১৩ই ডিসেম্বর, ১৯৬৫ সাল। ডাঃ নিখিল চন্দ্র সেন এই মাত্র রুগী দেখে ফিরছেন। রাত প্রায় পৌনে বারটা। রাজশাহী জেলার তানোর থানাস্থ মুন্ডুমালা গ্রামে তখনও বিদ্যুতের আলো পৌছায়নি। আশেপাশে পাঁচ ছয় ক্রোশ এলাকার মধ্যে (ডাক্তার বলতে ঐ সেন বাবুই) আর কোন ভাল ডাক্তার নেই। নবকুমার বাবু অবশ্য টুকটাক হোমিওপ্যাথি প্র্যাকটিস করেন, তাও দুই হাট বারে।
হাটের এক কোণায় বড় নিম গাছটার নিচে একটা দোচালা ঘরেই নিখিল বাবুর ছোট্ট ডিসপেন্সারী কাম থাকার ঘর। ঔষধ বলতে নেহায়েত জরুরি কিছু, এই যা। বড় কোন অসুখ-বিসুখে ঔষধ আনতে যেতে হয় সেই রাজশাহী সদরে, এখান থেকে প্রায় কুড়ি বাইশ মাইল। যাতায়াতের মাধ্যম বলতে, হয় গরুর গাড়ী নয়তো পায়ে হাঁটা। চাঁপাই নবাবগঞ্জ থেকে একটা মেইল ট্রেন অবশ্য আমনুরা-ললিত নগর হয়ে রাজশাহী যায়, তাও আমনুরা বা ললিত নগর দুটোই প্রায় ছয় সাত মাইলের হাঁটা পথ। তার ওপর ট্রেনের টাইম টেবলের কোন ঠিক ঠিকানা নেই।
চির কুমার নিখিল বাবুর বয়স প্রায় ষাটের কাছাকাছি। তিনকূলে এক দূর সম্পর্কের খুড়তুতো ভাইপো ছাড়া কেউ নেই। এই ছেলেটাই তাঁর দেখাশোনা করে ও পাশাপাশি নিখিল বাবুর তত্বাবধানে পড়ালেখা চালিয়ে যায়। নিখিল বাবুর আদি নিবাস কোথায় তা সম্ভবত কারুরই জানা নেই। মুন্ডুমালায় আছেন প্রায় পঁয়ত্রিশ বছর। কঠোর নিয়মানুবর্তিতার ভেতরে চলা মানুষটাকে সাদা চুলগুলো বাদ দিলে বয়স ধরা দায়। এখনও সাত আট মাইল পথ পায়ে হেঁটেই রুগী দেখেন। বয়স এতটুকুও ন্যুব্জ করতে পারেনি। প্রায় ছয় ফুট লম্বা, ফর্সা। পুরুষ্ঠ সাদা গোঁফ ও মাথা ভর্তি নিখুঁত করে আঁচড়ানো পাকা চুল। ভীষন সৌখিন এই মানুষটা ধবধবে সাদা পাঞ্জাবি ও চিকন পাড়ের ধূতি পরে, চোখে সোনালি গোল ফ্রেমের চশমা এঁটে হাতে ডাক্তারীর ব্যাগ সমেত যখন পথ চলেন, অনেকেই এক প্রকার ঈর্ষা মিশ্রিত সমীহের দৃষ্টিতে তাঁর গমন পথের দিকে চেয়ে থাকে। ভীষণ রাশ ভারী ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন অথচ সদা হাস্যময় নিখিল বাবু সবার অত্যন্ত প্রিয়। হিন্দু মসলিমদের সাথে সহাবস্থানে থাকা সাঁওতাল অধ্যুষিত এই এলাকায় যেন সকলের একমাত্র ত্রাতা তিনিই।
সাত পুকুরিয়া থেকে রুগী দেখে ফিরছেন। নিকষ কালো অন্ধকার চারদিকে। তার উপর ভীষন কুয়াশা। দু’হাত সামনের পথ দেথাই দায়। আকাশ ভর্তি তারা, কিন্তু তাদের আলোয় পখ আলোকিত হবার বদলে আঁধার যেন আরও জেঁকে ধরেছে। সদরউদ্দিন বিশ্বাসের দ্বিতীয়া স্ত্রী কুলসুমের ক’দিন ধরেই খুব জ্বর। কোন ঔষধেই ধরছেনা। এলাকায় কিছুদিন আগে কালাজ্বরের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছিল। অনেক প্রাণ নিয়ে গেছে। অজ পাড়া গাঁয়ের এই ডাক্তারের চেয়ে দেখা ছাড়া কিছুই করার ছিলনা। সদরউদ্দিন বিশ্বাসের দ্বিতীয়া স্ত্রীর জ্বরটা কালাজ্বরই কি না ভাবছিলেন আর হাঁটছিলেন তিনি।
