‘আমরা যখন আকাশের তলে উড়িয়ছি শুধু ঘুড়ি/ তোমরা এখন কলের জাহাজ চালাও গগন জুড়ি’- কবি বেগম সুফিয়া কামালের লেখা এ লাইনগুলোতে ফুটে উঠেছে স্বল্প সময়ে বিজ্ঞানের অভাবনীয় অগ্রযাত্রার কাহিনী। সেই সাথে ফুটে উঠেছে স্বপ্ন আর কল্পনার বাস্তব রূপায়নের কাহিনী। তবে এসব কল্পনা বাস্তবায়নের পথ মোটেই সুগম ছিলো না, বন্ধুর এই পথ পার হতে বিস্তর কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে, পেরুতে হয়েছে প্রত্যাশিত-অতিপ্রত্যাশিত ও অপ্রত্যাশিত অনেক বাধা।
প্রাচীন রোমের কথাই ধরা যেতে পারে। সেখানে এমন এক সময় ছিলো যখন বিজ্ঞান-বিষয়ক যে কোনো চিন্তাকেই ধর্মবিরোধী মনে করা হতো। এমনকি সেখানকার একসময়ের রাজা লুই জনের পক্ষ থেকে ঘোষণাও দেওয়া হয়েছিলো যে, কেউ যদি চাঁদ-সূর্য-তারা ইত্যাদি নিয়ে প্রচলিত মতের বাইরে কোনো আপত্তিকর কথা বলে, তাহলে তাকে সারাজীবনের জন্য কয়েদ করে রাখা হবে। জনের শাসন ছিলো লৌহকঠিন এবং সে শাসনের চৌকাঠ ডিঙ্গিয়ে কেউ বিজ্ঞান বিশেষ করে জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চা করতে সাহস পায়নি। উল্লেখ্য, সে সময়ে বিজ্ঞানের শাখাগুলোর মধ্যে জ্যোতির্বিজ্ঞানই ছিলো অগ্রগামী ও সবচাইতে প্রভাবশালী।
অনেকে হয়তো অবাক হবেন, অ্যারিস্টটল কিংবা হিপোক্র্যাটিসদের যুগেও যখন বিজ্ঞানচর্চা হতো বেশ জোরেশোরে, তখন এর ১২০০ বছর পর কীভাবে এই ধরনের ঘোষণা আসে জনসম্মুখে? আসে, কারণ রাজা লুই জনের মতো অনেক সামন্তপতি বুঝতে পেরেছিলেন, মানুষ যতোই এ বিষয়গুলো নিয়ে চিন্তা করবে, ততোই তারা সৃষ্টিরহস্য সম্পর্কে জানবে এবং ততোই তাদের অলৌকিক কাহিনী বলে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে রাখার দিন শেষ হতে থাকবে। জনগন অধিক কিছু জেনে ফেললে এর সুদূরপ্রসারী ফল তো হবেই, পাশাপাশি রাজ্য চালানোতেও হয়তো অনেক প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে। বুদ্ধিমান শাসকরা এটা বুঝতে পেরেছিলেন, যদি জনসাধারণকে অশিক্ষিত করে রাখা যায়, তাহলে খুব সহজেই তাদের ওপর আধিপত্যের ঝাণ্ডা ওড়ানো যাবে। এ সময়টাকেই বিজ্ঞানীরা বিজ্ঞানের জগতের ‘অন্ধকার যুগ’ বলে অভিহিত করে থাকেন।
খ্রিস্টের জন্মেরও ৩০০ বছর আগে জন্মেছিলেন বিজ্ঞানী আর্কিমিডিস। এর আগে যারা বিজ্ঞানচর্চা করতেন, তাদের কেউই বিজ্ঞানী বলে অভিহিত হতেন না। কারণ তখন বিজ্ঞান নামে আলাদা কোনো শাস্ত্র ছিলো না। যে কারণে অ্যারিস্টটল একইসাথে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জনক হতে পারেন, আবার চিকিৎসাবিদ্যায়ও তাঁর অবদান স্মরণীয় বলে মানা হয়। তাঁদের পরিচয় ছিলো মূলত দার্শনিক। সে হিসেবে বিজ্ঞানের যাত্রা শুরু হয় মূলত আর্কিমিডিসের সময় থেকেই। আর এই ধারার সবচাইতে উজ্জ্বলতম অধ্যায়টি হচ্ছে জ্যোতির্বিজ্ঞান।
