চিঠি-১
বাবা,
জীবনে প্রথমবার অবাধ্য হয়েছিলাম তোমার। হয়ত তুমি ক্ষমা করেছ। আমি নিজেকে কিছুতেই ক্ষমা করতে পারলাম না। যতবার তোমার সামনে গিয়ে দাঁড়াই লজ্জা আর অপরাধবোধ আমাকে বিষাক্ত সাপ বিচ্ছুর মত কাঁটতে থাকে। নিজের বিষে নিজেই নীল হয়ে যাই। ২২ টি বছরের স্নেহ মমতা ভুলে মাত্র ২২ দিনের মিষ্টি কথায় কিনা বিশ্বাসঘাতকতা করলাম তোমার সাথে? এ লজ্জা আমি কি দিয়ে ঢাঁকবো বাবা? তাই এভাবে পালিয়ে গেলাম। এত অপরাধের বোঝা টেনে বেড়াবার শক্তি আমার নেই। একদিন তোমার মেয়ে থেকে তোমার মা হয়ে উঠেছিলাম। নিজের দোষে আজ মেয়ের অবস্থান টুকুও হারালাম! ভাল থেকো বাবা। যদি আর জন্ম নেই, তবে যেন তোমার মেয়ে হয়েই জন্ম নেই। সত্যি বলছি, বিশ্বাস কর বাবা সেদিন আর কোন বেঈমানী আমি কোরবো না। ভাল থেকো বাবা।
তোমার বুঁচি
চিঠি-২
মা,
২২ শে শ্রাবণ, যেদিন আমার জন্ম হল সেদিন নাকি সবাই ভেবেছিল তুমি আর বাঁচবে না। বাঁচতে তোমাকে হলই। বুঝি ভেবেছিলে "আমি মরে গেলে আমার ছোট্ট সোনাটার কি হবে?"। তাই জমদূতের মুখে ছাই ফেলে তুমি ঠিকই বাঁচলে, আমার জন্য। তোমার জানের জান টা কে এতটুকু কষ্ট তুমি কখনও পেতে দাওনি। বন্ধুর মত পাশে থেকেছ, বুঝিয়েছ ভুল আর সঠিকের পার্থক্য। অটুট বিশ্বাস রেখেছ আমার প্রতি। কত বার পাড়াপড়শির কত কথার জবাবে বলেছ "আমার মেয়ের উপর আমার বিশ্বাস আছে"! এই বুঝি সেই বিশ্বাসের জবাব দিলাম মা? সেদিন গভীর রাতে ফিরে আসার পর আমি তোমার মুখের দিকে একটি বারের জন্যও তাকাতে পারিনি। এখনও তোমার চোখে চোখ রেখে কথা বলতে পারি না আমি।
এভাবে কি বাঁচা যায় মা? তাই চলে যাচ্ছি মা। বাবা কে দেখে রেখ মা। বাবুকে ঠিকমত পড়াশুনা করতে বোল। ওকে ডাক্তার হতেই হবে। আমার আর বাবার স্বপ্ন টা যেন ও পূরন করে। বাবু কে যখন বিয়ে দেবে আমার সব গহনা নুতন বউ কে পরিয়ে দিও। বোল তোমার এই বিশ্বাসঘাতিনি মেয়েটার কথা। আমার অস্তিত্ব টুকু ভুলে যেও।
তোমার
চুটকি সোনা
চিঠি-৩
ইন্সপেক্টর সাহেব,
হয়ত আমি আপনার ছোট বোন বা মেয়ের মতই হব। আমার শরীর টা কাঁটা ছেড়া করার জন্য জোর করবেন না। আমি নিজ ইচ্ছেতাই এই পথ বেছে নিয়েছি। আমি বাবা মায়ের একমাত্র মেয়ে ছিলাম। ভীষন আদরের। বাবা, মা, আমি আর একটা মাত্র ছোট ভাই। ৩ বছর আগে একবার বিয়ে হয়েছিল আমার। যে কারনেই হোক টেকেনি বিয়েটা। বাবা মায়ের পরম বন্ধুত্ব আর সহযোগীতায় সে শোক আমি কাটিয়ে উঠি। হঠাৎ একটা ছেলের সাথে ফোনে পরিচয় হয় আমার। দেখা করি দূ'জনে। সেদিন ছিল আমার জন্মদিন। সে আমার অতীত জানতো। জানতো আমার সব দূর্বলতা গুলো। আমি ঠিক যা যা চেয়েছি ঠিক সেই স্বপ্ন গুলোই দেখিয়েছিল সে আমাকে। আমিও সেই ছলানয় ভুলে থাকতাম। একদিন বাবা মা জেনে যায় সব। এও জানতে পারে আমার থেকে তার যোগ্যতাও অনেক কম। এর মাঝে নুতন সম্মন্ধ আসে আমার। মা চাপ দিতে থাকে আমার উপর। ওর কথা মত ঘর ছেড়ে বের হই এক সন্ধ্যায়। ঠিক তখনই বেরিয়ে আসে ওর আসল চেহারা। সে বলে "আমাকে ফাঁসানোর জন্য নাটক কোরছো তুমি"। আজও ভেবে পেলাম না আমি, কি এমন যোগ্যতা ওর ছিল যার জন্য কোন মেয়ে ওকে বিয়ে করার জন্য নাটক করতে পারে?! রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকলাম ৩-৪ টি ঘন্টা। সে আসেনি।
তারপর উপায় না দেখে রাত ১২:৩০টায় বাসায় ফিরলাম এক দাদা আর সেই ছেলেটির সাহায্য নিয়ে যার সাথে আমার বিয়ের কথা চলছিল। বাবা মা কিছুটা শাস্তি দিয়েছিল আমাকে কিন্তু অপরাধের তূলনায় সে বড় সামান্য। কিন্তু আমার বিবেক আমাকে কিছুতেই রেহাই দিচ্ছিল না। আমার যে বাবা মা কখনও কোনদিন এত টুকু কষ্ট দেয়নি আমাকে আমি কিনা তাদেরই বিশ্বাস নিয়ে এভাবে খেললাম? কোন সন্তান যেন বাবা মায়ের সাথে এমন খেলা না খেলে, এমন ধোঁকা না দেয়। বাবা মা কখনো সন্তানের অমঙ্গল চান না। ২২ টি বছর যারা নিজেদের হাজার সুখ বিসর্জন দিয়ে আমার সুখের কথা ভেবেছে, মাত্র কয়েকমাসের মিষ্টি কথায় ভুলে অনিশ্চিত মায়াহরিণের পিছে ছুটে সেই বাবা মাকে অসম্মান করার দুঃসাহস দেখিয়েছি আমি। আমার কি বেঁচে থাকা উচিত বলুন? সৃষ্টিকর্তার কাছে একটাই চাওয়া কোন মেয়ে কখনও যেন এভাবে বাপ-মা কে ধোঁকা না দেয়। জানি এভাবে চলে গেলে বাবা মা অনেক ক ষ্ট পাবেন। কিন্তু আমিও আর পারছিলাম না। এত হীনমন্যতা নিয়ে বাঁচা যায় না। নিজের ছোট বোন বা মেয়ে মনে করে আমার শরীরটা ময়নাতদন্তে পাঠাবেন না। একজন পরাজিত মানুষের শেষ অনুরোধটা রাখবেন আশা করি!
শ্রেয়া
(বি:দ্র:লেখাটি আমার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বন্ধুর লেখা, আমি শুধু মাত্র প্রকাশক)
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা অক্টোবর, ২০০৯ সকাল ১১:৩৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