চারদিক বড় বেশী রকমের নিস্তব্ধ। প্রচন্ড শীতে ঝিঁ ঝিঁ পোকারাও যেন ডাকতে ভুলে গেছে। পায়ের নিচের শক্ত লাল মাটিতে খড়মের একটানা ছন্দময় খট্ খট্ শব্দ ছাড়া আর কোথাও কোন আওয়াজ নেই।
সাত পুকুরিয়া ছেড়ে মুন্ডুমালা পথে প্রায় মাইলটাক দূরে পথের ধারে এক বিরাট শতায়ূ বট গাছ। গাছের নিচে কালি মন্দির। বট গাছের কাছাকাছি পৌঁছাতেই কেন জানি নিখিল বাবুর ভেতরটা কেমন করে উঠল। এই এলাকার প্রতিটি ধূলিকণার সাথে তাঁর অনেকদিনের পরিচয়। আজ প্রায় পঁয়ত্রিশ বছর হবে, এই এলাকায় তাঁর অবাধ পদচারণা। কি দিন, কি রাত, অকূতভয় নিখিল বাবু সব সময় পথ চলেন নির্দ্বিধায়। কখনোই তাঁর এমন হয়না। আজ হঠাৎ এমন হল কেন? চলার গতি কিছুটা বাড়িয়ে দিলেন তিনি। হঠাৎ কালি মন্দিরের দিক থেকে একটা মৃদূ অথচ করুন সুরে কান্নার শব্দ শুনতে পেরেন তিনি। অনেকটা ঘন বাঁশ ঝাড়ের ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া বাতাসের শব্দ যেন। মুন্ডুমালা হাটে বড় মন্দির নির্মানের পর নেহায়েত প্রয়োজন ছাড়া এদিকটায় কেউ আসেনা। তার ওপর মাস খানেক আগে যতীন মন্ডল এই গাছে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্ম্যা করেছে। লোকমুখে চালু আছে, গ্রামের কেউ কেউ নাকি গভীর রাতে যতীনের মত দেখতে একজনকে এই গাছের ডালে পা ঝুলিয়ে বসে থাকতে দেখেছে। এসব কারণে রাতে কেউ এই পথ মাড়ায়না।
এসব কথা মনে হতেই নিখিল বাবুর ঘাড়ের পেছন দিয়ে যেন একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল। প্রবল ভাবে মাথা নেড়ে নিজেকে বোঝাতে লাগলেন, না ভুল শুনেছেন। বট গাছের সীমানা তখনও পেরুননি। হঠাৎ মনে হল পেছন থেকে কে যেন খুব করুণ গলায় ডাকছে, ”নিখিল বাবু, নিখিল বাবু।” নিজেকে রোধ করার প্রবল ইচ্ছা থাকা সত্বেও কি এক অমোঘ আকর্ষন তাঁকে পেছন ফিরতে বাধ্য করল। দম বন্ধ করে জিজ্ঞেস করলেন,”কে?” অন্ধকারের ভেতর থেকে আগের চেয়ে একটু চড়া গলায় জবাব এল, ”বাবু হামি খগেন, হাঁকে (আমাকে) চিনতে পাচ্ছেন্না? ঐ যে আর বচ্ছর (গেল বছর) আপনার ঘর ছ্যায়্যা দিয়্যাছিনু।” ফোঁস করে সশব্দে চেপে রাখা শ্বাসটা ছাড়লেন তিনি। চিনেছেন খগেন কে।
”কি রে, তুই এত রাতে এখানে! কি করিস?”
