এর আগে অন্য এক লেখায় বিস্তারিত বলেছিলাম স্বপ্নটার কথা। আবারও বলি, সংক্ষেপে, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার শেষ দিকে থিসিস করার সময় কিছু জার্নালের আর্টিক্যাল ডাউনলোড করতে পারি নি- পারমিশন কিংবা ক্রেডিট কার্ড নেই বলে। তখনই প্রথম প্রশ্নটা মনে জেগেছিলো- জ্ঞানের জগতে এই বাঁধানিষেধ থাকাটা কি ঠিক? হয়তো ঠিক। জ্ঞান তৈরিতেও তো অর্থ লাগে! সেদিক দিয়ে ঠিকই আছে। কিন্তু তাহলে কি আমার মতো অর্থহীনদের জন্য জ্ঞানার্জন বন্ধ থাকবে?
স্বভাবজ্ঞান বলে- না, থাকবে না। থাকা উচিত নয়।
তাহলে?
তাহলে আর কি! অন্য কোনো প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে হবে যেখানে পড়ালেখার জন্য সমস্ত জ্ঞান উন্মুক্ত থাকবে। পৃথিবীতে এমন অনেক প্ল্যাটফর্ম ইতোমধ্যে রয়েছে। যেমন- উইকিপিডিয়া। কিন্তু সেখানে তথ্যের সমাহার; বিশেষায়িত জ্ঞানের জন্য গবেষণাভিত্তিক লেখা সেখানে নেই। তাই এমন একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা দরকার যেখানে ‘শিক্ষা’সম্পর্কিত যাবতীয় লেখা থাকবে। যে কেউ সেখান থেকে লেখা পড়তে পারবে, ডাউনলোড করতে পারবে, জ্ঞানার্জনের কাজে ব্যবহার করতে পারবে। আমার দেশ যেহেতু বাংলাদেশ, তাই বাংলাদেশের শিক্ষাসম্পর্কিত লেখাগুলোই সেখানে প্রাধান্য পাবে
সেই থেকে শুরু http://www.bdeduarticle.com -এর যাত্রা, যার আনুষ্ঠানিক পথচলা শুরু হয় ২০০৯ সালের মার্চের ১৪ তারিখে। ইতোমধ্যে সাইটটি ১০০ লেখার মাইলফলক অতিক্রম করেছে। এটুকু দাবি করা যায়- খুব খারাপ লেখা সেখানে নেই, কিন্তু বেশ কিছু ভালো লেখা পাওয়া যাবে। ভালো-খারাপ সব মিলিয়েই এই একশটির বেশি লেখা বাংলাদেশের শিক্ষাকে তুলে ধরেছে নানা দিক থেকে। এগুলোর মধ্যে যেমন গবেষণাধর্মী লেখা আছে, তেমনি আছে কেস স্টাডি, অ্যাকাডেমিক লেখা, বিভিন্ন সংস্থার উদ্যোগ, কলাম ইত্যাদি।
যেভাবে চলছে
নাম না দিয়ে নিজের একটি লেখা দিয়েই সাইটটির কাজ শুরু করেছিলাম। সহকর্মী, বন্ধুবান্ধব, অ্যাকাডেমিশিয়ান, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক- সবার কাছেই লেখা চেয়েছি। কেউ কেউ লেখা দিয়েছেন, কেউ কেউ দিবেন বলে আশ্বস্ত করেছেন। কেউ বা কোনো কথাই দেন নি। কিন্তু সবাই উৎসাহ দিয়েছেন অফুরান। লেখা চেয়েছি বিভিন্ন সংস্থার কাছ থেকেও। পদ্ধতিগত জটিলতার কারণে অনেক সংস্থা থেকে অনুমতি আসতে দেরি হচ্ছে, কিন্তু মৌখিকভাবে আশ্বাস দিয়েছেন অনেক সংস্থার প্রধানরাই। সবার আগে অনুমতি পেয়েছি আমার কর্মস্থল ব্র্যাক গবেষণা ও মূল্যায়ন বিভাগের লেখাগুলো প্রকাশের। তৎকালীন পরিচালক ইমরান মতিন সাইটের উদ্দেশ্য জেনে সাথে সাথেই অনুমতি দিয়ে দেন। তাঁকে ধন্যবাদ। পাশাপাশি বাংলাদেশ ইসিডি নেটওয়ার্ক তাদের সমস্ত লেখা এই সাইটে প্রকাশের অনুমতি দিয়েছেন। তাঁদেরকেও ধন্যবাদ। অনুমতি দেওয়ার এই পাইপলাইনে আছে আরও বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান- দেশের ও বিদেশের।