ত্রয়োদশ শতক পর্যন্ত বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে মূল অবদান রাখেন মূলত মুসলিম বিজ্ঞানীরা। আল মাহিহ, আল জাবির ইবনে হাইয়ান, আল খাওয়া রিজমি প্রমুখ বিজ্ঞানীরা যেমন জ্যোতির্বিদ্যায় তাঁদের পারদর্শিতা দেখান, তেমনি তাঁদের হাত দিয়েই শুরু হয় আজকের আলোক ও রসায়নবিদ্যা। এই বিজ্ঞানীরা আলোকবিদ্যা নিয়ে যে কাজ করেছিলেন, তার ওপর ভিত্তি করেই আলোকবিদ্যার অভাবনীয় উন্নতি সাধন করেন আরেক মুসলিম বিজ্ঞানী আল হাজেন।
এর পরপরই শুরু হয় গুটেনবার্গের ছাপাখানার যুগ, কোপার্নিকাসের সৌরজগতের যুগ, গ্যালিলিওর পৃথিবী ঘুরছে তত্ত্বের যুগ। কিন্তু তাঁরা কত চাপের মধ্যে থেকে কাজ করেছেন, তা বোধহয় সবাই জানেন। এমনকি ধর্মযাজকদের চাপে পড়ে গ্যালিলিওকে তো তাঁর তত্ত্ব প্রত্যাহার করেই নিতে হয়; যদিও তাঁর তত্ত্বের ওপর বিশ্বাস থেকে তিনি সরেননি একটুকুও। এরকম অনেক বাধাবিপত্তির মধ্যদিয়ে এগুতে হয়েছে সে সময়ের বিজ্ঞানকে। আবিষ্কৃত বিজ্ঞান তত্ত্বগুলোর মধ্যে যেগুলো শাসকদের পক্ষে যায়, নিদেনপক্ষে শাসকদের অন্তরায় হয়ে না দাড়ায়, শুধু সেগুলোর প্রচার ও প্রসার ঘটেছে। শাসকদের অত্যাচারে কতো মৌলিক গবেষণার ফলাফল নষ্ট হয়েছে, সেই সংখ্যাটি বোধহয় জানা যাবে না কোনোদিনও।
বিজ্ঞানী নিউটন, এডিসন, জেমস ওয়াট প্রমুখের কথা সবারই জানা। তাঁরা প্রাত্যহিক বিজ্ঞানকে যে কতদূর এগিয়ে দিয়েছেন, তা তাঁদের আবিষ্কৃত বিষয়গুলোর প্রতি নজর দিলেই বুঝা যায়। মনে করা হয়, সৃষ্টির প্রথম থেকে বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রা যদি ব্যাহত না হতো, তাহলে বর্তমানকালের মানুষ এখন যে সুবিধা ভোগ করছে, মানুষ কয়েক শতক আগে থেকেই সেগুলো ভোগ করতে পারতো।
তবে বিজ্ঞানের উন্নতি হওয়া এবং বিজ্ঞানমনস্ক হওয়া- দুটো ভিন্ন ব্যাপার। বিজ্ঞানের আবিষ্কারগুলোর সঙ্গে ওতোপ্রতোভাবে জড়িত অনেকেই এখনো প্রতিনিয়ত করে চলেছেন অবৈজ্ঞানিক কাজ, চেতনায় ধারণ করছেন কুসংস্কারের ডালি। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এখনো কন্যাসন্তান হত্যা, সতীদাহ প্রথা, প্রযুক্তিকে শয়তানের কারসাজি ভাবা ইত্যাদি ঘটনাগুলো ঘটছে। এবং এগুলো বেশি ঘটছে অনুন্নত দেশগুলোতে। কিছু কিছু দেশ যখন বিজ্ঞানের আবিষ্কারগুলোর সর্বোচ্চ ব্যাবহার ঘটিয়ে সভ্যতার উপরের স্তরে উঠে যাচ্ছে, তখন ওই দেশগুলোই দুর্বল দেশগুলোকে ওই আবিষ্কার দ্বারাই পদানত রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছে। প্রযুক্তি প্রতিনিয়ত তাই অত্যাচার করার যন্ত্রে পরিণত হচ্ছে। আর এটা সম্ভব হচ্ছে কারণ আমাদের মধ্যে প্রযুক্তিপণ্য ব্যবহারের সুযোগ বাড়ছে প্রতিনিয়ত, কিন্তু আমরা অনেকেই বিজ্ঞান চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে নিজেদেরকে বিজ্ঞানমনস্ক হিসেবে গড়ে তুলতে পারছি না। আমরা অনেকেই বুঝতে পারছি না, প্রযুক্তিমনস্কতার চাইতে বিজ্ঞানমনস্কতার অবস্থান অনেক ভিন্ন। একজন নিরক্ষর ব্যক্তিও চাইলে প্রযুক্তিমনস্ক হতে পারে, কিন্তু বিজ্ঞানমনস্ক হতে চাইলে অনেক চেষ্টা থাকতে হয়। আমাদের মধ্যে সেই চেষ্টাটির অভাব এতো প্রকট যে, যতোই আমরা শিক্ষিত হচ্ছি, ততোই হচ্ছি বিজ্ঞান-অমনস্ক।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

