somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মুক্তি, স্বপ্ন, জাদুবাস্তবতা ও হেমাঙ্গ বিশ্বাস

১৫ ই ডিসেম্বর, ২০০৯ দুপুর ১২:২৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

তরুণ বয়সটা খুবই খতরনাক্- মাথার ভেতরের দুনিয়াটা ভেঙেচুরে উলটপালট করে দেয়। বাইরের জিনিসগুলো তখনও আস্ত থাকে বলে মনে হয় সেগুলোর সবকিছু চুরমার করে ফেলি। মানুষ শেষ পর্যন্ত সৃষ্টিশীল বলে নতুন করে গড়ার ইচ্ছেটা ভাঙার সাথে সাথেই প্রবলতর হয়ে উঠে।

মানুষের জন্মের সময় মস্তিষ্কে সাম্য-অসাম্যের কোনো উপাদান থাকে কিনা জানি না, তবে শৈশবকালে অসাম্যের দিকগুলো খুব একটা ধরা দেয় না। আস্তে আস্তে বড় হওয়ার সাথে সাথে মানুষ প্রবলভাবে আবিষ্কার করে এই দুনিয়া কতোই না অসাম্যে ভরা! তখন সে বিস্মিত হয়, চিন্তিত হয়, ক্রোধান্বিত হয়, বিক্ষুব্ধ হয়। এই নানা ধরনের ‘হওয়া’র পাশাপাশি মস্তিষ্কের ধূসর পদার্থগুলোতে জন্ম নিতে থাকে আরও দুটি উপাদান— আশা ও স্বপ্ন। বিশেষ করে অসাম্যের পাইপলাইনে যাদের নিত্য-বসবাস, তাদের একটি বিরাট অংশের পুঁজিই থাকে মাত্র দুটো জিনিস— স্বপ্ন আর আশা।

পূর্বসূরিদের স্বপ্নের ধারাবাহিকতা ভর করে উত্তরপুরুষদের মাঝে। কৈশোরকালের কথা মনে পড়ে— আস্তে আস্তে তরুণ বয়সের দিকে এগিয়ে চলেছি— টুকটাক দু’একটা প্রশ্ন মাথার মধ্যে কুটকুট করা শুরু করেছে। পাশের বাড়ির ওরা এতো কিছু খায়, আমি কেন একটা বড় ইলিশের টুকরা পাই না?

তরুণ বয়সে নিজের খাওয়াটা গৌণ হতে থাকে। বাস্তবতার জগতে যখনই মাত্র ঘুম থেকে উঠা— তখনই দেখি অসাম্য শুধু খাওয়াতে সীমাবদ্ধ নেই! আস্তে আস্তে আবিষ্কৃত হতে লাগলো— পুরো পৃথিবীটাই নানান জাতের অসাম্যে ভরা। ‘ছোটদের অর্থনীতি’ কিংবা ‘ছোটদের রাজনীতি’ এসময় হাতে ধরিয়ে দিলেন কিছু বড়-তরুণ। ছোট ছোট ধাপগুলো পেরিয়ে মার্কস, এঙ্গেলস, লেনিন, মাও, চে কিংবা ক্যাস্ত্রোদের জগত থেকে আবিষ্কৃত হতে থাকলো কার্য ও কারণের অবিচ্ছিন্ন সূত্রগুলো।

এরই মধ্যে উদীচীর এক অনুষ্ঠানের কিছু গান জানিয়ে দিলো হেমাঙ্গ বিশ্বাস নামের আরেক তরুণতর এই অসাম্যের বিষয়গুলো নিয়েই গান করেন— খেটেখাওয়া মানুষ যার বলিষ্ঠ কণ্ঠের যোগানদাতা। প্রবল উৎসাহে নিউ মার্কেট থেকে কিনে আনি তাঁর গাওয়া গানের ক্যাসেট। ধার করা ওয়াকম্যানে দিনের পর দিন শুনতে থাকি সুরেলা কথায় অসাম্যের নানা কাহিনী, কথা, চিন্তা, বাস্তবতা কিংবা (হয়তো) জাদুবাস্তবতার কথা। মিছিলের প্রতিটি স্লোগানের মতোই হেমাঙ্গ বিশ্বাসের গানের সুর মগজে মাদকতা ছড়ায়, বিটগুলো ছন্দোবদ্ধ লয়ে অনুরণিত হতে থাকে— হতেই থাকে।

একটা সময় পর দূরত্ব বাড়তে থাকে— মিছিলের ময়দান ক্রমশই দূরবর্তী তেপান্তরের মাঠ হয়ে যায়। প্রোফাইলে লেখা আছে আমার— সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী, অপছন্দ সমাজের তান্ত্রিকদের। তান্ত্রিকদের ওই অবোধ্য নানা মন্ত্র আস্তে আস্তে দূরত্ব আরও বাড়িয়ে দিতে থাকে। তর্ক-বিতর্কের ময়দানে একসময় দেখি চেষ্টা চলে আবেগ দ্বারা বশীভূত করার, ইমোশনালি ব্ল্যাকমেইলের। অনেককিছু মেলে না, আর অনেককিছু মিলাই না। আপন নিজেকে রেখে পর নিজেকে নিয়ে সরে আসি সেখান থেকে।

...কিন্তু হেমাঙ্গ বিশ্বাস কখনোই আমাকে ছাড়েন না। আমিও ছাড়ি না হেমাঙ্গ বিশ্বাসকে। দু’বন্ধুর এই জগতে আজও কোনো গভীর রাতে মোবাইলের মিউজিক প্লেয়ার কানে কানে বলে যায়— গাও ইন্টারন্যাশনাল, মিলাও এ মানবজাত!

সত্যিই কি মানবজাত মিলবে! মধ্যবিত্তীয় দোদুল্যমানতায় হেমাঙ্গ আবারও দৃঢ়তর হন— আমরা করবো জয়, নিশ্চয়ই!

এই অফুরান আত্মবিশ্বাসের উৎস কী? ধন্ধে পড়ে যাই, ভাবতে থাকি। ছোট্ট মাথায় সারা বিশ্বের ভাবনা আসে না। এই বাংলাদেশের কথাটুকুই শুধু ভাবি— হেমাঙ্গ বিশ্বাস নানাভাবে নানাসুরে ভাবনা খোরাক দিয়ে যান, ভাবনা দূর করে যান। আর যাওয়ার সময় বলে যান রবসনের কথা। নিগ্রো ভাই আমার পল রোবসন!

আমাদের আশেপাশে কতো রোবসন! কখনো ওদের দিকে তাকাই, কখনো উপেক্ষা করি, অবহেলা করি। ওদের শক্তি কিংবা উদ্যমতা হয়তো এই ছোট্ট মস্তিষ্ক কখনোই ধারণ করতে পারবে না— কিন্তু মুক্তির দিকে তাকানোর স্বপ্নটাকে মাঝে মাঝে নাড়িয়ে দেওয়া এই রোবসন-হেমাঙ্গদের হঠাৎ করেই কুর্নিশ করতে ইচ্ছে করলো!

(এই লেখার সাথে ইন্টারন্যাশনাল, আমরা করবো জয় আর রোবসন গান তিনটি জুড়ে দিয়েছিলাম- ইস্নিপসের লিঙ্ক হিসেবে। কিন্তু কাজ করছে না। গানগুলো হয়তো অনেকের ভালো লাগতো।)
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই ডিসেম্বর, ২০০৯ দুপুর ১২:৩২
৯টি মন্তব্য ৭টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×