এছাড়া ব্যক্তিগতভাবে প্রচুর মানুষ সাইট তৈরির পর থেকে উৎসাহ দিয়েই যাচ্ছেন। অনেকে লেখা দিচ্ছেন নিয়মিত, কেউ কেউ লেখা যোগাড়ও করে দিচ্ছেন। কেউ কেউ নিয়মিত সাইট ভিজিট করছেন, কেউ মন্তব্য করছেন। কেউ ইমেইলে নিয়মিত পরামর্শ পাঠাচ্ছেন। পরিচিতদের যে যেভাবে পারেন, সেভাবেই উৎসাহ দিচ্ছেন, সাহায্য করছেন। যদিও উদ্যোগটি আমার, কিন্তু তাঁদের সবার নানামাত্রার সম্পৃক্ততা সাইটটি ভালোভাবে চলার পাথেয়।
যাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা
সাইটটি তৈরির সময় এ বিষয়ে বিন্দুমাত্র জ্ঞানও আমার ছিলো না। সুতরাং সাহায্য নিতে হয়েছে বিভিন্নজনের কাছ থেকে। নানান ধরনের কনটেন্ট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম থেকে জুমলাটাকে ভালো লাগলো। গুগলিং করে, ইবুক ডাউনলোড করে কিছুটা জুমলা শিখলাম, অবশ্যই শিখতে গিয়ে অনেককে বিরক্ত করতে হয়েছে। পুরো সাইটটি তৈরি করা জুমলা দিয়ে। সাইটটি ডোমেইন নেম, স্পেস ইত্যাদি বিষয়ে সোলার সফটওয়্যার সিস্টেমের সিইও আননূর রহমান বিভিন্ন সময়ে পরামর্শ দিয়েছেন, সাহায্য করেছেন। সাইট চালুর পর নানা কারণেই একের পর এক ঝামেলা দেখা দিতে থাকে। পিএইচডি থিসিস নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটানোর পরও সচলায়তনের সহমর্মী আলমগীর ভাইকে বিরক্ত করেছি। তিনি অনেক খুঁটিনাটি টেকনিক্যাল বিষয়ে সহায়তা করেছেন। সহকর্মী রিফাত আফরোজ বিভিন্নজনের কাছ থেকে লেখা আনার ব্যাপারে সহায়তা করেছেন। ইউনিভার্সিটি অব মালয়-এর সিনিয়র লেকচারার গাজী মাহবুবুল আলম লেখা ও বিভিন্ন উপদেশ দিয়ে সাহায্য করেছেন। এ সম্পর্কিত একটি লেখা লিখেছেন সামহোয়্যারইনের কৌশিক। সময়ে সময়ে বিভিন্ন উপদেশ ও মন্তব্য দিয়ে সহায়তা করেছেন শেভরন বাংলাদেশের পলাশ বসাক ও ইউনিভার্সিটি অব জর্জ ওয়াশিংটনের পিএইচডি গবেষক ও ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির লেকচারার মোহাম্মদ মিজানুর রশিদ শুভ্র। ডি. নেটের আসাদুজ্জামান আসাদ লেখা দিয়ে ও নানাজনকে সাইটের কথা বলেছেন সময়ে সময়ে। নানা ধরনের খুঁটিনাটি সাহায্য করেছেন ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচির তামান্না কলিম। প্রজন্ম ফোরামের বন্ধুদের কাছ থেকে নানা ধরনের টেকনিক্যাল সহায়তা। এরকম প্রচুর মানুষ আমাকে সাহায্য করেছেন যাদের অবদানের কারণেই আজকের এই সাইট- সবার নাম উল্লেখ করতে গেলে বিশাল তালিকা হয়ে যাবে। আর যারা লেখা দিয়েছেন, তাদের সহায়তার কথা উল্লেখ নাই করলাম! তাঁদের সবার প্রতি কৃতজ্ঞ। আমার একার পক্ষে কিছু করা সম্ভব হতো না, যদি না তারা আমার পাশে থাকতেন। সবচেয়ে বড় কথা, যে স্লোগান দিয়ে সাইটটি শুরু করেছিলাম, Knowledge is power only when it is shared, তাঁরা সেটিকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে নিজ নিজ অবস্থান থেকে প্রভুত সহায়তা করেছেন।
