছে, একবার রাঙামাটি থেকে ফেরার সময় একটা ব্যাপার আমাদেরকে অপরাধী করে দিয়েছিলো৷ বাসে ৫/৭ জন পাহাড়ী ছাড়া সবাই ছিলো বাঙালী৷ আর্মিরা বাসটি থামিয়ে ওই ৫/৭ জনের দেহ তল্লাশি করে, এদের মধ্যে দু'জন মেয়েও ছিলো; তল্লাশিটা সবার চোখের সামনে এমন বিশ্রিভাবে করা হয়েছিলো যে মনে হয়েছিলো তল্লাশি নয়, তাদেরকে রেপ করা হচ্ছে৷ লজ্জায় আমার মাথা হেঁট হয়ে গিয়েছিলো৷ কিন্তু কোনো বাঙালীকেই এ নিয়ে টু শব্দটি উচ্চারণ করতে দেখিনি৷ তো শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হবার পর, ওই অঞ্চল যখন বাঙালীর জন্য 'মুক্ত' হয়ে উঠেছে তখন আমার সেই চাকমা বন্ধু আমাকে তাদের বাড়িতে নিমন্ত্রণ করে৷ আমার এই তৃতীয় সফর ছিলো আমার জন্য এক বিস্ময়কর অভিজ্ঞতা৷ এই প্রথমবারের মতো আমি পাহাড়ীদের সঙ্গে ঘনিষ্টভাবে মেশার সুযোগ পাই এবং আবিষ্কার করি এতোদিন পর্যন্ত এদের সম্বন্ধে যা যা শুনে এসেছি তার প্রায় পুরোটাই ভুল৷ এই সহজ-সরল, দুঃখী, অধিকারবঞ্চিত, নিপীড়িত, নিষ্পেষিত অথচ অতিথিপরায়ণ জনগোষ্ঠীটি সম্বন্ধে এতোদিন কী ভ্রান্ত ধারণাই না পোষণ করেছি, ভেবে আমি লজ্জায় বিমূঢ় হয়ে গেলাম৷ আমার অবস্থানের কয়েকটি দিনে তারা আমাকে কেন্দ্র করে এমন উত্‍সবে মেতে রইলো যে, মনে হতে পারে আমার চেয়ে বড় কোনো অতিথি তাদের জীবনে কখনো আসেনি৷ একজন 'বাঙালী' লোক সপরিবারে তাদের বাড়িতে গিয়ে থাকছে, খাচ্ছে, ঘুমোচ্ছে, সবার সঙ্গে একই পরিবারের লোকের মতো মিশে গল্প করছে এর চেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার যেন আর নেই৷
যাহোক, প্রসঙ্গে ফিরে আসি৷ বলেছিলাম, বাংলাদেশের মানুষ রহস্যপ্রিয়৷ এই কথার সত্যতা আপনি খুঁজে পাবেন, যদি এদেশের মানুষের মধ্যে টিকে থাকা হাজার হাজার কুসংস্কারের দিকে তাকান৷ এদেশের মানুষ ভূত-প্রেত-জি্বন-পরী-দেও-দানব এ সব কিছুতেই বিশ্বাস করে৷ নিজে কোনোদিন এসব দেখেছে_এমন দাবি কেউ করে না, সবাই শুধু জানে অমুকে দেখেছে, নিজে দেখেনি, অথচ তারা গভীরভাবে বিশ্বাস করে যে, এসবের অস্তিত্ব আছে৷ এগুলো তারা বিশ্বাস করে, কারণ এগুলো রহস্যময়, রোমাঞ্চকর, অচেনা এবং ধরাছোঁয়ার বাইরে৷ এসব বিশ্বাস তাদের জীবনযাত্রাকে গভীরভাবে প্রভাবিত ও পরিচালিত করে৷