”হাঁর (আমার) বেটিটার খুবই জ্বর, নামতেই চাহেনা তিন দিন ধইর্যা। আপনাকিই ঢুঁড়তে (খুঁজতে) গেছুনু তো শুন্নু আপনি সাত পোখোর্যা গেছেন। তাই এঠে (এখানে) খাঢ়িয়্যা ঘাঁটা (রাস্তা) দেখছুনু । বেটিটা জ্বরে বেহুঁশ হয়্যা আছে। আপনি ইকটু চলেন হাঁর সোঁথে, না হইলে উ বাঁচেনা। বাবু, আপনাকে ভগবানের দোহাই।” এক নিঃশ্বাসে কথা গুলো বলে থামলো খগেন।
দ্বিধায় পড়ে গেলেন নিখিল বাবু। এখন মাঝ রাত, হাট এখনও তিন মাইল মত দূরে। বাড়ি ফিরতে এমনিতেই অনেক দেরি হয়ে গেছে। ছেলেটা আবার চিন্তা করবে। যদিও এমন দেরি তাঁর জন্য নতুন কিছুনা, তবু কিছুক্ষন আগের ভাবনাটা মনের ভেতর খচ্ খচ্ করছে। মন কিছুতেই যেতে সায় দিচ্ছেনা।
”কিন্তু, এখনতো রাত অনেক হয়ে গেছেরে, তুই বরং কাল ভোরে আয়।” বলে হাঁটা দিলেন তিনি।
হঠাৎ সামনে এসে পথ আগলে দাঁড়ালো খগেন, ”আপনাকে য্যাতেই হবে বাবু, এখ্নি না গেলে এক ঘন্টার মইধ্যে হাঁর বেটি মইর্যা য্যাবে।” বলে কাঁদতে শুরু করে দিল মঙলু।
”তুই কি করে বুঝলি যে তোর বেটি এক ঘন্টার মধ্যে মরে যাবে? আমি বলছি, কিচ্ছু হবেনা ওর।” সান্তনা দেবার জন্য বললেন তিনি।
খগেন নাছোড়বান্দা, ”না, হামি ঠিকই জানি। উ ঠিকই মইর্যা য্যাবে। অর মাও এ্যাকই ভাবে মরল। আপনাকে য্যাতেই হবে।”
আজীবন মানুষের সেবা করে এসেছেন নিখিল বাবু । যত রাতেই ডাক আসুক, কখনই কাউকে ফিরিয়ে দেননি তিনি। সাঁওতাল পাড়াটাও বেশ ভালই চেনেন তিনি। আজ কি যে হয়েছে, কিছুতেই যেন পা চলছেনা। কে যেন ভেতর থেকে বার বার বলছে,”পালাও, পালাও।” কিন্তু খগেনের গলায় এমন কিছু ছিল যে আর না বলতে পারলেননা তিনি ।
মন্দিরের পাশ ঘেঁষে দক্ষিনে একটা পথ সোজা খাঁড়ির দিকে গেছে। সেই পথ ধরে খগেনের পিছু পিছু চলতে লাগলেন তিনি। মন্দির পেরোতেই পথের ওপর একটা গরুর গাড়ী চোখে পড়ল। ধবধবে সাদা বিশাল দু’টো ষাঁড় গাড়ির সাথে জোতা। এই তল্লাটে এত বড় ষাঁড় চোখে পড়েনা। কোথায় থেকে এল এগুলো? কাছে যেতে মনে হল চোখ দুটো যেন আগুনের গোলা, আর যে ভাবে শিং বাঁকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে যেন ছাড়া পেলেই তেড়ে আসবে। শরীরের প্রতিটা পেশী সাক্ষি দিচ্ছে প্রচন্ড শক্তির। প্রায় নিখিল বাবুর সমান উঁচু।এই ষাঁড় দুনিয়ার কোন প্রাণী কিনা সন্দেহ হয়।
