আমার বন্ধু পূষণকে বাইরে থেকে দেখলে আপাদমস্তক ভদ্রলোক মনে হয়। চুল ছোট করে ছাঁটা, নিচু স্বরে কথা বলে, ভদ্র ব্যবহার, পারতপক্ষে রাগারাগি করে না, কারো বিরুদ্ধে কখনো কোনো অভিযোগ করতে চায় না ইত্যাদি ইত্যাদি। আমি এখন পর্যন্ত এমন কোনো মানুষ দেখিনি যে পূষণের সাথে পরিচিত হয়ে ‘ছেলেটি অসম্ভব ভালো’ মন্তব্য করেনি। এমনকি পূষণের যে কনিষ্ঠতম বন্ধু লাজিমা, যার বয়স তখনও ৬ হয়নি, সেও গত ঈদের সময় ঈদ কার্ডে পূষণকে লিখে পাঠিয়েছে- You are a good boy. সুতরাং যে মানদণ্ডগুলো দিয়ে আমরা মানুষকে ভালো কিংবা মন্দ বলি, সেই মানদণ্ডে পূষণ অত্যন্ত নিপাট ভদ্রলোক।
এর বাইরেও পূষণের আরো গুণ আছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকে প্রগতিশীল আন্দোলনে জড়িয়েছিলো, শামসুন্নাহার হলের নারী ছাত্রদের লাঞ্ছিত করার ঘটনার প্রতিবাদে সে আন্দোলনকারীদের সামনের কাতারে ছিলো, হুমায়ূন আজাদের ঘটনায় সে নিজে পুলিশের হাতে লাঞ্ছিত হয়েছে। একদিকে সে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের অপ্রতিহত আগ্রাসন নিয়ে তীব্রতম বক্তৃতা রাখতে পারে সমাবেশে, অন্যদিকে তার বন্ধুদের চোখে সে একজন ‘নারীবাদী’। তার সমসাময়িক বন্ধুরা মনে করতো পূষণ একজন পুরুষ হয়েও পুরুষদের অধিকার রক্ষায় যতোটুকু না সচেতন, তার চাইতে বেশি নারীর অধিকার রক্ষায়। ফলে নারী ইস্যুতে কোনো পরামর্শ বা সিদ্ধান্তের প্রয়োজনে সবাই ছুটতে পূষণপানে। পুরুষবাদী নারীরাও যে কারণে পূষণকে সহ্য না করতে পারলেও পছন্দ করতো।
রক্ষণশীলরাও পূষণের প্রশংসা করে। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম চার বছরে কোনো নারী তাকে মোহমুগ্ধ করতে পারেনি, যদিও এর মধ্যে অনেক নারী তাকে ছুঁয়ে গেছে অগোচরে। পূষণ চিন্তা করতে পারে যৌক্তিকভাবে, বিজ্ঞানসচেতনতা আন্দোলনের নিষ্ঠাবান কর্মী সে। তার ট্র্যাক রেকর্ড আছে পরিবেশ নিয়ে কাজ করার, বিতর্ক করার, সাংস্কৃতিক আন্দোলনকে সংগঠিত করার।
সুতরাং যেভাবেই আপনি দেখুন না কেন, ভালোমানুষদের তালিকা থেকে পূষণকে ফেলা পরিচিত যে কারোরই জন্য কষ্টকর হবে। তবে একমাত্র আমি, পূষণের সবচাইতে প্রিয় ও ঘনিষ্ঠ বন্ধু, এবং সে নিজে জানে-- কিছু কিছু ক্ষেত্রে পূষণ পৃথিবীর চরমতম ভণ্ড একজন মানুষ। নিজেকে ভালোমানুষ সাজানোর অভিপ্রায়ে সে সময়গুলোতেও ভালোমানুষ হয়ে থাকার ভণ্ডামিটুকু করতে ছাড়ে না।
তার সব কাহিনী তো আপনাদের বলা সম্ভব নয়! বলাটা উচিতও না। তবে এটুকু বলতে পারি, বাইরে থেকে তাকে যতোটা নারীবাদী মনে হোক না কেন, তার সবই অন্য নারীর ক্ষেত্রে, নিজ নারীর ক্ষেত্রে ছাড়া দিতে পূষণ সেন্সরশিপ আরোপ করতে চায়।
তবে এটুকু পড়েই আবার পূষণকে ভুল বুঝতে শুরু করবেন না...
