somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সেক্স এবং জেন্ডারের পার্থক্য কোথায়?

২৩ শে আগস্ট, ২০০৯ রাত ১২:০৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

সেক্স এবং জেন্ডার- দুটি শব্দকেই সাধারণভাবে আমরা লিঙ্গ বলে থাকি। আভিধানিকভাবেও জেন্ডার শব্দটির অর্থ লিঙ্গ। ব্যাকরণ পড়তে গিয়ে আমরা দেখেছি জেন্ডার শব্দটির প্রতিশব্দ করা হয়েছে লিঙ্গ, যেমন- পুংলিঙ্গ, স্ত্রীলিঙ্গ, ক্লিবলিঙ্গ ও উভয়লিঙ্গ। জেন্ডার বিষয়টিকে নিয়ে যখন থেকে নড়াচড়া শুরু হয়, তখন প্রথমদিকে জেন্ডারকে লিঙ্গের প্রতিশব্দ বা ইংরেজি শব্দের আক্ষরিক অর্থ হিসেবেই মনে করা হতো। লিঙ্গ শব্দটি দিয়ে যেভাবে জৈবিক বা শারীরিক প্রপঞ্চকে প্রকাশ করা হয়, তাতে এর সামাজিক দিকগুলো সুস্পষ্টভাবে বুঝায় না। তাই পরবর্তী সময়ে এই ধারণা থেকে সরে আসা হয়েছে। বর্তমানে সাহিত্য, আলোচনা বা উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে জেন্ডার শব্দটি ভিন্ন ও ব্যাপকতর অর্থে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং দুটো শব্দেরই আলাদা ও সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা রয়েছে। উল্লেখ্য যে, সেক্স ও জেন্ডারের মধ্যে এই পার্থক্যের সূচনা কিন্তু নারীবাদীরা করেন নি; কিন্তু জৈবিক বা শারীরিক প্রপঞ্চের প্রকাশ থেকে ভিন্নতর প্রেক্ষাপট তুলে ধরার জন্য মনোবিজ্ঞানীরা সর্বপ্রথম এই শব্দটির ব্যবহার শুরু করেন, পরে নারীবাদীরা এটিকে অনুসরণ করেন।

সেক্স কী?
সেক্স হচ্ছে নারী ও পুরুষের মধ্যকার বৈশিষ্টসূচক ভিন্নতা যা শারীরিক বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে নারী-পুরুষের স্বাতন্ত্র্য নির্দেশ করে। এটি শারীরবৃত্তীয়ভাবে নির্ধারিত নারী-পুরুষের প্রাকৃতিক প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য বা জৈবিক কারণে সৃষ্ট এবং অপরিবর্তনীয়।

জেন্ডার কী?
জেন্ডার হচ্ছে নারী ও পুরুষের সামাজিক পরিচয় যা একইসাথে সামাজিকভাবে নারী-পুরুষের সম্পর্ক ও ভূমিকাকে নির্দেশ করে। এতে নারী ও পুরুষের সাথে সম্পর্কিত মনস্তাত্বিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বোধটি প্রাধান্য পায় বেশি। ফলে সমাজ, পরিবেশ ও স্থান বদলের সাথে সাথে জেন্ডার-ধারণা পরিবর্তিত হতে পারে।

পার্থক্য কোথায়?
অ্যান ওকলের মতে, সেক্স শারীরিক বৈশিষ্ট্য বহন করে। আর জেন্ডার একটি নির্দিষ্ট সমাজে সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিকভাবে নির্ধারিত বিশিষ্টতা নির্দেশ করে।একজন নারী ও পুরুষের কার কী রকম পোশাক-পরিচ্ছদ হবে; কে কী রকম আচার-আচরণ করবে; আশা-আকাঙ্ক্ষা, প্রত্যাশা কার কী রকম হবে; সমাজের নানা ধরনের কাজে একজন নারী বা একজন পুরুষের ভূমিকা কী হবে;মানসিক গঠনের দিক দিয়ে একজন নারী বা পুরুষ কী রকম হবে; সমাজ ও সংস্কৃতি নির্ধারিত এই বিষয়গুলোর ব্যাখ্যাদাতা হচ্ছে জেন্ডার।

