গেওর্গে আব্বাস ভনে শোনে কাব্যবান
গন্তব্যহীন আমি গাড়ি চালাচ্ছি অন্ধকারে, ঘোড়া চালাচ্ছি অন্ধকারে। আমার গাড়িতে বসার কোনো আসন নেই; বসে আছি মুন্ডুহীন বাঘের পিঠে। আমার যাত্রারম্ভ নেই, শেষ নেই। আমি তীরন্দাজ এখন। ঘোড়ার উজ্জ্বল ক্ষুরে উড়ন্ত পাটনার ধুলো; সামনেই তো কাফিরিস্তান। আমার ভেতর কথা তৈরি হচ্ছে দ্রুত। কিন্তু আমি চিঠি লিখব না। লিখতে গেলেই মনে পড়ে কবি শহীদ কাদরীর কথা। আজ থেকে প্রায় দেড় যুগ আগে জার্মান থেকে তিনি তাঁর বন্ধুদের লিখেছিলেন--- সাদা রমণীর উরুর ভাঁজের চেয়েও আমার বন্ধুদের মুখচ্ছবি আজও আমার কাছে উজ্জ্বল। না আমি চিঠি লিখব না। কথা বলব। আমি অদৃশ্যের সঙ্গে কথা বলব; একজন তরুন কবির সঙ্গে কথা বলব; আমি আমার সঙ্গে কথা বলব।
তোমার কবিতায় অদৃশ্য কোনো ব্লেড নেই অদৃশ্য। তাই তুমি শূন্যস্থানে রক্ত ঝরাতে পার না; অন্ধকারের তলপেট চিরে দিয়ে মধ্যাকর্ষণ উড়িয়ে দিতে জান না। তোমার কবিতায় তীব্রতা নেই; দু'শব্দের মধ্যবর্তী নীরবতা সহ সতর্ক অবিদিতিকরণ অনুপস্থিত। তুমি তো ভাল মিস্ত্রিবিদ্যকও নও। অনুপ্রাস, উপমা, উৎপ্রেক্ষায় নতুনত্ব নেই তোমার। ভাষিক ব্যঞ্জণা ও দুর্লক্ষ্য। তোমার ভাষা ম্যাড়ম্যাড়ে। বানান ভুল হয়। তোমার কবিতায় বিনির্মাণ নেই, যুগ্ম বৈপরিত্য নেই; যাদুবাস্তবতাও উত্তরাধুনিকতার অনুপস্থিতি আছে। ইংরেজী, ফরাসী ও চুবাস নগরীর শব্দ ব্যবহার করে কোনোও বাহাদুরী এ-অবধি দেখাতে পারো নি। কিন্তু অদৃশ্য, এত নেই’ ‘নেই’ বলার পরও একটিমাত্র সাধারন বাক্যে আমি যে একবার ‘আছে’ শব্দটির প্রয়োগ করতে চাই, আর তা হল--- তোমার কবিতায় কবিতা আছে।
সুদূর শৈশবে তখনও বিদ্যালয়ে যাইনি, স্বরে-অ স্বরে-আ আমাদের আয়ত্বের অতীত ছিল, তখনও তো জলের বর্ণহীন বর্ণ দেখেছি তুমি আর আমি। ঐ চিকনর ছায়াগুলি কেমন যে ছিল অদৃশ্য! হায় রঙ! ঐ সীম ফুলের মাথায় জমে-থাকা একবিন্দু শিশির! আহারে! আবার যদি, মৃত্যুর আগে অন্তত একবার যদি আমাদের নিষ্করুণ হৃৎপিন্ড ধুয়ে দেয়া দেয়া যেত শিশিরের জলে। অথচ দেখ অদৃশ্য, ঐ সীমফুল আর শিশিরের ফণাকে কতদিনের পরিচিত মনে হয়। মৃত বন্ধুর হাতের বলিরেখার কথা মনে পড়ে। কেউ কোনদিন, পৃথিবীর কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে কান্না শেখায়নি আমাকে, তাই বুঝি দুই চোখে নির্নিমেষ গড়িয়ে পড়ে নরম বেড়াল।
