আমার দুই সহকর্মী পড়লেন কঠিন বিপদে। বিপদটা নারী হওয়ার জন্য।
তারা দুজনেই গ্রামীণফোন ব্যবহার করেন। একদিন হঠাৎ করেই একজনের মোবাইলে বিশ্রি এসএমএস আসা শুরু করলো। পড়ে তো তিনি হতভম্ব। এমন এসএমএস কেউ কাউকে লিখতে পারে- এটা তাঁর কল্পনায়ও ছিলো না। মুখ ভার করে তিনি আমাদের ঘটনাটা জানালেন, সেই সাথে জানালেন এসএমএসগুলো এমন যে, তিনি কাউকে সেগুলো দেখাতেও পারছেন না। আমি খুব একটা পাত্তা দিলাম না। নারী হয়ে জন্মেছেন, আবার এমন দেশে বাস করেন যেখানে যারা নারীনীতি বুঝে না তারা সেটার পর্যালোচক হয়ে যায়- সেখানে এটা স্বাভাবিক ব্যাপার। বরং আমি উল্টো অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম- এই প্রথম এ ধরনের এসএমএস পেলেন?
যা হোক, পরদিন থেকে পাশের সহকর্মীর মোবাইলেও এসএমএস আসা শুরু করলো। একই নম্বর থেকে একই এসএমএস। তাঁরা বললেন, এসএমএসের লেখা থেকে বুঝা যায় পরিচিত কেউ করছে। এমন কেউ যে তাদের দুজনেকই চিনে। দিন-রাত এসএমএস আসতেই লাগলো। এবার আর বিষয়টা উপেক্ষা করা গেলো না। আমরা দোকানের মোবাইল থেকে ওই নম্বরে ফোন করে জানার চেষ্টা করলাম কে এমন করছে। কিছুই জানা গেলো না- নম্বরটি সারাদিন বন্ধ থাকে। আরেক বন্ধুর মোবাইল থেকে একবার ফোন করা হলো, কিন্তু ওপ্রান্ত থেকে কেউ রিসিভ করে নি। উল্টো সেই নম্বরেও একই এসএমএস আসা শুরু হলো। বাধ্য হয়ে তাঁরা গেলেন গ্রামীণফোনের গুলশান অফিসের কাস্টমার কেয়ারে।
আমাদের ‘কাছের মানুষ’রা এখন কাস্টমার কেয়ারে বসেন! কিন্তু যিনি তাঁদের রিসিভ করলেন, তিনি প্রথমেই খুব ভাব দেখিয়ে বললেন- আমার সাথে আসেন। সহকর্মী দুজন গেলেন তার পেছন পেছন। মিনিটখানেকের মধ্যেই তিনি তাঁদের কথা ভুলে কোনো এক টেবিলে আলাপ জুড়ে দিলেন। কিছুক্ষণ পর পেছনে ফিরে আমার সহকর্মীদের দেখে খুব বিরক্ত হয়ে বললেন- আপনারা এখানে কেন? আপনাদের এখানে কে আসতে বলেছে?
আমার সহকর্মীরা নির্বাক, স্তম্ভিত। মনে হলো, অভিযোগ জমা দিতে গিয়ে তাঁরা অনেক বড় অপরাধ করে ফেলেছেন। তাঁরা বললেন- আপনিই তো আসতে বললেন! ভদ্রলোক বেমালুম অস্বীকার করলেন। যাই হোক, কিছুক্ষণ পর অভিযোগ জমা দিয়ে তাঁরা চলে আসলেন। জানানো হলো- ৭২ ঘণ্টার মধ্যে তাদেরকে অভিযোগের রেজাল্ট জানানো হবে। সেই সাথে এটাও বলে দেওয়া হলো- যে এসএমএস পাঠাচ্ছে, তাকে গ্রামীণফোন থেকে ফোন করে শুধু অনুরোধ করা হবে আর এসএমএস না করার জন্য। কিন্তু তারা ফোন বন্ধ করতে পারবে না। সহকর্মীরা অনুরোধ করলেন- ফোন বন্ধ না করলেও তাদের নম্বরে যেনো এসএমএস না আসে, সেই ব্যবস্থা করার জন্য। অদ্ভুত উত্তর পাওয়া গেলো- ‘আপনারা যেমন আমাদের কাস্টমার, তিনিও আমাদের কাস্টমার। আমরা কোনো কাস্টমারের নম্বর থেকে কল বা এসএমএস বন্ধ করতে পারবো না।‘
- ‘এভাবে দিনের পর দিন বিরক্ত করলেও না?’
- ‘না’।
তাঁরা চলে এলেন।
একদিন যায়-দুদিন যায়-তিনদিন যায়, গ্রামীণফোন থেকে আর কোনো ‘রেজাল্ট’ আসে না। কিন্তু এসএমএস ঠিকই আসে। এর মাঝে গ্রাহককথাঅনলাইনে চ্যাট করে একজনকে পুনরায় অভিযোগ জানানো হলো। তিনি জানালেন- এমন কোনো লিখিত অভিযোগ তারা পান নি। তারপরও তিনি বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখবেন বলে জানালেন।
আরো কয়েকটি দিন গেলো। অশ্লীল থেকে অশ্লীলতর এসএমএসের বন্যা শুরু হলো দুজনের মোবাইলে। বাধ্য হয়ে একজন গেলেন উত্তরা কাস্টমার কেয়ারে। সেখান থেকেও জানানো হলো- ফোন করে এসএমএস না পাঠানোর অনুরোধ করা ছাড়া তারা আর কিছু করতে পারবেন না। এবার গ্রামীণফোনে চাকরিরত আমাদের এক পরিচিতকে জানালাম। তিনিও কিছু চেষ্টা করলেন। কিন্তু লাভ হলো না। তিনি জানালেন- এরকম কোনো লিখিত অভিযোগ তারা পান নি।
তাহলে অভিযোগটি কোথায় গেল?
যা হোক, শেষ পর্যন্ত অন্য উপায়ে এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাওয়া গেছে- পরিচিত-স্বল্পপরিচিত কয়েকজনের আন্তরিক সাহায্যে। কিন্তু তার জন্য যে শ্রম- যে সময় ব্যয় হয়েছে, কিংবা যেভাবে বিভিন্ন উর্ধ্বতন মানুষদের কাছে যেতে হয়েছে, তাতে একটাই বোধ জন্মে- বিজ্ঞাপনের ’কাছের মানুষ’রা কর্পোরেট লাভের কাছের মানুষ, আমাদের মতো গ্রাহকদের নয়।
এই উৎপাত বন্ধ হওয়ার আরো দশ-বারোদিন পর অর্থাৎ প্রায় ২৫ দিন পর গ্রামীণফোন থেকে ফোন এলো আমার এক সহকর্মীর কাছে- ‘আপনি একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছিলেন, কিন্তু আপনার সিগনেচারটা ঠিক পুরোপরি মিলছে না...’

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