উপর্যুক্ত বক্তব্য অনুযায়ী, সেক্স বিষয়টি পুরোপুরি শরীরের উপর নির্ভরশীল কিন্তু জেন্ডার নির্ভরশীল সমাজের উপর। যেহেতু নারী বা পুরুষের দায়িত্ব, কাজ ও আচরণ মোটামুটি সমাজ কর্তৃক নির্ধারিত হয়, তাই সমাজ পরিবর্তন বা সময় পরিবর্তনের সাথে সাথে জেন্ডার ধারণা বদলে যেতে পারে। উদাহরণস্বরূপ- আমরা যখন কাউকে ‘নারী’ বা ‘পুরুষ’ হিসেবে চিহ্নিত করি, তখন সেখানে জৈব-লিঙ্গ নির্দেশ করাটাই মূল উদ্দেশ্য হয়ে দাড়ায়। কিন্তু ‘মেয়েলি’ বা ‘পুরুষালি’ ইত্যাদি শব্দ ব্যবহারের মাধ্যমে জেন্ডার প্রপঞ্চকে যুক্ত করা হয় যেখানে নারী বা পুরুষের লিঙ্গীয় বৈশিষ্ট্যকে ছাপিয়ে স্বভাব-আচরণগত ইত্যাদি বেশ কিছু বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পায়। আর এ কারণে সেক্সকে জৈবলিঙ্গ এবং জেন্ডারকে সামাজিক লিঙ্গ বলে অনেকে অভিহিত করেন।

মোট কথা সেক্সের সাথে সম্পর্কযুক্ত বৈশিষ্ট্যগুলো শারীরিক বা জৈবিক, সর্বজনীন, অপরিবর্তনীয় এবং প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট।

অন্যদিকে জেন্ডারের সাথে সম্পর্কিত বিষয়গুলো সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও মনস্তাত্বিক; সমাজ ও সংস্কৃতিভেদে তা ভিন্ন হতে পারে এবং এটি পরিবর্তনীয়।

শ্রমবিভাজনেও সেক্স ও জেন্ডারের মধ্যকার পার্থক্যগুলো সুস্পষ্ট। নারী ও পুরুষ তার শারীরিক গঠনের কারণে যে কাজ বা ভূমিকা পালন করে, সেগুলোকে সেক্সভিত্তিক শ্রম বিভাজন বলা হয়। যেমন- বংশরক্ষায় নারী ডিম্বাণু সরবরাহ করে,শিশুকে স্তন পান করায়, অপরদিকে পুরুষ শুক্রাণু সরবরাহ করে। অন্যদিকে নারী ও পুরুষ সামাজিক বা সাংস্কৃতিক রীতিনীতি ও বিশ্বাসের কারণে সে কাজ বা ভূমিকা পালন করে সেগুলোকে বলা হয় জেন্ডারভিত্তিক শ্রম বিভাজন। যেমন- আমাদের দেশে সাধারণ ফেনোমেনা হচ্ছে নারী ঘরের ভিতরে কাজ করবে, পুরুষ কাজ করবে ঘরের বাইরে ইত্যাদি।

সুতরাং শব্দগত দিক দিয়ে দুটো শব্দ পুরোপুরি ভিন্নার্থ বহন করে। বাংলাদেশে একসময় সেক্স ও জেন্ডার- উভয়ক্ষেত্রেই লিঙ্গ শব্দটি ব্যবহার করা হলেও বর্তমানে অর্থগত দিক দিয়ে ভিন্নতা বহন করায় সেক্সের প্রতিশব্দ হিসেবে লিঙ্গ এবং জেন্ডারের জন্য আলাদা কোনো প্রতিশব্দ ব্যবহার না করে জেন্ডার শব্দটি হুবহু ব্যবহার করা হচ্ছে। সুতরাং শারীরিক বা জৈবিক বৈশিষ্ট্যের সাথে সম্পর্কিত কোনো আলোচনায় লিঙ্গ এবং এর বাইরের সব ধরনের আলোচনায় জেন্ডার শব্দটি ব্যবহার করাই শ্রেয় বলে মনে করা হয়।

***
নোট: ‌এনজিওতে কাজ করতে গিয়ে সেক্স ও জেন্ডারের পার্থক্য সম্পর্কে মোটামুটি এই ধরনের কিছু ধারণা পেয়েছি। এগুলোকে কেন্দ্র করে বর্তমানে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, উন্নয়ন, পুষ্টি ইত্যাদি বিভিন্ন ক্ষেত্রে জৈবলৈঙ্গিক বৈশিষ্ট্য থেকে জেন্ডারকে পৃথক করার চেষ্টা করা হচ্ছে এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে জেন্ডারকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে এনজিও জেন্ডার কর্মকাণ্ড বা জেন্ডার চেতনার সাথে অনেকক্ষেত্রে ব্যক্তিগতভাবে আমি একমত নই। উদাহরণস্বরূপ- অনেক এনজিওর জেন্ডার কর্মশালায় নারী-পুরুষ বৈষম্যের জন্য ধর্মকে দায়ী করা হয় না; কিন্তু আমার মতে প্রতিটা ধর্মই প্রবলভাবে পুরুষকেন্দ্রিক, পুরুষ-চেতনা পৃষ্ঠপোষক। এরকম আরও বেশ কিছু ক্ষেত্রে তাদের সাথে ব্যক্তিগতভাবে আমার দ্বিমত রয়েছে। আগামী মাসে জেন্ডার বিষয়ক একটা প্রশিক্ষণে যাচ্ছি। সেখান থেকে ফিরে এ ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনার আশা রাখি।
১৮টি মন্তব্য ১৮টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×