”আপনাকে লিয়্যা য্যাব্যার ল্যাগ্যা গাড়হি লিয়্যা অ্যাসছি, চলেন, উঠেন। দেরী করিয়েন না” খগেন তাড়া দেয়। খগেনের মত একজন হত দরিদ্র লোক কোথায় পেল এতো দামী ষাঁড় জোড়া তা নিখিল বাবু বুঝে উঠতে পারলেন না। অন্য সময় তাঁর প্রতিক্রিয়া কি হত তা ভিন্ন কথা কিন্তু এখন মাথা মনে হচ্ছে যেন একেবারে ফাঁকা হয়ে আছে। কোন প্রশ্ন করার মতও অবস্থা নেই। মন্ত্রমূগ্ধের মত গাড়ীতে চেপে বসলেন নিখিল বাবু। চালকের আসনে খগেন।
গাড়ী যেন উড়ে চলেছে। মনে হচ্ছে ষাঁড় দু'টি মাটিতে পা ই ফেলছেনা। এত জোরে চলছে গাড়ী অথচ মাটিতে খূরের কোন শব্দ পাওয়া যাচ্ছেনা। কাঁচা মাটির পথেও গাড়ীর কোন দুলুনি নেই যেন। কেবল একটাই শব্দ কানে আসছে, ষাঁড়ের গলায় ঝোলানো ঘন্টার মৃদূ টুংটাং। নিখিল বাবুর কেমন যেন তন্দ্রামত লাগছিল। হঠাৎ বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দে তন্দ্রা কেটে গেল। অবাক হয়ে চেয়ে দেখলেন গাড়ীটা খাঁড়ির ওপর দিয়ে চলেছে!
এ কি করে সম্ভব! খাঁড়ির উপরেতো কোন সেতু নেই; তাহলে? সামনে চেয়ে দেখেন চালকের আসনে বসা খগেনের চাবুক (স্থানীয় ভাষায় 'সাঁটা') ধরা হাতটা চাদর থেকে বেরিয়ে আছে, তা তে কোন মাংসের ছিঁটে ফোঁটাও নেই, স্রেফ কংকাল। মাথাটা যেন কিসের আঘাতে থেঁতলে বিকৃত হয়ে আছে।
একটা প্রবল আর্তচিৎকার দিয়ে মূর্ছা গেলেন নিখিল বাবু। আর কিছু মনে নেই।
সকালে গ্রামের জেলেরা তাঁর অচেতন দেহ পায় খাঁড়িতে মাছ ধরতে এসে। নিখিল বাবুর জ্ঞান ফেরে দুপুরের পর। সমস্ত শরীর জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে। সুস্থ্য হতে সময় লাগে পাক্কা ৩ সপ্তাহ।
এর মাঝে খগেনের খোঁজ নিয়েছেন তিনি। ঘটনার দিন রাতেই তার মেয়ে মারা গিয়েছিল; কালা জ্বরে। খগেন ডাক্তারের খোঁজে দিশেহারা হয়ে ছুটতে ছুটতে আসছিল হাটের দিকে। খাঁড়ির ওপরে সেতু পেরুতে গিয়ে তাড়াহুড়োয় পা হড়কে খাদে পড়ে সে মারা যায়। তার আর মেয়ের জন্য ডাক্তার নিয়ে ফেরা হয়েছিলনা।
সেদিন সকালে নিখিল বাবুর একটু তফাতেই জেলেরা ঘাড় মটকানো অবস্থায় খগেনকেও উদ্ধার করেছিল।
---------------০---------------------
{অনেক আগে (২০০৭ এর ১৩ই ডিসেম্বর) গল্পটা লেখা হলেও কেন জানি পছন্দ না হওয়ায় ব্লগে দেয়া বা ছাপানো হয়নি। মাঝে আবার হড়ড়ড় জোয়ার চলল
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই ফেব্রুয়ারি, ২০০৯ বিকাল ৪:৫৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



