গতরাতে পরীবাগের একটি চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছি। এমন সময় কাঁধে ঝোলা নিয়ে শুশ্রুমণ্ডিত এক প্রৌঢ় এসে পাশে দাঁড়ালেন। মুখে বড় দাড়ি, পকেটফোলা কাগজ। ঝোলাটি বেশ বড় এবং ভারী মনে হচ্ছিল। সামনেই একটি বেঞ্চে বসে আরো দু’জন প্রৌঢ় চা খাচ্ছিলেন। শুশ্রুমণ্ডিত প্রৌঢ় ঝোলা না নামিয়েই যোগ দিলেন তাদের আড্ডায় এবং বলতে শুরু করলেন একটি কাহিনী-- এক গবেষক ভিক্ষুকদের আর্থসামাজিক অবস্থান কীভাবে উন্নত করা যায় তা নিয়ে গবেষণা করছিলেন। এ উদ্দেশ্যে তিনি নদীর পাড়ে বসা এক ভিক্ষুকের সুগভীর সাক্ষাৎকার নিলেন অনেকক্ষণ সময় নিয়ে। ভিক্ষুকটি ভাবছিলো, এতো কথা বলছে হয়তো যাওয়ার সময় অনেক টাকা ভিক্ষা পাওয়া যাবে। কিন্তু গবেষকের দিক থেকে সেরকম কোনো সাড়া পাওয়া গেলো না। আসার সময় তাই ভিক্ষুকটি গবেষককে বললো, আপনি আমার সময় নষ্ট করে গেলেন।
গবেষক: কেনো? আমি তো আগেই বলেছি, ভিক্ষুকদের আর্থসামাজিক অবস্থা কীভাবে উন্নতি করা যায়, সে বিষয়ে আমি গবেষণা করছি। এতে তো আখেরে আপনারই লাভ হবে!
ভিক্ষুক: দূর মিয়া। আপনার সাথে এতোক্ষণ কথা না বলে ভিক্ষা চাইলে আরো দু’চার টাকা ভিক্ষা পাওয়া যেতো। আপনি খালি ফাউ প্যাঁচাল পাড়লেন।
কাহিনী শেষ করে সেই প্রৌঢ় পকেট থেকে দুটি কাগজ বের করে বললেন, আজ বিকেলে প্রেসক্লাবের সামনে বসে এই বিষয়টি নিয়ে একটি কবিতা লিখেছি। আপনাদের শোনাই?
মুখের ওপর না করা অভদ্রতা। আমাদের সম্মতি পেয়ে তিনি বলতে শুরু করলেন তার দীর্ঘ কবিতা। কবিতা শুনে আমরা সবাই হতভম্ব। বড় কবি বা সমালোচকরা হয়তো বলবেন-- এ কিছুই হয়নি। কিন্তু কবিতার বক্তব্য এবং মাধুর্য আমাদের কানকে অন্তত শান্তি দিয়েছে অনেকখানি। মনে হয়েছে, এই কবিতা শুধু কানকেই শান্তি দেয়নি, প্রাচুর্যে ভরিয়েছে মনকেও। বলা দরকার, বাকি দু'জন প্রৌঢ়ের একজন বর্তমান সময়ের বড় কবি।
জিজ্ঞেস করলাম, কবিতা কেনো লিখেন আপনি?
বললেন, লিখতে চাই না। ইচ্ছে করে না। কেউ ছাপায় না, তাই। শামসুর রাহমান একদিন আমাকে বলেছিলেন, আপনি কবিতা ছাড়বেন না কখনো। তারপরও ছেড়েই দিয়েছিলাম। কিন্তু গতকাল তাঁর জন্মদিনে মনে হয়েছিলো, একটা কিছু লিখি তাঁর জন্য কিংবা আমার নিজের জন্য।
এ ধরনের অভিজ্ঞতা আগেও কয়েকবার হয়েছে। পরিচিত গণ্ডির মধ্যেও কয়েকজন কবি আছেন যাদের লেখা পত্রিকাওয়ালারা ছাপায় না। অথচ তাদের সবারই কবিতা কোনো না কোনোভাবে, অনেকক্ষেত্রে প্রকাশ্যেই বড় কবিদের দ্বারা প্রশংসিত হয়েছে। তারপরও ছাপার পাতায় তাঁরা উপেক্ষিত। মৌখিকভাবে প্রশংসিত হলেও তারা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে উপেক্ষিত প্রতিষ্ঠিত কবিদের কাছেও। মাঝেমাঝে তাই ধন্দে থাকি- আমরা কি এসব স্বভাবকবিদের মর্যাদা দিতে উদাসীন, নাকি তাঁদের লেখা বুঝতে অক্ষম?

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

