somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আমরা যারা তাঁর সান্নিধ্য পেয়েছিলাম, তারা আজ ভীষণ অসহায়

২১ শে জুলাই, ২০০৮ সকাল ১০:১৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

কবি সমুদ্র গুপ্তকে প্রথম দেখি ২০০০ সালের সন্ধ্যা প্রায় শাহবাগ আজিজ সুপার মার্কেটের একটি দোকানে। আপনমনে কাজ করছেন তিনি। মাথায় একরাশ রূপালি শুভ্র শাদা দীর্ঘ চুল, প্রায় বিরতিহীন সিগারেট টেনে চলেছেন। তিনি হেসে যাচ্ছেন এর মাঝেও অন্যদের সাথে। এরপর দেখা হয় ২০০১ সালে নোয়াখালীতে কবিতা উৎসবে। এখানেই মূলত পরিচয় আমার তাঁর সাথে। সে পরিচয় আমাকে টেনে নিয়ে গেছে সমুদ্র দা’র ভালোবাসায়।

গতকাল সকালের প্রখর ঘুম ভাঙ্গল আসলাম সানী ভাই’র ফোনে। তিনি জানালেন কবির প্রয়াণের খবর। সমুদ্র গুপ্ত আর নেই। ভারতের ব্যাঙ্গালোরের একটি হাসপাতালে ভোরে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন। আর বাঁচানো গেলো না। যে কবি প্রতিনিয়ত কবিতায় শব্দতরঙ্গ সৃষ্টি করতেন, প্রতিবাদের কন্ঠস্বর যিনি সেই কবি এখন প্রয়াত, বিশ্বাস হয় না, মানতে চাই না। বুকের মধ্যে কেমন যেনো বিষণ্নতা ছেঁয়ে গেছে অবচেতনে। অথচ তিনি আমাদের চেতনা-তারুন্যের প্রতীক ছিলেন। কবির সুস্থ কর্মময় আরও বহুবছর কামনা করেছিলাম। তার মহাপ্রয়াণ বড় তি হয়ে গেলো। আজ আমাদের অজানা হয়ে ওঠেনি। সারাজীবন যিনি তিমির হননের সংগ্রামে ছিলেন অক্লান্ত যোদ্ধা, তাঁকেই গ্রাস করে নিলো মৃত্যুর কপট অন্ধকার!

সিরাজগঞ্জের সন্তান কবি সমুদ্র গুপ্ত। ১৯৪৪ সালের ২৩ জুন তিনি জন্ম নেন। আবদুল মান্নান তাঁর আসল নাম। পাকিস্তানী গোয়েন্দা সংস্থার নজর এড়াতে সমুদ্র গুপ্ত নামে ছদ্মাবরণ করেন। সিরাজগঞ্জ থেকে ঢাকা-এই পথ পরিক্রমা তাঁর সহজ ছিলো না। ষাটের দশক থেকেই তিনি কবিতা, গল্প, সমালোচনা, সাহিত্য, প্রবন্ধ ইত্যাদি রচনা শুরু করেন। তাঁর ১৩টি কাব্য, একটি গদ্য, একাধিক সম্পাদিত ও অনুবাদ গ্রন্থ ছাড়াও বহু লেখা প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে রোদ ঝলসানো মুখ, স্বপ্নমঙ্গল কাব্য, চোখে চোখ রেখে, একাকী রোদ্রের দিকে, শেকড়ের শোকে, নদীও বাড়িতে ফেরে ইত্যাদি। তাঁর কবিতা ইংরেজি, ফরাসি, চীনা, হিন্দি, নেপালি ও সিংহলি ভাষায় অনূদিত ও প্রকাশিত হয়েছে।

ছুঁটে বেড়িয়েছেন সারাদেশ, কবি ও কবিতার আয়োজনে। কবি হিসেবেও নয় কেবল, যেকোনো সাংস্কৃতিক উদ্যোগেও সমুদ্র গুপ্ত ছিলেন প্রথম সারিতে। জাতীয় কবিতা পরিষদের তিনি অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা তিনি, পরবর্তীকালে সাধারণ সম্পাদক ছিলেন এ সংগঠনে।

১৯৬৯ এর গণ-অভ্যুত্থানের সক্রিয় কর্মী এবং মুক্তিযুদ্ধে তিনি অংশগ্রহণ করেন তিনি। ১৯৯০ সালে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

সমুদ্র গুপ্ত। অনেক বিশেষণে তাঁকে জানা যায়। সব বিশেষণ ছাপিয়ে তিনি আমার কাছে কেবল দাদাই ছিলেন। আমার মতো তরুণদের পাশে ছিলেন সবসময়, প্রাণিত করতেন সৃষ্টিশীল সব কাজে। শাহবাগ আজিজ সুপার মার্কেট ছিলো তার দ্বিতীয় ঠিকানা, তিনি প্রায় বলতেন এটি। আমাকে শাহবাগে নিয়মিত আমন্ত্রণ জানাতো এ মানুষটি। তার টানেই যেতাম শাহবাগে

বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান কবি হয়েও কবিতার প্রসাদ গুণে সমুদ্র গুপ্ত প্রধান কবিদের মধ্যে নিঃসন্দেহে বিশিষ্ট। তার এ বৈশিষ্ট্য নানামাত্রিক-যেমন কবিতার নিবিড় স্বভাবে, তেমনি মাটি ও মানুষ নিয়ে, ব্যক্তি ও সমাজ নিয়ে গভীর বাস্তবতার প্রকাশে। সমুদ্র গুপ্ত তার কবি স্বভাবে যেমন রাজপথের কবি, তেমনি বরাবর গ্রাম বাংলার মাটি, মানুষ ও নিসর্গের কবি। তার কবিতার পাঠক একই সঙ্গে পাবেন বাঙালি সত্তার গভীর অনুভব ও মননশীল। পাঠকের কাছে তাই তার কবিতা আধুনিকতার উদ্ভাস।

মনে পড়ে অসুস্থ হওয়ার কিছুদিন আগে শাহবাগের আজিজ মার্কেটের নিচে দেখা হয় সমুদ্র দা’র সাথে। আমার হাত ধরে দ্বিতীয় তলা, তৃতীয় তলা চল্লেন। অনেক কথা এরমাঝে। কবিতার কথা, রাষ্ট্র-সমাজ বিভিন্ন বিষয়ে কথা হয়। সেদিনের সাাতে জানান দিলেন তিনি অসুস্থ। খুউব হাস্যোজ্জ্বল ছিলেন। বাধর্ক্য তার শরীরকে ছেয়ে গেলেও তারুণ্য ছিলো সবসময় অদম্য।
প্রিয় কবি’র কাছে যাওয়ার বিচ্ছিন্ন স্মৃতিগুলো আজ উজ্জ্বল, আঁকড়ে ধরে রাখলাম এণ।

আমরা যারা তাঁর সান্নিধ্য পেয়েছিলাম, তারা আজ ভীষণ অসহায়।

বিশ জুলাই দুই হাজার আট, খিলগাঁও, ঢাকা
৩টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×