এসবকিছুর বাইরে এ জাতির মধ্যে যে জিনিষটি সবচেয়ে বেশি পরিমাণে আছে তা হলো এদের আধ্যাত্মিকতা ও ভাববাদিতা৷ এদেশের শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়, যারা মূলত বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত আছেন, তাদের একটি বদ্ধমূল ধারণা রয়েছে যে, গ্রামের মানুষের একমাত্র সমস্যা হচ্ছে দারিদ্র্য৷ তারা যে ঠিকমতো খেতে পাচ্ছে না, পরতে পারছে না, তাদের থাকার জন্য ভালো একটি ঘর নেই, অসুখ হলে চিকিত্‍সার সুযোগ নেই_এগুলোই হচ্ছে তাদের জীবনের একমাত্র সমস্যা৷ এসব সংকট অস্বীকার করা যায় না, কিন্তু এগুলো তাদের জীবনে একমাত্র সংকট নয়৷ গ্রামের অনেক মানুষের মধ্যেই এমন কিছু দার্শনিক-সংকট আছে যে, তা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ দার্শনিকের প্রশ্ন ও সংকটের চেয়ে কোনো অংশে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়৷ তারা জীবন ও পৃথিবী নিয়ে, স্রষ্টা ও সৃষ্টির ধারণা নিয়ে, বিশ্বজগত্‍ সৃষ্টির উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য নিয়ে এমন কিছু প্রশ্ন তোলে যে, হতবাক হয়ে যেতে হয়৷ এ বিষয়ে আমি একটি উদাহরণ দিতে চাই, কিন্তু তার আগে আপনাদেরকে বাউলদের কথাও মনে করিয়ে দিতে চাই৷ তারা যে প্রশ্নগুলো তোলে তা কি খুব সাধারণ?
আমাদের এলাকায় খুব নদী ভাঙে৷ সব হারিয়ে মানুষ নিঃস্ব হয়ে পড়ে৷ তো এমনই একটি নদীভাঙা পরিবার আমাদের বাড়িতে এসে আশ্রয় নিয়েছিলো৷ যাঁর কথা আপনাদেরকে বলতে চাই, তাঁকে আমরা ডাকতাম মনসুর কাকা বলে৷ আমার বাবার বয়সী তিনি, ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে নাকি স্কুলে কিছুদিন পড়েছিলেনও, কিন্তু স্বাভাবিক নিয়মেই বেশিদূর এগোয়নি সেই পড়াশোনা৷ তো, তাঁর বাড়ি ভেঙে যাবার পর বাবাই তাকে আমাদের বাড়িতে এসে থাকতে বলেছিলেন৷ এতে তাঁর আশ্রয় যেমন জুটেছিলো, তেমনই আমাদের বাড়ি দেখাশোনা করার একজন বিশ্বস্ত মানুষও পাওয়া গিয়েছিলো৷ বাবা আমাদেরকে বলে দিয়েছিলেন, যেন আমরা এই লোকটিকে শ্রদ্ধা করি৷ তখন স্বাভাবিকভাবেই ভেবেছি তাঁর বয়সের কারণেই হয়তো একথা বলা হচ্ছে, কিন্তু পরে আমার ভুল ভাঙে৷