অর্থই অনর্থের মূল
থাকলে অফুরান আনন্দের উৎস, না থাকলে টাকা-পয়সা খুব খতরনাক বিষয়। একটি সাইট তৈরি করে দেওয়ার জন্য বেশ কয়েকজনের কাছে ধর্না দিতে দিতে ক্লান্ত হয়ে যখন হাল ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবছিলাম, তখনই জুমলার সাথে পরিচয়। কিছুদিন ঘাটাঘাটি করে নিজের ল্যাপটপে একটা সাইট তৈরিও করে ফেললাম। ব্যস, আর পায় কে! কয়েকদিনের মধ্যে ডোমেইন নেম আর স্পেস কিনে যাত্রা শুরু করলাম।
ডোমেইন নেম আর স্পেস কিনতে গিয়ে আরেক অভিজ্ঞতা। পকেট থেকে বেশকিছু টাকা বেরিয়ে যাচ্ছে দেখে প্রথমে ফ্রিতে করার চেষ্টা করলাম। লাভ হলো না। নানা জনে ভয় দেখালেন, ফ্রিতে করে অমুক হ্যাপা, তমুক হ্যাপা। তাঁদের পরামর্শ মেনে শেষ পর্যন্ত কারো কাছে হাত না পেতেই কাজ শুরু করে দিলাম।
সাইট চালু হওয়ার পর গুগল অ্যাডসেন্সের দ্বারস্থ হলাম। প্রবল জনপ্রিয় এই মাধ্যমটি নিয়ে প্রথমদিকে বেশ চিন্তাগ্রস্তই ছিলাম- না জানি কী সব অ্যাড দেখায়! কিছুদিন ব্যবহারের পর মোটামুটি নিঃশঙ্ক হলাম যে, তারা উল্টাপাল্টা কোনো বিজ্ঞাপন দেখায় না। সেই থেকে গুগল অ্যাডসেন্স চালু রাখলাম। পকেটের পয়সা খরচ করে সাইট তৈরি ও মেইনটেইনেন্সের মতো সামর্থ্য নেই, ফলে এর দ্বারস্থ হতেই হলো। উদ্দেশ্য- সাইটের খরচটুকু তুলে আনা। পাশাপাশি উদ্বৃত্ত থাকলে বাড়তি টাকা দিয়ে ঠিক একই রকম আরেকটি সাইট বানানোর চিন্তা আছে- আমার প্রিয় বাংলায়। সেখানে শিক্ষাবিষয়ক সব বাংলা লেখা থাকবে, থাকবে বাংলায় ভাবনাচিন্তা বিনিময় করার সহায়ক উপাদানগুলো। যারা বিভিন্ন কারণে ইংরেজিতে লিখতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না, তারাও তখন এখানে বাংলায় লিখতে পারবেন সহজেই। না, সাইটের খরচ উঠে আসে নি, কিন্তু ছোট্ট সুখবর এই যে, বাংলা সাইট বানানোর কারিগরি দিকটি তৈরি করে রাখা হচ্ছে। যে কোনোদিন হুট করেই হয়তো শিক্ষাবিষয়ক এরকম একটি বাংলা সাইট চালু হয়ে যাবে।
শেষ কথা
এই লেখাটা কেন লিখলাম? নিজের আনন্দটুকু প্রকাশের জন্য, সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য। পাশাপাশি শিক্ষা বিষয়ে যারা ভাবেন, চিন্তা করেন, লিখেন- তাঁদের অনুরোধ করার জন্য যে, আপনার মতামত কিংবা লেখাটা পাঠিয়ে দিন সাইটের ঠিকানায়। শিক্ষা নিয়ে প্রত্যেকেরই কিছু না কিছু ভাবনা আছে, আছে নিজস্ব মতামত- সেগুলোই পাঠিয়ে দিন। আপনার-আমার ছোটখাট ভাবনাগুলোই হয়তো একদিন অনেক বড় হয়ে উঠবে, দেশের শিক্ষাকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে।
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা নভেম্বর, ২০০৯ সন্ধ্যা ৬:৪৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