পূষণ তার গার্লফ্রেন্ডকে অসম্ভব ভালোবাসে। তার জন্য নেই এমন কিছু যা সে করতে পারে না। তার সামনে পূষণের সবকিছু উল্টাপাল্টা হয়ে যায়, অযৌক্তিক কাজকেও সে তখন যৌক্তিক করে নিতে পারে। অসম্ভব প্রেমিক এই পূষণই পুরো উল্টো আচরণ করে যখন সে কোনো কারণে নিজেকে বঞ্চিত মনে করে। মনে মনে ফুঁসে ওঠে যখন তার গার্লফ্রেন্ড তার প্রতি প্রত্যাশিত আচরণ করে না। কোনো কোনো মুহূর্তে পূষণ চায় তার গার্লফ্রেন্ড যেনো তার পুরো মনোযোগ পূষণের দিকে ঢেলে দেয়। সেটি যখন পায় না, তখন তার সমস্ত রাগ গিয়ে পড়ে গার্লফ্রেন্ডের পুরুষবন্ধুদের ওপর। তখন পূষণের গার্লফ্রেন্ড ওদের সাথে কথা বলুক, সময় কাটাক এটা সে সহ্যই করতে পারে না। কিন্তু এ কথা সে কাকে বলবে?
গার্লফ্রেন্ডকে? সেটি সম্ভব নয়। কারণ পূষণের গার্লফ্রেন্ড জানে বন্ধুত্বের ব্যাপারে পূষণ বেশ উদার। কিন্তু যা জানে না তা হলো, গার্লফ্রেন্ডের যে আবেগ পূষণের জন্য সেখান থেকে সে একবিন্দুও কাউকে ছাড় দিতে রাজি নয়। তবে এটুকু সে তার গার্লফ্রেন্ডকে বলতে পারে না। তাহলে তার গার্লফ্রেন্ড তাকে নিচু মনের, ছোট মনের মানুষ মনে করবে। যদিও পূষণ নিজেও জানে, এ ব্যাপারে সে সত্যিই নিচু মনের একজন মানুষ।
পারতপক্ষে সে চায় না তার গার্লফ্রেন্ডের কাছে কোনো পুরুষ ঘেঁষুক। কিন্তু নিজেকে প্রতিনিয়ত ভালোমানুষ বানানোর অভিপ্রায়ে সে এ ব্যাপারে কিছুই বলে না। বরং উৎসাহ দেয় সে তার গার্লফ্রেন্ডকে-- যাও, ওদের সাথে আড্ডা দাও। এনজয় করো, ইত্যাদি।
শুধু আমি জানি, কী অসহ্য রাগে তখন ফুঁসতে থাকে পূষণ, কী অসহ্য ক্ষোভে ঘণ্টার পর ঘণ্টার ঢাকার রাস্তাগুলো ক্ষতবিক্ষত হয় তার পদাঘাতে। যে কথা কাউকে বলা যায় না, সে কথা রয়ে যায় শরীরে। অসহ্য উত্তাপে পূষণ সেই রাগ-ক্ষোভ-অভিমান বয়ে বেড়ায় দিনের পর দিন। তার নারী কেন অন্য পুরুষের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ায় অংশ নেবে? স্বাভাবিক সময়ে তো পূষণ কিছু বলে না! নিজের একান্ত সময়গুলোকে কেন সে অন্যের সাথে ভাগ করে নিবে?
আমি অসম্ভব গাল দিই পূষণকে-- এ অন্যায়। পূষণ বলে, আমি জানি। কিন্তু আমারও তো সীমাবদ্ধতা আছে! পূষণ উল্টো প্রশ্ন করে আমাকে, এই যে আমার কথা তুমি ব্লগে সবাইকে জানিয়ে দিচ্ছ, কিন্তু তুমি বল তো এই সীমাবদ্ধতা কোন পুরুষের নেই? এ রকম বড় আর কোনো সীমাবদ্ধতা কি আমার মধ্যে আছে বলো?
অপমানে লজ্জ্বায় পূষণ মুখ ঢেকে রাখে হাত দিয়ে। আমি পূষণের আয়নায় দেখি আমার মুখটিও।
আমি আবারও সবাইকে বলছি-- ভালোমানুষের অন্তরালে পূষণ এ ব্যাপারে অসম্ভব ভণ্ড ও নিচু মনের মানুষ। তবে আমি এটুকু বলি- মন্দের ভালো হয়তো- পূষণ তার নারীকে অসম্ভব ভালোবাসে। তার নারী যেদিন সেটা পুরোপুরি বুঝবে, সেদিন হয়তো সে পাগল হয়ে যাবে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