মনসুর কাকা ছিলেন এক অদ্ভুত মানুষ৷ রাতে যখনই তাকে ডাকতাম তিনি সাড়া দিতেন৷ আমার মনে অনেকবার এই প্রশ্ন জেগেছে যে, তিনি কি সারারাত জেগেই থাকেন? না, হয়তো তা থাকতেন না, হয়তো বাড়ি পাহারার উত্‍কণ্ঠা-ই ঐ বৃদ্ধ মানুষটিকে জাগিয়ে রাখতো৷ এমনই ছিলো তাঁর কর্তব্যবোধ ও স্নেহের ফল্গুধারা৷ কিন্তু এসব তখন আমার তেমন চোখে পড়েনি, যা চোখে পড়তো তা হলো_তাঁকে আমি প্রায়ই কাঁদতে দেখতাম৷ প্রথম প্রথম ধারণা করেছিলাম যে, তিনি বাড়ি ভাঙার শোকে কাঁদছেন৷ তাছাড়াও স্ত্রী তাঁর আগেই মারা গিয়েছিলেন, কোনো ছেলে ছিলো না, মেয়েদের বিয়ে হয়ে গিয়েছিলো বেশ দূরে দূরে, ফলে আক্ষরিক অর্থেই তিনি ছিলেন খুব নিঃসঙ্গ মানুষ৷ আমি ভেবেছিলাম এই বুড়ো বয়সে বাড়ি ভাঙার মতো ভয়াবহ বিপর্যয়ের ধাক্কা, আশ্রয়হীন হয়ে অন্যের বাড়িতে আশ্রয় নেয়া, নিজের আগেই তাঁর স্ত্রীর বিদায় নেয়া কিংবা এই ভয়াবহ নিঃসঙ্গতার যন্ত্রণা তিনি একসঙ্গে সামলাতে পারছেন না৷ তাঁকে একদিন জিজ্ঞেস করেছিলাম_'আপনি এতো কাঁদেন কেন মনসুর কাকা?' তিনি উত্তর দিলেন_'তুমি বুঝবা না বাবা৷' আমার তখন না বোঝার বয়স নয়, কলেজে পড়ি, তাঁর এই ধরনের সমস্যা নিশ্চয়ই বুঝতে পারবো৷ তাই আবার জিজ্ঞেস করলাম৷ এভাবে কয়েকবার জিজ্ঞেস করার পর তিনি যা বললেন আমি তার জন্য একেবারেই প্রস্তুত ছিলাম না৷
তিনি বললেন, 'ক্যান যে জন্মাইছিলাম সেইটা বুঝবার পারি না বইলা কান্দি৷'
এ কথার মানে কি? আমি ভেবেছিলাম, এই দুঃসহ জীবন নিয়ে খুব বেশি বিতৃষ্ণ হয়েই তিনি কথাটা বলেছেন৷ কিন্তু ব্যাপারটা সেরকম ছিলো না৷ মানে বুঝিয়ে বলতে বললে তিনি বলেছিলেন যে, তাঁর সবসময়ই মনে হয়_আল্লাহ যে তাকে এই দুনিয়ায় পাঠিয়েছেন, সেটা একেবারে খামোখা নয়৷ তাঁর নিশ্চয়ই কিছু করার কথা ছিলো, কিন্তু কি যে করার কথা ছিলো সেটা বুঝতেই পারেন নি সারা জীবনে, তাই তিনি কাঁদেন৷ তাঁর এই দৃষ্টিভঙ্গি আমাকে চমকে দিয়েছিলো৷ তাঁর মৃতু্য পর্যন্ত তাঁকে আমি অনর্গল প্রশ্ন করে গেছি, এবং তাঁর ভাবনা-চিন্তায় বিস্ময়ে অভিভূত হয়েছি৷ তাঁর ভাষ্যমতে জীবনের অন্য কোনো কিছু নিয়ে তাঁর কোনো আক্ষেপ নেই, তাঁর একটি ছেলের শখ ছিলো, হয় নি; কিংবা তাঁর আগেই স্ত্রী গত হয়েছেন, এইসব নিয়ে তাঁর কোনো দুঃখ নেই, বরং এগুলোকে তিনি দেখেছেন জীবনের এক স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হিসেবেই৷ এমনকি তাঁর যে বাড়ি ভেঙে গেছে, এটাকেও তিনি দেখছেন পুরোপুরি এক ভাববাদী দৃষ্টিকোণ থেকে৷ তাঁর ধারণা, করণীয় কাজটি করতে পারেন নি বলেই শেষ জীবনে তাঁকে এই কষ্ট পেতে হচ্ছে৷ তাঁর আক্ষেপ ঐ একটি বিষয় নিয়েই; তাঁর জানাই হলো না কেন তাঁকে এই পৃথিবীতে পাঠানো হয়েছিলো, তার করণীয় কাজটি কি ছিলো!
বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এটি একটি দর্শন৷ মনসুর কাকাও মনে করেন, এই জীবন স্রষ্টা প্রদত্ত; আল্লাহ তাকে পাঠিয়েছেন, কিন্তু তাঁর মতে এই জন্ম খামোখা বা বিনা কারণে হতে পারে না৷ তাঁর অবশ্যই কিছু করার কথা ছিলো৷ কি করার কথা ছিলো যদিও তিনি সেটা বুঝে উঠতে পারেন নি, কিন্তু কিছু একটা করার জন্যই তাঁকে পাঠানো হয়েছিলো, তাতে কোনো সন্দেহ নেই৷ আর বুঝতে পারেন নি বলেই তাঁর ওই কান্না৷ জীবনের সমস্ত বঞ্চনা, অপ্রাপ্তি, হাহাকার, দুঃখ, কষ্ট, অনেক কিছু হারিয়ে ফেলার বেদনা, নিঃসঙ্গতা ও অসহায়ত্ব এসবকিছু ভুলে গিয়ে তিনি যখন কেবল তাঁর জন্মের কার্যকারণ খুঁজে না পাওয়ার দুঃখে কাঁদেন, তখন ওই কান্না কী মহত্‍ হয়ে ওঠে, ভেবে দেখুন প্রিয় পাঠক৷ এই সহজ-সরল-প্রায় নিরক্ষর মানুষটির দর্শনটি তাহলে কি দাঁড়ায়! তিনি বলতে চান, মানুষের জীবন অর্থহীন নয়, উদ্দেশ্যহীন নয়৷ মানুষের নিশ্চয়ই কিছু না কিছু করার আছে৷
ভেবে দেখুন কী চমত্‍কার, অসামান্য একটি দর্শন আমাদের গ্রামের একজন সাধারণ মানুষ ধারণ করেন৷ আমি একটি মাত্র উদাহরণ দিলাম, এমন উদাহরণ আমরা সবাই দু'চারটে করে দিতে পারবো, অন্তত গ্রামের সহজসরল মানুষগুলোর সঙ্গে যাদের পরিচয় আছে তারা এই বিষয়টিকে নিশ্চয়ই উপলব্ধি করতে পারেন৷
এতোক্ষণ ধরে আমি যেসব কথা বললাম সেগুলো বাংলাদেশের মানুষের মন বোঝার জন্য যথেষ্ট নয়৷ আমি নিরাসক্তি, নিস্পৃহতা এবং উদাসীনতার কথা বলেছি, কিন্তু এগুলো মেনে নিলে আমরা মুক্তিযুদ্ধের বিষয়টিকে কিভাবে ব্যাখ্যা করবো? বাঙালী তো কোনোদিনই যোদ্ধা জাতি নয়, চিরকাল সে নির্ঝঞ্ঝাট থাকতে চেয়েছে, তাহলে মুক্তিযুদ্ধের সময় সবাই মিলে এমন মরণপণ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লো কেন? এটা কি হঠাত্‍ ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনা? সেরকমটি মনে করার কোনো কারণ নেই৷ হঠাত্‍ ঘটে-যাওয়া কোনো ঘটনায় এতো দ্রুত একটি জাতি সংঘবদ্ধ হতে পারে না৷ তাহলে কি বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে আগে থেকেই এমন একটি প্রস্তুতি ছিলো? থাকলে তো তাদেরকে আর উদাসীন বলে আখ্যা দেয়া যায় না৷ বোঝা যায় এ নিয়ে তাদের আগে থেকেই চিন্তা ভাবনা ছিলো৷ তাহলে সেটা বোঝা যায় নি কেন? তবে কি ব্যাপারটা এরকম যে, বাঙালী যতোটা উদাসীনতা দেখায় আসলে তারা অতোটা উদাসীন নয়! এ প্রসঙ্গে আমি অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাককে উদ্ধৃত করতে চাই৷ তিনি তাঁর একমাত্র লিখিত বক্তৃতা 'বাংলাদেশ : জাতির অবস্থা'-তে বলেছেন, "বাংলাদেশের মানুষ একটা জাতি, কারণ তারা একটা জাতি হতে চায়, অন্য কিছু নয়৷ .... এই জাতিকে তৈরি করেছে তার অনমনীয় গর্ব, সুখে-দুঃখে আট কোটি মানুষের সঙ্গে একই পরিচয় বহন করা, অন্য কিছু নয়, শুধু বাঙালী হতে চাওয়ার জেদ৷'
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা ডিসেম্বর, ২০০৭ সকাল ৭:০৫
১৫টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×