তুমি তো তরুন। তীব্র তরুন হলে প্রেয়সীকে কেন যে বারবার বল-- ভালবাসি, ভালবাসি। কিসের এত ভালবাসা তোমার। এ-শব্দ তো জবাই করেছে দশে মিলে। তুমি তা পুনর্বার হত্যা করো, তারপর প্রাণারূপ করো; ধরায় এসেছ তুমি কবি অথবা আজরাইল; কবি অথবা ঈশ্বর তুমি। আর যদি না-ই পারো প্রিয়ার হাত ধরে বলো আমি কেউ না, তোমার মেরুদন্ডে লাফিয়ে ওঠা একবিন্দু আনন্দবীর্য আমি; যত্রতত্র আমার ঝরিয়ো না; যতনে রেখো। তুমি তার নিতম্বে কায়মনে পাখি ধরো আর বলো-- এইখানে একজন কবির কবর শুয়ে আছে; তুমি ধীরে হাঁটো; সর্বমঙ্গলা হও; দুর্গা হও।
২+২=৩; দু-য়ে দু-য়ে সর্বদা চার হয় না বলেই আমরা ভাবিত হই; কবিতায় গিরিমাটির গন্ধ খুঁজি, হেমচন্দ্রের হেকটরবধ কাব্য থেকে লাবণ্যপ্রভা পাঠ করি। আমরা ভাবি বর্ণ, গন্ধসহ শব্দের আকার আকৃতি ইত্যাদি। আরও ধীরে ভাবি, এই ক'টি বর্ণমালা ব্যবহার করেই তো মানুষ কবি হয়। কেউ কেউ নোবেল পুরষ্কার অর্জন করে। তারপর আত্মহত্যা করে। তারপর যুথবদ্ধ আসে আরো একদল উজ্জ্বল তরুন। ঐ দলের ভেতরে একজনকে জ্বলজ্বল করতে দেখি, যার পকেটে তরতাজা দশটি কবিতা। আসলে কবিতা নয়, তার পকেটে দশ-দশটি উত্থিত শিশ্ন জেগে আছে; ইচ্ছে করলেই সে বিদ্ধ করবে সুপ্রিম কোর্ট, সচিবালয়, বেশ্যালয় ইত্যাদি ইত্যাদি।
তোমার শহরে রোদ উঠেছে অদৃশ্য। প্রচন্ড রোদে ঘেমে যাচ্ছে সংসদ ভবন থেকে সব্জি বাজার অবধি। তুমি হাঁটছো নগরীর প্রধান রাস্তা ধরে, তোমার সকল পরিচিত জন, এমনকি তোমার ডিজিটাল বন্ধু ও বান্ধবীরা তোমায় নিয়ে হাস্য করছে। প্রচন্ড বিদ্রুপ নিয়ে মাথার উপর দিয়ে উড়ে যায় পুংলিঙ্গের পাখি আর তখনও তুমি পৃথিবীর প্রাচীন নিরক্ষর এক অক্ষরের কাছে নতজানু। মাথার ভেতরে ভোঁ ভোঁ করছে একপাল মাছি। মাথার ভেতরে উড়ন্ত অক্ষরগুলি ভেজা ভেজা; মাতৃজরায়নজলে সিক্ত হয়ে আছে। তুমি লিখছ ‘দূরদেশে, বিদ্যুতে আগুন লাগে পাখির পেশাবে’। হতাশ হচ্ছে তুমি, ধীর হচ্ছো তুমি... ছেড়া বাতাস জোড়া তো লাগানো গেল না কিছুতেই। তারপরও হঠাৎ মনে হল স্নিগ্ধ ঐ বালিকাটির কথা--- তোমার কবিতা বড় কঠিন অদৃশ্য, তোমার কবিতা বড় কঠিন... যীশু খ্রিষ্টের মত প্রশান্ত হলে তুমি; আত্মজিজ্ঞাসু হলে--- ঐ বালিকা কি জানে, তুমি যে মানুষ নও। তুমি কবি। পাথরের বংশধর।
---------------------------------------------------------------------------------
প্রিয় ব্লগার নয়, তরুন কবি 'অদৃশ্য' এর নিম্নোক্ত শব্দাবলীর প্রতিউত্তরে- ১
প্রিয়তম শবদেহের প্রার্থনা নিয়ে
যেখানে ধরণী বুক চিড়ে
কফিন হয়ে আছে...

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

